সময়
নারগিস দোজা
দশবছরের রামিসা টিভি ছেড়ে শ্রীদেবীর টিপটিপ বারষা পানি পানিনে আগ লাগায়া গানের তালে তালে নাচার চেষ্টা করছিল। তার মা মায়মুনা বেগম ভেজা কাপড় নিয়ে বারান্দায় যাচ্ছিল মেলে দেবার জন্যে। মেয়েকে কোমর দুলিয়ে পানিনে আগ লাগায়ের সাথে নাচতে দেখে সটান কানের পাশে একচড় লাগিয়ে দিলেন। রামিসা মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে কান্না শুরু করে করে দিল।
ওই ছেমড়ি, কান্দান বন কর কইতাছি। ফির যদি দেখি কোমড় উমর দোলাইয়া নাচবার, শইলের তামাম হাড্ডি ভাইঙা ফালামু। লেখাপড়ার খবর নাইকা ! ফির বছর ফেল করে। তমিজ লেহাজ কই গেছে খবর নাই ফিলমের নাইকাগো লাহান দিনভরনাচন কুদন লইয়া পড়ছে। এইগুলা কি পিনছোস। একখন খুল। মুখের রঙচঙ এখনি মুছ কইলাম।
দশবছরের রামিসার সিনেমার নায়িকা হবার সাধ ওখানেই শেষ। এখন সে কথা মনে করে তিনি আজও হাসেন। তিনি জানেন সে দিন তার আম্মা মায়মুনা বেগম যা করেছিল সঠিক কাজটাই করেছিল। কিন্তু আফসোসের কথা সেই সঠিক কাজটা তিনি নিজে করতে পারেন না। এদেশের নিয়মকানুন তা তাকে করতে দেবে না। চাইন্ড এবিউজের দুর্নাম দিয়ে মেয়েকে নিয়ে যাবে। গত সপ্তাহেই তো রায়নার বান্ধবী কার্লার বাসা ওভার নাইট স্টের কথা নিয়ে মা-মেয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি। মেয়ে যাবেই। তিনি রাজি না। সেই মুহূর্তে তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল সায়রার কানের নিচে একটা ধরিয়ে দিত আম্মার মতো। কিন্তু পারেননি। জীবনে আরো কতো কিছু যে পারলেন না সেটাই মনে মনে ভাবলেন। সায়রা অবশ্য শেষ পর্যন্ত যায়নি এবং সেই জন্য তিনদিন মায়ের সাথে কথা বলেনি। এদেশে একজন সিঙ্গেল মাদারের ছেলেমেয়ে বড়ো করা কতোটা যে টাফ তা যারা সেই পরিস্থিতিতে পড়ে তারাই জানে। পাঁচ বছর আগে রায়নার বাবার সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর থেকেই একা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশে হলে মা-বাবা পাশে থাকতো।
এখানে সেই সুবিধাটা নেই। অবশ্য এটা ঠিক রানার পাপার সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার কারণ বোঝাতে মুখে ফেনা উঠে যেতো। তাও কিছু এক্সপ্লানেশন তো আব্বা-আম্মাকে দিতেই হয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে একজন দশ বছরের সংসার থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় মানুষকে তা বোঝানো কঠিন কাজ। কারণ সবারই চিন্তাধারা আলাদা আলাদা।
আমগাছে মাজনুনকে উঠিয়ে দিয়ে রামিসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে! কোচড়ে সদ্য কুড়িয়ে কয়েকটা আম!
– ওই যে উপরের ডালে বড়ো একটা দেখতাছি, ওইটা নামা না! দেহস না!আন্ধা নিকি?
– উপরে উঠলে ডাল ভেঙে পড়ে যাবো! আর উপরে উঠবো না!
– যা ব্যডা ডরপুক কুন হানকার!
– তোমার তো সাহস অনেক! তো আমাকে কেন গাছে উঠালে শুনি?
– আম্মায় গোস্সা করবো দেইখাইতো চড়বার পারি না।
– ওই রামিসার বাচ্চা! ছেমড়ি কই গেলি? আয়া কাচাহলুদ বাটাডি।মাইখা গুসল করতে যা!
মায়মুনা বেগমের চিৎকার শুনে রামিসা মাজনুনকে গাছে রেখেই বাড়ির ভেতরে ভো দৌড় দিল!
– আজকাও ক্যলা হলুদ মাখন লাগবো আম্মাজান?
– তোর আব্বাজান কইছে আজকা হাঞ্জা টাইমমে তোরে দেখনেকো লাইগা লুকজন আইবো!
– আব্বাজান রোজ রোজ এইগুলা কি করে। আমি কইছি সাদিউদি এখন করুম না। আমি ভার্ছিত পড়মু। তুমি আব্বাজানরে বুঝায়া কও না ক্যালা শুনি?
– আরে ছেমড়ি এতো পইড়া কি করবি আখিরে তো রান্নাঘরই সামলান লাগবো?
– এইবারই শেষবার কইয়া দিলাম । ফির যদি সং সাজনের কথাউথা কও আমি ভাইগা যামুগা কইলাম।
খানিক পরে মাজনুন লুঙ্গির কোচড়ে পাড়া আমগুলো নিয়ে বান্দায় দাড়িয়ে ডাক দেয়
– এই রামিসা তোমার আম নিয়ে যাও!
- মাজনুন বাপজান নিকি? কি হইচে? রামিসারে ঢুড ক্যালা? উই বাথরুমে? তোমার লুঙ্গিতে কি বাজান?
- জি চাচি আম্মা! রিমি আম পেড়ে দিতে বলেছিল।
- ওই ছেমড়ি এই বারিষে তুমারে গাছে উঠাইছিল না কি বাপজান? ছেমড়ির আকল হইবো কবে আল্লা মালুম। গাছের থে পড়লে কি হইতো? এই বরতনে ঢাইলা রাখো বাজান। তুমি নিছো। কয়টা লইয়া যাও।
– আম্মাজান মাজনুনের বাচ্চা আম দিয়া গেছে নি।
– ছেমড়ি গাছের তন পইড়া ঠ্যাংউং ভাঙলে কি হইতো শুনি। তোর আকলউকল কয় যায়গা শুনি।
– দেখছোনি বড় আমটা নিছে গা। ওই মাজনুনের বাচ্চা মাজনুন তোরে পাইলে টেংরি ভাঙমু কয়াদিলাম।
রামিসা বাংলাটাউন মানে ড্যানফোর্থে বাজার করতে এসেছে। মাসে একবার আসে। সরকারে ঢুকে বেশ কিছু শাক-সবজী নিয়েছে। মারহাবা থেকে একটা ইলিশ নিয়েছে। এককেজির! তার বেশ কয়েকদিন চলে যাবে। তারপর রেডহট তুন্দুরি থেকে খোলা মুড়ি মাখা আর এককাপ চা খেয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কে বাসের জন অপেক্ষা করছে। বাসে করে লরেন্স এভেনিউ পর্যন্ত যেতে সেখান থেকে ৫৪ বাস ধরবে।
বাড়ি ফিরে দেখে সায়রা এখনো ফেরেনি। এই উইকেন্ডটা তার বাবার কাছে থাকার কথা! মতিন ফ্রাইডেতে নিয়ে গেছে। আজকে নামিয়ে দিয়ে যাবার কথা। মতিনের দ্বিতীয় বউ একজন সাদা কানাডিয়ান। ক্যাথলিনের সাথে সায়রার সাথে ভালো সম্পর্ক। বাব মেয়ের মধ্যে আসে না। বাঙালি হলে কি হতো জানা নেই।
রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দিয়ে দুইটুকরো ইলিশ পানিতে ভিজিয়ে দিল যাওয়ার আগে মুরগি মেরিনেট করে রেখে গিয়েছিল। তাকে ওভেনে ঢুকিয়ে দিল। বাকি বাজার গুছিয়ে রেখে ইলিশের টুকরো দুটো পরিষ্কার করা শুরু করলো। ফ্রোজেন ইলিশ পানিতে ভিজানতে একটু ছেড়ে ছেড়ে আসছে। ভিমের টুকরো দুটো পেটির ভেতর থেকে বের করে রাখলো আলাদা ভাজবে বলে। সায়রার বেশ পছন্দ ইলিশের ডিম। একসময় তারও অনেক পছন্দের ছিল। মনে পড়ে গেল সুত্রাপুর বাজার থেকে আব্বা আস্তো ইলিশ কিনে আনার পর মা তাকে বড়ো আঁশবটিতে ফেলে কাটতো। কখনো কখনো রিক্সায় করে সাথে সেও যেত বড়ো মাছ হলে পেটি গাতা আলাদা করে কাটা হতো। সেই ডিম খাওয়া নিয়ে পিঠোপিঠি তোফায়েলের সাথে ঝগড়া তারপর চুল ধরে বসে থাকা দুজন দুজনের। তারপর আম্মার মার!
রামিসা ইলিশ ভাজতে ভাজতে দরজায় চাবির শব্দে তাকিয়ে দেখলো সায়রা ঢুকছে। একহাতে একটা বড়োসড়ো সপিং ব্যাগ আর কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে। ইলিশ ভাজার গন্ধ বুকে টেনে নিয়ে বললো
– মা! ইউ গট ইলিশ। ইয়ামি! আই লভ ইলিশ।
– যা ফ্রেস হয়ে আয় । ভাত খাবি। মেয়েকে বললো রামিসা। সে এর মধ্যে সাওয়ার সেরে নিয়েছে।
বেক করা চিকেন ওভেন থেকে বের করে টেবিলে রাখলো সে। টেবিলে ভাত আর গরম ইলিশ সুগন্ধ ছড়াচ্ছে।
কয়দিন যাবত ভীষণ গরম পড়েছে। সারাদিন ফিল লাইক চল্লিশ বা তার আশেপাশে থাকছে টেম্পারেচার। জুলাইয়ের শুরু থেকেই বেশ গরম। জুলাইয়ে রামিসার আর স্কুলে সামার ভ্যাকেশন শুরু হয়ে গেছে। এখানে সব স্কুল এই সময়েই বন্ধ থাকে। এই সময়টা মাঝে মাঝে বিল্ডিংয়ে থাকা দেশি ভাবিরা বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়তে দিয়ে যায় তার কাছে। একজন সার্টিফায়েড টিচার হওয়ার পরও খুব বেশি একটা চার্জ সে করে না। এ কারণে ভাবিদের সাথে সম্পর্কও ভালো। অনেকেই প্লট নিয়ে শাক সবজি করে। তাকে মাঝে মধ্যে গিফটও করে। এই সময়টা সে সায়রাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যায়। এবার কী করবে এখনো ঠিক করেনি। মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে হবে কোথায় যেতে চায়। লিভিং রুমের এসিটা নষ্ট হয়ে গেছে সেটা কিনতে হবে আবার।
সকালবেলায় ডিম ভাজি দিয়ে পরোটা খেতে খেতে এই সব ভাবছিল রামিসা। সায়রা এখনো ঘুম থেকে জাগেনি। উঠলে পরে নিজের পছন্দ মতো কিছু খেয়ে নেবে। অন্য দিন সে দই কলা বা ব্লুবেরি দিয়ে ওটমিল খেয়ে স্কুলে যায়। ছুটির দিনগুলো লাক্সারির সময়। নয় তো সাতসকালে উঠে মা-মেয়ে নাস্তা লাঞ্চ রেডি এসব করতেই সময় চলে যায়। মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে নিজের স্কুলে চলে যায়। গাড়িটা এক্সিডেন্ট করার পর আর সালভেজ করা যায়নি।ইন্সুরেন্সের টাকাটা পেলে নুতন একটা গাড়ি দেখতে হবে।
– মা, তুমি কি খাচ্ছো? আমাকেও দাও। মেয়ের গলার আওয়াজে মাথা ঘুরিয়ে দেখে সায়রা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসছে।
– ডিম পরোটা খাবে না অন্য কিছু? মেয়েকে জিঞ্জেস করে সে।
– ডু ইউ স্টিল হ্যাভ বিফ গ্রেভি? ওটা দিয়ে দাও।
খাওয়া শেষ করে সে ফ্রাইপ্যান চুলোয় বসিয়ে ফ্রিজ থেকে ফ্রোজেন দুটো পরোটা বের করে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি চলছে সেপ্টেম্বরে স্কুলে নুতন বছর শুরু হবে। এককাপ কোল্ড কফি শেষ করে মেয়েকে এক গ্লাস দুধ দিয়ে বেডরুমে ঢোকে রামিসা। লিভিংরুমের এসি কেনা হয়নি তাই নিজের রুমে বসেই স্কুল থেকে দেয়া নুতন বছরের জন্য কারিকুলাম টাস্ক বসে বসে চেক করে। সে টিডিএসবির অধীনে পরিচালিত স্কারবরোর একটা স্কুলের ক্লাস থ্রির টিচার। মেয়েও বোর্ডের স্কুলেই পড়ে, তবে অন্য স্কুলে। টার্সগুলো দেখতে দেখতে ভাবে কাজগুলো গুছিয়ে রাখতে হবে। সায়রাকে নিয়ে ঠাণ্ডা কোথাও ভ্যাকেশনে যাবে বলে ভাবছে।
দেখতে দেখতে পনেরোটা বছর কেটে গেল এই দেশে। উনিশ বছর বয়সে সায়রার বাবা মতিনের সাথে বিয়ে হয়েছিল রামিসার। বিয়ের একমাস পর মতিন ফিরে আসে কানাডা। দুইবছর লেগে যায় রামিসার কাগজ হতে। মতিন তখন থাকতো মন্ট্রিয়াল। রামিসা আসার আগে টরন্টোতে মুভ করে। তখন ডাউনটাউনে থাকতো। মতিন পড়তে এসে বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে লেখাপড়া বাদ দেয়। তার ভিসা ক্যান্সেল হয়ে যায়। বন্ধুরা বুদ্ধি দেয় এসাইলাম ক্লেইম করার। পিআর হতে তার দুই বছর লেগে যায়। তারপর দেশে গিয়ে বিয়ে করে সে। কিন্তু বিয়ের সময় প্রফেশন লুকিয়ে বলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। যতোদিন এসাইলাম হয়নি সরকারের কাছ থেকে একটা এলাউন্স পেতো। সাথে অডজব করতো ক্যাসে। পিআর হওয়ার পর সেটা বন্ধ হয়ে যায়। এসাইলামে থাকা কালিন প্রথমেই হেভি ড্রাইভিংটা শিখে নেয়। পরে হেভিভেহিকল ড্রাইভিংর লাইসেন্স বের করে।
রামিসা যখন আসে সে তখন ইউহল চালায়। কিছুদিন আগেই মেট্রো হাউজিংয়ে বাসা পেয়েছে এক বেডরুমের। রামিসা আসার পর জানতে পারে সে ইঞ্জিনিয়ার নয়। একজন ড্রাইভার। সে ব্যাপারটা বাড়িতে জানায়। রক্ষণশীল পরিবার তাকে মেনে নিয়ে বলে। রামিসার কিছুই করার থাকে না। মতিন রামিসাকে বাসায় বেবিসিটিংয়ে লাগিয়ে দেয়। আশেপাশের দেশি ভাবি যারা জব করে তাদের বাচ্চা রাখার কাজ। যেহেতু লাইসেন্সড বেবিসিটার নয় তাই সবাই ঘন্টা প্রতি আড়াই ডলার তিন ডলার দেয়। রামিসা জানতে পারে লাইসেন্সড বেবিসিটাররা সাত-আট ডলার করে পায় ঘন্টায়। সে ঠিক করে লাইসেন্সেড বেবিসিটার হবে। তবে তার জন্য লেখাপড়া করতে হবে।
রামিসা ভাবীদের কাছে লিঙ্ক আর ইএসএলের কথা শুনে বাড়ির সামনের স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। সকালে স্কুলে বাচ্চাদেরসহ স্কুলে যায়। বাচ্চারাও ক্লাস করে সাথে সেও। ছুটির পর তাদের নিয়ে বাড়ি ফেরে। তারা ঘুমায় রামিসা রান্না সারে। তিনটার দিকে ভাবী কাজ থেকে ফেরার সবময় বাচ্চা নিয়ে যায়। দিন কেটে যাচ্ছে। লেখাপড়ায় সে ভালো ছিল। লিঙ্কের টিচার তাকে এডাল্ট হাইস্কুলে ভর্তি হতে বলে। মতিন দরকার নেই বলে। রামিসার ইচ্ছা ভর্তি হওয়ার। বছর কেটে গেছে। রামিসার আর লেখাপড়া করা হয় না। তার সময় কাটে বেবি সিটিং করে। এর মধ্যে টের পেয়েছে সে প্রেগনেন্ট। মতিন ইদানিং মাঝে মাঝে ড্রিঙ্ক করে বাড়ি ফেরে। রামিসাকে বোঝায়। বন্ধুদের চাপে পরে খেয়েছে। কানাডা আসার দুইবছরের মাথায় সায়রার জন্ম হয়। মেয়ের জন্মের পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও মতিন আবার ড্রিঙ্ক করা শুরু করে। হেভি গাড়ি চালানোর কারণে মতিনের এলকোহলের নেশা ডেভলপ করেছে রামিসা বুঝতে পারে। সে তাই মতিনকে বলে ইউহলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে ক্যাব চালায় না কেন। কিন্তু মতিন রাজি হয় না। নুতন কোম্পানিতে জব নেয়। মালিক একজন হিস্প্যানিক। আগে টরন্টোর ভিতরে গাড়ি চালালেও এবার শহরের বাইরে যাওয়া শুরু করে। কারণ কোম্পানির গাড়ি প্রভিন্সের সব জায়গা চলাচল করে। প্রায়ই রাতে ফেরা হয় না। কারণ একএকটা ট্রিপে সাত আট ঘন্টা লেগে যায়। কখনো কখনো আরো বেশি সময় লাগে। অন্টারিও অনেক বড়ো বলে। মতিনের ড্রিঙ্কিং হ্যাভিট আরো বাড়ে। রামিসার সাথে এই নিয়ে ঝগড়া হয় প্রায়ই। সায়রার বয়স যখন একবছর সে এডাল্ট হাই স্কুলে ভর্তি হয় জোর করে। কারণ সে বুঝতে পারছিল সায়রার জন্যেও তার এটা করা দরকার।
সায়রাকে নিয়েই সে ক্লাস করতে যায়। ফিরে রান্না বাড়া করে। আর বিকালে বেবি সিটিং করে। তার বন্ধুদের কাছে খবর পায় মতিনের বসের সাথে মতিনের ঘনিষ্ঠতার। রামিসা জিজ্ঞেস করলে সে অস্বীকার করে। দুজনের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে থাকে।
রামিসা হাইস্কুল শেষ করে রায়ারসানে আর্লি চাইন্ডহুড এডুকেশনে ভর্তি হয়। এটা নিয়ে দুজনের মধ্যে তুমুল কথা-কাটাকাটি ঝগড়া ঝাটি এবং এক পর্যায়ে সে রামিসার গায়ে হাত তোলে। রামিসাও সাপের জন্য এপ্লাই করে। হাইস্কুল রেজাল্ট ভালো হওয়ায় পেয়ে যায়।
সায়রার বয়স যখন চার বছর তখন তাদের সেপারেশন হয়ে যায়। তার আগে মতিন বেশ কয়েকবার তার গায়ে হাত তোলে। পড়শীরা পুলিশকে কল করে। সেপারেশন চলাকালীন সে বসের সাথে লিভ টুগেদার করতে শুরু করে। তার লাইফ স্টাইলের সাথে সেটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। দুইবছর পর ডিভোর্স হয়ে যায়। সায়রার তখনও পড়াশোনা শেষ হতে একবছর বাকি। মতিন বসকেই বিয়ে করেছে। ডিভোর্সের পর তার পাশে দাড়ায় সরকারের ওয়েলফেয়ার বিভাগ। এছাড়া মতিনের দেয়া চাইন্ড সাপোর্ট। রামিসা পড়াশোনা শেষ করে ক্লাস ওয়ানের টিচার্স এসিস্টেন্ট হিসাবে স্কুলে জয়েন করে। পূর্ণ টিচার হিসাবে প্রমোশন হয়। তারপর থেকে তার জীবন এভাবেই চলছে।
রামিসার বিয়ের পর তার আব্বা তাদের পুরানো বাসাটা ডেভলপারদের দিয়ে দেয়। তারা চারটা ফ্ল্যাট আর কয়েক লক্ষ টাকা ওদেরকে দেয়। অল্প বয়সে মেয়েকে পড়ালেখা না করিয়ে বিয়ে দেবার ভুল সিদ্ধান্ত তাকে অসুস্থ করে দিয়েছিল। মেয়ের কষ্টকর জীবনের ধাক্কা নিতে না পেরে বছর চারেক আগে তিনি মারা গেছেন। রামিসার ডিভোর্সের পর দুইবছর আগে প্রথম বার সে দেশে গেলে তার মা একটা ফ্ল্যাট বিক্রি করে টাকাটা রামিসার নামে জমা করে দেন। সেই টাকা কানাডায় এনে সেটা ডাউনপেমেন্ট হিসাবে দিয়ে এই এপার্টমেন্টটা সে কিনেছে। ছোট হলেও মা-মেয়ের জন্যে যথেষ্ট।
রামিসা ইন্সুরেন্সে টাকা পাওয়ার পর নুতন গাড়ি কিনবে বলে আজকে সায়রাকে নিয়ে টয়োটার স্কারবরো সাইটে এসেছে। সায়রার লাল গাড়ি পছন্দ। রামিসা একটা মিনিভ্যান পছন্দ করেছে লাল রঙের। ক্যাম্পিংয়ে যেতে সুবিধা হবে বলে। স্টোরেজ বড়ো আছে। অগাস্টে কোন পার্কে মা-মেয়ে ক্যাম্পিংয়ে যাবার কথা ভাবছে। অন্টারিওর নর্থে কোথাও যাবে। ওদিকটা মোটামুটি ঠান্ডা থাকবে। ব্রান্ড নিউ কার বলে দামটা খানিকটা বেশি পড়ছে। কাগজপত্র রেডি হলে জানাবে ডিলার। পুরোনো কিনলে দাম কিছুটা কম হতো। তবে ইন্সুরেন্স অনেক বেশি আসতো। সে জন্য নুতনই কেনার ডিসিশন নিয়েছে। এক সপ্তাহ পর গাড়ি ডেলিভারী নেয়ার সময় সায়রা বায়না ধরলো নায়াগ্রা ফলস যাওয়ার। রামিসাও ভাবলো নয় কেন! একটা টেস্ট ড্রাইভও হয়ে যাবে। দুজনেরই স্কুল বন্ধ যাওয়াই যায়।
একটা পেট্রোলপাম্প থেকে তেল ভরে নিয়ে মা-বেটি রওয়ানা দিল নায়াগ্রা ফলস। পৌঁছাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগবে। কিংস্টন ধরে কিউইউইতে উঠে চলে যাওয়া যাবে। ফলস সংলগ্ন কোন হোটেলে উঠবে। একটা দিন থেকে ঘুরে বেড়াবে মা বেটি। নায়াগ্রা ফলস পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল তাদের। পথে একজায়গায় থেমে লাঞ্চ সেরে নিয়েছিল তারা। আগে ফলস ভিউ হোটেলে একটা ডবলবেড রুম নিলো তারা। এমনিতেই অনেক ভিড় হয় এইসময়। আজকেও ছিল তারপরও পেয়ে গেলো ভাগ্যক্রমে। মা-মেয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে ফলস দেখতে রওয়ানা দিল। আটটা পর্যন্ত কাটিয়ে একটা দোকানে ঢুকে মা-মেয়ে একজোড়া রাতের পোশাক কিনে ডিনার সেরে হোটেলে ফিরলো। পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে বাটারফ্লাই কনজারভেটরি দেখে বোট রাইডে গেল তারা। টিকিট কেটে জার্নি বিহাইন্ড দা ফলস দেখে এলো। সন্ধ্যায় ফিরতি যাত্রা করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। পথে অবশ্য ডিনারের জন্য থেমেছিল।
চমৎকার দিন কাটিয়ে সায়রার মন মেজাজ বেশ ফুরফুরে। নায়াগ্রা থেকে ফিরে বাপকে ফোন দিয়ে একঘণ্টা ধরে কী কী করেছে তার ফিরিস্তি দিলো। মতিনের মেয়ের সাথে সম্পর্ক ভালো। স্টেপ মাদারের সাথেও। যদিও ডিভোর্সের পর ভালো ছিল না ততো। আস্তে আস্তে নর্মাল হয়েছে। রামিসা বাপ-মেয়ের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
দেশে মাকে ফোন দিয়ে কথা বলছিল রামিসা। ফ্লাটের ভাড়া দিয়ে চলে যায় ওর। ভাইটা পড়ালেখা শেষ করেছে। সায়রা বন্ধুদের সাথে হলে সিনেমা দেখতে গেছে। সন্ধ্যায় দশতলার বাসিন্দা নাইমা ভাবির ছেলে তাহসিফকে পড়াতে বসেছিল রামিসা। নাইমা ভাবিরাও তার মতোই নিজেদের কেনা এপার্টমেন্টে থাকেন। ওদের আরো এপার্টমেন্ট আছে বিল্ডিংয়ে, ভাড়া দিয়েছেন। শুনেছে ভাই বিজনেস করে। কিসের বিজনেস জানে না। কানাঘুষা শুনেছে ম্যানপাওয়ারের। এখানে এবং দেশে দুইজায়গাতেই অফিস খুলেছেন। দেশে তার ভাই ব্যবসা দেখে। তিনি এখান থেকে ইনভাইটেশন লেটার পাঠান ভিজিট ভিসার। ভাই সেগুলো বিক্রি করে লোক পাঠায় এখানে। এছাড়াও তিনি রিফিউজি ক্লেইম লইয়ার হিসাবে কাজ করেন। তাফসির যাওয়ার পর সে দরজা বন্ধ।
বিকেলে বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল সায়রা। মুভি দেখে ফিরে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে। তার আগে মায়ের কান ঝালাপালা করে দিয়েছে এই বলে, মাম তোমার দেখা উচিৎ। লেট’স গো – একদিন দুজনে মিলে। রামিসা মেয়েকে কথা দেয় দুজনে একসঙ্গে মুভি দেখতে যাবে।
গরম একটু কমায় লিভিং রুমের এসি আর কেনা হয়নি। ভাবছে ডিহিউমিডিফায়ার কিনবে কি না। কিচেনে একজস্ট ফ্যান লাগানো আছে। কিচেনের কথায় মনে পড়লো বারান্দায় গাছগুলোতে আজ পানি দেয়া হয়নি। খুব বেশি গাছ নেই। লাউয়ের, সীমের একটা করে গাছ আর একটা বিফস্টেক টমেটো। আর একটা ফ্লোরিবান্দা গোলাপের গাছ। সকালে দেখেছিল ফুল ফুটেছে একটা। একদম গোলাপপানির মতো সুগন্ধি। এবারই কিনেছে। উইনটারে ভিতরে এনে রাখতে হবে। জানালার পাশ থেকে ওঠার সময় বেলী ফুলের সুগন্ধ নাকে ঝাপটা দিল। অনেক ফুল ফুটেছে।
সকালবেলা রামিসা মাত্র ব্রেকফাস্ট শেষ করেছে ডিম পরোটা দিয়ে। সায়রাও ডিম পরোটা পছন্দ করে। উঠলে ভেজে দেবে। সামার ভ্যাকেশনটা লাকজারির সময়। মা মেয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে।। এদিক সেদিন ঘুরে বেড়ায়। দুধচায়ে চুমুক দিয়ে ভাবলো অনেকদিন দেশী গ্রোসারীতে যাওয়া হয় না। যাবে কি না ভাবছে। গাড়িটা পেয়েছে যখন ড্যাথফোর্থেই চলে যাবে একদিন। এছাড়া নর্থের দিকে একটা সপ্তাহ কাটিয়ে আসার প্লান আছে। হাডসনবে-তে যাবে কি না ভাবলো। বহুদিন সমুদ্র দেখেনি সে। একবার সমুদ্রতীর যেয়ে বসার ইচ্ছে আছে। লেকের পারে বহুবার বসেছে। এবার সমুদ্র পাড়ে বসার পালা।
পনেরোটা বছর কানাডায় কেটে গেল। আটটা বছর কেটেছে ঝড় আর ঝঞ্জার মধ্যে। একা না হয়েও একাই। সায়রা বড়ো হয়ে স্টাডি শেষ করলে। একাই হয়ে যাবে সত্যিকার অর্থেই। মেয়ের নিজের জীবন হবে নিজের মতো থাকবে। সেখানে সে মাথা গলাবে না। যাকে মন চাইবে তাকেই বিয়ে করবে। না করলেও কিছু আসে যায় না।
বারান্দায় বের হয়ে গাছগুলোতে পানি দিলো। লাউগাছটা বেশ বড়ো হয়েছে। বাঙালিপাড়া ড্যানফোর্থের দেশি গ্রোসারি থেকে কিনেছিল। সীমগাছে সীম এসেছে। গাছটায় সাদা ফুল ধরে দেখে অবাক হয়েছিল। সারাজীবন বেগুনি ফুল হতে দেখেছে। ফুল আসার পর টাইনি মৌমাছিগুলো অনেক জ্বালিয়েছে। এফিড এনে ছেড়ে দিত। আর তাই গাছটা মরেই গিয়েছিল প্রায়। ডবল ডেলাইট গোলাপটাকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিল সে। হাতে গোলাপপানির সুবাস জড়িয়ে গেল।
মতিন রামিসার সাথে যতই অন্যায় করুক সায়রার জন্যে তার দায়িত্বে অবহেলা করেনি। ডিভোর্সের পর সায়রার জন্য খোলা ব্যাঙ্ক একাউন্টে রেগুলার চাইল্ড সাপোর্ট জমা হচ্ছে ফ্যামিলি রেসপন্সিবলিটি অফিসের থ্রুতে সায়রা আর রামিসার জয়েন্ট একাউন্টে। যদিও রামিসা প্রথম দিকে টাকাটা খরচ করলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর সেখানে আর হাত দেয়নি। ইচ্ছে সায়রা যখন ভার্সিতে যাবে যেন ওসাপ ছাড়াই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে।
রামিসা বেড়রুমে বসে ল্যাপটপে ট্রাভল গাইডের পেজগুলো চেক করছিল। সায়রা ঢুকে বলল
– মাম আই থিঙ্ক আই নিড স্যানিটারি ন্যাপকিন!
– হোয়েন ডিড হ্যাপেন দিস? আর ইউ সিওর? রামিসা কিছুটা থতমত খেয়ে বললো।
– অফকোর্স আই অ্যাম। উই লার্ন এবাউট দিস ইন স্কুল। সায়রা জবাব দিল।
– ঠিক আছে। আপাতত আমারটা ব্যবহার করো। আগামীকাল তোমাকে নিয়ে মার্কেটে যাব! সে মেয়েকে বললো।
ল্যাপটপ বন্ধ করে মেয়েকে স্যানিটারী ন্যাপকিন বের করে দিতে দিতে রামিসা ভাবলো, ভাগ্যিস স্কুল বন্ধের মধ্যে ব্যপারটা ঘটলো। ক্লাস চলাকালীন হলে তো মেয়েটা ঝামেলায় পড়ে যেতো। অবশ্য ব্যপারটা এতো তাড়াতাড়ি ঘটবে ভাবেনি। তাই প্রি-কশনও নেয়নি। মনে পড়লো নিজের সময়ও আর্লীই ঘটেছিল ব্যপারটা। মেয়ের হাতে পাকেটটা দিতে দিতে কপালে চুমু দিল সে আর বললো – নাউ ইউ আর এ ওম্যান মা! ভাবলো আম্মাজানকে ফোন করে বলতে হবে যেন একটা মিলাদের ব্যবস্থা করে। সেদিন পেট কেটে যাকে জন্ম দিল আজ সে পরিপূর্ণ নারী হওয়ার পথে। কথা মনে হতেই চোখ বেয়ে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো রামিসার।
সকালে বেকফাস্টের পর মেয়েকে নিয়ে টাউনসেন্টারে গেল সে। ওয়ালমার্ট থেকে স্পেসাল প্যান্টি কিনলো একডজন। আর কয়েক প্যাকেট ন্যাপকিন। ঠিক করলো আশেপাশে গোল্ডের দোকান আছে কি না চেক করবে। মেয়েকে কিছু একটা কিনে দিতে হবে এই উপলক্ষ্যে। মনে পড়লো খবরটা মতিনকেও জানানো দরকার। হাজার হলেও তার মেয়ে নারী হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের দুই তারিখে স্কুল খুলেছে রামিসার অফিসিয়ালি। কিন্তু অফিস খুলেছে আরো এক সপ্তাহ আগে। দুই মাস বন্ধের পর কলিগদের সাথে দেখা হতেই ইসাবেলা, জাসপ্রীত, কাউর, লুসি, চাং, আমিরা আলি সবার সাথে হাগ আর হাই হ্যালোর বন্যা বয়ে গেল। জাসপ্রীতের সাথে যোগাযোগ থাকলেও ইসাবেলা জামাইকায় বাবা-মার সাথে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলবারতো টমাস ওরাও সবাই চলে এলো। রামিসা পুরো ছুটি ঘরে বসে কাটিয়েছে শুনে আলবারতো চোখ পাকিয়ে তাকালো তার দিকে। রামিসা হেসে দিল। রামিসার পুরোনো স্মৃতি ভেসে গেল মনের মনিকোঠায়। সে মাত্র পাস করে একটা ডে কেয়ারে যোগ দিয়েছে। আলবারতোর মেয়ে সেখানে আসতো! একদিন সে মেয়ের ক্লাসে বাচ্চাদের টেককেয়ার করতে দেখে তাকে। সে রামিসার সাথে কথা বলে মাঝে মাঝে। এভাবেই আলাপ দুজনার। একদিন জিজ্ঞেস করে, রামিসা কি কোনো জুনিয়র কিনডারগারটেন স্কুলে জব করবে?
রামিসা তখন সেরবোর্নে সরকারের দেয়া বাসায় থাকে। সেখানেই একটা ডে-কেয়ারে চাকরি করে। আলবারতোর চেষ্টায় একটা জুনিয়র কিনডারগারটেন স্কুলে রামিসার চাকরি হয়ে যায়। সেখান থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে আজ সে এখানে। আলবারতো আর তার পরিবার সেদিনের মতো এখনও তার পাশেই আছে। রামিসা যখন ডানফোর্থে মুভ করে একই সময়ে সেও স্কারবরোতে বাড়ি কিনে পরিবারসহ মুভ করে।
রামিসার আর মুজনি যাওয়া হয়নি নানা ঝামেলায়। অক্টোবর মাস চলছে। সেপ্টেম্বরে রঙ ধরতে থাকা গাছগুলো এখন পুরো রঙিন। রামিসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে ফলে বদলে যাওয়া গাছপালাদের দেখে। রামিসা যখন মেসিতে থাকতো। মাঝে মাঝে বাংলাপাড়ার অনুষ্ঠানগুলোয় যেত। এখানে আসার পর কম যাওয়া হয়। তবে সেপ্টেম্বর মাসে এক বন্ধু তার কবিতার উৎসবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এতো মানুষের কণ্ঠে বাংলা কবিতা শুনতে ভালোই লাগছিল।
বন্ধু যখন স্টেজে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করছিল তার মনে পড়ে যাচ্ছিল কলেজের দিনগুলোর কথা। ফজলুল হক মহিলা কলেজে পড়তো। রিকশা করে লোহারপুল ব্রিজ পার হয়ে কলেজে যেতে হতো। বিজয়দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। বন্ধুরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতো। তার খুব ইচ্ছে করতো তাদের সাথে গাওয়ার।
বিশ তারিখে এখানে দেওয়ালি ছিল। মানে কালিপুজো। সেই উপলক্ষ্যে জাসপ্রীত স্কুলে তাদের লাঞ্চ করিয়ে ছিল। কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন। সাথে মিস্টি। ডিসেম্বর মাসে সায়রার জন্মদিন। বাসায় তার বন্ধুদের ইনভাইট করবে মাকে আগেই জানিয়ে রেখেছে সে। মেয়ের সাথে আলাপ করতে হবে এই ব্যপারে।
একএক সময় অবাক হয়ে সে ভাবে নিয়তি তাকে কোথা থেকে কোথায় এনে ফেলেছে। তার যদি মতিনের সাথে বিয়ে না হতো তাহলে নিশ্চয়ই কোন ভার্সিটিতে ভর্তি হতো।
বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার।
নার্গিস দোজা টরন্টোর লেখক। তিনি চব্বিশ বছর ধরে কানাডায় অভিবাসী। ইতোমধ্যে তাঁর দুটি উপন্যাস ও একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তাঁর লেখা বহু সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে।