বিশ্ব চিঠি দিবস নিয়ে

সুমাইয়া মোয়াজ্জেম

গত পহেলা সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব চিঠি দিবস!

এই সেদিনের কথা ! আব্বা, আম্মা, আর বড়ো বোনের কাছ ঘেকে চিঠি পেতাম ! বড়ো বোন যখন আমেরিকা গেলো, সেইসময় এতো ইন্টারনেট বা ইউটিউবের চল ছিল না। আমেরিকা কেমন, সেখানকার মানুষজন কেমন, কফি শপগুলো কেমন , সেখানের আকাশের রং কেমন আর পানি র রং কেমন সেগুলো বোনের বিস্তারিত চিঠিতেই প্রথম দেখতে পাই!

আম্মার চিঠি আসতো মেডিকেলে হোস্টেলে থাকা অবস্থায়! ছোট বোনের পড়ালেখা আর সাজসজ্জার যেই ধুম চলছে , সেটাই অনেক বড়ো করে লিখে জানাতো আম্মা। আর তার সাথে থাকতো অনেক উপদেশ বাণী !

কানাডাতে পারি জমানোর পর শুরু হলো আসল চিঠি লেখালেখি। টরন্টো শহরের ছোট্ট এপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ আমার জন্য নির্ধারিত মেলবক্সের ফুটো দিয়ে যখন ওভারসিস চিঠির খামটা চোখে পড়তো , তখন থেকেই প্রচন্ড খুশি আর আবেগে দু চোখ দিয়ে শুধু অশ্রু ঝরতে থাকতো! সেই চিঠি পেয়ে আমার কী আনন্দ! রান্নাঘরে স্টোভের পাশে চিঠির খামটা রেখে দিতাম। রান্না করতাম আর একটু পর পর তাকিয়ে দেখতাম ! যতক্ষণ না খুলে থাকা যায়। খুললেই তো আনন্দ শেষ ! সকল কাজ-কর্ম শেষ করে চিঠি নিয়ে বসতাম! অতি সযতনে, খুব সাবধানে চিঠির খামটা খুলতাম! ছেঁড়া অংশটাও খামের ভিতর রেখে দিতাম!

খামের ভিতরে দুইটা চিঠি থাকতো – একটা আব্বার , একটা আম্মার। আগে আব্বারটা পড়তাম ! আব্বার চিঠিটা ছোট থাকতো! অনেক স্নেহ আর দুআ ভরা থাকতো সেই চিঠি! এরপর আম্মা র চিঠি! ৩/৪ পৃষ্ঠা! পড়তেই থাকতাম। … পড়তেই থাকতাম।… একই শব্দ বার বার পড়তাম! যত বেশি সময় ধরে পড়া যায়, যেন তাড়াতাড়ি শেষ না হয়ে যায়।

আব্বা-আম্মার সাথে সুমাইয়া মোয়াজ্জেম, তাঁর বোন এবং ছেলে

সেই চিঠিগুলোতে হাসি, কান্না, সুখের খবর , দুঃখের খবর – কত কিনা থাকতো! আম্মার চিঠিগুলো ৩/৪ পৃষ্ঠার হতো। কত রকমের গল্প সেইসব চিঠি তে থাকতো! আমাদের ধানমন্ডি তিন নম্বরের বাসাটার খবর (যেখানে আমাদের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে), আত্মীয় স্বজনের খবর … আরও কত কি! সব কিছু স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পেতাম! পড়তে পড়তে চিঠিগুলো চোখের পানি তে ভিজে যেতো!

আর চিঠির শেষ পর্বে থাকতো অনেক প্রশ্ন। . . . আমার শরীর কেমন আছে, কীভাবে সব কিছু ম্যানেজ করি একা একা, বাস ট্রেনে যেন খুব সাবধানে চড়। কত আদর আম্মার ! তারপরে লেখা থাকতো এখন আর তাঁদের আগের মতো বাইরে থেকে বিকেলের নাস্তা এনে আড্ডা হয় না। এখন আর আগের মতো সবাই মিলে উত্তম-সুচিত্রা র সিনেমা দেখা হয় না। তখন আর কান্না ধরে রাখা সম্ভব হতো না !

এখনও হঠাৎ কোনোদিন আমি চিঠি গুলো বের করে পড়ি। অনেক জায়গায় লেখাগুলো ঝাপসা হয়ে আছে! সেটার কারণ আমি জানি! একটি চিঠি অনেক আনন্দের কারণ। আবার অনেক সময় অনেক কষ্টের উৎস! এখন ইমেইল, হোয়াটস্যাপ মেসেজ আর মেসেঞ্জার এর যুগে কোথায় হারিয়ে গেলো সেই চিঠির দিনগুলো! হারানো দিনগুলোর এক দুর্দান্ত স্মৃতি হলো প্রিয় মানুষদের চিঠিগুলো ! যার কাছে এই স্মৃতিটুকু আছে, তিনি ভাগ্যবান !

একদিন আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মনোযোগ দিয়ে তিনি কি লিখছেন! জিজ্ঞেস করেছিলাম কী লেখা চলছে? কিছু বলেননি! কিছু লেখালেখি নিজের জন্যই না হয় থাকুক।