সুদূরপারের জীবন পুরাণ


শাহানা আকতার মহুয়া

সেই যে দুই বিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেকক্টাস প্রজাতি আফ্রিকা থেকে প্রথম যাত্রা শুরু করে সেই যাত্রা আজও থামেনি। হোমো ইরেক্টাসের পরে হোমো হাইডেলবার্গেন্সিস প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর আগে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, ডেনিসোভানস এবং নিয়ান্ডারথালদের পূর্বপুরুষও এই সময়েই আফ্রিকা থেকে অন্যত্র গিয়েছিল। তো, এই যে জীবনের প্রয়োজনে একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রাচীন কালের মানুষের আসা-যাওয়া ও বাসস্থাপন, যাকে আমরা এখন মাইগ্রেশন বা অভিবাসন বলছি; বর্তমানকালেও এসেও তা স্তিমিত হয়নি। এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রতিনিয়ত অভিবাসন করছে মানুষ।

নিয়ান্ডারথালের উত্তরসূরি হিসেবে আমারও একসময় ইচ্ছে জেগেছিল বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসার। নিজের সবকিছু ছেড়ে মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে কেন অভিবাসন নেয়? মোটা দাগে কয়েকটি কারণকে সাধারণত চিহ্নিত করা হয়, যেমন- উন্নত জীবন যাপন, অর্থ উপার্জন, কিন্তু এসব আমাদের চিন্তাতেও ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল ছেলেটাকে নিরাপদ এবং সুন্দর একটা জীবনে আনতে পারার, আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল যে কানাডায় এসে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাবো সহজেই। বাংলা সাহিত্যে সৌম্যদর্শন এক ভদ্রলোক আছে না, শিশুকাল থেকে যিনি কবিতা-গল্প-গান-স্বপ্ন-আনন্দ-বেদনা-প্রেম-অভিমান থেকে শুরু করে সবকিছুতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন, তিনিই আমার সর্বনাশ করেছেন যখন তিনি বলেছেন- “চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে,” “সুদূর বিপুল সুদূর তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি।” সেই সুদূরের বাঁশি নিরন্তর বাজতে থাকে আমার প্রাণে আর আমি উতলা হয়ে ওঠি পৃথিবীর প্রতিটি কোণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার জন্য। মনে মনে ইচ্ছে বুনি- “দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া।”

২০০৮ সালের ২৮ মার্চের এক বিকেলে ভ্যাঙ্কুভারে পৌঁছে, প্লেন থেকে যখন নামছি, চোখের সামনে শুরু হলো এক অপূর্ব দৃশ্যায়ন! হঠাৎ করে তুষারপাত শুরু হলো! গুঁড়ি গুঁড়ি নরম তুষার, ধবধবে সাদা ফুলের পাপড়ির মতো ঝরে পড়ছে আমাদের ওপর। যেন তুষারের পাপড়ি ছিটিয়ে প্রকৃতি আমাদেরকে স্বাগত জানালো কানাডায়। স্বপ্নের মতো সেই দৃশ্যটা এখনো স্পষ্ট দেখতে পাই। ছেলে প্রমিত আর আমার খুবই পছন্দের ছিল তুষারপাত। আহা, তুষারের এই সৌন্দর্য দেখার জন্য আমরা সিমলা, গ্যাংটকে পর্যন্ত গিয়েছি!

অভিবাসী জীবন কেমন? আমাদের জন্য পাকাপাকিভাবে দেশের বাইরে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ছিল খুবই কঠিন। বাংলাদেশে মাটি, মানুষের সাথে ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিলাম আমরা। পরিবার ছেড়ে দূরে যাবো না বলে অনেক ভালো সুযোগ ছেড়ে নাটোরেই থেকে গিয়েছিলাম। অথচ, সেখান থেকেই একদিন সরাসরি চলে এলাম কানাডায়। ভাবা যায়!

যারা অনেক টাকা পয়সা নিয়ে এসেছেন, কিংবা অন্য দেশে থেকে অভ্যস্ততা নিয়ে এসেছেন- তাদের কথা ভিন্ন; কিন্তু আমি এবং নতুন দু’জনেই ছিলাম শিক্ষকতা পেশায়, তার উপরে ঘোরাঘুরির প্রবল বাতিক, তারও ওপরে আবার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর অভ্যাসটাও মজ্জাগত। কানাডায় আমাদের শুরুটা তাই একেবারেই মাটি থেকে। আসার পর থেকেই নতুন খুব মনমরা হয়ে গেল এবং দেশে ফিরে যাবে বলে সাব্যস্ত করে ফেলল। বুঝিয়ে বললাম- দেখ, ফিরে আমরা অবশ্যই যাবো কিন্তু কয়েকটা মাস যাক। যদি ভালো না লাগে, চলে যাবো- কোনো সমস্যা নেই। এসেই যখন পড়েছি, কিছুদিন না হয় থেকেই যাই।

আমি এবং নতুন দু’জনেই খুব পজেটিভ মানুষ। জানি, সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ভালো এবং খারাপ আছে সব কিছুতেই, সবখানেই। থাকবে। কিন্তু আমরা দু’জনেই ভালো’র সাথে, আলোর সাথে, শুদ্ধতার সাথে চলতে চেয়েছি সবসময়। খারাপটা নয়, সবকিছুর ভালো দিকটা দেখার চেষ্টা করেছি। নিজেদের ইচ্ছায় এসেছি এদেশে। ভাষা, সংস্কৃতি, আবহাওয়া সবই ভিন্ন; তাই বলে পিছিয়ে যাবো! তা কি হয়?

সপ্তাহ দু’য়েক পরে আমরা দু’জনেই ট্রানজিশনাল জবে ঢুকে যাই। পে-চেকের সাথে সাথে অভিজ্ঞতা, কম্যুনিকেশন, তথ্য প্রাপ্তি অবশ্যই অনেক সমৃদ্ধ করেছে। এলিমেন্টারি স্কুলে ছেলেটার ক্লাস শুরু হয়ে গেল, জবের পাশাপাশি আমরা ভলান্টারি করতাম। কানাডায় ভলান্টারিকে খুব মূল্য দেওয়া হয় আর দেশেও আমরা নানারকম ভলান্টারি কাজের সাথে যুক্ত ছিলাম বিধায় এই ধরনের কাজ আমাদের কাছেও খুব নতুন বা কষ্টের কিছু ছিল না। ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’র স্বভাবে আমরাও মাসখানেকের মধ্যে জড়িয়ে যাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে, নতুন ইমিগ্রান্টদের জন্য যা সবসময় সহজ নয়।

২.
অভিবাসন পরবর্তী পর্যায়কে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয় : মধুচন্দ্রিমা পর্ব (honeymoon phase), উত্তেজনা ও হতাশা পর্ব (Aggravation & frustration), ধীরে ধীরে সমন্বয় (Gradual adjustment), অভিযোজন ও গ্রহণ (Adaptation & acceptance) এবং পুনরায় কালচারাল শকের ধাক্কা (Re-entry or reverse culture shock)। একজন অভিবাসী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই অনুভব করেছি; মোটামুটি সবাইকেই কমবেশি এ পর্বগুলোর ভিতর দিয়ে যেতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে পর্বগুলো অবশ্য আগে পরেও হতে পারে।

আমরা দু’জন, কেউই বিশেষ ক্যারিয়ারমুখী নই। শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবছিলাম। নতুন একটা কোর্সও করে ফেললাম। ইউনিভার্সিটির সাথে যোগাযোগ করলাম বটে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো পড়াশোনায় যেতে ইচ্ছে করলো না। এখানে পরিচিত অনেকেই তখন রেসিডেন্ট কেয়ার অ্যাটেনড্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। জব মার্কেট ভালো, স্যালারি ভালো, বেনিফিট ভালো কিন্তু কাজের ধরন দেখে দমে গেলাম। কারণ আমি ততদিনে মোটামুটি রিসার্চ করে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে ‘ক্যারিয়ার প্ল্যানিং’ বিষয়টি বুঝে গেছি। এখানে মানুষ গড়ে ছয়বার ক্যারিয়ার পরিবর্তন করলেও আমি শুরুতেই ধাক্কা খেতে চাইলাম না। পূর্বের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, এখানে এসে ভলান্টারি করার পাশাপাশি Early childhood care and education (ECCE) ডিপ্লোমাটি করে ফেললাম। প্র্যাকটিকাল করতে করতে জবও হয়ে গেল। তবে কাউন্সেলিং পেশাটা আমাকে ভীষণ টানতো। ভলান্টারি করতাম যে অর্গানাইজেশনে, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিলাম। কিন্তু ওই যে- দীর্ঘ কোনো পড়াশোনায় যেতে মন চাইল না, তাই Career Development Practitioner প্রোগ্রামটি করে ফেললাম। আমিই নাকি প্রথম বাংলাদেশি এখানে- যে প্রথম এই প্রোগ্রামটি নিয়েছে! শিক্ষকদের কাছে থেকে যে অভূতপূর্ব সহযোগিতা পেয়েছি, তা বর্ণনাতীত। একঘেয়ে শিক্ষাও যে প্রাণবন্ত, আনন্দময় এবং আকর্ষণীয় হতে পারে, তা ক্লাসরুমে না গেলে বোঝা যায় না। ক্লাসে প্রথম দিন নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছিলাম যে আমি লেখালিখি করি, একখানা কবিতাও শুনিয়েছিলাম একদিন। লেখালিখি করার কারণেই সবাই আমাকে একটু আলাদাভাবে দেখতো। বন্ধুর মতো সেইসব শিক্ষকদের অনেকের সাথেই এখনও যোগাযোগ আছে।

৩.
চ্যালেঞ্জ আমার ভালো লাগে। ভালো লাগে নতুন কিছু জানতে, নতুন মানুষ এবং পরিবেশে মিশতে। তাই কর্মক্ষেত্রসহ সবখানেই আমার গ্রহণযোগ্যতা। তবে এত ব্যস্ততার মধ্যেও স্বদেশ এবং স্বজনদের ছেড়ে আসার কষ্ট সবসময় পোড়াতো। মনের মধ্যে সারাক্ষণ হু হু করত। প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে লেখালিখিতে সময় দিতে পারতাম না বলে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলতাম। ব্যাকুল হয়ে কাঁদতাম। তাতেও যন্ত্রণা! মন খুলে হাপুস নয়নে কাঁদার মতো সময়ও ছিল না। তড়িঘড়ি চোখ মুছে নিজেই নিজেকে বলতাম- আচ্ছা, এখন থাকুক। কাজে বের হতে হবে এখন, পরে এসে কাঁদবো। বড্ড ক্লান্ত থাকতাম। অনেক সময় গুম হয়ে থাকতাম, কখনো কখনো আবার নতুন আর প্রমিতের ওপর রাগ ঝাড়তাম। মানুষ হিসেবে আমি বড়ো বেশি সংবেদনশীল এবং স্বপ্নবাজ। এখন বুঝি যে, হাত-পা বাঁধা ছিল, কোনো উপায় ছিল না, ভিতরে ভীষণ কষ্ট ছিল এবং সেই কষ্ট প্রকাশ করতে পারতাম না এবং অন্যদের বুঝতে দিতে চাইতাম না বলে ভিতরে ভিতরে ভীষণ ডিপ্রেশন জাপ্টে ধরেছিল। মন খারাপের সময়গুলোতে পড়ন্ত বিকেলে কখনো কখনো আমার চোখের জলও মিশে গেছে প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশিতে।
চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কানাডায় স্বজনপ্রীতি- অন্তত আমি দেখিনি। যতটুকু অর্জন, তা একান্তই নিজের। সেটেলমেন্ট/এমপ্লয়মেন্ট কাউন্সেলর কিংবা কেইস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হয়েছি। প্রকৃতি আর মানুষের পাশাপাশি কানাডার অন্যতম সৌন্দর্য হচ্ছে মাল্টিকালচারালিজম। পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠীর সম্মিলন ঘটেছে এখানে। এতদিন ধরে আছি, মাল্টিকালচারাল প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি, কোথাও বর্ণবাদের সন্ধান পাইনি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। তবে হ্যাঁ, ভারতীয়, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান এবং ফিজিয়ান আর বাংলাদেশিদের চেহারা মোটামুটি একই রকম বলে অনেকে আমাদেরকে এদের সাথে গুলিয়ে ফেলে। আমি সাথে সাথে সবিনয়ে তাদের জানাই যে, আমি বাংলাদেশি। আগে যখন মিডিয়ার বদৌলতে বাংলাদেশের নাম এতটা শোনা যায়নি, তখন অনেকে বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইত- বাংলাদেশ কোথায়? অনেকে বলে- বাংলাদেশ তো ইন্ডিয়ায়! আমি তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরে বলি যে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। সময় থাকলে ম্যাপে এক বিন্দু গর্বের মতো বাংলাদেশ বিন্দুটাও দেখিয়ে দিই।

৪.
আমি একটু অন্যভাবে ভাবার চেষ্টা করি। অভিবাসী জীবনে কষ্ট আছে, হতাশা আছে, বেদনা আছে, তবে তা কি শুধু অন্য বলেই? নিজের দেশে নেই? আছে তো। নিজের দেশেও এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বাস করতে গেলে থিতু হতে, মন বসাতে সময় লাগে, পরিশ্রম করতে হয়। নতুন অভিবাসী আমার ক্লায়েটদেরও এভাবেই বোঝাই। ভিন দেশের মাটিতে তাদের জীবনকে সহজতর করে তোলার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করা আমার পেশার অংশ। আমার ভালো লাগার সাথে আমার কাজের দারুণ মেলবন্ধন আছে।

মাল্টিকালচারাল বিভিন্ন সংগঠনসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মূল সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে আছি নানাভাবে। পদ-পদবির জন্য নয়, কাজ করতে ভালো লাগে বলেই যখন যে সংগঠনের কাজ করি, তা করি প্রাণ দিয়ে। আপন দর্পণে নিজেকে উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে উপলব্ধি করতে পারি, এটা হয়তো আমার খুব খারাপ একটা দিক। সবকিছুতে সততা আর মূল্যবোধ ঢেলে দেওয়া ঠিক নয়।

ভাষা এবং বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল সবসময়ই। বাংলাদেশে আমি আর নতুন সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী যেমন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডাদের সাথে মিশতাম, কাজ করতাম সাধ্যানুযায়ী। কানাডায় এসে এখানকার আদিবাসীদের বিষয়ে জেনে আরো বিস্মিত হলাম। দু’জন মানুষের সান্নিধ্য আগ্রহকে আরো উস্কে দেয়। আমার সৌভাগ্য যে দুইজন অনন্য ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছি যাঁরা নানাভাবে আমার মনন, চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। একজন হলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্যতম রূপকার রফিকুল ইসলাম এবং অন্যজন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, কানাডীয় আদিবাসী ও গভর্নমেন্টের মধ্যে নেগোসিয়েটর রবি আলম। রবি আলম ভাই যখন আদিবাসীদের জীবনযাত্রা, তাদের ঐতিহ্য এবং সংগ্রাম নিয়ে কথা বলেন, আমি আর নতুন প্রবল আগ্রহে শুনি। ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই দু’জন মানুষকে কোনোদিন পরনিন্দা, সমালোচনা, অন্যকে ছোটো করে কথা বলতে দেখিনি। বড়ো বড়ো বিষয় নিয়ে বড়ো কাজ করেছেন কিন্তু ‘আমি, আমি’ ব্যাপারটি একেবারেই নেই তাদের ভিতরে।

৫.
রাজধানী থেকে নয়, উত্তরবঙ্গের এক মফস্বল শহর নাটোর থেকে আসা মানুষ আমি, যে মাটি আর মানুষের কাছাকাছি থাকবে এবং মঙ্গল চর্চা করবে বলে প্রবাসী অনেক পাত্রকে ফিরিয়ে দিয়েছে, এমনকি নাটোর ছেড়ে ঢাকাতেও যেতে চায়নি, আর সে কি না আজ বিপরীত গোলার্ধের এক অজানা পরিবেশে!

ঢাকার বাইরে যারা বাংলাদেশ আছে বলে মনে করেন না তাদের দু’য়েকজন খোঁচা দিয়েছেন- “ও নাটোর! নাটোরে আপনার বাড়ি! নাটোর যেন কোথায়?’’ আমার মুখে তো সবসময়ই হাসি, সেই হাসি আরেকটু ছড়িয়ে দিয়ে বলেছি- “বাংলাদেশের চৌষট্টিটি জেলার মধ্যে একটা জেলার নাম নাটোর। তবে এ-শহরে নানারকম সমৃদ্ধি থাকলেও প্রদর্শন কম। তাই হয়তো জানা হয়নি আপনার।” আমরা যখন দেশের বাইরে আসি অনেকেই তখন শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, অর্থের সাথে সাথে আরো নিয়ে আসি পদমর্যাদার দাম্ভিকতা, ক্ষমতার বড়াই, রাজনৈতিক কূটকচালি, প্রদর্শনের সংস্কৃতি, পিছনে কথা বলা আর পরচর্চার প্রবণতা। আমার কাছে এগুলো ব্যাধির মতো মনে হয়। তাই নিজেকে লুকানোর জন্য আমার আশ্রয় সৌম্যদর্শন সেই ঋষির কাছেই।

কানাডার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলনাহীন। আমরা থাকি ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে। প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশি, সাদা তুষারের মুকুটে ঢাকা সবুজ পাহাড়, মেপল পাতায় বোনা রঙিন হেমন্ত, তুষারফুলে ঢাকা শীতার্ত দিন কিংবা চেরি উৎসবে মাতাল বসন্ত সবেতেই বাড়াবাড়ি রকমের সৌন্দর্য। স্বর্গীয় এই সৌন্দর্যের জন্যই বোধহয় বলা হয়- “Splendour without diminishment.” বাংলাদেশের বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো এ-দেশেও লেগে থাকে নানা জাতির, নানা ভাষার উৎসব। সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে এখানকার মানুষগুলোর ভীষণ আন্তরিক আর হাসিখুশি মুখ। মিথ্যের ছড়াছড়ি নেই, লাল ফাইলের দৌরাত্ম্য নেই, ঘুষ নেই, তৈলমর্দন নেই, নারী-পুরুষের দৃশ্যমান বৈষম্য নেই- এসবই এ দেশের ভালো দিক।

এদের নম্রতা এবং মানবিকতা আমাকে মুগ্ধ করে। একবার আমার ছেলে প্রমিত খুব অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় সাত ঘণ্টা সে অচেতন ছিল। তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য ডাক্তারদের যে মমত্ববোধ, দায়িত্বশীলতা এবং একই সাথে পেশাদারিত্ব দেখেছি, তা কখনো ভুলব না। সেদিন একটা কথাই মনে হয়েছিল- তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন চিকিৎসা এবং আন্তরিকতা দিয়ে রোগীকে সুস্থ করে তুলতে। মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে যদি প্রাণ প্রতিস্থাপন করা যেতো, তারা সেটাও করতেন!

ছোটো ছোটো যেকোনো প্রাপ্তি আমাকে ভীষণ আপ্লুত করে। কারো কাছ থেকে এত্তোটুকু কিছু পেলে ভুলি না, যেমন ভুলতে পারিনি বাসা থেকে হোয়াইট রক শহরে কাজ করতে যেতাম যে বাসে, সেই বাসের নম্বর। ড্রাইভারস লাইসেন্স হয়নি তখনো। বাসের জন্য অপেক্ষারত যাত্রীদের জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যদি সেখানে অপেক্ষমাণ যাত্রী না থাকে কিংবা কেউ বাস থেকে সেই স্টপে না নামে তাহলে বাস থামে না। সদ্য নতুন দেশে আসা এই আমার অনেক সময় কাজ শেষে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছুতে দু’এক মিনিট দেরি হয়ে যেতো। আসার আগেই যদি বাসটি এসে যেতো, তাহলে ড্রাইভার বেশ দূর থেকে দেখে গতি একটু কমিয়ে দিতেন, যেন বাসটি মিস না হয়। কয়েক সেকেন্ড দেরিতে বাসটি মিস হয়ে গেলে পরেরটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ঠান্ডার মধ্যে, বাসায় পৌঁছুতে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে। একজন নতুন অভিবাসী সেইসব অনুগ্রহের কথা ভুলবে কীভাবে! একটা শীতকাল এ দেশে কাটানোর পরে শীত আর কাবু করতে পারে না।

আমার সমস্যা হচ্ছে, খালি ভালো চোখে পড়ে বলে খারাপ কিছু সহসা খুঁজে পাই না। প্রমিত বলে- “মা, তুমি ইউটোপিয়ায় বাস করো।” কিন্তু এই পৃথিবী তো এমন নয়! যতদিন বাঁচব, আমি নিজের ভিতরে তৈরি করা এই ইউটোপিয়াতেই বাঁচতে চাই।

লেখক পরিচিতি
জন্ম এবং বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের নাটোরে। ২০০৮ সাল থেকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাস। সম্পাদনা করেন সুরুচিশোভন সাহিত্যের কাগজ ‘ছান্দস’। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ধ্রুপদ সন্ন্যাসে’ (১৯৯৮), ‘কাচের কোকিল’ (২০০০), ‘প্রত্নপিপাসার জল’ (২০০৫), ‘মনঘর’ (২০১২), ‘শত পদ্য মলাটের ভাঁজে’ (২০১৮)। অনুবাদ- ‘আর্মেনিয়ার ছোঁগল্প’ (২০০৫), ‘জেনানা জবান’ (২০১০), ‘দূরের ক্যানভাস’ (২০১৬) এবং ‘উত্তুঙ্গ স্রোত বেয়ে’ (২০১৯)। ২০০৪ সালে ‘যতীন্দ্রমোহন বাগচী সম্মাননা পদক’ লাভ।