কানাডার সাহিত্য নিয়ে আমার বই লেখার আদি-অন্ত
২০২৫ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আমার বই ‘কানাডার সাহিত্য’। প্রকাশক ভিরাসত। কানাডার টরন্টো শহরের যে এলাকায় আমার আবাস সেখানকার পাক্ষিক পত্রিকা বিচমেট্রো (BeachMetro) এই বই প্রকাশ নিয়ে আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে লিখেছিল, “Titled Kanadian Sahityo (Canadian Literature in Bengali), this is Das’ second book focusing on popular Canadian literary figures . His previous 2019 Bengali book on Canadian literature amassed acclaim by Bengali readers living in Canada and Bangladesh. For Das, bringing Bengali attention to historic Canadian writers was an overarching goal behind his work.” উল্লেখ করে রাখতে চাই, ‘কানাডার সাহিত্য’ বইয়ের প্রথম ক্ষুদ্রতর সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে ২০১৯ সালে। কানাডার সাহিত্য নিয়ে আমার এই অগ্রসরণের আদি-অন্ত নিয়েই আজকের লেখা।
২০১৩ সালের আগস্টের ১৫ তারিখ বাংলাদেশের ঢাকা থেকে আমরা পিয়ারসন এয়ারপোর্টে নামি। আসার সময়ে আমার ব্যাগে বই ছিল হাতে গোনা সামান্য কয়েকটি বই। কারণ, আসার পরে আমি কোনোদিন বই পড়বো, বই লিখবো, সাহিত্য করবো, ভাষা নিয়ে কাজ করবো এই প্রত্যাশাটা একেবারেই ছিল না। আসার পরে যেমনটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে- সকল নতুন অভিবাসীর ক্ষেত্রেই ঘটে- সেটি হচ্ছে যে আমরা, আমাদের নতুন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হলাম। সেই কাজটি চলতে থাকলো মাসের পর মাস ধরে। বলা যায়, এক বছর ধরে। আরও যেটি ঘটলো সেটি হচ্ছে, নতুন দেশের জীবিকা, নতুন দেশের ব্যবস্থা, ইত্যাদির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার কাজগুলো হতে থাকলো। আর সেসব কারণেই বই তখন মূল্যহীন এক বস্তুর মতো হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে।
কখনও কখনও হাতে যে দু’চারটে বই ছিল সেগুলো যে একটু উলটে-পালটে দেখতাম না, তা নয়। কিন্তু সেগুলো আমাকে কোনো আনন্দ-উৎসাহ সে-সময় দিতে পারেনি। এটাই হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম সত্য কথা।

কিন্তু এর ভিতরে যে জিনিসটা আমার মাঝে মাঝে করতে ইচ্ছে করতো তা হচ্ছে কেনেডিয়ান সাহিত্যকে একটু চেখে দেখতে। এই ইচ্ছে থেকে কিন্তু মাঝে মাঝে কানাডার সাহিত্যের দু’একটি বই ঘরেও এনেছি। কিন্তু কেনেডিয়ান সাহিত্যের বই তখন আমার কাছে সামথিং গ্রিক টু ওয়ান। যেটাকে বলা যায় এক ধরনের অপরিচিত জিনিস। আমি তখন পর্যন্ত কানাডার দু’চারজন লেখককে জানি- মার্গারেট অ্যাটউড (জন্ম ১৯৩৯) বা ইয়ান মার্টেল (জন্ম ১৯৬৩) বা মাইকেল ওনডাডজি (জন্ম ১৯৪৩) বা রোহিনতন মিস্ত্রীকে (জন্ম ১৯৫২) জানতাম- বা এরকম পাঁচ-দশজন লেখকের নাম আমি জানতাম। কিন্তু সেগুলো নিয়ে কখনওই তো কোনো কাজ করা হয়ে ওঠেনি আমার পক্ষে।
শুরুতে কানাডীয় সাহিত্যে যখন আমি হাত দিতে চেষ্টা করতাম, তখন সেটা আমার কাছে একটা মহাসাগর মনে হতো। সাগর নয়, একদম মহাসাগর- যেটি কোনোক্রমে পার হওয়া সম্ভব না কখনই। তো সেই পরিস্থিতিতে কী করে যেন একদিন- যেটাকে বলে আইসব্রেকিং বা বরফ-গলা- সেটি ঘটলো। আমার স্ত্রী নীলিমা তাঁর কাজের জায়গা থেকে আগেভাগে চলে এসেছিলেন সেদিন। ফিরে এসে আমাকে বললেন, তাকে একটু ভ্যালু ভিলেজে যেতে হবে। কিছু জিনিসপত্র লাগবে সংসারের। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমিও চলো’। ও খুব ভালো করে জানেন যে, ঘর-সংসারের জিনিসপত্র কেনার ব্যাপারে আমার কোনোদিন কোনো আগ্রহ ছিল না। তখন আমি বললাম, “আমি যেতে পারি যদি বই কিনতে পারি।” ও তখন বললেন, “ঠিক আছে। তুমি বই কিনবে।”
আগেও আমি ওই দোকানে গিয়েছি। আগে যতোবার গিয়েছি, বইগুলোতে চোখ বুলিয়েছি। কিন্তু কখনই কেনা হয়নি। কিন্তু সেদিন গিয়ে আমি একটা কার্ট নিলাম। কার্ট নিয়ে আমি বইয়ের সেলফের সামনে দাঁড়ালাম। আমার স্ত্রী তাঁর সংসারের জিনিস কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি কার্ট নিয়ে দেখতে থাকলাম কানাডিয়ান সাহিত্যের লেখক কারা। ব্যাকফ্লাপ দেখে বুঝতে চেষ্টা করলাম কোন কোন লেখক কানাডার। তারপরে পড়তে থাকলাম পুরস্কারের সিল। আমি পুরস্কার পাওয়া ২০-২৫টা বই আমার কার্টে তুলে ফেললাম। সত্যি কথা হলো আমি সেই বইগুলোর অধিকাংশ লেখকের নাম জানতাম না। তাদের বইয়ের নামও শুনিনি ততোদিনে। বইগুলো কিনে নিয়ে টিটিসি বাসে ওঠলাম। তখনও তো বাসে চড়ি– গাড়ি কেনা হয়নি- বাসেই যাওয়া আসা। ব্যাস। বাসে ফিরতে ফিরতেই ব্যাগ খুলে বই বের করেছি। একেকটা দেখছি, উল্টাচ্ছি, আবার ব্যাগে রাখছি। নীলিমা বুঝতে পারছেন যে, আমি নতুন একটি জগতে ডুবে যাচ্ছি। এরপর বইগুলো নিয়ে এলাম আমার ঘরে- বেডরুমে। ওগুলো নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে সাজিয়ে রাখলাম।
মানে, সবকটা বইয়ের ফ্রন্ট দেখা যায় এমনভাবে সাজালাম। ওভাবে সাজিয়েছি কারণ ওই যে ২০-২৫টি বই কিনেছি- সেগুলোর ওই ২০ বা ২৫ জন লেখককে আমি জানতে চাই। প্রথমে ওই ২০-২৫ জন লেখকের নাম আয়ত্ত করতে শুরু করলাম। মানে নামগুলো আমি মুখস্থ করলাম। বই তো সামনে রয়েছে- কভারে দেখছি। বইয়ের লেখকের নাম জানছি, বইয়ের নাম জানছি। এভাবে ২০-২৫ জন লেখক, ২০-২৫টি বই আমার জানা হলো। এরপর আমি একজন করে লেখককে ধরছি, তাকে নিয়ে আবার গুগল করছি। গুগল করতে গিয়ে তার আরও দুই-পাঁচটি বইয়ের নাম জানছি। এভাবে আমার ভিতরে ধারণাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করলো এবং এটি করতে গিয়ে তিনি যেই যেই পুরস্কার পেয়েছেন, সেই পুরস্কার সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম। এভাবে করতে করতে এবং এভাবে বই কিনতে কিনতে বছর খানেক পর আমি দেখলাম যে আমার ঘরে বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ, চারশ হয়ে গেল। সাথে আরও দেখলাম যে প্রায় ৬০-৭০-৮০ জন লেখকের ব্যাপারে আমার স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়ে গেল। ধারণা হতে থাকলো বিভিন্ন ঘরনার লেখকদের নিয়ে।

এভাবে একসময় আমি এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেলাম যে প্রায় দুইশ-তিনশ বই আমি নাম বললে চিনতে পারি। এই প্রক্রিয়া চলে দুই-তিন বছর ধরে। একটা পর্যায়ে আমার ভিতরে একটি ভাবনা তৈরি হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যা যা পড়বো সেগুলো নিয়ে আমার অনুধাবন বাংলায় লিখে রাখবো।
ধরা যাক, মার্গারেট অ্যাটউডের পাঁচটা বই কেনা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে আমি দুই পৃষ্ঠা লিখলাম। ওটা মার্গারেট- ওটা আমার ঘরের মেঝেতে একপাশে রয়েছে। আবার ধরা যাক মাইকেল ওনডাডজি- তাঁর ছয়টি বই কেনা হয়েছে। সেগুলো নিয়ে একটু পড়ছি এবং হয়তো পাঁচ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে। এক জায়গায় রাখছি। এরকম করে আমার জিনিসগুলো এগুতে থাকলো। এভাবে ধারণাটা ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করলো। যেমন ধরা যাক, আমি আল পার্ডিকে (১৯১৮-২০০০) পড়লাম। আমি পি কে পেইজকে (১৯১৬-২০১০) পড়লাম, মিল্টন অ্যাকর্নকে (১৯২৩-১৯৮৬) পড়লাম- এরকম করে আমার দিন যেতে লাগলো। নতুন নতুন লেখককে জানছি। এই যে নতুন নতুন লেখককে জানছি- তাঁরা কিন্তু কানাডার অনেক বড়ো বড়ো লেখক। অনেক বিখ্যাত। যেমন ধরা যাক, আমার খুব পছন্দের একজন কবি গুয়েন্ডলিন ম্যাকিয়ান (১৯৪১-১৯৮৭)। যখন তাঁর বই আবিষ্কার করলাম, জিনিসটা এমন যে তাঁর নাম জানছি- এটা কিন্তু আমার কাছে আবিষ্কার। নাম জানার পরে কারো কারো বায়োগ্রাফি পড়লাম, অটোবায়োগ্রাফি কিনতে শুরু করলাম। চিঠিপত্রের সংকলন সংগ্রহ করতে শুরু করলাম।
টরন্টো ডাউন টাউনে পুরনো বইয়ের একটা দোকান আছে- বিএমভি। সেখানে অনেক সিরিয়াস বই পাওয়া যায়। সেই জায়গা থেকে আমি পছন্দের বই নির্বাচন করা শিখে ফেললাম। আমি যদি গুয়েন্ডলিন ম্যাকিয়ানের কথা বলি- গুয়েনকে নিয়ে কিন্তু একটা জীবনী আছে। ওই অসাধারণ জীবনীটির নাম আমি জেনে ফেললাম। লেখকের নাম রোজমেরি সালিভ্যান (জন্ম ১৯৪৭)। বইয়ের নাম ‘শ্যাডো মেকার’ (১৯৮৫)। তখন ওই জীবনীটা আমি কিনতে গেলাম। কী যে অসামান্য বই! তখন কিন্তু আমার ক্ষুধা বাড়ছে। তখন ক্ষুধা অনুযায়ী আমি বই খুঁজছি। ওই যে সালিভ্যানের লেখা ভালো লেগে গেল। আমি ক্রমে ক্রমে তাঁর লেখা অন্য জীবনীগুলো খুঁজতে লাগলাম। জানলাম, তিনি অ্যাটউডেরও একটি জীবনী লিখেছেন। তখন সেই জীবনী ‘দ্য রেড শুজ’ (১৯৯৮) কিনে ফেললাম। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে আমার ধারণাগুলো স্পষ্ট হতে থাকলো।
এভাবে আমি একসময় জানলাম জর্জ বাওয়ারিঙের (জন্ম ১৯৩৫) কথা। জর্জ বাওয়ারিঙের গদ্য পড়া শুরু করলাম। ভাবতাম- আহা, কী করে এমন করে লেখে মানুষ! পরে পেলাম জর্জ বাওয়ারিঙের আত্মজীবনী। আত্মজীবনীমূলক চার-পাঁচটি বই এই লেখকের। তখন আমার মনে হচ্ছিলো- বাব্বাহ্ কী সুন্দর! আমি আবার যেটি দোকানে পাচ্ছি না- সেটি লাইব্রেরিতে থেকে আনছি। এইভাবে করে করে একসময় আমি দেখলাম যে, আমার বিশ-পঁচিশটি প্রবন্ধ তৈরি হয়ে গেছে কানাডিয়ান লেখকদের নিয়ে এবং আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমার এই প্রবন্ধগুলোকে আমি একটি বই আকারে ছাপাবো। চূড়ান্ত করলাম ভাবনা। চূড়ান্ত করার পরে আমার পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশককে দিয়ে দিলাম। এরপর আমার বই প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। তখন ওই বইয়ের দশ-বারোটি প্রবন্ধ আমি নিউইয়র্ক এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় দিলাম। টরন্টোর পত্র-পত্রিকাতেও দিতে থাকলাম।
তখন গিয়ে দাঁড়ালো এমন যে- আমার বই একদিকে রেডি হয়ে যাচ্ছে, আর এই পাঁচ-ছয় মাসে অভিবাসী মানুষেরা বা বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজের মানুষেরা বুঝতে শুরু করলেন, আমি কানাডিয়ান সাহিত্য নিয়ে অনেকখানি কাজ শুরু করেছি। আমার পাঠ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা হতে থাকলো এবং এরপরে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ বইয়ের পাঠ উন্মোচন হলো। সেই উন্মোচনে হল ভর্তি মানুষ। কত বন্ধুরা এসেছিলেন- লেখক বন্ধু, শিল্পী বন্ধু, ব্যবসায়ী বন্ধু, রাজনৈতিক বন্ধু, পেশাজীবী বন্ধু– তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁরা আমাকে উৎসাহিত করেছেন। এই যে তাঁরা আমার বইকে সাদরে গ্রহণ করলেন, তাঁরা যে আমার গ্রন্থ প্রকাশে আনন্দচিত্তে উল্লাস প্রকাশ করলেন, এটি আমার মধ্যে অনেক উদ্দীপনা তৈরি করেছে- উৎসাহ তৈরি করেছে।

সেদিন কিন্তু আমাদের ছোট্ট আয়োজনে অনেক বরেণ্য কবি-লেখক ছিলেন। সাথে ছিলেন টরন্টোর তৎকালীন পোয়েট লরিয়েট অ্যান মাইকেলস। কানাডায় অনেক পুরস্কার পাওয়া একজন অসামান্য কবি ও ঔপন্যাসিক তিনি। তিনি দাঁড়িয়ে সবার সামনে বললেন, ‘On behalf of Canada, on behalf of Toronto ও salute Subrata. ও I congratulate Subrata.’ এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।
প্রথম পাণ্ডুলিপিটি রচনাকালেই আরও একটি উন্নয়ন ঘটেছিল আমার। প্রাথমিক পাঠের সময় আমি যে-সব প্রবন্ধ লিখি, সেগুলোর সহায়ক হিসেবে লাইব্রেরি থেকে বই এনে ব্যবহার করেছি। যেহেতু ওইসব রেফারেন্স বই আমার যথেষ্ট পরিচিত নয়, সেগুলোর তালিকা প্রবন্ধের পিছনে লিখে রাখতাম। কিন্তু রেফারেন্স বই- সমালোচনা, জীবনী, আত্মজীবনী কি একবার চোখ বোলানোর জিনিস? এগুলো তো বারবার টেবিলে ওঠতে, নতুন নতুন ইঙ্গিত দেওয়ার জন্যেই রচিত। আর তাই পাণ্ডুলিপি রচনাকালেই নতুন আরেকটি কাজ করতে শুরু করি আমি। পুরানো বইয়ের অনলাইন দোকান বা টরন্টো শহরের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনতে শুরু করি ওইসব বই।
ক্রমে ক্রমে লুসি মড মন্টগোমারি (১৮৭৪-১৯৪২), আর্ল বার্নি (১৯০৪-১৯৯৫), হিউ ম্যাকলেনান, আর্ভিং লেইটন (১৯১২-২০০৬), ফার্লে মওয়াত (১৯২১-২০১৪), পিয়ের বার্টন (১৯২০-২০০৪), মর্লি কালাহান (১৯০৩-১৯৯০), গ্যাব্রিয়েল রয় (১৯০৯-১৯৮৩), মর্ডেকাই রিচলার (১৯৩১-২০০১), গুয়েনডলিন ম্যাকইয়েন, পিকে পেইজ, এলিজাবেথ স্মার্ট (১৯১৩-১৯৮৬) প্রমুখের মূল্যবান জীবনীর কপি আমার ঘরে এসে ঢোকে। কেন যেন ২০১৪-২০১৫ সালে কোনোদিনই লাইব্রেরি থেকে এনে পড়ার সময় ভাবতে পারতাম না এলসপ্যাথ ক্যামেরনের (জন্ম ১৯৪৩) মতো গবেষকের লেখা তিন কানাডীয় মহীরুহকে নিয়ে অসামান্য তিন জীবনীগ্রন্থ কখনও আমার ঘরে থাকতে পারে। রোজমেরি সালিভ্যানের মতো উচ্চমার্গের জীবনীকার রচিত অনন্য বইগুলো আমার নিত্যসঙ্গী হবে একদিন, সেটা যেন ভাবনার বাইরে ছিল। অভাবনীয় ছিল কবি, গবেষক ও অধ্যাপক ব্রুস মেয়েরের (জন্ম- ১৯৫৭) বই আমার দৈনন্দিন সহযাত্রী হবে।
এই প্রক্রিয়াতেই বর্তমানে গ্যাব্রিয়েল রয় (১৯০৯-১৯৮৩), আর্ভিং লেইটন, পিকে পেইজ, রবার্ট ক্রোয়েটস (১৯২৭-২০১১), নর্মান লেভিন (১৯২৩-২০০৫), মেরি মিগস (১৯১৭-২০০২), মারিয়া ক্যাম্পবেল (জন্ম- ১৯৪০), প্যাট্রিক লেইন (১৯৩৯-২০১৯), ডিয়োন ব্রান্ড (জন্ম. ১৯৫৩) প্রমুখ অসামান্য লেখকের আত্মজীবনীর মালিক হয়েছি আমি। যোগার করতে সক্ষম হয়েছি কানাডীয় সাহিত্যের নক্ষত্র সুজানা মোডি (১৮০৩-১৮৮৫), আল পার্ডি, আর্ভিং লেইটন, মার্গারেট লরেন্স, ডেভিড রবার্টসন প্রমুখের রচিত চিঠিপত্রের সংকলন।

‘ক্যানলিট ফুডবুক’ (মার্গারেট অ্যাটউড, ১৯৮৭), ‘লেফট হুক’ (জর্জ বাওয়ারিং, ২০০৫), ‘দ্য জার্নালস অব সুজানা মোদী’ (মার্গারেট অ্যাটউড, ২০০০), ‘ইন মাডি ওয়াটার: কনভারসেশনস উইথ ইলেভেন পোয়েটস’ (রব বাড, ২০০৩), ‘অটো/বায়োগ্রাফি ইন কানাডা: ক্রিটিক্যাল ডিরেকশান’ (সম্পাদক : জুলিয্যায়ক, ২০০৫), ‘রি : রিডিং দ্য পোস্টমডার্ন’ (সম্পাদক: রবার্ট ডেভিড স্ট্যাসি, ২০১০), ‘ড. ডেলিশাস : মেময়েরস অফ অ্যা লাইফ ইন ক্যানলিট’ (রবার্ট লেকার, ২০০৬), ‘রাইটার্স টকিং’ (সম্পাদক : জন মেটকাফ ও অন্যরা, ২০০৩), ‘কানাডিয়ানস : অ্যা পোট্রেট অব অ্যা কান্ট্রি’ (রয় ম্যাকগ্রেগর, ২০০৮), ‘লিটারারি সেলিব্রিটি ইন কানাডা’ (লরেইন ইয়র্ক, ২০০৭), ‘দ্য আইডিয়া অব কানাডা’ (ডেভিড জনস্টন, ২০১৬), ‘দ্য প্রোমিজ অব কানাডা : ১৫০ ইয়ারস- পিপল অ্যান্ড আইডিয়াস দ্যাট হ্যাভ শেভড আওয়ার কান্ট্রি’ (শার্লট গ্রে, ২০১৬) প্রভৃতির মতো অসামান্য গ্রন্থগুলো।
গ্রেগ গ্যাটেনবির (জন্ম ১৯৫০) দুই খ-ের ‘কানাডা থ্রু দ্য আইজ অব ফরেন রাইটার্স’ (১৯৯৩, ১৯৯৫) এবং ঢাউস সাইজের ‘টরন্টো: অ্যা লিটারারি গাইড’ (১৯৯৯)-এর মতো বইয়ের মালিক হয়ে যেন প্রেমাস্পদকে কাছে পাওয়ার সুখ অনুভব করেছি। ‘দ্য নোট বুকস’ (২০১৩) বা ‘হুকড অন কানাডিয়ান বুকস’ (২০১০) আমার টেবিলে যেন সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে আসন গাড়লো। সেই সাথে নিক মাউন্টের ‘অ্যারাইভাল’ (২০১৭) এবং মার্গারেট অ্যাটউডের ‘সারভাইভাল’ (১৯৭২) এর মতো বই কানাডীয় সাহিত্যের যে-কোনো পাঠকের মতো আমার জন্যেও সার্বক্ষণিক সঙ্গী।
প্রথম পাণ্ডুলিপি লেখার এক বছর আগেও কখনও কেন যেন স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না এসব বইয়ের মালিক হতে পারব আমি। মহামূল্যবান এই গ্রন্থরাশি আমাকে ভবিষ্যৎ সময়ে কানাডীয় সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে, স্বপ্ন দেখতে, পরিকল্পনা করতে বিরাট ভূমিকা রাখবে- সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

আমার বইয়ের যারা রিভিউ করেছেন, সমালোচনা করেছেন, তাঁরা বলেছেন যে, এই বইটি অনেকটা জিপিএস-এর মতো। মানে, এই বইটি যদি কারো কাছে থাকে সেটি হবে তাঁর কাছে জিপিএস টু কানাডীয় সাহিত্য- একজন বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে, বাংলাভাষি পাঠকের কাছে এই বইটি সেই ভূমিকা পালন করতে পারবে। এভাবেই কানাডীয় সাহিত্যের ওপরে বই বাড়তে থাকলো আমার ঘরে।
কানাডার সাহিত্য নিয়ে আমার প্রথম বই ২০১৯ সালে ঢাকার একুশে বইমেলাতে প্রকাশিত হয়। তখন সেটির নাম ছিল ‘কানাডীয় সাহিত্য : বিচ্ছিন্ন ভাবনা’। সে-বইটি নিয়ে সেবছর টরন্টোতে ৩রা ফেব্রুয়ারি এক পাঠ-উন্মোচনের আয়োজন করা হয়েছিল। টরন্টো পোয়েট লরিয়েট অ্যান মাইকেলস এবং বহু প্রথিতযশা বাঙালি ও অবাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে আলোচকেরা বলেছিলেন যে, বইটি মোটেই বিচ্ছিন্ন ভাবনার সমন্বয় নয়। তাঁদের বিবেচনায় বইয়ের প্রবন্ধগুলো সুচিন্তিতভাবে সংবদ্ধ। আর তাই বইটির কলকাতা সংস্করণের নাম ‘কানাডার সাহিত্য’ করা হয়।
‘কানাডীয় সাহিত্য : বিচ্ছিন্ন ভাবনা’ প্রকাশের অনুষ্ঠান বন্ধুকবি অ্যান ম্যাইকেলস উপস্থিত থাকেন এবং বলেন: ‘টরন্টো সিটির পক্ষ থেকে, কানাডার প্রতিনিধিত্বকারী কবি হিসেবে আমি সুব্রতকে অভিনন্দন জানাই।’ তাঁর এই কথা আমার জন্য অনেক বড়ো পুরস্কার।
অ্যান মাইকেলসের বক্তৃতা শুনলে স্পষ্ট হয় টরন্টোর সকল কমিউনিটির সাহিত্য-উদ্যোগের প্রতি তিনি কতখানি দরদি। দশ বছরের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, সহমর্মিতার নিদর্শন হিসেবে নতুন এই সংস্করণটি আমি অ্যান মাইকেলসকে উৎসর্গ করেছি।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৬৪। লিখিত, অনূদিত এবং সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা একত্রিশ। কানাডা জার্নালের (www.c-j.ca) উদ্যোক্তা। ২০০৩ সালে বাংলা সাহিত্য নিয়ে প্রথম ওয়েবসাইট (www.bdnovels.org)-এর উদ্যোগ নেন। ২০১৮ সালে গায়ত্রী গ্যামার্স মেমোরিয়াল পুরস্কার এবং ২০২৩ সালে কানাডার শ্রেষ্ঠ বাঙালি লেখকের পুরস্কার লাভ করেন। ২০২১ সালে কানাডার শীর্ষ ২৫ অভিবাসী পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
