অচেনা আকাশ

কাজী হেলাল

১২ এপ্রিল! মন্ট্রিয়ল-এর আকাশে শেষ বিকেলের রোদ উঁকিঝুঁকি দিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে! ফরাসি সংস্কৃতি সমৃদ্ধ বর্ণিল শহরের সেই আকাশকে আমার মনে হয়েছিল এক অনন্তের সম্ভাবনাময় নতুন এক পৃথিবী! ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ হাতছানি দিয়ে আবার চলে যায়, যেন লুকোচুরি খেলছে মেঘের সাথে! সালটা ছিল ১৯৯০!

কারো কাছে সেই দিনটি হয়তো সাদামাটা আর দশটা দিনের মতো, তবে আমার কাছে ছিল ঝলমলো আবার বেদনা বিধূর দিনের এক অলিখিত কাব্য। যদিও এই দিনটি কালের গর্ভে প্রবেশ করেছে ৩৫ বছর আগে, তবু যখনই ঘুরে ফিরে আসে ১২ই এপ্রিল, মনে পড়ে যায় সেই বিশেষ দিনে আমি পরবাসী হয়েছি! সেই দিনের অনুভূতি কেমন ছিল তা বোধহয় লিখে প্রকাশ করা একটু কঠিন!

এয়ার হোস্টেস-এর ঘোষণায় ঘোর কেটে গেলে মনে হলো আর কিছুক্ষণের মধ্যে যে দেশে পদার্পণ করতে যাচ্ছি, সেই দেশটা কি কখনো আমার হবে! নাকি আমরা এই দেশের হয়ে যাবো! বদলে যাবে মনের আকাশ, বুকের ভিতরে বাংলাদেশের যে ঘুড্ডি উড়ছে তা একসময় ডানা ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে! যান্ত্রিকতা গ্রাস করবে সব সুকুমার বৃত্তি? হাজারো প্রশ্নের ভিতর উপলব্ধি করলাম, মন্ট্রিয়ল শহরের মিরাবেল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করেছে। তখন টরন্টোর পিয়ারসন নয়, কানাডার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল মন্ট্রিয়লের মিরাবেল এয়ারপোর্ট! প্লেন ল্যান্ড করার পর বুঝতে পারলাম সারা শরীর এবং মনব্যাপী ভীষণ এক উত্তেজনা বাক্স বন্দি ইঁদুরের মতো দৌড়ঝাঁপ করছে! দেশের সরকারি চাকরি, প্রাণের নদী আত্রাই, বন্ধুদের সান্নিধ্য, সবকিছু ছেড়ে চলে আসায় এক ধরনের শূন্যতাবোধ, আবার নতুন এক পৃথিবীর আহ্বান, সে এক দোদুল্যমান অবস্থা। ইমিগ্রেশনের সব ফর্মালিটিজ শেষ করতে করতে বেশ কিছু সময় লেগে গেল!

বিমানবন্দরের লাউঞ্জে অপেক্ষা করছেন বড়োভাই, যিনি কিংস্টন থেকে এসেছেন আমাদের নিতে! কাজ শেষ করে ইমিগ্রেশন অফিসার প্রথমে ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজে কিছু একটা বললেন, বোধগম্য হয়নি তখন, যা এখনো হয় না একমাত্র ফরাসি শব্দ ‘বোঁজো’ ছাড়া। তারপরেই ইংলিশে বললেন ‘ওয়েলকাম টু কানাডা’! মনে হলো বিশাল কিছু একটা পেয়ে গেছি, সেই আনন্দকে আত্মস্থ করার আগেই হঠাৎ করে পিছনে ফেলে আসা শৈশব কৈশোরের স্মৃতি এসে জাপটে ধরেছিল মনকে! কিছু হারানো আর নতুন কিছু পাওয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

২.

আমি, বাবা, মা ও আমার ছোটো ভাই ডাক্তার তারিক একসঙ্গে সেই দিন কানাডায় এসেছি আমাদের বড়ো ভাইয়ের স্পনসরশিপে! আমাদের প্রত্যেকের মনের ভিতর সেদিন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি কাজ করছিল বলে মনে হয়েছে! আমি ও আমার ছোটো ভাই অবশ্যই কানাডা এসে সেটল করতে চেয়েছি, অধীর হয়ে অপেক্ষা করেছি নতুন ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় ! আমাদের পরিবারের প্রবীণরা বহুদিন ধরে এদেশে বসবাস করছেন তাদের কাছ থেকে শুনে এসেছি, উত্তর আমেরিকা অফুরান অপরচুনিটির দেশ, একটি কাঠামোর ভিতর দিয়ে এ দেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এগিয়ে যায়! আইনের কাছে জনগণ থাকে দায়বদ্ধ! যদি কেউ চায় তার জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে তাহলে তার জন্য সমস্ত প্রবেশ পথ থাকে উন্মুক্ত! আমরা সেই উন্মুক্ত পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্পে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম! তাই আমার মনে হয় আমাদের কোনো ভাই বোনের এই দেশে এসে প্রতিষ্ঠা পেতে অসুবিধা হয়নি।

জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজ তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং মানবিক মানুষ হিসেবে উত্তর আমেরিকায় নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন! তবে আব্বা সারা জীবনের অর্জন, পারিবারিক ব্যবসা, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি, মহাদেবপুরের মানুষের ভালোবাসা, সবকিছু ছেড়েছুড়ে এভাবে বিদেশে চলে আসতে চাননি! অবশ্য, মা চেয়েছিলেন তার সব সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে এদেশে এসে থাকতে। কারণ, পরিবারের অর্ধেক সদস্যরা অনেক আগে ১৯৬৯ সালের দিকে উত্তর আমেরিকায় চলে এসেছেন, সেক্ষেত্রে এদেশই তাঁর জন্য শেষ ঠিকানা যেখানে পরিবারের সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পারবেন! যদিও তাঁর মনোকষ্ট কোনো অংশে আমাদের থেকে কম ছিল না বলে আমার মনে হয়েছে। ৬০ বছরের সংসারের শেকড় উপড়ে নিয়ে নতুন করে বিদেশ বিভুঁইয়ে আবার তা রোপন করা কখনোই কারো জন্য সহজ নয়!

একটি বয়স্ক গাছকে কখনোই এক জায়গা থেকে তুলে এনে অন্য কোথাও রোপণ করা যায় না, যদিনা তা কোনো ভ্রমণেচ্ছু বৃক্ষ হয়! বাবার মনমরা ভাব দেখে আমার মনে হয়েছিল, মাটির গভীরে প্রোথিত শেকড়কে কেউ যেন উৎপাটন করেছে নির্দয়ভাবে। কতটা জল সেচন, কতটা পরিচর্যায় তিনি আবার এ নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেবেন, মনে হয় না তখন সেই উত্তর কারো জানা ছিল! কারণ তাঁর ৫২ বছরের অধিক পুরাতন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘কাজী লাইব্রেরি’কে নির্দয়ভাবে তালা চাবি মেরে সবকিছু বন্ধ করে আমাদের সঙ্গে তাঁকে চলে আসতে হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাঁর কাছে সবকিছু।

জীবনযাপনের প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও ‘কাজী লাইব্রেরি’ ছিল তার প্রাণ। লাইব্রেরির ভিতরে আসবাবপত্র, ক্যাশ বাক্স, বই রাখার তাক- জানি না ওদের প্রাণ আছে কি না, তবে নিশ্চয়ই ওরা খুব কষ্ট পেয়েছে আমাদের অনুপস্থিতিতে, ওরা হয়তো গুমরে গুমরে কেঁদেছে আমাদের মতোই।

লাইব্রেরির ভিতরে দুই হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে আব্বা যখন সকাল সন্ধ্যা বসতেন, আমি চোখের সামনে এখনো দেখতে পাই তিনি ভীষণ প্রশান্তি লাভ করতেন। সেই প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটিকে ওভাবে বন্ধ করে দিয়ে সারাজীবনের জন্য এদেশে চলে আসা তাঁর জন্য ভীষণ দুরূহ ছিল। কারণ ‘কাজী লাইব্রেরিতে’ সান্ধ্যকালীন সময়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এসে ভিড় জমাতেন, উন্মুক্ত সমাজ দর্শন ও রাজনীতির আলোচনায় মেতে উঠতেন সবায়। প্রাণ খুলে আড্ডা হতো অনেক রাত অবধি! বাবা চলে আসার অর্থ হলো সেই সুন্দর মুহূর্তের ধারাবাহিকতা ছন্দপতন হয়ে যাওয়া! তারপরেও সবার অনুরোধে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, দেশের মায়া ত্যাগ করে তিনি পরবাসী হয়েছিলেন, তবে তার আত্মা পড়ে ছিল পলিমাটির দেশে!

আমি, আমার ছোটো ভাই ডাক্তার তারিক, আব্বা, মা, এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দেখতে পেলাম আমাদের বড়ো ভাই, যিনি অন্টারিও গভর্মেন্টের একজন সফল উর্ধ্বতন প্রকৌশলী, অপেক্ষা করছেন আমাদের জন্য। এই আলোকিত মানুষটি এদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সভ্যদের মধ্যে একজন স্বনামধন্য স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি, যার তদারকিতে অন্টারিওতে বহু বড়ো বড়ো হাইওয়ে এবং ব্রিজ তৈরি হয়েছে! আমরা পরিবারের সবাই তাঁর জন্য সত্যিই গর্ববোধ করি।

মন্ট্রিয়ল শহরে শীতের আমেজ তখনো কেটে যায়নি। গুঁড়ি গুঁড়ি তুষার সাদা চাদরের মতো পড়ে আছে রাস্তায়। হাইওয়ে থেকে দূরে বাড়িগুলোর ওপর তুষার, শেষ বিকেলের রোদ ঝিলিক মেরে শুভ্র শুদ্ধ ভালোবাসাকে কেমন ছুঁয়ে গেছে বিড়ালরোম আদরে। জীবনের প্রথম দেখা তুষার। আসলে তুষার না বলে তুষারের নমুনা বলা যেতে পারে। গায়ে পড়ে নিমিষেই গলে যায়, কি মিষ্টি অনুভূতি!

আমাদের গাড়ি খুব দ্রুত ছুটে চলেছে ট্রান্স কানাডা হাইওয়ে ৪০১ ধরে, ছুটে চলেছে কিংস্টনের পথে; মধ্যরাতের কাছাকাছি আমরা ভাইজানের বাসায় পৌঁছে গেলাম! সত্যিই এখানে উল্লেখ করতে হয়, অনেক ভাগ্যবান আমরা, এদেশে এসেছিলাম সোনার চামচ মুখে নিয়ে! এতটুকু চিন্তা করতে হয়নি আহার বাসস্থানের কথা ভেবে! বড়ো ভাইয়ের বাসায় সব ব্যবস্থা করা ছিল, মাসের পর মাস আমরা সেখানে থেকেছি! শুধু এটুকুই ভাবতে হয়েছে নতুন এই বৈরী পরিবেশে নিজেকে কীভাবে স্টাবলিশ করবো, ভাইজান সব সময় আমাদের জন্য চেষ্টা করেছেন জীবনকে সুন্দরভাবে কীভাবে তৈরি করতে হয় সেই পথ দেখাতে!

৩.

সময় দেখতে দেখতে চলে যায়! এদেশে আমার জীবনের প্রথম সামার দেখতে দেখতে এক সময় শেষ হয়ে এলো! আসলে যা কিছু সুন্দর খুব অল্পতেই তা শেষ হয়ে যায়!

এদেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও মনোরম দিনগুলো চোখের নিমিষে শেষ হয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে বৈরী আবহাওয়ার জন্য! ধীরে ধীরে প্রকৃতি বদলে যেতে থাকে গাছপালায় রং ধরে! তারপর আস্তে আস্তে বিবর্ণ হতে থাকে গাছের পাতা একসময় তা ঝরে পড়ে! প্রকৃতি পুরোদমে প্রস্তুতি নেয় শীতের মরশুমের জন্য! আমরাও প্রস্তুত হয়ে যাই শীতকে মোকাবেলা করার জন্য শীতের জ্যাকেট, স্নোব্টু, থার্মাল, গাড়িতে স্নো টায়ার সবকিছু নিয়ে!

নভেম্বরের শুরুতে কানাডিয়ান গিজ (রাজকীয় ভাব নিয়ে চলাফেরা করে এমন এক ধরনের হাঁস জাতীয় পাখি) দেশান্তরী হলে আমার জীবনে প্রথম স্নো এলো সৌন্দর্য ও ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা নিয়ে। হঠাৎ একদিন সকালে ওঠে দেখি প্রকৃতি সাদা চাদরে নিজেকে মুড়ে ফেলেছে। বছরের প্রায় ছয় মাস ধরে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে তুষারপাত হতে থাকে। আকাশ থেকে ধীরে ধীরে ঝরে পড়া স্নো-ফ্লেইকগুলো দেখলে মনে হয় স্বর্গ থেকে দেবদূত নেমে আসছে! শিশুর মতো কোমল আর চুপচাপ। গাছপালা, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি- সব কিছু ঢেকে যায় সাদা আবরণে। তবে এই সৌন্দর্যের মাঝে আছে কঠিন বাস্তবতা! বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে টিকে থাকার এক চ্যালেঞ্জ! এদেশে কিছু এনিমেল আছে, তারা পুরো শীতকাল ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়! মানুষের সেই সুযোগ থাকে না বলে তাপমাত্রা কখনো কখনো মাইনাস ২০-৩০ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলেও তাকে সেই পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়! রাস্তায় জমে যাওয়া আইস ও ফ্রিজিং রেইন-এর ভিতর গাড়ি চালানো ও হাঁটা- দু’টোই হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। অনেক সময় ব্ল্যাক আইস যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভয়ানকভাবে পিছলে পড়ে পা ভাঙ্গার সম্ভাবনা থাকে। ফলে শীত মৌসুমে ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার আগে সবাইকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, আইস-গ্রিপ জুতো ব্যবহার না করলে বিপদ যেকোনো সময় যেকোনো দিক থেকে আসতে পারে! তবুও এই তুষারপাত, কানাডার সংস্কৃতির একটি বড়ো অংশ।

শিশুদের জন্য স্লেজিং, টোবাগন, বরফ মানব তৈরির উত্তেজনা, বড়োদের জন্য স্কিইং বা আইস স্কেটিং, আইস ফিশিং, হেঁটে হেঁটে ফ্রোজেন লেকের মাঝখানে গিয়ে একটা গর্ত করে বরশি ফেলে অপেক্ষা করা, ধরা পড়তে পারে বিশাল ট্রাউট অথবা স্যামন টেন্টের ভিতরে চা কফির বন্দোবস্ত থাকলে তো আর কথাই নেই, আনন্দ তখন অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়! এদেশের মানুষ শীতকে উপভোগের নানা উপায় খুঁজে বের করে। বড়োদিনের সময় সাদা তুষার আনন্দকে আরও রঙিন করে তোলে। তুষারবিহীন বড়োদিন একেবারেই বেমানান এই দেশে! তাই নির্দ্বিধায় এটুকু বলা যায়, কানাডিয়ান স্নো ও আইস-এ যেমন আছে কঠিন বাস্তবতা, তেমনই অন্যদিকে আছে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যা অন্তরচক্ষু দিয়ে অনুভব করার বিষয়!

বরফের সঙ্গে খেলাধুলার প্রথম পর্বে অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য আমার বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে একদিন ক্রসকান্ট্রি স্কি করতে গেলাম। পায়ে ভারী স্কেট, দুই হাতে দুই অন্ধের ছড়ির মতো স্টিক দিয়ে ঠেলে ঠেলে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছি ট্রেইল ধরে! পাইন বৃক্ষ থেকে ঝরে পড়ছে অঝোর ধারায় তুষার, কখনো কখনো গগলস-এর ওপরে তুষার পড়ে সমস্যার সৃষ্টি করছে, সামনে কিছুই দেখা যায় না! অনভিজ্ঞের এইসব অভিজ্ঞতাও এক অসামান্য আনন্দের ব্যাপার! তবে মজার ব্যাপার হলো যতই আমি সামনে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছি তাতে কোনো লাভ হয় না! ধপাস করে শুভ্র নরম পেঁজা তুলোর মতো স্নোর মধ্যে পড়ে এক হাস্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়! নাকে-চোখে-মুখে স্নো নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম ব্যর্থ মনোরথে!

ক্রসকান্ট্রি স্কিতে যখন বিফল হই, তখন আমি একদম কনফার্ম হয়ে যাই যে, ডাউনহিল স্কি করতে গেলে আমার দুরবস্থার কোনো শেষ থাকবে না! ডাউনহিল স্কি করতে হলে পাহাড়ের ওপর থেকে খুব দ্রুত নিচে নেমে আসতে হয়, পায়ে থাকে বিশেষভাবে তৈরি স্কি করার জুতো, দুই হাতে দুটি স্টিক যা ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে! তবে অত্যন্ত মজার ব্যাপার হলো, আমি যতটা ভীত এই শীতকালীন স্পোর্টসে, আমাদের কন্যা ডাক্তার সাবরিনা ততটাই সাহসী ও পারঙ্গম স্কি, আইস স্কেটিং করার ব্যাপারে। সে খুব সহজে পাহাড়ের ওপর থেকে স্কি করতে করতে নেমে আসে এবং নিচে এসে আমাকে বলে ‘হায় বাপি’। পাহাড়ের ওপরে একদৃষ্টিতে আমি আর তার মা তাকিয়ে থাকি, আর জানা-অজানা যত দোয়া-দোরুদ আছে পড়তে থাকি, যেন আমাদের মেয়ে নিরাপদে নিচে এসে পৌঁছায়।

আজ আমাদের কন্যা বড়ো হয়ে গেছে, অন্য এক মহাদেশে গিয়ে ডক্টর অব মেডিসিন-এ পড়াশোনা শেষ করে ইন্টার্ন করছে! তারপরেও তার মা প্রতি মুহূর্তে তার নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করতে থাকে! সন্তানের জন্য বাবা-মার দুশ্চিন্তা মনে হয় কখনোই কোনোদিন শেষ হয় না! সন্তানরা যত বড়োই হোক না কেন, বাবা-মার কাছে তারা ছোটোবেলার সেই শিশুটিই থেকে যায়।

৪.

শীত মৌসুমের আরো একটি চমকপ্রদ এবং ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা এখানে শেয়ার করবো। তখন আমি কিংস্টোন শহরে বসবাস করি!

১৯৯৮ সাল। প্রতি বছরই শীত আসে কিশোরী মেয়ের মতো নতুন নতুন বায়না নিয়ে, নতুন আঙ্গিকে! সে বছর শীত এলো দুর্ধর্ষ বিধ্বংসী এক অচেনা রূপ নিয়ে। সন্ধ্যা থেকে রেডিও-টেলিভিশনে প্রতিনিয়ত ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে আগামীকাল আইসস্টর্ম হবে। বরফ ঝড় কীভাবে আসে, তা আমার কখনো জানা ছিল না। বাংলাদশে বৈশাখ মাসের শিল পড়া দেখেছি। বাড়ির আঙিনা ভর্তি হয়ে যেতো ছোটো ছোটো টুকরো শিল পড়ে। অনেক সময় বড়ো বড়ো শিল আকাশ থেকে নেমে এলে ফসলের প্রচুর ক্ষতি হতো! তরমুজ বাঙ্গি ফেটে চৌচির হয়ে যেতো। বাড়ির আঙিনায় যে শিল পড়তো সেগুলো বাটিতে ভর্তি করে নিয়ে এসে টপাটপ মুখে ফেলে দিতাম। আবার এক সুতোয় গেঁথে আঙুরের ঝোপা বানাতাম! ছোটোবেলার সেই আনন্দ-বেদনার স্মৃতিগুলো কখনোই ভুলে যাওয়ার নয়। আমরা সব ভাই-বোন ঝাঁপিয়ে পড়তাম আঙিনায়, কার আগে কে বড়ো শিল কুড়াতে পারে তার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠতাম। মা আমাদের বকা দিতেন, চিৎকার করে বারবার বলতে থাকতেন, “ওঠে এসো, ঠান্ডা লেগে তোমাদের জ্বর এসে যাবে।” কিন্তু কে শোনে কার কথা! প্রকৃতি প্রদত্ত বরফ আমাদের জন্যে আনন্দের হলেও, বাংলার কৃষকের জন্য ছিল দুর্বিসহ যন্ত্রণা। ধান ও আমের মৌসুমে কৃষকরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তো! আমাদের আনন্দ অন্যের জন্য কত কষ্টের হতে পারে, ছোটোবেলায় সেটি বোঝার মতো কোনো অন্তর্দৃষ্টি ছিল না, ছিল না উপলব্ধির ক্ষমতা! এখন ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায়!

ফিরে আসি কিংস্টনের সেই বরফ যুগের কথায়। আমরা তখনও কিংস্টনে থাকি, পড়াশোনা শেষ করে আমি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করছি, আমার স্ত্রী নিপা কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে আরবান প্ল্যানিং এর ওপরে মাস্টার ডিগ্রি করছে! ছোট্ট কন্যা সাবরিনাকে নিয়ে আমাদের ব্যস্ত জীবন। শীত তো প্রতিবারই আসে- কখনো কবিতার মতো নেমে আসে, কখনো আসে খটোমটো প্রবন্ধ হয়ে, থমথমে ভাব নিয়ে! কিন্তু ১৯৯৮-এর শীত? সে এসেছিল যেন বরফের রূপে মৃত্যুদূত হয়ে!

কেউ যদি ‘আইস এজ’ মুভিটি দেখে থাকেন, তাহলে অবশ্যই সেই সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারবেন। কুইন্স ইউনিভার্সিটি জার্নালে সেই সময়ে প্রকাশিত একটি ছোট্ট সংবাদ এখানে উদ্ধৃত করছি- “The Ice Storm that hit the Kingston region in January 1998 was an Unforgettable Experience for all who endured it.” নর্থ আমেরিকা-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নিউজ মিডিয়া তখন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তের সেই খবর দিন-রাত প্রচার করেছে!

“For more than 80 hours, steadz Freezing Rain and drizzle fell over an area of several thousand square miles of Eastern Ontario, including Ottawa, Brockville, and Kingston, an extensive area in Southern Quebec, Northern New York, and Northern New England (including parts of Vermont, New Hampshire and Maine.” Source:  Smith. queens

সেই তুষার ঝড়ে মানুষের জীবনযাত্রা একেবারে থেমে গিয়েছিল। প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মতো রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ সব ছিল বন্ধ! পাওয়ার লাইনগুলো দুমড়ে-মুচড়ে মাটিতে পড়ে ছিল। বড়ো বড়ো গাছপালা বৈদ্যুতিক তারের ওপরে আইস এমনভাবে জমেছিল যেন কেউ নিজ হাতে ভাস্কর্য তৈরি করেছে! বাড়ির দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না! বাড়ির সামনে ড্রাইভওয়ে, মিউনিসিপ্যালিটির রাস্তাঘাট, পার্কিং লট, ছোটো ছোটো ডোবা, সবকিছুই ছিল স্কেটিং এরিনা। এতটা স্লিপারি ছিল যে মানুষ কোনোভাবেই তাদের বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তা পর্যন্ত যেতে পারেনি। ৭২ ঘণ্টা কোনো বিদ্যুৎ ছিল না শহরে! সমস্ত পরিষেবা বন্ধ ছিল! রেডিও-টেলিভিশনে সব বিনোদনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে বারবার ঘোষণা করছিল- Ice Storm Alert! তা কেবল একটি আবহাওয়ার সতর্কতা ছিল না, বরং তা ছিল এক বাস্তব কাব্যিক আতঙ্কের আগমন বার্তা।
কিংস্টনের আকাশ যেন সেদিন গোপনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল এক শিল্পীর সঙ্গে, ভয়ার্ত চোখে দেখেছি পলকে পলকে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন আকৃতির ভাস্কর্য; পৃথিবীর বুকেই দৃশ্যমান এক হিমযুগ। সেই বরফ ঝড়ে শুধু সৌন্দর্যই ছিল না, ছিল শূন্যতা- যা আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছিল বহু বছর! সেই শূন্যতার ঘোর শীত আসলেই আবার মনের গহিনে জেগে ওঠে! মনে পড়ে যায় কিংস্টন থাকাকালীন সেই শীত মৌসুমের কথা

তবুও শীতকে আহ্বান করি! স্প্রিং-এ যেমন বুনো ফুলের জন্য অপেক্ষায় থাকে হৃদয়, প্রকৃতিও অপেক্ষায় থাকে নিজেকে রঙের মাধুর্য দিয়ে সাজাবে বলে! তুষারপাতও তেমনই নিয়ে আসে এই ধরণীতে অনাবিল আনন্দের ফুল, ফসলের মাঠকে রাখে সিক্ত! এ-সবই ক্যানাডিয়ান সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, বরফ ছাড়া শীতের মৌসুম যেন বৃষ্টি ছাড়া বর্ষাকাল! আমরা অপেক্ষায় থাকি পরের মৌসুমে আবার নতুন করে শীতকে আহ্বান করবো বলে!

লেখক পরিচিতি
একাধারে কবি, আবৃত্তিকার, অভিনেতা ও নাট্যকর্মী। জন্ম বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট এবং মার্কেটিং-এ মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে বসবাস করছেন কানাডার টরন্টো শহরে। লেখালেখি শুরু করেন কিশোর বেলায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘পানকৌড়ির ডুবসাঁতার’, ‘শ্রাবণীর চোখে স্থলপদ্ম’, ‘বুকের গহীনে ডেলফিনিয়াম’।