অভিবাসীর স্বপ্ন ফসল : একজন শিক্ষকের আত্মকথন

মানসী সাহা

আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম যে দেশটি বছরের অধিকাংশ সময়ই শীতের চাদরে ঢাকা থাকে সেই দেশটির নাম কানাডা। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী এই ভূমিতে তাঁদের বাস অনুমান করা হয় অন্তত ১২,০০০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে। ইউরোপীয়দের আগমনের মাধ্যমে অভিবাসন শুরু হয় ১৬শ শতক থেকে। প্রথমে ফরাসি ও ব্রিটিশরা কানাডার পূর্ব উপকূলে আসতে শুরু করে। আধুনিক অভিবাসন ব্যবস্থা শুরু হয় ১৯৬৭ সাল থেকে। যার ফলে যোগ্যতা, শিক্ষা, ভাষা দক্ষতা ইত্যাদি বিবেচনায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ অভিবাসী হয়ে আসতে আরম্ভ করে আর তাই বহু জাতি, বহু ভাষা আর বহু সংস্কৃতির সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ।

কেন আসে তারা? শুধু কি উন্নত জীবনের টান? নাকি আরও কিছু? মানুষ আসে; কারণ, এখানে স্বাধীনতার আস্বাদ আছে- চলার স্বাধীনতা, বলার স্বাধীনতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা। এখানে দেখা যা, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” বাক্যের বাস্তব চিত্র। একজন বৌদ্ধ, একজন মুসলিম, একজন খ্রিষ্টান, একজন হিন্দু সবাই রঙিন ম্যাপল লিফের পতাকার তলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কণ্ঠে তোলে “ও কানাডা, আওয়ার হোম অ্যান্ড নেটিভ ল্যান্ড।” মানুষ আসে, কারণ, মানুষের মর্যাদা এখানে অর্থ বা পদবির ওপর নির্ভর করে না। রেস্তোরাঁর কর্মী, ডেলিভারি চালক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সবাই “হ্যাব এ নাইস ডে” শুনতে পান হাসিমুখে। মানুষ আসে, এজন্যে যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এখানে মৌলিক অধিকার- কোনো বিলাসিতা নয়। শিশুরা স্কুলে যায় মনের আনন্দে। হোম ওয়ার্ক, কোচিং, আর মোটা মোটা বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে তাদের নুয়ে পড়তে হয় না। পরিকল্পিত খেলার মাঠ, স্কুল, গ্রন্থাগার, ব্যায়ামাগার-সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিশু কিশোরদের মানসিক বিকাশ ঘটে স্বাধীন ও সুস্থ পরিবেশে। কৈশোরের কৌতূহল এবং স্বপ্ন এখানে অবজ্ঞার নয়, প্রশ্রয়ের সঙ্গেই গড়ে ওঠে। আর বৃদ্ধেরা পার্কে হাঁটেন নিঃশঙ্কচিত্তে। বার্ধক্যের পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় সেবা ও সহায়তা সুনিশ্চিত করে স্থানীয় প্রশাসন। মানুষ আসে, তার কারণ- এখানে আইন কারো কথায় চলে না, আইন সবাইকে ছুঁয়ে যায় সমানভাবে। মানবকুলের মতো এখানে প্রাণীকুলও নিরুপদ্রপ। এক সারি হাঁস রাস্তা পার হতে থাকলে চালক রাস্তার দু-পাশের গাড়ি থামিয়ে রাখেন। মানুষ আসে, কারণ, এখানে আশ্রয় পায় যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী, আশ্রয় পায় উদ্বাস্তু কিংবা স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণী। কানাডার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো এমনভাবে গঠিত, যেন নাগরিক জীবন হয়ে ওঠে সহজ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ।

একজন বাংলাদেশি তরুণী বরফে ঢাকা ঠান্ডায় জমে যাওয়া দেশে এসে বসবাস করতে চায় কেন? কারণ, এখানে সে শ্বাস নিতে পারে বুক ভরে।

কোনো বাসে ওঠলেই ধাক্কা, হেঁটে গেলে আড় চোখে তাকানো, কর্মস্থলে কটুবাক্য, রাস্তায় অপমান- এ সব সহ্য করতে হয় না তাঁকে। কানাডায় সে দেখে ভিড় ঠেলে কেউ গায়ে হাত দেয় না, কেউ অকারণে লোলুপ দৃষ্টি ছোঁড়ে না। কেউ হিজাব পরলো না ছোটো স্কার্ট পরলো তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এই ব্যক্তি-স্বাধীনতা সবার আছে। এখানে কাজের কোনো জাত নেই, মেয়ের কাজ বা ছেলের কাজ বলে কিছু নেই।

কানাডায় নারীদের শুধু সমান চোখে দেখা হয় না, বিশেষ সম্মানের চোখেই দেখা হয়। ‘লেডিস ফার্স্ট’- কথাটি তাঁরা মেনে চলে। এখানে বাসে উঠলে দেখা যায় একজন পুরুষ নীরবে ওঠে দাঁড়িয়ে আসন ছেড়ে দেয় পাশের নারীকে। কে তিনি? স্ত্রী? বোন? মা? না, তিনি একজন সম্পূর্ণ অপরিচিতা। তবু নারীত্বের প্রতি যে শ্রদ্ধা সেটিই তাকে উঠে দাঁড়াতে শেখায়। বাংলাদেশ থেকে আগত অনেক নারীর কাছে এটি প্রথমে বিস্ময় জাগায় যেখানে জীবনে বহুবার ঠেলাঠেলি সহ্য করে বাসে ওঠতে হয়েছে, সেখানে এখন এক অচেনা পুরুষ তাঁর জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন আর বলেন: “প্লিজ টেইক ম্যাই সিট।” এটাই তাঁর সংস্কৃতি, এটাই তাঁর মানবিক শিক্ষা। অভিবাসী সে তরুণী জানে এখানে শীত প্রচণ্ড, দীর্ঘ সময় রোদহীন আকাশ আর বাইরে তুষারের স্তূপ- তবু এই সাদা বিষণ্ণতার মাঝেই সে খুঁজে পায় রঙিন স্বাধীনতা। স্বাধীনতা নিজেকে প্রকাশ করার, নিজের মতো করে বাঁচার।

২.

আমি বাংলাদেশের এক স্বচ্ছন্দ পরিবারের সন্তান। নিষ্কণ্টক জীবন ছিল ভালোবাসার চাদরে আবৃত। এসএসসি পাস করে মফস্বলের গণ্ডি পেরিয়ে পড়াশোনা করতে ঢাকায় যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, বড়দির ছায়াতলে থাকা- সবই ছিল স্বপ্নপূরণের এক শান্তিপূর্ণ পথ। কানাডাবাসী স্বামী শঙ্কর রায় চৌধুরীর সাথে যখন সাত পাঁকে বাঁধা পড়ি তখন আমি মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। বিয়ের চৌদ্দ মাস পর মাস্টার্স শেষ করে মনে হচ্ছিল জীবন হয়তো একটু স্বস্তির দিকে এগোবে। কিন্তু জীবনের প্রকৃত গন্তব্য যে তখনও শুরু হয়নি তা তখন ভাবিনি। জীবন মোড় নেয় এক নতুন পথে। দেশ, প্রিয়জন, মা-বাবা, ভাইবোনের আদর ভালোবাসা ছেড়ে পাড়ি জমালাম বারো হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডার অচেনা ভূখণ্ডে। গন্তব্য ছিল গোয়েল্ফ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী স্বামী শঙ্করের পাশে নতুন জীবন গড়ে তোলা।

কানাডীয় হেমন্তের রঙিন ঋতুর পাতাঝরা দেখতে দেখতে শুরু করলাম জীবনের নতুন অধ্যায়। ইউনিভার্সিটির তিনতলার স্টুডেন্ট হাউজিংটির দ্বিতীয় তলার এক বেডরুমের ছিমছাম বাসাটি ছিল ইউনিভার্সিটি থেকে কয়েক মিনিটের পথ। সেই কয়েক মিনিটের পথেই ছিল আমার নিত্য আনাগোনা। ইডেন কলেজ, টিএসসি, শাহবাগ, আর পাবলিক লাইব্রেরির সামনের ভীতিকর মিটিং মিছিল নয় বরং রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ইউনিভার্সিটির বিশাল লাইব্রেরিটি ছিল আমার কানাডার প্রথম শ্রেণিকক্ষ। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্জন কোণায় বসে চললো আমার পড়া, যাতে ভাষার দক্ষতার সাথে সাথে গড়ে ওঠেছিল কানাডার শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ও। এরপর গোয়েল্ফ পাবলিক লাইব্রেরিতেও চললো নিয়মিত আনাগোনা। কানাডায় পা রেখে উপলব্ধি করলাম, এখানে প্রতিটি পদক্ষেপে আছে কষ্ট কিন্তু নতুন করে নিজেকে গড়তে হলে সেই কষ্টের সিঁড়ি ভাঙতেই হবে। কোনো বিকল্প নেই, নেই কোনো শর্ট কাট। এখানে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে আগে জানতে হবে নিজের অবস্থান। বাংলাদেশের পরিচিত শ্লোগান ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ এখানে রূপ নিল ‘কষ্টের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা’-তে। তবে এই কষ্টময় তপ্ত পথে শান্তির বারিধারা হয়ে এসেছিল প্রবাসে বাঙালিদের সান্নিধ্য। মাত্র ১২-১৫টি পরিবারের বাস ছিল তখন কিন্তু সবার মাঝে ছিল ভীষণ আন্তরিকতা। গোয়েল্ফ আসার ঠিক পরদিনই ছিল বাঙালিদের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর সবার অনুরোধে গাইলাম, “দাঁড়াও আমার আঁখির আগে।” সেখানে গিয়ে সবার সাথে পরিচিত হয়ে মনে হয়েছিল তাঁরাই আমার অভিভাবক, আত্মীয়, বন্ধু, প্রিয়জন।

আমরা প্রত্যেকেই জীবনে একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থবহ অবস্থানে পৌঁছোতে চাই। কিন্তু অভিবাসনের সেই স্বপ্নপথ মসৃণ ছিল না, ছিল পাথরময়। ছায়ানটে ওয়াহিদুল হক ভাইয়ের কাছে শিখেছিলাম রবি ঠাকুরের সেই গান, “আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো, তাই তো তোমার বাণী বাজে ঝরনা-ঝরানো” আর জেনেছিলাম প্রতিটি অর্জন রক্ত-ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে অর্জিত হয়। একজন বাংলাদেশি নারী হিসেবে যখন কানাডায় পা রেখেছিলাম তখন আমার কাছে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন কেবলই দূরের আলো মনে হতো। ভাষার সীমাবদ্ধতা, সাংস্কৃতিক দূরত্ব, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জটিল পথ- সবকিছুর মধ্যদিয়েই নিজেকে গড়ে তুলেছি একজন কানাডীয় শিক্ষক হিসেবে। আমার সংগ্রামের এই আত্মকথা সেই সব নারীর গল্প যারা প্রবাসে এসেও নিজের স্বপ্নকে মুছে ফেলেননি।

৩.

কানাডায় টিকে থাকতে হলে শুধু মন চাইলে হবে না- চাই সহনশীলতা, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়। আর সবচেয়ে জরুরি ইতিবাচক মনোভাব- “আই কেন ডু ইট।”

আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল টোফেল পরীক্ষায় ভালো স্কোর পাওয়া। যেহেতু শিক্ষকতা করাই আমার লক্ষ্য ছিল তাই ভাষার দক্ষতা ছিল মূল চাবিকাঠি। দিনে ভর্তি হলাম ইংরেজি শিক্ষার স্কুলে, সন্ধ্যায় কম্পিউটার শেখার স্কুলে। আর খণ্ডকালীন কাজ সামলে রাতভর চলত টোফেল পরীক্ষার প্রস্তুতি। ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার, শোনার অনুশীলন, উচ্চারণ, লেখার দক্ষতা- সবই যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রের প্রশিক্ষণ ছিল। ইংরেজি শেখার ক্লাসে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের সাথে সখ্য হয়। কেউ রাশিয়া থেকে এসেছে, কেউ কলম্বিয়া, কেউ বা পোল্যান্ড থেকে। আমরা সবাই ছিলাম এক স্বপ্নযাত্রার যাত্রী। সবার ছিল একটি নতুন জীবনের আশা। ইংরেজি শিখতে গিয়ে ক্লাসে দেখা হয়েছিল এক অসাধারণ ভদ্র দম্পতির সঙ্গে- ভেরা ও তাঁর জীবনসঙ্গী। অবসর নিয়েছেন অনেক আগেই নিজেদের চাকরি জীবন থেকে। ইংরেজি শেখার স্কুলে তাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সাহায্য করেন নতুন অভিবাসীদের। তাঁদেরও একাকিত্বের ভার কাটে আর নবাগতদের উপকার হয়। তাঁদের কাজ ছিল নতুন অভিবাসীদের সঙ্গে সপ্তাহে কয়েকদিন আলাপচারিতায় বসে কথোপকথনের মাধ্যমে ইংরেজি শেখানো। কোনো বইয়ের ব্যাকরণ শেখাতেন না। শুরু করতেন এভাবে: ‘টেল মি আবাউট ইউর ডে।’ আর সেখান থেকেই শুরু হতো সহজ বাক্য, ভুলে ভরা উচ্চারণ, কখনো হাসি, কখনো হাতের ইশারা। তাঁরা শোনাতেন তাঁদের স্বাবলম্বী কন্যার গল্প, বাগানের গল্প, শীতের সকালে গরম কফির গল্প। আমি শোনাতাম নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথের কথা, বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের কথা, আর কানাডায় নতুন করে শিকড় ছড়ানোর চেষ্টার কথা। দিন গড়াতে গড়াতে আমার সঙ্গে সেই ভেরা দম্পতির বন্ধন হয়ে ওঠল আত্মীয়তার চেয়েও আপন।

একদিন হঠাৎ বললেন, “উড ইউ অ্যান্ড ইউর হাসব্যান্ড জয়েন আস ফর ডিনার দিস উইকএন্ড?”

সেটি ছিল কোনো কানাডীয় বাড়িতে আমাদের দ্বিতীয় সান্ধ্যভোজন। প্রথমটি ছিল শঙ্করের প্রফেসর ড. ট্রেভর স্মিথের বাড়িতে। ছোটো ছিমছাম গোছানো ভেরার বাড়িটিতে পেলাম শান্তির পরশ। আলট্রা মার্ট থেকে কেনা ফুলের তোড়াটি দেখে ভীষণ খুশি হলো, কিন্তু শুধু শুধু কেন পয়সা খরচ করেছি তাও বললো। এক টুকরো কানাডীয় শীতের সন্ধ্যায়, উষ্ণ ঘরের আলো, টেবিল ভর্তি খাবার, ভেরার বানানো অ্যাপল পাই আর গল্পের ভিতর দিয়ে বুঝেছিলাম কানাডায় নতুনদের অভিবাদন জানানোর কী চমৎকার রীতি। কঠিন পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এই দম্পতি। তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।

৪.

ভাষার প্রতিবন্ধকতা পেরোনোর পর নতুন চ্যালেঞ্জ নিলাম ড্রাইভিং শেখার। স্বাবলম্বী হতে হলে বিশেষ করে কানাডার মতো শীতপ্রধান দেশে এবং গোয়েল্ফের মতো কম জনবহুল শহরে যেখানে খুব ঘন ঘন বাস সার্ভিস নেই সেখানে ড্রাইভিং জানাটা আবশ্যক। একবার শীতের কবলে পড়ে বুঝেছিলাম ড্রাইভিং ছাড়া এখানে জীবন স্থবির ও অনিরাপদ।

জানুয়ারির সকাল। বরফ ঝরছে একটানা। সারারাত বরফ পড়ে রাস্তায় জমে আছে শুভ্র স্তূপ। নির্জনতা চারিদিকে। বাসা থেকে কয়েক মিনিটের তুষার ঢাকা পথ মাড়িয়ে কলেজ এভিনিও-এর বাস স্টপে দাঁড়িয়ে কাঁপছি। হাতের মোজার ভিতরে কাঁপছে আঙ্গুলগুলো কনকনে ঠান্ডায়, পায়ের বুটে বরফ ঢুকে মোজা ভিজে গেছে। সামনে দিয়ে চলেছে গাড়ি কিন্তু বাসের দেখা নেই। কষ্টের সময় না কি সবচেয়ে আপনজনের মুখই আগে মনে পড়ে। সেই মুহূর্তে বারবার মায়ের মুখটি ভেসে ওঠছিল চোখের সামনে। ঠিক তখন একটি গাড়ি এসে থামলো। জানালার কাচ নামিয়ে বের হলো এক মৃদু হাসি আর এক নারীকণ্ঠ: “ইউ লুক ফ্রোজেন সুইটহার্ট। গেট ইন দ্যা কার।” চেয়ে দেখি আমার ইংরেজি স্কুলের সহপাঠী বারবারা। পোল্যান্ড থেকে আসা মধ্যবয়সি বারবারার উষ্ণতা মাখা আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওঠলাম গাড়িতে। হিটারের উষ্ণতায় আঙুলে একটু প্রাণ ফিরে এলো। সে বললো, পোল্যান্ড থেকে দশ বছর আগে যখন সে আসে তখন তাঁরও গাড়ি ছিল না। শীতের দিনে তাঁকেও আমার মতো অনেকবার বাস স্টপে শীতে কুঁকড়ে যেতে হয়েছিল। দুই ভিন্ন দেশের দুই নারী কিন্তু দুজনের ভিতরে একই অনুভবের সেতুবন্ধন। ভাষা ভিন্ন, জাত ভিন্ন, দেশ ভিন্ন কিন্তু সহানুভূতির স্পর্শ যেন এক।

সেইদিনের সেই ঘটনায় ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জনের তাগিদ আরও বেড়ে গেল। ফোনবই খুঁজে খুঁজে বের করলাম ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টরদের নাম। প্রথমে জি-১ মানে লিখিত পরীক্ষা পাস করে অভিজ্ঞ ইন্সট্রাক্টর পিটারকে নিয়ে শুরু হলো ড্রাইভিং শেখা। জি-২ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দিনটি জীবনের আরেকটি ধাপ অতিক্রমের দিন- স্বাধীনতার পথে এক বিশাল অর্জন। পিটার বলতো গাড়ি সোজা রাখতে হলে গাড়ির সামনে তাকাবে না, দূরের রাস্তায় তাকাবে তাহলেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। আমি দূরে তাকাই, লক্ষ্যে পৌঁছতে।

৫.
এরই মধ্যে কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। মা হয়েছি। আমেরিকার ইলিনয়ের আরবানা শেম্পেইন ইউনিভার্সিটিতে শঙ্কর পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ করতে গেছে। আমিও গেলাম। পড়াতে শুরু করলাম মন্টেসরি স্কুল অব আরবানা শেম্পেইন-এ। সাথে সাথে নিজেকে তৈরি করতে লাগলাম স্ট্যেইটস টিচিং সার্টিফিকেটের পরীক্ষার জন্য কেননা, স্ট্যেইটস টিচিং সার্টিফিকেট ছাড়া সরকারি স্কুল বোর্ডে শিক্ষকতা করা যায় না। আরবানা শেম্পেইন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে চললো আমার পরীক্ষার প্রস্তুতি। পরীক্ষা দিলাম, অর্জন করলাম শিক্ষকতার সার্টিফিকেট। দু’বছর পর ফিরে এলাম কানাডায়।

আমেরিকার টিচিং সার্টিফিকেট কানাডায় গ্রহণযোগ্যতা পেলো না। কানাডায় শিক্ষকতা করতে হলে কানাডীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। আবেদন করার পর একসেপটেন্স লেটার এলো কয়েকটি ইউনিভার্সিটি থেকে- কুইন্স, ট্রেনট, ইয়র্ক এবং নিপিসিং। আবেদন প্রক্রিয়ায় দরকার হয়েছিল টোফেল স্কোর, পুলিশ রেকর্ড চেক এবং ব্যক্তিগত প্রবন্ধ- যেখানে লিখতে হয়েছিল কেন আমি শিক্ষক হতে চাই। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলাদেশের একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট যা মেজদা (প্রভাস চন্দ্র সাহা) বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়েছিলেন। মেজদার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ।

নিপিসিং ইউনিভার্সিটির সুলেক স্কুল অব এডুকেশনে এক বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, যা কি-না নর্থ বে শহরে অবস্থিত। নর্থ বে শহরটি অন্টারিও প্রদেশের উত্তরে যার তাপমাত্রা অন্টারিও প্রদেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেক কম এবং তুষারপাতও হয় অধিক। কখনো কখনো ৫০-৬০ সে.মি. বরফে আবৃত থাকে। আমরা তখন থাকি মিডল্যান্ড শহরে। ৩০০ কিলোমিটার দূরের নর্থ বে শহরে আমার একার জন্য বাসাভাড়া করি। সপ্তাহে পাঁচদিন সকাল ৯টার ক্লাস ধরতে আমাকে ভোরবেলা বেরোতে হতো মিডল্যান্ড থেকে। সেই রুক্ষ শীতের সকালে যখন সূর্যও মুখ তোলেনি, আমি বেরিয়ে পড়তাম গাড়ি নিয়ে। গন্তব্য নিপিসিং বিশ্ববিদ্যালয়। হাতে স্টিয়ারিং, মাথায় চিন্তা- আজকে ক্লাসে কী কী শিখবো, আর হৃদয়ে ছিল একটাই অনুপ্রেরণা- একদিন আমি হবো এই দেশের একজন স্কুল শিক্ষক। সারাদিন চলতো ক্লাস, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ ওয়ার্ক। কোনো কোনোদিন ক্লাস থাকতো রাত ১০টা পর্যন্ত। অন্টারিও কারিকুলামের সব সাবজেক্টক-সহ শিক্ষার্থীদের আচরণ বিশ্লেষণ, পাঠ পরিকল্পনা, মূল্যায়ন কৌশল, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা, ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট, এবং ট্যাকনোলজি ছিল এই প্রোগ্রামের মূল বিষয়। এর সঙ্গে ছিল প্র্যাকটিকাম- স্কুলে গিয়ে হাতে-কলমে শেখা।

অন্টারিও প্রদেশের বিভিন্ন শহর থেকে আসা সহপাঠীদের সবার সাথে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সখ্য হয়ে গিয়েছিল। আর তাই হয়তো এমন কঠিন কোর্স, প্রতিকূল আবহাওয়া, অচেনা পরিবেশ সব বাধা পেরিয়ে গ্রাজুয়েশনের দিনটিকে আহ্বান জানাতে পেরেছিলাম। একদিন রাত দশটায় ক্লাস শেষে পার্কিং লটে দেখি, গাড়ি বরফে ঢাকা। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে অসহায় হয়ে যখন ভাবছি, কী করবো? তখনই সহপাঠী রবার্ট আর ব্রায়ান এগিয়ে এসে বললো, “মানসী, তুমি শুধু গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ভিতরে বসো, আমরা পরিষ্কার করে দিচ্ছি।” সহপাঠীদের সহানুভূতিতে সেদিন কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। “ড্রাইভ সেইফলি” বলে ওরা বিদায় দিলো আর আমি ড্রাইভ করতে করতে ভাবলাম এদের জন্যই ভুপেন হাজারিকা লিখেছেন, “মানুষ মানুষের জন্য।”

পাঁচদিনের ক্লাস শেষে শুক্রবার রাতে ফিরে আসতাম স্বামী-সন্তানদের কাছে- আমার শান্তির নীড়, মিডল্যান্ডে। এই প্রোগ্রামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর ১৯ সপ্তাহের দীর্ঘ প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা, যেখানে ইউনিভার্সিটির পাঠ্য জ্ঞানকে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করার সুযোগ মিলেছিল। প্র্যাকটিকালটি সিমকো কাউন্টি ডিসট্রিক স্কুল বোর্ডের অধীনে করতে পেরেছিলাম। এতে মানসিক শান্তি ও পারিবারিক সহায়তাও পেয়েছিলাম অনেক। প্রতিদিন ক্লাসের পর নিজের বাড়ির চেনা উঠোনে ফিরতে পারার স্বস্তি, সন্তানদের মুখ দেখার আনন্দ আমাকে আরও বেশি মনোযোগী, আত্মবিশ্বাসী ও নিবেদিত করেছিল শিক্ষকতার পথকে ভালোবাসার।

বিশেষ সম্মান-সহ ডিগ্রি শেষ করে ঘরে ফিরলাম। এই পুরো যাত্রাপথে সবচেয়ে বড়ো শক্তি ছিল আমার স্বামী। শুধু জীবনসঙ্গী হিসেবে নন, একজন মেন্টর হিসেবে আমাকে গাইড করেছেন, দিয়েছেন অনুপ্রেরণা আর ভালোবাসার ছায়া। আমাদের ছোটো ছোটো সন্তান ভিক্টর আর প্রিন্স নিঃশব্দে মায়ের স্বপ্নে শামিল হয়েছিল। ওদের না বলা সহনশীলতাই ছিল আমার চালিকা শক্তি।

৬.

অন্টারিও কলেজ অব টিচার্স (ওসিটি)-এর সদস্যপত্রটি হাতে পেয়ে চোখে জল এসে গেল- এ কষ্টের কান্না ছিল না, ছিল গভীর ত্যাগ আর অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতিতে এক নীরব আনন্দাশ্রু। চাকরির জন্য আবেদন করলাম। প্রাথমিক সিলেকশানে উত্তীর্ণ হওয়ার পর যে তিনটি মূল ধাপ ছিল তা হলো- লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক প্রেজেন্টেশন এবং মৌখিক ইন্টারভিউ। সফলতার চাবি দিয়ে খুলতে পারলাম শিক্ষকতার দরোজা- একজন কানাডীয় শিক্ষক হিসেবে পেলাম চাকরির প্রস্তাব।

আজ আমি কানাডার একজন নিবন্ধিত শিক্ষক। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, শিক্ষকরা হলেন একটি সমাজ গড়ার কারিগর। কিন্তু এই পরিচয়ের পিছনে আছে দীর্ঘ অধ্যবসায়, পরিশ্রম আর ত্যাগ। প্রবাসে দাঁড়িয়ে যখন আমি একজন শিক্ষকের ভূমিকা পালন করি, তখন আমি একটি সেতুবন্ধন তৈরি করি- শেকড়ের সাথে নতুনের। বাংলাদেশ আমাকে শেকড় দিয়েছে, কানাডা দিয়েছে ডানা। আমি যখন এই দুটো পরিচয় নিয়ে ক্লাসরুমে দাঁড়াই তখন শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারি কীভাবে অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় আসতে হয়। এই যাত্রা আমার একার নয়, এই যাত্রার চিত্রপটে আছে হাজারো অভিবাসী নারীর প্রতিচ্ছবি। আমার এই জীবনসংগ্রামের গল্প যদি একটিমাত্র হৃদয়েও অনুপ্রেরণার ঢেউ তোলে তবেই বুঝবো আমার কলম সার্থক, আমার যাত্রা ধন্য।

লেখক পরিচিতি
কানাডার কিংস্টনবাসী লেখক, শিক্ষক, সংগঠক ও সঞ্চালক। বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব কানাডা’র সচিব। কানাডার ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব অথরস (টিফা)-তে ২০২০ সালে অনুবাদ সাহিত্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘হৃদয়ে জাগে একাত্তর: ভাটি বাংলায় গণহত্যা’। গ্রিস-ভিত্তিক সারা বিশ্বের কবি সাহিত্যিকদের সংগঠন রাইটার্স ক্যাপিটাল ফাউন্ডেশন কর্তৃক ২০২৩ সালে প্যানোরামা আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত।