আমার নাট্যজীবন

হাবিবুল্লাহ দুলাল

আমি হাবিব দুলাল। চট্টগ্রামের এক নিভৃত পল্লীগ্রামে আমার জন্ম। লেখাপড়া শিক্ষা এবং বেড়ে ওঠেছি চট্টগ্রামে। বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। স্কুল জীবন থেকেই মঞ্চে আমার অগ্রজদের যাত্রা নাটক ইত্যাদি দেখে আমার মনে ভীষণ বাসনা হতো। আমিও মঞ্চে অভিনয় করবো। যদিও তখন আমি অভিনয়ের ক-খ কিছুই বুঝি না বা জানিও না। অবশ্য এখনো জানি না। আমি বিশাল সমুদ্রের তীরে নাটকের নুড়ি কুড়োচ্ছি মাত্র। তখন আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁদের অভিনয় উপভোগ করতাম শুধু। কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারে জন্মের কারণে সংস্কৃতি চর্চা নিষেধ না থাকলেও তেমন বাধাও ছিল না কোনো সময়। তাই আমি থেমে থাকিনি। তবে নাটকের ভূত বরাবরই মাথায় ঘুরপাক খেতো।

সেই থেকেই ১৯৭১-৭২ সালে চট্টগ্রামে আমরা নাট্যপ্রেমি কিছু তরুণ তরুণী নাটকের কাজ শুরু করলাম। সাংস্কৃতিক অঙ্গণে আমার পদযাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রামের পূরবী ললিতকলা একাডেমি নামক একটি সংগঠনের মাধ্যমে। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা নয়জন ছিলাম। তার মধ্যে এখন আমরা বেঁচে আছি মাত্র চারজন। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধস্নাত বাংলাদেশে নাটকের জোয়ার চলছিল। ভালো নাটক চাই। মৌলিক নাটক। বক্তব্যনিষ্ঠ নাটক। সময়োপযোগী নাটক চাই। নিয়মিত পাদপ্রদীপের সম্মুখে দাঁড়াতে চাই। সাথে ছিলেন আমার তৎকালীন তরুণ শিল্পী বন্ধু সৈয়দ ইকবাল। যিনি এখন টরন্টো শহরেই সপরিবার বাস করছেন। তিনিই আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করে আসছেন। গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই বন্ধু ইকবালকে। কিন্তু আমাদের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ও দেশীয় নাটক খুঁজে না পেয়ে আমরা নিজেদেরই লেখা প্রথম নাটক ‘জননীর মৃত্যু চাই’ নাটকটি নিয়ে মঞ্চে যাত্রা শুরু করলাম। রচনা এবং নাট্যরূপ দিয়েছেন প্রখ্যাত নাট্যকার বন্ধু রবিউল আলম। আমি ছিলাম এখনো আছি নিবেদিত নেপথ্যকর্মী। ভীষণ উপভোগ করতাম। ধীরে ধীরে নাটকের মোহে আচ্ছন্ন হলাম।

বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও আমার নেশা এবং আকর্ষণ ছিল মঞ্চ নাটকের প্রতি। তখন নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে নাটক করতাম। এরপর বেশ কিছু নাটক মঞ্চায়ন করলাম। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর অনেক জল গড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে নিমজ্জিত হলো। জল যেমন থামে না, আমিও থামিনি।

পেশাগত কারণে একসময় দেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিলাম। মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে কাতার স্টিল কোম্পানিতে সংক্ষেপে (QASCO) নতুন করে কর্মজীবন শুরু হলো। সেখানে দীর্ঘ ১২ বছর সপরিবারে কাটালাম। সেখানে স্থানীয় সরকারি বিধি নিষেধের ভিতরেও সীমিত পরিসরে আমরা মঞ্চে পরিবেশন করতে সক্ষম হলাম নাট্যকার বন্ধু রবিউল আলম লিখিত ‘এক যে ছিল দুই হুজুর’ নাটকটি। প্রচুর দর্শক সমাগম ঘটে। দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালিই আমার সাফল্যের অন্যতম একটি প্রেরণা।

নাটক আমার ধ্যান। কাতার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ আরব সাগরের একটি উপদ্বীপ। যার জনসংখ্যা মাত্র ২.৭ মিলিয়ন। তার মধ্যে বিভিন্ন পেশায় জড়িত বাংলাদেশি ছিলেন প্রায় ৪০ হাজার। ইতোমধ্যে আমার সংসার জীবন শুরু হলো। সংসারে আমার স্ত্রী রেখার গর্ভে তিনটি সন্তান এলো। সুখে শান্তিতেই কাটছিল আমাদের পাঁচ জনের জীবন। তিনজনেরই নাম রেখেছি বাংলায়। শাওন, শাজন আর রাজন।

এই দীর্ঘ ১২ বছর চাকরির সময় প্রায়ই ভাবতাম- এই দেশে কোনো বিদেশিকে এরা স্থায়ী নাগরিকের মর্যাদা দেবে না। তাই একসময় সেখানকার পাঠ চুকিয়ে অভিবাসীদের জন্য উদার দেশ কানাডায় পাড়ি দিলাম ইমিগ্রেশন নিয়ে।

কানাডায় এসে নাটকের সেই ভাবনায় আবার নাট্য জীবন শুরু করলাম। শুরুতে নাট্যচর্চা তেমন কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার নাট্য জগৎ বিকাশলাভ করতে লাগলো। আমি ক্রমশ প্রাণ পাচ্ছি। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। বেশ কিছু নাট্যকর্মীর আবির্ভাব হতে লাগলো। বেশ কিছু উৎসাহী তরুণের সমন্বয়ে আমরা গঠন করলাম Bangladesh Theatre Toronto (BTT)। এর ভেতরে অনেক ইতিহাস রয়েছে। কোনো এক সময়ে বিশদ আলোচনা করা যাবে।

যাহোক, টরন্টো শহরের মূল ধারার নাট্যজগতের সাথে আমরা (BTT) সম্পৃক্ত হয়েছি। আমরা Daniels Spectrum, Toronto, North York Performing Art Centre: (NYPAC, Fairview Library Theatre-এ বাংলা নাটককে স্থান দিতে পেরেছি।

এ-যাবৎ আমরা ছোটো বড়ো আর পথ নাটক মিলিয়ে আনুমানিক ডজনখানেক পূর্ণাঙ্গ নাটক টরন্টোবাসীকে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছি। এটি আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস হলেও বিশাল অর্জন। আমাদের এই অর্জনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আপনাদের আর আমার সতীর্থ নাট্যপ্রেমি ইকবাল আনোয়ার, কামাল, রেখা, মুন্নি, সৈয়দা ডিভা আনোয়ার, বাবু, হায়দার, রোমান চৌধুরী, নুরুল আবছার, শরিফ আহমেদ, ইতি, আমিন, সৈয়দ ইকবাল। এবং প্রয়াত আবদুল জব্বার। দর্শকদের সহযোগিতা উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় আমরা যৎসামান্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি ভবিষ্যতেও আপনাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ থিয়েটার টরন্টোর সদস্যবৃন্দের তালিকা- ইকবাল আনোয়ার, ডিবা আনোয়ার বাবু, ইলিয়াছ রহমান, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কামাল, নুর আফরোজ মুন্নি, হাবিব উল্লাহ দুলাল, রেখা হাবিব উল্লাহ, আজাদ, নুরুল আবছার শরিফ, রাশেদা আবছার নাইনু, শওকত হোসেন, সেলিনা হোসেন, শফিকুর ইসলাম, আফরোজা পারভিন, মোহাম্মদ হাসান টিটু, মাহবুব আলম মিশু, রোমান আহমদ চৌধুরী, পারভিন ফেরদৌস, মাহবুবুল হক খোকন, প্রণবেশ পোদ্দার, রনি পালমার, আজাদ, টপি সাহা, সমীর রায়, হাসান মাহমুদ, আরিফুল হক, সৈয়দ ইকবাল, মামুন খান, আলবেলিয়া ফ্লোরা, তিষা কাওসার, অনন্যা চৌধুরী, মঈন আহসান, কাজী রিফাত হোসেন, হিমেল দাস, তিথি, রেবা আহমেদ, শিমুল সাহা, সোমা হাওলাদার, তিসা, তাসনীম আহমেদ অর্নি, শ্রেয়া সাহা, মঈন দেলোয়ার, ফাহমিদা ইসলাম, সপ্তর্ষি সাহা, আবদুল্লাহ, মিথুন রেজা, ইত্তেলা উমামা, মোস্তফা হক, আনিনা তাহিন নেভিলা, রিনি সাখাওয়াত, ইত্তেজা আহমেদ টিপু, শোয়েব চৌধুরী, মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, অনুপ সেনগুপ্ত, তানভী হক, গোলাম মহীউদ্দিন, হিমাদ্রি রয়, নুসরাত জাহান শাওলী, এলিনা মিতা, ক্রিস্টোফার ক্যারী, ম্যাক আজাদ, নাজিয়া হক, সাকিফ খন্দকার, আমির সুমন, ইকবাল হাসান রিপন, মাহমুদা কাওসার, তিশা প্রমুখ।

২.
এখন কিছুটা আমার পরিবার সম্পর্কে বলি। তা না-হলে আমার কথাগুলো অপূর্ণ থেকে যাবে। শুরু থেকেই আমার স্ত্রী রেখা এবং আমার সন্তানরা আমাকে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করে গেছেন। কোনো সময়ই তাঁরা এতটুকুও অনীহা প্রকাশ করেননি। আমি তাঁদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

কিন্তু হঠাৎ করে ছন্দপতন হলো। গত দু’বছর আগে আমার স্ত্রী আমার সন্তানদেরকে আর আমাকে নিঃস্ব করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। তিনি এখন পিকারিং-এ শান্তির নিদ্রা যাপন করছেন। আমাদের সব কর্মকা-ই তিনি পরপার থেকে প্রত্যক্ষ করছেন।

এটি আমার জীবনের অত্যন্ত মর্মস্পর্শী অধ্যায়। রেখা ছিলেন আমার জীবনের চালিকাশক্তি। তাই এই বিষয়ে আর না এগোনোই শ্রেয়। এ কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। আমাকে ক্ষমা করুন।
মঞ্চের জয় হোক। নাটকের জয় হোক।

লেখক পরিচিতি
আদি নিবাস চট্টগ্রাম। বর্তমান বয়স ৭৬ বছর। কর্মসূত্রে জাপান ও কাতারে ছিলেন। ১৯৯২ সালে কানাডায় আগমন। স্ত্রীর রেখা প্রয়াত হয়েছেন। তিন সন্তানের জনক। নিজেকে নাট্যকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।