আমার শিল্পযাত্রা

রওশন আরা বেগম

প্রতিটি মানুষের একটা গন্তব্য থাকে। আর এই গন্তব্যটি তৈরি হয়ে থাকে চারপাশের পরিবেশ দ্বারা। অনেক সময় দেখা যায় যে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর প্রধান কারণ হয়তো সে নিজেই অথবা আশেপাশের মানুষের প্রভাবে সঠিক গন্তব্যের থেকে বিচ্যুতি হয়ে থাকে। যেসময় যেটি দরকার সেই সময় মতো সেটি করতে হয়, এই ধারণাটি সবার ক্ষেত্রে সত্য না-ও হতে পারে। এই কানাডাতে এসে দেখতে পেলাম মানুষ যখন পেশাগত কাজ শেষ করে মানে অবসর নেয়, তারপরেই শুরু করে দেয় তার শখের কাজটি করতে। এই শখের কাজটি হতে পারে মানব উন্নয়নমূলক কোনো কাজ। এই শখের কাজটি হতে পারে কোনো নিজস্ব কোনো ক্রিয়েটিভিটি কাজে নিযুক্ত হওয়া। এই শখের কাজটি হতে পারে ছোটোকালের ভালোলাগার কোনো কাজ। এই শখের কাজটি হতে পারে নিজের পছন্দমাফিক কোনো কাজ। অনেকের কাছে মনে হতে পারে এই অবেলায় এসে কেন এই কাজটা করা হচ্ছে। যখন যা ভালো লাগে তখন তা করে ফেলার চেষ্টাটা ভালো কিন্তু সবার জন্য তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

কানাডিয়ান কালচারে দেখা যাচ্ছে অবেলা বলে কিছু নেই। কাজ কাজই। যেকোনো সময় এটি শুরু করা যেতে পারে। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স থাকা লাগবে বলে সেটি বেঁধে দেওয়া নেই। আমি কাজটি শুরু করেছিলাম ২০১৮ সালের শেষ দিকে। কাজটি হলো চিত্রকলার উপর ভালোলাগার থেকে ছবি অঙ্কন করা। আমি ভর্তি হয়ে যাই ৩-৪ মাসের একটি শর্ট কোর্সে, যেখানে শিল্পকলার নানা মিডিয়ার সম্পর্কে ভাসাভাসা কিছুটা জ্ঞান দেওয়া হয়, তবে আমার মনে পড়ে- ক্লাস করার আগেই কানাডিয়ান বিখ্যাত শিল্পীর বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলাম এক্রেলিক মিডিয়ায়। এই আর্টগুলো সবকয়টাই ছিল গ্রুপ অব সেভেন আর্ট। প্রথমেই কানাডিয়ান আর্ট সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। জল কালারের ওপর বেশি কাজ সেখানে করানো হয়েছিল। তার আগেই আমি সব বিখ্যাত বিখ্যাত ছবিগুলো এক্রেলিক ও জল মিডিয়ায় কাজ করে বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করতে থাকি। এই কাজগুলো দেখে অনেকেই মুগ্ধ হয়ে আমার বন্ধু তালিকায় যুক্ত হয়।

আমার মনে পড়ে, আমি যে ছবিটি দেখতাম হুবহু সেটি আঁকতে পারতাম। তবে প্রথমে এঁকেছি এক্রিলিক মিডিয়ায়। ইউটিউবে কিছু কাজ দেখতাম। তারপর আমি চলে যাই টরন্টো এভিনু রোডের আর্ট স্কুলে। সেখানে কিছু আর্টের কাজ করানো হতো। এটি ছিল চার মাসের কোর্স। এখানে আমার আঁকা ছবিগুলো দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যেতো, তখন টিচার স্বয়ং আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন আমি কোথার থেকে এই কাজগুলো শিখেছি। একজন শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, তুমি যে নিজেই দেখছি থমসন হয়ে বসে গেছো। টম থমসন একজন বিখ্যাত কানাডিয়ান চিত্রশিল্পী। তার বেশ কিছু ছবি আমি এঁকেছিলাম। খুব অল্প বয়সেই এই শিল্পীর মৃত্যু হয়। বলা হয়ে থাকে, তাকে কেউ হত্যা করেছিল। তার মৃত্যু নিয়ে যে রহস্যের জাল তৈরি হয়ে আছে, তা আজও অমীমাংসিত। লোকাল লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বই এনে অনেক পড়াশোনা করি। এইভাবে কানাডিয়ান চিত্রশিল্প সম্পর্কে জ্ঞান নেওয়ার চেষ্টা করি। গ্রুপ অব সেভেন আর্ট দেখে আমি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, আমি একটার পর একটা এই ছবি কপি করতে থাকি। তখনও আমি জানতাম না যে, বিখ্যাত কোনো শিল্পী ছবি আঁকা চর্চার জন্য ভালো হলেও এর কোনো ভ্যালু নেই। ছুটে যাই ম্যাকমাইকেল কানাডিয়ান আর্ট গ্যালারিতে। একবার গিয়ে থেমে থাকিনি, বারবার গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই গ্রুপ অব সেভেন আর্ট। কানাডিয়ান বিখ্যাত সব শিল্পীর আর্টকে দেখে এতটা বিমুগ্ধ হয়ে যাই যে, একটার পর একটা তাদের অনেকের ছবি আঁকতে থাকি। আমার মনে পড়ে, আমি শুধু গ্রুপ অব সেভেন আর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলাম না। আমি ইটালি ফ্রান্সের রেনেসাঁ পর্বের শিল্পীদের নানা ছবি এঁকে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলাম।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত কয়েকটি ছবি আমি এঁকেছিলাম। প্রথম যে ছবিটি কানাডা ও আমেরিকান আর্ট গ্রুপে পোস্ট করে শিল্পী মহলে আমার পরিচিতি আসে সেটি হলো Girl with a pearl earring। শিল্পীর নাম Johanner Vermeer। এটি একটি পৃথিবী বিখ্যাত ছবি। আমি সেটি জল রং দিয়ে করি। মূল ছবিটি ওয়েল মিডিয়ায় করা। শত শত বিখ্যাত সব শিল্পীরা আমার নানা প্রশ্ন করতে থাকে। আমার সেই ছবিটি প্রথম ভাইরাল হয় সোশাল মিডিয়ায়। কিছু কিছু ছবি বিভিন্ন আর্ট গ্রুপে পোস্ট করে ভাইরাল হয়েছিল। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন আমি কোন ব্রান্ডের রং ব্যবহার করেছি, কোন ব্রাশ ব্যবহার করেছি এবং কোথা থেকে পড়াশোনা করেছি… ইত্যাদি। যারা আমাকে নানা প্রশ্ন করতেন তারা অনেকেই আমেরিকা কিংবা কানাডার আর্ট স্কুল বা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত, যেটি আমার জানা ছিল না। এইভাবেই আমি নর্থ আমেরিকার বিভিন্ন শিল্পী মহলে পরিচিতি পাই। আমি যখন ওয়াটার কালারের ওপর প্রথম একটি ছবি তৈরি করি, তওখন কেউ বিশ্বাস করেনি যে, এটি আমার প্রথম ছবি ওয়াটার কালার মিডিয়ার পর। কেন যেন এটি ম্যাজিকের মতো হয়ে গেছে আমার হাতে এসে। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত অনেক শিল্পী আমার ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় চলে আসে। এদের মধ্যে Jack Faragasso সবচেয়ে সিনিয়ার একজন বিখ্যাত আমেরিকান আর্টিস্ট। তিনি নিউইয়র্কের আর্ট কলেজের অবসরপ্রাপ্ত ইমেরিটাস প্রফেসর। পেন্টিং নিয়ে তার লেখা বই রয়েছে। আমেরিকান এই বিখ্যাত শিল্পী আমার সঙ্গে যুক্ত হন। আমি কীভাবে শিল্পের নানা মিডিয়ায় কাজ করছি, তা তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলছেন। আমার শিল্পকর্ম নিয়ে জ্যাক মাঝে মাঝে মন্তব্য করে থাকেন এবং শিল্প সম্পর্কে নানা মেসেজ দেন। Tabatha Devis Phillips আমেরিকান একজন আর্টিস্ট যার অনেক ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়। তিনিও আমার ভালো একজন বন্ধুও। শিল্পের নানা বিষয়ে আমার সঙ্গে আলাপ হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এইভাবেই যারা আমার ছবি দেখেন এবং নানা বিষয় তথ্য দিয়ে থাকেন। ইংল্যান্ডের এক বিখ্যাত আর্ট বোদ্ধা Brian Galway চমৎকার একজন আর্ট ক্রিটিক। আর্টের ওপর তার জ্ঞান এত বেশি যা দেখে আমি চমকে যাই। তিনি আমার আর্টের মহাভক্ত। সব সময় আমাকে ফলো করে থাকেন। আমার আঁকা প্রায় প্রতিটি ছবি নিয়ে তার কোনো না কোনো বক্তব্য থাকবেই। তার নেশাই হলো আর্ট সম্পর্কে জ্ঞান নেওয়া। চমৎকার একজন মানুষ। Paul Birchak-ও আমেরিকান একজন বিখ্যাত শিল্পী। অনলাইনে আমি তার ক্লাসে কয়েক মাস ক্লাসও করেছি। ওয়েল ও প্যাস্টেল মিডিয়ার ওপর তার কাজ রয়েছে। তিনিও আমার ভালো একজন বন্ধু।

কানাডার অনেক শিল্পীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ তৈরি হয় বিভিন্ন আর্ট গ্রুপের মেম্বার হবার ফলে। তাছাড়া আমার বেশ কিছু আর্ট অনলাইনে ভাইরাল হবার ফলে কানাডার অনেক বড়ো বড়ো শিল্পীরা আমার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। প্রথমে আমি টরন্টোর FCA মেম্বার হই। এরপরে আমি ওন্টারিও আর্ট গ্রুপের মেম্বার হই। এরপরে আমি ইটোবিকোক আর্ট গ্রুপের মেম্বার হই। তাছাড়া অনলাইনে সম্ভবত ১০-১২টি আর্ট গ্রুপের মেম্বার যেখানে আমি আমার কাজগুলো প্রায় দিয়ে থাকি। এভাবে আমি কানাডার বিভিন্ন প্রভিন্সের শিল্পীদের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়ি। কানাডার শিল্পীদের মধ্যে Tracy Root-এর কাজ আমার খুব ভালো লাগে। তিনিও আমার কাজকে অনেক পছন্দ করেন। আমাকে তিনি নানাভাবে সাহায্যও করেন। আমার আরেকজন মনট্রিলবাসি সাংবাদিক বন্ধু Bonnie Wurst আমার শিল্পকর্মের ওপর কাজ করতে চান। এই সাংবাদিক আমার সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন আমার কাজকে খুব ভালোবাসে।

আমার শিল্পী বন্ধুরা প্রায় আমাকে প্রশ্ন করতেন এবং এখনও করে যে আমি কীভাবে এই ছবিগুলো এত দ্রুত আঁকছি এবং বিভিন্ন আর্ট গ্রুপে দিয়ে চলছি। তারা নাকি সেখানে ছবি দিতে ভয় পান। কারণ বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীরা ছবিগুলো দেখে এবং আরো ভয় পান ছবিটা হয়তো এপ্রুভ হবে না। ভয় লাগে, কারণ, এই গ্রুপে সব বড়ো বড়ো আর্টিস্টরা থাকে, যারা আমার ছবিকে এলাও করবে না সবার সামনে তুলে ধরতে। এটি শুনে আমি অবাক। আমি তো প্রতিদিন কিছু না কিছু ছবি বিভিন্ন আর্ট গ্রুপে পোস্ট করি, যে গ্রুপগুলোতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শিল্পীরা তাদের নিজস্ব ছবি পোস্ট করে থাকে। এভাবেই আমার যাত্রা চলতে থাকে। এরপর অনেকদিন হয়ে যায় ভাবতে থাকি কীভাবে ছবিগুলো নিয়ে একটি এক্সিবিশনের আয়োজন করা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার নানা আর্ট গ্রুপের মেম্বার সুবাদে এক্সিবিশনের সুযোগও তৈরি হয়ে যায়। ইটোবিকক সিভিক সেন্টারে আমার লাস্ট এক্সিবিশনটা হয়ে গেল এ বছরই। কমপক্ষে ৭০ জন কানাডিয়ান আর্টিস্ট এই এক্সিবিশনে সিলেক্টটেড হয়। এর মধ্যে আমি একজন। যাইহোক শিল্পের নানা অলিগলিতে ঘুরে চলছি, শিল্পকে ভালোবেসে। কিছু কিছু জিনিস আমার কাছে অবাক লেগেছে তা হলো, বাঙালি হয়ে আমার শিল্পকর্ম বাঙালি কমিউনিটিতে প্রদর্শিত হতে পারিনি। এর কারণ কী, জানি না। চেষ্টা যে করিনি, তা নয়। হয় তো আমাদের নিজেদেরই কোনো ঘাটতি রয়েছে।

এখন যে জিনিসটি বলতে চাই, আমি আসলে সব মিডিয়াই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, যেটি শিল্পীদের ক্ষেত্রে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জের বিষয়। আমাকে কেউ যদি শুধু ওয়াটার কালারের ওপর কাজ করতে বলে, তাহলে আমি ঠিক প্রফেশনাল একজন ওয়াটার কালার মিডিয়ার শিল্পীর মতোই কাজ করতে পারি। ঠিক তেমনি একই শিল্প যখন আমাকে বলা হয় অয়েল মিডিয়াতে করতে, ঠিক তেমনি একজন প্রফেশনাল আর্টিস্টের মতোই আমি অয়েল কালারের মাধ্যমে ছবিটি আনতে পারি। তেমনি এক্রেলিক মিডিয়াতেও সমানভাবেই স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারি। এটি অনেক শিল্পীরাই পারেন না। জানি না কেন পারেন না। তেমনি চারকোল পেন্সিল যেটাই বলা হোক না কেন, চমৎকার ফুটে ওঠে নানা আবেগ অনুভূতি। সব মিডিয়াতে কাজ করা অনেকের জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জের বিষয়। এটা হয়তো আমার ভালোলাগা থেকে হয়েছে। যে মিডিয়াতেই কাজ করতে গেছি সেই মিডিয়ারই প্রেমে পড়েছি। সেখান থেকে বের হতে বেশ সময় লেগেছে। তবে প্রথম শুরু করেছিলাম অ্যাক্রিলিক মিডিয়ার মাধ্যমে এবং গ্রুপ অব সেভেন আর্টের প্রেমে পড়ে। একটার পর একটা অসংখ্য ছবি এঁকেছি যা আমার প্রথম দিকের ছবি গ্রুপ অব সেভেন আর্ট।

বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে এই সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে। মিডিয়া এখন মানুষের হাতের মধ্যে চলে এসেছে আর ক্রিয়েশনের মাধ্যমে ওঠে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন শিল্পী। প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে যে একজন শিল্পী হওয়া যায়, তা কানাডার ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, তবে আমার মনে হয় আমাদের বাঙালি সমাজে এটি একটি নতুন একেবারেই নতুন। যখন আমি প্রথমে ক্লাসে যাই, ভেবেছিলাম আমি হয়তো ৪৫ বছর বয়সের এক বয়স্ক নারী যে কিনা এই বয়সে এসে শিল্পী হতে চেয়েছি। কিন্তু দেখা গেল যে, আমার থেকে ১০-২০ বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অনেকেই শিল্পচর্চার জন্য ওঠে পড়ে লেগেছে। তাদের মধ্যে বরং আমি একজন জুনিয়র।

টরন্টোর অলিতে-গলিতে যেখানেই আর্ট এক্সিবিশন হতো, সেখানেই আমি ছুটে যেতাম। যেটি এখনও চালিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয় টরন্টোর এমন কোনো আর গ্যালারি নেই যেখানে আমার যাওয়া হয়নি। ছবি আঁকতে গিয়ে মনে হয় সেই ছবির প্রেমে পড়া লাগে। এটি আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে। ছবি আঁকার পিছনে আরেকটি জিনিস বেশ কাজ করেছে, সেটি হলো টরন্টোর নানা পার্ক। বাসার পাশেই রয়েছে সেন্টেনিয়াল পার্ক। এই পার্ক থেকে নানা ভিউ তুলে নিয়ে ক্যানভাসে তুলেছি অসংখ্য বার। আস্তে আস্তে কানাডিয়ান গ্রুপ অব সেভেন আর্ট থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব ধারায় নিজস্ব চিত্রকর্ম আবিষ্কার করেছি। এতে কানাডার মূলধারার চিত্রকলার সাথে কিছুটা মিল থাকলেও থাকতে পারে। এখন আমি বড়ো ক্যানভাসের ওপর বেশ কয়েকটি কাজে হাত দিয়েছি যে কাজটি শেষ করতে হয়তো কয়েক বছর কেটে যাবে।

মনের মধ্যে নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদে ভালোলাগা জিনিসের কাছে ছুটে গেছি। কানাডার মূলধারার শিল্পকর্ম নিয়ে মেতে থাকি বেশ কয়েক বছর। গ্রুপ অব সেভেন আর্ট আসলে থিওসোপিকাল আর্ট। এখানে দেখা যায় সাবজেক্ট মেটার প্রাধান্য পায় না। হিন্দুইজম এবং বুদ্ধইজমের স্পিরিচুয়াল ভাবনার সমাবেশ থেকে এই থিওসোপিকাল আর্টের আবিষ্কার। এখানে আর্টে দেখা যাচ্ছে যে, একটি ড্রিমি জগতের বিচরণ। এই ছবিগুলো দেখলে মনে হবে, কী অদ্ভুত ড্রিমি জগতে বিচরণ করে চলছি! রঙের কারুকার্য এমনই একটি অদ্ভুত জগতে বিচরণ করে একটি ইউনিভার্সেল সত্যের সন্ধানের দিকে নিয়ে যায়, যেটি বর্ণনাতীত ভাবনার থেকে বেরিয়ে অনুভূতির জগতে বিচরণ করতে শেখায়। কেউ যদি বলেন, আমি ছবির কিছু বুঝি না, তা সত্য না। একটি ছবি দেখলে কেমন জানি মনে হয়- এই অনুভূতিটাই আপনাকে বুঝিয়ে দেয় যে, আপনি শিল্প বোঝেন। এটি গ্রুপ অব সেভেনের আর্ট দেখে আমি বুঝেছি। তবে শিল্পের নানা ধরন রয়েছে। কোনো কোনো শিল্পের সাবজেক্ট ম্যাটার অনেক বড়ো। সাবজেক্ট ম্যাটার প্রাধান্য শিল্পকর্ম নিয়ে বেশি কাজ করেছেন পাবলো পিকাসো। সুরেলিস্টিক নিয়ে বেশি কাজ করেছেন সালভেদর দালি।

শিল্পীরা প্রচণ্ড সংবেদনশীল। এই সংবেদনশীলতাই তাকে এক সময় শিল্পের দিকে নিয়ে যায়। আমার মনে পড়ে, আমার আম্মা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ ছিলেন। আমি বলবো, তিনি ছিলেন ন্যাচেরাল ট্যালেন্টের একজন মানুষ। তিনি গান শুনতে শুনতে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সেই গান তুলে আনতে পারতেন নিজের কণ্ঠে নিজস্ব আবেগ দিয়ে। অথচ এই মানুষটির এই প্রতিভাটি চাপা পড়ে যায় সংসারের বেড়াজালে। আমার মায়ের মেধা আমি পরিমাপ করতে চাই না। কারণ, কোনোদিনও তা প্রকাশিত হয়নি কারোর কাছে। কিন্তু আমি তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছিলাম জীবনের শেষ প্রান্তে এসে। একটি কবিতার বই তার মাথার মধ্যে গেঁথে ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত; তা-হলো কবি জসিম উদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’। আর কিছু গান ও কবিতা। নজরুলগীতি তার কণ্ঠে দারুণভাবে ফুটে ওঠতো। এই সবটার কোনোটাই কোনোদিনও সামনে আসতে পারেনি, আলোর মুখ দেখতে পারেনি। অনেকগুলো ছেলে-মেয়ের জন্মদাত্রী এই মাকে আমি স্মরণ করি মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, শুধু অজ্ঞতার কারণে অবহেলার কারণে আমার মা’র মতো একজন বড়ো শিল্পীকে হারিয়ে ফেলেছি। সারা জীবন পরিশ্রম করে গেছেন ছেলেমেয়ের জন্য। কিন্তু নিজের দিকে ফিরেও তাকাননি। নিজের কোনো পরিচয় রেখে যেতে পারেননি, এত বড়ো প্রতিভাধর মানুষ হয়েও। এই ব্যর্থতা আমাদের সবার।

আমাদের সমাজে অসংখ্য প্রতিভাবান মেয়েরা ঝরে যায় সংসারের নানা চাপে যা আমি দেখে গেলাম আমার মাকে দিয়ে। আমি শুধু মধ্যবয়সে এসে ঘুরে দাঁড়িয়েছি সংগ্রাম করে। এখনো সেই চেষ্টা চলছে; এই ২৬ বছরের প্রবাস জীবনে শুধুই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি তা নয়। আমার মনে পড়ে, আমার বাসনা জেগেছিল ছয়-সাত বছর আগে। আমি শিল্পী হবো তবে সেই শিল্পকর্ম যেন আমাকে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে যেন না হয়। এই ভাবনার থেকে ওঠে পড়ে লেগেছিলাম নিজের খরচেই শিল্পের চর্চার পিছনে। এজন্য আমি পাশাপাশি আরেকটি জব করি, যে জবটি আমার সংসার এবং আমার এই শিল্পের পিছনের খরচটি বহন করে থাকে। প্রচুর অর্ডার পাই এখন কিন্তু অর্ডারের কোনো কাজ করতে আমার ভালো লাগে না। বিশেষ করে বাজার চাহিদা রয়েছে পোর্টেটের ওপর। শিল্পের মূল ধারার কাছে বাজার চাহিদা শূন্য। এই শূন্য থেকে আবিষ্কার হয়ে যায় ভ্যান গগ। আবিষ্কার হয়ে যায় বলা যাবে না, আবিষ্কার করা লাগে। একজন শিল্পীর শিল্পকর্মকে আবিষ্কার করে তুলে আনতে হয় সভ্যতার জন্য। যে সমাজ এই মানুষগুলোকে তুলে আনতে পারে সেই সমাজ তত উন্নত। শিল্পীর চেতনা বোধ শিল্পে থাকে, তার কাজে থাকে, তার ভাবনায় থাকে। এই ভাবনাগুলোই সমাজ উন্নয়নের জন্য মানব উন্নয়নের জন্য একটা বড়ো মাইলফলক। ভ্যান গগের প্রদর্শনীতে গিয়ে আমি অঝোরে কেঁদেছি। আমার কেন জানি মনে হয় দুঃখ-কষ্ট এগুলো না থাকলে এই সৃষ্টি থাকত না। কোনো একটা দুঃখ বড়ো কোনো সৃষ্টির কারণ হয়ে যায়। শিল্পীর জন্য এটি খুব ভয়াবহ সত্য।

লেখক পরিচিতি
জন্ম বাংলাদেশের খুলনায়, ১৯৭৩ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স শেষ করে বিয়ে করে চলে আসেন কানাডার টরন্টোতে- ১৯৯৮ সালে। প্রথমে চেষ্টা করেন নার্স হবার। ভর্তি হন হাই স্কুলে। এরপরে সংসারের হাল ধরার জন্য শর্ট কোস করে হোম ডে কেয়ার করেন। ২০১৮ সালের শেষের দিকে ঝুঁকে পড়েন আর্টের দিকে।