উৎসব আনন্দে আমাদের অভিবাসী যাপিত জীবন
দুই দশকের বেশি সময় আছি টরন্টো শহরে। চাকরি ছেড়ে ভালোবাসার সঙ্গিনীকে নিয়ে চারটি সুটকেস আর স্বল্প কিছু অর্থ নিয়ে স্বপ্নহীন পাড়ি জমাই টরন্টো নগরীতে। এখানে এসে নিজের দর্শনে বিশ্বাসী বলে স্বপ্ন বুনি নয়ন মেলে। জাগরণেই। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে চাইনি কখনো। দেখি না এখনও।
নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নতুন শহরে আবার পড়াশোনা করেছি সেই ২০০১ সালে। যদিও সাথে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি স্নাতক- বাণিজ্য, শিক্ষা এবং আইন। সেই ডিগ্রিতে শুধু চলবে না বলে আবার পড়তে হলো। গড়তে হলো নতুন জায়গা, যেভাবে চায় সেভাবে নিজেকে। গড়ে নেওয়াটা আসলে আপেক্ষিক। এই চেষ্টা থামবার নয়। তাইতো এখনও গড়ে নেওয়ার, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকি প্রতিনিয়ত।
আশার কথা, বসে নেই আমার ভালোবাসার, প্রিয় সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চা। কবিতা পড়ি, একটু আধটু লেখালিখি করি, নাটক করি, করাই। সিনেমা সঙ্গীত, রাজনীতি নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকি সন্ধ্যায়, ছুটির দিনগুলোতে। ২০১১ সাল থেকে নাটকের দল ‘অন্য থিয়েটার’ টরন্টো এবং ২০১৪ সাল থেকে আবৃত্তি দল ‘অন্যস্বর’ টরন্টো-এর সাথে কাজ করে যাচ্ছি বিরামহীন। অনেক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার কাজ করেছি। নাট্যাভিনয়, নাট্য নির্দেশনা দিয়েছি, দিচ্ছি।
২.
অফিসের সময়গুলো বাদে আমি বাংলায় কথা বলি। বাংলাই সব। থাকি বাঙালি অধ্যুষিত ড্যানফোর্থ এবং ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায়। আমার মতো অনেকে বাড়ি হতে ‘দুই পা ফেলিয়া’ যদি যান অস্ট্রেলিয়া, লন্ডন, আমেরিকা বা কানাডায় তবে কি তাদের ভাষাপ্রেম বেড়ে যায়, নাকি কমে যায়- এর কোনো সমীক্ষা আছে কি-না আমার জানা নেই। তবে দুই দশকের আমারই অভিবাসী জীবনে দেখেছি যাদের ন্যূনতম স্বদেশপ্রেম আছে, লক্ষ্য করেছি, সেই তাদেরই আছে স্বভাষাপ্রেম। আবার অনেকের স্বদেশপ্রেম ফিকে হলেও মাতৃভাষাপ্রেম থাকে জ্বলজ্বলে।
টরন্টো অভিবাসনে দেখেছি আমারই মতো সিংহভাগ মানুষ নিজ ভাষাভাষিদের এলাকায় প্রথমে আশ্রয় গড়েন। খাদ্যাভ্যাস যেমন ছাড়তে কষ্ট তেমনি অসম্ভব বেদনার মতো বাজে নিজ ভাষা থেকে দূরে থাকা। তাই তো বাংলা কথা বলা চাই। চাই বাংলায় দিনরাত্রি অবগাহন করা।
খুব বেশিদিন আগে নয়, ২০০৪ সালে টরন্টোর একটা শপিং মলে হাঁটতে গিয়ে ফোনে বাংলা কথা বলতে দেখে কলকাতার একজন আমাকে আগলে ধরেছিলেন এবং বলেছিলেন তিনি অনেকদিন পর তার মাতৃভাষা শুনলেন। নিজেই বলেছিলেন তিনি যে পাড়ায় থাকেন, সেই পাড়ায় বাংলাভাষি ত্রি-সীমানায় কেউ নেই। উন্নাসিক ছিলেন নিজেই সেটাও জানালেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দূরের স্ব-জাতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি ইচ্ছে করে। আজ এইবেলায় তাই তার অনুশোচনার কষ্ট সেদিন দেখেছি। সেদিন দুজনে মিলে এপার ওপার না থেকে অপার বাংলা হয়ে ওঠেছিলাম। ভাষা এমনি করে একজনকে আরেকজনকে কাছে টানে। এখানে কোনো কাঁটা তারের বেড়া থাকে না। বাংলা ভাষা আমাদের এক মালায় গেঁথে নেয়। দু’য়ের মাতৃভাষা এক বলে কথা। ‘আ মরি বাংলা ভাষা’!
এটাই নিশ্চয় হোমসিক। দূরে গেলে বাড়ির কথা মনে হওয়া। এক সুহৃদ বাংলাদেশ থেকে টরন্টো এসে বলেছিলেন এখানে নানান বাড়িতে গিয়ে দেখেছেন বাংলা ভাষার প্রতি অনিঃশেষ ভালোবাসা। তিনি জানিয়েছিলেন- দেশের মানুষ বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো লোকে দেখেন না। জনতা নাকি হিন্দি চ্যানেল নিদেনপক্ষে কলকাতার সিরিয়ালে আসক্তি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। প্রবাসে উল্টো। এখানে কমবেশি সকলে মাতৃভূমির রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। বাংলাদেশে কবে কোথায় কী হচ্ছে, প্রবাসে বসে তারা তাই নিয়ে চিন্তিত। কেউ এই পার্টির নেতা, আরেকজন আরেক পার্টির সভাপতি। রাজাকারের বিচার চাই, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হোক, লুটেরা রুখে স্বদেশ বাঁচাও, হোক প্রতিবাদ বলে ফেস্টুন পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন রাস্তায়। প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। একুশ এলে সমবেত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করেন। অন্যান্য দিবস, উৎসব তো আছেই।
পশ্চিমে বাঙালির গৃহে বাংলা টিভি চ্যানেল চলে। পরস্পর বাংলায় কথায় বলেন, সেটা প্রমিত কিংবা আঞ্চলিক। লাইব্রেরি থেকে বই আনতে গিয়ে দুটি একটি বাংলা বই নিয়ে আসেন। বাংলা সঙ্গীত শোনেন। বাংলা সিনেমা বেশি না দেখলেও অনলাইনে বাংলা পত্রিকাগুলো দেখে নেন সময় করে। এই প্রেম তার ভাষাপ্রেম। জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ মায়ের ভাষায় হলে অন্তরের যোগসূত্র বাড়ে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রজন্ম যদি ঘরে অন্তত মাতৃভাষায় কথা বলেন, তাহলে তাদের মেধার বিকাশ হয়। মস্তিষ্কের কোষে বিচ্ছুরণ ঘটে।
গ্লোবাল ভিলেজ এখন। কে, কোথায় ভৌগোলিকভাবে অবস্থান করি না কেন, সেটা বড়ো বিষয় নয়। আমাদের চর্চায় বাংলা ভাষা থাকে। এখনকার কবিরা বাংলায় কবিতা লিখেন, সাহিত্যিকগণ গল্প-উপন্যাস লিখেন। আবৃত্তিকারেরা বাংলা কবিতা পড়ে। বাংলা যাত্রা, নাটক হয় এখানে এখন। যারা বলেন ‘আমি বাংলায় কথা বলি, বাংলায় গান গাই’- তারা মূলত শিকড় উপড়ে পশ্চিমে আসা। চারা গাছ নয় বেশ বড়ো গাছ উপড়েই অভিবাসী তারা। তাই বাংলাভাষার টান অনেকাংশে গভীর হয় তাদের।
আমি একজন অভিবাসী মানুষকে চিনতাম। যিনি টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা পড়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। সেই কামাল আহমেদ যখন বয়সের ভারে এখানে সেখানে যেতে পারতেন না তখন ফোন করে আমাদের অনেক অনুজ বন্ধুদের গভীরভাবে তাগাদা দিতেন সমস্ত পত্রিকা জোগাড় তাকে পৌঁছে দেওয়ার। আমরাও তাই করতাম। আমৃত্যু তিনি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা, বলা যায় মুখস্থ করতেন।
আমি আরেকজন বাঙালিকে দেখেছি। যিনি ষাটের দশ থেকে কানাডাতে শিক্ষকতা করতে আসেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সঞ্চয়ের সিংহভাগ তিনি প্রজন্মের পুঁথিগত বাংলা ভাষা চর্চার জন্যে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে ১৯৯৯ সালে দান করেন। সেই মহৎপ্রাণ ড. মহাদেব চক্রবর্তী শুধু থোক অর্থ দিয়ে বসে থাকেননি পরবর্তীকালে দ্বারে দ্বারে ঘুরে, টরন্টোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থেকে মানুষের কাছে হাত পেতে সাহায্য নিয়েছেন শুধু নিজ ভাষার মমতার টানে। অনেকদিন তিনি অর্থ প্রণোদনা দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলা কোর্স নেওয়ার জন্যে উৎসাহিত করেছেন। ৯৮ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। আমৃত্যু তিনি বাংলা বাংলা করে গেছেন। অথচ তাঁর বেড়ে ওঠা ভারতের বানারসে। যদিও শেকড় তাঁর নাটোরে।
আরেক অধ্যাপক মীজান রহমান গণিতের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর কাছে জেনেছি, তিনি বছর বছর বাংলা না শুনতে পেয়ে শব্দ ভুলে যাচ্ছিলেন। ষাটের দশকে যখন তিনি নিজ পিএইচডি করার পর থেকে শিক্ষকতা করে আসছিলেন নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে। সেই তিনি অনেক বছর পর ৯০ দশকে বাংলায় গদ্য লেখা শুরু করেন।‘ দেশে বিদেশে’ নামক একটি সাপ্তাহিক-এ লিখতে থাকেন অসাধারণ সব সুখপাঠ্য গদ্য, হৃদয় ছোঁয়া নির্মেদ কলাম। তিনি ইচ্ছে করলেই ইংরেজি মাধ্যমে লিখতে পারতেন। তা তিনি ইচ্ছে করেই করেন নাই। মীজান রহমানের আমৃত্যু সাহিত্যচর্চা ছিল বাংলা মাধ্যমেই।
আমরা সবাই কামাল আহমেদ নই। নই মীজান রহমান। আমাদের বাংলা পড়ার, চর্চার তত আগ্রহ, উৎসাহ নেই। কারণে অকারণে প্রবাসের নানান প্রতিকূলতায় আমরা যতটা চাল ডাল নুনের খবর নিতে ব্যস্ত, বাড়ি, গাড়ি, বিত্ত, বৈভব খুঁজতে তটস্থ; ততটাই উদাসীন বাংলা চর্চায়। আমাদের হয়ে ওঠে না বাংলা কৃষ্টি সংস্কৃতির খবর নেওয়া। আবার অনেকের ভ্রান্ত ধারণা আছে বাংলা ভাষার চর্চা করলে সে পিছিয়ে পড়বে। তারা সন্তানদের সাথে ঘরে বাংলা ছেড়ে ইংরেজিতে কথাবার্তা, ইংরেজি নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত নিয়ে থাকেন। অথচ এখনকার বেড়ে ওঠা সন্তানেরা স্কুল কলেজে ইংরেজি মাধ্যমে এমনিতেই বসবাস করে। ইংরেজি ভাষা তো তারা সেখানেই শিখবে। ঘরে বাংলা থাকাটা শ্রেয়। তারপরেও পশ্চিমে প্রজন্মের বাংলা চর্চা আশা জাগানিয়া না হলেও হতাশাজনক নয়।
আমার কথা বলি, ঘরে নয় শুধু, বাঙালির সাথে বাংলায় কথায় বলুন। তাহলে ভাষা শহিদদেরকে মর্যাদা দেওয়া হবে। বেগবান হবে বাঙালির কৃষ্টি-সংস্কৃতি বিদেশ বিভূঁইয়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জানবে- বাংলা একটি মধুরতম ভাষা।
২.
টরন্টোতে সামার এলে অনুষ্ঠানের ধুম লাগে। মূলধারার নানা অনুষ্ঠান যেমন থাকে তেমনি থাকে বিভিন্ন এথনিক গ্রুপের অনুষ্ঠানমালা। রাস্তাঘাট বন্ধ করে পথমেলা হয়। কনসার্টের পর কনসার্ট চলতে থাকে। বছর ঘুরে ফিরে ফোবানাও অনুষ্ঠিত হয়। তবে বাঙালিদের সামাজিক সমিতি, জেলা সমিতি, এলামনাইদের বার্ষিক পিকনিক এই সময়ে সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি ছুটির দিনে কোনো না কোনো সমিতির পিকনিক থাকে। ব্যক্তিগতভাবে পিকনিকগুলোতে যাই। মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করি। কবিতা গান, নাটক নিয়ে হাজির হই ফি-বছর।
৩.
তিনি আমাদের সুহৃদ। আরও অনেকের সঙ্গে তার সাথে তাবৎ বিষয় নিয়ে আড্ডা হয়। সমাজ রাজনীতি শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকে সপ্তাহান্তের আড্ডায়। তিনি কারো কাজের যথাযথ প্রশংসা, সমালোচনা সমানে সমান করেন। যার যেটা প্রাপ্য। নির্মোহ বিশ্লেষণ। সেই তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন আমাকে লক্ষ্য করে। জানতে চাইলেন টরন্টোর বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা কি বাংলা নাটক করে কিংবা করবে?
প্রশ্নকর্তা জানেন, আমি বাংলা মঞ্চ নাটকের সাথে জড়িত। তিনি নিজেও আমাদের নাট্যদল ‘অন্যথিয়েটার’ টরন্টো-এর কয়েকটি প্রযোজনা দেখেছেন। প্রশ্নটি আমাকে বেশ ভাবায়। হ্যাঁ এবং না উত্তর দিলাম তখন। বললাম, হয়তো রবীন্দ্র-নজরুল-এঁর দিবস ধরে কিছু হবে। কিছু হবে পার্বণ ধরে। এর বাইরে নিয়মিত কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
কেন বাংলা নাটক করতে হবে, সেটা নিয়েও তর্ক হতে পারে। শুধুমাত্র ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে প্রবাসে বাংলা নাটক করবার দরকার আছে কি? ইংরেজি ভাষায় নাটক হলেও সব দর্শকশ্রোতা বুঝতে পারবে। বাংলায় দর্শক সীমিত। এখানকার বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা বাংলা বলতে পারার সংখ্যা খুঁজে পেলেও নাট্যাভিনয় করার সংখ্যা অনেক কম। দোষ দিয়ে কোনো কিছু হবে না। এখানকার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার অতো চাপ না থাকলেও নানাবিধ কারণে বাংলা নাটকে তাদের অংশগ্রহণ খুব কম। সময়ের কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। এখন যেমন- তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগ চলছে। হাতের মধ্যে সমস্ত কিছু। শুধু ছোটোদের নয় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের হাতে ফোন। খেলা, কথোপকথন, সিনেমা, গান, ভিডিও দেখতে সবাই ব্যস্ত। দশজন একসাথে বসে গল্প করার জন্যে বসলেই প্রত্যেকের হাতে ফোন চলছে এখান থেকে সেখানে। অস্থির সকলে। এখান থেকে সেখানে। এই প্রযুক্তির আগ্রাসী তাণ্ডবে নাটকে উৎসাহী করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
৪.
প্রগতিশীল ভাবনা, অন্যরকম, অন্যকিছু করার ইচ্ছে আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ২০১১ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে তাঁর লেখা নাটক ‘সূক্ষ্মবিচার’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে ‘অন্যথিয়েটার’ টরন্টো-এর যাত্রা শুরু করে।
অন্যথিয়েটার টরন্টো মঞ্চে নাটক আনছে ফি-বছর। ইতোমধ্যে ১১টি প্রযোজনা এনেছে। অতিমারীর সময়ে ২০২১ সালে মঞ্চে আনে ‘তিনকন্যার উপাখ্যান’। ‘অন্যথিয়েটার’ এই শহরে ‘তিন কন্যার উপাখ্যান’-এর ২৪টি সার্থক রজনী মঞ্চায়ন করেছে। ১টি প্রদর্শনী অটোয়া এবং ১টি প্রদর্শনী নিউ ইয়র্কে হয়েছে। নাটকটির ২০২৫ সালে ১৯ জুলাই মন্ট্রিয়লে মঞ্চাভিনয়ের আমন্ত্রণ আছে। প্রবাসে একটি নাটকের একাধিক প্রদর্শনী একটি মাইল ফলক হয়ে থাকবে ‘তিন কন্যার উপাখ্যান’। ‘তিনকন্যার উপাখ্যান’ বিদগ্ধজনের প্রশংসা পেয়েছে। উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় আলোকিত করেছেন কবি আসাদ চৌধুরীসহ অনেক নাট্যমোদী দর্শকশ্রোতা।
আবার যখন নাটক করতে অটোয়া যাই, নিউ ইয়র্কে যাই, তখন হাসিমুখে লক্ষ্মীর হাত বাড়িয়ে দেন এই শহরের আমাদের বাংলাভাষি সুহৃদ নাটক ভালোবাসার মানুষজনেরা। এঁরা শিল্পের পৃষ্ঠপোষক। ওরা আছে বলে কাজগুলো করা যায় কম হতাশায়, আশা জাগানিয়া হৃদয়ে।
২০১৪ সালে- ‘লক্ষ্য, বাচনিক উৎকর্ষ’ এই মন্ত্র নিয়ে ‘অন্যস্বর’ টরন্টো প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রবাসে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, বাংলা, বাঙালি কৃষ্টি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বেগবান করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে ‘অন্যস্বর’ টরন্টো।
বর্তমানে দলটি ৪০-এর অধিক সদস্য নিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে এবং গ্রেটার টরন্টো এলাকার বাংলা ভাষাভাষি কমিউনিটির জন্য অনেক সফল আবৃত্তির অনুষ্ঠান উপহার দিয়ে যাচ্ছে। এইবার তৃতীয় বছরের মতো টানা ১২ দিন বিজয়ের অনুষ্ঠান করেছে, অন্যান্য বছর টানা অবশ্য ১৬ দিন করেছে। দুই সপ্তাহ আগেই বৈশাখের পরিবেশনা শেষ হলো এবং দেশে ও বিদেশে অনুষ্ঠানটি প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে। ‘অন্যস্বর’ টরন্টো সারাবছর জুড়ে আবৃত্তি কর্মশালা, গুণিজন সংবর্ধনা, বিষয়ভিত্তিক, জাতীয় দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে।
উল্লেখ্য, ‘অন্যস্বর’ টরন্টো নাট্য সংগঠন ‘অন্যথিয়েটার’ টরন্টো-এর অঙ্গ সংগঠন।
৫.
বাংলাদেশে ছাত্রজীবনে সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলাম। অভিবাসী হওয়ার পর প্রথম দিকে মূল ধারায় চলচ্চিত্র উৎসবে ছবি দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে কয়েকজন সমমনা বন্ধু মিলে টরন্টো ফিল্ম ফোরাম নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। ভালো চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা, এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় আছে এই সংগঠনটির। এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আয়োজন করছে সেমিনার, মাল্টিকালচারাল চলচ্চিত্র উৎসব।
৬.
অন্যমেলা আয়োজিত টরন্টো বাংলা বইমেলায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম প্রথম ১০ বছর। বইমেলার ১০টির মতো স্মরণিকার সম্পাদনা করেছি। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের এবং অনুরোধে অন্যান্য সংগঠনের স্মরণিকার সম্পাদনা করেছি।
৭.
পারিজাত বলি না, শেফালি বলি না
আমি বলি শিউলি
কাক ডাকা ভোর নেই জানালার ওপাশে,
পাখির কিচির মিচির শুনেছি কবে
সেটা বিস্মৃত প্রায়, মন্দিরের ঘণ্টাও শুনি না কয়েক যুগ, নেই মাইকে আজান এখানে।
টরন্টোয় আমাকে সকালে কাজের জন্যে ওঠতে হয় যান্ত্রিক নিয়মে। কয়েক বছর আগে ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাখলে এখন এলার্ম বেজে ওঠে সেল ফোনে। চোখ মেলে সেটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে সরাসরি ওয়াশরুমে। আজ মনে হলো, জীবন চলার পথে ঘুম থেকে ওঠার সিংহভাগ সময় আমার ভোরবেলা ছিল। যদিও ঘুম, ঘুম আবার ঘুম আমার প্রিয়। তারপরেও যত রাত জাগি না কেন, হয় সকালে অফিস, না হয় ক্লাস- এই করে করে কেটে গেছে, যাচ্ছে আমার যাপিত জীবন। শুধু ছুটির দিনগুলোতে সারাদিন ঘুমোতে পেরে আপাতত বেজায় শান্তি।
একটা সময় কাক ডাকা ভোরে ওঠতাম। ফুল কুড়াতে যেতাম। হেমন্তের ভোরে শরৎকালে অন্তত টানা চার বছর ফুল কুড়ানোর শখ ছিল। সালটা ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭।
এখন যেটা বিজিবি’র হেডকোয়ার্টার, সেটা আমাদের মুখে তখনো, এখনো বিডিআর। অফিসিয়াল আর মগজের মধ্যে এই পার্থক্য। সেই বর্ডার নিরাপত্তা বাহিনীর সদর দপ্তরের ৫ নম্বর গেটের পূর্বের দিকে কিছুটা গেলেই বাবু ভাই, আলমাস ভাইদের বাড়ি। বাড়িটির পশ্চিম পাশে জাবেদ, জাহাঙ্গীর ভাইদের বাড়ি। পুব পাশে দারোগা বাড়ি বা ইকবাল ভাইদের দ্বিতল বাড়ি। বাবু ভাইয়ের বাবা আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের মতো ছিলেন। যদিও তিনি পাস করা ডাক্তার ছিলেন না। তিনি জ্বর, সর্দি-কাশি দেখে ওষুধ খেতে বলতেন। প্রয়োজনে ইনজেকশন দিতেন। পরে শুনেছি তিনি ফার্মাসিস্ট ছিলেন, তাও উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়া। বেশ আন্তরিক ছিলেন। মা বলতেন, যা তোর ডাক্তার চাচাকে ডেকে নিয়ে আয়। ডাকলে কখনো না বলেন নাই তিনি। নিজে কাজে যাওয়ার আগে কিংবা পরে দেখে যেতেন। সেই মানুষটি হঠাৎ না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বোধহয় ১৯৭৫ সালের আগেই। মনে পড়ে কোনো গেট বা প্রাচীর ছিল না তাঁর বাড়ির সামনের দিকে।
সেই বাড়ির একপাশে ছিল শিউলি গাছটি। পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চ ফলনশীল (ফুল অর্থে) গাছটি বোধহয়। ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত আঙিনাটি। সারারাত ফুটতো আর ভোর হতে অঝোরে ঝরে পড়তো। এত এত ফুল! পাগল করা সৌন্দর্যে চিক চিক করতো ফুলগুলো ভোরের আলোয়। চোখ বন্ধ না করেও দেখতে পাই গাছটি, ঝরা ফুল আর আমার কুড়ানোর আকুলতা!
শিশির বিন্দু ছুঁয়ে ফুল কুড়িয়ে ঘরে এনে রাখলে বোনেরাই ইচ্ছে হলে মালা করতেন। মালা গাঁথার শখ ছিল না। আমার ছিল ফুল কুড়ানোর আনন্দ।
৮.
আজও ফুল কুড়িয়ে বেড়াই অন্যভাবে। কখনো ‘অন্যথিয়েটার’ টরন্টো-এর নাটকের মাধ্যমে, ‘অন্যস্বর’ টরন্টো-এর কোনো আবৃত্তি অনুষ্ঠানের মধ্যে।
আমারই মতো অনেক অভিবাসীদের এভাবেই কেটে যাচ্ছে যাপিত জীবন। কেটে যাক আগামী দিনগুলো সেটাও চাই মনে-প্রাণে। আমাদের হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বহমান থাকুক অভিবাসীদের বাংলা কৃষ্টি, সাংস্কৃতিক কর্মকা-।
আমি শুধু রবি থেকে নিয়ে বলি-
খুলে দাও দ্বার,
নীলাকাশ করো অবারিত;
কৌতূহলী পুষ্পগন্ধ কক্ষে মোর করুক প্রবেশ;
প্রথম রৌদ্রের আলো
সর্বদেহে হোক সঞ্চারিত শিরায় শিরায়;
আমি বেঁচে আছি, তারি অভিনন্দনের বাণী
মর্মরিত পল্লবে পল্লবে আমারে শুনিতে দাও।
[ খুলে দাও দ্বার / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]
লেখক পরিচিতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। অভিনেতা, আবৃত্তিকার, নাট্য নির্দেশক, উপস্থাপক এবং সংগঠক। আশির দশকে থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত নাট্যশিল্পী। জড়িত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, লোক নাট্যদল, বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সাথে। অন্যথিয়েটার এবং অন্যস্বর নামের নাট্যদল এবং আবৃত্তি দলের প্রধান সংগঠক এবং নির্দেশক। কানাডার ব্যাংক অব মন্ট্রিয়ল-এ কর্মরত। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ইচ্ছের ডানায়’ (২০২৩)।

