এখানে বাঙালি প্রতারিত হয় বাঙালি দ্বারা

তাজুল মোহাম্মাদ

বিগত শতাব্দীর শেষ দু-দশক আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার কাজে গভীরভাবে নিয়োজিত। অবশ্য কতকগুলো বই ধার নিয়ে ঘরে বসে আরেকটি নতুন বইয়ের জন্ম দেওয়ার কাজটি করার অভ্যেস আমার কখনও ছিল না। ১৯৯৪ সালের মধ্য জুলাই থেকে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ওয়ারস্কাইমস্ ফাইল’ নির্মাণের কাজে আমি ছিলাম আগাগোড়া জড়িত। ১৯৮০ সালে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা শুরু করার পর থেকে যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদী, উগ্রবাদী এবং জামায়াত-শিবিরের হুমকি-ধামকি তীব্র আকার ধারণ করে। আক্রান্ত হয়েছে বাসা। শহরের বাইরেও আক্রান্ত হয়েছি বিয়ানিবাজারে, কানাইঘাটে, সড়কের বাজারে এবং ঢাকায়। এ অবস্থায় প্রথমে আত্মগোপনে, পরে দেশত্যাগ করে ব্রিটেন। সেখানেও ঐ সব গোষ্ঠীর কোপানলে পড়েছি। অবশেষে ১৯৯৬ সালের ১০ জানুয়ারি পা রাখি কানাডায়।

বসবাসের জন্য নিরাপদ দেশ হিসেবে কানাডা বিশ্বের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে আছে আরও অনেক আগে থেকে। কেউ এসেছেন উন্নত জীবন-যাপনের জন্যে, কেউবা জীবনের হুমকির মুখে। নিজ দেশে ভয়ানক অপরাধ সংগঠিত করার পর দুর্ধর্ষ খুনি, পাচারকারী, লুটেরাদেরও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো কানাডা। আমাদের দেশ থেকেও জাতির জনকের খুনি, জেল হত্যায় জড়িত এরকম বহু অপরাধী চলে এসেছে এবং আসছে। কিন্তু বড়ো কথা হলো একটি উন্নত দেশের সভ্য সমাজে, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, লিঙ্গ-বৈষম্য মুক্ত উদার গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী কানাডায় যুগের পর যুগ বাস করেও খোলস পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি অনেকের পক্ষে। এর মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাও নগণ্য নয়। ব্যবসার নামে প্রতারণা করে নিরীহ বাঙালিদের সর্বশান্ত করার অনেক উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। এরকম প্রতারকদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার ভান্ডার তখন পূর্ণ। তবে এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে আমার জীবনের সমস্ত আর্থিক সঞ্চয়ের বিনিময়ে। সঞ্চয় ছিল আমার খুবই সীমিত। প্রতারকের খপ্পরে পড়ে অর্থ হারিয়েছি, বাড়ি-ঘর সব বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। তারপরও কার্ড দিয়ে ১০০ হাজার ডলার তুলে দিতে হয়েছে। সেই অর্থ শোধ করেছি কাজ করে করে।

২.

বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলি। ১৯৯৮ সালে বিবিসি চ্যানেল ফোর থেকে একটি কাজের এ্যাসাইনমেন্ট পাই। অল্প সময়ের কাজ হলেও এই প্রথম মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক কোনো কাজের জন্য আমার অর্থ গ্রহণ। এর আগে ১৯৯৪-৯৫ সালে ৯ মাস বিবিসির জন্য গবেষণা কাজ করলেও কোনো পারিশ্রমিক আমি গ্রহণ করিনি। চেকটা পাওয়ার পরই আসেন একজন বাড়ির দালাল। কানাডাতেই পরিচয় এবং সখ্য। বিবিসির টাকা পুরো ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তার মাধ্যমে কিনেছি বাড়ি। সখ্য বেড়ে যায় বিনিমি’র চেকের পুরো দ্বিগুণ। তখন আমার আয় রোজগারও বেশ ভালো। আমার আর্থিক অবস্থাও তার জানা। প্রস্তাব দিলেন যৌথ ব্যবসার। বলেছিলাম ব্যবসার অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি ব্যবসা করবো না। আর কখনো যদি এ বিষয়ে ভাবি তাহলে পার্টনার নয় এককভাবেই করবো। কিন্তু লোকটি নাছোড় বান্দা। কিছুদিন পরপরই নানা রকম ব্যবসার প্রস্তাব নিয়ে আসেন। একবার বললেন, “আপনি আমাকে টাকা দেন, বাড়ি কিনবো আপনার নামে। বাড়ি সংস্কার করাবো। তারপর অধিক মূল্যে বিক্রি করবো। মুনাফার অর্ধেক আপনি, বাকি অর্ধেক আমি। দেখাশোনা, কেনাবেচা সবই আমার দায়িত্ব।” ঘন ঘন চাপে এক সময়রাজিও হয় যাই। এক সময় হলো চারটে বাড়ি। তিনটি বাড়িতে অল্প করে লাভ হলেও একটি বাড়িতে মোটা অংকের মুনাফা। তারপর ছুটলেন লক্ষ্যের দিকে।

একদিন জানালেন নতুন বাড়ি কিনবেন, ডাউন পেমেন্ট-৩০ হাজার ডলার, সেটা আমাকে দিতে হবে। আমি সব সময় সকল মানুষকেই বিশ্বাস করতাম, এখনো তাই করি। একটা চেক দিতে চাইলাম। বললেন ক্যাশ এনে ঘরে রাখতে। পরের দিন এসে নিয়ে যাবেন। তাই হয়েছিল। পরের দিন দেখলাম তিনি আমার টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন কিছু কথা। যার অর্থ হলো একটি বাড়ি কেনার জন্য আমার নিকট থেকে ৩০ হাজার ডলার নিয়েছেন। সংস্কার করার পর বিক্রি করে যদি লাভ না-ও হয় তবুও ১০ হাজার ডলার দেবেন। লাভ হলে ১৫ হাজার ডলার এবং ক্ষতি হলেও ৫ হাজার ডলার আমাকে দেবেন। কোনো কারণে তার মৃত্যু হলে স্ত্রী এই অর্থ আমাকে দেবেন। যে ডায়েরিতে লিখেছেন সেটির মালিক তিনি এবং তা এখনো আর নেননি।

বছর পাঁচ-ছয় পরের কথা। ততদিনে বাড়ি কেনা-বেচা সবই সম্পন্ন হয়ে গেছে। একদিন আমার বাড়িতে এনে দিলেন ৩০ হাজার ডলারের একটি চেক। নেওয়ার সময় যেমন কিছু বলিনি তেমনি চেক দেওয়ার কালেও বলা হয়নি কোনো কথা। যদিও বলতে চেয়েছিলাম নিয়েছেন তো ক্যাশ, আপনিও ক্যাশ দেন। কিন্তু কেন যে বলতে পারিনি, জানি না। পরের দিন বললাম তাকে এই চেকটা জমা দিলে কোনো সমস্যা হতে পারে। এটি আপানি নিয়ে যান। উত্তর ছিল- এখন চেকের পাতা শেষ হয়ে গেছে। পরে ক্যাশ ডলার দেবো এবং আপনি একটি চেক দেবেন আমায়। তাই বিশ্বাস করলাম আমি। কিন্তু কথা রাখেননি তিনি। নিজের হাতে ডায়রিতে যা লিখে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন তাও বেমালুম ভুলে গেলেন। তারপরও বলিনি তাকে কিছুই। বরং সম্পর্ক যেমন ছিল তেমনি থাকলো।

এই সময় রেভিনিউ কানাডা থেকে নোটিশ আসে ১০৫ হাজার ডলার ট্যাক্স কম দিয়েছি আমি। টনক নড়ে আমার। দেখা গেল পুরনো বাড়ি ভেঙে-চুরে মেরামত করার সামগ্রী কেনা ব্যতীত যে লেবার কস্ট-এর সব বিলই রিজেক্ট হয়েছে। কারণ এদেরকে নগদ অর্থে কাজ করিয়েছেন তিনি। রেভিনিউ অফিসে ডাক পড়লো আমার। একে একে দফা ওয়ারি ব্যাখ্যা করবো, আমাকে যারা কাজ করেছে ওরা সোনিয়েস ইন্সুরেন্স নাম্বার দেয়নি। একজন তা দিলেও সেই নম্বর ইনএকটিভ। হয়তো সে এদেশেই নেই। রেভিনিউ অফিসার স্পষ্ট করে আমাকে জানালেন অনেকেই এরকম প্রতারণা করছে। এদের সবাইকে তারা ধরার চেষ্টা করছেন। এবার তিনি আরো স্পষ্ট করে আমাকে বললেন, আমি যার সঙ্গে ব্যবসায় জড়িয়েছি তিনি আরো বাহু লোককে ব্যবহার করে সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছেন। তারা ঐ লোকের প্রতারণার অনেকগুলো ঘটনা উদঘাটন করেছে। এর মধ্যে আমার ঘটনাও একটি।

অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ঐ লোক আমাকে ৩০ হাজার ডলার কেন দিয়েছিল? উত্তরে জানালাম সেই ত্রিশ হাজার ডলারের লেনদেনের বৃত্তান্ত। খোলাসা করে ঐ অফিসার অভিমত ব্যক্ত করেন টাকা ধার নিয়ে সে অর্থ প্রদান শেষে ঐ চেক প্রদর্শন করে ট্যাক্স রেয়াত নেওয়ার মাধ্যমে আরেকটি প্রতারণা করেছেন। সব শেষে ঐ অফিসারের পরামর্শ ছিল আমি যদি বলি ব্যবসায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, বন্ধু হিসেবে উনি আমার নাম ব্যবহার করেছেন মাত্র। রেভিনিউ কানাডা তখন ১০৫ হাজার ডালারের দায় তার হিসেবেই যুক্ত করবে। আমি সেদিন তা করিনি। কারণ বাড়ি কেনাবেচাটা তো আমার নামেই হয়েছে।

রেভিনিউ অফিসের এই সিটিংয়ের পুরো সময় ধরে আমার সাথে ছিলেন আমার একাউন্ট্যান্ট। ঐ লোকটি আবার এই একাউন্ট্যান্টের ক্লায়েন্ট। তিনি পরে নিজের অফিসে ডেকে এনে ঐ লোকটিকে সব জানিয়েছন। উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন একজন নিরীহ ভদ্রলোকের এমন সর্বনাশ করা ঠিক হয়নি। তিনি তখন কথা দিয়েছিলেন আইনি লড়াই শেষে যত দিতে হয়, সেই টাকার অর্ধেক দেবেন তিনি। আমাকেও বললেন একই কথা। একই সঙ্গে একটি ল’ ফার্মের ঠিকানা দিলেন আমায়। তার পরামর্শ মতো ঐ ল’ ফার্মের মাধ্যমে কেইস ফাইল করি আমি। চুক্তি ছিল পুরো মামলার ফি বাবদ দিতে হবে ১৫ হাজার ডলার। কিন্তু প্রতি বছরই ৬-৭ হাজার ডলার বিল পাঠায়। আমার তখন মাথায় হাত। মামলার অবস্থা জানা, শুনানির কোনো তারিখ নেওয়ার চেষ্টা করা, কতদিনে মামলার ইতি হবে অধৈর্য হয়ে এসব কথা জিজ্ঞেস করার জন্য যত কল করেছি, প্রতিটির জন্য ২’শ-৩’শ ডলার বিল। প্রতিটি চিঠি লেখা বা জবাব দেওয়ার জন্য ৫’শ ডালার, এই ভাবে চার্জ করছিল। ১৫ হাজার ডলারের পরও ৫ বছরে অন্তত ২০ হাজার ডলার দেওয়ার পর মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেই। অন্যদিকে মূল টাকার ইন্টারেস্ট হয়ে গেছে আরো ১৫ হাজার ডলার। আমরা এই ১১৫ হাজার ডলার পরিশোধ করেছিলাম ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে। অনেকগুলো বছরে যা পরিশোধ করতে করতে যে ইন্টারেস্ট দিয়েছি, তার পরিমাণও বিরাট।

৩.

কনাডায় প্রথম প্রতারণার শিকার হওয়ার পর হয়তো অন্যান্য প্রতারকরাও বুঝে গেল, আমার সরলতার সুযোগ সহজেই নিতে পারবে। তাই অভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত হয় তারাও। এর মধ্যে একজন কলকাতার ব্রাহ্মণ। কানডায় আমার প্রথম সপ্তাহেই দেখা এবং একটু একটু করে সখ্য গড়ে ওঠা। কোনো কাজ করেন না তিনি। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবেই মন্ট্রিয়লের বাসিন্দা। প্রতিদিন আসতেন বাসার, রান্না করতেন নিজে, আমার স্ত্রীকেও রান্না শেখাতেন। প্রায় প্রতিদিনই প্রস্তাব রাখতেন, বলতেন- আমি যেন একটি রেস্টুরেন্ট চালু করি, পরিচালনা করবেন তিনি। এক সময় একজন বন্ধুকে অনুরোধ করে রেস্টুরেন্টে কাজের ব্যবস্থা করে দিই। বলেন, ঐ বাড়ির দালান যে ক্ষতি করেছে তা পুষিয়ে দেবেন মাত্র তিন মাসে। একটি রেস্টুরেন্ট তাকে চালু করে দিলেই তিন মাসে ঐ টাকা বের করে দেবেন। সাথে জোটায় অন্য এক বুড়ির দালালকে। বাঁধলেন তারা জুটি। চাপে চাপে দিশেহারা করে ফেলে আমাকে। আমি শেষ পর্যন্ত ৮০ হাজার ডলার লোন নিয়ে তুলে দিই তাদের হাতে। চালু হলো রেস্টুরেন্ট। দুই প্রতারক মিলেই ধরে, আমি যেন জাস্টিন ট্রুডোকে নিয়ে আসি রেস্টুরেন্টে। তা-ও করেছিলাম। আরো একজন পার্টনার ছিলেন। উনার নিকট থেকেও ২০ হাজার ডলার নিয়েছেন। খুব ভালো সূচনা হলো। জমজমাট ব্যবসা। সপ্তাহ শেষেই বলে বাজার করে দিতে। ৫০০/৬০০ ডলারের বাজার করে দিই। কার্ডের বিল পর্যন্ত সে দেয়নি। এক বছর পর রেস্টুরেন্ট বিক্রি করার সিদ্ধান্ত হয়। একজন একজন আগ্রহী ক্রেতা ১০০ হাজার ডলারে ক্রয় করতে আগ্রহ দেখান। প্রতারক দুজন তখনই বুঝে গেছে, ওর কাছে বিক্রি করলে আমাকে ঠকাতে পারবে না। টাকাটা আমার কাছেই চলে আসবে। বললেন তার কাছে আরো ভালো অফার আছে। কিছুদিন পর আমার সম্পূর্ণ অজান্তে অন্য এক ভারতীয়ের কাছে রেস্টুরেন্ট বিক্রি করে তিনি হয়ে যান অদৃশ্য। বদল করলেন বাড়ি। শুনেছি ঐ টাকা দিয়ে কলকাতায় তার বোনের নামে একটি কারখানা ঢালু করেছিলেন। আর মন্ট্রিয়লে তিনি বাস করতেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। অবশেষে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয় এবং নগরীর কোন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তা-ও আমি জানতে পারিনি।

মজার বিষয় হলো, মৃত্যুর আগে এই প্রতারক নাকি স্ত্রীকে বলে গেছেন- মৃত্যু সংবাদ কাউকে জানানোর দরকার নেই। তার মরদেহ দাহ করার আগে অবধি যেন আমি কোনোভাবেই জানতে না পারি। এর কোনো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। পাবও না কোনোদিন। তবে মনে থাকবে তাকে। তার সহযোগী প্রতারক যে পিতা আগস্টে মন্ট্রিয়লে এসেছিল, এখন কোথায় আছে জানি না। এভাবে বার বার প্রতারিত হয়েছি আমি। উদাহরণ হিসেবে আমি নিজের ঘটনার বর্ণনা দিলেও এরকম নিজ দেশের স্বজাতির প্রতারক দ্বারা প্রতারিত হয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া বাঙালির সংখ্যা বেশ বড়ো। অনেক প্রতারক একাধিকবার পুলিশ, আরসিএসপি’র হাতে ধরা পড়েছে। দণ্ডিত হয়েছে। এই প্রতারকরাই কমিউনিটিতে ভালো লোক হিসেবে নিজেকে জাহির করার প্রাণপাত প্রচেষ্টা করেন। কমিউনিটির বিভিন্ন প্রোগ্রামে ৫০ ডলার, ১০০ ডলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বক্তা হয়, আবৃত্তি করে, গান ও নৃত্য পরিবেশন করে। বিশ-ত্রিশ ডলার দিয়ে হাততালি নেয়। বাহবা কুড়ায়।

৪.

এটা মুদ্রার একপিঠ। অপর পৃষ্ঠের দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশি বহু ভাইয়েরা ব্যবসার নানা ক্ষেত্রে সততার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, সম্মানিত হয়েছেন কমিউনিটিতে, সরকারের কাছেও। আবার সমাজ সেবামূলক কাজেও তাদের রয়েছে সক্রিয়তা।

এই লেখাটি চলমান অবস্থায় ফেসবুকে প্রকশিত হলো একটি সংবাদ। তাতে জানা গেল বাংলাদেশি একজন ব্যবসায়ী নজরুল আলম শানু, যিনি ক্যুইবেক প্রদেশে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টিম হর্টনস্-এর মালিকানা নিয়েছেন। তার মালিকানায় এখন মন্ট্রিয়ল ডাউন টাউনেই রয়েছে টিম হর্টনস্-এর ৬টি স্টোর। এই ব্যবসাটি পরিচালনায় তার যোগ্যতা, দক্ষতা এবং ফ্রেজাজির শর্ত পূরণে সর্বোচ্চ নম্বর লাভের জন্য নানা সময়ে লাভ করেছেন নানান এওয়ার্ড। নিজের একটি স্টোর হয়েছে প্রদেশের ব্যস্ততম স্টোর। বিষয়টি শুধু নজরুল আলম শানুর নয়- আমার বিবেচনায় বাংলাদেশি কমিউনিটির গর্ব। আমাদের অহংকার বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি একটি উদাহরণ। এ-রকম আরো অনেক ব্যবসায়ীর সাফল্য এই দেশে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে। হ্যাঁ, যে সংবাদটির কথা বলছিলাম তাতে লেখা হয়েছে নজরুল আলম শানু এবছর ২৫ হাজার ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন ফাউন্ডেশনে দিয়েছেন। আমাদের মুদ্রার দুই পিঠের বৈসাদৃশ্য এমনতর।

৫.

কানাডায় আমি প্রতারিত হওয়ার কারণে অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। কারণ, ঐ প্রতারকদের ব্যাপারে অন্যরা সতর্ক হয়ে যান। এর মধ্যে নজরুল আলম শানুও একজন। খুবই সুদর্শন, সদা হাস্যমুখ, এক ভীষণ মিষ্টিমুখ ভদ্রলোক। প্রথম দর্শনেই যে কাউকে আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তার।

একবার, একটি কুরিয়ার কোম্পানি খুলে প্রতারণার জাল ফেলে। আমিও তাদের মিষ্টি কথায় ভুলে গেছি। আড়াই হাজার ডলার ধার দিয়েছি ২/৩ মাসের জন্য। পরের আড়াই দশকেও তা আর পরিশোধ করেনি। বন্ধু নজরুল আলম বানুও তা জানতেন। ফলে তার কাছে গিয়ে যখন একই তরিকায় অর্থ আদায় করতে চেষ্টা করে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যত মিষ্টি’ কথাই যত ইনিয়ে বিনিয়ে বলেন না কেন, তাতে কোনো ফল হবে ন।, কারণ, আমি তাজুল মোহাম্মদের ন্যায় সহজ সরল নই। এখানে সুবিধে করতে পারবেন না, অন্যত্র চেষ্টা করেন। কী আর করা! বিফল হয়ে ফিরে যেতে হলো সেখান থেকে।

অর্থ ধার নিয়ে পরিশোধ না করা, ব্যবসার ফাঁদে জড়িয়ে প্রতারণা, গাড়ি কিনে টাকা না দেওয়া এরকম কত যে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে তার তো শেষ নেই।

পুরানো একটি গাড়ি বিক্রি করেছিলাম। কথা-বার্তা শেষে গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন এর ক্রেতা। এরপর তিনি লাপাত্তা। এত সব লিখে ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না পাঠকের। কেবল ভিন্ন রকম একটি প্রতারণার গল্প শোনাবো। তখন ২০০১ সাল। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন কয়েকশ মানুষ সেই বছর এবং পরবর্তী লম্বা সময় ধরে। চট্টগ্রামের অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মহুরীকে নিজের বৈঠকখানায় কুপিয়ে হত্যা এবং সেই রক্তাক্ত মরদেহের বীভৎস চিত্র মনে পড়লে আজও ঘুম হারাম হয়ে যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীর ইজ্জত রক্ষা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। দল বেঁধে ধর্ষণের ছবি প্রতিদিন পত্রিকায় আসতো। পাঠক নিশ্চয়ই বিস্মৃত হননি পূর্ণিমার গর্ভধারিণী মা কী করুণ কণ্ঠে মিনতি করছিলেন। কিশোরী মেয়ের ওপর জামায়াত-বিএনপি’র একদল সন্ত্রাসী যখন, প্রকাশ্য দিবালোকে মা-বাবার চোখের সামনে পাশবিক লালসা চরিতার্থ করছে তখন সেই মায়ের করজোড়ে আকুতি- “বাবারা আমার মেয়েটার বয়স অতি অল্প, তোমরা একজন একজন করে যাও।” হায়রে অসহায় মা! লুণ্ঠিত ভস্মিভূত হয়েছে হিন্দুদের বাড়ি-ঘর। বেদখল হয়েছে বাড়ি-জমি-সবই। তারাও হয়েছেন গৃহ এবং জন্মভূমি ছাড়া। এর প্রতিবাদে মানবাধিকার সম্মেলন হয়েছিল মন্ট্রিয়লে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালে সে সময় দলের একজন স্বঘোষিত নেতা প্রায়ই বলতেন, শেখ হাসিনা অপেক্ষা অধিক পাওয়ার এক্সারসাইজ করতে পারেন। কারণ, হাসিনা নাকি আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারেন না- যা তিনি পারেন। সেই নেতা একদিন মানবাধিকার সম্মেলনের কর্মীদেরকে নিমন্ত্রণ করেন একটি রেস্টুরেন্টে। খাওয়া-দাওয়ার শেষ পর্যায়ে কানে মোবাইল লাগিয়ে বাইরে চলে যান। খাওয়ার পর সবাই অপেক্ষা করছেন নেতা এসে বিল পরিশোধ করার পর বিদায় নেবেন। এই সময় রিং এলো আমার মোবাইলে। নেতা জানালেন, “আপা (শেখ হাসিনা) ফোন করেছিলেন। তাই বাইরে যেতে হয়েছে।” তিনিই (শেখ হাসিনা) একটি কাজ দিয়েছেন। তাই তিনি কাজে চলে যাচ্ছেন। অনুরোধ করলেন আমার কাউকে দিয়ে যেন বিলটা পরিশোধ করে দিই। পরের দিনই, টাকা দিয়ে দেবেন তিনি। ২৪ বছর হয়ে গেছে তিনি কখনো জিজ্ঞেস করেননি কার্ডের বিল আমাকে মওকুফ করে দিয়েছে কি না। এরপর তিনি আরও অনেক রকম কাজ করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। এরকম অভিজ্ঞতা আমার পাহাড়সম।

কানডায় আমার প্রায় বিশ বছর। এ সময়ে বাঙালির গর্ব করার মতো বহু ঘটনা যেমন প্রত্যক্ষ করেছি, একই রকম দুর্নাম কুড়ানো ঘটনার সংখ্যাও কম নয়। ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিতে গেলে ঢাউস সাইজের একটি গ্রন্থ হতে পারে; হয়তো তা হবেও। তবে আজ এতটুকুই।

লেখক পরিচিতি
তাজুল মোহাম্মদের লেখাজোখা প্রধানত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। সোয়া’শো এর বেশি গ্রন্থ প্রণয়ন করলেও মলাবন্ধি হয়েছে মাত্র ৮৬টি। ৭২-ঊর্ধ্ব তাজুল মোহাম্মদ এখনও নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন।