কানাডায় আমার আমি
নতুন সূচনার প্রতীক্ষা
২০১৬ সাল। ঢাকায় তখন আমার জীবন ছিল গতি ও স্বীকৃতিতে পরিপূর্ণ। আমার দু’টি পেশা ছিল- একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং অপরটি টেলিভিশনে সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা। এই দুটি ক্ষেত্রেই আমি পেয়েছিলাম সম্মান, মর্যাদা ও মানুষের ভালোবাসা। কিন্তু জীবন তখন আমাকে এক নতুন অধ্যায়ের ডাক দিচ্ছিল। একটি দেশে, যেখানে আমি অপরিচিত, যেখানে কোনো নিরাপদ শেকড় গাঁথা নেই, সেই কানাডার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত এক অর্থে ছিল আত্মত্যাগ, অন্য অর্থে এক নতুন আশার আলোকবর্তিকা।
চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন, আর হৃদয়ে ছিল অজানা ভয়। প্রিয়জনদের ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। কিন্তু ভিতরে ছিল আত্মনির্মাণের এক প্রবল আকাক্সক্ষা। আমি শুধু নিজের জন্য নয়, আমার চারপাশের মানুষদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম।
প্রথম পদক্ষেপ : টরন্টোতে আগমন ও পরিচয় সন্ধান
টরন্টোতে বাংলাদেশি কমিউনিটি বর্তমানে অত্যন্ত সুসংগঠিত, ক্রমবর্ধমান এবং বহুমাত্রিক। এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছ এবং এর ফলে গড়ে ওঠেছে এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ।
ফিরে তাকাই ৯ বছর আগের সময়টাতে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে টরন্টোতে পা রাখার দিনটিতে বাইরের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস! রাস্তাঘাট বরফের সাদা চাদরে ঢাকা! এ আরেক অদ্ভুত সৌন্দর্য! শরীরে মোটা জ্যাকেট জড়িয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বাসার উদ্দেশে বের হই। প্রথম কিছুদিন যেন এক স্বপ্নময় ধাঁধার মতো কেটেছে! এপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে শীতের প্রকৃতি দেখতাম, উপভোগ করতাম তুষারপাত! বিশাল এই নগরী, বহুজাতিকতার মেলবন্ধন, আর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনার ঝিলিক আমাকে রোমাঞ্চিত করেছিল। কিন্তু সেই রোমাঞ্চের মাঝেও ছিল বাস্তবতার কষাঘাত। এখানে নতুন করে নিজেকে গড়তে হবে, নতুনভাবে জায়গা করে নিতে হবে।
আমি সিদ্ধান্ত নিই, প্রথমেই একটু ঘুরে দেখি। শহরটাকে চিনি। একদিন টরন্টো ট্রানজিট কমিশন বা টিটিসি বাসে করে ঘুরেছি, তো অন্যদিন সাবওয়ে বা পাতাল ট্রেনে করে কিপ্লিং থেকে কেনেডি, আবার অন্য ট্রেনে কেনেডি থেকে স্কারবোরো টাউন সেন্টার, কিংবা উইলসন সাবওয়ে স্টেশন ঘুরেছি। টরন্টো ডাউন টাউনের ইটন সেন্টার, কখনও আবার টরন্টো কিংবা ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে আড্ডা দিয়েছি। ফ্রি সেমিনারগুলোয় অংশ নিয়েছি।
মনে তখন প্রশ্ন জেগেছে, বাংলাদেশি কমিউনিটি এখানে কেমন, তারা কী করছে? কীভাবে তারা নতুন জীবনে স্থিতি খুঁজে পাচ্ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ড্যানফোর্থের বাংলাপাড়ায় গিয়ে পরিচিত হই বিভিন্ন মানুষের সাথে। পরিচয় হয় বাংলাদেশের বেশ ক’জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যারা গণমাধ্যম, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্যচর্চার সঙ্গে নিবেদিত। যেমন- সৈকত রুশদি, নজরুল মিন্টো, শহিদুল ইসলাম মিন্টু, সুব্রত কুমার দাস, প্রয়াত রিজুয়ান রহমান-সহ অনেকেই আছেন এই তালিকায়। তাঁরা শুধু বন্ধুত্ব নয়, আমাকে প্রেরণাও দিয়েছেন।
২০১৬ সালেই আমি প্রথম বড়ো একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার সুযোগ পাই- ‘দেশে বিদেশে’ পত্রিকার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে টরন্টোর মেট্রো কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত হয় অনুষ্ঠানটি। আমার সহ-উপস্থাপক ছিলেন রিজুয়ান, অজন্তা চৌধুরী ও ফারহানা আহমেদ। এরপর একে একে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান, বিজয় দিবস, বাংলামেলা, বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল ও অন্যান্য প্রবাসী আয়োজনে সঞ্চালক হিসেবে যুক্ত হই। লেখালিখি করি সাপ্তাহিক বাংলামেইল পত্রিকায়। ঢাকার অনেক পত্রিকাতেও কানাডার খবরাখবর নিয়ে লেখা দিই। এনআরবি টেলিভিশনে কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করি।

দেখতে দেখতে শীত শেষ হয়ে প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম উঁকি দেয়। মনে আছে, এমন এক গ্রীষ্মের সকালে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির প্রয়াত প্রফেসর ড. রউফ একদিন তার ক্লাসে আমন্ত্রণ জানান। পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখান। ইয়র্কের ক্যাম্পাসের কোল ঘেঁষে সবজি ক্ষেত ছিল। এখানে অধ্যাপক রউফ নিজেও লাল শাক বপন করেছিলেন। কানাডায় বাংলাদেশি অনেক ফসল উৎপাদন দেখে বেশ ভালো লেগেছিল।
টরন্টোর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা কেমন?
কানাডায় এসে আমি যতটুকু বোঝার চেষ্টা করেছি তা হলো এখানে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা মানেই শুধু সার্টিফিকেট অর্জন নয়- এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা যা শিক্ষার্থীদেরকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা গড়ে তোলে।
টরন্টোর প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে যা পেলাম-
১. University of Toronto (U of T)
-কানাডার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের সেরা ২০বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি।
-গবেষণা, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন, সোশ্যাল সায়েন্স ও বিজনেস, সব বিষয়ে সুনাম রয়েছে।
-তিনটি ক্যাম্পাস : St. George (Downtown), Scarborough, Mississauga
২. York University
-টরন্টোর আরেকটি বড়ো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
-আইন, বিজনেস, আর্টস ও এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজে খ্যাতি।
-এর Schulich School of Business আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
৩. Ryerson University (বর্তমানে Toronto Metropolitan University)
-মিডিয়া, ডিজাইন, বিজনেস এবং টেকনোলজি বিষয়ক কোর্সে অগ্রগামী।
-ডাউন টাউনে অবস্থিত হওয়ায় ছাত্রদের ইন্ডাস্ট্রি এক্সপোজার ভালো।
৪. Seneca College
-কর্মমুখী কোর্স এবং ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে জনপ্রিয়।
-বিজনেস, হেলথ কেয়ার, ইনফরমেশন টেকনোলজি, মিডিয়া স্টাডিজ ইত্যাদি বিষয়ে বহু কোর্স অফার করে।
৫. George Brown College
-ডাউন টাউনে অবস্থিত, কর্মমুখী ট্রেনিং এবং হ্যান্ডস-অন লার্নিং-এর জন্য বিখ্যাত।
-কুকিং, নার্সিং, হসপিটালিটি এবং ডিজাইন বিষয়ে সেরা।
৬. Humber College
-শক্তিশালী কো-অপ (co-op) এবং ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম।
-আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নানা সাপোর্ট সার্ভিস রয়েছে।
শিক্ষার ধরন ও মান
-ব্যবহারিক ও প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা : থিওরির পাশাপাশি প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ ওয়ার্ক এবং ইন্টার্নশিপ থাকে।
-কো-অপ এবং ইন্টার্নশিপ সুবিধা : অনেক কলেজ-ইউনিভার্সিটি কো-অপ প্রোগ্রাম অফার করে যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ মেলে।
-গবেষণার সুযোগ : বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির নতুন দিগন্ত
আমি সব সময় বিশ্বাস করি শেখার কোনো শেষ নেই। তাই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে আমি নতুন করে নিজের আগ্রহের জায়গাকে শক্ত ভিত দিতে চাই। কিছুদিন Polycultural Immigrant & Community Services-এ যাই নিউকামারদের নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে। ভেবেছিলাম পিএইচ.ডি প্রোগ্রামে ভর্তি হবো। নিউইয়র্ক থেকে আমার পরিচিত এক প্রফেসর তখন টরন্টো বেড়াতে আসেন। তার মাধ্যমে পরিচয় হয় তখনকার রায়ারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি) এক অধ্যাপকের সঙ্গে। আমার ভবিষ্যৎ চিন্তা-ভাবনা বিশ্লেষণ করে তিনি একরকম আমাকে নিরুৎসাহিতই করেন পিএইচ.ডি প্রোগ্রামের ব্যাপারে!
তারপরও মনে হচ্ছিল কিছু একটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করি। যেহেতু মিডিয়া নিয়ে আগ্রহ, তাই ভর্তি হই Toronto Film School-Gi Graphic Design & Interactive Media প্রোগ্রামে। এক বছরের ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম, অন্য সব কলেজগুলোতে যা ২-৩ বছর লাগে শেষ করতে। এক বছরে পুরো ৪টা সেমিস্টার, একরকম রোলার-কোস্টারে চড়ে বসার মতো অবস্থা ছিল আমার!
এই শিক্ষা শুধু সফটওয়্যার বা টুল শেখানো নয়, এটি ছিল একটি নতুন চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখার শিক্ষা। আমি বুঝতে শিখি, ডিজাইন মানে শুধু রং কিংবা টাইপোগ্রাফি নয়, এটি প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, সংস্কৃতির গল্প বলা যেতে পারে এর মাধ্যমে। আমার ক্লাসের এসাইনমেন্টে যেমন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের দুর্ভিক্ষ নিয়ে চুয়াত্তরের মন্বন্তর স্থান পায়, তেমনি আসে পাবলো পিকাসোর যুদ্ধ বিরোধী প্রতীক ‘গুয়ের্নিকা’!
আমার ক্লাসরুমে সহপাঠীরা ছিল জাপান, ফিলিপিনস, শ্রীলঙ্কা থেকে আগত। আমরা সবাই আলাদা, কিন্তু সৃজনশীলতায় একসাথে মিশে যেতাম। এই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা আমাকে শেখায় সৃজনশীলতার মূল শক্তি লুকিয়ে থাকে বৈচিত্র্যের মধ্যেই। Ontario Student Assistance Program (OSAP) নিয়ে পড়াশোনা করলেও ভালো ফলাফলের জন্য গ্র্যান্টও পেয়ে যাই! কোর্সে ভর্তির পরপরই মাথায় আসে নিজের একটি পত্রিকা করার।
CBN: নিজের গল্প বলার মাধ্যমে কমিউনিটির শক্তি জাগানো
আমি লক্ষ্য করি, আমাদের কমিউনিটির মানুষের অনেকেই বিস্ময়কর কাজ করছেন, কিন্তু সেগুলো মিডিয়ায় সঠিকভাবে ঠাঁই পায় না। তখনই ভাবি, “যদি আমাদের কথা আমরা না বলি, তাহলে বলবে কে?” এই ভাবনার ভিত্তিতে জন্ম নেয় Canadian Bangladeshi News (CBN)। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু করি, আর অক্টোবরে সেটি পরিণত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ প্রিন্ট সাপ্তাহিক পত্রিকায়।

CBN শুধুই সংবাদই পরিবেশন করে না, এটি কানাডায় বাংলাদেশিদের একটি আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, একটি কণ্ঠস্বর। বাংলার পাশপাশি ইংরেজির জন্যও আলাদা পৃষ্ঠা ছিল এতে। উদ্দেশ্য ছিল এখানকার তরুণ প্রজন্মকেও আকৃষ্ট করা। পত্রিকাতে আমরা তুলে ধরেছি-
-নতুন অভিবাসীদের সংগ্রামের গল্প,
-শিক্ষার্থীদের সফলতা,
-মায়েদের আত্মত্যাগ,
-তরুণ উদ্যোক্তার বিজয়
-অনেক গুণী লেখকের প্রবন্ধ
-বিভিন্ন প্রদেশের নানা গুণীজনদের গল্প, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনি ইত্যাদি
CBN ছিল একটি ‘মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম’-এর বাইরে গিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন, একটি কমিউনিটি চেতনার প্রতীক। কমিউনিটির অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় এই পত্রিকার মাধ্যমে।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের অংশীদার
২০১৭ সালের ২১ অক্টোবর CBN-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় ড্যানফোর্থের তৎকালীন মিজান কমপ্লেক্সে। কমিউনিটির বিশিষ্টজনেরা এদিন উপস্থিত ছিলেন, বক্তব্য রাখেন। প্রয়াত কবি আসাদ চৌধুরী ছিলেন প্রধান অতিথি। প্রথম সংখ্যায় আমাদের প্রিয়জন ডলি বেগমের ইংরেজিতে একটি লেখা স্থান পায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডলি বক্তব্যও রাখেন। যদিও তাকে সেসময় তেমন কেউই সেভাবে চিনতেন না! আমরা তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানাই।
২০১৮ সালের কথা। ডলি বেগম, একজন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান নারী যিনি ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি হিসেবে কানাডার যেকোনো সংসদের সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমি তার নির্বাচনি প্রচারে সম্পূর্ণ যুক্ত হই। পত্রিকার মাধ্যমে ডিজাইন, ব্যানার শিরোনাম, জনমত তৈরি, প্রচারণা কৌশল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কন্টেন্ট, সব জায়গাতেই আমি চেষ্টা করি আমার সর্বোচ্চটা দিতে।
যেদিন ডলি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন, মনে হয়েছে যেন একজন বাংলাদেশি হিসেবে তা আমারও বিজয়! এটি আমাদের কমিউনিটির সম্মান, আমাদের অংশগ্রহণের স্বীকৃতি। সেই মুহূর্তটি আজও আমার হৃদয়ে গর্বের আবেগ নিয়ে জায়গা করে আছে। ডলি বেগম এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে পরপর তিনবার তার নির্বাচনি এলাকা স্কারবোরো সাউথ ওয়েস্ট থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
নতুন পেশায় যাত্রা : রিয়েল এস্টেট ও মানুষের স্বপ্ন পূরণে সহচর
প্রযুক্তি, মিডিয়া, সংস্কৃতির জগৎ থেকে এবার পা রাখি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক পেশায়- রিয়েল এস্টেট। অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি মিডিয়ার মানুষ, হঠাৎ রিয়েল এস্টেটে কেন?”
আমার উত্তর ছিল, “কারণ এই পেশায় আমি মানুষের জীবনের একটি স্বপ্নের সাথে যুক্ত হতে পারি।”
বাড়ি কেনা, পরিবার নিয়ে নতুন শুরু, জীবনের স্থিতি, এই প্রতিটি গল্পে আমার ছোট্ট সহায়তাটুকুও বড়ো একটা পার্থক্য তৈরি করতে পারে। আমার ডিজাইন স্কিল আমাকে মার্কেটিং দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে রাখে, নিজেই লোগো, ব্যানার, ফ্লায়ার ডিজাইন করি। ভিডিও সম্পাদনা করি। বিজ্ঞাপন থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, সবকিছুতে আমি নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারি।
কমিউনিটির সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধন : স্পন্সরশিপ, স্বেচ্ছাসেবা ও অংশগ্রহণ
আমি বিশ্বাস করি, শুধু পেশাগত সফলতা নয়, একজন মানুষের পূর্ণতা আসে তার সামাজিক ভূমিকার মধ্যদিয়েও। তাই আমি সব সময় চেষ্টা করি, কমিউনিটির উৎসব, সংকট বা সাংস্কৃতিক চেতনার যেকোনো মুহূর্তে পাশে থাকতে। হোক সেটা বাংলা বইমেলা, পূজা, ঈদ মেলা, স্কুল ফান্ড রাইজিং বা কারো চিকিৎসা সহায়তা। সাহিত্য উৎসব, খেলাধুলা যেখানে পারি স্পন্সর করি, যেখানে পারি শারীরিকভাবে উপস্থিত হই, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই।
এই কাজগুলো সবসময় আর্থিকভাবে লাভজনক নয়, কিন্তু আত্মিক শান্তি অমূল্য। যখন দেখি আমার কারণে কেউ একটু সাহস পায়, কেউ সামনে এগোতে চায়, সেই অনুভূতি অনন্য।
তরুণ প্রজন্মের জন্য স্বপ্ন : নেতৃত্ব, পরিচয়, আত্মবিশ্বাস
আমার সবচেয়ে গভীর আকাক্সক্ষা, প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বড়ো হওয়া আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন নিজের শিকড় ভুলে না যায়। আমি চাই, তারা গর্ব করে বলুক, “আমি বাংলাদেশি, আমি কানাডিয়ান।”
এই দুই পরিচয়ের সমন্বয়ে তারা যেন আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আমার স্বপ্ন, একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিজেদের সৃজনশীলতা, চিন্তা, নেতৃত্ব, সংস্কৃতি সব কিছু তুলে ধরতে পারে। মিডিয়া, ব্যবসা, প্রযুক্তি, সাহিত্য, সবখানে যেন আমাদের তরুণরা আত্মবিশ্বাসের সাথে উঠে আসে।
বাংলাদেশ ফ্যাস্টিভ্যাল : মঞ্চে নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করার গর্ব
বাংলাদেশ ফ্যাস্টিভ্যাল কানাডায় বসবাসরত আমাদের সংস্কৃতি ও চেতনাকে জাগ্রত রাখার সবচেয়ে বৃহৎ আয়োজন। আমি ৪র্থ বারের মতো এই অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করি। প্রতিটি বছরেই আমি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই, নতুন শিল্পী, নতুন দর্শক, নতুন আবেগ। কিন্তু প্রতিবারই আমি শিখি আরও বেশি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন দেখি প্রবাসীরা বাংলাদেশের গানের তালে নাচছেন, মঞ্চে করতালি দিচ্ছেন, তখন মনে হয় আমরা ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও মানসিকভাবে আমরা আমাদের শেকড়ের সঙ্গেই আছি।
এই অভিজ্ঞতা শুধু পেশাগত নয়, এটি ছিল আত্মিক। আমি ভাষার, সংস্কৃতির, আবেগের সেতু হতে পেরে গর্বিত।
বর্তমানে যা দেখি
টরন্টো ও আশেপাশের এলাকা, বিশেষ করে Scarborough, East York, Danforth, Thorncliffe Park, Etobicoke, Mississauga, এবং Markham-এ অনেক বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করেন। এসব এলাকায় বাংলাদেশি দোকান, রেস্টুরেন্ট, মসজিদ, মন্দির এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রচুর। বছরজুড়ে বিভিন্ন বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, কনসার্ট, নাটক ও সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ভাষাদিবস, বসন্ত বরণ, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস প্রভৃতি দিবস পালনে বাংলাদেশিরা অনেক সক্রিয়। বাংলাদেশি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধরা টরন্টোর বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একত্রিত হন। রমজান, ঈদ, পূজা, বড়োদিন-সহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে উদযাপিত হয়।
বাংলাদেশি খাবারের জনপ্রিয়তা টরন্টোতে ব্যাপক। এজন্য বেশ কিছু বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠেছে। এছাড়া, গ্রেটার টরন্টো এলাকাতে অনেক বাংলাদেশি গ্রোসারি দোকান রয়েছে যেখানে দেশি চাল, ডাল, মসলা, মাছ-মাংস ও সবজি বেশ সুলভে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশি কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে টরন্টোতে অনেক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও কমিউনিটি নিউজ চ্যানেল রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একাধিক ফেসবুক গ্রুপ ও ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন তথ্য, সেবা ও অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।
বাংলাদেশিরা এখানে পারিবারিক জীবনকে খুব গুরুত্ব দেন। একে অপরকে সহায়তা করেন, নতুন অভিবাসীদের গাইড করেন এবং বিভিন্ন সমাজসেবা ও ভলান্টিয়ার কাজে যুক্ত থাকেন। বিভিন্ন পেশাজীবী (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রিয়েলটর, শিক্ষক, বিজনেসম্যান) বাংলাদেশি রয়েছেন যারা কমিউনিটির মধ্যে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছেন।
যদিও নতুন অভিবাসীদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে, যেমন- চাকরি খোঁজা, ভাষা ও সংস্কৃতিগত মানিয়ে নেওয়া; তবুও বাংলাদেশি কমিউনিটির সাহায্যে এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
আমি এখনও নির্মাণাধীন
আজ প্রবাস জীবনের ৯টি বছর পেরিয়ে এসে আমি যখন পিছনে তাকাই, তখন মনে হয়- আমি এখনও ‘তৈরি’ হচ্ছি।
আমি ডিজাইনার, মিডিয়া এক্টিভিস্ট, উদ্যোক্তা, রিয়েলটর- এই পরিচয়গুলো আজ একসাথে বয়ে চলেছি। প্রতিদিন শিখছি, প্রতিদিন বদলাচ্ছি, প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে ওঠছি। আমি বিশ্বাস করি, নির্মাণ কখনোই শেষ হয় না।
পরিশেষে বলতে চাই, টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন আর শুধুই অভিবাসী জনগোষ্ঠী নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠিত, কর্মঠ ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ গোষ্ঠী, যারা কানাডার বহু-সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের শেকড়কে মেলাতে শিখেছে।
যদি আমার এই অভিজ্ঞতা কোনো এক তরুণকে নিজের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করে, যদি কোনো অভিবাসী নিজেকে চিনে নিতে পারে এই লেখার মাধ্যমে, তাহলে আমি মনে করবো, আমার এই যাত্রার এক গভীর অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
ধন্যবাদ, কানাডা। ধন্যবাদ, বাংলাদেশ। ধন্যবাদ, আমার কমিউনিটিকে, আমাকে আমার নিজের মতো করে গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার জন্য।
লেখক পরিচিতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। বাংলাদেশে থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা ও গণমাধ্যমে যুক্ত ছিলেন। কানাডায় ব্যবসা ও লেখালিখিতে সক্রিয় রয়েছেন। সম্প্রতি সুব্রত কুমার দাস সম্পাদিত ‘কানাডা: বিবিধ প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে তাঁর প্রকাশিত লেখা ‘কানাডার গণমাধ্যম‘ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ।

