কেবল ব্যক্তি-স্বাধীনতা নয়, ব্যক্তি-নির্ভরতারও দেশ কানাডা
কানাডা কেমন দেশ? শান্তির, আনন্দের, সুখের, নিরাপত্তার, সমৃদ্ধির? নাকি সবকিছুকে মিলিয়ে এক করে বলে দেওয়া যায় এটা নির্ভরতার দেশ। কিসের নির্ভরতা, কেমন নির্ভরতা? সত্যি করে বলতে গেলে কানাডা হলো ব্যক্তির নির্ভরতা বা আত্মনির্ভরতার জায়গা। আমি নারী হিসেবে দেখেছি, এখানে নারীর জন্য সব ধরনের নির্ভরতা রয়েছে; মানুষ হিসেবে অনুভব করেছি এখানে মানুষের জন্য সব রকমের সু-ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি ও প্রকৃতির বিপুলতাকে আশ্রয় করে এখানে দিনে দিনে সমাজ ও রাষ্ট্র গভীরভাবে মানবিক হয়ে ওঠায় কানাডা মানুষের জন্য কল্যাণের ও নির্ভরতার দেশ হতে পেরেছে।
আমি কানাডায় এসেছি ১৯৮৯ সালে। সময়ের হিসেবে প্রায় সাড়ে তিন দশককাল পার করে দিলাম। দীর্ঘ এই জার্নিতে অনেককিছু যেমন পেয়েছি, হারিয়েছিও বেশকিছু। তবে, সত্যি কথা বলতে কী, নিজের জন্য, অপরের জন্য জীবনে যতটুকুই করতে পেরেছি; হয়তো তা খুবই সামান্য, কিন্তু মাঝে-মধ্যে ভাবি বাংলাদেশে থাকলে এসবের কিছুই হয়তো করতে পারতাম না। কানাডা আমার কাছে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার বিবেচনায় চমৎকার একটি দেশ। সামাজিকভাবে স্বচ্ছন্দ না থাকতে পারলে, আর্থিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলে জীবনের অনেক কাজ আটকে যায়। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই বাস্তবতাকে আমি নিবিড়ভাবে অনুভব করতে পেরেছি। কানাডা সেই উপলব্ধি তৈরিতে আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে নিঃসন্দেহে।
২.
আমার জীবনের প্রধান পথ হলো সুন্দরের জন্য কাতরতা। সুন্দরকে ভালোবেসে বেঁচে থাকার উৎসাহ প্রথমত আমি আমার পরিবার থেকে পেয়েছি। বাবা-মা, ভাই-বোন থেকে শিখেছি। শ্বশুর-শাশুড়িও হাতে ধরে শিখিয়েছেন অনেককিছু। আমার স্বামী কবি ইকবাল হাসান ছিল ভালো বক্তা। সুন্দর করে কথা বলতো ও। মানুষের সাথে প্রবলভাবে মিশতে পারতো। আমি তো আর একদিনে বা একা একা তৈরি হইনি। সংসার জীবনে এসে স্বামীর কাছ থেকেও শিখেছি; কীভাবে মানুষের সাথে মিশতে হয় এসবের কলাকৌশল জেনেছি। ইকবাল মানবতার জন্য নিবেদিত ছিল। আমার বাবাও। তিনি সবসময় মানুষকে সাহায্য করতেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল আমাদের পরিবারে। তিনি দুঃখী মানুষের পাশে ছিলেন। তিনি বরিশালে একটি জমিদার বাড়ি কিনেছিলেন। সেখানে আমি বৈচিত্র্য ও আনন্দের ভিতর দিয়ে শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছি। আমার স্বামী এই টরন্টোতে বহু মানুষের খারাপ সময়ে, ভালো সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের টরন্টোর বাড়িতে অনেক মানুষ আসতো। সাহিত্যের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেছিল এক সময় আমাদের নাইন আইসক্রিম লেনের বাড়িটি। আড্ডা চলতো কখনো কখনো গভীর রাত অব্দি। আড্ডায় আসা লেখক-শিল্পী-শ্রোতার আপ্যায়ন করতে খুব আনন্দ পেতো কবি ইকবাল হাসান। চাকরির ব্যাপারেও অনেককে সহযোগিতা করেছে। এগুলো আন্তরিকতার সাথে করতো ও। নতুন কেউ যখন আসে প্রবাসে, তখন দেশ থেকে অনেকে অনেককিছু ছেড়ে আসে। নতুন জায়গায় তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়; কতরকম সহায়তা লাগে! ইকবাল সেগুলো করেছে। আমিও করি যথাসম্ভব। অফিসে, পরিচিতজন কেউ বিপদে পড়লে তাদের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। আমি মনে করি, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো দরকার। যাদের অর্থ আছে, সকলেরই উচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমি লেখালিখি থেকে পাওয়া টাকা দরিদ্রদেরকে দান করি। বাংলাদেশে যে-সকল শিশু রাস্তায় আশ্রয়ে থাকে, খেতে পায় না, দুধ পায় না; ওদেরকে দুধ কিনে দেওয়ার কাজে ওই টাকাটা দিই। বরিশালে সাহিত্য সংগঠন পরিচালনায় আর্থিকভাবে সহায়তা করি; লেখকদেরকে সম্মাননা ও সম্মানী দেওয়ার চেষ্টা করি। এভাবে মানুষকে ভালোবাসার মধ্যদিয়ে জীবনের সুন্দর দিকগুলোকে আমি উদযাপন করি। ভালোর মধ্যদিয়ে টিকে থাকার মানেই জীবনের সফলতাকে স্পর্শ করা; আমি এরকমই মনে করি। আর এসব করার সাহস প্রবলভাবে যুগিয়েছে আমার কানাডা। কেননা, কানাডায় শ্রমের মর্যাদা আছে; প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব আয়-উপার্জন দিয়ে আন্তনির্ভরশীলতা অর্জন করতে শেখে এখানে। আমিও শিখেছি। কাজ করে যে অর্থ আয় করি, তা থেকে কিছুটা আমি অপরের কল্যাণে দিতে পারি। এটা যে কত বড়ো আনন্দের ব্যাপার, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
আমি কর্মপ্রিয় মানুষ। কাজের মধ্যদিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করি। কানাডায় আসার পর থেকেই চাকরি করি আমি। জিএনকে সার্ভিসেস-এ প্রায় ৩০ বছর কাজ করেছি। ওটি আমেরিকান কোম্পানি। পরে সিনতাস ওটা কিনে নেয়। সিনতাসও আমেরিকান। এটা বেশ বড়ো কোম্পানি। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ বছরের চাকরি আমার। এখানে গার্মেন্টস সামগ্রী আসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। হসপিটাল থেকেও অনেক কাপড় আসে ওয়াশিং-এ। নতুন কাপড়ও বানায় এই কোম্পানি। আমি কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সে কাজ করি। খুব ভালো কোম্পানি। কর্মচারীবান্ধব পরিবেশে কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কাজ করে অ্যাক্টিভ লাইফে থাকতে পারা জীবনের বিরাট আনন্দের ব্যাপার। সকালে অফিসে এক্সারসাইজ করায়। ফিজিক্যাল ফিটনেস-সহ নানান বিষয়ে কোম্পানি বেশ সিরিয়াস। নানান রকম বেনিফিট দেয়। সংসারের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসও দেয়। কাজ করে আমি সন্তুষ্ট। সহকর্মীদের আন্তরিকতা আর সহযোগিতা আমাকে কাজ করে যেতে উৎসাহ যোগায়। মাঝে-মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কখনো শরীর খারাপ থাকলে মনে হয় কাজ ছেড়ে ঘরে বসে থাকি। কিন্তু অফিসের সহকর্মীদের ভালোবাসা আমাকে বারবার কাজে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ছুটি কাটাতেও অনেক সময় মন সায় দেয় না। এই যে কাজের সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ, তা হয়তো বাংলাদেশে পেতাম না। এটাও আমার কানাডা-প্রীতির আরেকটি কারণ।
প্রবাসে কাজ ছাড়া তো টিকে থাকা কঠিন ব্যাপার। যদিও আমার কন্যা আমেরিকায় খুব ভালো চাকরি করে। কিন্তু আমি তার কাছ থেকে সহায়তা নিই না; কারণ, তারও তো সংসার আছে। তার মানে দাঁড়ায় এই যে, কানাডা আমাকে স্বাবলম্বী হতে শিখিয়েছে দারুণভাবে। আমার জন্মভূমি বাংলাদেশে যে মেয়েরা স্বাবলম্বী হচ্ছে না, আমি সে কথা কখনই বলি না। বরং বলি, পারিশ্রমিক ও আর্থিক নিশ্চয়তার কথা। কানাডায় ব্যক্তি-স্বাধীনতা যেমন উদযাপন করছি, পাশাপাশি ব্যক্তি-নির্ভরতার স্বাদও লাভ করেছি। এটাই বড়ো অর্জন আমার জীবনে। এমনটি হয়তো অনেক দেশেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবারের একজন বা দুজন চাকরি করে যা উপার্জন করে, তাতে কোনো রকমে সংসার চালানো যায় কেবল। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা করা সেইসব চাকরিজীবীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আমি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছি। বোধহয় এই কারণেই কানাডা বিশ্বব্যাপী বহু মানুষের কাছে আগ্রহের দেশ হিসেবে পরিচিত। আয় করে আমি সচ্ছল বলেই দেশ থেকে পরিবারের সদস্যদেরকে স্পন্সর করতে পেরেছি। প্রয়োজনে দেশে আত্মীয়-পরিজনদের পাশে আর্থিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারছি। এই সামর্থ্যটুকু আমাকে কানাডা দিয়েছে। সম্প্রতি বরিশালে প্রতিষ্ঠা করেছি ‘ইকবাল-তসলিমা ফাউন্ডেশন’। এর মাধ্যমে দরিদ্রকে সহায়তা করছি। প্রতি বছর অনেককে রিক্সা, নৌকা কিনে দিচ্ছি। বেশকিছু খাবার পানির কল স্থাপন করেছি। অনেককে ঘরের টিন কিনে দিয়েছি। গরু-ছাগল কিনে দিয়েছি। কবি বেঁচে থাকতে এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছি আমরা। গত বছর আমি পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ করেছি মানুষের কল্যাণের পথে। দুস্থ মানুষের সেবার পাশাপাশি কবি-সাহিত্যিকদের সম্মাননা ও পুরস্কার দিয়েছি। এছাড়া, বরিশালে পৈত্রিক বাড়ি থেকে, ঢাকার ফ্ল্যাট মাসে মাসে থেকে ভাড়ার যে টাকা পাই, তা বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে ব্যবহার করি। অসহায় ও বিপন্ন মানুষের যেমন উপকার করতে পারি, তেমনই শিল্প-সাহিত্য-সমাজসেবায় নিয়োজিত মানুষদেরকে সম্মাননাও প্রদান করতে পারছি এই ফাউন্ডেশনের কাজের মধ্যদিয়ে।
৩.
কানাডা বৈচিত্র্যের দেশ। এখানে আছে প্রকৃতির বৈচিত্র্য, মানুষের বৈচিত্র্য, ভাষার বৈচিত্র্য, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। মাল্টিকালচারাল এই দেশে রাজনৈতিক পরিশুদ্ধতাও আরেক বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে। রাজনীতি এখানে সংস্কৃতিরই একটি অনন্য অংশ হয়ে ওঠেছে। মানুষ তার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবনা-কল্পনাকে নিজের মতো করে দেখতে পারে। আরোপিত কোনো বিষয় এখানে মানুষকে বিপন্ন করে তোলে না। যার যার ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা ও লালনের অধিকার উন্মুক্ত থাকায় ব্যক্তির বিকাশ এখানে স্বাভাবিক। প্রতিবন্ধকতাকে কানাডার সমাজ ও সরকার মোকাবিলা করে চলেছে যথাযথ পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। এটা ভাবতে আমার ভালো লাগে। নিরাপদ লাগে। আনন্দ পাই। চলাফেরায়, কাজে, সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে কানাডা যে বৈচিত্র্যের সন্ধান দিয়েছে, তা আমি প্রতিদিন যাপন করি।
কানাডা সিনিয়র সিটিজেনদের নিরাপদ আবাসভূমি। বৃদ্ধ হলে সন্তানাদির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার যে দুশ্চিন্তা আমাদের দেশে দেখেছি, কানাডায় তা নেই। বয়স্কদের জন্য সকল ধরনের নাগরিক সুবিধা কানাডাকে দিনে দিনে মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলেছে। কানাডার ভেজালমুক্ত খাবার সত্যি এক বিরাট নিয়ামত। নিশ্চিন্তে সকল খাবার খাওয়া যায়। ভেজালের আশঙ্কা নেই। সুষ্ঠু চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনা কানাডাকে আরেকটি নির্ভরতার জায়গা। রোগী বা রোগ নিয়ে ডাক্তার বা হাসপাতালের মালিকরা এখানে ব্যবসা করে না; যেমনটা বাংলাদেশে হয়। এখানকার নিরাপদ ও সুন্দর যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে; নির্ভয়ে, বিনা টেনশনে যেকোনো খাবার খেতে পারা, অসুস্থ হলে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া আর প্রয়োজনে যখন-তখন যেখানে-সেখানে যাতায়াতের সুবিধা যে কতো বড়ো নাগরিক অধিকার, তা কানাডায় না এলে টের পেতাম না। আমার কেবলই মনে হয়, এসব সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সুবিধাও ব্যক্তি-নির্ভরতার অন্যতম কারণ। যে কারণে কেউ একবার কানাডায় এলে আর নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় না (অল্পকিছু ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়)। আমিও কানাডায় আসার পর আর কখনো স্থায়িভাবে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারিনি। সম্ভবত এখানে আমি প্রার্থিত প্রশ্রয় ও আশ্রয় পেয়েছি।
৪.
কানাডায় বহু-সংস্কৃতির কোলাহল ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতায় কোনো কোনো কমিউনিটি অনেক এগিয়েছে, আবার অনেকে পিছিয়েও পড়েছে নিয়মমাফিক দৌড়ে। এখানে বাঙালি ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চাও। তবে, বিভিন্ন সংগঠনের আদর্শ-নীতি এবং সদস্যদের মধ্যে মত-পার্থক্যের কারণে কখনো কখনো অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা যে সৃষ্টি হয়নি, তা কিন্তু নয়- হয়েছে। কানাডায় সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে আমি সম্পৃক্ত হতে চেয়েছি। কিন্তু ইকবাল হাসান আমাকে মানা করেছে। ও বলতো, ‘এখানে সংগঠনগুলোতে অনেক রাজনীতি আছে, এগুলো তুমি বুঝবে না, সামাল দিতে পারবে না। এসব জায়গায় ব্যাক-বাইট হয়; এসব তুমি নিতে পারবে না। তার চেয়ে ঘরে বসে পড়ো, লেখো। ওটাই তোমার জন্য ভালো হবে।’ অনেক সংগঠন আমাকে নিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি কখনো যাইনি। তবে, এখন সিনিয়রদের কিছু সভায়, সম্মেলনে যোগ দিই। এসবের মধ্যে শুধু নির্ভেজাল আনন্দ ও আড্ডা উপভোগ করি। আমি খাওয়া-দাওয়া করতে ভালোবাসি, বন্ধু-পরিজনদের খাওয়াতে পছন্দ করি; তাই এইসব আড্ডা-আয়োজন আমার জীবনে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। কারো বাসায়, পার্কে বা কোনো অনুষ্ঠানে অবসর সময় কাটাতে আমার বেশ লাগে। আমি এগুলো এনজয় করি।
মিডিয়ার দিক থেকে কানাডায় বিশেষ করে টরন্টোতে বাঙালি কমিউনিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এখানকার বাংলা পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো বেশ গুছিয়ে কাজ করছে বলে আমার ধারণা। লেখালিখির জগতেও অনেকের অবদান সত্যিই ঈর্ষণীয়। দেশ-বিদেশের বইমেলায় কানাডা প্রবাসী বাঙালি লেখকদের নতুন নতুন বইয়ের সমারোহ আমাকে প্রেরণা যোগায়। আমি লিখতে আগ্রহ বোধ করি। মন্ট্রিয়ল বইমেলা, টরন্টো বইমেলা আমাদের প্রাণের আনন্দকে উসকে দেয়। এসব আয়োজনে অনেক শ্রম ও আন্তরিকতা আছে; তবে, আমার মনে হয় এইসব আয়োজন আরো পরিকল্পিত ও গোছানো হতে পারে। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজের ভাষা-সংস্কৃতিকে পরিবেশন করার জন্য প্রবাসীদেরকে সমবেতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে হাত বাড়াতে হবে।
সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি কানাডার রাজনীতিতেও বাঙালির অংশগ্রহণ আরো জোরদার হওয়া দরকার বলে মনে করি। এখানে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রভাব ও চর্চা বেশি। তবে হ্যাঁ, ইদানীং হচ্ছে। কেউ কেউ এগিয়ে আসছেন কানাডার মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে। এটা আনন্দের খবর। এখানে দেশের রাজনীতির যে চর্চা হয়, তা হয়তো কিছু প্রভাব ফেলে। কিন্তু দেশ ফেলে প্রবাসে আসার পর এখানকার রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার পক্ষে আমার অবস্থান। যদিও রাজনীতি আমি কম বুঝি। রাজনীতি তো বোঝার ব্যাপার। পড়তে হবে, জানতে হবে। শিক্ষিত ও যোগ্য লোকের জন্য রাজনীতি এই দেশে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও কানাডার রাজনীতির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখানে বাংলাদেশিরা শো-আপ করে বেশি। রাজনীতি না-বুঝবার কারণে মেইনস্ট্রিমে বাঙালি পিছিয়ে আছে। আমি মনে করি কানাডার মেইনস্ট্রিমের কালচারাল যে দলগুলো আছে, তাদের কাছ থেকে শিখতে হবে। ওরা অনেক সমৃদ্ধ। যেমন, গ্রিক কমিউনিটির কথা ধরা যেতে পারে। তারা তো অনেক কিছু করে। চাইনিজরাও অনেকভাবে এগিয়ে। এমনকি ইন্ডিয়ানরাও। কানাডিয়ান কালচার থেকে, অন্যান্য কমিউনিটি থেকে না শিখে কেবল দেশের সবকিছু টেনে এনে এগোনো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশিরা এখানে অনেক বেশি দেশীয় ভাবমূর্তি ও সমাজ-রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। ভালো কিছুর জন্য অবশ্যই ভালো থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। কানাডার বহু-সংস্কৃতির মূল্যবোধ ও ভাবধারাকে আয়ত্ত করার কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। পারিবারিক উত্তরাধিকারী হিসেবে এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করতে হয় কমিউনিটির সেবা করে। সে-পথে বাঙালির আগ্রহ এখনও অনেকটা কম বলে মনে হয়েছে। যেহেতু কানাডা আত্ম-নির্ভরতার ভূমি, তাই এখানে নিজেকে আত্ম-নির্ভরশীল করে তবে মানুষের জন্য, সমাজের ও রাষ্ট্রের জন্য কিছু কাজ করার জন্য তৈরি হতে হয়। সবার সাথে মিলেমিশে, মানুষের উপকার করে, নিজে উপার্জন করে খেয়ে-পরে জীবনের পথ পাড়ি দেওয়াতেই আনন্দ। কারো ওপর নির্ভরতা আমার ভালো লাগে না। আমি ভীষণভাবে আত্ম-নির্ভরশীল। মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই। কানাডা আমাকে সেই মর্যাদা ও সুখ অনুভব করার সুযোগ দিয়েছে।
কানাডায় সম্প্রতি নতুন ইমিগ্র্যান্ট বেড়েছে। অনেক লোক এসেছে, কিন্তু কতজন শিক্ষিত জানি না। শুনতে পাই, অনেক লোক আছে, যারা কম শিক্ষিত। এখানে তো প্রচুর জায়গা আছে। কাজ করে টিকতে পারলে ভালো। বাংলাদেশ ছাড়াও সিরিয়া, ইউক্রেন, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, হংকং, মেক্সিকো, সোমালিয়া, আফগানিস্তান থেকে মানুষ এসেছে। সবাই আশা নিয়ে এসেছে। তারা ভালো থাকলে দেশের জন্যও ভালো; ওসব দেশে চাপ কমবে। এখানে এখন জব মার্কেটের অবস্থা ভালো না যদিও; কিন্তু কাজ আছে অনেক রকম। এখানকার জবের জন্য প্রয়োজনীয় লেখাপড়া করে তারা যদি টিকে থাকতে পারে, মন্দ কী? আমরা এখানকার বাসিন্দারা তো নতুনদেরকে খাওয়াচ্ছি না, ডলার দিচ্ছি না। সরকার যতটুকু পারে হেল্প করছে। তো লোকেদের সমস্যা কী? এটাকে নেগেটিভলি নেওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। বরং যেকোনোভাবে মানুষকে সাহায্য করা উচিত।
আমি সকলের ওপর সহজে আস্থা রাখি। মানুষকে নেগেটিভভাবে চিন্তা করতে পারি না। তবে, মাঝে-মধ্যে মনে হয় সবার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; অনেকে সরলতার সুযোগ নিয়ে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তবে, কানাডা কিন্তু ইতিবাচক ভাবনার দেশ, নেতিবাচকতাকে ঝেড়ে ফেলতে না পারলে আমরা কানাডায় থেকেও পিছিয়ে-পড়া পরশ্রীকাতর বাঙালিই রয়ে যাবো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে যত মানুষ কানাডায় আসতে চায়, আসুক। তবে, অবশ্যই আসার আগে এখানকার চাকরির বাজার, কাজ পাওয়ার জন্য কী কী যোগ্যতা লাগে, সেসব বিষয়ে জেনে-বুঝে আসতে হবে। অনেকে এসব বিষয়ে খোঁজ-খবর না নিয়ে এসে কষ্টের মধ্যে পড়ে। এটি অভিবাসীর দেশ। যতো বেশি যোগ্য লোক এখানে আসতে পারবে, নিজ নিজ দেশের জন্য ততো ভালো। কারণ তারা তো এখানে কাজ করে দেশে আত্মীয়-স্বজনের জন্য ডলার পাঠাতে পারবে। এতে পরিবার এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে। আর কানাডাও তো লস করছে না; এত যোগ্য মানুষের শ্রম আর মেধার ওপরেই তো দাঁড়িয়ে আছে কানাডার বিকাশধারা।
ব্যক্তিগতভাবে প্রচার-প্রসার মানুষের চিরায়ত বাসনা। কানাডায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে; কাজের, ভাবনার, পরিকল্পনার পথে এখানে পরিবার বা রাষ্ট্র কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে, নিজের সাথে বোঝা-পড়ার ভিতর দিয়েও দশের জন্য, দেশের জন্য নিজেকে নিবেদিত রাখতে হলে প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয় ও পরিবেশ। আর সবচেয়ে বেশি দরকার আত্ম-নির্ভরতার। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভোগ করার পাশাপাশি আমি অর্জন ও প্রাপ্তিও পছন্দ করি। কিন্তু তা বিশেষ মর্যাদার পথে যেন তা হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে ভুলি না। আমার এই অনুভবের শক্তি ও সামর্থ্যকে প্রতিদিন ঘুড়ির লাটাইয়ের সুতোর মতো প্রলম্বিত করে চলেছে আমার কানাডা; আমার আশ্রয়; আমার আত্ম-নির্ভতার পথের দিশা।
লেখক পরিচিতি
কবি ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম বাংলাদেশের বরিশালে। স্বামী খ্যাতিমান কবি ইকবাল হাসান। স্কুল জীবন থেকেই তসলিমার লেখালেখি শুরু। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি দেশের বাইরে। ত্রিশ বছর যাবৎ আমেরিকান একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে চাকরি করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : নিঃশব্দে নিশীথে, আঁধার কন্যা, প্রস্ফুটিতা, কেউ কেউ কেবল কাঙাল হয়। ‘অপূর্ণ গোধূলি’ তাঁর পঞ্চম একক কাব্যগ্রন্থ। ‘চোখের মণি’ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস।

