ঘর, ফেরা হয়নি আমার ঘর

ডক্টর শান্তনু বণিক

ঘর
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অসীম সম্ভাবনা, বহুত্ববাদ আর বহুসংস্কৃতির এক অদ্ভুত মিলনস্থল এই কানাডা। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শীতপ্রধান এই দেশটি যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যে ভরা, তেমনি গত অর্ধ-শতাব্দী ধরে অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে মেধা, মনন, জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, কৃষ্টি, খাদ্যাভ্যাস বা আচার-ব্যবহারের দিক থেকেও অসীম অনন্য বৈচিত্র্যময়।

অসম্ভব দুর্বিনীত কিন্তু ভয়াবহ স্বদেশ-কাতর একজন মানুষ আমি, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে স্বল্প সময়ের জন্য থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে এসেছিলাম কানাডাতে। ঢাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা। ঢাকা ছিল আমার একান্ত নিজের শহর; এক বেলা ঢাকা ছেড়ে গেলে মনে হতো, কী যেন হারিয়ে ফেললাম। সেই শহরে আপাত বদ্ধ-পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সারাক্ষণ জীবন যুদ্ধ করে নিজের জায়গা দখল করে রাখার মানসিকতার একজন ছিলাম। বাংলা নাটক-গান-সংস্কৃতি, মূল্যবোধ চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম বলে কেউ ভাবতেও পারেনি আমি খুব বেশিদিন দেশের বাইরে থাকতে পারবো।

নব্য পরিণীতা স্ত্রীর সাথে যখন কানাডার ক্যালগেরি শহরে প্রথম পা রাখি, ইউনিভার্সিটি সুপারভাইজারের বন্ধু সূত্রে পরিচিত হওয়া রতনদা এসেছিলেন এয়ারপোর্টে তার ছয় মাসের ছেলে সায়ানকে নিয়ে আমাদেরকে বাসায় নিয়ে যেতে। উনি বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর দুজনেরই দেশের জন্য এত খারাপ লাগতে থাকলো যে, কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী বললো, “চলো, ফিরে যাই!”

অথচ, আজ প্রায় দুই দশক হয়ে গেল, কীভাবে যেন ক্যালগেরি, কানাডা হয়ে গেল আমার ঘর! প্রবলভাবে ভালোবেসে ফেললাম এই শহর, এই দেশ, এই প্রকৃতি, এই শীতল তুষারময় আবহাওয়া, আর এর মানুষগুলোকে…।

আত্মানুসন্ধান
প্রথম বছরটা খুব কষ্টে কাটলো, পড়াশোনা বা কোনো কিছুতেই মন বসে না। দেশের জন্য, বাবা-মা-ভাইয়ের জন্য বুক ছিঁড়ে কান্না আসে… বন্ধুদের কথা মনে হয়, মনে হয় আমার প্রিয় শহরের কথা। শহরে একটা মাত্র বাংলাদেশি দোকান; মাইনাস ত্রিশ তাপমাত্রায় তুষারপাতের মধ্যে বিশাল জ্যাকেট-বুট পরে, দুই হাতে আর পিঠে ভারি ব্যাগ নিয়ে, দুইবার বাস আর একবার ট্রেন পরিবর্তন করে দেড়-দুই কিলোমিটার হেঁটে সেখান থেকে দেশের জিনিস কিনে আনি দুইজনে। দুই বছর আগে এক্সপায়ার করে যাওয়া বরফায়িত ইলিশ মাছ বাসায় এসে ভিজানোর পর গলে যায় জলের মধ্যে, সেই কাঁশটে গন্ধ হয়ে যাওয়া পচে-গলে যাওয়া ইলিশ মাছ সর্ষের তেলে ভেজে খেয়ে দেশের মাছ খাচ্ছি ভেবে সান্ত¡না পাই- দেশের গন্ধ পাই!

এখানে আসার পর অনেকদিন ধরে নিজেকে চিনতে পারি না, এই কী সেই আমি! যে মানুষ ঢাকায় দুইশ গজ যেতে রিক্সা ডাকতাম, নিজের গ্লাসে জলটা নিজে ভরে খেতে হতো না, সেই আমরা দুজনে ভোর সাড়ে পাঁচটায় ওঠে ছয়টায় বাস ধরি, বাস-ট্রেন পালটে ইউনিভার্সিটি যাই, সারাদিন পড়াশোনা-ক্লাস শেষে ল্যাবে রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করে রাত বারোটায় বাড়ি ফিরি… অতিপরিচিত কষ্টে ভরা পরিশ্রমী অভিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন! ফেলে আসা জীবনের কথা ভেবে প্রতিনিয়ত দীর্ঘশ্বাস ফেলি…।

আস্তে আস্তে হয়তো মনোজগতে পরিবর্তন হচ্ছিল, তখন রাতারাতি টের পাইনি। কানাডিয়ান সংস্কৃতির ভদ্রতা, সৌম্যতা, স্বেচ্ছায় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা, বহুত্ববাদ, পরমতসহিষ্ণুতা ধীরে ধীরে নীড় বাঁধে আচরণে, ব্যবহারে, জীবনযাপনে।

এখন যখন ফিরে তাকাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘটনাগুলো। রাতের বেলা ফেরার সময় ট্রেন কয়েক মিনিট দেরি হলেও বাস মিস হয়নি, কারণ শিখ বাস ড্রাইভার আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, জানে আমরা ফিরবো সেই সময়ে। কখনো-বা তুষারের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছি দূরের বাস স্টপের দিকে, হঠাৎ দেখি পাশে এসে বাস থামলো- এক শ্বেতাঙ্গ বাস ড্রাইভার তুলে নিলো আমাদের এই ভয়াবহ শীত থেকে বাঁচাতে। কখনো রাস্তার মাঝে হাত তুলে বাস থামিয়ে ড্রাইভারকে পথ জিজ্ঞেস করেছি কতবার, নিরাশ হইনি একবারও, বিরক্ত হতে দেখিনি। অ্যপার্টমেন্টের বুড়োবুড়িরা দেখা হলেই গল্প জুড়ে দেয়, তাদের জিনিসপত্র তুলতে সাহায্য করতে গেলে তারা করতে দেয় না; নিজের কাজ নিজেই করবে বলে। শুধু যে বিদেশিরাই এরকম তা নয়, দেশের প্রবাসীরাও অসম্ভব আন্তরিক, দেশ থেকে আসা অজানা-অচেনা মানুষদের আপন করে নিয়ে যথাসাধ্য সাহায্য করার ব্যাপারটা খুব ভালো লেগে যায়।

ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময় আবিষ্কার করি এই দেশের সবচেয়ে চমৎকার কিছু ব্যাপারের মধ্যে একটা হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবার সংস্কৃতি। এই যে সমাজ, দেশ, কমিউনিটি, পরিবেশকে নিজের ভেবে দায়িত্ব নেওয়া, সেটার সাথে সেই সময় সামাজিকভাবে পরিচিত ছিলাম না অতটা, সবটাই ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। একদম ছোটোবেলা থেকে শেখানো হয়, কিন্ডারগার্টেন-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরি ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবাকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করা হয়, অসম্ভব গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশে বিভিন্ন আপদে, বিপদে, দুর্ঘটনা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ে সবসময়ই চেষ্টা করতাম সাহায্য করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু এখানে শুধু আপদকালীন সময় নয়, সমাজ-সভ্যতা-পরিবেশের প্রতিটা কাজের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবা আর সমাজসেবার সুযোগ রয়েছে। কোথাও কোনোকিছু ঠিক নেই দেখলে লোকজনকে দেখি নিজের দায়িত্ব মনে করে কাজে লেগে যেতে- শিখলাম যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রে ‘ঔনারশিপ’ ব্যাপারটা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মন-মানসিকতা।

সেই শিক্ষাটা পাওয়ার পর মনে হলো, স্বদেশ-কাতরতা নিয়ে বসে থেকে তো কোনো লাভ হবে না, বিদেশেই দেশের সুশিক্ষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টি নিয়ে বাঁচা সম্ভব। সেই বোধ থেকে জড়িত হয়ে গেলাম শহর ও প্রভিন্সের বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সামাজিক, পেশাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে। নানারকম অর্গানাইজেশনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা শুরু হলো, সমাজের কাজে লাগার জন্য বা দেশীয় ভাষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবায় যেন হারিয়ে ফেলা নিজেকে ফিরে পেলাম আবার। সেই নেশাতেই টিকে গেলাম হয়তো এই প্রবাসে!

ক্ষতিপূরণ
কানাডার শহরগুলোর কেন্দ্রে একদল গৃহহীন বা হোমলেস মানুষের দেখা মেলে। মলিন জীর্ণ বস্ত্র, অনেক সময়ই দেখতে ভিন্ন রকম, কখনো-বা মাতাল, কারো কারো সাথে থাকা ঝোলা, কখনো অসুস্থ এই মানুষগুলো রাস্তায়, ট্রেন/বাস স্টেশনে পড়ে থাকে, কখনো ভিক্ষা করে বা মানুষের দানের টাকায় চলে। হঠাৎ কখনো দেখা যায় কারো সাথে ঝামেলা করছে, কিংবা কোনো কারণে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কানাডা আসার পর এদের সাথে কয়েকটা ঘটনা দেখে প্রথম দিকে কেমন যেন একটা ভয় কাজ করতো, একই সাথে আগ্রহও জাগতো, এরা এমন কেন? কখনো কেউ একজন তেড়ে এসেছে, কেউ-বা জ্যাকেটে থুতু দিয়েছে, কেউ এসে সিগারেট বা বিয়ার কেনার টাকা চেয়েছে, কেউ মারতে চেয়েছে, কেউ খাবারের ময়লা ছুঁড়ে মেরেছে…; আর একবার ট্রেন স্টেশনে অপেক্ষারত আমাকে দেখে গালে এসে চুমুও খেয়েছে! কিন্তু এসব সত্ত্বেও আগ্রহ থেকেই জানতে পারি এই হোমলেসদের একটা বড়ো অংশই আসলে কানাডার আদিবাসী।

একদিন রাতে অফিস থেকে ফিরছি, ট্রেনে আমার উল্টো পাশে একজন আদিবাসী এসে বসলো। পোশাক মোটামুটি ভালো, কিন্তু মনে হলো কিছুটা মাতাল। আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, আমি কে, কোথা থেকে এসেছি। উত্তর দিতেই আমাকে বললো, “তোমরা অভিবাসীরা এসে আমাদের সবকিছু নিয়ে যাচ্ছো, তুমি কী নিতে এসেছো?” আমি জানালাম কোনো কিছু নেওয়ার ইচ্ছা আমার নেই, আমি তোমাদের ভার্সিটির আমন্ত্রণে এসেছি এবং কানাডা ভালো লেগে যাওয়ায় থেকে গেছি। সে তখন হঠাৎ বললো, “আমি তো তোমাকে আমন্ত্রণ করিনি! আর যারা করেছে তারা তো আমন্ত্রণের অধিকারই রাখে না। আমি-আমরা এই কানাডার মালিক, তোমরা সবাই আমাদের সবকিছু আস্তে আস্তে দখল করে নিয়েছো, নিচ্ছো!” ট্রেন থেকে নেমে আমার কানে বাজতে থাকলো, “আমি-আমরা এই দেশের মালিক, তোমরা আমাদের সবকিছু দখল করে নিচ্ছো!”

কানাডার আদিবাসীরা মোটামুটি তিন ধরনের, ফার্স্ট নেশনস, ইনুট আর মেটি (ইউরোপিয়ানদের সাথে মিশ্রণ); কানাডায় প্রায় ৬০০ রকমের ভিন্ন ভাষাভাষি বা সংস্কৃতির ফার্স্ট নেশনস রয়েছে। এদের একটা অংশ ইউরোপিয়ান বা অভিবাসীদের কারণে বাস্তুহারা। এদেরই একটা অংশকে দেখা যায় পথে-ঘাটে। জানতে পারলাম, কেন এদেশে আপাতদৃষ্টিতে এরকমভাবে থাকতে দেওয়া হয়। আদিবাসীদেরকে সবাই আলাদা সম্মানের চোখে দেখে, কারণ এরাই তো কানাডার আসল মালিক। বিভিন্ন এলাকা এদের জন্য সংরক্ষিত করে রাখা হয়, সেখানে বাইরের কেউ গিয়ে কিছু করতে পারে না। সরকার নানারকমের সুযোগ-সুবিধা দেয়, পড়াশোনা-চাকরি বা আয়করেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলো সবই আসলে কলোনিয়াল সময় থেকে চলে আসা অপরাধ, অত্যাচার, অনেক আদিবাসী জাতি-গোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘটনা আর আদিবাসী শিশুদের জোর করে ধরে এনে স্কুলে রেখে অত্যাচার ও হত্যার যে ইতিহাস তার ক্ষতিপূরণের একটা প্রচেষ্টা মাত্র। এই অত্যাচারের ইতিহাস এতটাই ভয়াবহ যে সব কানাডিয়ান এর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী, অনুতপ্ত। তারপরও আদিবাসীরা আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কর্পোরেট লোভ আর অভিবাসনের চাপে।

ইতিহাস জানার পর এখন আর এই আদিবাসী গৃহহীনদের ভয় লাগে না, বরং একটা মায়া চলে আসে। কানে বাজে, “আমি-আমরা এই দেশের মালিক, তোমরা আমাদের সবকিছু দখল করে নিচ্ছো!” মনে পড়ে যায়, আমরা আমাদের দেশের আদিবাসীদের সাথেও একই কাজ করছি এই যুগে এসেও- একসময় সেই ঋণ আমাদের শোধ করতে হবে…।

বৈচিত্র্য
আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কানাডার কোন ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো লাগে? আমার উত্তর হবে খুব সম্ভব- সমাজের ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও বহু সংস্কৃতির মিলনমেলা। যে-কেউ কানাডিয়ান হয়েও তার ধর্ম বিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পোশাক-খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা কারোর জন্য ক্ষতিকারক হয়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির এই সংস্কৃতির মিলন, জাতি-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্য, খাদ্যাভ্যাস বা পোশাকের বহুমাত্রিকতা, বিভিন্ন বিশ্বাস বা ঐতিহ্যের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর নিজেকে প্রকাশের স্বাধীনতা সত্যিই কানাডাকে এক অনন্য দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

নিজের সত্ত্বা বজায় রেখেও বিদেশের এই মূলধারার সমাজে একীভূত হওয়া সম্ভব, এটা আসলে আমার জন্য এক বিস্ময় হয়ে দেখা দিয়েছিল প্রথম প্রথম। এই পরমতসহিষ্ণুতা, সেক্যুলারিজম আর বহুত্ববাদ, প্রতিটি মানুষকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন নির্বিশেষে নিজের মতো করে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বাধীনতা দেয়।

আমার মেয়েকে যখন কিন্ডারগার্টেনে স্কুলে ভর্তি করা হয়, স্কুলের শিক্ষক বার বার আমাদের মনে করিয়ে দেন বাড়িতে যেন সবসময় বাংলাভাষার চর্চা করা হয়, নিজেদের সংস্কৃতি যেন পালন করা হয়। আমরা অবাক হই। শিক্ষক বুঝিয়ে দেন, নিজের কালচারাল রুটের সাথে বন্ধন ছোটোবেলার শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করে। আমাদের বিস্ময় আরো বাড়ে, যখন দেখি কিন্ডারগার্টেনের প্রতি মাসে আমাদের মেয়েকে ক্লাসে যে প্রেজেন্টেশন দিতে হয়, সেই বিষয়গুলো সবই নিজেদের সংস্কৃতি, পরিবার, খাদ্যাভ্যাস এর সাথে সম্পর্কিত। আমার মেয়ে ক্লাসে বড়াই করে বলে তার প্রিয় খাবার ইলিশ মাছ! আমাদেরকে স্কুল থেকে ধন্যবাদ দেওয়া হয় সন্তানের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সাথে সুন্দর শক্ত বন্ধনের জন্য। সে-সময় মনে হয়, এই শিশুগুলো কতটা সৌভাগ্যের অধিকারী যে ছোটোবেলা থেকে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, খাদ্য, ভাষা ও মানুষের সাথে পরিচিত হচ্ছে, তারা উদারনৈতিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। একেক জনের বন্ধু হচ্ছে কেউ বা এশিয়ান, কেউ বা ভারতীয় উপমহাদেশের, কেউ আরবীয়, কেউ ভূমধ্যসাগরীয়, কেউ আফ্রিকান, কেউ ইউরোপিয়ান, কেউ দক্ষিণ আফ্রিকার আর কেউ-বা আমেরিকা বা কানাডার। এই যে বৈচিত্র্য, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বন্ধুত্ব করার সুযোগ এই ব্যাপারটা প্রতিটা শিশুর জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, নিজেকে বিশ্ব-নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিশাল সুযোগ।

এই ব্যাপারগুলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, “বৈচিত্র্যই শক্তি, বৈচিত্র্যই সভ্যতা, বৈচিত্র্যই কানাডা!”

হোয়াই বদার?
আমরা অনেকেই কানাডায় এসেছি বদ্ধ সমাজব্যবস্থা থেকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরমভাবে পুরুষতান্ত্রিক বা ধর্মনিয়ন্ত্রিত চিন্তা-চেতনায় বেড়ে ওঠা সমাজ থেকে। তাই বিদেশে এসে আমাদের কাছে একটা বড়ো ধাক্কা লাগে নানা বর্ণের, নানা ধরনের চিন্তাচেতনা, নানা ধরনের সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের বা ভিন্ন রকমের নৈতিকতার ধারণা নিয়ে আসা মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে।

নৈতিকতার ধারণা যুগ, দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, ভৌগোলিক অবস্থা আর মানুষের চিন্তা-চেতনা নির্ভর। এই ধারণাগুলোর অনেক কিছুই সময়, স্থান ও পরিবেশের সাথে পরিবর্তিত হয়। এর মধ্যে কিছু ধারণা আবার সবকিছু বিবেচনা করেও দেশ-কাল-পরিবেশ নির্বিশেষে ধ্রুবকও হয়ে থাকে। এই নৈতিকতার ধারণা সমাজকে সংজ্ঞায়িত করে।

ধরা যাক, আপনার মূল্যবান কিছু হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের মতো দেশে সেই মূল্যবান জিনিসটি কেউ ফেরত দিলে সেটা পত্রিকায় খবর হয়। কিন্তু উন্নত নৈতিকতার দেশে সেটাই স্বাভাবিক ঘটনা। আফ্রিকার এক গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশ থেকে আসা বন্ধু একবার বলেছিল, “নৈতিকতার ক্ষেত্রে তোমাদের ডেফিনিশনের সাথে আমাদের মেলে না; তোমরা জানো যুগে-যুগে দেশে দেশে সব ধর্মেই চুরি করা খারাপ, মানুষ মারা খারাপ। কিন্তু আমাদের জন্য এই বোধটা তৈরি হওয়ার সুযোগ পায় না। কারণ, আমরা যে অবস্থায় বেড়ে ওঠেছি, আমরা যদি সুযোগ পেলে খাবার চুরি না করি, তাহলে হয়তো অনেক দিন না খেয়ে থাকতে হবে, কেউ কেউ হয়তো ক্ষুধার জ্বালায় মারা যাবে! আবার অনেক সময় আমরা যদি প্রতিপক্ষকে সুযোগ পেয়ে আগে না মারি, তাহলে আমরা নিজেরাই মারা যাবো! আমাদের জন্য বেঁচে থাকাটা যুদ্ধ, আত্মরক্ষার জন্য সবকিছু সঠিক, সেখানে নৈতিকতার দায় আসে না, নৈতিকতার বোধ জাগার সুযোগ আসে না! কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে নৈতিকতা নিয়ে বাঁচে না, সে মানুষ হিসেবে নিম্নস্তরের।” সেই বন্ধুর কথাগুলো আমার চিন্তা-জগতে বড়ো একটা নাড়া দিয়েছিল। অনেক সময়ই নিজের সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে ‘মোরাল পুলিশিং’ করে গেছি জীবনে, অন্যকে বিচার করেছি নিজের মানদণ্ডে, হয়তো-বা তার অবস্থান-পরিস্থিতি আমার জানার বাইরে। প্রবাস জীবনে আমার মনোজগতে সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা তাই, ‘এমপ্যাথি’- সহানুভূতি!

আমাদের এখন নৈতিকতা চর্চার সৌভাগ্য আছে, সুযোগ আছে, তাই আমরা কেন অনৈতিক হবো? আমার মনে হয় কানাডার জীবনযাত্রা দর্শনগতভাবে অনেকটাই এই ধারণাটা লালন করে। সাম্প্রতিককালের অস্থির সময় বাদ দিলে কানাডিয়ানরা সাধারণত নিয়মবদ্ধ নৈতিক জীবনযাপন করে থাকে বলেই দেখি।

আমার আরেক শ্বেতাঙ্গ বন্ধু আলবার্টার প্রত্যন্ত রেডনেক সমাজ থেকে আসা, প্রবলভাবে গোঁড়া চিন্তা-চেতনার ধারক-বাহক। সেদিন ছিল প্যারেড-ডে, এলজিবিটিকিউ ও সমর্থকরা রঙধনু পতাকা নিয়ে ডাউন টাউনে র‌্যালি করছে। আমি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই বিষয়ে তোমার চিন্তা-ধারণা কী?” সে যা বললো, তা সারাজীবন আমার মনে থাকবে, “দেখো আমি ব্যাপারটা পছন্দ করি না, আমার এটা নিয়ে চিন্তা করতেও অস্বস্তি হয়। আমি হয়তো চাইবো না আমার পরিবারের কেউ এমন হোক। কিন্তু কোনো মানুষ কীভাবে জীবন-যাপন করবে, দুইজন মানুষ পারস্পরিক সম্মতিতে তাদের সম্পর্ক কীভাবে পালন করবে, সেটা তাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি সেটা বিচার করার কে? তাদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা নিয়ে আমি কেন বিরক্ত হবো বা রাষ্ট্র কেন নাক গলাবে? যতক্ষণ না আমার জীবনে কেউ বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, হোয়াই বদার?”

বদ্ধ সমাজব্যবস্থা থেকে ওঠে আসা আমার আরেক গোঁড়া সমাজের একজন মানুষের কথা শুনে মনে হলো, আমাকে ক্ষতি করে না এমন বিষয় নিয়ে কথা বলার, অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর বা অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার আমি কে? জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের এই শিক্ষাটা, এই চিন্তাটা মনে হয় দরকারি- “হোয়াই বদার?”

লেখক পরিচিতি
শান্তনু বণিক প্রায় দুই দশক ধরে কানাডার বাসিন্দা। বাংলাদেশের বুয়েট থেকে পাস করে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে মেডিক্যাল ইমেজিং-এ পিএইচ.ডি ও পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ অর্জন করেন। বিশ্ববিখ্যাত স্তন-ক্যান্সার গবেষণার জন্য তিনি কানাডার স্বাস্থ্য-গবেষণায় জাতীয় প্রকাশনা পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা ও প্রচারণায় তিনি ক্যালগেরি শহরে সংগঠক ও সমাজসেবক হিসাবে অত্যন্ত সুপরিচিত।