টরন্টোর দিনগুলি
ডা. সৈয়দ আযম মোহাম্মদ
একদিন সন্ধ্যা ৬টায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ২৪ ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে ঢাকা থেকে লন্ডন হয়ে পিয়ারসনে এসে নামলাম আমরা ৩ জন। আমার ছেলে, স্ত্রী আর আমি। এ যাত্রায় আমি কো-অ্যাপ্লিক্যান্ট। এয়ারপোর্টে আমার স্ত্রীর মামীর ছোটো ভাই ফিরোজ মামা এসেছিলেন। ২০০৫ সালের জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিন মামার যত্নে তার বাসায় ছিলাম। পুরা ১৫টা দিন দুপুরে ঘুম, রাতেও ঘুম। কোনো কিছুতেই মন দিতে পারিনি। পরে একটি বাসা দেখে ওঠে পড়লাম।
মামার উপদেশ মতো চলতে লাগলাম। একদিন ইন্টারনেটে একটি বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হলাম। পরদিন সেখানে হাজির হলাম স্বামী-স্ত্রী দুজনেই। এরা আমাদেরকে উপযুক্ত কাজ দেবে তবে তার আগে এসেসমেন্ট করবে in person interview-এর মাধ্যমে। দেখলাম সবাইকে বসিয়ে রেখেছে এবং বেছে বেছে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা দুজনে বসেছিলাম একসাথে সেখান থেকে আমার স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে গেল।
ইন্টারভিউ শেষে হাসি মুখে আমার স্ত্রী বেরিয়ে এলো। তার সে কী আবেগ, ভাবখানা এমন যে, এক হাজার ডলার দিলেই তার জন্য উপযুক্ত একটা চাকরি হয়ে যাবে! বুঝতে পারলাম তার মগজ ধোলাই হয়ে গেছে অল্প সময়ে। আমার কোনো কথাই আর শুনতে চায় না এক হাজার ডলার সে তাদেরকে দেবেই। তাকে বললাম ডলারগুলো তারা নেবে ঠিকই কিন্তু আর কিছুই করবে না। এটা সহজেই বোঝা যায় কেননা, ওরা আমাকে রেখে তাকে একা ভিতরে নিয়ে কথা বললো কেন? মামার মধস্থতায় এক হাজার ডলার রক্ষা পেল।
২.
একদিন দুপুরে ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ে স্টেশনের দিকে হেঁটে যাচ্ছি একা। একজন অচিন পথিকের সাথে কেমন করে যেন আলাপ জমলো আমার। সেও স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। আমার পরিচয়ে তাকে হাসতে দেখে জানতে চাইলাম কারণটি। তিনি বললেন, আমার জাত বন্ধু অর্থাৎ আমারই মতোন একজন ডাক্তার। তার ফোন নং নিলাম। সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব আর ভ্রাতৃত্ব। বয়সে বড়ো তাই তিনি নবী ভাই (ডাক্তার নবী)।
কাজের জন্য আমি মরিয়া হয়ে ওঠলাম। একদিকে অসুস্থ ছেলে অন্যদিকে সাথে আনা ডলারগুলো ঝর ঝর করে খরচ হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন কর্মসংস্থান অফিসে গিয়ে নাম লেখাই ইন্টারভিউ দিই, কিন্তু অপেক্ষার শেষ হয় না। একদিন এক রিক্রুটিং এজেন্সি মিথ্যা কথা বলে কাজে পাঠালো।
রাতে প্রথম কাজে এসেছি ৭/৮ জন। বিভিন্ন ভাষাভাষি আমরা। সবাই স্বাস্থ্যবান আমি ছাড়া। সুপারভাইজার কয়েকবার আমাকে দেখে নিলেন। কাজ বুঝিয়ে দিলেন। গাড়ি থেকে বড়ো বড়ো টায়ার নামিয়ে সেগুলি সাজিয়ে রাখতে হবে। সবার পায়ে স্টিল টো সু ছিল। সকালে বাম পায়ের ব্যথায় জুতা খুলে দেখলাম বড়ো আঙুলের নখের নিচে রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে। আর সে কাজে যাইনি।
পরিচিত কয়েকজন উপদেশ দিলো কাজের কী দরকার, সোশাল সিকিউরিটিতে গেলেই তো হয়। এ কথায় আমাদের দু’জনের মন সায় দেয়নি। এরপর একদিন একটি সিকিউরিটি কোম্পানিতে যোগ দিলাম কাজে, তবে এরা ঝুলিয়ে রাখে আজ এখানে তো কাল ওখানে, এভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাজ করায়। ৪০/৫০/৬০ ঘণ্টা কাজ করায় সপ্তায়। কোনো বিশ্রাম নেই তাছাড়া আমার ডলারেরও দরকার।
রাতে কাজ দিনে ঘুম এভাবেই ৩ বছর চলে গেল। এখানে নতুন করে কেরিয়ার করার চিন্তা ভাবনা করছি। নবী ভাই পরামর্শ দিলেন হেলথ ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্টে পড়ালেখা করার জন্য। সেই মতো কাগজপত্র জমা দিলাম। ভর্তির নোটিশ পেলাম। জর্জব্রাউন কলেজে ভর্তি হলাম। কাজ বন্ধ হয়ে গেল ওসাফের (OSAP) শর্ত মোতাবেক। ক্লাস শুরু করলাম। মনে হলো এই কোর্সে আমিই প্রভু।
২ বছর পর উত্তীর্ণ হয়ে সার্টিফিকেট ও কাজের লাইসেন্স নিয়ে বের হলাম। দু-একটি ইন্টারভিউ-এর ডাক আসছে, হাজির হচ্ছি কিন্তু আর কোনো উত্তর পাইনি। সবাই এক্সপেরিয়েন্স চায়, আমার তো তা নেই। এক, দুই, তিন বছর এভাবেই কাটলো। আমি আবার সেই সিকিউরিটি জবে ফিরে গেছি।
সিকিউরিটি কাজের থেকে আবার পড়ালেখা করে আর একটি ডিগ্রি নেব বলে মন স্থির করলাম। ২০১৩ সালে Ryerson University-তে Public Health and Safety বিষয়ে Undergrad কোর্সে ভর্তি হলাম। আবারও ওসাপের শর্ত অনুযায়ী সব কাজ বাদ দিয়ে পড়ালেখায় মন দিলাম। ৪ বছরের কোর্স ২ বছর ক্রেডিটে ২ বছরেই শেষ করে আবারো বসে থাকলাম। চাকরি হয় না তাই এ-৪ সিকিউরিটি কোম্পানিতে যোগ দিলাম।
সিকিউরিটি কোম্পানিতেও প্রতিযোগিতা, সেখানেও চায় কাজের অভিজ্ঞতা। ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। কিছু লিখিত প্রশ্ন-সহ একটি খাতা দিয়ে বলা হলো পরীক্ষা দিতে হবে। জীবনে কত পরীক্ষা তো দিলাম, সেখানে এই পরীক্ষা আবার কী? পরীক্ষা দিয়ে বাসায় চলে এলাম। সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধি আর কিছু ইংরেজি গ্রামাটিক্যাল প্রশ্ন। ঘরে বসে দিন কাটছে, উদ্বেগ বাড়ছে কিন্তু কোনো খোঁজ নেই।
একদিন ফোন এলো, একজন ম্যানেজার ফোন করে বলছেন, তুমি কবে আসতে চাও? তোমার সাথে কথা বলতে চাই।
পরের সোমবার G-4 Security company-র অফিসে চলে গেলাম। ম্যানেজারের সাথে অনেকক্ষণ কথা বললাম। আমার নিজের পরিচয় গোপন রাখলাম। ম্যানেজার বললেন, তোমাকে একটু দেখতে ডেকেছি।
‘বলে কি?’ -আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম।
-শুধু দেখার জন্য?
-না কাজও দেবো, তবে দেখতে চেয়েছি এই কারণে যে, পরীক্ষায় তুমি যে নম্বর পেয়েছো তা সচরাচর কেউ পায় না।
-কত? আমি জানতে চাইলাম
-96 out of 100
মনে পড়লো, এসএসসি পরীক্ষায় কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, ম্যাথে এ-রকম নম্বর পেয়েছিলাম। আজ সেই স্মৃতি আবার মনে করিয়ে দিলো।
-তুমি তো শুধু সিকিউরিটি গার্ড-এর চাকরি চেয়েছো!
আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো ম্যানেজারের কথায়।
-তোমার সুপারভাইজারের চাকরি পাওয়ার কথা।
এমনিই চাকরি হয় না, তার পরে আবার সুপারভাইজার! একবার ভাবলাম। সুপারভাইজারের চাকরিতে ঘণ্টাপ্রতি মাত্র ২ ডলার বেতন বেশি তার ওপর ৮ ঘণ্টা থাকতে হয় গাড়ির ভিতর। আমি গাড়ি অল্প কিছুদিন চালাচ্ছি সেটা না বলে বললাম, ‘গার্ডের চাকরিতেই আমি খুশি।‘
আমি চলে এলাম। ৩ দিন কাজ ২ দিন অফ, ২ দিন কাজ ৩ দিন অফ। বিকাল ৫টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করি। ভোরে বাসায় এসে ঘুম পড়ি, বেলা ২টায় ওঠে গোছগাছ করে আবার বিকাল ৪টায় বেরিয়ে পড়ি।
৩.
নতুন এক কর্মস্থলে কাজ করছি এখানে সুপারভাইজার কম বয়সী আফ্রিকান মহিলা। সে সকালে কাজ করে আর আমি বিকালের শিফটে। সে যখন জানলো আমি বাংলাদেশে ডাক্তার ছিলাম তখন থেকে আমার প্রতি তার ভালো জানাটা লক্ষণীয় ছিল আমার কাছে। একদিন সে বললো, আমার একটু উপকার করতে হবে।
-কী উপকার?
-কাল আমি একঘণ্টা আগে চলে যাবো, তুমি একঘণ্টা আগে আসবে এবং পরদিন তুমি একঘণ্টা দেরিতে আসবে, আমি এক ঘণ্টা দেরিতে চলে যাবো। এটা পারস্পরিক বন্দোবস্ত যেন কারো কোনো লোকসান না হয় উপরন্তু একটু বাড়তি সময় পেল একদিন নিজের কোনো ব্যক্তিগত কাজের জন্য।
সুপারভাইজার যখন বলছে তখন আমার সমস্যা কী? যথারীতি কাজ করছি। সমস্যা হলো পরদিন যখন আমি একঘণ্টা পরে কাজে এলাম। বিকাল ৪টার স্থানে আমি কাজে এলাম ৫টায়। সুপারভাইজার ফোনে কন্ট্রোল রুমে কল দিয়ে আমাকে-Book on করে দিতে বললো।
কন্ট্রোল রুম- সৈয়দকে তো ৪টায় Book on করা হয়েছে।
সুপারভাইজার মহিলা তো অগ্নিমূর্তি।
-তুমি কখন করলে এ কাজ?
কাজে এসে নিজের টেলিফোনে বা কর্মস্থলের অফিসিয়াল ফোনে আসা যাওয়ার সময় Book on, Book off করার নিয়ম। এই বিষয়ে সবাই sincere and honest.
কোনো কথাই সে শুনতে চাইলো না। তার ভাবখানা এমন ছিল যে, তুমি একঘণ্টা পয়সার লোভ সামলাতে পারলে না? বাসা থেকে নিজের ফোনে বুক অন করলে?
সে চলে গেলে আমি একা কাজ করছি কিন্তু মনের অবস্থা ভালো না। রাত যতই বাড়তে থাকে ততই খারাপ লাগছে। কিছু না করে দোষী হওয়ার মতো কষ্টের আর কিছু নেই। তাছাড়া আমি যে এটা করিনি তা আমি আর আল্লাহ ছাড়া আর কারো জানার কথা নয়। তাদের কথা হলো, তোমার পিন নং তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। কাজেই তোমার কাজ তুমিই করেছো।
ভাবলাম, আমি যদি এর প্রতিবাদ না করি তাহলে এটা তার মনে স্থায়ী হবে যে, আমি এসব করি। এরকম বহু মানুষকে পাওয়া যাবে, যারা দু-একবার ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। রাত এগারোটার সময় একটা চিঠি লিখলাম সুপারভাইজারকে। ছোট্ট কথা যে আমি মানসিকভাবে ভালো নই। এ-বিষয়ে তুমি কালকে কন্ট্রোল রুমে কল দিয়ে জানবে যে, কে এই Book on করেছে। কোন্ টেলিফোন থেকে এটা করা হয়েছে সেটার তথ্য কন্ট্রোল রুমে আছে কাজেই সেটি পেলে বোঝা যাবে যে, আমি করেছি না অন্য কেউ করেছে। আমি এটাও বললাম- যদি প্রমাণ হয় যে, আমি করেছি তাহলে যা শাস্তি হয় আমি মাথা পেতে নেবো।
পরদিন সকালে বাসার টেলিফোন বাজছে। সকাল ১০টা, তখনো আমি শয্যায়। ফোন ধরলাম।
-গুড মর্নিং, সাঈদ। আমি দুঃখিত।
-গুড মর্নিং।
-কন্ট্রোল রুম জানালো যে, তুমি এটা করনি।
-তাহলে কে করলো?
-ওরা করেছে।
-কেন?
-ওরা বললো তুমি সব সময় কাজে রেগুলার তাই ৪টার কিছু পরে ওরা তোমাকে Book on করেছে এই ভেবে যে, তুমি হয়তো ভুলে গেছো।
আমি আর কথা বাড়ালাম না, ভাবলাম সত্য আর ন্যায় সব সময়ই প্রমাণ করা যায়, দরকার সাহস।
৪.
২০১৫ সাল ১০ বছর হয়ে গেছে আমি দেশ থেকে এসেছি নতুন এই দেশে। এই ১০ বছরে দেশে যেতে পারিনি এমন কি মায়ের মৃত্যুতেও। জীবন সংগ্রামের গত ১০ বছর ছিল ‘Do or Die’-এর মতো। একদিন ফেসবুকে জর্জ ব্রাউন কলেজের এক সহপাঠীকে পেলাম। সে জানালো যে, এখন সুপারভাইজার এবং তার অফিসে একজন কর্মী লাগবে। সে আমাকে কলেজে থাকতে দেখেছে বা জানে। তার আগ্রহে জানালাম আমি কাজ করতে ইচ্ছুক। যোগাযোগ করার পর তাকে আর পেলাম না। এবার আমার পালা আমি নিয়মিত তাকে মনে করিয়ে দিই। বেশ কিছু দিন পর জানালো যে, তার ৩ মাসের জন্য একজন লোক প্রয়োজন। ভাবলাম ৩ মাস কেন ৩ দিন হলেও আমি রাজি।
মাত্র ১৫ দিনের নোটিশে আমি টরন্টো ছেড়ে নিশীথ সূর্যের দেশ উত্তর মেরুর অঞ্চল- ইনুভিক রিজিউনাল হাসপাতালে যোগ দিলাম। ধীরে ধীরে কাজ বুঝলাম। ৩ মাস থেকে ৬ মাস, ৬ মাস থেকে ২ বছর… এখন অনির্ধারিত কালব্যাপী চাকরি। আমার আর টরন্টোর কোনো জবে ফেরা হয়নি।
লেখক পরিচিতি
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর বাংলাদেশ হেলথ্ সার্ভিস ক্যাডারে যোগ দেন এবং ২০ বছর চাকরি করার পর ইমিগ্রান্ট হিসাবে কানাডা আসেন। লেখক বর্তমানে Stanton Territorial Hospital, Yellowknife, NT-তে Health Information Management Specialist পদে কর্মরত।

