টিটিসি যাত্রীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা

জেবুন নাহার

কানাডা পৃথিবীর উন্নত ও সুশৃঙ্খল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দেশ। এদেশের যোগাযোগব্যবস্থা ও তেমনি উন্নত এবং প্রশংসনীয়। কানাডাতে দশটি প্রদেশ এবং তিনটি টেরোটরি রয়েছে। প্রতিটি প্রদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া প্রদেশের মধ্যে যেসব শহর আছে সেগুলো মধ্যেও একটি শহর থেকে আরেকটি শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।

আমি আমার প্রবাস জীবন শুরু করেছিলাম কুবেক প্রদেশের মন্ট্রিয়ল শহরে। আমি যেহেতু অন্টারিও প্রদেশের টরন্টো শহরে বর্তমানে বসবাস করছি তাই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এই দুই শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে কিছুটা ফারাক লক্ষ্য করেছি।

টরন্টো কানাডার মুভিং শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি শহর। তাই এই শহরে জনসংখ্যার বসতও বেশি। বাড়ছে টিটিসি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, পর্যটন, শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই শহর বিশেষ ভাবে সমৃদ্ধ। তাই এই শহরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নতুন মানুষ আর নতুন ইমিগ্রেন্টদের ভিড়। আর এই জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ টরন্টোর পাবলিক ট্রানজিট ব্যবহার করে থাকে। তাই আমি টরন্টো পাবলিক সার্ভিস টিটিসি (টরন্টো ট্রানজিট কর্পোরেশন) নিয়ে লিখছি।

২.

আমরা যারা কানাডাতে থাকি তারা তাদের প্রয়োজনে বের হওয়ার জন্য পাবলিক ট্রানজিটগুলো অনেক ব্যবহার করি। টিটিসি (টরন্টো ট্রানজিট কর্পোরেশন)-এর তিনটি প্রধান শাখা। সাবওয়ে, বাস এবং স্ট্রিটকার। টরন্টোর বেশির ভাগ এলাকায়ই স্বাভাবিক বাস এবং এক্সপ্রেস বাস পরিষেবা বিদ্যমান। এক্সপ্রেস বাস সম্ভবত সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন এবং তাই সবচেয়ে ব্যস্ত, এটি আধা-মহাসড়কের মতো বড়ো বড়ো সড়ক দিয়ে শহরের বিস্তৃত অঞ্চল পেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, ডাউন টাউনের বাসগুলো সাধারণ গাড়ির চেয়েও ধীর এবং ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকে। এর চেয়েও ধীরগতির হচ্ছে লম্বা আরামদায়ক স্ট্রিটকার, যার প্রধান সুবিধা সম্ভবত পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক হওয়া। এছাড়া যেকোনো অবস্থাতেই, হেঁটে চলা এবং সাইক্লিং তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কার্যকর, বিশেষ করে ফিট মানুষদের জন্য।

সর্বোত্তম এবং সহজতম ট্রানজিট ব্যবস্থা হচ্ছে লাইন ২, যা কিপলিং থেকে কেনেডি পর্যন্ত বিস্তৃত এবং বর্তমানে এটি এসটিসি (স্কারবোরো টাউন সেন্টার)-এর দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এটি কার্যকর এবং কিছু অংশে ভালো দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ দেয়, যদিও বেশিরভাগ অংশই ভূগর্ভস্থ এবং কিছু অংশ স্থলপৃষ্ঠে। যদি কেউ পিয়ারসন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে যেতে চান, তাহলে কিপলিংমুখী লাইন ২ এবং বাস ৯০০ সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক। ১০-১২ মিনিট অন্তর অন্তর এই বাসের সার্ভিস আছে। বাড়তি সারচার্জ নেই।

লাইন ১, যার নিজস্ব ATS (অটোমেটেড ট্রেন কন্ট্রোল) ব্যবস্থা রয়েছে। ১-২ মিনিট ব্যবধানে ট্রেন চলে আসে এবং এটি ভন, ফিঞ্চ ও ইউনিয়ন স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত, যা আবার কানাডার পূর্বাঞ্চলের বাকি অংশের সঙ্গে সংযোগ করে।

দুই ঘণ্টার আনলিমিটেড ট্রান্সফার প্রেস্টো, ডেবিট বা ক্রেডিট যে-কোনোভাবে পেমেন্টই হোক, তা সক্রিয় হয়। ডলার তিন পয়েন্ট তিন শূন্যতে একটা টিটিসি টিকিট কিনে দুই ঘণ্টা শহরে যেকোনো প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়া যায় অনায়াসে। যতবার খুশি যেখানে খুশি যাওয়া যায়। এছাড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ ছাড়ে টিকিট কেনার ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোর দাম দুই টাকা ২০ পয়সা বা মান্থলিও টিকিটের ব্যবস্থা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি আছে আবার হাই স্কুল স্টুডেন্টদের জন্য এটা আরেকটা ধার্য করা হয়। সেটা আরো কম। অন্যদিকে আবার রিফুজি ও বয়স্ক বৃদ্ধদের জন্য আলাদা ফেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এদিকে গত বছর থেকে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে যে, প্রেস্টো কার্ড-এর বিপরীতে যে কেউ ইচ্ছা করলে তাদের ডেভিড বা ক্রেডিট কার্ড পাঞ্চ করে সরাসরি ওঠতে পারে। এভাবে নানা উপায়ে পরিশোধ হয়ে থাকে।

টিটিসি নিয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতা আছে, সেটি আমি বলবো, কারণ প্রভিন্সিয়াল ইলেকশনের দিন আমি ভোট দিতে বের হওয়ার সময় আমার ছেলের স্টুডেন্ট কার্ড নিয়ে বের হয়ে চলে যাই। এটা ইচ্ছাকৃত ভুল ছিল না। টেবিলের দুইটাই ছিল আমি ভুলবশত বা কেলাসনেস-এর কারণে নিয়ে চলে যাই। যখন ভোট দিয়ে বের হয়ে ওয়ার্ডেন সাবওয়ে পার করি তখন এক পুলিশ আমাকে আটকায়। আমি তো কনফিডেন্টলি পুলিশের সামনে যাই। আমি তখনও জানি না যে, আমাকে জরিমানা গুণতে হবে। যদিও আমার ছেলের কার্ড তারপরও যেহেতু আমিও স্টুডেন্ট, তাই আমি হয়তো পার পেয়ে যাবো। কিন্তু সে আমাকে প্রশ্ন করে যে তোমার আইডি কার্ড কই? আমি তাদেরকে আমার কলেজের আইডিটা শো করি ফোনের মাধ্যমে। কিন্তু তারা বলে এই আইডিতে হবে না। আমাকে টিটিসি পোস্ট সেকেন্ডারি ফটো আইডি থাকতে হবে যেটা বাথারস থেকে সংগ্রহ করতে হয়। আমার এটা জানা ছিল কিন্তু আমি কিছুটা ইগনোরই করেছিলাম ব্যাপারটা। ভেবেছিলাম আমি যেহেতু স্টুডেন্ট আমি কার্ডটা ব্যাবহার করতে পারবো। তো আমি পুলিশকে বললাম, আমার কিছুটা কেলাসনেসের কারণে তুমি আমাকে এত শাস্তি দেবে। কিন্তু পুলিশ বললো, “তুমি যদি ক্লেইম করতে চাও, তাহলে তুমি পারো। কিন্তু তোমাকে এখন ৩৬০ ডলার জরিমানা দিতে হবে।” তো আর কী! আমি ৩৬০ ডলার জরিমানার জন্য প্রস্তুত হলাম। কিন্তু জানালো, সাথে সাথে পে করতে হবে না। আমি আমার ছেলেকে ফোন করলাম। পুলিশ আমার পাসপোর্ট চাইলো। যেহেতু ভোট দিতে গিয়েছিলাম সাথে পাসপোর্ট ছিল। কথা না বলে আমার পাসপোর্ট শো করলাম এবং তারা আমার এড্রেস নিলো। তারা আমার পরে আমাকে এমাউন্টের একটা পেপার ইমেইল পাঠালো। আমি জানি, আমার কিছুটা সচেতনতার অভাবে তাদেরকে ৩৬০ ডলার জরিমানা দিলাম।

আমি একথাগুলো লিখছি এজন্য যে, আমার অভিজ্ঞতাটা যেন অন্য কেউ ফেস না করে। কারণ, প্রতিটি জিনিসের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন থাকা দরকার এবং মানা দরকার। যেটা আমার করা দরকার ছিল, যে ভুলটা আমি করেছি, সেটা যেন অন্য কেউ না করেন। ৩ ডলার ৩০ সেন্ট আমাকে দিতে হতো। ৩৬০ ডলারের পরিবর্তে। এর থেকে আমার ছিল একটা শিক্ষা। বাসায় এসে ছেলেকে বললাম বাথারস গিয়ে আমাকে একটা স্টুডেন্ট ফটো আইডি করিয়ে দিও যাতে পরবর্তীকালে আমার এই সমস্যা না হয়। কারণ, আমার আরো এক বছরের স্টুডেন্ট আইডি করা দরকার। ছোট্ট একটি বেখেয়ালিপনার জন্য আমাকে বড়ো একটা জরিমানা গুণতে হলো।

এছাড়া টিটিসি পুলিশ মাঝে মাঝে বিভিন্ন বাস বা স্ট্রিটকারে ও ট্রেনে ভিজিট করে। যদি কোনো অনিয়ম চোখে পড়ে সাথে সাথে জরিমানা করে স্ট্রিটকারে অনেক সময় ৫০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা করে কারণ অনেক ইয়াং জেনারেশন আছে, যারা মাঝে মাঝেই পেস্টোকার্ড পাঞ্জ না করে ওঠে পড়ে। কারণ ড্রাইভার আর যাত্রীদের মধ্যে একটা দেয়াল থাকে, যাতে ড্রাইভার সরাসরি তাদের সবসময় পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। সেই সুযোগে অনেক মানুষ তার অপব্যবহার করে টিটিসিতে অনেক সময় কিছু হোমলেস মানুষ পেমেন্ট ছাড়াই ব্যবহার করে। সেক্ষেত্রে ড্রাইভার তেমন কিছু না বলে তাদেরকে এলাও করে। তবে হোমলেস মানুষজন মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক আচরণ ও শব্দ করে যা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

টিটিসির একটি লস অ্যান্ড ফাউন্ড সেক্টর আছে। সেখানে টিটিসি থেকে ও টিটিসিতে কোনো কিছু ভুলবশত ফেলে গেলে তা জমা হয়। সাথে সাথে কেউ কমপ্লেইন করলে উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে হাজির হলে সেটা উদ্ধারও করা যায়। যদিও এটা একটু ঝামেলার ব্যাপার তবে কেউ যদি ফুড আইটেম টিটিসিতে ফেলে রাখেন তবে সেটা আর ফেরত পাওয়া যায় না। সেটা ফেলে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে।

টিপিসিতে একদিন আমার ব্যাগ সব রকমের ক্রেডিট কার্ড ডেবিট কার্ডসহ আমি একটা বাসের মধ্যে ফেলে রেখে চলে যাই। আমি ক্যাসেল ফ্রেন্ক থেকে ব্রডভিও পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হলো আমার ব্যাগ কোথায়? যেহেতু ক্যাসেল ফ্রাঙ্ক সাবওয়েতে যে বাসগুলো আসে সেগুলো থেকে আবার কোনো কার্ড আবার পাঞ্জ করতে হয় না। বাস থেকে সরাসরি ট্রেনে যাওয়া যায়। তো আমি সেইভাবে একটা স্টেশন পার হয়ে চলে যাই। যখন খেয়াল হয়, তখন আমি উল্টো পথে ফিরে এসে যে অফিসার নিয়োজিত ছিলেন তাকে ব্যাপারটা খুলে বলি। তিনি আমার ফোন নাম্বার ও এড্রেস রাখেন এবং আমাকে জানান আমি যে গাড়িটা ওঠেছিলাম সে গাড়িটা সম্পর্কে বলি। সে অনুযায়ী তিনি ব্যবস্থা করবেন। ফোন নাম্বার দিয়ে আমি আমার কাজে চলে যাই এবং আমার ছেলেকে ফোন করে বলি যদি ওটা ফাউন্ড হয় তুমি গিয়ে নিয়ে এসো। ভাগ্যবশত আমি সত্যিই বাসে আমার ওই ব্যাগটা রেখে যাই এবং টিটিসির ওই অফিসার ওটা ফাউন্ড করে এবং আমার ছেলে আমাকে জানায়। আমি আমার ছেলেকে বলি সে উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে যায়। আমি ভীষণ বাঁচা বেঁচে যাই। তবে ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে তা বা হোমলেসদের কাছে পড়লে অনেক সময় ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এমন আরও দু-একটি ঘটনা ঘটেছে আমার সাথে। আমি এমনিতে একটু আনমনা বেখেয়ালি মানুষ। তাই অনেক সময় আমার সাথে এরকম ঘটনা ঘটে থাকে। সচরাচর অনেকের সাথেই ঘটে থাকে এ-ধরনের ঘটনা।

টরন্টো ট্রানজিট কর্পোরেশনের আরেকটা দিক হচ্ছে গো ট্রেন এবং গো বাস। সিস্টেম সেগুলো লাইন ওয়ানের ইউনিয়ন স্টেশন থেকে পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে স্বল্প খরচে টরন্টো থেকে বিভিন্ন ছোটো ছোটো শহরে যাওয়া যায়। গো ট্রেন লেকশোর ইস্ট যায় অশোয়ার দিকে। আর গো ট্রেন লেকশোর ওয়েস্ট যায় নায়াগ্রার দিকে। মূলত কানাডার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব স্মুথ এবং নিরাপদ। আমি ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইভিনিং শিফটে কাজ করতাম। রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে বারোটার পর হয়ে যেত। অনেক সময় আরো বেশি সময় লেগে যেতো বা এর চেয়ে দেরি হতো। কিন্তু এতে বাস বা ট্রেনে চড়তে কোনো নিরাপত্তার অভাব আমার মনে হয়নি বা রাস্তায় কোনো প্রবলেম মনে হয়নি। কিন্তু যদি দেশে থাকতাম তাহলে এই সময়ে বের হওয়ার কথা একটা মেয়ে মানুষ ভাবতেও পারতাম না কল্পনাও করতে পারতাম না।

এই বৃহৎ টিটিসি ব্যবস্থা চলমান রাখতে অনেকগুলো সেক্টর কাজ করে। যেমন টিটিসি ড্রাইভার, টিটিসি ইঞ্জিনিয়ার, টিটিসি হেলপ ডেস্ক, টিটিসি পুলিশ ইত্যাদি। এছাড়া এত বড়ো টিটিসি সাবওয়ে ও অন্যান্য সার্ভিস নিট অ্যান্ড ক্লিন রাখতে একদল কর্মী নিয়োজিত থাকে। টিটিসি পুলিশ সদা-সর্বদা সচেষ্ট থাকে যেকোনো আনওয়ানটেড সিচুয়েশন মোকাবেলা করার জন্য। টিটিসি ড্রাইভারকে ন্যূনতম গ্রেট ১২ ডিপ্লোমা ডিগ্রি থাকতে হয়। এছাড়া অনেকগুলো ধাপে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। আমাদের দেশের ড্রাইভারদের মতো শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেই বড়ো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া যায় না। তাদের ম্যানার, এটিচুয়েড, হ্যাভিট সব দেখে নির্বাচন করা হয়। যদিও কিছু টিটিসি বাস ড্রাইভার নিয়ে আমার অভিযোগ রয়েছে। তা হলো, কিছু কিছু ড্রাইভার আচমকা আচমকা ব্রেক কষে। যা শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য ঝুঁকি। টিটিসি বাসে নীল রঙের কিছু স্পেশাল সিট বসানো থাকেÑ যা বৃদ্ধ, শিশু বা গর্ভবতীদের জন্য বরাদ্দ থাকে। যদিও কেউ কেউ পূর্বে বসা থাকে তারা তাদের কাউকে দেখা মাত্রই ওঠে। তাদের জন্য সিট ছেড়ে দেওয়া হয়। টিটিসি সাবওয়ে সার্ভিস ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাত ১.৩০ থেকে কিছু ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে। তবে সে সময় নাইট সার্ভিস চালু থাকে।

অধিকাংশ স্টেশনে এলিভেটর, এসকিলেটর এবং সাধারণ সিঁড়ি আছে। কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। সিগন্যাল ও রক্ষণাবেক্ষণ বিলম্ব, ট্রেন থামার ঘটনা এখনো নিয়মিত। বাস বাঞ্চিং ও চালক স্বল্পতা, শীতে সময়সূচি ধরে রাখা এগুলো নিয়মিত সমস্যা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের তুলনায় ভিড় কম, শৃঙ্খলা বেশি এবং এসি সুবিধা সর্বজনীন, তবে শিডিউল নির্ভরতা এখনো উন্নতির পথে।

এগলিনটন, ফিঞ্চ ও অন্টারিও লাইন সময়মতো শেষ হলে ২০৩০ নাগাদ সাবওয়ে নেটওয়ার্ক প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়বে। বাস ও স্ট্রিটকারের ওপর চাপ কমবে। রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকঠাক চালু থাকলে টরন্টো সত্যিকারের ১৫ মিনিটের একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা হবে।

এসবের পরও, ব্যক্তিগতভাবে টিটিসি সার্ভিসের ওপর আমি মাঝে মাঝে অনেক বিরক্ত হই। কারণ, অনেক পজিটিভ দিক থাকলেও এর নেগেটিভ দিকও কম নয়। আমরা যারা টিটিসি ইউজ করি তাদেরকে মাঝে মাঝেই অনেক ঝামেলার ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। দেখা গেল আমরা বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, অযথা কারণে বাস ডিলে হচ্ছে। আবার এমনও হয়, যে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বাস ছেড়ে চলে গেছে। স্নো, ঝড়, বৃষ্টিতে যা খুব বিরক্তিকর। এটা হলো রোজকার কাহিনি, আর সাবওয়ের কথা কী বলবো, ট্রেনে দেখা যায় মাঝপথে হঠাৎ করে ট্রেন বন্ধ। বলে যে আউট অব সার্ভিস। ট্রেন আর যাবে না বলে দেয়। তখন আমাদের মতো প্যাসেঞ্জারদের যারা কাজে যাচ্ছি, নির্দিষ্ট টাইমে পৌছাতে হবে, তাদের জন্য একটা বিশাল অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হয়। সেই ট্রেন থেকে নেমে কখনো শ্যাটল বাসে ওঠতে হয়। অনেক সময় শ্যাটল বাস আসতেও সময় লেগে যায়। তো, অযথা করে আমাদের কিছু সময় এবং শ্রম বেশি দিতে হয়।

তবে, এটার অনেক ভালো দিকও আছে। যেমন অল্প খরচে টিকিট কিনে যেখানে খুশি সেখানে যাওয়া যায়। সাবওয়ে ট্রেনগুলো করে শহরে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়ানো যায়। আমি যেমন মন খারাপ হলে সাবওয়ে ট্রেনে চড়ে বসি কলম কাগজ হাতে নিয়ে। ট্রেন চলতে থাকে এঁকেবেঁকে মাটির নিচ দিয়ে। আর আমি মনের মাধুরী মিশিয়ে দুঃখগীতি লিখে যাই। মাঝে মধ্যে পডতে পড়তে বা লেখার ঘোরে থেকে নির্দিষ্ট স্টেশন মিস করে পার হয়ে যাই! আবার যখন বাস বা ট্রেনে চড়ি বিমুগ্ধ হয়ে প্রকৃতি দেখি। ছবি তুলি।

যারা বাংলাদেশে বসে বা বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে কানাডার যোগাযোগব্যবস্থার কথা চিন্তা করেন তারা হয়তো বাংলাদেশের তুলনায় হাজার গুণ বেটার সার্ভিস এখানে পাবেন। ঠেলাঠেলি কিংবা ভিড় নেই এখানে। তারপরও যেটুকু প্রবলেম আমরা ফেস করি, আমি সেগুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। তবুও আমরা ভালো আছি রাত-বিরাতেও ভয় পাই না পাবলিক সার্ভিসে চড়তে। সর্বোপরি কানাডার যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো। দিনের প্রায় ২৪ ঘণ্টাই টিটিসি সার্ভিস ব্যবহার করতে পারি। এটি একটি স্বল্পব্যয় বহুল ব্যবস্থা। আমাদের যাদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নাই বা গাড়ি এফুরট করতে পারি না, তাদের জন্য টিটিসি অত্যন্ত ভালো। অন্যদিকে উবার বা ট্যাক্সি অনেক ব্যয়বহুল হওয়াতে আমাদের জন্য টিটিসি সার্ভিসই সাশ্রয়ী।

আমি জানি আপনারা কম-বেশি সবাই জানেন। তবু নিজের অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

জন্ম : ১৬ নভেম্বর, ১৯৭৬। অনার্স, মাস্টার্স (ঢাকা, বাংলাদেশ)। MOA Diploma ( Medix College, Toronto)। অধ্যয়নরত (TriOs College, Toronto)। বাংলা , ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় পারদর্শী। সাধারণত কবিতা লেখা হয়। এছাড়া গল্প উপন্যাস লেখার অভ্যাস আছে। প্রকাশিত বই ৪টি। তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের আর্তনাদ, বিধবার স্বপ্ন, অন্তরীক্ষ প্রেম ও খেরখাতা, পিলসুজ। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে টরন্টোতে বসবাস করেন।