পশ্চিমবঙ্গ থেকে টরন্টোতে আগত বাঙালিদের ক্রমবিবর্তন
রথীন ঘোষ
গত ছয় দশক ধরে টরন্টো এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাঙালি বাসিন্দা হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে পরম সৌভাগ্যবান এবং গর্বিত মনে করি। কারণ এই শহরেই সারা উত্তর আমেরিকাতে প্রথম বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার ও অগ্রগতির বীজ বপন হয়, যা পরবর্তীকালে একটি বিরাট মহীরুহের আকার ধারণ করে। ভারতবর্ষের বাইরে টরন্টোতেই প্রথম বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ভবন ‘টেগোর সেন্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কানাডার প্রথম কালীবাড়িরও প্রতিষ্ঠা হয় এই টরন্টোতেই। টরন্টোর বাঙালি সম্প্রদায়ের একজন সদস্য হিসেবে যে বছর আমি প্রথম জার্মানি থেকে কানাডায় আসি, অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে, তখন থেকেই আমি একজন বাঙালি সমাজকর্মী হিসেবে বাংলা সংস্কৃতির প্রচারে সঙ্গবদ্ধভাবে কিছু করার জন্য কাজ শুরু করি। টরন্টো অথবা জিটিএ-তে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সম্প্রদায় এবং সংস্কৃতির ক্রমোন্নতির ঐতিহাসিক বিবরণ আমি সংক্ষেপে আপনাদের জানাবো।
২.
প্রসঙ্গক্রমে, আমার নিজের জীবন সম্পর্কেও কিছু বলার প্রয়োজন বলে মনে করি। আমি খুব কম বয়সে, ১৯৬১ সালে, কলকাতা থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য জার্মানি যাই। সেখানে চার বছর পড়াশোনা করার পর ১৯৬৫ সালে অভিবাসী হিসেবে কানাডার টরন্টো শহরে আসি। জার্মানিতে থাকাকালে আমি জার্মান সংস্কৃতি জানার এবং শেখার চেষ্টা করি। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচারে যুক্ত থাকি। সেখানে আমরা জার্মান ভাষায় কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ নাটক, রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ এবং ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করি। এইসব অনুষ্ঠানে অভিনয়েও আমি প্রধান ভূমিকায় ছিলাম।
বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে কিছু বাঙালি অভিবাসী টরন্টো শহরে বসবাসের জন্য আসেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রয়াত ড. পি কে বসু। পরে সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে আরও কিছু বাঙালি অভিবাসী এবং ছাত্র তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। আমি যখন ১৯৬৫ সালে টরন্টোতে আসি তখন কোনো বাঙালি সংগঠন এখানে ছিল না এবং সংগঠিতভাবে কোনো অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই বছরেই প্রথম সংগঠিতভাবে বিজয়া সম্মিলনী পালিত হয় টরন্টোতে ড. বসুর বাড়িতে। অনুষ্ঠানের আয়োজনে ছিলেন প্রয়াত সুব্রত দাসগুপ্ত এবং আমি। পঁয়ত্রিশজন বাঙালি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দশটি ছিল পরিবার এবং বাকিরা ছিলেন ব্যাচেলর। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ ছিল গান, সেতার বাজনা এবং আবৃত্তি। যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা হলেন ড. হেমশঙ্কর রায়, ছন্দা দাস, প্রয়াত বাবু দে এবং আমি।
১৯৬৬ সালে প্রথম পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে। আয়োজনে প্রয়াত সুব্রত দাসগুপ্ত, প্রয়াত নমিতা পাল এবং আমি। এবার দর্শকের সংখ্যা ছিল একশো পাঁচজন। ওই বছরই প্রথম বড়ো করে পিকনিকের আয়োজন হয়, প্রায় আশিজনের মতো লোক হয়। ওই বছরের বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠান করি YMCA-তে। দর্শকের সংখ্যা ছিল একশো পঞ্চাশজন। সেই সময় বেশির ভাগ বাঙালি অভিবাসী এসেছিলেন পশ্চিম জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ভারতবর্ষ এবং আমেরিকা থেকে।
প্রথম সরস্বতী পুজো এবং রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হয় ১৯৬৮ সালে- আয়োজনে ছিলেন প্রয়াত ড. অমিয় ঘোষাল এবং আরও কয়েকজন। প্রথম বাংলা নাটক মঞ্চস্থ হয় ১৯৬৮ সালেই। নাটকের পরিচালনায় ছিলেন প্রয়াত সত্যরঞ্জন ঘোষ। নাটকের নাম ছিল ‘উল্কা’। প্রধান ভূমিকায় ছিলেন সুখেন্দু রায়চৌধুরী, রীতা রায়, প্রয়াত দীপ্তিমান সেনগুপ্ত, কেয়া ঘোষ এবং আমি। নাটকটির আয়োজনে ছিলেন প্রয়াত রামেন গাঙ্গুলি, প্রয়াত প্রভাত মুখার্জি, প্রয়াত অসিত দত্ত, প্রয়াত সুব্রত দাসগুপ্ত এবং আমি। নাটকটি অটোয়াতেও মঞ্চস্থ হয়।
দ্বিতীয় নাটক ‘লবণাক্ত’ মঞ্চস্থ হয় ১৯৬৯ সালে। পরিচালনায় ছিলেন সুখেন্দু রায়চৌধুরী। প্রধান ভূমিকায় ছিলাম আমি, ইলা রায়, প্রয়াত নীতিন মজুমদার এবং প্রয়াত সুভাষ রায়। ওই বছরেই বড়ো করে পিকনিক এবং বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণে ছিল প্রায় তিনশ জন।
৩.
টরন্টোতে প্রথম একটি বাঙালি সংঘ তৈরির উদ্দেশ্যে আঠারো জন সদস্য নিয়ে একটি অ্যাড হক কমিটি গঠন করা হয় ১৯৭০ সালে। সংঘের নাম দেওয়া হয় ‘প্রবাসী’। ওই বছরেই প্রথম প্রবাসীর ব্যানারে নাটক মঞ্চস্থ হয় যার নাম ছিল ‘ক্ষুধা’। পরিচালনায় ছিলেন প্রয়াত দিব্যেন্দু ঘোষ। প্রধান ভূমিকায় ছিলাম আমি, ফল্গু দাশগুপ্ত, সুখেন্দু রায়চৌধুরী এবং প্রয়াত নীতিন মজুমদার।
১৯৭১ সালে প্রবাসীর প্রথম সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়। নির্বাচনি সমিতির প্রধান নির্দেশক ছিলেন ড. সৌরেন বাগচী। প্রবাসীর প্রায় চারশো জন সদস্য এই নির্বাচনে ভোট দেন। প্রবাসীর প্রথম নির্বাচিত বোর্ড ছিল এমন-
সভাপতি : ড. অরবিন্দ গুহ (প্রয়াত)
সহ-সভাপতি : ড. অমলাচরণ চৌধুরী
সাধারণ সম্পাদক : রমেন গাঙ্গুলি (প্রয়াত)
সহ-সম্পাদক : প্রভাত মুখার্জি (প্রয়াত)
কোষাধ্যক্ষ : মেঘনাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রয়াত)
বোর্ডের অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন : রথীন ঘোষ, সুব্রত দাসগুপ্ত (প্রয়াত), নীতিন মজুমদার (প্রয়াত), ড. দিব্যেন্দু রায় (প্রয়াত), ড. পরিতোষ দত্ত এবং সুবোধ রায় (প্রয়াত)।
১৯৭১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত প্রবাসীর বিগত সভাপতিরা ছিলেন যথাক্রমে ড. অরবিন্দ গুহ (প্রয়াত), ড. অমলাচরণ চৌধুরী, তপন দাস, ড. পরিতোষ দত্ত, সুধীন সরকার, দেবু কুণ্ডু(প্রয়াত), শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রয়াত), রথীন ঘোষ, সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রয়াত), রমেন গাঙ্গুলি (প্রয়াত), উমা কুণ্ডু (প্রয়াত) এবং দিব্যেন্দু ঘোষ (প্রয়াত)।
৪.
কানাডায় আসার পর আমি শেরিডান কলেজ এবং হাম্বার কলেজে আরও শিক্ষা লাভ করি এবং ১৯৬৬ সালে বিবাহ করি। ১৯৬৮ সালে আমার একটি কন্যা জন্মলাভ করে। ১৯৭০ সালে আমি আমার প্রথম বাড়ি টরন্টো শহরে কিনি।
১৯৭২ সালে প্রথম বাঙালি যাত্রা ‘বাঙালি’ মঞ্চস্থ হয়। পরিচালনায় সুখেন্দু রায়চৌধুরী। মতের অমিলের জন্য কিছু বাঙালি প্রবাসী থেকে বেরিয়ে এসে Bengali Cultural Association (BCA) নামে আরেকটি বাঙালি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন ১৯৭৩ সালে।
১৯৭৩ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত BCA-এর সভাপতিরা ছিলেন প্রয়াত বরুণ সেনগুপ্ত, প্রয়াত ঋত্বেন্দ্র রায়, প্রয়াত পানু রায়, পার্থ সেন, কবি বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ সরকার, প্রয়াত ড. অভিজিৎ গুহ এবং প্রয়াত শঙ্কর সরকার।
তেরো বছর ধরে দুটি বাঙালি প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদাভাবে সুন্দর করে অসংখ্য সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কয়েকটি অনুষ্ঠানের নাম উল্লেখ করতেই হয়। দুটি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ প্রবাসী এবং BCA আলাদাভাবে প্রথম দুর্গাপূজা করে ১৯৭৩ সালে টরন্টোতে। দুটি প্রতিষ্ঠান কলকাতা থেকে প্রতিমা নিয়ে আসে। টরন্টো শহরে এখন এগারোটির বেশি দুর্গাপূজা হয় এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বঙ্গীয় পরিষদ টরন্টো (BPT), প্রবাসী বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন (PBCA), টরন্টো কালীবাড়ি, আমার পুজো, বঙ্গ পরিবার, টরন্টো উৎসব, আগমনী, ভারত সেবাশ্রম সংঘ, বেদান্ত সোসাইটি এবং তিনটি বাংলাদেশি হিন্দু প্রতিষ্ঠান যেমন হিন্দু ধর্মাশ্রম টরন্টো, টরন্টো দুর্গাবাড়ি এবং বাংলাদেশ কানাডা হিন্দু মন্দির।

BCA প্রথম ‘আহ্বান’ নামে একটি হাতে লেখা বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করে যার দায়িত্বে ছিলেন ড. সম্প্রসাদ মজুমদার এবং পঙ্কজ দত্ত। পত্রিকাটি ১৯৮৬ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে প্রবাসী প্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ করে। পরিচালনায় ছিলেন প্রয়াত দীপ্তি সরকার। ১৯৭৪ সালেই আমি এককভাবে প্রথমবার প্রয়াত দ্বিজেন মুখার্জীর একটি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করি টরন্টোতে।
১৯৭৫ সালে BCA প্রয়াত সমীর দে’র তত্ত্বাবধানে প্রথম টরন্টোতে একটি বেতার অনুষ্ঠান শুরু করে, যার নাম ছিল ‘আহ্বান’। ওই বছরেই আমি প্রথম প্রযোজক এবং পরিচালক হিসেবে পৃথিবীতে প্রথম বাংলা ভাষায় রঙিন টিভি বা দূরদর্শনের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান শুরু করি টরন্টোতে যার নাম ছিল ‘বর্ণালী- Voice of Bengal’। ওই নামেই একটি বেতার অনুষ্ঠানও আমি এবং প্রয়াত শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় টরন্টোতে ১৯৭৫ সালে শুরু করি।
১৯৭৬ সালে BCA মান্না দে’র একটি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে টরন্টোতে এবং প্রবাসী হেমন্ত মুখার্জীর একটি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ওই একই বছরে। ওই বছরেই প্রবাসী একটি মাল্টিমিডিয়া অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করে যার নাম ছিল ‘From Himalayas to the Rockies’- একজন ভারতীয় অভিবাসীর জীবনী। এই অনুষ্ঠানের প্রযোজক ছিল কানাডিয়ান সরকার। এর পরিচালক এবং প্রধান ভূমিকায় ছিলাম আমি।
BCA প্রথম বাংলা স্কুলের স্থাপনা করে ১৯৭৭ সালে টরন্টোতে। তত্ত্বাবধানে ছিলেন প্রয়াত সুধীরা রায় চৌধুরী এবং শ্রমিকা ঘোষ। প্রয়াত ভারতী গাঙ্গুলি এবং আরও কয়েকজন মিলে ১৯৭৮ সালে বাংলা স্কুলের শুরু করেন ব্রামালিয়া বা ব্র্যাম্পটনে। ১৯৭৯ সালে সরমা মুখার্জী এবং আরও কয়েকজন মিলে মিসিসাগা বাংলা স্কুলের পত্তন করেন। প্রয়াত ছায়া গুপ্ত ১৯৮৬ সালে শুরু করেন এটোবিকোক বাংলা স্কুল।
১৯৭৯ সালে BCA একটি চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছিল টরন্টোতে যেখানে মহানায়ক উত্তম কুমার নিজে উপস্থিত ছিলেন সঙ্গে সুপ্রিয়া চৌধুরী। প্রয়াত পানু রায় এবং প্রয়াত অসিত দত্ত এ অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
১৯৮০ সালে কলকাতার বিখ্যাত নাটকের দল ‘চেতনা’ প্রবাসীর আমন্ত্রণে টরন্টোতে আসে এবং ‘জগন্নাথ’ ও ‘মারিচ সংবাদ’ নাটক দুটি মঞ্চস্থ করে। পরিচালনায় ছিলেন অরুণ মুখার্জী। টরন্টোর দুইজন শিল্পী ‘জগন্নাথ’ নাটকে অভিনয় করেন, তারা হলেন- শ্যামল ঘোষাল এবং আমি।
১৯৮১ সালে প্রবাসী এবং BCA যৌথভাবে একটি কলকাতার নাট্যদলের দ্বারা তিনটি নাটক টরন্টোতে মঞ্চস্থ করে- ‘নহবত’, ‘শেষ থেকে শুরু’ এবং ‘এরাও মানুষ’। পরিচালনায় ছিলেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনয়ে ছিলেন সত্যদা, তরুণ কুমার (বুড়োদা), রত্না ঘোষাল এবং আরও অনেকে। বুড়োদা আমার বাড়িতেই ছিলেন। সেই সময় আমাদের সুযোগ হয়েছিল মহানায়ক উত্তমকু মারকে নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করার। পরবর্তীকালে আরও অনেক শিল্পীই আমার বাড়িতে ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে আমার এক ধরনের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁদের কয়েকজন হলেন সুপ্রিয়া চৌধুরী, মাধবী মুখার্জী, রণজিত মল্লিক, দীপঙ্কর দে, দুলাল লাহিড়ী, শিবাজী চ্যাটার্জী, অরুন্ধতী হোম চৌধুরী, দ্বিজেন মুখার্জী, শকুন্তলা বড়ুয়া, সৈকত মিত্র, সুচিত্রা মিত্র, সুবীর সেন, পূর্ণদাস বাউল, ভূপেন হাজারিকা, তাপস পাল, বনশ্রী সেনগুপ্ত, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, অন্তরা চৌধুরী এবং আরও অনেকে।
১৯৮৪ সালে প্রবাসী সন্ধ্যা মুখার্জীর একটি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, তবলায় সঙ্গতে ছিলেন রাধাকান্ত নন্দী। আমি বেতারে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কিংবদন্তি শিল্পী সন্ধ্যাদির সঙ্গে আমার একটি মধুর ভাই-বোনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে যার ফলে তিনি আমার কলকাতাতে দ্বিতীয় বিবাহ অনুষ্ঠানে আসেন। কলকাতায় গেলে তিনি নিজে হাতে রান্না করে আমাকে খাওয়াতেন এবং তাঁর ঠাকুরঘরে নিয়ে গিয়ে গান শোনাতেন। এটা আমার পরম সৌভাগ্য যা আমি আজীবন মনে রাখবো।
৫.
দুটি সমিতি দীর্ঘদিন ধরে একই বাঙালি সমাজের জন্য আলাদা আলাদাভাবে একই ধরনের অনুষ্ঠান; যেমন- দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজা, রবীন্দ্রজয়ন্তী, পহেলা বৈশাখ, মহালয়া, পিকনিক, নাটক, দেশ থেকে শিল্পীদের নিয়ে আসা, নিউ ইয়ার ইত্যাদির আয়োজন করে আসছিল। অনেক চিন্তার পর এই দুই সমিতির কর্মীরা ঠিক করলেন যে, গতানুগতিকভাবে কিছু করতে গেলে যেমন বাঙালি সমাজের জন্য নিজেদের একটি বাড়ি কিনতে গেলে তাদেরকে সঙ্গবদ্ধ হতে হবে। একই অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি আর্থিক ও সামাজিকভাবে কাম্য নয়। এই সমঝোতার ফল হিসেবে ১৯৮৭ সালে দুটি সংস্থা এক হয় যার নতুন নাম হয় ‘প্রবাসী বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন’ (PBCA) এবং ‘বঙ্গীয় পরিষদ টরন্টো’ (BPT)। সাংস্কৃতিক কাজের জন্য PBCA এবং ধর্মীয় কাজের জন্য BPT। দুটি সমিতি কিন্তু একই বোর্ডের সদস্যদের দ্বারাই চালিত হবে।
PBCA-র প্রথম সভাপতি হন প্রয়াত ড. কান্তি হোড়। এর পরের সভাপতিরা ছিলেন প্রয়াত সুব্রত ব্যানার্জী, প্রয়াত ড. বিজয় দাস, সমীর মহাজন, রথীন ঘোষ, জয়দেব সরকার এবং ড. সঞ্জীব মুখার্জী। BPT-র প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রয়াত শঙ্কর সরকার এবং এর পরের সভাপতিরা হলেন অলোক মজুমদার, শুভ্রা শুর, প্রতাপ সোম, রুবি মুখার্জী, বিরাজ সাহা, প্রয়াত বিজন নন্দী, প্রয়াত দীপক চ্যাটার্জী, আনন্দ চৌধুরী, ধীমান মিত্র, বাপি ব্যানার্জী, অনির্বাণ কারগুপ্ত এবং কল্যাণী সাহা। PBCA-র প্রথম নাটক ‘বাবা বাদল’ মঞ্চস্থ হয় ১৯৮৭ সালে। পরিচালনায় ছিলাম আমি। ১৯৮৭ সালে-ই প্রথম একসঙ্গে দুর্গাপূজা পালিত হয়।
১৯৮৮ সালে PBCA সতেরো হাজার বর্গফুটের একটি বাড়ি ১৪০ মিলউইক ড্রাইভ, টরন্টোতে ক্রয় করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘টেগোর সেন্টার’। এই বাড়ি এখন সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত। ভারতবর্ষের বাইরে ‘টেগোর সেন্টার’ বাঙালিদের প্রথম সাংস্কৃতিক ভবন সারা পৃথিবীতে। বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান এখানে পালিত হয়।
PBCA এবং BPT এখন পর্যন্ত অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো- উত্তর আমেরিকার বঙ্গ সম্মেলন বা NABC, যা PBCA চারবার- ১৯৯২, ১৯৯৮, ২০০৮ এবং ২০১৩ সালে আয়োজন করে। কলকাতা এবং মুম্বাই থেকে অসংখ্য শিল্পী এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। দর্শকের সংখ্যা ছিল বিভিন্ন সময়ে পাঁচ থেকে দশ হাজার। ২০২৫ সালে টরন্টো কালীবাড়ি, এটি আবার টরন্টোতে আয়োজন করে।
NABC কমিটি প্রতি বছর সেরা বাঙালিদের একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেয়। ১৯৯৭ সালে ফিলাডেলফিয়াতে কানাডা থেকে এই পুরস্কার আমাকে দেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে কানাডা থেকে এই পুরস্কার পান গোরা আদিত্য, প্রয়াত শান্তি চক্রবর্তী, প্রয়াত সুধীর রায়চৌধুরী, প্রয়াত বিজয় পাল এবং প্রয়াত অসিত দত্ত। ২০০৮ সালে এই পুরস্কার কানাডা থেকে পান প্রয়াত ড. অভিজিৎ গুহ, প্রয়াত রমেন গাঙ্গুলি, ড. অলোক মুখার্জী, ড. শঙ্কর দাশগুপ্ত, প্রয়াত ড. দীপক মজুমদার এবং প্রয়াত ড. কান্তি হোড়। ২০১৩ সালে কানাডা থেকে পান প্রয়াত প্রসাদ ব্যানার্জী, রথীন ঘোষ, প্রয়াত সমীর দে এবং প্রয়াত ড. বিজয় দাস।
১৯৯০ সালে www.torontobengali.com নামে টরন্টোতে প্রথম বাঙালিদের ওয়েবসাইট তৈরি করেন রমেন ঘোষ। ২০০১ সালে PBCA শৃঙ্গার বেতার অনুষ্ঠানের সহযোগিতায় টরন্টোতে প্রথম একটি আন্তর্দেশীয় নাটক প্রতিযোগিতা শুরু করে, যেখানে বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র এবং বিভাস চক্রবর্তী।
২০০৪, ২০০৫, ২০০৭, ২০০৯, ২০১০ থেকে ২০১২ এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বিরাটভাবে দুই দিনব্যাপী একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে PBCA, যার নাম বসন্ত উৎসব। যেখানে উত্তর আমেরিকা ছাড়াও অসংখ্য বিখ্যাত শিল্পী ভারত থেকে এসে যোগদান করেন। বহু বছর ধরে PBCA অসংখ্য নাটক টরন্টোতে মঞ্চস্থ করেছে, যেখানে টরন্টো ছাড়াও কলকাতার অনেক প্রখ্যাত শিল্পীরাও যোগদান করেছেন। ২০০৪ সালে টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থা প্রথম টরন্টোতে বাঙালিদের প্রতিভা প্রতিযোগিতা শুরু করে।

গোরা আদিত্য হলেন কানাডায় প্রথম বাঙালি ব্যবসায়ী। এরপর আর যে বাঙালিরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন GTA-তে তারা হলেন গোবিন্দ সাহা, জয়দেব সরকার, ড. শঙ্কর দাশগুপ্ত, সুরজিৎ বিশ্বাস, ড. জিতেন সাহা এবং শুভজিৎ দাস। টরন্টোতে প্রথম বাঙালিদের ফেসবুক গ্রুপের প্রতিষ্ঠা করেছেন সুদীপ মজুমদার, যার নাম ‘Bengalis of Toronto (BOT)’।
১৯৮৯ সালে টরন্টো বেঙ্গলি ড্রামা গ্রুপের প্রতিষ্ঠা হয় টরন্টোতে। এই সংস্থা প্রতি বছর একটি করে নাটক মঞ্চস্থ করে। এই সংস্থার পুরোধা ছিলেন কল্যাণ ব্যানার্জী এবং এখন শ্যামল দে সরকার। এখন পর্যন্ত বহু নাটক তারা মঞ্চস্থ করেছেন। উনিশশো আশি সালে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষদের সাহায্যার্থে Toronto Calcutta Foundation নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। এটি একটি দাতব্য সংস্থা, যারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং চোখের (Eye) ক্যাম্প করে থাকে পশ্চিমবঙ্গে। জিটিএ-র (GTA) প্রথম বাঙালি রেস্তোরাঁ ছিল Bong Manchurian। বর্তমানে রয়েছে Jomidaari এবং Mustard Garden।
গত ষাট বছরে বিপুল সংখ্যক বাঙালিও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমার কাছেই রয়েছে ৩৬৪ জন প্রয়াত বাঙালির তালিকা।
টরন্টো কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠা হয় উনিশশো পঁচাশি সালে, যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা কালী। এর প্রতিষ্ঠা করেন বেশ কয়েকজন বাঙালি, যার পুরোধায় ছিলেন প্রয়াত মেঘনাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রয়াত প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। উনিশশো ছিয়াশি সালে টরন্টো কালীবাড়ি ব্র্যাম্পটনের ম্যাকভিন ড্রাইভে একটি বাড়ি কেনে এবং সেটাই হয় বাঙালিদের উত্তর আমেরিকাতে প্রথম কালী মন্দির। উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে মিসিসাগার Professional Court-এ টরন্টো কালীবাড়ি ২.৬ একর জায়গা জুড়ে ১০ হাজার বর্গফুটের একটি নতুন মন্দির নির্মাণ করে। উনিশশো আটানব্বই সালে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়। টরন্টো কালীবাড়ির প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রয়াত প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার পরের সভাপতিরা হলেন প্রয়াত সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাত রাহা এবং প্রয়াত সমীর দে। বর্তমানের কার্যকরী সভাপতি হলেন জয়দেব সরকার।
দায়িত্বের সঙ্গে এবং গর্বের সঙ্গে বলা যেতে পারে যে, টরন্টোর বাঙালি সমাজ উত্তর আমেরিকাতে বাংলার সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রচারে প্রধান নেতৃত্বে রয়েছে। ভবিষ্যতে এর আরও ক্রমোন্নতি হবে- এই আশা করা যায়।
৭.
ইতোমধ্যে আমি বাঙালি সম্প্রদায় ছাড়াও Federation of Indo Canadian Association, Indian Immigrant Aid Services, Indian Heritage Society of Brampton, New Delhi Pavilion, Carabram, Caravan, Panorama India ইত্যাদি ভারতীয় সংস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছি এবং তাদের সভাপতি, সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ইত্যাদি পদে কাজ করেছি। পেশাগতভাবে আমি Magna International-এর Quality Assurance Manager এবং পরে Senior Quality System Management Consultant ছিলাম General Motors Canada-র। পরবর্তীকালে আমার নিজস্ব কোম্পানিও প্রতিষ্ঠিত হয় যার নাম RG Consulting।
১৯৮১ সালে আমার জীবনে নামে চরম বিপর্যয়। সে-বছর আমি ছিলাম প্রবাসীর সভাপতি। ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের তৎকালীন ক্লাব বিল্ডিং-এ একটি মিটিং-এ যেতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা বরফের ওপর আমি স্লিপ করে পড়ে যাই এবং আমার ফিমার এবং কোমর ভেঙে যায়। অপারেশনের পর আমি দুই মাস হাসপাতালে এবং রিহ্যাবে কাটাই। ফিরে আসার কয়েক মাসের মধ্যে আমার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ হয়। আমি একটি নতুন কেনা বাড়িতে একা চলে যাই। সেই সময় আমি আমার কাজটাও হারাই। তখন আমি আত্মহত্যা করার কথাও চিন্তা করতাম। কিন্তু এটাও ভাবতাম যে, টানেলের ওপারে নিশ্চয় আলো থাকবে এবং তাই হলো।
ভারত সরকার আমাকে টরন্টোর ভারতীয় কনস্যুলেট এবং প্যানোরামা ইন্ডিয়ার মাধ্যমে পুরস্কার দিয়ে আমাকে সম্মানিত করে ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে কানাডায় প্রচার করার জন্য। ১৯৮৪ সালে আমি আবার বিয়ে করে নতুনভাবে জীবন শুরু করি। আমার এই স্ত্রীর জন্ম লন্ডনে। তাঁর বাবা একজন ভারতীয় কূটনীতিক ছিলেন। যার ফলে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বাবা ও মায়ের সঙ্গে ঘুরেছেন। ১৯৮৫ সালে আমার দ্বিতীয় কন্যার জন্ম হয়। ১৯৮৬ সালে আবার নতুন বাড়ি কিনি। এরপর থেকে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, ভগবানের দয়ায়। পৃথিবী ঘোরা আমার একটি নেশা। এখন পর্যন্ত আমি ১১৩টি দেশ ঘুরেছি।
লেখক পরিচিতি
জন্ম কলকাতায়। ডিসেম্বর ১৯৪২। ১৯৬১ সালে বিএ পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানির উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। কানাডায় অভিবাসন নেন ১৯৬৫ সালে। সংঘবদ্ধভাবে বাঙালিদের জন্য কিছু করার তাগিদে ১৯৬৫ সালে আয়োজনে করা হয় বিজয়া সম্মিলনী। ১৯৬৬ সালে করা হয় প্রথম পহেলা বৈশাখ। ১৯৬৮ সালে বাঙালিদের উদ্যোগে প্রথম নাটক মঞ্চায়ন এবং রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। গত ষাট বছর কানাডায় বাঙালিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সাথে যুক্ত রয়েছেন

