পৃথিবীর পথে
এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে নিয়ত ঘটে যাচ্ছে অজস্র ঘটনা যার মাঝে ছড়িয়ে আছে হাসি, আনন্দ, বেদনা কিংবা অশ্রু। সময়ের স্রোতে ঘটে যাওয়া সেইসব স্মৃতির কিছু আটকে থাকে জীবনের কোনো অদৃশ্য বাঁকে, কিছু অনুক্ষণ বাজতে থাকে হৃদয়ের তন্ত্রীতে, যা পলে পলে অনাবিল সুরে বেজে চলে মনের গভীরে- বেলায় অবেলায়। আবার কিছু স্মরণ বেলার আয়নায় ঝাপসা হতে হতে একদিন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। আমাদের হৃদয় অলিন্দের একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে সুখ-দুঃখের আলো-ছায়ায় ভরা একটি বিরাট আকাশ, যা সূর্যের আলোয় কখনও অনেক উজ্জ্বল, কখনও গোধূলির রঙে ভরা আবেশের সলাজ বিনম্রতায় স্নিগ্ধ-বিনত, কখনও-বা কালো মেঘের ঘনঘটায় শ্রাবণধারায় সিক্ত। এই-ই কমবেশি আমাদের জীবন পঙক্তির কথামালা। এবং এটাই আমাদের জীবনপথ। এই পথে চলতে চলতে আমাদের সাথে দেখা হয়ে যায় অজানা অচেনা অনেক মানুষের, জানার সুযোগ ঘটে তাদের কারো কারো জীবন-কথার; ফেলে আসা স্মৃতির আয়নায় জেগে থাকা স্মরণ দিনের।
২.
১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি একটা সময়। আমি তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেটের অ্যান আর্বর সিটিতে আমার কাজিন কাম বেস্ট ফ্রেন্ড নৃপেন, মানে- ডক্টর নৃপেন সাহার বাড়িতে অবস্থান করছি। নৃপেন তখন ডিয়ারবোর্নে অবস্থিত ফোর্ড মটর কোম্পানিতে প্রিন্সিপল রিসার্স ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। একদিন সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কানাডায় বেড়াতে যাবো কি-না। আমি যদিও প্রচুর বেড়ানো ও ভ্রমণের ধকলে কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম, তবু কানাডা যাওয়ার প্রস্তাব শুনে লাফিয়ে সোফা থেকে ওঠে দাঁড়ালাম এবং তার দু-তিনদিন পরে, এক উইকএন্ডের ভোরবেলায় নৃপেন ও আমি কানাডার উইন্ডসর শহরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম।
উইন্ডসর ভ্রমণ শেষে নৃপেন ফিরে গেল অ্যান আর্বরে আর আমি টরন্টো অভিমুখী ট্রেনে ওঠে বসে পড়লাম। শেষ গন্তব্য মন্ট্রিয়ল। ট্রেন টরন্টোর পথে ছুটছে। ট্রেনের সবকিছু খুব ভালো লাগলো- আরামদায়ক সিট, ভিতরের পরিবেশ এবং যাত্রীদেরকেও। কেউ বই পড়ছে, কেউ নিচু স্বরে সহযাত্রীর সাথে কথা বলছে। ভ্রমণটা শুরু থেকেই বেশ মিষ্টি, সহজ ও চিত্তাকর্ষক লাগছিল। কিছুক্ষণ পরপরই ব্রেকফাস্ট সার্ভকারী একজন ওয়েটার তখনকার সময়ের একটি বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয় জিংগেল- ‘সি ইউ লেটার, আ্যলিগেটর’ সুর করে বলে যাচ্ছিলো, যা আজও আমার মনে বাজে। ভারি মিষ্টি অনুভূতি! ট্রেনের জানালার ধারে বসে শুধুই দেখছি- রেল লাইনের দু-পাশে দুর্দান্ত ল্যান্ডস্কেপের ছবি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাপল, ওক, বিচ, অ্যাশ, পাইন ইত্যাদি সারি সারি নানান গাছের বনানী। রেল লাইনের দুই পাশের অনাবিল সৌন্দর্যের ডালি পিছনে ফেলে ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে একটি স্বপ্নিল পথে। এসব বনবীথির পাতায় পাতায় মধ্য-নভেম্বরের হালকা তুষার ভ্রমণ পথের দৃশ্যাবলিকে অনন্য করে তুলেছিল। ট্রেনের ভিতরে শীত শুরুর স্বাভাবিক উষ্ণতা বজায় থাকায় ভ্রমণটা আরামদায়ক মনে হচ্ছিলো এবং ট্রেন টরন্টো রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে যাত্রাপথের নয়নাভিরাম এবং মনোরম সব দৃশ্যাবলিকে স্মরণের পাতায় বেঁধে নেমে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পরে আরেকটা ট্রেন ধরে আমার টরন্টো থেকে মন্ট্রিয়ল রওনা হবার কথা। তাই নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বলা যেতে পারে, এদিক ওদিক পায়চারী করছিলাম। হঠাৎ করে খেয়াল করলাম আমার থেকে ২০-২৫ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে একটি যুবক আমার মতোই ফ্লাটফর্মে পায়চারী করছে। দু-একবার ঐ দূরত্বে দাঁড়িয়ে চোখাচোখিও হয়েছে। সাধারণ দেখায় তাকে ২৬-২৭ বছরের এক বাংলাদেশি যুবক বলেই মোটামুটি ধারণা হলো। মাঝারি উচ্চতার শ্যামলা গায়ের এবং একহারা গড়নের যুবকটির পরিধানে কিছুটা অবিন্যস্ত সাধারণ প্যান্ট-শার্ট। দু-একবার আমার কাছাকাছি এসে ঘোরাঘুরি করে আবার ফিরে গেল সে। আমি উপযাচক হয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করবার চেষ্টা করলাম না। কী ভেবে, মিনিট পাঁচেক পর যুবকটি আবার আমার দিকে ফিরে এলো এবং উৎসুক চোখে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো- ‘ওয়, আপনে কিথা বাংলাদেশি নি বাই?’
উত্তরে বললাম- ‘হ্যাঁ।’
ততক্ষণে যুবকটির নিবাস ও জন্মস্থান সম্পর্কে আমার নিশ্চিত একটা ধারণা হয়ে গেল। কিন্তু আমি একটা আপাত গাম্ভীর্যের মধ্যে নিজকে ঢেকে চুপ রইলাম। যুবকটি আবার জিজ্ঞাসা করলো- ‘কিথা বা আপনেও মন্ট্রিয়ল যাইতা নি?’
আমি মাথা নেড়ে একটা হ্যাঁ সূচক ভঙ্গি করলাম। মনে হলো, আমার গন্তব্য স্থানের নাম শুনে সে বেশ খুশি হলো এবং আমাকে একটা প্রস্তাব দিলো যে, সে আমার সাথে একই কামরায় উঠতে চায় এবং একা একা বসে থাকা বা ভ্রমণ করা তার ভালো লাগে না। মুখে কিছুটা গম্ভীর একটা ভাব ছড়িয়ে রেখে একটু সময় নিয়ে তাকে বললাম- ঠিক আছে।
যুবকটির চোখ-মুখ দেখে মনে হলো সে খুশি হয়েছে। অল্প কিছু সময় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- “আপনার নাম কী?”
সোহেল আহমেদ- উত্তরে সে বললো। (আমি এখানে তার আসল নামের বদলে একটি রূপক নাম ব্যবহার করলাম) ।
আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?
মৌলভীবাজার- ছেলেটি উত্তরে বললো।
তারপর যুবকটি আমি কোথায় যাবো জিজ্ঞাসা করলো। ততক্ষণে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে গেছে এবং আমি ও সোহেল দুজনেই একই কামরায় ওঠে পড়লাম। জানালার ধার ঘেষে সামনাসামনি দুটো সিটে আমরা দুজন বসলাম। ট্রেন মোটামুটি খালিই ছিল এবং স্বাভাবিক স্বরে কথা বললে অন্যান্য যাত্রীর অসুবিধা হবার মতো কোনো কারণ ছিল না। আমাদের মাঝে ছোটোখাটো বিষয়ে কথা হতে থাকলো। অতি শীঘ্রই আমি বুঝে গেলাম সোহেল তার আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া চলতি বাংলা ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত নয়।
বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় বছর দুয়েকের মতো আমার শ্রীমঙ্গলে পোস্টিং ছিল এবং অত্যন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জড়িত হয়ে পড়া সেখানকার ভাষা বোঝার একটি অভিজ্ঞতা ততদিনে আমার হয়ে গিয়েছিল। তাই সোহেলের আঞ্চলিক বাচন বুঝতে আমার তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। এভাবে কথা বলতে বলতে যুবকটি ততক্ষণে আমার নাম, বাড়ি, পেশা ইত্যাদি জেনে নিয়েছে। যুবকটিকে আমার নিজেরও মনে হয়েছে সে ধূর্ত, চতুর কিংবা মিথ্যাবাদী ধরনের নয়। কিন্তু আমার ও তার মাঝে শিক্ষাগত ফারাক, ব্যক্তিত্বের সীমাবদ্ধতা একটি অদৃশ্য জাল তৈরি করে রেখেছিল। আমাদের কথোপকথনের এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে কবে এবং কখন কানাডায় এসেছে। আমার প্রশ্ন শুনে মুখটা তার ভার হয়ে গেলো এবং আমাকে বললো- “দাদা, আমার কানাডা আসার গল্প অনেক লম্বা এবং বেশ কষ্টের।” প্রথমদিকে আমি অত আগ্রহ প্রকাশ না করলেও পরে ভাবলাম, টরন্টো-মন্ট্রিয়ল প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ট্রেন জার্নি, এতটা সময় কীভাবে কাটাবো, না হয় শুনি এই ছেলেটার জীবনের গল্প।
যুবক সোহেল বলতে শুরু করলো- মৌলভীবাজারে তার বাড়ি। সেখানে একটি মেয়ের সাথে তার ভালোলাগার একটা সম্পর্ক ছিল। পারিবারিকভাবে অসচ্ছল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে মেয়েপক্ষ বিয়েতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর বন্ধু বা পারিবারিক আত্মীয়দের সহায়তায় আর্থিক সচ্ছলতা আনতে চাকরি নিয়ে সে ওমানে পাড়ি জমায়। বছরখানেক ওমানের মাসকাটে চাকরি করার পর একদিন সে জানতে পারে, যে মেয়েটির সাথে তার বিয়ের কথা হয়েছিল সেই মেয়েটির অন্যত্র এক অবস্থাপন্ন পরিবারে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। খবরটা জেনে একরাশ হতাশায় ডুবে যায় সোহেল। এমন সময়ে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে আমেরিকা আসবে। কিন্তু আমেরিকায় আসার ভিসা সে পাবে না, সেটা সে জানতো। তাই অবৈধ পথে আমেরিকা আসার সুযোগ খুঁজতে থাকে সে। ভরসার মধ্যে ছিল আমেরিকায় তার দূর-সম্পর্কের এক মামা। যখন আমেরিকা আসার প্রবল বাসনা তার মনে প্রকট হতে থাকে তখন থেকেই সে অর্থ জমাতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তার এক তুর্কি সহকর্মীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানব-পাচারকারী দালালদের সাথে তার যোগাযোগ হয়ে যায়। বেশ মোটা অর্থের বিনিময়ে তারা তাকে ওমানের মাসকাট থেকে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। কলম্বিয়া এসে তারা নতুন আরেক দল মানব পাচারকারীর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার নিশ্চিত অঙ্গীকার করে সোহেলকে, যারা তাকে মেক্সিকো পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। তারপর মেক্সিকান মানবপাচার দালালের সহযোগিতায় মেক্সিকো-ইউএস-এর বিশাল বর্ডার দিয়ে রাতের অন্ধকারে আমেরিকায় ঢুকে পড়ার রুট তারা সোহেলকে জানায়।
আমেরিকা আসার স্বপ্নে বিভোর সোহেল দিনরাত পরিশ্রম করে আরও অর্থ যোগাড় করে। মিথ্যে বলে বন্ধুদের কাছ থেকেও কিছু রিয়াল ধারও নেয় সে। সেইসব ওমানি রিয়াল দিয়ে সে ইউএস ডলার কেনে। পাচারকারী নেটওয়ার্কের লোকজন তাকে বিভিন্ন দেশের জাল ভিসা দিয়ে তুরস্ক হয়ে জল, স্থল ও আকাশপথে কলম্বিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। তারপর শুরু হয় সোহেল আহমেদের আসল অ্যাডভেঞ্চার।
স্প্যানিশভাষি এইসব মানব পাচারকারীরা অত্যন্ত নির্মম মানসিকতার এবং দুধর্ষ গোছের মানুষ। তারা জানে, মৃত্যু তাদের পায়ে পায়ে। তাদের সহায়তায় সোহেল আহমেদকে কলম্বিয়া ও পানামা বর্ডারের মাঝে ‘ডারিয়ান গ্যাপ’ নামের প্রায় একশ’ কিলোমিটার লম্বা বিশ্বের অন্যতম দুর্গম পায়েচলা পথ অতিক্রম করে পানামার কোনো নিকটবর্তী শহরে পৌঁছতে হবে। ওমানে থাকাকলীন সময়ে এসব মানব পাচারকারীরা সোহেলকে এই দীর্ঘ দুর্গম জঙ্গল, কাদাপথ পায়ে হেঁটে পার হতে হবে বলে, তেমন কিছু বলেনি। সোহেল আমার সাথে গল্পে যখনই ‘ডারিয়ান গ্যাপ’ নামটি উল্লেখ করলো, তখন আমি চমকে ওঠেছিলাম। আমেরিকায় অবস্থানকালে দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ায় জন্মগ্রহণকারী লর্জিও রোডাস নামের এক স্প্যানিশ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে আমার খুব সখ্য গড়ে ওঠে। সে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ লেখাপড়া করেছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এত বেশি লোক কীভাবে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এসেছে তা নিয়ে গল্প করতে করতে লর্জিও কলম্বিয়ার উত্তর এবং পানামার দক্ষিণ অংশের সংযোগকারী ভয়াবহ রকমের দুর্গম ডারিয়ান গ্যাপ নামক পথটি সম্পর্কে আমাকে অনেক গল্প শুনিয়েছিল। এখন সোহেলের কাছে ডারিয়ান গ্যাপের নাম শুনে একটি হিমশীতল প্রবাহ আমার শরীরের ভিতর দিয়ে যেন বয়ে গেলো বলে মনে হলো।
যাহোক, সোহেল আহমেদ ততক্ষণে ডারিয়ান গ্যাপ জয়ে শামিল হয়ে গেছে। সাথে আছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রত্যাশী বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় পঞ্চাশ জনের একটি গ্রুপ। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সংকট, ব্যক্তিগত উচ্চাশা, উন্নত জীবনের ইশারা নানাবিধ কারণে আমেরিকায় আশ্রয় অভিলাষী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী লোকজন এখানে জড়ো হয়েছে যাদের অধিকাংশই স্প্যানিশ ভাষাভাষি ল্যাটিন আমেরিকার লোক। গভীর জঙ্গল, আঁকাবাঁকা, সংকীর্ণ, উঁচু-নিচু পথ, স্থানে স্থানে গভীর কাদাভরা পথ। পা রাখলে দেড় থেকে দুই ফুট অনায়াসে কাদার ভিতর ডুবে যায়। পানীয় জলের অভাবে নদী বা ঝর্ণার জল খাওয়া, খাদ্যের অভাব, অনাদৃত মাটি কিংবা ঘাসের বিছানায় রাত্রিযাপন, বৃষ্টি, বিষাক্ত পোকামাকড়, সাপ, জঙ্গলের হিংস্র প্রাণী, স্থানে স্থানে মৃত মানুষের হাড়গোড়, পাচারকারী, রুক্ষ পাহারাদার বা পথ প্রদর্শকদের হাতের বন্দুক সব মিলিয়ে জীবন-মরণ যুদ্ধের এক নির্মম পথ এই ডারিয়ান গ্যাপ। রাতের বেলায় তা আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশি যুবক সোহেল আহমেদ চলছে ডারিয়ান গ্যাপের দুর্গম পথে- চোখে জ্বলছে দূর আমেরিকার অলীক কোনো বাতিঘর। দিন যায়, রাত আসে। এবং দিনের আলো ফোটার পরেই আবার যাত্রা। প্রায় প্রতিদিন প্রতিরাতের একই চিত্র। সোহেল আহমেদ নিজে জানে না কতটুকু পথ সে পাড়ি দিয়েছে আর কতটুকু পথই-বা বাকি। এর মধ্যে একদিন তার গায়ে জ্বর এলো।
এ কয়দিনে সে বুঝে গিয়েছে যে, সে নিজে পথ চলতে না পারলে এ সকল মানব পাচারকারীরা এবং এই দীর্ঘ কাফেলা তাকে সেখানে ফেলেই সামনে এগিয়ে যাবে। এমন সময় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের এক সহযাত্রী ল্যাটিন তরুণী তার কাছে থাকা কিছু জ্বরের ঔষধ সোহেলকে খেতে দেয়। সোহেলের ভাষায় মেয়েটি খুব সুন্দরী এবং সাথে তার বছর পাঁচেকের একটি মেয়ে সন্তান ছিল। ঐ ল্যাটিন তরুণীর দেওয়া ট্যাবলেটে দুদিনেই সে অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠে- জ্বর নেমে যায়। তরুণীটির সহযোগিতায় সোহেল আহমেদের মন কৃতজ্ঞতায় ভরে যায় এবং যাত্রাপথে সোহেল তাকে সাহায্য করতে থাকে। বিশেষ করে তরুণীর পাঁচ বছরের ছোট্ট ক্লান্ত মেয়েটিকে কাঁধে চড়িয়ে কাদামাটির পথটুকু পার করে দেওয়ার কাজ সে করে দিত। এভাবেই চলছিল এবং এভাবে পথের সীমানা ক্রমশ ক্ষুদ্রতর হচ্ছিল। সোহেল তরুণীটির স্প্যানিশ বোঝে না এবং তরুণীটি সোহেলের ভাষা বোঝে না। সুতরাং ইউনিভার্সাল শারীরিক ভাষায় তাদের ব্যবহারিক ও মনের যোগাযোগ। দুর্গম পথের অজস্র কষ্টের মাঝেও কিছু সুখ সোহেলের যাত্রাপথটিকে অনেকটা মধুর করে দিয়েছিল। এর মধ্যে মানব পাচারকারী দলের গ্রুপ লিডার ঘোষণা করলো যে, পরের দিন দুয়েকের মধ্যেই ওরা পানামার একটা বর্ডার সিটিতে পৌঁছে যাবে। সোহেলের মনটা কিছুটা নিশ্চিত হলো যে, আর তেমন বেশি পথ নেই। এমন পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হবে না। সোহেল কিছুটা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেল।
পরদিন খুব সকালে আবার যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি কিন্তু সোহেল কোনোমতেই তরুণীটিকে আর খুঁজে পাচ্ছিল না। সম্ভাব্য স্পটগুলোতে খুঁজলো, কিন্তু কোথাও সে নেই। এই বেলায় মেয়েটার একটা ছদ্ম বা রূপক স্প্যানিশ নাম দিতে চাই- ধরা যাক তার নাম ছিল গ্যাব্রিয়েলা। গ্যাব্রিয়েলা নেই। কোথাও নেই! ভয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করতেও পারছে না সোহেল। অবশেষে বার বার পিছন ফিরে তাকিয়েও গ্যাব্রিয়েলাকে দেখতে না পেয়ে সোহেল অগ্রগামী কাফেলায় মিশে যায়, পিছনে পড়ে থাকা বলতে না পারা তার অনেক কথা, কয়েকটি দিনের হঠাৎ পাওয়া ভালোবাসা।
কথা বলার এই মুহূর্তটিতে হঠাৎ সোহেল কিছুটা নিশ্চুপ হয়ে গেল। একটু আগেই তার কণ্ঠ ক্রমশ ভারি শোনাচ্ছিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি সোহেলকে জিজ্ঞাসা করলাম- তারপর মেয়েটাকে আর খুঁজে পেলেন কি?
“না, আর খুঁজে পাইনি। তার ছোট্ট মেয়েটাকেও আর দেখিনি। আগেই বুঝেছিলাম পাচারকারীদের একজনের চোখ গ্যাব্রিয়েলার দিকে পড়েছিল। পথে মেয়েটাকে ঐ পাচারকারী লোকটা চোখে চোখে রাখতো। পানামার এক বর্ডার শহরের কাছাকাছি এসে যেদিন আমরা পৌঁছালাম সেই রাতেই মনে হয় ঐ লোকটা তাকে ওঠিয়ে নিয়ে গেছে।” এই বলে সোহেল চুপ হয়ে গেলো।
পরিবেশটা ততক্ষণে গম্ভীর। সোহেলের সাথে সাথে আমিও চুপ হয়ে গেলাম। নীরবতা ভাঙতে আমি সোহেলকে জিজ্ঞাসা করলাম- সেখান থেকে কী করে কানাডা এসে পৌঁছলেন?
গল্প করতে করতে আমাদের ট্রেন মন্ট্রিয়লের কাছাকাছি চলে এলো। আমি সোহেলকে জিজ্ঞাসা করলাম- তারপর কী হলো?
সোহেল বললো- কলম্বিয়া-পানামা পেরোনের পর কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, এল সালভাদর, গুয়েতেমালা পেরিয়ে মেক্সিকো পৌঁছে যাই। এসব ব্যবস্থা পাচারকারী দালালরা করে দিয়েছিল। তারপর তারা মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র বর্ডারের কাছাকাছি একটি শহরে আমাকে ছেড়ে দেয়। অল্প কিছু ডলার আমার কাছে রেখে বাকি সব ডলার পাচারকারীরা হাতিয়ে নেয়, যদিও কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী সকল অর্থ আমি আগেই তাদেরকে দিয়ে দিয়েছিলাম।
তারপর সুযোগ বুঝে একদিন পাচারকারীদের পরামর্শ মোতাবেক সোহেল রাতের অন্ধকারে আরও কিছু অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের সাথে মেক্সিকো বর্ডার পেরিয়ে আমেরিকায় ঢুকে পড়ে। কিছুদূর এগোতেই রাতের অন্ধকার ভেদ করে আমেরিকান বর্ডার গার্ডের তীব্র ফ্লাড লাইটের আলোয় হতচকিত সোহেল হাত উঠিয়ে সারেন্ডার করে, তারপর আমেরিকান কারাগার। মাস দুয়েক পরে সোহেলের ঐ দূর-সম্পর্কিত মামা তাকে জামিনে মুক্ত করে। এবার সোহেল আমেরিকার উত্তর বর্ডার পেরিয়ে কানাডা পৌঁছে আত্মসমর্পণ করে। তারপর থেকে সোহেলের ঠিকানা মন্ট্রিয়ল এবং ভরসা রাজনৈতিক আাশ্রয়। মন্ট্রিয়ল পৌঁছানোর সময় কমে আসতেই সোহেল খুব আবদারের সাথে আমাকে বললো- দাদা, আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে, আপনি কানাডায় থেকে যান। আমি আপনাকে এক বড়ো ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাবো, যিনি দেশে আইন বিষয়ে টেলিভিশন উপস্থাপক ছিলেন। একশ’ পারসেন্ট গ্যারান্টি আপনার কেস পাস হয়ে যাবে। এছাড়া আপনি তো হিন্দু এবং এখন বিএনপি ক্ষমতায়, বলবেন দেশে থাকলে সরকার মেরে ফেলবে। আপনার কেসটা হয়ে যাবেই যাবে, দাদা।
আমি মনে মনে একটু হাসলাম, তারপর তাকে বললাম- আমি বিএনপি’র আমলেই তো আমেরিকান গভর্নমেন্টের ভিজিটর ভিসায় আমেরিকা এসেছি।
সোহেল আহমেদ কী বুঝলো জানি না। তবে তা নিয়ে আমি আর কথা বাড়ালাম না। তাকে বললাম- আমি হরেন্দ্র বিশ্বাস নামে আমার এক বন্ধুর বাসায় ওঠবো এবং জায়গাটা রেলওয়ে স্টেশন থেকে খুব কাছে বলেই আমার বন্ধু বলেছে। আপনি তো স্টেশনের কাছেই থাকেন, চেনেন না কি হরেন্দ্র বিশ্বাস বা তার স্ত্রী ইন্দিরাকে?
সে ঘাড় নাড়িয়ে ‘না’ বললো। তখন তাকে বললাম- ‘যা হোক, আমাকে কি আপনি একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দিতে পারবেন?
সোহেল সানন্দে রাজি হলো এবং তার টেলিফোন নাম্বারটা আমাকে দিলো। স্টেশন থেকে নেমে দুজনে রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম এবং সোহেল একটা ট্যাক্সি ডেকে গন্তব্যটা ড্রাইভারকে বলে দিয়ে বিদায় নিলো। লক্ষ করলাম ড্রাইভারটি আড়চোখে দু-তিন বার সোহেলের দিকে তাকালো এবং গাড়ি নিয়ে একটু এগিয়ে যাওয়ার পরপরই আমাকে আচমকা একটা প্রশ্ন করলো-
জেন্টলম্যান, হ্যাভ ইউ কাম হিয়ার টু স্টে ইন কানাডা?
প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হলেও উত্তর দিলাম। বললাম- নো, আই হ্যাভ কাম হিয়ার টু সি ওয়ান অব মাই ফ্রেন্ডস লিভিং হিয়ার ইন মন্ট্রিয়ল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ এবং কয়েক মিনিট পর ড্রাইভার গাড়িটা গন্তব্যে থামালো। ব্যাক পকেট থেকে ওয়ালেট বের করতে করতে মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম- ডু ইউ হ্যাভ চেঞ্জ ফর ইউএস ডলার?
ড্রাইভার বললো- ওহ্ ইয়েস।
ওয়ালেট খুলে ড্রাইভারকে একটা পাঁচ ইউএস ডলারের নোট দিলাম। মিটারে দেখলাম ভাড়া হয়েছে আড়াই কানাডিয়ান ডলার। ড্রাইভারটি আমাকে সাড়ে তিন কানাডিয়ান ডলার ফেরত দিতেই আমি আমার গলার স্বর একটু গম্ভীর করে বললাম- দিস ইজ ফর ইউ প্লিজ।
বছর পঞ্চাশের ফরাসি ড্রাইভারটি একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললো- থ্যাঙ্ক ইউ।
মনে মনে ভাবলাম, আড়াই ডলারের ভাড়ার বিপরীতে সাড়ে তিন ডলার টিপস। আমি তো কানাডায় থাকতে আসিনি- বেড়াতে এসেছি। আর তুমি আমাকে নন-হোয়াইট মানব সন্তান বলে কানাডায় থেকে যাওয়ার ক্যান্ডিডেট ভেবেছো বাপু! তোমার প্রশ্ন আমার ইগোতে লেগেছে। তাই তোমাকে এই অতিরিক্ত ডলার টিপস দিয়ে তুমি যে সুপিরিয়র কেউ নও, শুধুই একজন ড্রাইভার তা বুঝিয়ে দিলাম। ভাবলাম, ডলার ক’টি গচ্ছা গেলেও লোকটাকে একটা শিক্ষা তো দিলাম। বাইরে তখন টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। গাড়ি থেকে নামার প্রস্তুতি নিতেই ড্রাইভারটি বলে উঠলো- প্লিজ সিট ইনসাইড, ইটস রেইন আউটসাইড অ্যান্ড ইউ উইল বি অল ওয়েট। লেট ইয়োর ফ্রেন্ড কাম ইন, আনটিল দেন ইউ কেন স্টে ইনসাইড দি কার।
মিনিট খানেকের মধ্যেই দেখি হরেন্দ্র জ্বর ও বৃষ্টির কারণে গায়ে কম্বল জড়িয়ে তার এপার্টমেন্ট বিল্ডিং থেকে নেমে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমি হরেন্দ্রকে দেখে গাড়ি থেকে নামতে নামতে টিপ্স পরবর্তী সময়ে সুন্দর ব্যবহারের জন্য ড্রাইভারটিকে ধন্যবাদ দিয়ে তার গাড়ি থেকে নিষ্ক্রান্ত হলাম। কিন্তু আমার মনের তন্ত্রীতে তখনও সোহেলের গল্পের রেশটা বেজে চলেছিল।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৫৫ সালে, বাংলাদেশের নোয়াখালীতে। যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক রতন চাকরি করেছেন বাংলাদেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং কানাডায় ম্যাপল লীফ ফুডস কোম্পানিতে। তার লেখার আঙ্গিক কবিতা ও ছোটোগল্প। স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে পড়াকালে লেখায় হাতেখড়ি ও প্রথম ম্যাগাজিনে রচনা ছাপা। প্রিয় সাহিত্যিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশ। ভালোবাসা ও শখ : সংগীত, কবিতা, সিনেমা ও ভ্রমণ।

