মনে হয় যেন আছি স্বদেশেই
২০০২ সালে সপরিবারে স্থায়ী আবাস গড়তে কানাডায় যখন আসি নিজেকে মনে হয়েছিল শেকড় উপড়ে ফেলা বৃক্ষের মতো। এখানে আসার আগে ফিলিপিন্স-এ দীর্ঘদিন থাকার ফলে বিদেশে থাকার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সেখানে তো প্রবাসী হয়ে আজীবন থাকার জন্য যাইনি। গিয়েছিলাম চাকরির স্বার্থে কয়েক বছরের জন্যে। জানতাম চাকরির মেয়াদ শেষ হলেই দেশে ফিরে যাবো, স্বজন-বন্ধুদের সান্নিধ্যে দেশেই থাকবো। কিন্তু সেই স্বজন-বন্ধুদের কাছ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে কানাডায় এলাম দেশটিতে স্থায়িভাবে থাকার জন্যে। এখানে এসে মনে হলো, প্রথম বিশ্বের এই দেশে দ্রুত ধাবমান জীবনযাত্রার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবো তো? বাড়তে থাকলো হোমসিকনেস, সেই সাথে একধরনের বিষণ্ণতা। এই বিষণ্ণতা আরো তীব্র হয় দীর্ঘদিন কোনো কর্মসংস্থান না হওয়ার কারণে। ভেবেছিলাম কানাডা একটি বিশাল দেশ, জনসংখ্যা দেশের আয়তনের তুলনায় বেশ কম। সুতরাং অতি সহজেই যে-কোনো একটা কাজ জুটিয়ে নিতে পারবো। এই ভাবনা ও বাস্তবের মধ্যে যখন ব্যাপক ব্যবধান আবিষ্কার করলাম, যখন সাথে নিয়ে আসা অর্থকড়ি ক্রমশ কমে আসছে, তখন হতাশা যেন চারদিক থেকে এসে আমাকে জাপটে ধরলো।
কানাডায় এসে আমার মতো এই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন অনেকেই। কারো কারো ক্ষেত্রে এই সময়ের ব্যাপ্তিটা কম, কারো ক্ষেত্রে আবার বেশি। আমার ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি হয়েছিল বলে হতাশায় মুষড়ে পড়েছিলাম। বার বার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। আমি ও আমার স্ত্রী রিংকু ফিলিপিন্স-এ একটি আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। সপরিবারে থাকার জন্য বেতার প্রতিষ্ঠানটি দিয়েছিল সুসজ্জিত অ্যাপার্টমেন্ট, সাথে ড্রাইভারসহ গাড়ি। মাস মাস কোনো ভাড়া দিতে হতো না, একেবারে বিনে পয়সায় থাকার চমৎকার ব্যবস্থা। আর বেতনও ছিল আমাদের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। তার ওপর ছিল Rice Subsidz নামে খাদ্য-ভাতা। বেতনের টাকা প্রায় খরচই হতো না। সব মিলিয়ে সোনার চাকরি। সেই সোনার চাকরি, সেই বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে কানাডায় আসলাম আরো উন্নত জীবনের আশায়। কিন্তু সেই আশার সাথে বাস্তবের কোনো মিল খুঁজে পেলাম না। তাই হতাশা ও আক্ষেপ দিন দিন বেড়েই চললো। অবশেষে বহু চেষ্টার পর আমার স্ত্রী রিংকু একটি আমেরিকাভিত্তিক রিটেইল কোম্পানিতে চাকরি পেলো। কয়েক মাস পর পদোন্নতি পেয়ে ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার হলো। হতাশার মেঘ ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগলো। রিংকু চাকরি পাওয়ার প্রায় এক বছর পর আমার ভাগ্যও সুপ্রসন্ন হলো। একই কোম্পানিতে আমারও চাকরি হলো। কিছুদিনের মধ্যে পদোন্নতি পেয়ে আমিও ম্যানেজমেন্ট টিমের অন্তর্ভুক্ত হলাম। এখানে কাজ করতে করতে একটা বিষয় বুঝলাম, আর তা হলো, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তিতা দিয়ে অনেক দূর যাওয়া যায়, অনেক ওপরে ওঠা যায়। তার জন্য কোনো তদবিরের প্রয়োজন হয় না। কাউকে তৈল মর্দনের প্রয়োজন হয় না। কানাডায় আসার পর জীবন-সংগ্রামের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে এভাবেই আমরা থিতু হলাম আমাদের নতুন জীবনে। মনের আকাশ থেকে সরে গেল হতাশার কালো মেঘ।
২.
কানাডায় এসে টরন্টো শহরের যে এলাকায় প্রথমে আস্তানা গেড়েছিলাম সেখানে বাঙালির দেখা মিলতো না। শুনেছিলাম বাংলাদেশের বাঙালি অধ্যুষিত ড্যানফোর্থের কথা। কিন্তু কর্মসংস্থানের খোঁজে তখন এতটাই ব্যস্ত যে, ওদিকে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। থিতিয়ে বসার পর একদিন মনে হলো ড্যানফোর্থে যাই, দেখি জানাশোনা কারোর সাথে দেখা হয় কি না। একদিন ড্যানফোর্থে গিয়ে দেখি সারিবদ্ধ দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁর বেশিরভাগই বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন। সাইনবোর্ডগুলো বাংলায় লেখা। এখানে লোকজন একে অপরের সাথে বাংলায় কথা বলছে। ড্যানফোর্থকে মনে হলো যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। এরপর থেকে মাঝে-মাঝে তাই ড্যানফোর্থে যেতাম স্বদেশের স্বাদ নিতে। ড্যানফোর্থে সেই সময় দু’টো সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিস ছিল। পত্রিকা দু’টোর নাম ‘বাংলা কাগজ’ ও ‘বাংলা রিপোর্টার’। একসময় পত্রিকার এই অফিস দু’টোতে যাতায়াত শুরু হলো। সপ্তাহান্তের ছুটিতে সেখানে সন্ধ্যার পর তুমুল আড্ডায় মেতে ওঠতাম। ‘বাংলা রিপোর্টার’ পত্রিকার সম্পাদক সুমন রহমানের অনুপ্রেরণায় একসময় বাংলা রিপোর্টারে লিখতেও শুরু করলাম। চলচ্চিত্র বিষয়ক আমার অনেক লেখা এই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। প্রবাসে বসে বাংলায় লিখছি, তা আবার এখানেই বাংলা পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে- এই বিষয়টি ছিল আমার জন্যে এক পরম প্রাপ্তি। ড্যানফোর্থের অমোঘ আকর্ষণে অবশেষে ডাউনটাউনে বসবাসের সমাপ্তি টেনে চলে এলাম ড্যানফোর্থের সন্নিকটে এলসওয়ার্থে।
এলসওয়ার্থে আসার পর পরিচয় হলো টরন্টোর প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘দেশে বিদেশে’র সম্পাদক নজরুল মিন্টোর সাথে। তিনি তখন থাকতেন আমাদের আবাসস্থল থেকে অনতিদূরে, একেবারে হাঁটার দূরত্বে। প্রায়ই সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে যাই, আড্ডা হয়। তাঁর পত্রিকায় আমার দু-একটি লেখাও তিনি ছাপালেন। একদিন তিনি তাঁর পত্রিকার সংস্কৃতি পাতার দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আমি লুফে নিলাম। এরকম একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। ‘বাংলা রিপোর্টার’ ও ‘দেশে বিদেশে’ পত্রিকার সাথে জড়িত থাকার সুবাদে পরিচয় হলো টরন্টোর বহু গুণীজনের সাথে। আমি একটু আধটু অভিনয় করি জেনে টরন্টোর নন্দিত নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক আকতার হোসেন একদিন তাঁর নাটকের একটি স্ক্রিপ্ট হাতে দিয়ে বললেন, পড়ুন, পরে কথা হবে। তারপর একদিন ফোন করে বললেন, এই নাটকে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় আপনাকে ভেবেছি। আমার সাথে কি কাজ করবেন? আমি রাজি হয়ে গেলাম। টরন্টোয় বাংলা নাটকে সেই আমার প্রথম অভিনয়। নাটকের নাম ‘চার দেয়ালের জীবন’। পরে আকতার হোসেন রচিত ও নির্দেশিত ‘এক্কা দোক্কা মন’ নাটকেও অভিনয় করেছি।
‘চার দেয়ালের জীবন’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে পরিচয় হলো গুণী নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী অরুণা হায়দারের সাথে। অরুণার সাথে অভিনয় করতে গিয়ে বুঝলাম, সে শুধু একজন নৃত্যপটীয়সী নয়, অত্যন্ত উঁচুমানের একজন অভিনেত্রীও বটে। ওই নাটক করতে গিয়ে আরেক গুণীজনের সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। তাঁর নাম আহমেদ হোসেন। আহমেদকে বাংলাদেশে মঞ্চে ও টেলিভিশনে অভিনয় করতে দেখেছি। টরন্টো এসে তাঁর দেখা মিলবে ভাবিনি। অরুণা ও আহমেদের সাথে টরন্টোর বিভিন্ন মঞ্চে ও টেলিভিশনে নাটক ও আবৃত্তির অনুষ্ঠানসহ বহু অনুষ্ঠান করেছি। এইসব করতে করতে সম্বোধন কখন আপনি থেকে তুই-তুকারিতে ঠেকেছে বুঝতেও পারিনি। আহমেদ হোসেনের পরিচালনায় ‘বিবিধ বিধান’ নাটকটি করতে গিয়ে বুঝেছি, সে কতটা সুদক্ষ ও প্রশিক্ষিত নাট্যপরিচালক। এরপর আহমেদের উদ্যোগে ‘মুক্তমন: সত্য, সুন্দর, আনন্দ, কল্যাণ’ নামে একটি আবৃত্তি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এই আবৃত্তি সংগঠনের সদস্য তিনজন। আহমেদ, আমি ও শান্ত নামের একজন আবৃত্তিশিল্পী। তখন আমাদের নিজস্ব আয়োজন ছাড়াও টরন্টোর প্রায় সব অনুষ্ঠানেই আমাদের ডাক পড়তো। শান্ত পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার পর ‘মুক্তমন’ নিয়ে আর এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয়নি আমার, আহমেদের দু’জনেরই।
একবার টরন্টো এলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী, নৃত্যের শিক্ষক ও অভিনেত্রী লায়লা হাসান। তিনি সে-বছর আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উপলক্ষ্যে টরন্টো শহরের সব নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে একটি নৃত্যানুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিলেন। সেই লক্ষ্যে গঠন করলেন একটি কমিটি এবং আমাকে দিলেন সেই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব। অরুণা হায়দার এবং নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যের শিক্ষক বিপ্লব কর-সহ টরন্টোর বেশ কয়েকজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন সেই কমিটিতে। আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসের দিন সেই কমিটি আয়োজন করেছিল বিশাল এক নৃত্যানুষ্ঠানের। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি দেশের শতাধিক নৃত্যশিল্পী নৃত্যের সেই মহা-আয়োজনে নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন। টরন্টোর বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে সেই আয়োজনটি একটি মাইলফলক হয়ে আছে।
২০১২ সালে এই টরন্টো শহরে ‘বাংলা মেইল’ নামের একটি সাপ্তাহিক পূর্ণ প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করে। শহিদুল ইসলাম মিন্টু সম্পাদিত এই পত্রিকার সূচনালগ্নে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্যও হয়। পত্রিকাটির প্রকাশের কাল থেকে আজ অবধি আমার সাথে গ্রন্থিবন্ধনটি অটুট আছে।
টরন্টো শহরে ২০১৬ সালে গঠিত হয় ‘বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার’ (বিএলআরসি) নামে বাঙালি লেখক-কবিদের একটি সংগঠন। লেখক-গবেষক-টিভি উপস্থাপক সুব্রত কুমার দাসের উদ্যোগে গঠিত বিএলআরসি ওই বছরই পাঁচজন প্রবাসী লেখকের গ্রন্থ প্রকাশ করে এবং মহা-সমারোহে আয়োজন করে এই গ্রন্থগুলোর প্রকাশনা উৎসব। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে আমার কাব্যগ্রন্থ ‘মনকল্প’ একটি। কোনোদিন আমার কোনো বই প্রকাশিত হবে ভাবিনি। প্রবাসে গঠিত সাহিত্য সংগঠন বিএলআরসি আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে এসে আমাকে অবাক করে দেয়। সুব্রত কুমার দাসের হাত ধরেই আমার পরিচয় হয় কানাডার প্রথিতযশা কবি ও ঔপন্যাসিক অ্যান মাইকেলসের সাথে। তাঁকে আমার লেখা কবিতা শোনানোরও সৌভাগ্য হয়। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন আমার কবিতা, প্রথমে বাংলায়, পরে তার ইংরেজি অনুবাদ। সেদিন সেখানে অন্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন কানাডার আরেক প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক। দিনটি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে আজীবন।
২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত লেখক-কবিদের আন্তর্জাতিক উৎসব টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব অথর্স, সংক্ষেপে টিফায় স্বরচিত কবিতা পাঠের এক দুর্লভ সৌভাগ্য হয় সুব্রত কুমার দাসের আহ্বানে। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই উৎসবে সংযোজিত হয় বাংলা কবিতা পাঠের একটি আলাদা সেশন। তাঁর সুললিত সঞ্চালনায় সেই সেশনে অন্যান্য বাঙালি কবিদের সাথে স্বরচিত কবিতা পাঠ করি বিদগ্ধ কাব্যপ্রেমিকদের উপস্থিতিতে। এটিও আমার জন্য একটি স্মরণীয় দিন।

২০২৪ সালে সুব্রত কুমার দাসের উদ্যোগে মহা-সমারোহে অনুষ্ঠিত হয় কানাডীয় বাঙালি সাহিত্য উৎসব। এই উৎসবে কানাডার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাঙালি লেখক-কবিরা অংশগ্রহণ করেন। এই উপলক্ষ্যে শহিদুল ইসলাম মিন্টু সম্পাদিত ‘বাংলা মেইল’ পত্রিকা প্রকাশ করে একটি বিশেষ সংখ্যা। এই সংখ্যায় প্রকাশিত হয় কানাডার তিরিশেরও অধিক বাঙালি লেখকের লেখা প্রবন্ধ। সবকয়টি প্রবন্ধ কানাডার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা। আমার পরম সৌভাগ্য যে এই গুণী লেখকদের লেখার সাথে আমার একটি লেখাও নির্বাচিত হয় এবং পত্রিকায় ছাপা হয়। আমার লেখার বিষয় ছিল কানাডীয় চলচ্চিত্র। পরে সুব্রত কুমার দাসের সম্পাদনায় এই লেখাগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয় একটি গ্রন্থ ‘কানাডা বিবিধ প্রসঙ্গ’ এই নামে। এই গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানও হয় বিপুল সমারোহে। আমার সাহিত্যচর্চাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে সুব্রত কুমার দাসের অবদান অনস্বীকার্য। আর এইজন্য আমি তাঁর নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয়ে থাকবো আজীবন।
টরন্টোর বাংলা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত কয়েকজন বন্ধু মিলে একবার সিদ্ধান্ত নিলাম এই শহরে যাত্রা করবো। টরন্টোয় নাটক, সঙ্গীতানুষ্ঠান, আবৃত্তির অনুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠানসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়; কিন্তু সে যাবৎ বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার মঞ্চায়ন হয়নি। শুরু করলাম ‘সিরাজউদ্দৌলা’ যাত্রাপালার মহড়া। প্রায় চার মাস টানা মহড়া শেষে দু’দিন মহাসমারোহে মঞ্চায়িত হলো ‘সিরাজউদ্দৌলা’। ওই যাত্রাপালায় অভিনয় করেছিলাম গোলাম হোসেনের চরিত্রে। মঞ্চায়নের উভয় দিনই মিলনায়তন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

‘সিরাজউদ্দৌলা’ যাত্রাপালা মঞ্চায়নের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পরে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে গঠন করি নাট্যসংগঠন ‘নাট্যসঙ্ঘ, কানাডা’। ‘তিন মাতালের কাণ্ড’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে নাট্যসংঘ, কানাডার যাত্রা শুরু। এই নাটকে এক মাতাল ও নুরু চোর- এই দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করি। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, নাটকের মতো একটি বিশাল আয়োজনকে প্রবাসের নানান সীমাবদ্ধতায় সার্থক ক’রে তোলা অত্যন্ত কঠিন। প্রথমত নাটকের চরিত্র অনুযায়ী কুশীলব নির্বাচনে হ’তে হয় গলদ্ঘর্ম, মঞ্চাভিনয়ে দক্ষ অভিনেতা অভিনেত্রীর স্বল্পতার কারণে। তারপর আসে মহড়ার বিষয়টি। কুশীলবদের রুটি-রুজির দিন ও সময়কে মেনে নির্ধারণ করতে হয় মহড়ার দিনক্ষণ। সপ্তাহে এক বা বড়োজোর দু’দিন ছাড়া মহড়া সম্ভব নয়। এই কারণে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে নাটক মঞ্চায়নে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখানে নাটকের মঞ্চায়ন হ’চ্ছে ‘নাট্যসঙ্ঘ, কানাডা’, ‘অন্য থিয়েটার’, ‘বাংলাদেশ থিয়েটার’ ও ‘ইতিহাস দেশ সমাজ’-এর মতো কিছু নাট্যসংগঠনের উদ্যোগে। এই নাট্যসংগঠনগুলোর নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মীদের নিরলস শ্রমে ও ত্যাগে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, যা দর্শকরা দর্শনীর বিনিময়ে দেখছেন। নাটকের প্রদর্শনীগুলোতে হল থাকে কানায় কানায় পূর্ণ। এই প্রবাসে নাটকের প্রতি দর্শকদের মমত্ববোধ ও আগ্রহ দেখে রীতিমতো অবাক হ’তে হয়। এখানে যে নাটকগুলো মঞ্চস্থ হ’চ্ছে তার অধিকাংশই মৌলিক। স্বদেশের সমাজ-বাস্তবতা এবং প্রবাসী জীবনের নানা টানাপোড়েন নিয়ে প্রবাসী নাট্যকারদের রচিত নাটকগুলোর মঞ্চায়নই হচ্ছে বেশি।
কানাডার বাংলা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান দেশি টেলিভিশনের প্রযোজনায় টেলিফিল্মও নির্মিত হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাক্ষুসী’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত ওই টেলিফিল্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ হয়েছিল। ছবিটির বেশিরভাগ শুটিং হয়েছিল আউটডোরে। লোকেশনগুলো এমনভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল, যাতে বাংলাদেশের প্রকৃতির আবহ থাকে। ছবিটিতে কাজ করার স্মৃতি এখনো চিত্তবোধে আনন্দ জাগায়। ড. মঞ্জুর পারভেজ ও ইলোরা আমীন পরিচালিত ছবিটির প্রিমিয়ার হয় ২০১৪ সালে টরন্টোয় অনুষ্ঠিত নজরুল সম্মেলনে। পরে বাংলাদেশের আরটিভিতে তা প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও দেশি টেলিভিশন ও বাংলা টেলিভিশনের বিভিন্ন প্রযোজনায় একসময় অংশগ্রহণ করেছি প্রায় নিয়মিত। আর এখন টরন্টোর বাংলা মিডিয়া জগতের প্রিয়মুখ শহিদুল ইসলাম মিন্টুর এনআরবি টিভি’র বিশেষ আয়োজনগুলোতে বাংলা কবিতা উচ্চারণের সৌভাগ্য হচ্ছে মাঝে মাঝে।
টরন্টো শহরে বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো পালিত হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। শহিদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানগুলোতে নামে মানুষের ঢল। পহেলা বৈশাখে এখানে মঙ্গল শোভাযাত্রাও হয়। এখানে আছে শহিদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সেইসাথে সেখানে বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে হয় অনুষ্ঠান একুশে ফেব্রুয়ারির মহান দিনটিতে। রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীও পালিত হয় মহা-সমারোহে। আর প্রতি বছর গ্রীষ্মে থাকে বইমেলার আয়োজন। বাংলা সংস্কৃতির সবকিছুরই সরব উপস্থিতি এই টরন্টো শহরে। এইসব আয়োজনে প্রবাসের শত কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও চেষ্টা করি উপস্থিত থাকতে কখনো অংশগ্রহণকারী, কখনো-বা স্রেফ দর্শক হিসেবে। প্রবাসে এইসব সাংস্কৃতিক আয়োজনের সাথে নিবিড় সখ্যই দেশে না থাকার বেদনাকে ভুলিয়ে দেয়। মনে হয়- আছি আমার প্রিয় স্বদেশেই।
৩.
কানাডা হচ্ছে বহু-সংস্কৃতির মিলনভূমি। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে অভিবাসী হয়ে এসেছেন এবং এখনো আসছেন তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষাকে সাথে নিয়ে। এখানে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষাকে লালন এবং তার চর্চার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তো নেই-ই; বরং তা সংরক্ষণ, লালন ও চর্চার সুযোগ অবারিত। কানাডীয় সরকার সবসময়ই অভিবাসীদের নিজ নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে উৎসাহ প্রদান করে থাকে। এই লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে Canadian Multiculturalism Act নামে একটি আইন। Canadian Charter of Rights and Freedoms-এর ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের দ্বারা কানাডায় বহু-সাংস্কৃতিক কর্মসূচিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১৯৮২ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালে প্রণীত হয় Canadian Multiculturalism Act নামে আইনটি। যতদূর জানা যায় কানাডাতেই প্রথম এই ধরনের একটি আইন প্রণীত হয় অভিবাসীদের নিজ নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের লক্ষ্যে। এই আইনটি ছাড়াও বহু-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ প্রদানের জন্য রয়েছে অন্যান্য নানা ধরনের কর্মসূচি ও অর্থায়নের ব্যবস্থা। অভিবাসীরা তাদের নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে সংস্কৃতি চর্চা ও উৎসবাদি আয়োজনের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বাধাপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু কানাডায় সেই ধরনের কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা একেবারেই নেই। এদেশে সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নানা রকমের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন তারই প্রমাণ বহন করে। এছাড়াও প্রতি বছর ২৭ জুন মহা-সমারোহে পালিত হয় Canadian Multiculturalism Day. সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি প্রদানই দিবসটি পালনের একমাত্র উদ্দেশ্য। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ, সংরক্ষণ ও লালন কানাডীয় সমাজব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লেখক পরিচিতি
শেখর ই গোমেজ লেখালেখির জগতে আছেন দীর্ঘদিন। স্কুলে পড়াকালীন শুরু হয় তাঁর সাহিত্য-যাত্রা স্কুল ম্যাগাজিনে লেখার মাধ্যমে। তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ ও কানাডার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কাব্যগ্রন্থ ‘মনকল্প’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। প্রকাশক টরন্টোর বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার। কবিতার পাশাপাশি গবেষণামূলক প্রবন্ধও রচনা করেন। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় মূলত চলচ্চিত্রের নানা দিক ও কাব্য বিশ্লেষণ।

