মাটির কাছাকাছি

রোকসানা লেইস

অনেকদিন শহুরে জীবনে থাকার পর হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, মাটির কাছে থাকলে কেমন হয়। মাটির কাছে থাকা- কথাটা কেমন অদ্ভুত, তাই না? কানাডায় শহরের জীবনেও বাড়িগুলো এমনভাবে বানানো মাটির সাথে সম্পর্ক আছে। পিছনে ব্যাক ইয়ার্ড সামনেও একটুখানি আঙিনা গাড়ি পার্কিং। নিজ দায়িত্বে এসব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হয় বাড়িতে বসবাসকারীদের কানাডার চার ঋতুর চার রকম আবহাওয়ায়।

গ্রীষ্মে ঘাসকাটা, শরতে ঝরাপাতা পরিষ্কার। শীতে বরফ পরিচ্ছন্ন করা আর বসন্তে বরফ শেষের জমা জল চলে গেলে, মাটিতে নতুনের বীজ বোনা। এইসব কাজের জন্য মাটির সাথে কাজ করার আগ্রহ মনে হয় শুধু আমি নই, কানাডায় বসবাসকারী সব বাংলাদেশিদের মধ্যেই দেখা যায়। এমনকি যারা কখনো বাগান করেন নাই তারাও গ্রীষ্মকালে ফুল ফসল তুলতে চান, নিজের হাতে বোনা ফসলের গাছ থেকে। সময় মাত্র চারমাস এর মধ্যেই ফসল বোনা থেকে তোলার কাজ শেষ করতে হয়।

নিত্যদিনের কাজের সাথে জমি চাষ করা, বীজ বোনা-চারার যত্ন করা আর ফসল তোলা থেকে ফসল সংগ্রহ করে নিজে খাওয়ার সাথে আত্মীয়-স্বজন বন্ধুদের বিলানোতে যে আনন্দ! দেশে থাকা এই সব মানুষ সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত ছিলেন মনে করি। নয়তো অভিবাসী জীবনে এত কাজ নিজে করার পরও সবাইকে দেখি আগ্রহ ভরে মাটির সাথে কাজ করতে চায় এই কয়েকটা মাস। তবে হাইরাইজ বিল্ডিং-এ থাকা মানুষেররা এই মাটির সংযোগ থেকে বঞ্চিত। যদিও ইচ্ছে করলেই হাঁটা যায় খোলা মাঠে। পার্কে, ট্রেইলে। যার কোনো কমতি নেই কানাডায়।

যেদিন প্রথম কানাডায় প্রবেশ করি, সেদিন থেকেই আমার আগ্রহ জন্মায়, কানাডার গ্রামের মানুষ কেমন থাকে, তা জানার জন্য। শহুরে জীবন আর গ্রামের জীবন কি একই রকম? এই আগ্রহটা তৈরি হয়েছিল প্রথমেই বিশাল জায়গা জুড়ে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে। শুরুতেই বড়ো শহর টরন্টো ছাড়া পূর্ব, পশ্চিম, উত্তরের ছোটো কিছু শহরে, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। বেশ অনেকদিন থাকারও অভিজ্ঞতা হয় সে-সব শহরে। আর এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার পথে বিশাল কানাডার অনেক বিস্তৃর্ণ পথ পেরিয়েছি, দেখেছি ফসলের ক্ষেত– মাঠের পর মাঠ জুড়ে। কোথাও ভুট্টা তো কোথাও ক্যানলা, কোথাও যব, তো কোথাও আলু, সূর্যমুখীর বিশাল বাগান। এছাড়া দেখেছি আপেল, আঙুর, পিচ, চেরি, স্ট্রবেরি এবং আরো নানা রকম ফলের বাগান। কখনো খোলা মাঠে কিছু গরু, ঘোড়া, ছাগল, ভেড়া একা নিজের মতোন ঘাস খাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, বসে আছে। কোথাও কোনো পাহারাদার রাখাল নেই।

অবাক লাগতো, কীভাবে এই প্রাণীগুলো অন্য কোথাও চলে যায় না! মালিক যেখানে রেখে গেছে সেখানেই থাকে! কিন্তু এত বিশাল ভূমি জুড়ে বাগান বা ক্ষেতের পাশে কখনো দেখা পেতাম না কোনো বাড়ি ঘরের বা মানুষের। মানুষ ছাড়াই যেন আপন মনে সেজে আছে বিশাল প্রকৃতি ফসলের মাঠ। আর ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রাণিকুল।

অনেক অনেক প্রশ্ন আমার মনে। স্থানীয় যারা অনেক বছর ধরে আছেন, জানতে চাইতাম তাদের কাছে কানাডার গ্রামীণ জীবন-যাপন সম্পর্কে। তারা যতটুকু জানতেন, সেভাবে উত্তর দিতেন। কিন্তু তারাও তো শহুরে মানুষ, আসলে তাই প্রকৃত সত্য জানা হয়ে ওঠত না।

একবার চলে গেলাম ড্রাইভ করে দুই প্রভিন্স পার হয়ে পূর্ব দিকের শেষ ছোটো প্রভিন্স, প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডে। ড্রাইভ করতে হলো, ষোলো ঘণ্টা প্রায়- ষোলো-শ’ কিলোমিটার দূরের আটলান্টিকের পাড়ের প্রভিন্সে পৌঁছাতে। সেখানে তখন মোটে বত্রিশ হাজার লোকের বাস, ঐ প্রভিন্সের রাজধানী শ্যার্লোটউনে। কোনো কোনো শহরে মোটে দুইশ’ বা তিনশ’ লোক বাস করে। মোট প্রভিন্সের জনসংখ্যা তখন একলাখ পঁয়ত্রিশ হাজার। এমন জনসংখ্যার দেশে ঘনবসতি দেখার কোনো সুযোগ নেই। এক একটা বাড়ি অনেক দূরে দূরে।

কৃষি আর মৎস শিকার এই প্রভিন্সের মানুষের আয়ের উৎস। সেখানে আমার কয়েকদিন থাকার মাঝে আলাপ হলো স্থানীয় কিছু মানুষের সাথে। যারা খুব সহজ-সরল এবং সুখী জীবনে অভ্যস্ত। তাদের জীবন যাত্রায় টরন্টো, ভ্যানকুভার, মন্ট্রিয়লের মতোন বড়ো শহরের জীবন-যাপনের ব্যস্ততা নেই।

যারা মাছ মারতে যায়, তাদের মিতালী সাগরের সাথে। ছোটো ছোটো রঙিন ঘর বানায় তারা জলের পাড় ধরে। মাছ মেরে নিয়ে আসে গান গাইতে গাইতে। আলস্যে আনন্দে গানে, কবিতায় তাদের জীবনযাত্রা।

যারা কৃষিকাজ করে, তারাও খুব ব্যস্ততায় থাকে না। বছরে কয়েকটা দিন মাঠে কাজ করে আর বাকি সময় সান্ধ্য পার্টি আর গালগল্পে কাটাতে ভালোবাসে। তারা একে অপরকে সাহায্য করতে ভালোবাসে। ছোটো কমিউনিটির সবাই সবাইকে চেনে।

মাঠে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন লেখক।

সেই প্রথম সাগরপাড়ে বসে সরাসরি কিছু স্থানীয় মানুষের সাথে গল্পে জেনেছিলাম তাদের জীবন যাত্রা। জেনেছিলাম তারা উল বুনতে পছন্দ করে। ছেলেরাও উল বুনে বানায় নানান কিছু। আর এই উল সংগ্রহ করে নিজেদের ভেড়ার লোম সংগ্রহ করে। ধরা পড়া মাছ টিনজাত করার নিজস্ব প্রক্রিয়া আছে তাদের। শীতকালের জন্য খাদ্য সঞ্চয়ের প্রাকৃতিক নিয়ম তারা আধুনিক ফ্রিজ হওয়ার অনেক আগে থেকেই জানে। হিমায়িত, শুকানো, ক্যানিং, সংরক্ষণ এবং গাঁজন বা ফারমেনটিং নিয়মে। বহু আগে থেকেই তারা খাদ্য সঞ্চয় করে রাখতো।

আধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার মানুষের জীবন-যাপন সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু আধুনিক যন্ত্র আবিষ্কারের আগে থেকেই মানুষের মধ্যে যে সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ছিল, তা মানুষ আবিষ্কার করেছে বেঁচে থাকার তাগিদে। যখন বরফে ঢাকা সময় খাদ্য পাওয়া কঠিন, সেই সময়ের জন্য খাবার পাওয়া সহজ করার জন্য সংরক্ষণ পদ্ধতি মানুষ খুঁজে পেয়েছিল।

আমি অবাক হই এখনও এ কথা ভেবে, বছরে আট-নয় মাস যেখানে শীত থাকে, আর সে শীত তো কঠিন, মাইনাসের ঘরে নেমে যাওয়া শীত; সেই জায়গায় মানুষ কাঠের আগুন জ্বালিয়ে কীভাবে জীবন-যাপন করতো? এখন অনেক আধুনিক সুবিধা পাওয়ার পরও শীতের জন্য নড়তে ইচ্ছা করে না অনেক সময় আমার। অথচ এদেশে ঘড়ির সময় ধরে সব কাজ মানুষ করে যাচ্ছে। অনেক মানুষ নর্থ পুলের কাছেই থাকে বরফের ঘর বেঁধে। তারা শীতপ্রধান জায়গার জীবন-যাপনই ভালোবাসে। বরফের ভিতর প্রাণীর গায়ের চামড়ার কোট পরে শিকার করতে যায়। সত্যি মানুষের চিন্তা-ভাবনা যাপিত জীবন কত বিচিত্র!

শহুরে জীবনে এক চিলতে মাটির সাথে ফসল ফলাতে ফলাতে একদিন ভাবনা হলো, গ্রামে চলে গেলে কেমন হয়? বিস্তৃর্ণ গ্রাম্য পরিবেশে থাকার অভিজ্ঞতা নেওয়ার ইচ্ছা হলো।

নিজের মতোন গ্রাম দেখা শুরু হলো, ঘুরে ঘুরে- সেই থেকে। প্রত্যেক ছুটির দিনে তখন নানা গ্রামে চলে যেতাম। কোথাও নদী বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা। দেখতাম অনেকেই মাছ ধরছে ছিপ ফেলে। গ্রামের স্থানীয় মানুষের চেয়ে শহরের মানুষ যেত মাছ ধরতে নদী, হ্রদের পারে।

অনেক মজা লাগতো যখন মাছ ধরে সে মাছ আবার ছেড়ে দিতো জলে, তা দেখে। বিদেশিরা মাছ ধরার আনন্দ পাওয়ার জন্য মাছ ধরতো। মাছ খাওয়ার জন্য তাদের আগ্রহ তেমন ছিল না। আমাদের দেশের মানুষ অবশ্য মাছ ধরে বাক্স ভর্তি করে নিয়ে আসতো। ফ্রিজে তুলে রাখবে। নিজে খাবে এবং বন্ধুদের দেবে। কালচারাল গ্যাপ বিষয়টা চেনা হলো। তেমনি দেখেছি এদেশে গাছের নিচে নানারকম ফল পড়ে থাকে, গাছ ভর্তি ফল কেউ ধরেও দেখে না। বাজার থেকে কিনে খাবে কিন্তু গাছ থেকে পেড়ে বা কুড়িয়ে খাবে না।

দেখতাম দল বেঁধে মানুষের ঘুড়ি ওড়ানো। নানান রকমের ঘুড়ি বিভিন্ন আকৃতি, কত ধরনের মানুষ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, মহা উৎসব যেন! কেউ পরিবার নিয়ে এসেছে। সবাই ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। কেউ একা একা। কিন্তু সবাই মিলে এক বিশাল দল মাঠে নেমেছে ঘুড়ি উৎসব করার জন্য। এসব পরখ করতে করতে এক সময় স্থানান্তরিত হয়ে গেলাম গ্রামে, শহরের আরামের জীবন ছেড়ে। যেখানে একটুখানি জায়গার ভিতর সিটি কর্পোরেশন থেকে দেওয়া সমস্ত সুযোগ সুবিধার মধ্যে থাকা যেতো। নিজে কাজ করতে না চাইলে কাছে পিঠে পাওয়া যায় সাহায্য করার লোকও। রান্না না করতে চাইলে পাশেই খাবার দোকানে যাওয়া যায়।

এমন নানাবিধ সুযোগ রেখে গ্রামের জীবনে চলে গেলাম। শুরুর দিনই রাতের বেলা ছিল প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি। অচেনা জনবিরল জায়গায় পুরানো বাড়ির ভিতর অন্যরকম এক অনুভূতি। চাইলেই কাউকে ডাকতে পারবো না। আশেপাশে কাছাকাছি কোনো বাড়ি নেই। কোনো চেনাও নেই। রাত ঘন হতেই নিস্তব্ধতা যেন বাড়তে লাগলো। ঝড় বৃষ্টি থামার পর একটানা ঝিঁ ঝিঁ’র শব্দ দরজা খুললে টের পাচ্ছি। ঘরের ভিতর পিনপতন নৈঃশব্দ। এত নীরবতায় যেন ঘুম আসতে চায় না। তবু রাত কাটলো। সকালে স্টোভ জ্বলছে না। কেটলে পানি গরম হচ্ছে না। নাস্তা বানানোর কী হবে? বিদ্যুৎ নাই। কোথায় খবর নেবো, জানি না। আশেপাশে বাসা নেই যে, বিদ্যুৎ আছে কিনা পরখ করবো। অপেক্ষা করে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় রইল না।

বিদ্যুৎ শহর থেকে সাপ্লাই দিলেও ঘর গরম করার জন্য তেল কিনতে হয় নিজে। যা এক বিশাল খরচ। ঘরের ভিতর যে ফায়ারপ্লেস আছে তাতে কাঠ দিয়ে আগুন দিয়ে বসে থাকলাম ঘর গরম হওয়ার নাম গন্ধ নাই। মাত্র সাত দিনে বাড়ির চারপাশের ঘাস এমন বিশাল লম্বা হয়ে গেলো মনে হয় যেন জঙ্গলে বাস করছি। ঘাস কাটার কোনো যন্ত্র নাই। তখন গ্রীষ্মকাল হলেও ঘরের ভিতর প্রচুর ঠান্ডা থাকে। তাই প্রায়শই আমি বাইরে বসে রোদ পোহাই। এমনি একদিন দেখি আমার পাশে বসে রোদ পোহাচ্ছে বিশাল বড়ো এক সাপ। তবে আমি ভয় পাওয়ার আগেই মনে হয় সাপ আমাকে দেখে ভয় পেয়ে লেজগুটিয়ে পালিয়ে গেলো। অথচ আমার ধারণা ছিল কানাডায় সাপ নাই। সবচেয়ে বড়ো অসুবিধা হলো, শহুরে অভ্যস্ত জীবনে তখন ইন্টারনেট ব্যবহারে দারুণ অভ্যস্ত। অথচ কানাডার গ্রাম যে ইন্টারনেটের বাইরে প্রায়, সেই খবর আমার জানা ছিল না। মোটে তো দুটো ইন্টারনেট সাপ্লাই করার কোম্পানি তখন, তাদের একজন বললো, এই অঞ্চল তাদের আওতার বাইরে। অন্য কোম্পানি বললো, ওরা কেবল দুই গিগা বাইট ইন্টারনেট দিতে পারবে। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো, তাই ঐ দুই গিগা বাইটই নেওয়া হলো। আরো সমস্যা হলো মোবাইলে রোমিং চার্জ বাড়তে লাগলো।

শুরুতেই এমন নানারকম উদ্ভট অবস্থায় কখনো মনে হলো, সাজানো সহজ জীবন ছেড়ে এসে কি ভুল করে ফেললাম? চলে এসেছি, এখন আর ফেরার উপায় নাই। নানানভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। ঘরের বাইরে পাওয়া গেলো একটা হিটিং সিস্টেম, যেখানে কাঠ ঢুকিয়ে আগুন দিলে পানির সাহায্যে ঘর গরম হয়। একটা প্রাচীন পদ্ধতি সম্পর্কে জানা হলো। এই সিস্টেমটা আবিষ্কার করার পর ঘরের ভিতর থাকা আরামদায়ক হয়ে গেল। এখানে শহরের মতোন পানি সাপ্লাই নেই, পানি তুলতে হয় নিজেকেই। গরম করতে হয় নিজে। সোয়ারেজ সিস্টেমও নিজের। মোটামুটি সব কিছুই নিজে করতে হয়। টাউনশিপ থেকে পরিচ্ছন্নতা আর বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়া আর তেমন সুবিধা পাওয়া যায় না।

বিদ্যুৎ না থাকলে অপেক্ষায় থাকতে হয়। পিচ ঢালা পথ অনেকটা দূরে শেষ হয়ে যায়, মাটির পথ ধরে বাড়ি ফিরতে হয়। সত্যিকারের গ্রামীণ অনুভূতি। দু’পাশে ফসলের ক্ষেত।

এর মাঝে দেখলাম, আমি ছাড়া নানা রকম প্রাণিকুল ঘরে বসবাস করে, ভাড়া না দিয়েই। এ যেন কিনু গোয়ালার গলি। বিনা ভাড়ায় থাকে, আবার খিদা লাগলে বিদ্যুতের তার চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। আমাকে থাকতে হয় অন্ধকারে। দিনে দিনে জানা হলো তাদের গতিবিধি। বন্ধ করা হলো ঘরে ঢোকার পথ। এখন আর যখন তখন বিদ্যুতের তার কেটে দিতে পারে না কেউ।

সাপের ভয় চলে গেলো, যখন জানলাম এসব নির্বিষ ঢোড়া জাতীয় সাপ। মাত্র দুই গিগা বাইট ইন্টারনেট, হিসাব করে ব্যবহার করি। এর মধ্যে মেঘলা দিনে মুভি দেখতে দেখতে কত গিগাবাইট ব্যবহার করেছি বুঝতেই পারলাম না। জানলাম যখন বিশাল অংকের বিল এলো পরের মাসে। এটাও জানলাম, দুই গিগাবাইট বরাদ্দের বাইরেও ব্যবহার করা যাবে, শুধু অর্থ ব্যয় হবে বেশি। সব কিছুরই সমাধান আছে। শুধু জানতে হবে। সেই সংকীর্ণ অবস্থা এখন বদলে গেল, শহরের মতোন আনলিমিটেড ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগে। অপেক্ষায় শান্তি। আসছে নতুন নতুন অফার। ক’দিন আগে নিজেদের মতোন কেবল বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে এক কোম্পানি, যখন বাসায় ছিলাম না। এখন চলছে প্রতিযোগিতা অনেক কিছুর।

মাটির কাছে খড়ের গাদায় বসে প্রকৃতি উপভোগ করছেন লেখক।

প্রথম দেখা গ্রামের চেয়ে অনেকটাই বদলে যাচ্ছে দিন দিন। গ্রামীণ জীবনের প্রথম সবচেয়ে ভালো লাগলো, ঘুম থেকে জেগে যখন দেখলাম, একজনের পর একজন প্রতিবেশী নিজেরাই এসে পরিচিত হয়ে গেলো। অভ্যর্থনা জানিয়ে গেল, গ্রামে আগমনের। নিমন্ত্রণ দিয়ে গেল তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য।

গ্রামে মানুষ অনেক আন্তরিক এবং সহজ মনে হলো। শহরে পাশাপাশি ফ্লাটের প্রতিবেশীর সঙ্গে অনেক সময় দেখা হয়নি। অনেকে কথা পর্যন্ত বলেনি অনেক সময়। অথচ গ্রামের প্রতিবেশীরা নিজেরাই এগিয়ে এসেছে পরিচিত হতে। জানিয়ে গেছে অনেক তথ্য যা জানা ছিল না। শহরের মেয়র পর্যন্ত এলো পরিচিত হতে। রবিবার রবিবার চার্চে যাওয়ার আমন্ত্রণ নিয়ে আসতো যারা গীর্জার সাথে জড়িত এমন লোকজন।

একটু দূরে দূরে থাকা বাড়িগুলোর মানুষ যারা চাষবাস করেই জীবন যাপন করে, যাদের আছে নিজস্ব গরু, ঘোড়া, ছাগল, ভেড়া তারা নিজেরাই আগ্রহ করে বাড়ির এবং আশেপাশের ঘাস কেটে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। এবং কেটেও দিলো। আমন্ত্রণ জানালো তাদের বাড়িতে যেতে। এ-যেন দেশে ছোটো শহরে থাকার অনুভূতি ফিরে এলো। সবাই সবার পরিচিত। আপদে বিপদে, সুখে দুঃখে পাশাপাশি থাকার আনন্দ। জানা গেলো আমার কৌতূহল সম্পর্কে, প্রাণিগুলো একা কীভাবে বসে থাকে মাঠে। মাঠে সূক্ষ্ম বিদ্যুৎ দেওয়া ক্ষতিকর নয় এমন এক ধরনের তারের বেড়া দেওয়া থাকে। মাঠ পেরিয়ে যেতে গেলে হালকা বৈদ্যুতিক শক খেয়ে প্রাণীকুল তাই মাঠেই ফিরে আসে। কয়েকবার শক খেলে তারা আর ঐ পথে হাঁটে না।

পরিচয় হলো আরো অন্যরকম কিছু মানুষের সাথে, যারা এই আধুনিক জীবনে প্রচণ্ড রকমভাবে পুরানো ধ্যান-ধারণায় আছে, সেই নিয়মে জীবন যাপন করে। খুব যত্ন করে এড়িয়ে চলে আধুনিক যন্ত্রপাতির সুখ-সুবিধা। হাতে তৈরি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এবং ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ঘুড়ে বেড়ায়; কাজে, বাজারে যায়। তাদের পোশাক এবং চালচলন দেখলে আমার মনে হয় লিটিল হাউস অন দ্যা প্রেইরি। এদের বলে আমিস। খুব সহজ পুরানো ধ্যান-ধারণায় এখনও তারা জীবন যাপন করে।

মাঝে মাঝে দেখি, দরজার কাছে কেউ রেখে গেছে বিশাল বড়ো আলুর প্যাকেট, যা সারা বছর খেয়েও শেষ করতে পারবো না। এছাড়াও ভুট্টা বা নানারকম সবজি, ফল। কে যে কখন রেখে যাচ্ছে তাদের নামও বলে যায় না যদি দেখা না হয়। জানতেও পারি না কখনো, কে রেখে গেলো।

আরো দেখলাম, একা একজন কৃষক বিশাল বিশাল মাঠের চাষ থেকে ফসল বোনা তোলার কাজগুলো একাই করে ফেলছে তাদের সাহায্যকারী মেশিনের সহায়তায়। কৃষক পরিবারের সবাই কৃষক নয়। বর্তমান সময়ে অনেকেই অন্যান্য কাজের জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়। এমনকি কট্টর আমিস নিয়মের মানুষের পরিবারেও নিয়ম ভাঙার গান চলছে। অনেকেই আমিস গোষ্ঠীর বাইরে অন্য গোষ্ঠীর মানুষ বিয়ে করে পরিবার এবং নিয়ম থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে যাচ্ছে।

বাড়ির পাশে কোনো গ্রোসারি দোকান নাই। বাজার করতে যেতে হয় পাশের ছোটো শহরে। হঠাৎ প্রয়োজনীয় কিছু শেষ হয়ে গেলে বাজারে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নাই। অথচ এমন অভ্যস্ত ছিলাম বাড়ির নিচে গ্রোসারী দোকান, রান্না করতে করতে পিঁয়াজ, তেল, কাঁচা মরিচ শেষ হয়ে গেলে বাচ্চাদের পাঠিয়েও নিয়ে আসতে পারতাম।

অভ্যাস পরিবর্তন করতে হলো সব কিছু বাড়ন্ত হওয়ার আগেই কিনে ফেলার। শহরে প্রতিদিন নানা অনুষ্ঠান। ছুটির দিন বা বিকালে কমিউনিটির অনুষ্ঠান বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা। অকারণ মলে গিয়ে হাঁটাহাঁটি। প্রয়োজন না থাকলেও কিছু কিনে ফেলা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে গেলো অভ্যাসগুলো। বন্ধুরা দূরের পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসতো আমার কাছে। পাখপাখালির গানে সবুজের মাঝে কাটিয়ে যেতো।

বিকেলের মায়াবী রোদের রং দেখি। রাতে তারা খচিত আকাশ দেখি। পূর্ণিমার আলোয় ভেসে যাওয়া মায়াবী সময়, জানি না আমাকে কোন মায়াপুরিতে নিয়ে যায়। ঘাসের মাঝে নানা রকম ফুল ফোটে, তা দেখি। মুগ্ধ হই তাদের সৌন্দর্যে, সৌরভে। চিনে যাই নানা রকম প্রাকৃতিক রেমিডি লুকিয়ে থাকা ঔষধি গাছের চেহারা, উপকারিতা। বুনো তিতির দল বেঁধে এসে শুয়ে থাকে বাড়ির আঙিনায়। তাদের দেখতে দেখতে হারিয়ে ফেলি নিজেকে। রাতের বেলা লাখো জোনাকি যেদিন প্রথম দেখলাম জ্বলছে নিভছে, সেই রাতে আমার ঘুম চলে গেল। আমি হয়ে গেলাম ছোটো বেলার সেই বাচ্চা মেয়েটি, যে বাড়ির আঙিনা জুড়ে দৌড়ে বেড়াতো জোনাকি পোকার পিছে, ধরে বোতলে রাখার জন্য। দেশ-বিদেশের কোনো পার্থক্য রইল না।

অন্ধকার রাতে কোটি তারার ভিড় আকাশ জুড়ে কতদিন এই সৌন্দর্য দেখায় বঞ্চিত ছিলাম শহরে থেকে। অনেক দিনের সাধ উত্তরের আলো দেখার। কত জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছি শুধু উত্তরের আলো দেখার জন্য। সেই সাধও পূরণ করার সুযোগ পেয়ে গেলাম ঘরে বসে। উত্তরের আলো অরোরা, চলে এলো আমার কাছে। মাটির কাছে না গেলে হয় তো সে সাধ অপূর্ণই থেকে যেতো এখনও।

আপেল ফুলের ঘ্রাণে ভাসতে ভাসতে হাজারো আপেল যখন মাটিতে ঝরে পড়ে থাকে, মায়াহরিণী তার নিচে আসে দল বেঁধে খাওয়ার খোঁজে। আপেল কুড়াতে কুড়াতে ভাবি, কখনো কি ভেবেছিলাম কোনো বিদেশের মাটিতে পেয়ে যাবো দেশে থাকার সুখ?

যতকিছু অসুবিধা সবটাই পুষিয়ে দিতে লাগলো প্রকৃতি তার মায়ায়, সৌন্দর্যে। হলুদ সরিষাফুলের মাঠে বা সূর্যমুখীর ক্ষেতে বসে কাটিয়ে দিতে পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফসল ওঠানোর সময় অপূর্ব ঘ্রাণ ভাসে চারপাশে। ধানকাটা হেমন্তের মাঠের সাথে মিল পেতে কোনো অসুবিধা হয় না। তখন মনেই হয় না- দেশ না বিদেশে আছি, শহরে নয় গ্রামে আছি! ভালো থাকা খুঁজে নিতে হয় মনে। মানিয়ে নিতে হয় জীবন যেখানে যেমন।

গ্রামীণ জীবনে পেয়ে গেলাম মানুষের নানা রকম উৎসব আয়োজন। কখনো ছবি আঁকা, কখনো ফসলের মেলা। কখনো আবার গানবাজনা বা খেলাধুলার আয়োজন। কখনো ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। ওরা খুব আনন্দের সাথে আয়োজন করে এসব উৎসব।

বছর জুড়ে নানারকম অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাই বিভিন্ন বাড়িতে। কেউ পালন করে কানাডা ডে। কেউ পালন করে ভিক্টোরিয়া ডে। কেউ নিমন্ত্রণ করে থ্যাঙ্কস গিভিং ডে তে। আবার মেয়রের আয়োজনে পালন করা হয়, সবাই মিলে ফসল তোলার উৎসব। অনেকে ক্রিসমাস পার্টি করে পাড়া প্রতিবেশী বন্ধুদেরকে নিয়ে। তাদের অনুষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারি, অনেক রকম নিয়ম, যা আমার জানা ছিল না। বয়স্ক মানুষ সব জায়গাতেই ভিন্ন নিয়ম ভাবনার অধিকারী। তাদের জ্ঞানও অনেক প্রকৃতির সাথে সর্ম্পকিত।

শীতকালে তুমুল বরফের নিচে ডুবে আছি বাড়ির ভিতর। বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হঠাৎ দেখি বরফের ধুলো উড়িয়ে সব পরিষ্কার করে দিচ্ছে কেউ। প্রতিবেশী নিজের আঙিনা পরিষ্কার করে উদ্ধার করতে আসতো আমাকেও। ভালোলাগায় মন ভরে ওঠতো। কোন দেশের কোন অচেনা মানুষ, যার ভাষা অন্য রকম, যার ধর্ম ভিন্ন যার সাথে মাত্র অল্পদিনের পরিচয়, তারা কেমন আপনজন হয়ে ওঠেছে! মানবধর্ম মানুষ মানুষের জন্য- এই ভালোবাসায় মন ভরে ওঠে।

অনেকদিন হয়ে গেছে। পুরানো অনেক প্রতিবেশী চলে গেছে। নতুন অনেকের আগমন হয়েছে। তাদের কাছে আমি পুরানো প্রতিবেশী। তাদের কাছে আমিও এগিয়ে যাই নানা প্রতিকূলতায় সাহায্য সহযোগিতায়, তাদের জিজ্ঞাসার অপেক্ষা না করে। গ্রামীণ জীবন মাটির কাছাকাছি থাকার সুখ আমি উপভোগ করি বহতা নদীর মতোন।

লেখক পরিচিতি
সব্যসাচী লেখক রোকসানা লেইস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, গান, ভ্রমণবিষয়ে লেখালিখি করেন। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সাবলীল বিচরণ তাঁর। বাংলাদেশের মেয়ে বর্তমানে বাস করছেন কানাডার অন্টারিও প্রভিন্সে। গিয়েছেন পৃথিবীর মানচিত্রের অনেকগুলো দেশে। তবে তিনি মনে করেন এখনো অনেকটাই বাকি রয়ে গেছে পৃথিবী দেখার। প্রতিনিয়ত আপডেট করেন নিজেকে আধুনিক সময়ের সাথে।