মেপেল পাতার দিনগুলি

দেবাঞ্জনা মুখার্জী ভৌমিক

একটা বরফ ঢাকা সাদা ফুটপাথ ধরে মাত্র দু’মাসের পুরোনো অচেনা একটা শহরে হেঁটে চলেছি আমি। একা, আমার মাথায় কাঁধে হাতে ঝরে পড়ছে সাদা তুলোর মতো বরফ। এই তুষারপাতের সন্ধ্যায় সেদিন আমার গন্তব্য ছিল হ্যাজেল ম্যাকালিওন সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। কানাডার টরন্টো শহরকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে ওঠা গ্রেটার টরন্টো এরিয়া বা জিটিএ-এর অন্যতম প্রধান একটি শহর মিসিসাগা। সেখানেই আমার বসবাস, আর এই লাইব্রেরিও সেই শহরের প্রাণকেন্দ্র, সেলেব্রেশন স্কোয়ারের ঠিক পাশেই। হেঁটে চলেছি লাইব্রেরিতে এমন কারো সাথে সাক্ষাৎ করতে, যাকে আমি চিনি না ! কেন যাচ্ছি, শুধু এই কথাটুকু জানি। লাইব্রেরির অভ্যন্তরীণ গঠনও অজানা, কারণ এই লাইব্রেরিতে আসা হয়নি এর আগে। আসলে কানাডা আসার পর ফেসবুকে একটি গ্রুপে জানিয়েছিলাম আমার ভালোবাসার একটি জিনিসের ব্যাপারে- আঁকা, পেইন্টিং; আঁকা শেখানো। আর সেই পোস্ট দেখে এক অভারতীয় মহিলা তাঁর মেয়েকে আঁকা শেখানোর জন্য যোগাযোগ করলেন। কলকাতায় আমার বাড়িতে প্রায় তিরিশ জন আঁকা গান আবৃত্তি শিখতে আসতো। সেই অভিজ্ঞতা থেকে মহিলাকে আমার মিসিসাগার অ্যাপার্টমেন্টে আসার কথা জানালে সে জানালো ‘না বাড়িতে আসবো না! তুমি লাইব্রেরিতে ক্লাস নাও!’ প্রথমে শুনে আমি অবাক! আমায় কেন কেউ লাইব্রেরিতে ক্লাস নিতে অনুমতি দেবে! তারপরই হলো সেই নতুন অভিজ্ঞতা।

লাইব্রেরির নির্দিষ্ট জায়গায় যেকোনো টেবিলে আমি আমার সেই ক্লাস নাইনে বা গ্রেড নাইনে পড়া ছাত্রীকে নিয়ে প্রতি বুধবার ক্লাস করতাম। সেদিন বরফ পেরিয়ে লাইব্রেরি পৌঁছে যাওয়ার কারণ সেই ক্লাসই। এত সুন্দর ক্লাস হচ্ছে দেখে, কিছুদিন পর সেই ছাত্রীর বোনও অন্য দিন অন্য সময়ে আঁকা শিখতে শুরু করলো। শিখতে এলো অন্য নতুন ছাত্রও। একেবারে অচেনা কোনো মানুষের বাড়ি না পৌঁছে একটা পাবলিক প্লেসে ক্লাস করার সুবিধা বুঝলাম। ছাত্রীর মায়ের বদৌলতে এ-দেশের লাইব্রেরিতে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে আমি অবগত হয়ে গেলাম। বুঝলাম, ‘সেফ এনভায়রনমেন্ট’।

সেই আঁকা শেখানোর কাজটি, কোভিড মহামারীর দুঃসময়ে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে চলেছিল। তারপর এক সময়ে ঊনচল্লিশ জন ছাত্র-ছাত্রীকে শিখিয়ে আঁকাআঁকির মাধ্যমে খুবই আনন্দলাভ করেছি, সেই সাথে অর্থ উপার্জনের আনন্দ তো অবশ্যই। একবার আঁকার অর্ডার পাওয়া গিয়েছিল ফেসবুকের মাধ্যমে- সে অভিজ্ঞতাও অনন্য। এক মহিলা তাঁর বাল্যবান্ধবীকে একটি পেইন্টিং উপহার দিতে চান। কাস্টমাইসড সেই পেইন্টিং করার জন্য আর্টিস্ট খুঁজছেন। সেই বান্ধবী একজন নামী ফটোগ্রাফার। কাশ্মীর ভ্রমণে গিয়ে বান্ধবী কাশ্মীরের স্বর্গীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধারণ করে এক অপূর্ব ফটোগ্রাফ তুলেছিল- তারই পেইন্টিং করে দিতে হবে।

মহিলা সেটিই উপহার দিতে চান বান্ধবীকে। যোগাযোগের পর সে পেইন্টিং করতে পেরে, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়ে এবং বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে- সে যে কী আনন্দ হয়েছিল, তা আবার মনে পড়ে যাচ্ছে এই লেখাটি লিখতে লিখতে। কবিতা এবং অন্যান্য লেখালিখির প্রতি ভালোবাসার কারণে টরন্টো শহর আমাকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছে। দিয়েছে ভালোবাসা, সম্মান, পরিচিতি, আরো লেখার সুযোগ আর বিশ্বের দরবারে পৌঁছে যাওয়ার স্মরণীয় মুহূর্ত। পয়লা অক্টোবর ২০২২-এ Toronto International Festival of Authors (TIFA)-এর তেতাল্লিশতম বার্ষিক অনুষ্ঠানে দশ জন বাঙালি বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দিয়েছিল অন্য ভাষার মানুষদের কাছে আন্তর্জাতিক এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করে। দশদিনব্যাপী সেই সাহিত্য সমাবেশে দশ বাঙালি লেখকদের একজন ছিলাম আমি। টরন্টো শহরের বুকে জনপ্রিয় কালচারাল সেন্টার হারভার ফ্রন্টের ওপেন স্টেজে সেদিনের অনুষ্ঠানে World in Other Words : Bengali Readings- এই শিরোনামের অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলাম। প্রথমে বাংলায় এবং তারপর তারই ইংরেজি অনুবাদ। উল্লেখ্য ইংরেজি অনুবাদটি করেছিল আমার কন্যা সৌরাদৃতা ভৌমিক। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে বিশ্বের দরবারে পৌঁছতে পেরে হৃদয় পরিপূর্ণ হয়েছিল সেদিন। কানাডাতে থাকা আমার মতো বাংলাভাষার শব্দ শ্রমিকরা সেদিন গবেষক, লেখক, প্রাবন্ধিক সুব্রত কুমার দাসের নেতৃত্বে টিফার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয় ঘোষণা করেছিলাম সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষি অন্য কয়েকশো মানুষদের সামনে। বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষ থেকে এত দূরে টরন্টো ফেস্টিভ্যাল অফ অথরস এর বিশ্বমঞ্চে বাংলাভাষার জয়যাত্রার জন্য সুব্রত কুমার দাসের অবদান অনস্বীকার্য।

২.

এবার একটি অন্য অভিজ্ঞতার কথা বলি। টরন্টো শহরে হিন্দু-মুসলিমের সমন্বয় দেখে প্রথম চমকে গিয়েছিলাম লোকনাথ ব্রহ্মচারীর একশো বত্রিশতম তিরোধান দিবসে, টরন্টো শহরের স্কারবোরোতে অবস্থিত বাবা লোকনাথ আশ্রম আয়োজিত একটি মনোজ্ঞ আনন্দ উৎসবে উপস্থিত হয়ে। একটু বিশদে বলি, ঠিক কী ঘটনা- আমাকে অবাক করেছিল সেই ঘটনা।

টরন্টোর হিন্দু ধর্মাশ্রমে অনুষ্ঠানটি সেদিন শুরু হয়েছিল দুপুর থেকেই। বাবা লোকনাথের কয়েকশো ভক্তদের সমাগম হয়েছিল বাবার তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানেও তার মৃত্যুর শতাধিক বছর পরেও বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষ থেকে এত হাজার মাইল দূরে টরন্টোর এই বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে একশো ষাট বছর জীবিত থাকা পুণ্য আত্মা বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীকে স্মরণ করার এই যে আয়োজন তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয় ছিলও উপস্থিত ভক্তবৃন্দ পুষ্প অর্ঘ্য ও পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণে বাবাকে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে। বাবা লোকনাথ আশ্রমের পক্ষ থেকে সভাপতি সঞ্জিত দাস এবং সাধারণ সম্পাদক অনুপ কুমার বিশ্বাস তাঁদের আন্তরিক বক্তব্যে প্রকাশ করেন, কোভিড-এর অতিমারীর প্রকোপে গত দু’বছরের পেরিয়ে আসা কঠিন সময়ের পর সবার সমাগমে সেই ২০২২ সালের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পেরে তাঁদের সংস্থার সবাই কত আনন্দিত। টরন্টো শহরে লোকনাথ আশ্রমটি সতেরো বছরের পুরোনো এবং এই আশ্রমের পক্ষ থেকে তেরোতম বাংলা ম্যাগাজিন ‘অঞ্জলি’ প্রকাশিত হলো ওই দিন সন্ধ্যার অনুষ্ঠানেই। কোভিড মাঝে দুটি বছর কেড়ে নেওয়ার পর অঞ্জলি আবার স্বমহিমায় পাঠকদের কাছে ফিরে আসায় ‘অঞ্জলি’র সম্পাদকীয় পর্ষদের পক্ষ থেকে বাবা লোকনাথ আশ্রমের ডিরেক্টর সুজিত কুসুম পাল তাঁর মনোগ্রাহী বক্তব্যে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন, বাবা লোকনাথের শক্তিশালী বক্তব্য ও আচরণ- একজন গেরুয়া বসনধারী হয়েও তিনি বলতে পেরেছিলেন জীবের সেবায়, জ্ঞানে ও কর্মেই মনুষ্য জীবনের আসল সার্থকতা, সারহীন ধর্ম চর্চায় নয়। তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যে প্রত্যয় নিয়ে নিজের কবিতায় লিখেছিলেন আমিই লেনিন, সেই দৃঢ়তার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তাঁর বক্তব্যে। ‘অঞ্জলি’র আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচনের জন্য তিনি মঞ্চে আহ্বান জানান বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও গবেষক আকবর হোসেন মহাশয়কে। সম্পাদনা পরিষদের সুজিত কুসুম পাল, তাপস পণ্ডিত, আশীষ রায়, অপূর্ব সাহা, চন্দন দে এবং বিজনেস এডিটর সঞ্জিত দাস এবং সর্বোপরি সকল জ্ঞানী-গুণী লেখক, যাঁরা তাদের মূল্যবান লেখা দিয়ে ‘অঞ্জলি’ ম্যাগাজিনকে সমৃদ্ধ করেছেন- তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আকবর হোসেন পত্রিকা উদ্বোধন করেন। আর এইখানেই চমকে ওঠি আমি মুসলিম ধর্মের আকবর হোসেনের হাতে বইটির উদ্বোধন হতে দেখে। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাস অনুষ্ঠানে বেদের বাণী নিয়ে আলোচনা করেন। বিবেকানন্দের শিকাগো জয় করার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি উপস্থিত সবাইকে যূথবদ্ধতা নিয়ে সমাজ ও নিজেকে এবং হিন্দু ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এক অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষের উজ্জ্বল উপস্থিতি সেদিন আমায় মুগ্ধ করেছিল। তারপর এই সমন্বয় দেখেছি বারংবার এবং হয়েছি আনন্দিত।

৩.

পৃথিবীর বিভিন্ন কোণ যেখানে সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন, সেই দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে শহিদুল ইসলাম মিন্টু হিন্দুদের বৃহত্তম উৎসব দুর্গাপূজার সুবর্ণ জয়ন্তী বছরকে ইতিহাসের পাতায় ধরে রাখতে একটা সমগ্র সংখ্যাই উৎসর্গ করেছিলেন! দু’হাজার তেইশ সালে কানাডার বাঙালিদের ইতিহাসে একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বছর ছিল, কারণ, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে উনিশশো তিয়াত্তর সালে মাতৃভূমি থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে টরন্টোতে, এই পরবাসের মাটিতেই প্রথমবারের দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়েছিল। সেদিনের সেই সুখস্মৃতি পেরিয়ে পঞ্চাশটা বছরের পথ চলা এবং আজকের এগিয়ে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করার মুহূর্তে, এই বিশেষ বছরকে এক অভিনব প্রয়াসে ধরে রাখতে কানাডার সর্বাধিক পঠিত বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘বাংলা মেইল’-এ বিশেষ শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। ‘বাংলা মেইল’ পত্রিকার উনিশে অক্টোবরের ভলিউম এগারো এবং সাতচল্লিশতম সংখ্যাটি একান্তভাবেই টরন্টোতে দুর্গাপূজার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশ করা হয়েছিল।

আজ থেকে কুড়ি বা পঞ্চাশ বছর পর কোনো এক শারদ সন্ধ্যায় এই সংখ্যাটি হাতে নিয়ে আগামী প্রজন্ম খুঁজে নিতে পারবে ইতিহাস, ডুবে যেতে পারবে টরন্টোর বুকে দুর্গাপূজার মহিমা-সলিলে। ভবিষ্যতের সেই মুহূর্তসমূহের জন্ম দিতেই পঞ্চাশ বছরের এই শারদ সংখ্যা সাজানো হয়েছিল অনেক তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন দিয়ে। এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা- এই চার মহাদেশের মাটিতেই দুর্গাপূজা কাটানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে পাঠকদের মনকে সুদূরের স্বাদ পৌঁছে দিতে আমি দেবাঞ্জনা মুখার্জি ভৌমিক নিজেও লিখেছি ‘মহাদেশ চার – উৎসব এক’ এই শিরোনামে। এই বিশেষ সংখ্যার অতিথি সম্পাদক ছিলেন বাঙালি সমাজে জনপ্রিয় মানুষ সুব্রত কুমার দাস। আর তাঁর এই ভাবনার ফসল এই বিশেষ সংখ্যাটি সম্ভব হয়েছিল ‘বাংলা মেইলে’র কর্ণধার শহিদুল ইসলাম মিন্টুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। এই আয়োজন এই প্রয়াস তাই ছিল আরো বেশি প্রশংসনীয়, আরো বেশি উৎসাহব্যঞ্জক, আরো বেশি অভূতপূর্ব। তাঁর এই প্রয়াসের জন্য হিন্দু ধর্মাশ্রম থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সুব্রত বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন প্রভিন্সে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা লেখক মানুষদের কাছে আমন্ত্রণমূলক লেখা চেয়ে পাঠিয়েছিলেন, বিষয় নির্বাচন করে দিয়েছিলেন সুপরিকল্পিতভাবে। সুব্রতর দক্ষ হাতে সাজিয়ে তোলা শারদ পত্রিকাটি বিভিন্ন ইতিহাস, অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি মেদুরতা আর স্মৃতি রোমন্থনে সমৃদ্ধ। এই বিশেষ সংখ্যার বিভিন্ন শিরোনামের নানা লেখায় ধরে রাখতে পেরেছিল ফেলে আসা সময়কে। প্রতিটি লেখাই নিজ নিজ সজ্জায় সুসজ্জিত এবং সুমধুর স্মৃতিচারণ। পুজোর সময় ভারতবর্ষে কলকাতায় অনেক নামী-দামী পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত হয় নানান সাহিত্যে সজ্জিত হয়ে। বাংলা মেইলের এই মহাযজ্ঞ সম্ভব হয়েছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যেই। সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু নিজের ধর্মের সাথে তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাঁর পেশা সাংবাদিকতাকে মিশিয়ে ফেলেন না, তা তিনি বহুবার প্রমাণ করেছেন হিন্দুদের নিয়ে তাঁর টিভি চ্যানেল এনআরবি টিভির বিভিন্ন কাজের ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। পুজোর সময়ে এই টিভি যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, তাতে আমি এবং আমার মেয়ে দু’বছর অত্যন্ত আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে অংশ গ্রহণ করেছি। পরিবেশনা করেছি দুর্গা পুজোর গান, মহালয়ার গান।

শারদ সংখ্যাও একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক সম্পদ হয়ে রইলো। সেখানে হিন্দু মুসলিম খ্রিষ্টান- সব ধর্মের মানুষ লিখেছেন এবং সব ধর্মের মানুষ স্পন্সরশিপ নিয়ে মুক্ত হৃদয়ে এগিয়ে এসে এই পত্রিকা প্রকাশে সব রকম আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। আমরা লেখক ও পাঠকরা আনন্দিত হয়েছি এই অসাম্প্রদায়িক এক মহাযজ্ঞের অংশীদার হতে পেরে। এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম।

৪.

টরন্টো নিয়ে অভিজ্ঞতা লিখতে বসলে টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালে বিখ্যাত ভারতীয় অভিনেত্রী শাবানা আজমির সাথে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গ বলতেই হয়। সাথে দেখা হয়েছিল তাঁর বর, বিখ্যাত লিরিসিস্ট জাভেদ আখতারের সাথে। শাবানা সেদিন পরেছিলেন আসমানি রঙের একটি সালোয়ার কামিজ। আসমানি রং আমার প্রিয় রং হওয়ায় আমিও পরেছিলাম সেই রঙের সালোয়ার কামিজ! তিনি বললেন ‘উই আর টুইনিং!’ সেকি আনন্দ আমার। তিনি আমার এবং আমার পরিধেয় পোশাকের দিকে চেয়ে রয়েছেন আমাদের দুজনের একসাথে এমন একটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি আছে। ফিল্ম ফেস্টিভালে অনেক সিনেমা দেখা, অনেক মানুষের সাথে আলাপ হওয়া, মনোজ্ঞ আলোচনা শোনা- এসব তো ছিলই।

শুধু এত আনন্দের মধ্যেও সেই ছোটোবেলায় এই শাবানা আজমি নামটা শোনার শুরু যার কাছ থেকে সেই মাকে ছবিগুলো দেখাতে পারলাম না সেই দুঃখ রয়ে যাবে চিরকাল। মা এক্কেবারে হঠাৎ করে পাড়ি দিয়েছে নাম না জানা দেশে। “মা তোমার অতি প্রিয় অভিনেত্রীর সাথে আজ দেখা হলো”- উচ্ছ্বসিত ভাষায় মাকে সে অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

৫.

কানাডায় সমগ্র ভারতবর্ষকে একসাথে একই ছাদের তলায় দেখার সুযোগ হয়েছে বেশ কয়েকবার, প্যানোরামা ইন্ডিয়া সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠানে পৌঁছে গিয়ে। এই সংস্থা বছরে দু’বার বড়ো করে অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে- ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস পনেরোই অগাস্টে, আর প্রজাতন্ত্র দিবস ছাব্বিশে জানুয়ারি উপলক্ষ্যে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লোকনৃত্য, সঙ্গীত, প্রসিদ্ধ নৃত্যশৈলী দলগত নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে কানাডা বসবাসকারী ভারতীয়দের বিনা ভিসায় বিনা প্লেনের টিকিটে পৌঁছে দেয় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। নানা ভাষার নানা পরিধানের বিভিন্ন জাতির মহামিলনে ব্র্যাম্পটনের কনভেনশন সেন্টার কিংবা নেথান ফিলিপ স্কয়ার উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। সব বয়সের সব রাজ্যের থেকে আসা উপস্থিত সকল দর্শক মেতে ওঠে ‘জনগণ মন’ সংগীতের সুরে। কন্সুলেট জেনারেল অব ইন্ডিয়া, টরন্টো কানাডা, প্রতি বছর এই পানোরামা ইন্ডিয়া সংস্থার সাথে সব বয়সের অংশ গ্রহণকারীদের জন্য অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। গত চার বার এডাল্ট ক্যাটেগরিতে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান অধিকারিণী হয়ে পুরস্কার পেয়ে আপ্লুত হয়েছি। কন্সুলেট জেনারেলের হাত থেকে পুরস্কৃত হওয়ার মুহূর্তগুলো মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল। আমার মেয়ে এবং ছেলেও পুরস্কৃত হয়েছে একাধিকবার, সেই আনন্দ আরো অধিক।

টরন্টো অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে বসলে থেকে যায় আরো কত গল্প, আরো কত অজানা কথা। সেসব গল্পের ঝুলি তোলা থাক অন্য কোনো ভোরের জন্য। আজ তবে এটুকুই থাক, বাকি কথা রইলো তোলা নতুন কোনো দিনের জন্য।

লেখক পরিচিতি
কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ার, সতেরো বছর বয়সে ন্যাশনাল পোয়েট্রি সোসাইটি অব ইন্ডিয়া, দিল্লিতে নির্বাচিত তরুণ কবি। গ্রন্থসমূহ ‘স্বপ্নের ক্যানভাস’, ‘নব্য ইভের আদিম কাব্য’, ‘বার্কশায়ারের উড়োচিঠি’, ‘উৎস থেকে পরবাস’। ৪৩তম টিফাতে ২০২২-এ নির্বাচিত বাঙালি লেখক। বাংলা মেইল এবং এনআরবি টিভি, কানাডা থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত বইয়ের জন্য সম্মানিত।