সেই যে আমার নানারঙের দিনগুলি!

প্রতিমা সরকার

কোনো এক নাম-না-জানা বিজ্ঞ মানুষ বলেছেন, You can’t go back and change the beginning, but you can start where you are and change the ending.

১৯৮৪ সালে আমার দাদা প্রবীর বিকাশ সরকার যখন স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে জাপান যান, আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তখন থেকেই বুকের ভিতর একটা গোপন ইচ্ছে পোষণ করেছি যে, একদিন আমিও বিদেশ যাবো। আমার জাপানিজ বউদি নরিকো মিয়াজাওয়া প্রতি বছর আমাদের জন্য জামা-কাপড়, সাজগোজের জন্য নানারকম কসমেটিক্স পাঠাতেন। আর পাঠাতেন ক্যালেন্ডার। কত সুন্দর সুন্দর ছবি প্রতিটি পাতায়! শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। মা ভালো উল বুনতেন বলে সুন্দর সব ডিজাইনের উলের সোয়েটারের ক্যাটালগও পাঠাতেন। সেই সমস্ত ক্যালেন্ডার আর ক্যাটালগ দেখে আমার বিদেশ যাওয়ার আগ্রহটা আরো বেশি পোক্ত হয়। তারপর অনেকদিন কেটে যায় আমারও। লেখাপড়া শেষ হয়। আর মা আমার জন্য পাত্র দেখা শুরু করেন। আমার বিয়ের যিনি ঘটক ছিলেন, ওকে মামা বলে ডাকতাম। তিনি জানতেন যে, আমার ইচ্ছে বিদেশ যাওয়া, তাই এমন একজনের সাথে বিয়ের আলাপ আনলেন যে কিছুদিন ধরে কানাডা যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

আমার সাথে বিয়ের পর বরমশাইও জানলেন যে আমি বিদেশ যেতে চাই তখন তিনি জোরেসোরে চেষ্টা চালালেন এবং বিয়ের চার বছরের মাথায় আমাদের কানাডার ভিসা হয়ে গেল। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে আমার ছেলে যখন প্রায় তিন বছরের, আমরা পাড়ি জমালাম সুন্দর একটা দেশ, কানাডায়। এসে ওঠলাম আমার খুবই কাছের বান্ধবী মুন্নির বাসায়।

কানাডায় তখন উইন্টার সিজন চলছে। চারদিকে বরফে ঢাকা। এর মধ্যেই আমরা আমার বান্ধবীর বাসার কাছে একটা হাইরাইজ বিল্ডিং-এর সাততলার একটা এক বেড রুমের বাসায় আমাদের নতুন দেশের সংসার শুরু করলাম। মুন্নি এবং তার বর শওকত ভাই আমাদের গৃহস্থালী জিনিসপত্র কেনাকাটায় অনেক সাহায্য করলেন।

দিন যেতে লাগলো ভালোমন্দ মিলিয়ে। বরমশাই চাকরির চেষ্টা করতে লাগলেন। আমি আমার ছেলে ছোট্ট শায়নকে নিয়ে বাসায় বসে টিভি দেখি নতুবা বান্ধবী মুন্নির বাসায় গিয়ে গল্পস্বল্প করে সময় কাটাই। তিন মাস চলে যাওয়ার পরে ভর্তি হলাম ইংলিশ ভাষা আপগ্রেড করার জন্য। কানাডা সরকারের ফান্ডে পরিচালিত LINC (Language Instruction for Newcomers to Canada)-এ। ইমিগ্রেশন নিয়ে আসা সব নিউকামাররাই এই ক্লাস করে ফ্রিতে। শায়ন থাকে পাশেই, ডে-কেয়ারে। আর আমি ক্লাস করি। কয়েক মাস ক্লাস করার পর সামার ভ্যাকেশন শুরু হলো আর আমাদের ক্লাসও বন্ধ হয়ে গেল দুই মাসের জন্য। তখন বসে না থেকে জব এজেন্সির মাধ্যমে প্রবাস জীবনের প্রথম কাজ শুরু করলাম একটা গ্লুফ্যাক্টরিতে।

কাজ বেশ ভালোই চলছিল। মাসখানেক যাওয়ার পর একদিন কাজে গিয়ে শুনি আমরা যারা এজেন্সির মাধ্যমে কাজে জয়েন করেছিলাম তাদেরকে লে অফ (lay off) দেওয়া হয়েছে। লে অফ কী জিনিস জানা ছিল না, তাই একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এখানে যদি কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ কমে যায় অথবা কোম্পানিতে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয় তাহলে মালিকপক্ষ সাময়িকভাবে কর্মীদের কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়। আবার যদি কাজের চাপ বাড়ে তখন ডেকে নেয়। আর নির্দিষ্ট একটা আওয়ার কাজ করলে কোম্পানির বেতন কাঠামো অনুসারে একটা মাসিক ভাতা পাওয়া যায় যত দিন না আবার কাজ শুরু করে। কিন্তু আমার যেহেতু বেশি দিন কাজ হয়নি তাই ভাতা পাওয়ার কোনো চান্স ছিল না।

কয়েকজন দেখলাম খুব মন খারাপ করলো এভাবে লে অফ দেওয়ায়। জিজ্ঞেস করায় বললো, ওদের আয়ের উপর সংসার নির্ভর করে। একজন পরামর্শ দিলো, যে এজেন্সি থেকে কাজে এসেছি সেখানে গিয়ে বলতে যে, কাজ নেই। তাহলে হয়তো অন্য জায়গায় কাজে পাঠাবে। সেইমতো পরদিন আবার এজেন্সিতে গিয়ে বললাম যে, কাজ নেই তখন আবার স্কচটেপ প্যাকিং করার একটা ফ্যাক্টরিতে পাঠালো। আর এখানেও কাজ তেমন কঠিন নয়। সুপারভাইজার একজন বয়স্ক মতো ইন্ডিয়ান এবং খুব কড়া। কাউকে কথা বলতে দেখলেই লাইন থেকে নিয়ে আলাদা করে কাজ করান অথবা বাড়ি পাঠিয়ে দেন। সবচে বাজে কাজ যেটা করেন সেটা হলো, রাত ১০টার পরে কাউকে ওয়াশরুম ইউজ করতে দেন না। ব্যবহারও খুবই বাজে। এখানে কাজ করলাম মোটে ১০ দিন। একদিন আমরা কথা বলছিলাম, সুপারভাইজার কীভাবে যেন দেখে ফেললো আর সাথে সাথে আমাকে-সহ কয়েকজনকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। কী আর করা! বাসায় চলে এলাম। পরদিন কাজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি, এমন সময় এজেন্সি থেকে কল দিয়ে বললো, আনফরচুনেটলি কাজ থেকে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে। আর গেলাম না এজেন্সিতে কাজ খুঁজতে। আসলে ততদিনে আমার বিদেশের মোহ একটু করে কাটতে শুরু করেছে। তাছাড়া এই ফ্যাক্টরি জবও আর করতে ইচ্ছে করছিল না। নিজের পড়াশোনাকে একটু আপগ্রেড করে একটা অফিসিয়াল জব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এর মধ্যেই হঠাৎ করে একদিন শুনি আমার বাবা খুব অসুস্থ। তাই নভেম্বর মাসে ছেলেকে নিয়ে দেশে চলে গেলাম। চার মাস ছিলাম দেশে।

ফিরে এসে ওঠলাম বাঙালি এলাকা বলে খ্যাত ক্রিসেন্ট টাউনের একটা বিল্ডিং-এ। আমার ছেলে তখন বিল্ডিং-এর পাশেই স্কুলে যাওয়া শুরু করলো। ছেলের বাবাও একটা ব্যাংকে জব পেয়ে গেল। তিনি সকালে কাজে যান, ছেলে স্কুলে। আমি বাসায় একা। হয় ঘুমাই, না হয় রান্না করি। দুপুরে ছেলেকে আনতে স্কুলে যাই। সেখানেই পরিচয় হলো কয়েকজন ভাবি, বউদির সাথে। তাদের সাথে বিকেলে ডেন্টোনিয়া পার্কে বসে আড্ডা দিই। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। আমার নিজেকে আপগ্রেডও করা হয় না, কোনো কাজেও যাই না।

একদিন স্কুলে গিয়েছি ছেলেকে আনতে, দেখা হলো এক ভাবির সাথে। কথা বলার মাঝে উনি জানতে চাইলেন কোনো জব করছি কি না। করি না বলায় বললেন, মঙ্গলবার করে যদি ফ্রি থাকি তাহলে যেন ক্রিসেন্ট টাউনের পাশের আরেক বাঙালি পাড়া টিসডেলের কমিউনিটি রুমে যেন যাই। ওখানে Bloor Information And Life Skills নামে একটা অর্গানাইজেশন থেকে ওয়ার্কশপ আর মেডিটেশন করানো হয়। বললাম, ঠিক আছে যাবো। তো, পরের মঙ্গলবার দুপুরে গেলাম। আলাপ হলো দুজন চমৎকার মানুষ, গুলনার আপা আর আফরোজা আপার সাথে। উনারা নিউকামার, রিফিউজি, লং টার্ম রেসিডেন্ট-সহ কানাডিয়ান সিটিজেনদের বিভিন্ন রকম পরিষেবা দিয়ে থাকেন। সেবাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, হাউজিং, জব সার্চ ও এপ্লিকেশন, হেলথ কেয়ার, সোশাল এসিস্ট্যান্স, সিপিপি ইত্যাদি। সেই সময়ই তাদের সহায়তায় আমি টরন্টো হাউজিং-এর জন্য এপ্লিকেশন করি।

দিন যেতে থাকে। এর মধ্যে একদিন জানলাম দ্বিতীয় সন্তানের মা হচ্ছি। কিন্তু তখনও ঠিক করে ওঠতে পারিনি, নিজেকে কীভাবে আপগ্রেড করবো? পড়ায় যাবো আর গেলে কী সাবজেক্ট নিয়ে পড়বো? এইসব হাবিজাবি চিন্তা করে সময় কাটে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। একদিন Bloor Information-এর আফরোজা আপা বললেন, Council of Agencies serving south Asians সংক্ষেপে CASSA নামে সাউথ এশিয়ান কমিউনিটির জন্য সেবাদানকারী একটা প্রতিষ্ঠান Domestic Violence-এর ওপর তিন সপ্তাহের একটা পেইড ট্রেনিং করাবে। আমি যেন তাতে poarticipate করি। উনারা জানতেন দেশে থাকতে আমি বাংলাদেশের একটা বৃহৎ নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন BRAC (Bangladesh Rural Advancement Committee)-এ জব করেছি আর সোশাল ওয়ার্কের ব্যাপারে আমার আগ্রহ আছে তাই ওই ট্রেনিংটার জন্য উনারা আমার নাম রেকমেন্ড করেছিলেন। ছেলের বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, যদি শরীরে কুলায়, করো।

ট্রেনিংটা ছিল উইকএন্ডে। মানে শনি, রবি। তাই ছেলেকে তার বাবার কাছে রেখে যেতে পারতাম। Dupont-এ CASSA’র অফিসে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হতো ট্রেনিং। মাঝখানে অবশ্য একঘণ্টার বিরতি। সেখানেই পরিচয় হয় Ritu Chokshi নামে ভারতীয় একটি মেয়ের সাথে। যে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে ট্রেনিংটা শেষ করতে। তবে দুঃখের বিষয় যেদিন আমাদের Final Session আর সার্টিফিকেট দেওয়া হয় সেদিনই ছিল আমার ডেলিভারি। তাই উপস্থিত থেকে সার্টিফিকেট নিতে পারিনি। অবশ্য মেয়েকে পেয়ে সার্টিফিকেট না পাওয়ার দুঃখ ভুলে গিয়েছিলাম।

ট্রেনিং-এর কিছু শর্ত ছিল যে, ডোমিস্টিক ভায়োলেন্সের ওপর তিনটি ওয়ার্কশপ করতে হবে ৮ থেকে ১০ জন নারীকে নিয়ে। সেই সাথে Photo Voice নামে একটা ছবি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতে হবে যেখানে প্রদর্শনীর সব ছবি নিজেদের তুলতে হবে। মনে আছে আমার মেয়ের যখন তিন মাস বয়স তখন Davis Ville-এ একটা অফিসে আমাদের তোলা ছবি দিয়ে সাজানো Photo Exhibition-এ গিয়েছিলাম মেয়েকে স্ট্রলারে বসিয়ে। তখনো ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ে স্টেশনে এলিভেটর যুক্ত হয়নি। তাই আমি করতাম কী, হেঁটে ডেনফরথ যেতাম। তারপর ১১৩ বাস ধরে মেইন স্ট্রিট সাবওয়েতে গিয়ে ট্রেনে চড়তাম।

যেহেতু মেয়ে ছোটো তাই কোনো কাজ করছিলাম না তখন। ছেলের স্কুলে বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ হতো। সেগুলোতে পার্টিসিপেট করতে ভালো লাগতো। এভাবে একদিন CASSA’র রিতুর মাধ্যমে কথা হলো Madhavi Reddz নামে একজনের সাথে যে কি-না কাজ করতো কানাডার অন্যতম চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন United Way-তে। ওরা তখন কনভারসেশন ক্যাফে নামে একটা একদিনের ওয়ার্কশপ করতে এসেছিল ক্রিসেন্ট টাউন ক্লাবে। আমি তখন টিসডেল প্লেসে নতুন প্রতিষ্টিত হওয়া South Asian WomenÕs Right Organization বা SAWRO নামে একটা অর্গানাইজেশনে কম্পিউটার শিখতে যাই। সেখানে তখন আলাপ হয় হোসনে আরা জেমি, হাসমত চৌধুরী জুঁই নামে দুজন মানুষের সাথে। জেমি আপা তখন SAWRO’র সাথে যুক্ত ছিলেন আর জুঁই আপার নিজের একটা বুটিক ছিল। দুজনেরই আমার মতো বাংলাদেশে সোশাল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। এই দুজন মানুষের সাথে আমার বন্ধুত্বটা গাঢ় হলো তখন যখন দেখা গেল, আমাদের তিনজনেরই স্বপ্ন এমন কিছু করা যার মধ্যদিয়ে আমরা আমাদের সোশাল ওয়ার্কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি এবং সেই সাথে কমিউনিটির অন্যান্য নারীর জন্যও কিছু করতে পারি।

আমরা তখন ইউনাইটেড ওয়ের কয়েকটা ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানেই আলাপ হলো আনিসা রশিদ লাকির সাথে। দেখা গেল সেও চায় চাকরির পাশাপাশি কিছু একটা করতে। ডেনফোর্থে তখন ইউনাইটেড ওয়ের অর্থায়নে Access Point On Danforth Hub নামে একটি মাল্টিসার্ভিস কমিউনিটি সেন্টার হয়েছে যেখানে হরেক রকম কমিউনিটি সার্ভিস দেওয়া হয়। কমিউনিটি গার্ডেনিং, সিনিয়র সার্ভিস-সহ বিভিন্ন ইউথ প্রোগ্রাম অরগানাইজ করা হয়।

একদিন মাধবী কথা প্রসঙ্গে বললো যে, ইউনাইটেড ওয়ে থেকে র‍্যাগ (Resident Action Grant) নামে একটা প্রজেক্ট-এর মাধ্যমে স্মল বিজনেসের জন্য গ্রান্ট দেওয়া হয়। তোমরা যদি চাও এপ্লিকেশন করতে পারো। আমি তোমাদের হেল্প করবো কীভাবে অ্যাপ্লাই করতে হবে। কথা বললাম জুঁই আপা, জেমি আপা আর লাকির সাথে। ওরা সম্মতি জানালো। জুঁই আপার মাধ্যমে তামান্না নামে আরেকজন আপা যুক্ত হলেন আমাদের সাথে। আমরা পাঁচ জন একসেস পয়েন্টে মাধবীর সাথে বসে অ্যাপ্লিকেশনের জন্য যে সমস্ত পেপার ওয়ার্ক করা প্রয়োজন সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে ঠিক করলাম। মাধবী আমাদের বিজনেসের নাম দিলো Dunia Degisn Collective। আর এপ্লিকেশনটা ফাইনালাইজ করে ইউনাইটেড ওয়েতে জমা দিয়ে দিলো।

তারপর অপেক্ষার পালা। অবশেষে একদিন মাধবী জানালো যে, আমাদের অ্যাপ্লিকেশন এপ্রুভ হয়েছে তবে আরো কয়েকটা এপ্লিকেশন জমা পড়েছে। তাই ইউনাইটেড ওয়ের মেইন অফিসে একটা প্রেজেন্টেশন সেরেমনি হবে। সবাইকে যার যার প্রোডাক্ট নিয়ে উপস্থিত থাকতে হবে নির্দিষ্ট তারিখে। মাধবী জানালো, তোমাদের অ্যাপ্লিকেশনটা অনেক স্ট্রং আর অভিনব তাই আশা করি তোমরাই গ্রান্টটা পাবে। আমরাও মনে সাহস আর ভরসা নিয়ে গেলাম আমাদের নিজেদের হাতে বানানো কিছু প্রোডাক্ট নিয়ে Wellington Stree-এ ইউনাইটেড ওয়ের মেইন অফিসে। ইউনাইটেড ওয়ের লোকজন পারটিসিপেন্টদের টেবিলগুলো ঘুরে ঘুরে সবার সাথে পরিচিত হলো, বিজনেস আইডিয়া সম্পর্কে জানলো। একজন জুঁই আপার হাতে বানানো একটা ফতুয়া এত পছন্দ করলো যে, যে দাম বললাম সেই দামেই কিনে নিলো।

আবারো অপেক্ষার পালা। এরপর এলো সেই কাক্সিক্ষত দিনটি। মাধবী ইমেইল দিয়ে জানালো যে আমাদের অ্যাপ্লিকেশন সিলেকটেড হয়েছে আরো দুটো বিজনেস অ্যাপ্লিকেশনের সাথে। আর আমরা ৬০০০ ডলারের একটা গ্রান্ট পেয়েছি। সেই দিনটা কী যে একটা মহা-আনন্দের দিন ছিল আমাদের জন্য, তা বলে বোঝানো যাবে না। পরের উইকেই মাধবী আমাদের নিয়ে বসলো এবং জানালো এই গ্রান্টের টাকাটা কীভাবে ডিস্ট্রিবিউট হবে এবং সেই সাথে আমাদের বিজনেস পলিসি আর প্রফিট কীভাবে আমরা ডিল করবো সেগুলো নিয়ে আমাদের কর্ম পরিকল্পনা তাকে জানাতে বললো।

আমরাও বসে আলাপ, আলোচনা করে আমাদের বিজনেসটা কীভাবে রান করবে, সেই সম্পর্কে সব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে মাধবীকে জানালাম। কিন্ত সমস্যা দেখা দিলো আমরা কোথায় বসে আমাদের প্রোডাক্ট তৈরি করবো? সেই সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে এলো Tammy Clarke, যে ছিল ANC (Action for Neighbourhood Change) Convener। সে প্রতি শনিবার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত Access Point Hub-এর একটা রুম আমাদের জন্য বরাদ্দ করে দিলো এবং আমাদের যাবতীয় সরঞ্জাম, সেলাই মেশিন ইত্যাদি রাখার জন্য একটা স্টোরেজের ব্যবস্থাও করে দিলো।

শুরু করলাম আমরা আমাদের জীবনের এক নতুন জার্নি। যার স্বপ্ন আমরা বহুদিন ধরে দেখে এসেছি। প্রতি শনিবার আমরা পাঁচজন বসি। বিভিন্ন ধরনের প্রোডাক্ট তৈরি করি। সেগুলো নিয়ে ইউনাইটেড ওয়ের সহায়তায় বিভিন্ন ট্রেড ফেয়ার, আমাদের দেশি মেলায় অংশগ্রহণ করি। প্রথম দিকে ভালোই সাড়া পাচ্ছিলাম বায়ারদের কাছ থেকে। দেখতে দেখতে তিনটা বছর পার হয়ে গেল কিন্তু তেমন প্রফিট করতে পারছিলাম না আমরা। আর তাই সবার মধ্যে একটা ঢিলেমির ভাব চলে এলো। সেই সাথে দেখা দিলো একটা হতাশা। তামান্না আপা তো ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা বলে গ্রুপ ছেড়ে চলেই গেলেন। টিকে রইলাম জুঁই আপা, জেমি আপা, লাকি আর আমি। এভাবে আরো একটি বছর চলে গেল। আস্তে, আস্তে আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন দুনিয়া ডিজাইন কালেকটিভ নামের বিজনেসটি বন্ধ হয়ে গেল। অবশ্য বন্ধ হয়ে গেলেও হারিয়ে গেল না একেবারে আমাদের জীবন থেকে। এখনো আমি আর জেমি আপা স্বপ্ন দেখি একদিন হয়তো আবার দুনিয়া ডিজাইন কালেকটিভ আবার নতুনভাবে, নতুনরূপে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে।

এরপর আমরা যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। একদিন Access Point-এর ম্যানেজার Gisela Vanzaghi’র কাছ থেকে একটা ইমেইল পেলাম যেটায় সে জানালো যে, টUnited Wayi Speakers Bureau Program নামে একটা প্রজেক্ট আছে যেখানে একজন স্পিকার ইউনাইটেড ওয়ের কার্যক্রম দ্বারা নেইবারহুড কমিউনিটি কীভাবে উপকৃত হচ্ছে সে সম্পর্কে বিভিন্ন ডোনার প্রতিনিধির সামনে স্পিচ রাখবে। আমি ইন্টারেস্টেড হলে Gisela আমার নাম রেকমেন্ড করবে। আমিও করবো বলে জানিয়ে দিলাম।

Speechটা কীভাবে রেডি করবো, সেটার ব্যাপারে Gisela আমাকে হেল্প করলো। তারপর একদিন Access Point-এ ১৫ জন BMO Employee সামনে কীভাবে ইউনাইটেড ওয়ে এই নেইবারহুড কমিউনিটিতে আমাদেরকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে হেল্প করে যাচ্ছে এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে উপকৃত হয়েছি, সেই বিষয়ে প্রথম স্পিচ দিলাম। তারপর টানা এক বছর গেস্ট স্পিকার হিসেবে স্পিচ দিয়েছি। খুবই ভালো লাগতো যখন অনেকের সামনে কথা বলতাম যদিও আমি খুব ভালো বক্তা না।

এরপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত জীবন, কাজ, বাচ্চা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে, কমিউনিটির সাথে আর সেভাবে যুক্ত থাকতে পারিনি। এখন এতদিন পরে যখন ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাই এই ভেবে যে, কমিউনিটির কাজ করে আমার ব্যক্তিগত লাভ হয়তো কিছু হয়নি তবে আমার মাধ্যমে যদি কেউ উপকৃত হয়ে থাকে সেটাও কম প্রাপ্তি নয় এক জীবনে।

লেখক পরিচিতি
জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের কুমিল্লা শহরে। কুমিল্লার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করে কিছুদিন আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০০৫ সাল থেকে সপরিবার কানাডা প্রবাসী। বর্তমানে টরন্টো শহরের একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে ডেন্টাল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত প্রতিমা ফেসবুকে অল্প-স্বল্প লেখালেখি করেন।