স্বপ্নলোকের চাবি

ঋতু মীর

আমার কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের মফস্বলে। কেটেছে সোনালি গমের ক্ষেতের মসৃণতায়, শক্ত মজবুত পারিবারিক বন্ধন, নিয়ম আর শ্রদ্ধা ভালোবাসার পরম নির্ভরতায়। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে নেত্রকোনার মগরা নদীর ধারে, গাছ গাছালির সুনিবিড় ছায়ায় বড়ো হওয়ার সুযোগ ছিল জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। হাঁস মুরগি, কবুতর, কুকুর, ছাগলসহ বাড়িতে ধবলী আর কালী নামে দুটো দুধেল গরুও ছিল। বাড়ির উঠানে ধবলীর মেয়ে লক্ষ্মী আর কালীর মেয়ে ‘শান্তি’-র জন্ম হতে দেখি। উঠানে খড়ের উঁচু পালায় তরতরিয়ে ওঠে লুকিয়ে বই পড়া ছিল এক নেশা। অদ্ভুত হলেও সত্যি যে, Little house on the Prairie বইয়ের বাংলা শিশুতোষ অনুবাদ ‘খোকা খুকুর গল্প শোন’ বইটাই ছিল বারবার পড়া একমাত্র বই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে বরফ, কুকুর টানা স্লেজ গাড়ি, বড়োদিনের উৎসব, উপহার, আলোকসজ্জা, পাইন, ঝাউ আর ম্যাপেল পাতার দেশে লরা মেরির কৈশোর, সুখী পরিবারের গল্পটা কেমন মন ছুঁয়ে যেতো। কল্পনার স্বপ্নিল স্বপ্নে সাদা বরফে কালো কাঠবিড়ালীর ছোটাছুটি দেখা, ম্যাপেল পাতার দেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটাও বুঝি সেই সময়েই অঙ্কুরিত হয়েছিল। টানটান ঠান্ডায় বরফ মাখামাখি খেলা, বরফ দিয়ে যত খুশি আইসক্রিম বানিয়ে খাওয়ার ছেলেমানুষি স্বপ্নটাও বেশ প্রবল ছিল।

মফস্বলের সোঁদা মাটির গন্ধ মাখা জীবনের গল্পটা শুধুই কৈশোরের অলীক কল্পনা বা স্বপ্ন নয়! ছোটোবেলা থেকেই পরিকল্পনামাফিক গোছানো জীবন যাপনে অভ্যস্ত আমি। পরিণত বয়সের এই প্রান্তে এখনও বিশ্বাস করি যে, মনে স্বপ্নের সুন্দর বীজ বপন এবং লালনের মধ্যেই একদিন সেই স্বপ্ন বিকশিত হয়, পূর্ণতা লাভ করে। তাছাড়া জীবনে সফলতার শর্তে প্রথমেই নিহিত থাকে লক্ষ্য বা গোল নির্ধারণ এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। জীবনের সবক্ষেত্রে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়াই স্বপ্ন পূরণের পথ পরিক্রমা। নিজ মেধা, বুদ্ধি, অধ্যবসায়, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা, চেষ্টা, সর্বোপরি চেঞ্জ বা পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার সুচারু কৌশলটা জানার প্রক্রিয়ায় স্বপ্নলোকের চাবি একদিন হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয়।

২.

প্রবাসে জীবন শুরুর পরিকল্পনাটা ঠিক দৈবচক্রে বা হঠাৎ নয়। অস্ট্রেলিয়া থেকে উচ্চ শিক্ষা শেষে দেশে ফিরে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার দুর্দম ইচ্ছাটা বেড়ে যায় বহুগুণ। অনিন্দ্য সুন্দর শহর মেলবোর্ন, ডেকিন ইউনিভারসিটির ঘন সবুজ ক্যাম্পাস, পড়ালেখার মান, সিস্টেম, নাগরিক অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, বিশেষত নারী স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো উন্নত কোনো দেশে প্রবাসী হওয়ার ইচ্ছাকে নতুন উন্মাদনা দেয়। স্বদেশ এবং বিদেশের প্রেক্ষাপটে নিজের অবস্থানকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি। নিজের মধ্যে অমিত সম্ভাবনাগুলো আত্মপ্রকাশের রাস্তা খোঁজে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্কিল বা ক্রেডেন্সিয়াল এসেসমেন্ট, কর্ম অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ, আবহাওয়া, বসবাস ইত্যাদিসহ ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার পুরো ব্যাপারটা প্রায় বছর ধরে অনুসন্ধান করে তবেই প্রিন্সিপাল এপ্লিক্যান্ট হিসেবে কানাডায় আবেদন করি। পেশায় শিক্ষক হওয়ায় কানাডায় ইন্টেনন্ডেন্ট জব হিসেবে শিক্ষক ক্যাটাগরি বিচার বিশ্লেষণের কাজও নিয়মিত চলতে থাকে। সেই সময় বাংলাদেশে কানাডার আলাদা দূতাবাস না থাকায় আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট ওয়েব সাইট, ফর্ম, প্রক্রিয়াগত তথ্য এবং চিঠির উত্তরের জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সিঙ্গাপুরস্থ কানাডা এম্ব্যাসি থেকে আমার চিঠির উত্তরে কেবল ওয়েব এড্রেস পাঠিয়ে দেওয়া দেখে বুঝি যে, ইংরেজি ভাষা, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে নিজেকে আপগ্রেড করে তবেই ইমিগ্রেশনের আবেদন করতে হবে।

বসবাসের জন্য ভাইব্রেন্ট, ডাইভারসিটি এবং মাল্টিকালচার আবহ-ই টরন্টো শহর বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ। বাসস্থান, খাওয়া, বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা, বাংলা ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সামাজিক মেলামেশা- সবক্ষেত্রেই এক খণ্ড ‘বাংলাদেশ’ যেন ধরাছোঁয়ার মধ্যেই। মনে আছে, এখানে ঠান্ডার প্রকৃত অভিজ্ঞতা সরেজমিনে অনুভবের জন্য ডিসেম্বর মাসই বেছে নিয়েছিলাম। পাতা শূন্য গাছে পেঁজা তুলার মতো বরফ, কাঠবিড়ালির চঞ্চল ছোটাছুটি দেখে মন বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিল। স্বপ্ন জয়ের উচ্ছ্বাস আর পরম প্রাপ্তিতে মনে হয়- কী প্রচণ্ড ভাগ্যবান আমি! উচ্ছ্বাসে আবেগে ছন্দপতন ঘটিয়ে আবার মুহূর্তেই আবহাওয়া বদলের রহস্যময় ধাক্কাটা টের পাই। মাইনাস ত্রিশের উইন্ড চিল, পিছল বরফে অনভ্যস্ত পায়ে হাঁটা, পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নেওয়া, ধোঁয়া ধোঁয়া নিঃশ্বাস, নাক ও চোখের পানি বরফ হয়ে জমে যাওয়া, বাজারের পলিথিন ব্যাগ হাতের তালুতে কেটে বসে যাওয়া ভয়ঙ্কর সেই শীতের অভিজ্ঞতার ভিতরে এক ভেঙে পড়া অসহায়ত্ব টের পাই। সেই সাথে উপলব্ধি করি যে, প্রতিমুহূর্তে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা এবং বিভিন্ন লেয়ারে ওয়েদার এপ্রোপ্রিয়েট ড্রেসে বের হওয়ার অভ্যাস রপ্ত করাটা এখানে বেশ জরুরি। তাছাড়া পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট ধরে রাস্তা চিনে নির্দিষ্ট সময়ে কাজে পৌঁছে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জটাও মাথায় নেওয়া দরকার।

৩.

যাপিত জীবনে অভ্যস্ত অনেক অভ্যাসের কাছে আমরা প্রায়শই বন্দি। আরামদায়ক অবস্থান থেকে স্থানচ্যুতি আমাদেরকে দিশেহারা করে। আকাশ বা বাইরের পৃথিবী দেখতে না পাওয়া আধো আলো আধো অন্ধকার জানালাবিহীন বেসমেন্ট বসবাসের জন্য ভাড়া করতে গিয়ে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। দেশে নিজের একান্ত ছিমছাম বাসা, খোলা ছাদ কেবলই টানতে থাকে। বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে বোঝাই- বেসমেন্টের বদলে তাহলে শেয়ার হাউসে থাকা যায়। তবে সেই সাথে শেয়ার মেন্টালিটি এবং দায়িত্ববোধকেও আপগ্রেড করতে হবে যে! রান্না, খাওয়া, বসা এবং বাথরুমের মতো স্থান যার সাথে ভাগ করতে হবে তাকে পরিবারের সদস্যের মতো বুঝে নেওয়াই হবে একসাথে মিলেমিশে থাকার একমাত্র শর্ত। প্রাত্যহিক জীবনের নানা পরিবর্তনকে এভাবে খোলা মনে আলিঙ্গন করে শুরুর দিকে প্রায় এক বছর শেয়ার হাউসেই কাটিয়ে দিই।

এখানে এসে প্রথমেই টিচিং লাইসেন্স অথরিটি Ontario College of Teachers-এ আবেদন করি এবং বেশ দ্রুতই পাবলিক স্কুলে শিক্ষকতার লাইসেন্স পেয়ে যাই। স্কিলস ফর চেঞ্জ নামে প্রতিষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষকদের জন্য ইংরেজি ভাষা, অন্টারিও স্কুল সিস্টেম বিষয়ে নির্ধারিত ছয় মাসের ফ্রি কোর্সও এই সময়েই শেষ করি। রেস্যুমে, কভার লেটার, ইন্টারভিউ টেকনিক, ড্রেস কোড, কাজের ক্ষেত্রে প্রফেসনালিজম, টিচিং প্র্যাকটিসের এথিকাল, প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড, কানাডিয়ান স্কুল কালচার-সহ আরও নানা বিষয়ে সরাসরি জানার অভূতপূর্ব সুযোগ ঘটে। এমনকি শিক্ষা বোর্ডে ইন্টারভিউ পাওয়ার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়। মনে আছে, আমার ছয় পাতা রেস্যুমে দেখে ইন্সট্রাক্টর মৃদু হেসে তাৎক্ষণিক তিন পাতা ফেলে দিয়ে বলে- রেস্যুমে এবং কভার লেটার মিলে তিন পাতার মধ্যে কেবল প্রোফাইল, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এবং কোয়ালিফিকেশন হাইলাইটেড হবে। কভার লেটারে সব কিছুর সংক্ষিপ্ত চিত্র থাকবে। মনে রেখো, ইন্টারভিউ বোর্ড সীমাবদ্ধ সময়ে এক সম্পূর্ণ তোমাকে দেখবে এবং নির্বাচিত করবে। এই তিন পাতায় নিজেকে ‘সেল’ করার কৌশলটা জানতে হবে। একটা পরিচ্ছন্ন ফরম্যাটে সংক্ষিপ্ত, নির্দিষ্ট আর প্রফেশনাল রেস্যুমের গভীর তাৎপর্য সেই প্রথম উপলব্ধি করি। নানা দেশের শিক্ষকদের সাথে পরিচয়ের সূত্রে ওন্টারিও ছাড়া আরও বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্ককে ধারণা হয়। শিক্ষক হিসেবে এখানে কর্মজীবনে ঢোকার প্রস্তুতি হিসেবে ‘স্কিল ফর চেঞ্জ’-এ কোর্সের সিদ্ধান্ত ছিল খুব সময়োচিত এবং যথার্থ ।

লার্নিং বিষয়টা চলমান, বহতা নদীর মতো। শেখার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। কোর্স শেষে এলিমেন্টারি, সেকেন্ডারি- এই দুই স্তরের স্কুলেই সকাল বিকাল ফুল টাইম ভলান্টিয়ারিং শুরু করি। স্কুল কালচার, পড়ালেখার ধরন, পদ্ধতি, শিক্ষার্থী, পরিবেশ পরিস্থিতি বোঝা ছাড়াও স্কুলে চাকরির জন্য ভালো রেফারেন্স থাকা আবশ্যক। ক্লাসে সহযোগী হিসেবে খাতা দেখা, টিচিং ম্যাটেরিয়াল হাতের কাছে গুছিয়ে রাখা, প্রয়োজনে পাঠদান, বিহেভিয়ার বা চ্যালেঞ্জিং ছাত্র সামাল দিয়ে শ্রেণি শিক্ষকের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা করি। দেশে পোস্ট গ্রাজুয়েট লেভেলে বড়ো গ্যালারিতে স্কুলের শিক্ষকদের পড়ানোর পূর্ব স্মৃতিকে সেই মুহূর্তে মনে বাক্স বন্দি করে রাখি। আমার সামনে অডিয়েন্স এখন স্কুলের বয়ঃসন্ধির কোমলমতি ছাত্রছাত্রী। তাদের লেভেল, ম্যাচুরিটি বুঝে শিক্ষাদানের চ্যালেঞ্জটা মাথায় নেওয়াই যে এখন প্রায়োরিটি! ‘কী ছিলাম’ আর ‘কী ছিল’ ভেবে সময় ক্ষেপণ করার অর্থ লক্ষ্যের সিঁড়ি থেকে নিজেকে পিছিয়ে নেওয়া। ওন্টারিও স্কুল শিক্ষকের পাঠ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোও ক্ষেত্রবিশেষে ‘হুকড’ বা সংযুক্ত করে নেই। শ্রেণিশিক্ষকের ভাষাগত এক্সেন্ট, বিষয়বস্তু উপস্থাপন, ক্লাস ম্যানেজমেন্ট, টিচিং এইডের ব্যবহার সর্বোপরি পাঠদান কৌশল দেখে চমৎকৃত হই। রেফারেন্সের প্রশ্নে তারা প্রত্যেকেই অসীম উদারতায় বলে- যেভাবে লিখলে তোমার পক্ষে যায় সেভাবেই লিখো, সাইন করে দিচ্ছি। বোর্ডে ইন্টারভিউটা দাও, রেফারেন্স চেক নিয়ে একদম ভেবোনা। তোমার মতো ধৈর্যশীল, ডেডিকেটেড, ব্যতিক্রমধর্মী, প্রফেসনাল এবং কোয়ালিফাইড একজন শিক্ষকের যে খুব প্রয়োজন মীর! নিজের সম্পর্কে এমন মন্তব্যে কনফিডেন্ট লেভেল যেন আরও কয়েক ধাপ বেড়ে যায়। জীবনের পূর্ব সাফল্যের ক্ষেত্রে কনস্ট্রাকটিভ এবং প্রশংসামূলক বিশ্লেষণ দ্বারা কি কখনো এভাবে সম্মানিত হয়েছি? বিপরীতে, প্রথাগত সমাজের ‘জাজমেন্টাল’ মেন্টালিটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো সুপ্ত প্রতিভা বা সম্ভাবনাকে কুঁড়িতেই বিনষ্ট করে দিয়েছে। আমার স্থির বিশ্বাস গঠনমূলক সমালোচনা, যথার্থ ফিডব্যাক মানুষের উত্তরণে মূল্যবান ভূমিকা রেখে মানুষকে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। টরন্টো এবং ডুরহাম এই দুই বোর্ডেই শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের অর্জন আর অসম্পূর্ণতাগুলো বারবার খতিয়ে দেখি। ঈশ্বরের পায়ে অসীম কৃতজ্ঞতায় সেই উক্তিই নিবেদন করি- ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শক্তি’।

৪.

টিচিং লাইন্সেন্স হাতে পাওয়া এবং শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়টা ছিল মানসিক টানাপোড়েনের এক নিদারুণ দুঃসময়। সকাল-সন্ধ্যা দৈহিক শ্রমের কাজ করে শিক্ষকতার প্রস্তুতি নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অর্থ উপার্জনের দ্বিতীয় বিকল্প না থাকায় সঙ্গত কারণেই সোশ্যাল সিকিউরিটি মানির দ্বারস্থ হতে হয়। ভিক্ষার মতো সামান্য অর্থ হাত পেতে নেওয়া, সোশ্যাল ওয়ার্কারদের মন্তব্য, এবিউসিভ আচরণে প্রচণ্ড এক হীনম্মন্যতার জন্ম হয়। তাদের বক্তব্য- ভলান্টিয়ারিং বা শিক্ষকতার প্রস্তুতি নয়, কারখানা বা যেকোনো কাজ করার ট্রেনিং নিয়ে এই মুহূর্ত থেকেই অর্থ উপার্জন শুরু কর। গোল ওরিয়েন্টেড এই আমি প্রতি মুহূর্তে বিশ্বাস হারানো আস্থাহীনতায় ডুবে যাওয়া সময়ে একদিন ভয়ঙ্কর তিক্ত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। ‘ওভার কোয়ালিফাইড’ ক্যান্ডিডেট হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠানই আমার চাকরির এপ্লিকেশন ফেরত পাঠিয়ে দিতো অফিসে। বাঘের মুখের হিংস্রতায় সোশ্যাল অফিসার অকারণ জেরা শুরু করে। সীমাহীন অযৌক্তিক কিছু ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে হঠাৎ আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। অফিসারের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চড়া সুরে বলি- তুমি কি ভেবেছো আমি এই দেশে ভিক্ষা করতে এসেছি? সেই মুহূর্তে আমার ভিতরে এক ভয়হীন ‘পারবো এবং পারতেই হবে’ এই দৃঢ়তা বোধ কাজ করে। টানাপোড়েনের এই দুঃসহ সময়টা ভাগ্যগুণেই দীর্ঘ হয়নি- বোর্ডে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে চলার পথ ক্রমশ সুগম হয়েছে।

এখানে নিজ ক্ষেত্রে কাজ পাওয়াটা যেমন কঠিন তেমনি কাজ ধরে রাখাটা আরও কঠিন। চাকরি ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে সত্যি কিছু নেই। ম্যান্ডেটরি ট্রেনিং, প্রফেশনাল লার্নিং প্রসেসের মধ্যদিয়ে শিক্ষক হিসেবে প্রতি পদক্ষেপে নিজেকে আপগ্রেড করতে হচ্ছে। নিজের ফিল্ডে মেইন স্ট্রিমে কাজ পাওয়াটাকে আমি কখনোই ভাগ্যগুণ মনে করি না, এক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দিই বরাবর। ইতিবাচক চিন্তা চেতনা এবং যেকোনো পরিবর্তনকে সহজভাবে মেনে নিয়ে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ করার প্রবণতা আমাকে কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে গেছে নিঃসন্দেহে। আমি বিশ্বাস করি যে, আত্মসমালোচনা, রিফ্লেকশন কেবল একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, এই গুণ ব্যক্তি মানুষকেও সমৃদ্ধ করে বহুমাত্রায়। পেশার ক্ষেত্রে কী পাইনি বা কী পাওয়ার কথা ছিল বা কী অসম্পূর্ণ রয়ে গেল, সেই ভাবনাকে আমল না দিয়ে যা পেয়েছি তা ধরে রাখা, উন্নতির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজেকে যেমন সবক্ষেত্রে সফল মনে করি না তেমনি ব্যর্থতার জন্য অকারণ গ্লানিতেও ভুগি না।

৫.

কানাডায় সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষে অসাম্য বা বিভাজনের অনুপস্থিতি একজন নারী হিসেবে আমাকে সম্মানিত করে। চাকরি বা সামজিক ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হিসেবে যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রতিনিয়ত আমার মনে শক্তি যুগিয়েছে। মিশ্র সংস্কৃতির সমৃদ্ধ নির্যাসটাও বেশ উপভোগ করি। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি-সহ নানাবিধ আধুনিকায়ন, আমলাতান্ত্রিকতা বা পদ সোপানের দম্ভ মুক্ত শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষা উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ এবং স্টুডেন্ট সাকসেস প্রসঙ্গ প্রায়োরিটির অগ্রভাগে দেখে বারবার অনুপ্রাণিত হয়েছি। স্কুলে নানা রকম ‘হিডেন’ জব এবং সেগুলো এক্সপ্লোর করে ভিন্ন পেশার বিভিন্ন সংগ্রামী অভিবাসীর সাথে পরিচয়, তাদের কাজকর্ম আমার চিন্তায়, অভিজ্ঞতায় অনেক সময়েই ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

কাজের ক্ষেত্রে স্ট্রেস, সময়ের ধরনের কারণে পরিবারের সাথে বিচ্ছিন্নতা, দূরত্ব, ডিভোর্স, আত্মহত্যার বিষয়গুলো নিয়ে প্রায়শই ভাবি। কাছে, দূরের সম্পর্ক এবং মায়া-মমতার বন্ধনে শিথিলতার বিষয়গুলোতে মনে কষ্ট জমাট বাঁধে। এখানে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ভাষাসহ নিজ সংস্কৃতির আধা খেঁচড়া অবস্থানে বিরক্তির সাথে কিছুটা আতঙ্কিতও হই। টরন্টো বোর্ডের অধীনে প্রাথমিক স্কুলে ভাষা শেখানোর প্রোগ্রামে কিছুদিন বাংলা ভাষা শেখানোর কাজ করতে গিয়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। এক শিক্ষার্থী দীর্ঘ দিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকায় বাড়িতে ফোন করে এক মহা বিড়ম্বনায় পড়ে যাই। শিক্ষার্থীর অভিভাবক মেজাজি সুরে তার সন্তানের বাংলা ক্লাসে না আসার লম্বা বয়ান দেন। আমার কানে তার একটা কথা তুমুলভাবেই লেগে যায়- ‘বাংলা ভাষা আবার স্কুলে শেখার কী আছে?’ ফোনের এই প্রান্তে কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে যাই। মাতৃভাষার জ্ঞান থাকলেই যে কেবল ইংরেজি বা অন্য যেকোনো ভাষার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের ব্যবহার বা প্রয়োগ সম্ভব- এই কথাটা এখানে বলা অরণ্যে রোদন হবে, ভেবে চুপ করে থাকি।

প্রবাসে নিজের জন্মভূমিকে বেশি করে অনুভব করা আমাদের স্বভাবজাত এক চিরন্তন আবেগ। জন্মভূমি মায়ের সমান। মায়ের তুলনা কেবলই মা! বাংলাদেশের সাথে কানাডার তুলনামূলক আলোচনা তাই আমি নিজ সচেতনতায় এড়িয়ে চলি। আমরা অনেক সময়েই নিজেদের শিকড়ের ইতিহাস ভুলে নিজেকে এবং উত্তরসূরিকে এই সংস্কৃতির উপযুক্ত করে তুলতে সচেষ্ট হই। আমি মনে করি অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সন্তানকে এই দেশের মাল্টিকালচার সোসাইটির ভালো মন্দ বিবেচনা করে কোনটা কতটুকু নিতে হবে বা বর্জন করতে হবে সেই দিক নির্দেশনায় পরিচালিত করা। মনে রাখতে হবে-অভিবাসনের পরিবর্তিত প্রক্রিয়ায় বয়ঃসন্ধির এই প্রজন্মও কিন্তু ‘শুদ্ধ না ভুল’ এই বিতর্কের ঘূর্ণি ঝড়ে এক কঠিন সময় পার করছে। নিজ দেশের আজীবন লালিত সভ্যতা, সংস্কৃতি, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধের ধারণ এবং প্রতিফলন ঘটিয়ে অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সন্তানকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করা। প্রবাসে বড়ো কষ্ট হলো, দেশে কাছের মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে না পারার অযোগ্যতায় নিজেকে প্রচণ্ড স্বার্থপর মনে হওয়া। এই গ্লানি থেকে বের না হতে পারাটাই আমার কাছে প্রবাস জীবনের চরম সংকট বলে মনে হয়। দেশের মঙ্গলের জন্য কিছু করার ইচ্ছা বা স্বপ্নটা ভিতরে সযত্নে লালন করলে একদিন নিশ্চয়ই তা বাস্তবায়িত হবে। সবশেষে, স্বপ্নলোকের সেই যাদুর চাবি দেশের স্বপ্নবাজ তারুণ্যের কাছে কোনো একদিন পৌঁছে যাক শিক্ষক হিসেবে এই প্রত্যাশা নিরন্তর।

লেখক পরিচিতি
ঋতু মীরের জন্ম ঢাকায়। বর্তমানে টরন্টো স্কুল শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে শিক্ষায় ডিপ্লোমা, মাস্টার্স এবং ডেকিন ইউনিভার্সিটি মেলবোর্ন থেকে শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। সমাজ, সম্পর্ক এবং মানুষের মনোজাগতিক সুখ, দুঃখ, বেদনা, জটিলতা তার লেখার প্রধান উপজীব্য। ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে সংগীতে তালিম নিয়েছেন।