স্মৃতিতে কানাডার শরৎ ঋতু-র একদিন
জীবন যাপন আর স্মৃতির ভিতরের শূন্যতা যেন শরতের পাতাঝরার মতোই ফিরে ফিরে আসে বারবার। কানাডায় শরৎকাল, যা শরৎ নামেও পরিচিত; সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়; যদিও বিভিন্ন জায়গায় সময়ের হেরফের হয়। তাপমাত্রা কমতে থাকে, দিন ছোটো হয়ে আসে আর গাছের পাতারা সবুজ থেকে লাল, কমলা, হলুদ এবং বাদামি রঙের বাহারে সেজে ওঠে। এরপর পাতাঝরা শুরু হয়, এজন্যই এই ঋতুকে ফল (Fall) বলা হয়।
কানাডাতে চারটা ঋতুকে এত সুন্দরভাবে উপলব্ধি করা যায়, সত্যি বিস্ময় জাগে। গ্রীষ্ম শেষ হতে না হতেই পথের ধারের সবুজ গাছগুলো পাতার রঙ বদলাতে শুরু করে। যদিও আগুন রঙে সাজে পাতারা। তবু Fall এলেই অন্যরকম বিষণ্ণতা পেয়ে বসে। গাছগুলো পাতাহীন, বিবর্ণ হয়ে যায়। ঝরাপাতার দিনগুলো না ফুরোতেই শুরু হয় তুষারপাত। শীতনিদ্রায় চলে যায় পশুপাখিরা। ঘরবাড়ির আশেপাশে কাঠবিড়ালী আর হুটেপুটি খায় না।
শেষবার ফল (Fall) এর রং দেখতে Mont Tremblant-এ গিয়েছিলাম আমরা দু’জন, ১৬ অক্টোবরে ২০১৬ আমাদের ২৪তম বিবাহ-বার্ষিকীতে। অপূর্ব পাহাড় আর হ্রদে ঘেরা এক ছোট্ট শহর। সব ঋতুতেই সেখানে বেড়াতে গিয়েছি কিন্তু সেই ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত আজও স্পষ্ট মনে আছে।
অটোয়া থেকে Mont Tremblant যাওয়ার রাস্তাটা এত সুন্দর! দু’ঘণ্টার পথ, চোখ জুড়ানো পাহাড়ি দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। গাড়ি চলছিল, সামনে এবং আশেপাশে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল আমরা সোনালি পাতার দেশে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে লালের আভা, কখনো-বা কমলা। পথে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। সে-এক অপার্থিব দৃশ্য! পথে কয়েকবার থেমে ছবি তুলেছিলাম। একটা ফার্ম হাউসের সামনে গাড়ি থামিয়ে ভিতরের পশু-পাখিগুলো দেখলাম। কতগুলো হাঁস আর মুরগি বাচ্চাদের নিয়ে আপন মনে ঘুরছিল। হলুদ হাঁসের বাচ্চা আর মুরগির বাচ্চাগুলোকে একই রকম দেখতে লাগে। দুই পাহাড়ের মধ্যদিয়ে যাওয়ার সময় তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। ও খুব সাবধানে ড্রাইভ করছিল। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। এখানে গেলেই আমার রাঙামাটির কথা মনে হয়।
গাড়িতে কত গান বেজেছিল! কখনো আমি, কখনো ও, আবার কখনো দু’জনে গলা মিলিয়েছিলাম। “ওপারে থাকবো আমি তুমি রইবে এপারে”- এই গানটা গাইছিল ও অনুপম রায়ের সাথে গলা মিলিয়ে। কেন যেনো চোখ ভেসে যাচ্ছিল আমার! বুঝতে পেরে ও গান গাওয়া থামিয়ে দিয়েছিল। কত কথা বলেছিলাম আমরা সেদিন! কত স্বপ্ন দেখেছিলাম! যদিও স্বপ্ন দেখতে আমরা ভয় পেতাম, অনেকবছর ধরেই আমরা প্রতিদিন বাঁচতে শিখেছিলাম। হাঁটতে, চলতে, কথা বলতে বলতে কতবার আমাদের মনে হয়েছে, কেন জীবন এমন! কেন বারবার শরীরের এই যুদ্ধ ওর?
বারী সিদ্দিকীর প্রতিটা গান ও এমন গলা ছেড়ে গাইছিল, আমি অনেকগুলো ভিডিও করেছিলাম আমার ছোট্ট সনি ভিডিও ক্যামেরাতে। ওর খুব প্রিয় গান ছিল, ‘অপরাধী হইলেও আমি তোর’। বারী সিদ্দিকী যখন আমাদের শহরে গান গাইতে এসেছিলেন, ও গানটা গাইতে অনুরোধ করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় শিল্পী ওর গলা জড়িয়ে ধরে কানে কানে গানটার কয়েক লাইন শুনিয়েছিলেন। ও খুব আপ্লুত হয়েছিল।
অবাক ব্যাপার হলো, আমি যেসব ভিডিও করেছিলাম, কখনো সেই ভিডিও কেনো যেন দেখা হয়নি। দুই বছর আগে পুরাতন কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভে সেগুলো খুঁজে পেলাম। ওর গলা শুনে রাতভর কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল এমন নির্ঘুম রাতের জন্যই হয়তো এগুলো করেছিলাম। আসলেই কতকিছু থেকে যায়! কত স্মৃতি, কত কথা, কত সুর!
শহরে ঢুকে সোজা চলে গিয়েছিলাম Mont Tremblant শহরের ডাউন টাউনে। যেখানে রয়েছে অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, সিটি হল। Rue de St-Jovite রাস্তাটার উপরেরই মূলত, ১০০ বছরের পুরনো বাড়িঘরগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে অনেক পুরনো দোকান, রেস্তোরাঁ এবং ফুটপাথের ক্যাফে আছে। প্রাণবন্ত এই শহরটিতেই Bluesfest আর Jazz Festival-এর মতো অনেক সাংস্কৃতিক আর শৈল্পিক অনুষ্ঠান হয়। এখানকার রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় আমরা ইতিহাসের থেকে ওঠে আসা মানুষ। যতবার এখানে গিয়েছি, আমার একথা মনে হয়েছে। এখানেই অনেক খোলা পার্ক আছে। আর বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় বসে আরাম করা যায়। Creek Clair-এ যাওয়ার জন্য ১০০০ ফুট লম্বা সেতু আছে যা ধরে Diable নদীর কাছে যাওয়া যায়।
হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা পেয়ে গেল। অনেক ব্যস্ত একটা রেস্টুরেন্টের সামনের টেরেসে বসলাম। মানুষের ভিড়ে বসতে ভালো লাগে। খাবারের অর্ডার দিয়েই রাশীক, রাইয়ানকে ফোন করলাম। ওদের সাথে কথা বলবার সময়ই জানলাম আজ আমরা এখানে এই শহরে থাকবো। রাশীকও আগে থেকেই জানতো। আমি হইচই শুরু করার আগেই সে জানালো প্রয়োজনীয় সবকিছু গাড়ির পিছনে আছে। আর কিছু লাগলে তো কেনাই যাবে! আমি এতক্ষণে বুঝলাম, বারবার বাড়তি জামাকাপড় নিতে বলার কারণ যদিও বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়েছিল।
পাহাড়ের পাশে দোতলা একটা হোটেলে ওঠেছিলাম। আগেই বলা ছিল যে আমাদের বিবাহ-বার্ষিকী। হোটেলের পক্ষ থেকে ফুল, কেক (পেস্ট্রি) আর দুইটা ছোট্ট ওয়াইন-এর বোতল দিয়েছিল। রাতে বাইরে খেতে যাওয়া ছাড়া আর কোথাও যাওয়া হলো না। খুব কাছের একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলাম। সেখানে বসেও ছেলেদের সাথে কথা হলো। ওদের বাবা ওদেরকে পিজ্জা অর্ডার করতে বলেছিল। এরপর শান্তি। না-হলে কেমন যেনো অপরাধী লাগছিল।
পরের দিন সকালটি শুরু হলো ঝকঝকে সোনালি আভা দিয়ে। জানালা খুলে তাকিয়ে দেখি, রাস্তার ওপাশের পাহাড়ে যেন আগুন জ্বলছে। আগের দিনের আর রাতভর বৃষ্টির জন্য গাছের পাতা সব পড়ে যাবে এই ভয় পাচ্ছিলাম। কিছু তো পড়েছিল! কিন্তু পাতাদের সেই উজ্জ্বল রং এখনো চোখে লেগে আছে। ওকে কতবার যে ধন্যবাদ বলেছিলাম! এমন সুন্দর সকাল উপহার দেওয়ার জন্য। সেও খুব খুশি হয়ে হাসছিল।
নাস্তা খেয়েই চলে গিয়েছিলাম আমাদের প্রিয় Mont tremblant village-এ। পথে থামলাম একটা জায়গায়। যেখান থেকে রিভার ক্রুজে যায় সবাই। রিভার ক্রুজের ঘাটে একজন বয়স্ক শিল্পীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছিলেন। প্রতি বছর এখানকার শরৎকালের ছবি আঁকতে আসেন। বললেন, শরৎ তার প্রিয় ঋতু। কয়েক বছর আগে প্রিয় সঙ্গী হারানো, নির্জন গ্রামে থাকা, নিত্যপ্রয়োজনের জন্য দূর শহরে যাওয়া- সব কথাই বলেছিলেন এক প্রশান্ত হাসি নিয়ে। বলেছিলেন, প্রকৃতি থেকে যা পাওয়া যায় তাই জীবনকে পরিপূর্ণ করে, আমরাই নানান চাহিদায় জীবনকে জটিল করে তুলি। জীবনে কি এত কিছু লাগে? আরো জানালেন, ছেলেমেয়েরা কানাডার বিভিন্ন শহরে থাকেন। তিনি মাঝে মাঝে তাদের কাছে যেয়ে ঘুরে আসেন। তবে ভালো লাগে নিজেদের সেই গ্রাম। এই ক’দিন আগেও সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি সেভাবে ছিল না। শুধু লাইট জ্বালানোর জন্য যতটুকু দরকার। ফ্রিজ, ওভেন এসব এখনকার মতো ব্যবহার করা হতো না।
তার কথাগুলো আমার অন্তরে বাজতে থাকে- সত্যিই, জীবনে কি এত কিছু লাগে? এত এত কিছু? আমরা তাকে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে শুরু করি। আমাদের কথার ভিতরে অনেকক্ষণ তিনি জুড়ে থাকেন। ও যদিও হাঁটতে তেমন পছন্দ করতো না আর আমি মনে করতাম, আমি হাঁটতে হাঁটতে একদিন আকাশ ছুঁতে পারবো! আকাশের নীল সাদা মেঘের দিকে তাকিয়ে আমার দেশের শরৎকাল মনে পড়ছিল। দেশে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম আমরা। এই নিয়ে অনেক কথা বললাম। দু’জন বান্ধবীর সাথেও দেখা হয়েছিল সেখানে হাঁটার সময়। ঘুরতে এসেছিলেন, কুইবেকের অন্য এক শহর থেকে। একজন আমার পাতার কাজ করা শালটা দেখে মহা মুগ্ধ। শালটা পরে ছবিও তুললেন। আমার পাশের মানুষ সেদিন ফটোগ্রাফার আর আমি পুরোই মডেল ভাব নিয়েছিলাম। এখনো যেখানেই যাই, ছবি তুলি। কিন্তু সেই নাইকন ক্যামেরা এখন আর ব্যবহার হয় না। কেউ আমার অজস্র ছবি তুলে দেয় না! সবাই এখন আমরা ফোনের অধীন হয়ে গেছি। ফোনেই জীবন।
Mont tremblant village-এ গেলে অদ্ভুত এক দোলাচলে পড়তে হয়। মনের মধ্যে দারুণ অনুভূতি হয়। ক্লক টাওয়ার বিল্ডিং-এর কাছে গেলে niagara on the lake সিটির কথা মনে পড়ে। ভিলেজের ওপরের অংশে যেতে আমরা ক্যাবল কার-এ উঠি। ওপর থেকে চারপাশের হোটেলগুলো আর নিচের বর্ণিল পাতার গাছগুলো দেখা যায়। হোটেলের সুইমিং পুলগুলো থেকে তখনো বাচ্চাদের হইচই চিৎকার ভেসে আসে। ক্যাবল কার থেকে নেমে পুরো জায়গাটা ঘুরতে থাকি। সামনেই হ্যালোইন, তাই দোকানগুলোর সামনে দারুণ করে সাজানো হয়েছিল। বিশাল সব কুমড়োর ওপর ছোটো ছোটো বাচ্চারা ওঠে বসে ছবি তুলছিল।
যে পাহাড়টিতেskyline luge রাইড হয়, সেটা বন্ধ ছিল। অনেকবার ক্যাবলকারে ওপরে ওঠে, পরে সেই skyline luge-এ নেমেছি আমরা। সেদিন হঠাৎ কী মনে হয়েছিল জানি না, দু’জনে মিলে পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে ওঠতে শুরু করেছিলাম। একসময় যখন বুঝলাম ব্যাপারটা অত সহজ না, তখন আর ফেরার উপায় নেই। অর্ধেকের বেশি ওঠে পড়েছি। ঘাসের ওপর বসে বিশ্রাম নিলাম। হলুদ পাতার গাছের ছবি তুললাম। একটু পর আবার ওঠতে শুরু করলাম। ও আমার পিছনে উঠছিল আর বলছিল, ‘পিছন ফিরে নিচে তাকিও না।’ একদম উঁচুতে ওঠে কী ভালো যে লাগলো! মনে হলো, এ-যেন এভারেস্টে ওঠার মতো চরম আনন্দের অনুভূতি। ও তো মহা হুলুস্থুল শুরু করলো! কত ছবি তুলেছিলাম দু’জন দুজনার। ভিডিও করেছিলাম। অনেকক্ষণ বসে থাকলাম সেখানে। ভিলেজটাকে পাহাড়ের ওপর থেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। দূরের পাহাড়ের গায়ে গাছগুলো সোনালি আভায় আগুনের মতো লাগছিল। নামার পথে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে ছোট্ট ঝর্ণাধারা দেখলাম। কী যে এক অদ্ভুত আবহ! আমি মনের অজান্তে গান গাইতে শুরু করেছিলাম। এক সময় দেখি ও পাথর এর ওপর পা দিয়ে দিয়ে একদম ঝর্ণার কাছে গেছে। কুলকুল করে বয়ে যাওয়া জলের ধারায় হাত ভেজালো আর আমাকে জল ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো।
মনে হচ্ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে বসে থাকা যায়। আর সুন্দর কিছু দেখলেই আমার বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি স্রষ্টাকে মনে পড়ে। মনে হয়, ভাগ্যিস, এই মানুষ জন্ম দিয়েছিলেন! দিয়েছেন দেখার চোখ। অদ্ভুত সুন্দর সেই দিনটা স্মৃতির এলবামে জুড়ে যায় কত ছবি, কত কথা নিয়ে। দু’জনে হাত ধরে কতক্ষণ যে বসেছিলাম সেখানে! কে জানতো এমন দিন আর আসবে না?
কাঠের সিঁড়িটার ওপরে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলেছিল ও আমার। এখান থেকে একটু সামনে এগোতেই নির্জন এক বনভূমে পৌঁছে যাই। গাছের পাতা ঝরে মনে হচ্ছিল পাতার বিছানা। মনের অজান্তে গান গাইতে থাকি-
ঝরা পাতা গো, বসন্তী রং দিয়ে
শেষের বেশে
শেষের বেশে সেজেছ তুমি কী এ
খেলিলে হোলি ধুলায় ঘাসে ঘাসে
বসন্তের এই চরম ইতিহাসে…
ঝরা পাতা ঝরা পাতা
ঝরা পাতা গো আমি তোমারি দলে…
কতবার যে ঘুরে ফিরে সেই একই লাইন, ‘ঝরা পাতা ঝরা পাতা, ঝরা পাতা গো আমি তোমারি দলে’… গাইতে থাকি আমরা। সুরের সংক্রমণ ছড়িয়ে যায়, আকাশে, বাতাসে, সবখানে। বর্ণালি সেই পাতার দেশে অনেক ছবি তুলেছিলাম। আমাদের সেই দিনের একটি ছবিই আমার বই ‘রানুর আকাশ’-এর প্রচ্ছদ হয়েছিল।
এখনো প্রতি বছর শীত এলেই অপেক্ষায় থাকি কখন গাছগুলো সবুজ হবে। আবার সামার শেষ হতে না হতেই ‘ফল’-এর রঙে পাতাগুলো যখন প্রথমে রঙিন, পরে বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে, মন খুব বিষণ্ণ হয়। যদিও মাঝে মাঝে পাতার রং দেখবো বলে এখানে সেখানে যাই। এ-এক নেশা! সেই কবে পড়েছিলাম John Keats-এর ‘To Autumn’, আর Shelley-র ‘Ode to the West Wind’-এর সেই লাইনগুলো!
Yellow, and black, and pale, and hectic red,
Pestilence-stricken multitudes: O thou,
Who chariotest to their dark wintry bed.
স্যাররা যখন পড়াতেন, নিজের মনের ভিতর সেই চোখ হয়তো তখনই তৈরি হয়েছিল, যা দিয়ে পাতার এই অদ্ভুত রঙের খেলা দেখা যায়! আসলে মানুষের জীবনটা বড়ো অদ্ভুত। এই পাতার মতোই। প্রথমে সবুজ, তারপর রং বদলে বিবর্ণ হয়ে একদিন চলে যেতে হয়। আর তাই তো কত কষ্ট, কত হারানো, কত না পাওয়া নিয়েও বেঁচে থাকা এত ভালো লাগে।
অজস্র ছবির সাথে ঘুরে ফিরে আসে সেই সময়ের কত কিছু! কথা আসে। হাসির স্মৃতি ফিরে আসে। সেই ছোট্ট ঝর্ণার কলতান ফিরে আসে। পাহাড়ের ওপর ওঠার পর প্রিয় মানুষটির উচ্ছ্বাস মনে আসে। অথচ সেই প্রিয় মানুষটা, যে কতবার কতভাবে আমাকে ভালোবাসার অবাক সুর শুনিয়ে অবাক করেছে! আমার রাশীকস-রাইয়ানের বাবা, ২০২০-এর ২৪ অক্টোবরে, টুপ করে হারিয়ে গেছে! Fall-এর সেই গাছের পাতাদের মতোই! দীর্ঘ ১৯ বছরে দুইবার ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে জয়ী হলেও তৃতীয়বার আর পারেনি। এগারো মাস তুমুল লড়াই করে, হাতের মুঠোর হাত ছেড়ে চলে গেছে সেই অনন্তলোকে। যেখানে যাওয়া আছে, ফিরে আসা নেই।
গাছের পাতারা নতুন করে ফিরে আসে অথচ সেই প্রিয় মানুষটা আর ফিরে আসে না! আমাদের জীবনের সুর কেটে গেছে! ও খুব ভালোবাসতো এই অক্টোবর। পাতার বর্ণালি রং দেখতে কত জায়গায় গিয়েছি! কত স্মৃতির এলবামে ভরা এই জীবন!
২.
কবিতা লিখি। স্মৃতি গল্প লিখতে বসলে দিন-রাত সব একাকার হয়ে যায়। মনে হয় সেইসব দিনের ভিতর ঢুকে যাই। ফিরতে ইচ্ছা করে না সেই স্মৃতির গহ্বর থেকে। তবু আমি লিখি। ছায়ার মতো সেইসব দিনের পিছনে হাঁটি। ছোটো ছোটো ভালো লাগা, হারানো দিনের আলো আর স্মৃতির ছবি জুড়ে জুড়ে কবিতা ও গল্প সাজাই। আসলে যাপিত জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমরাই তো অহরহ গল্পের চরিত্র হয়ে যাই।
উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলেছিলেন-
All the world’s a stage,
And all the men and women merely players;
(As You Like It, spoken by Jaques)
কথাটা কী যে সত্যি!
কথাটা খুব সত্যি। পাতার মতোই মানুষও একদিন ঝরে যায়, কিন্তু স্মৃতির শরৎকালে তার হাসি, গান আর ভালোলাগা রয়ে যায় চিরকাল।
কখনো কখনো আমরা মুঠো ভরে ঝরা পাতাদের কুড়াই। বুকের ভিতর জমিয়ে রাখি সুষমা। জড়িয়ে রাখি আদর প্রাণের সেই মানুষের মতো, যে থাকে মনের গভীরে!
লেখক পরিচিতি
জন্ম এবং বেড়ে ওঠা লালমনিরহাটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স এবং মন্ট্রিয়লে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ৩৩ বছর ধরে কানাডা প্রবাসী সাজি কবিতা আবৃত্তি, রবীন্দ্রসংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় যুক্ত। তাঁর সাতটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে- ছয়টি কবিতা ও একটি স্মৃতিনির্ভর গল্পগ্রন্থ।

