অচেনা আলোয় নিজেকে খোঁজা
যখন একজন নারী নিজের শেকড় ছেড়ে নতুন পৃথিবীতে পা রাখে, তখন সে কেবল নতুন ভাষা, নিয়ম বা ঠিকানা শেখে না- সে নিজেকে নতুন করে গড়ে। এই গড়ার পথে থাকে অজস্র বাঁক, অপ্রচল অভিজ্ঞতা, ক্লান্তি আর কণ্ঠরোধ করা কান্না। কিন্তু তার মধ্যেই জ্বলে ওঠে কিছু গল্প, কিছু মানুষ, কিছু মুহূর্ত- যারা তাকে নির্মাণ করে, তাঁকে দেয় নিজের চেয়ে বড়ো কিছু হয়ে ওঠার প্রেরণা।
প্রবাস মানে শুধু একটি নতুন দেশের ঠিকানা নয়, বরং এক নতুন সত্তার জেগে ওঠা। আজকে এই লেখাটি একজন নারীর জীবনের সেই অনন্য যাত্রাপথের দলিল, যেখানে কানাডার শীতল হিমেল বাতাসে খুঁজে পেয়েছি জীবনের নতুন মানে- সেবা, ভালোবাসা এবং সাহস। অভিবাসী জীবনের সাধারণ গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কিছু ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা, যেগুলো আমাকে নির্মাণ করেছে ভিতর থেকে, তাই এই লেখাটি কেবল আত্মজৈবনিক নয়- এটি এক মানবিক আলেখ্য।
২.
আমার যাত্রা ছিল অনন্য, কিন্তু সেটা একার নয়। আমি আজকে যে গল্প আপনাদের সাথে শেয়ার করবো, সেই গল্প হয়তো আপনারও, কিংবা আপনার পাশের সেই নির্লিপ্ত হাসিমাখা নারীর, যিনি প্রতিদিন একটি জীবনকে ছুঁয়ে দেন অনেকটা নিঃশব্দে। আজকে আমার কলম কেবল স্মৃতির বাহক হয়ে নয় বরং উপস্থাপিত হবে একটি দীপ্ত আলোকবর্তিকা হয়ে, যাতে প্রতিফলিত হবে সেবা, ভালোবাসা এবং এক জীবনের সার্থকতা হিসেবে।
আমার জন্ম বাংলাদেশের বগুড়া শহরে। জীবনের শুরুটা ছিল একান্নবর্তী পরিবারে- দাদা-দাদি, মা, বাবা, ভাই-বোনদের আদর স্নেহে। পুকুরের ধারে দুপুরবেলা আর ঘরের কোণে নরম আলো আর মায়ের হাতের গরম ভাতে- এসব কিছু ছেড়ে চির পরিচিত জগৎ পেরিয়ে একদিন পা রাখি কানাডার ঠান্ডা, কিন্তু সম্ভাবনাময় মাটিতে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন ছিল, নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটু স্থিরতা খোঁজার প্রয়াস।
প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল, নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলেছি- জন্মভূমির পরিচিত মুখ, ভাষা, আকাশ, রান্নাঘরের গন্ধ সবই অচেনা হয়ে গিয়েছিল। আমি চাকরি করতাম ‘কেয়ার ইটারন্যাশনাল বাংলাদেশে’ যা এখন ‘কেয়ার বাংলাদেশ’। যেখানে আমি কাজ করেছি গ্রাম, উপশহর, শহর এবং রাজধানী ঝা-চকচকে জায়গায়। সেখনে আমি হারিয়ে যাই নাই। সেখান থেকেই খুঁজে নিয়েছি মানবিকতার গল্প। আমি নারী তাই নারীদের গল্প সবখানেই একরকম। শুধু পার্থক্য এই বংলাদেশে আইন-কানুনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বেড়িয়ে পড়া যায়। আর এখানে সুদূর প্রবাসে আইনের ফাঁক-ফোঁকর তেমনি মজবুত এবং কঠিন। আর সেখান থেকেই আমি যেন এক নতুন ‘আমি’-কে আবিষ্কার করতে শুরু করি। একজন অভিবাসী নারীর জীবনে যেমন থাকে সংগ্রাম, তেমনি থাকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা– যা ব্যতিক্রম, যা গভীরভাবে নির্মাণ করে আত্মাকে।
৩.
আমার মানবসেবার প্রতি ছোটোবেলা থেকেই টান ছিল আর বাবা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই কিন্তু তা আমার হয়ে ওঠা হয়নি। কিন্তু আমার মধ্যে ছিল পরের উপকার করার অপরিসীম নেশা। খেয়াল রাখতাম অসুস্থ প্রতিবেশীর বাবা, মা এবং বৃদ্ধ দাদা-দাদুর। কিন্তু তখন ভাবিনি এই মনোভাবই একদিন পেশায় রূপ নেবে, তা-ও আবার কানাডার মাটিতে। কানাডায় এসে আমি পেশাদার সেবিকা হিসেবে কাজ শুরু করি। যে ইউনিটে প্রথম দায়িত্ব পেয়েছিলাম, তা ছিল প্যালিয়েটিভ কেয়ার- যেখানে মানুষ আসে জীবনের শেষ অধ্যায়ে। মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে কাটানো সময় ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর পাঠশালা। সেই পাঠশালায় শিখেছি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কীভাবে নিজেকে কঠিন ও স্বাভাবিক থেকে হাসি মুখে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়।
বাংলাদেশে মৃত্যু নিয়ে কথা বলা মানেই ভয়, কান্না, নীরবতা। কিন্তু এখানে মৃত্যুও যেন এক পরিপূর্ণতার অংশ, যত্নের মধ্যে এক শান্তি। এখানে মৃত্যু যেন জীবনের স্বাভাবিক সমাপ্তি। আমি প্রত্যক্ষ করেছি- কীভাবে শেষ মুহূর্তেও একজন মানুষ একটু কোমল হাতের ছোঁয়া, একটু স্নেহভরা মুখের কথা খুঁজে ফেরেন।
প্রথম যেদিন একজন বৃদ্ধা, যার নাম ছিল মিরিয়াম, মৃত্যুর কিছুদিন আগে আমার হাতে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘‘You remind সব of my daughter. Thank you for being with সব’’ সেই মুহূর্তে আমি কাঁদতে চেয়েও কাঁদি নাই- কারণ, আমি তখন একজন সেবিকা, আবার একই সঙ্গে একজন মেয়ে, একজন প্রবাসী, একজন মা। এই অভিজ্ঞতাই আমাকে শিখিয়েছে- সেবা মানে শুধু কাজ নয়, তা এক আত্মিক সংযোগ, এক গভীর মানবিকতা।
একজন রোগী ছিলেন যিনি কথা বলতে পারতেন না, চলাফেরা করতে পারতেন না, শুধুই চোখে চোখে কথা বলতেন। আমি তাঁর সামনে প্রতিদিন বাংলা কবিতা পড়ে শোনাতাম- “আজি এ প্রভাতে রবির কর…।” জানি না তিনি বোঝেন কি না, তবে তাঁর চোখে জল আসত। সেই চোখে ছিল এক ধরনের আলোকিত স্বীকৃতি- আমি বুঝেছিলাম, ভাষার থেকেও বড়ো হলো অনুভব। সেবার এই অভিজ্ঞতা আমাকে প্রতিনিয়ত ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রতিদিনের ছোটো ছোটো মুহূর্ত- হুইল চেয়ারে বসে থাকা একজন বৃদ্ধের হাসি, কোনো বধির নারীর স্পর্শে কৃতজ্ঞতা- এইসব যেন আমার হৃদয়ে গল্প হয়ে জমে ওঠলো।
আরো একটি ঘটনা উল্লেখ্য করতে চাই। একদিন একজন রোগীর ছেলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল আমার, তিনি একজন আফগান অভিবাসী। বললেন, “My mother never trusted non-Afghans. But she loved your presence.” আমি হেসে বললাম, “আমাদের মায়েরা হয়তো একই রকম ভালোবাসেন।” ওর চোখে ছিল বিস্ময়, পরে কৃতজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে- ভিন্ন সংস্কৃতি মানে দূরত্ব নয়, বরং সংযোগের নতুন ভাষা।
আমার এখনো মনে পড়ে, যেদিন আমার মেয়ে রায়না পৃথিবীতে এলো, মনে হয়েছিল আমি নিজেই আবার নতুন করে জন্ম নিলাম। রায়নার চোখে আমি দেখেছি সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। আমার সাহস, কষ্ট আর স্বপ্ন যেন এক সাথে জ্বলে ওঠলো ওর শ্বাস-প্রশ্বাসে। ওর জন্ম বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরে। এগারো মাসের মেয়েকে নিয়ে এই প্রবাস জীবন শুরু করলেও তার মাঝে আমি দেখি অন্যের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছে। শৈশবে ওর অনেক কিছুই একজন মা হিসেবে আলাদা করে ভালো লাগতো। মানুষের প্রতি রায়নার ছিল অফুরান দরদ আর ভালোবাসা। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের পেলে সে খুব আনন্দ পেতো। পথে কোনো দরিদ্র মানুষকে সাহায্য চাওয়া দেখলে থমকে দাঁড়িয়ে যেতো, হাতের কাছে যা পেতো তাই তাদের দিকে এগিয়ে দিতো। ছোট্টো মানুষ তবুও তার মায়াভরা চোখের দিকে মানুষগুলো এমনভাবে তাকিয়ে থাকতো, মা-বাবা হিসেবে আমাদের মনও ভরে যেতো।
আজ আমার মেয়ে রায়নাও নার্সিংয়ে পড়ছে। ওকে দেখে আমার গর্বে বুক ভরে যায়। ও যখন বলে, “মা, তোমার মতো মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই,” আমি বুঝি আমার জীবনের ছোটো ছোটো মুহূর্তগুলো বৃথা যায়নি। সেবার যে বীজ আমি নিজের জীবনে বুনেছিলাম, তার একটি ডালপালা আমার মেয়ের জীবনেও বিস্তার করছে। রায়নার সঙ্গে আমার বন্ধনের একটি অনন্য দিক এই সেবার উত্তরাধিকার। ও যখন বয়স্ক প্রতিবেশীদের দেখে নিজের হাতে স্যুপ বানিয়ে দেয়, আমি তখন বুঝি- মানবিকতা জন্মগত নয়, এটি লালিত হয়।
৪.
প্রবাস জীবনের গল্প কেবল শ্রম আর সংগ্রামের নয়- তাতে আছে অনুভব, বঞ্চনা, অথচ আলোকিত কিছু স্মৃতি। এইসব অভিজ্ঞতাই আমার কলমে স্থান পায়। সেবার ফাঁকে ফাঁকে আমি লিখতে শুরু করলাম- প্রবাসী নারীর অভিমান, কানাডার শীতের নৈঃশব্দ, কিংবা হাসপাতালের করিডোরে পাওয়া নিঃশব্দ ভালোবাসার গল্প। এক সন্ধ্যায় আমার লেখায় একটি বাক্য ছিল- “নীরব মৃত্যুও কখনও কখনও আপনজনের সাহচর্য চায়”- এই বাক্যটি একজন পাঠককে নাকি প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল তিনি রহনড়ী-এ লিখেছিলেন, “এই বাক্য আমাকে আমার মায়ের কথা মনে করিয়ে দিলো, আপনাকে ধন্যবাদ, কবি।”
যখন আমার কোনো একটি লেখা দৈনিকের পাতায় কিংবা অনলাইন ম্যাগাজিনে ছাপা হয়, পাঠকদের প্রতিক্রিয়া আমার ভিতর নতুন করে আলো জ্বেলে দেয়। কেউ লেখেন- “আপনার গল্পে আমার প্রিয়জনের মুখ দেখি,” আবার কেউ বলেন, “আপনার জীবন আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।” এই প্রতিক্রিয়াগুলো আমার আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। আমি বুঝলাম, একজন সেবিকা হয়েও আমি গল্পকার হতে পারি। কবি হতে পারি। পেশা ও অনুভব একে অপরকে শক্তি দিতে পারে।
ভাষা যখন হৃদয়ের, তখন দেশ সীমান্ত পেরিয়ে তা হয়ে ওঠে শব্দের পালকে। প্রথম যখন আমি এখানে একটি অনুষ্ঠনে গেলাম আমার মেয়ে সবে এক বছরে পা দিয়েছে। রায়নার চঞ্চল চরণ ছুটে বেড়ায় এদিক সেদিক ধরে রাখা খুব কঠিন। আমি স্টেজে আবৃত্তি করছি, মেয়ে আমার কখন মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেদিন আমি মনে মনে ভাবি, মেয়ে পাঁচ বছর না হওয়া অব্দি কোথাও যাবো না। প্রথম প্রথম মনে হতো- এত ঠান্ডা, এত ভিন্ন ভাষা, এত ব্যস্ত জীবনযাত্রায় বাঙালির সংস্কৃতি ধরে রাখা অসম্ভব হবে। কিন্তু যতদিন গেল, বুঝলাম- শুধু বাংলা ভাষায় কথা বললেই সংস্কৃতি বাঁচে না। বাঁচে, যদি কেউ তা চর্চা করে, ভালোবাসে, ছড়িয়ে দেয়। আর আমি সেটাই করেছি। caregiver-এর কাজ শেষে সন্ধ্যায় বা সাপ্তাহিক ছুটিতে আমি ছুটে যেতাম আবৃত্তির অনুশীলনে, শিল্পচর্চার আয়োজনে, বইমেলা কিংবা জাতীয় আন্তর্জাতিক নানা দিবস উদযাপনে।
প্রথমবার কানাডার এক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছিলাম কাজী নজরুলের ‘যদি আর বাশি না বাজে’ কবিতা। চোখে জল এসেছিল। মনে হয়েছিল, আমি যেন সময় আর ভাষার সীমানা পেরিয়ে আমার পূর্বপুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে গেছি। বাংলা উচ্চারণ, ছন্দ, অনুভব- সব মিলিয়ে যখন একটি শব্দ উচ্চারিত হয়, সেটি কেবল ‘সংস্কৃতি’ নয়, তা হয়ে ওঠে ‘অস্তিত্ব’। আমি নানা সময়ে যুক্ত হয়েছি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে, যেখানে: আবৃত্তির কর্মশালা হতো, ছোটোদের জন্য বাংলা ভাষা শেখার ক্লাস হতো, নারীদের শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনার আসর বসতো, বাংলা নাটক ও কবিতা নিয়ে মঞ্চস্থ হতো প্রাণবন্ত সব আয়োজনের মাধ্যমে। বাংলাসাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন গুণী মানুষের জন্মদিন বা মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও থাকার চেষ্টা করি সব সময়।
আমি দেখেছি- আমার চারপাশে থাকা নতুন প্রজন্ম, যারা কখনো বাংলাদেশে যায়নি, তারা কীভাবে একটি কবিতার মাধ্যমে নিজের শিকড় চিনে নিচ্ছে! কারণ আমি বিশ্বাস করি, যে জাতি তার সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখতে পারে, সেই জাতি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
আমি চাই, আমার মেয়ে রায়না-সহ এ প্রজন্মের সব বাঙালি সন্তান জানুক- তাদের একটা অদৃশ্য, অথচ অমোঘ শিকড় আছে, যে শিকড় ভাষায়, সাহিত্যে, শিল্পে গাঁথা। আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি আবৃত্তির প্রতিটি শব্দ, শিল্পের প্রতিটি রেখা, আর সাহিত্যের প্রতিটি পৃষ্ঠা- আমাকে কানাডায় থেকেও বাঙালি করে রেখেছে। আগামী প্রজন্মের জন্য আমি রেখে যেতে চাই এই চর্চার মশাল, যে আলো কোনো শীতেই নেভে না।
প্রথমদিকে যেমন কানাডা ছিল কেবল কঠিন শীত, নিঃসঙ্গতা আর নতুন নিয়মের দেশ। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাটিতে আমি কিছু চিরচেনা জিনিস পেয়েছি- সহমর্মিতা, মানবিকতা আর একধরনের সংবেদনশীলতা। আমার সহকর্মীরা যেভাবে আমাকে সম্মান করেছে, যেভাবে একজন বৃদ্ধা আমার গল্প শুনে চোখ ভিজিয়েছেন- এইসব ঘটনা আমাকে কানাডাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে প্রবলভাবে।
তাই আমার জীবনের গল্প কোনো একক সংগ্রামের নয়- এটি একজন নারী, একজন মা, একজন সেবিকা আর একজন লেখকের মিলিত পথচলা। বাংলাদেশ থেকে কানাডা- এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমি যেমন হারিয়েছি অনেক কিছু, তেমনই পেয়েছি এমন কিছু যা আমাকে নতুন করে গড়ে তুলেছে। আমার পরিচয় আজ কেবল হোসনে আরা জেমী নামে সীমাবদ্ধ নয়- আমি একজন সেবাদানকারী হৃদয়, একজন সংস্কৃতির ধারক, একজন মা, একজন স্বপ্ন-বুননকারী।
আর আজকের এই লেখা? এটি আমি লিখেছি নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য, আবার হারিয়ে যাওয়ার জন্য, আবার ফিরে আসার জন্য। আমি চাই, আমার গল্প কারও মনে সাহস জাগাক- বিশেষ করে তাদের, যারা ভিনদেশে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে কখনো হারিয়ে যায়। তবে একটি বিষয় বলতেই হয়, সব আলোর নিচেই একটা ছায়া থাকে, কখনো তা দীর্ঘ, কখনো ক্ষীণ। কানাডায় এসে আমি যে আলো দেখেছি- স্বাধীনতা, সম্মান, ব্যক্তিস্বাধীনতার যে বিস্তার– তার আড়ালেও রয়েছে এমন কিছু অভিজ্ঞতা, যা আজও আমাকে আহত করে, ভাবায়।
আমরা বাঙালি। আমরা একে অপরের সুখে, সাফল্যে, আনন্দে গর্বিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রবাসে এসে কখনো কখনো আমি দেখেছি- সেই গর্বের জায়গায় জায়গা করে নেয় একধরনের ঈর্ষা। কারো কিছু ভালো করলেই পিছনে পড়ে যায় চুপিসারে বলা কটু কথা, অবজ্ঞা, অথবা উপেক্ষা। কারো সাহিত্যচর্চা, শিল্পকর্ম, মানবসেবা- এগুলো খুব কম সময়েই ‘উল্লাসে উদযাপিত’ হয়, বরং অনেক বেশি সময় ‘নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায়।
আমি অনেক অনুষ্ঠানে গিয়েছি যেখানে উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতির ব্যাখা বেশি শুনেছি। অনেক সময় কেউ পাশে এসে বলেনি, “তোমার কাজটা অসাধারণ!” বরং নীরবে অনুধাবন করেছি, কারো চোখে ‘কেন সে নয়’ প্রশ্নটা। কখনো কখনো মনে হয়েছে, আমাদের সমাজে সাফল্য নয়, সাম্যের ভুল ধারণাকেই অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়।
তবুও আমি আশাবাদী। আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীটা এখনো সৃষ্টিশীল, সহানুভূতিশীল এবং উৎসাহদায়ী মানুষের জন্যই বেঁচে থাকে। আমি আশায় থাকি- আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন এক সমাজ গড়ে তুলবে যেখানে-
-একজন নার্সের চোখে ক্লান্তির বদলে থাকবে গর্বের ছায়া।
-একজন কবির কলমকে বলা হবে “তুমি লেখো, আমরা শুনছি।”
-একজন অভিবাসী নারীর অভিজ্ঞতাকে বলা হবে “তোমার গল্পটা আমাদের আলোকিত করে।”
-আমি চাই, মানুষ শিখুক- সৃষ্টিশীলতা কারো একার সম্পত্তি নয়, এটি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো এক আকাশ- যেখানে একেকটি তারা একেকজনের আলোকচ্ছটা।
এই লেখার মাধ্যমে আমি বলতে চেয়েছি- প্রবাসের অভিজ্ঞতা সবসময় শুধু কষ্ট আর টিকে থাকার গল্প নয়, বরং তা এক ধরনের নির্মাণ, আত্ম-অনুসন্ধান, আর সংবেদনশীলতার ভাষা। যারা লেখেন, যারা ভাবেন- আপনার অভিজ্ঞতা অন্যের আলো হতে পারে। আমার স্বপ্ন একদিন আরও বেশি প্রবাসী নারী তাদের সাহসিকতার গল্প বলবে, সেবার পথে হাঁটবে, এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে আলোর মতো বিলিয়ে দেবে।
আমি নিজে যতবার মিরিয়াম, জন, কিংবা লিলির পাশে বসে তাঁদের শেষ গল্প শুনেছি, ততবার মনে হয়েছে, জীবনের প্রতিটি ছোটো মুহূর্তই গল্প হয়ে ওঠতে পারে, যদি আমরা সেটাকে আলোর মতো ধারণ করি।
কানাডায় আমার পথচলা আজও শেষ হয়নি। আমি এখনো একজন জীবন অন্বেষণকারী মানুষ। আমার ভিতরে প্রতিদিন জন্ম নেয় গল্প, অনুভব, আর নতুন করে নিজের মুখোমুখি হওয়ার সাহস। যদি আমার এই অভিজ্ঞতা একজন পাঠকের হৃদয়ে আলো জ্বালাতে পারে, একটুও সাহস দিতে পারে- তবে আমার লেখা সার্থক।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৬৪। পেশায় সমাজসেবী, আসক্তি কবিতায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- ‘বৃষ্টি করে নেবে’, ‘চিত্রপট’, ‘মিশে আছি অনুভবে’; শিশুতোষ গল্প- ‘বিজয়ের হাসি’, ‘এসো মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনি’; ছড়ার বই- ‘রায়নার বায়না’, ‘বাচ্চা ভূতের কাণ্ড’ এবং ‘ম্যাজিক্যাল ঘড়ি এসএলআর ০০২’; গল্পগ্রন্থ- ‘একটি ভুল এবং সমীকরণ’। পত্রকাব্য- ‘বুনোচিঠি’। ‘শত ভাবনায় বঙ্গবন্ধু’ তার সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ।

