অডিসি – মানুষের আবার মানুষ হয়ে ওঠার মহাকাব্য

লতিফুল কবির

হোমারের অডিসি-র গল্প অনেকের মতো আমার আগে থেকেই জানা। তাই পর্দায় সিনেমাটি দেখতে বসে গল্পের চমক নয়, আমি খুঁজছিলাম অন্য কিছু – হাজার বছরের পুরোনো একটি মহাকাব্যকে আজকের চলচ্চিত্র ভাষায় কীভাবে দাঁড় করানো যায়। যে গল্পের শেষ পরিণতি দর্শকের আগেই জানা, সেই গল্পে উত্তেজনা ধরে রাখা কঠিন কাজ; পরিচালককে তখন কাহিনির মোড়ের ওপর নয়, নির্ভর করতে হয় দৃশ্যের গভীরতা আর চরিত্রের ভেতরের টানাপোড়েনের ওপর। দেখা শেষে মনে হলো, এ যেন হোমারেরই মহাকাব্যের এক ধ্রুপদী চলচ্চিত্ররূপ – সময়ের কোনো প্রলেপ পড়েনি তার আত্মায়। পর্দার আলো-অন্ধকার, সমুদ্রের বিস্তার, চরিত্রের নীরবতা –সবকিছু মিলে মূল কাব্যের গাম্ভীর্যকেই যেন ফিরিয়ে এনেছে।

সবচেয়ে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে ট্রয় ধ্বংসের একটি দৃশ্য। বিজয়ের উন্মত্ততার ঠিক মাঝখানে হত্যা করা হচ্ছে এক কিশোরীকে, আর সেই একই মুহূর্তে দেবীমূর্তির মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। দুটি ঘটনা একই ফ্রেমে বসিয়ে পরিচালক যেন বলতে চেয়েছেন – এই দুই মৃত্যু আসলে এক। দৃশ্যটি তখন আর নিছক যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার ছবি হয়ে থাকেনি। মনে হয়েছে, এ যেন মানুষের নৈতিকতারই মস্তকচ্ছেদ। যে সমাজ নিরস্ত্র এক কিশোরীকে রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজে দেবীমূর্তির মাথা গড়িয়ে পড়াটা নিছক প্রতীক নয়, অনিবার্য পরিণতি। ট্রয় তখন আর কেবল একটি নগরের পতন নয়; মানুষের ভেতরে বাস করা যে মানবিক সভ্যতা, তারও ধ্বংসের প্রতীক হয়ে ওঠে। একটি প্রাচীর ভাঙার শব্দে যেন গোটা মানবচেতনার একটা স্তম্ভ ধসে পড়ছে।

যাঁরা ব্রাড পিট অভিনীত ট্রয় দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে – সেই ছবিতে মানুষের এই ধ্বংসযাত্রায় দেবতাদের কোনো উপস্থিতি ছিল না। সেখানে সবকিছুই মানুষের ইচ্ছা, ক্রোধ আর অহংকারের ফল; কোনো অদৃশ্য শক্তি এসে দায় ভাগ করে নেয়নি। ধ্বংসটুকু ছিল সম্পূর্ণ মানুষের নিজের হাতে গড়া, নিজের কাঁধে বওয়া। ঠিক এ কারণেই পরবর্তী যাত্রায়, অর্থাৎ অডিসি-তে দেবতাদের ফিরে আসা আমার কাছে অর্থপূর্ণ মনে হয়েছে। কারণ ধ্বংস মানুষ একাই করতে পারে; কিন্তু ধ্বংসের পর নৈতিকতা ফিরে পাওয়ার পথটি একা হাঁটা যায় না – সে পথ দীর্ঘ, কঠিন, আর বহু জায়গায় অন্ধকার। দেবতাদের উপস্থিতি এখানে অলৌকিকতার জন্য নয়; বরং মানুষের ভেতরের সেই উচ্চতর কণ্ঠস্বরের প্রতীক, যা ধ্বংসের মুহূর্তে চাপা পড়ে যায়, আর ফেরার পথে আবার জেগে ওঠে।

সেই পথেই অ্যাথেনা তখন আর কেবল একজন দেবী থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন প্রজ্ঞা, সংযম আর মানুষের ভেতরে টিকে থাকা নৈতিক চেতনার প্রতীক। যুদ্ধ যেখানে মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়, অ্যাথেনা সেখানে তাকে আবার মানুষের দিকে টেনে আনার ইঙ্গিত। লক্ষ করার মতো, তিনি অডিসিয়াসকে শক্তি জোগান না, জোগান বুদ্ধি ও ধৈর্য – যেন বোঝাতে চান, ফেরার লড়াইটা তলোয়ারের নয়, আত্মসংযমের। সেই আত্মসংযমে যতবার বিচ্যুতি ঘটে, ততবার অ্যাথেনা তার পাশে দাঁড়ায়। আর অডিসিয়াসের অবচেতন মনও তাঁকে চিনতে ভুল করে না – কারণ ধ্বংসের ভেতর দিয়ে গেলেও তার ভেতরের মানুষটি তখনও পুরোপুরি মরে যায়নি। যে চেতনা এখনও বেঁচে আছে, সে-ই তার আরাধ্যকে চিনে নেয়। অ্যাথেনাকে চেনা তাই বাইরের কোনো দেবীকে চেনা নয়, নিজের ভেতরের হারিয়ে-যেতে-বসা ভালো মানুষটিকে আবার খুঁজে পাওয়া।

শেষ পর্যন্ত অডিসি আমার কাছে কেবল একজন বীরের ঘরে ফেরার গল্প নয়। ইথাকায় ফেরার চেয়েও অনেক বড় হয়ে ওঠে আরেকটি প্রত্যাবর্তন – যুদ্ধ, অহংকার আর ধ্বংসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মানুষের আবার মানুষ হয়ে ওঠার গল্প। ঘরে ফেরাটা এখানে তাই ভূগোলের নয়, আত্মার। অডিসিয়াস সমুদ্র পাড়ি দেন বটে, কিন্তু তার আসল যাত্রা নিজের হারানো মনুষ্যত্বের দিকে। পথের প্রতিটি বিপদ, প্রতিটি প্রলোভন যেন তার ভেতরের একেকটা পরীক্ষা – কতটা ছাড়লে সে আবার নিজের কাছে ফিরতে পারবে, তারই হিসাব। এই একটি জায়গাতেই মহাকাব্যটি ব্যক্তিগত গল্পের সীমা ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

হয়তো এ কারণেই হোমার হাজার বছর পরেও আমাদের সমকালীন। মানুষ বদলায়, নগর বদলায়, অস্ত্র বদলায় – কিন্তু ধ্বংস আর প্রত্যাবর্তনের এই চক্র বদলায় না। প্রতিটি যুগ নিজের মতো করে একটি ট্রয় গড়ে, নিজের হাতে সেটি ভাঙে, তারপর ফেরার পথ খুঁজতে বেরোয়। বিজয়ের উল্লাস মিলিয়ে যাওয়ার পর যে শূন্যতা নেমে আসে, প্রতিটি প্রজন্মকে সেই একই শূন্যতার মুখোমুখি হতে হয় – আর আবিষ্কার করতে হয়, ভাঙা সহজ, গড়া কঠিন।

আর ঠিক এই জায়গায় এসেই সিনেমাটি আমাকে পর্দা থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। মানুষের নৈতিকতার পতন ও প্রত্যাবর্তনের এই মহাকাব্য আমাকে মনে করিয়ে দেয় ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নৈতিক বিপর্যয়ের কথা। ট্রয়ের বিজয়ীদের মতোই সেখানে বিজয়ের উন্মত্ততা নেমে এসেছিল, আর তারপর থেকে চলছে এক দীর্ঘ ধ্বংসলীলা। যে উল্লাস দিয়ে শুরু, তা কখন যেন প্রতিহিংসায়, তারপর নিছক ধ্বংসের অভ্যাসে বদলে গেছে। দেবীমূর্তির সেই বিচ্ছিন্ন মস্তকের ছবিটি তখন আর প্রাচীন গ্রিসের কল্পনা থাকে না; মনে হয় আমাদের সময়েরই কোনো দৃশ্য, আমাদেরই চোখের সামনে ঘটে যাওয়া।

পার্থক্য শুধু এইটুকু – মহাকাব্যে অডিসিয়াসের জন্য একজন অ্যাথেনা ছিলেন, যিনি তাকে ফেরার পথ দেখিয়েছিলেন। আমাদের এই ধ্বংসের পর সেই প্রজ্ঞা, সেই সংযম, সেই ফেরার পথ কে দেখাবে, তা এখনও অস্পষ্ট। এর শেষ কবে হবে, কীভাবে হবে – কেউ জানে না। তবু হোমার আমাকে একটা ক্ষীণ আশা দিয়ে যান: ধ্বংস যত সম্পূর্ণই হোক, মানুষের ভেতরের সেই অবচেতন চেতনা যদি টিকে থাকে, তবে ফেরার পথ একেবারে বন্ধ হয় না। মানুষ আবার মানুষ হয়ে উঠতে পারে – শুধু সেই যাত্রাটুকু দীর্ঘ, আর বড় নিঃসঙ্গ। প্রশ্ন একটাই থেকে যায়: আমরা কি সেই যাত্রাটুকু শুরু করার সাহস রাখি?