আত্মনির্মাণে বন্ধুত্ব : হতে পারে খনিজ উপাত্ত
আমি অভিবাসন নিয়ে কানাডার টরন্টো শহরে আসি ২০০৬ সালে। এসেই মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত ‘বাংলা কাগজ’ নামের একটি রঙিন সাপ্তাহিক পত্রিকা দেখে মনটা ভরে যায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এই শহরে অনিয়মিতভাবে সঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান এবং নাটকও মঞ্চস্থ হয়; সাহিত্য-পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কোনো তথ্য কোনো বন্ধু দিতে পারেননি। তখন টরন্টো থেকে ‘নীলকমল’ ও ‘চিন্ময়ী’ নামে দুটো বাৎসরিক স্মরণিকা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। কমিউনিটির এসব স্মরণিকা নিয়মিত প্রকাশিত হলেও, লেখাগুলো ছিল বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মীয় বিষয় নির্ভর, এবং এসব কাগজে সাহিত্যচর্চার কোনো সুযোগ ছিল না। সামাজিক কোনো নিমন্ত্রণে গেলে বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি, জমি, ব্যবসা ইত্যাদি বিষয়ে গল্প-গুজব কানে আসতো; সাহিত্য-বিষয়ক কোনো আলোচনা কখনো চোখে পড়েনি। ২০০৯ সালে বাবা লোকনাথ আশ্রমের (বিএলএ) সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘অঞ্জলি’র আত্মপ্রকাশ ঘটলে আমি তার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। কমিউনিটির প্রথম সাহিত্য ম্যাগাজিন হিসেবে ‘অঞ্জলি’র ঋদ্ধতা বোদ্ধা পাঠকদের প্রাণিত করে। এই পত্রিকায়, জন্মলগ্ন থেকে, যেকোনো ধর্মাবলম্বী লেখকের লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। শুরু থেকে ‘অঞ্জলি’কে একচেটিয়াভাবে একটি সাহিত্য-পত্রিকার রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে মানসম্পন্ন লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে আমার সাথে যোগাযোগ ঘটে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিভিন্ন বাংলাভাষি লেখক এবং বাংলাদেশের লেখক সুব্রত কুমার দাসের সাথে। তিনি ২০১০ সাল থেকে, বাংলাদেশে থাকা অবস্থায়, ‘অঞ্জলি’তে নিয়মিত লিখছেন। ২০১৩ সালে তিনিও ইমিগ্রেশন নিয়ে টরন্টো চলে আসেন। আসার পর থেকেই তাঁর সাথে আমার একটা বৌদ্ধিক সংযোগ ঘটে। সুব্রত কুমার দাস নামের একজন রবীন্দ্র-গবেষক এই শহরে ঢুকছেন- সংবাদটি আমাকে প্রথম জানিয়েছিলেন স্থানীয় ‘নতুন দেশ’ অনলাইন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর এবং ব্যবসায়ী জয়ন্ত বণিক।
ইতোমধ্যে, সুভেনির স্ট্যাটাস পরিত্যাগ করে লিটারারি ম্যাগাজিনে রূপান্তরকরণে কর্তৃপক্ষ সম্মত হলে, ২০১১ সাল থেকে আমি ‘নীলকমল’ পত্রিকাটিরও সম্পাদনার দায়িত্বভার গ্রহণ করি। এলো ২০১২ সাল, বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ও উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের (১৮৬৫-১৯৩৯) মধ্যকার বন্ধুত্বের শতবার্ষিকী। কেন জানি, এই সময় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করলো। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেই ফেললাম। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘নীলকমল’ সাহিত্য-পত্রিকায়। ‘অঞ্জলি’ ও ‘নীলকমল’ পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম ও আমার লেখালিখি দেখে লেখক, গবেষক ও টিভি সঞ্চালক সুব্রত কুমার দাস ২০১৫ সালের প্রথম দিকে একদিন ফোনালাপকালে আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, আমার কোনো বই প্রকাশিত হয়নি কেন। আমি তাঁকে জানালাম, বিষয়টি আমার মাথায় কখনো আসেনি এবং কর্মব্যস্ত অভিবাস-জীবনে এটি একটি দিবাস্বপ্নও বটে। তিনি বললেন, আপনার প্রকাশিত সাহিত্য-বিষয়ক প্রবন্ধগুলো কম্পাইল করলেই তো একটি গ্রন্থের জন্ম দেওয়া যায়। শুনে পুলকিত হলাম এবং কাজে লেগে গেলাম। শেলি, কিটস, ব্রাউনিং, কোলরিজ, ব্লেক, হেমিংওয়ে, ইয়েটস, এলিয়ট, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত ও জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলোকে একটি গ্রন্থে আবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কাজ গুছাতে গিয়ে এক পর্যায়ে ‘অঞ্জলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত ইয়েটস-বিষয়ক একটি পুরনো প্রবন্ধে পৌঁছানোর পর আমি থেমে গেলাম। এই থেমে যাওয়াটা অনেকটা কম্পিউটার শাটডাউন করার মতো; সপ্তাহ খানেক পর রি-স্টার্ট করলাম। হিসেব করে দেখলাম, লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোকে গ্রন্থবদ্ধ করলে মাত্র একশো পৃষ্ঠার মতো হয়। তাই, গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধি করার জন্যে ইয়েটস-বিষয়ক লেখাটিকে রি-রাইট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। শুরু হলো পাবলিক লাইব্রেরিতে যাওয়া-আসা এবং অ্যামাজন ও পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কেনাকাটা। অনুসন্ধানের গতি ক্রমশ বাড়তে থাকলো। গবেষণার এক পর্যায়ে এমন কিছু তথ্য বেরিয়ে আসতে লাগলো, যা মাস্টার্স পর্বে ইয়েটসকে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে নিজেও পাইনি, শিক্ষকদের মুখ থেকেও কখনও বের হয়নি। মাথায় অন্য কিছু চেপে বসলো।
২০১৫ সালের জুন মাস। অনুজপ্রতিম সুব্রত কুমার দাসের সাথে একদিন বসলাম। তাঁকে বললাম, আয়োজক ও উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ইয়েটসের সাহিত্য-কর্মের ওপর একটি আলোচনা সভার আয়োজন করতে চাই। তিনি জানতে চাইলেন, কোনো বাংলাভাষি লেখককে বাদ দিয়ে হঠাৎ আমার মাথায় ইয়েটসকে নিয়ে এই ভাবনাটি কেন এলো। আমি বলতে শুরু করলাম:
২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে স্থাপন করা হয়েছে ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পাওয়া রবীন্দ্রনাথের একটি ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি। এটি আইরিশ মাটিতে কোনো অ-আইরিশ ব্যক্তির প্রথম এবং একমাত্র মূর্তি। আবার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ইয়েটসের বন্ধুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে আইরিশ সরকার ভারতকে ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের একটি আবক্ষ মূর্তি দান করে, যেটি মুম্বাইয়ের ন্যাশনাল সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্টস ভবনের সামনে উন্মোচন করা হয়। একই বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের জন্মের ১৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভারতের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরেকটি আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করা হয় ইয়েটসের জন্মস্থান আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি স্লিগোতে।
উপর্যুক্ত তথ্যগুলো উপস্থাপন করে, আমি সুব্রত’দাকে বললাম, যে আইরিশ কবি ইয়েটস ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র ভূমিকা লিখে দিয়ে একজন অপরিচিত রবীন্দ্রনাথকে পশ্চিমা বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে অবদান রেখেছিলেন, আমরা কি তাঁদের দুজনের বন্ধুত্বকে কোনোভাবে সম্মান জানাতে পারি না? রবীন্দ্রনাথের মূর্তিই আইরিশ মাটিতে কোনো অ-আইরিশ ব্যক্তির প্রথম এবং একমাত্র মূর্তি; রবীন্দ্রনাথের প্রতি আইরিশদের এমন ভালোবাসার বিষয়টি জানার পরও কি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিমিত্তে কানাডার মাটিতে ‘কিঞ্চিৎ’ কিছু করতে পারি না? এরপর, আমাকে আর কিছু করতে হয়নি। দাদা ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত হলেন। পরের কর্মযজ্ঞের শতভাগ তিনি একাই সম্পাদন করেছেন।
ইতোমধ্যে আমি ইন্টারন্যাশনাল ইয়েটস সোসাইটির সদস্যপদ গ্রহণ করেছি। সুব্রত কুমার দাস সিদ্ধান্ত নিলেন, সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫ টরন্টোর অ্যালবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি অডিটোরিয়ামে বিকেল ৫টায় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং এই অনুষ্ঠানে ইয়েটসের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধুত্বের শতবার্ষিকীও উদযাপন করা হবে। সিদ্ধান্ত হলো, একক স্পন্সর হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে না পাওয়ার কারণে, অনুষ্ঠানের আয়োজক হিসেবে থাকবে ২০০৩ সালে সুব্রত কুমার দাসের প্রতিষ্ঠিত বাংলা উপন্যাসের প্রথম ওয়েবসাইট বাংলাদেশি নভেলস (www.bdnovels.org)। বিষয়টি আমি ইয়েটস সোসাইটিকে অবহিত করলে তাঁরা উদ্যোগটির প্রশংসা করেন এবং অনুষ্ঠানের আগেই একটি শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়ে দেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে সিনিয়র কবি অশোক চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে আয়োজিত হয় ইয়েটসের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি। প্রতিকূল আবহাওয়ায় জর্জরিত ডিসেম্বরের ঠান্ডা ও তুষারপাতের মধ্যেও সাহিত্য মোদী দর্শক-শ্রোতাদের সঠিক সময়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি অতিক্রম করেছিল আমাদের প্রত্যাশার সীমানা। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাভাষি লেখকদের উদ্যোগে এই শহরে প্রথমবারের মতো ইয়েটসের জন্মদিন পালনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল অন্যরকম এক উদ্দীপনা। ইয়েটসের সাহিত্য-কর্ম, ইয়েটস-রবীন্দ্রনাথ বন্ধুত্ব, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির পিছনে ইয়েটস-রচিত ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র মুখবন্ধের গুরুত্ব ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনাকালে সেদিনের অডিটোরিয়ামটিকে ঋদ্ধ করেছিল বক্তাবৃন্দের পর্যবেক্ষণ-মাত্রা ও ইতিহাস-সমৃদ্ধ তথ্য প্রবাহ। টরন্টোর সাহিত্য-পাড়ায় ইতিহাস নির্মাণকারী এই অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কবি আসাদ চৌধুরী, রাজস্থানের এস. এন. গার্লস পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপ্যাল ড. দিলীপ চক্রবর্তী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. সুজিত দত্ত, মুক্তচিন্তক আকবর হোসেন ও সংগঠক ফারহানা পল্লব। স্বাগত ভাষণে লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাস নোবেল বিজয়ী উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের কাব্যিক মহিমা এবং সাহিত্যে প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ইয়েটসের বন্ধুত্বের ওপর আলোকপাত করেন। আলোচনা, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ইয়েটসের মূল ইংরেজি ও অনূদিত কবিতার আবৃত্তি এবং অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ইয়েটস সোসাইটির পাঠানো বার্তা পাঠ করে শোনানোর মতো ললিত নির্ঘণ্টে কেটে যায় ৫৮ জন সুশীল মানুষের প্রায় তিনটি ঘণ্টা।
ইয়েটসের ‘Lida and the Swan’ (লিডা অ্যান্ড দ্য সোয়ান), ‘The Second Coming’ (দ্য সেকেন্ড কামিং) এবং ‘Aedh Wishes for the Cloths of Heaven’ (আয়েধ উইশেচ ফর দ্য ক্লথস অব হেভেন) টাইটেলের তিনটি মূল কবিতা আবৃত্তি করেন এলিনা মিতা, জোয়াকিম ভিক্টর গোমেজ ও পরমা সাইবা। অনূদিত কবিতাগুলো পাঠ করে শোনান শেখর গোমেজ, কল্যাণীয়া পূরবী ও মানিক চন্দ। কবিতাগুলো অনুবাদ করেন যথাক্রমে নাফিজা নাওয়ার, রেজভী জামান এবং সুজিত কুসুম পাল। আন্তর্জাতিক ইয়েটস সোসাইটির বার্তাটি পাঠ করেন সজিব চৌধুরী। নির্ঘণ্টের ফাঁকে ফাঁকে ভ্যালেন্টিনা ভৌমিক পরিবেশন করেন ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে বাছাইকৃত কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত। পুরো অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম আমি নিজেই। অনুষ্ঠানের অঙ্কুর থেকে ফলন পর্যন্ত যাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন তাঁরা হচ্ছেন শওগাত আলী সাগর, ড. সুজিত দত্ত, ব্যারিস্টার জয়ন্ত সিংহ, অলোক চৌধুরী, ও ড. সুশীতল চৌধুরী; আরও কয়েকজন ছিলেন যাঁদের নাম মনে করতে পারছি না।
সুদীর্ঘ দশ বছর পর আজ আমার ভাবতে ভালো লাগছে, সুব্রত কুমার দাস নামের মানুষটি অভিবাসন নিয়ে কানাডায় না আসলে এই ধরনের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মযজ্ঞ টরন্টোতে সম্পন্ন হতো না এবং ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে আমার ‘ইয়েটসের কবিতায় নারী ও নিকুঞ্জ’ গ্রন্থেরও জন্ম হতো না। এই অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত আমার পরিকল্পনা ছিল উপরে উল্লিখিত দশজন সাহিত্যিককে নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলোকে একত্রিত করে একটি গ্রন্থ বানাবো। প্রকাশিতব্য গ্রন্থের কলেবর ছোটো হচ্ছে দেখেই আমি ইয়েটসকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটির সাইজ বড়ো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। লাইব্রেরি এবং অনলাইনে তাঁকে নিয়ে অনুসন্ধানী সময় কাটাতে গিয়ে আমি ইয়েটসের অনুরক্ত হয়ে পড়লাম; ইন্টারন্যাশনাল ইয়েটস সোসাইটির সদস্য হলাম; সোসাইটির একান্ত ওয়েবসাইটটি আমার জন্যে উন্মুক্ত হয়ে গেলো। গবেষণাকর্মের কোনো এক সময় রবীন্দ্রনাথের কাছে ইয়েটসের লেখা একটি চিঠি চোখে পড়া মাত্রই আমার নিজের ভিতরে একটা দৃঢ় প্রতীতি জেগে উঠলো- প্রবন্ধ সঙ্কলন নয়; আমি ইয়েটসের বিশাল কাব্যিক জীবনের একটি ক্ষুদ্রতম অংশের ওপর রিভিউ করবো এবং এই রিভিউকর্মকেই চূড়ান্তভাবে গ্রন্থবদ্ধ করবো। লেখক নির্মাণের কারিগর হিসেবে খ্যাত সুব্রত কুমার দাসকে আমার প্রত্যয়ের কথা জানালে তিনি আমাকে অভিনন্দিত করেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা ইয়েটসের যে চিঠিটি আমাকে এইরকম একটি চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত নিতে হিল্লোলিত করেছিল সেটি এই প্রবন্ধের পাঠকের জন্যে নিচের ক্যানভাসে প্রক্ষেপণ করলাম-
২৫ জুলাই ১৯১২
… সামনের মঙ্গলবার আপনি আমাদের সাথে লাঞ্চ করবেন। ইসল্ট গনকে আমি সাথে নিয়ে আসবো। প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রূপবতী এই মেয়েটি এখন তার কৈশোরে বিচরণরত। তার বুদ্ধিবৃত্তির সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে আমি তাকে আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। বাড়ন্ত বয়সে আপনার পরামর্শ তার জন্যে সহায়ক হবে। এই সাক্ষাতের ব্যাপারে ম্যাডাম মডগণ উদগ্রীব হয়ে আছেন। যদি মঙ্গলবার দুপুরবেলা আপনি সময় করতে না পারেন, আমাকে জানাবেন। একদিন তাকে বিকেলে আধঘণ্টার জন্যে আমি আপনার কাছে নিয়ে আসবো। দেখলে আপনি পছন্দ করবেন। এই রকম প্রতিভাসম্পন্ন মেয়ে আমি কখনো দেখিনি। সে হচ্ছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাণময় মানুষগুলোর একজন। বয়স ঊনিশ চলছে। এই বয়সে সে ইতোমধ্যে ঔপন্যাসিক ফ্লবার্টের সব বই শেষ করেছে। আমার মনে হয়, মেয়েটি এখন বাংলা শেখার স্বপ্ন দেখছে। একেবারে ছোটোকাল থেকেই আমি তাকে চিনি।…
উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস
কোনো কোনো পাঠকের জন্যে হয়তো এটি চমক হবে, যদি আপনারা জানেন যে, ফরাসিভাষি এই ইসল্ট বাংলা ভাষা রপ্ত করে রবীন্দ্রনাথের বাংলা কবিতার নির্যাস সরাসরি আহরণ করেন। শুধু তা-ই নয়, ইসল্ট বাংলা ভাষায় এত দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু বাংলা কবিতা সরাসরি ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন। মেয়ের একাগ্রতা দেখে তার মা আইরিশ বিপ্লবী নারী মডগণ ইয়েটসকে অনুরোধ করেছিলেন, ইসল্টের সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে। প্রটেস্ট্যান্ট হয়েও ব্রিটিশপন্থি রাজনীতিক কবি ইয়েটস ভালোবাসতেন এই মডকে যিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী একজন ক্যাথলিক বিপ্লবী।
কিন্তু না, স্বপ্ন পূরণ করা কিংবা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়, যদি কোনো স্বাপ্নিক কিংবা চ্যালেঞ্জারের জীবনে একজন সুব্রত কুমার ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত না হন। দশ বছর আগে আমি বাংলা কিবোর্ডে দক্ষ ছিলাম না; তখন সব পাণ্ডুলিপি তৈরি করতাম কাগজ ও কলম দিয়ে। যেহেতু হাতে সময় একেবারেই নেই, দাদা স্ব-প্রণোদিত হয়ে বিজয় কিবোর্ডে টাইপ করার দায়িত্ব নিলেন। পৃষ্ঠা পঞ্চাশেক লেখা হলেই দৌড় দিয়ে তাঁকে দিয়ে আসতাম। এভাবে প্রায় ৬শ’ পৃষ্ঠার একটা পাণ্ডুলিপি তিনি টাইপ করেছেন। মাঝখানে আমার কাজের গতি খুব বেড়ে গেল, যেদিন তিনি জানালেন- বই খুব ভালো হচ্ছে এবং ভাবের প্রবাহ, তথ্যের বিন্যাস, শব্দের চয়ন ও ভাষার প্রকরণ তাঁর পছন্দ হয়েছে। শেষের দিকে কাজ থেকে দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দৈনিক প্রায় ১৮ ঘণ্টা ব্যয় করে শেষ পর্যন্ত জীবনের প্রথম গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সঠিক সময়ে চূড়ান্ত করতে সক্ষম হই।
গ্রন্থকার হিসেবে আমার আত্মপ্রকাশে ত্রিশ গ্রন্থের লেখক সুব্রত কুমার দাস একজন উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি আমার সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় অভিজ্ঞতার সাথে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণোদনার সংযোগ ঘটিয়ে আমাকে গ্রন্থকার হিসেবে নির্মাণে একচেটিয়া ভূমিকা পালন করেছেন। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। শেষ কথা- বন্ধু নির্বাচনে বৌদ্ধিক হতে পারলে সেই বন্ধুত্ব হতে পারে নিজেকে বিনির্মাণে অতি আবশ্যকীয় একটি খনিজ উপাত্ত।
লেখক পরিচিতি
জন্ম (১৯৫৫) চট্টগ্রামে। পড়াশোনা ইংরেজি সাহিত্য (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট এবং ইনফরমেশন সিস্টেম ম্যানেজমেন্টে। কর্মজীবন শুরু দৈনিক ‘স্বাধীনতা’য় ফিচার এডিটর হিসেবে। ১৯৮০ সালে যোগদান করেন বহুজাতিক ফাইজারে। টরন্টোতে অভিবাস ২০০৬ সাল থেকে। ইন্ডিজেনাস ক্যানাডা বিষয়ক অধ্যয়ন (আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়)। কর্মরত বিজিআইএস-এ। ‘ইয়েটসের কবিতায় নারী ও নিকুঞ্জ’ গ্রন্থের প্রণেতা। সদস্য: আন্তর্জাতিক ইয়েটস সোসাইটি এবং মার্গারেট অ্যাটউড সোসাইটি।

