আমার টরন্টো
কানাডাতে আমার অভিজ্ঞতা মূলত টরন্টোভিত্তিক। সামান্য কিছু অংশে মন্ট্রিয়ল ও ভ্যাঙ্কুভার আছে। কানাডা আমার কাছে ও অনেকের কাছে স্বপ্ন এবং স্বপ্ন পূরণের দেশ ছিল। তবে এখানে এসে অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেকের স্বপ্ন পূরণ হয় আবার অনেকের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। অনেক জিনিসের ওপর তা নির্ভর করে, যেমন- আগমনকালের পরিকল্পনা, বয়স, স্কিল, শিক্ষা, পরিশ্রমের ক্ষমতা, উদ্যোগ, অর্থ, সাপোর্ট, ভিসা ক্যাটাগরি ইত্যাদি। হুট করে আসা উচিৎ নয়। এখানে আমার অভিজ্ঞতা খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। এগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো অপ্রচলিত অভিজ্ঞতা আছে কি না, তা বোঝা যাবে গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পরে।
বাংলাদেশ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে শারদীয় দুর্গা পূজার কয়েকদিন আগে আমি ও আমার স্ত্রী টরন্টোতে আগমন করি। সেদিন সকালে টরন্টোর আকাশে ঝলমলে রোদ ছিল। প্লেন পিয়ারসন এয়ারপোর্টের মাটি ছুঁতে ছুঁতে সকাল ৯টা বাজে। প্লেন থেকে নেমেই প্রথমবারের মতো নতুন অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার স্বাদ পাই এভাবে- পৃথিবীর উল্টো দিকে আরেক প্রান্তে চলে এসেছি! এখানে সকাল আর ওখানে সন্ধ্যা নামছে! এয়ারপোর্ট ভবনে ঢুকে মনে হলো, যাত্রাপথে ফেলে আসা দুবাই এয়ারপোর্টের মতো এটি জৌলুসে ভরপুর নয়, তবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা কোনো অংশে কমও নয়। সেবিকারা দ্রুতগতিতে হুইল চেয়ার ঠেলছিলেন। বারবার হাত বদল হতে থাকি ও একাধিকবার একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন হই। সুবিশাল ভবনের ভিতরে মনে হচ্ছিল হারিয়ে যাচ্ছি না তো!
ইমিগ্রেশন শেষে বাইরে এসে অনেকদিন পর নাতিকে দেখতে পেয়ে খুবই ভালো লাগে। এদিকে স্টলারের ভেতরে আরেক রহস্য! সদ্য পৃথিবীতে আসা নাতনি মাথায় রঙিন ফিতে বেঁধে আমাদের অবাক চোখে দেখছে! দৃষ্টি দেখে মনে হলো, আমরা তার আপনজন বলে সনাক্ত করতে পারছে। মেয়ে ও মেয়েজামাই তো আছেই। অতঃপর গাড়িতে চড়ে বিশাল হাইওয়ে দিয়ে মেয়ের বাসায় যেতে যেতে জানালার কাচ দিয়ে দৃশ্য দেখছিলাম। আকাশচুম্বী দালান বিশেষ নাই; একতলা দোতালা বিশাল ভবন সব আরাম-আয়েশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শীতের দিন শুরু হয়ে গেছে তখন। তবে গাড়ির ভিতরে হিটিং মেশিনের উষ্ণতা। জেট্ ল্যাগ কাটতে দুদিনের বেশি সময় লাগেনি। তখন শুধু ঘুম আর ঘুম।
প্রথম অভিজ্ঞতা হলো টরন্টোতে শারদীয় দুর্গোৎসব। এখানে বাঙালিদের তিনটি প্রধান মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। অঞ্জলি দেওয়া, প্রসাদ গ্রহণ, ঢাকের শব্দ ও সমবেত বাঙালিদের বাংলা ভাষায় কথা বলা আমাকে যেন বুঝতে দেয়নি আমি হাজার হাজার মাইল দূরে আছি! এই পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করে। তবুও হোম-সিকে ভুগতাম। দেশের পূজার কথা মনে হতো। আকাশে প্লেনের শব্দ শুনলেই মনে হতো ফিরে যাই নিজ বাসভূমে।
দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা হলো, এখানকার হ্যালোইন উৎসব। এ বিষয়ে আগে কোনো ধারণা বা অভিজ্ঞতা ছিল না। থিম হলো- মৃতদের পবিত্র আত্মার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে একটি সন্ধ্যা উদযাপন করা। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখে কানাডায় এই উৎসব পালিত হয়। কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়ির লনে ভূত পেত্নী ইত্যাদির কাঠামো বসানো হয়। সন্ধ্যায় আলো জ্বললে আর নিভলে একটা আধিভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়! সঙ্গে হরর মিউজিক! দিনের আলো নিভতে না নিভতেই বাচ্চারা মায়েদের হাত ধরে শীত-পোশাক গায়ে দিয়ে প্রতিবেশীদের বাসায় বাসায় গিয়ে চকোলেট ও ক্যান্ডি সংগ্রহ করে। গৃহকর্তারা প্রস্তুত থাকেন চকোলেট নিয়ে। শীতে অনেক বাচ্চার নাক দিয়ে সর্দি ঝরলেও তারা ক্যান্ডি সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। আসলে তখন একটা স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
কানাডাতে শীতের অভিজ্ঞতা কল্পনার বাইরে ছিল। জীবনে প্রথম তুষারপাত চাক্ষুষ দেখি ঐ বছর ডিসেম্বর মাসে। একসময়ে পাহাড়-সমান বরফ দেখে আশ্চর্য হই। কঠিন শীতে মনে হতো, ধারালো ছুরি দিয়ে কেউ যেন কেটে কেটে বিনা রক্তপাতে মাংস খুলে নিচ্ছে! মাঝে মাঝে ফিলস্ লাইক মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হয়ে যেত। বরফ ঝড় হতো মাঝে মধ্যে। প্রচণ্ড বাতাসে সবকিছু ওড়ে যায় তখন। সামারে ছিল ভিন্ন চিত্র। সবাই সামার উপভোগে ব্যস্ত। তবে মাঝে মাঝে তাপমাত্রা প্লাস ৪০ ডিগ্রিতে ওঠে যায়। টরন্টো এসে নিজ প্রয়োজনে একজন ল’ ইয়ার-এর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। উনার নাম, ডগলাস। তিনি ইমিগ্রেশন বিষয়ে খুব দক্ষ ও প্রতিভাবান একজন আইনজীবী। টরন্টো বাঙালি সমাজে জনপ্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশি ও বাঙালিদের নিয়ে কাজ করতে করতে ডগলাস সাহেব বাংলা কথাবার্তা আন্দাজ করতে পারতেন। আমি উকিল জেনে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন
একদিন আমাকে হঠাৎ বলে ফেললেন, এখন উকিল টু উকিল কথা হবে! ডগলাস সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী আমি আমার বয়ানি একটা নোট বইতে ইংরেজিতে লিখে নিয়ে যাই। এতে আর্জি বা বেসিস অব ক্লেইম তৈরিতে উনার সুবিধা হয়েছিল বলে আমাকে বলেছিলেন। তিনি ক্লায়েন্টদেরকে যথেষ্ট সময় দিতেন। ধৈর্য ধরে তাদের কথা শুনতেন। পেশাগত দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সততায় ডগলাস ছিলেন মহিমান্বিত। রসবোধ ছিল উচ্চ মার্গের। ওর হাত ধরে আমাদের প্রথম ধাপ সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছিল। পারিশ্রমিকের কিছু অর্থ কাজে না লাগায় তিনি তা ফেরত দিয়ে দেন। পরবর্তীকালে অন্য একজনের সঙ্গে আমার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ডগলাস সাহেব বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করছেন বলে শুনেছি।
এখানে ফ্যামিলি ডাক্তার পাওয়া আরকটি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের ফ্যামিলি ডাক্তার যিনি তার নাম, ডাক্তার আরিফ। বাংলাদেশি। একেবারে যেন নিজের ফ্যামিলি মেম্বার। খুব অমায়িক মানুষ। এত ব্যস্ততার মাঝে কোনোদিন কারোর ওপর রাগ করতে দেখিনি। ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ। রোগ নির্ণয়ে ও ওষুধ নির্ধারণে চমৎকার। ওর ফার্মেসি অংশে মহিউদ্দিন ভাই আরেকজন দক্ষ ও ভালোবাসার মানুষ। উনাদের পেয়ে আমরা খুব খুশি।
টরন্টো এসে প্রথমে যে বাসায় ছিলাম তা স্কারবরো সিটির হেরন পার্ক অঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে থাকা অবস্থায় আমার জীবনে একটি টার্নিং পয়েন্ট জাতীয় অভিজ্ঞতা হয়। ঐ এলাকায় লরেন্স এ্যাভিনিউর উপরে একপাশে হেরন পার্ক ব্যাপটিস্ট চার্চ (hpbc) অবস্থিত। দিনটি ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৫ তারিখ। যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন বা বড়োদিন। কানাডা জুড়ে উৎসব চলছিল তখন। বেলা ১১টা’র দিকে একটা সূত্র ধরে ঐ চার্চের গেদারিং হলে প্রবেশ করি। যার উছিলায় ঢুকেছিলাম তিনিও কাউকে চেনেন না। বাইরে তুষারপাত হচ্ছিল। ভিতরে আরামদায়ক উষ্ণতা। টেবিলে টেবিলে আনন্দঘন পরিবেশে সবাই কথাবার্তা বলছেন। এই সময় একজন আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে নিজের পরিচয় দেন। উনার নাম, ডেভিড ফিলিপস্। আমি নিজের পরিচয় দিই। ডেভিড উনার স্ত্রীর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। নাম, ক্যাথি। হাত মেলাই তাদের সঙ্গে। কী অমায়িক ব্যবহার তাদের! অনেকের সঙ্গে পরিচিত হই। সবাই আন্তরিক। এমন সময় ড্রেস পরিহিত সান্তাক্লজ হলে প্রবেশ করলে মৃদু গুঞ্জন ওঠে হল জুড়ে। সান্তাক্লজ সবাইকে চকোলেটের বাক্স বিতরণ করলে সবাই তাকে উইশ করেন। এদিকে চা কফি স্ন্যাকস্ ফ্রুটস পিঠা খাওয়া চলতে থাকে। এরপর সঙ্গীত ও প্রার্থনা শেষে গরম ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু লাঞ্চ পরিবেশিত হয়। তখন থেকে মাঝে মাঝে চার্চে ও গেদারিং হলে আমার যাতায়াত শুরু হয়ে যায়। এদিকে ডেভিড ও ক্যাথির সঙ্গে মেলামেশা বাড়তে বাড়তে কখন যে আমরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যাই তা বলতে পারিনি। আমার স্ত্রীর সঙ্গেও তাদের বন্ধুত্ব হয়। এরপর নিয়মিত চার্চে ও গেদারিং হলে যেতে থাকি। সপ্তাহে প্রতি রবিবার ও বৃহষ্পতিবার। ডেভিড-ক্যাথি দম্পতি দীর্ঘদিন বিভিন্ন দেশে ও কানাডাতে অভিবাসী এবং দুস্থ লোকদের নিয়ে সেবামূলক কাজে ব্রতী আছেন। তাদের হৃদয় সর্বদা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। ডেভিড-ক্যাথি থেকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে পারি ও হৃদয়ে কীভাবে তা ধারণ করতে হয় তা শিখি। তারা খুব শীঘ্রই টরন্টো ছেড়ে দূরের আরেক শহরে চলে যাবেন। এই লেখা যখন ছাপা হবে তখন তারা থাকবেন অনেক দূরে। তবে হৃদয়ে থাকবেন চিরদিন।
হেরন পার্কের বাসায় আরেকটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল যা দেশে থাকতে নিয়মিত হতো। তবে উন্নত দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে তা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। সেদিন বাসায় নাতিন-এর মুখেভাত অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে একটা পার্টি চলছিল সন্ধ্যাবেলায়। খাবার পরিবেশন হয়েছে সবেমাত্র। হঠাৎ ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এলো। কারেন্ট চলে গেছে। এখানেও কারেন্ট যায়, বিশ্বাস হচ্ছিল না! ঘরে মোমবাতি নেই। উৎসব উপলক্ষ্যে আনা ছোটো মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ চলছিল। আধাঘণ্টা চলে গেছে কারেন্টের খবর নাই। ফোনাফুনিতে জানা গেল ট্রান্সফরমার বার্স্ট হয়েছে। এখানেও এই কাণ্ড ঘটে, তা ভাবতে পারি না! তবে দেশের মতো বার্স্ট হওয়ার প্রচণ্ড আওয়াজ শোনা যায়নি।
২০১৯ সালে বাসা পরিবর্তন করি এবং ঐ সামারে মন্ট্রিয়লে বেড়াতে যাই। সেখানে একজন প্রিয়জনের সান্নিধ্যে প্রায় দশদিন ছিলাম। পরিচ্ছন্ন সুন্দর শহরে আনন্দঘন পরিবেশে দিন কাটিয়েছি। বাঙালি সমাজে টরন্টো ও মন্ট্রিয়ল দুই জায়গাতেই নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোর পুরাতন ভালোলাগার রীতিনীতি চালু আছে। মন্ট্রিয়লে পাহাড়ের ওপরে একটি বিশাল দুর্গ আকৃতির চার্চ আছে যা দেখতে প্রতিদিনই লোকের ভীড় হয়। মন্ট্রিয়ল কানাডার কুইবেক প্রভিন্সের অন্তর্গত। এখানে ফ্রেঞ্চ ভাষা প্রধান। বেশ আগে মন্ট্রিয়ল কানাডাতে থাকবে কি না তা নিয়ে রেফারেন্ডাম বা গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। স্বল্প ভোটের ব্যবধানে মন্ট্রিয়ল কানাডাভুক্ত থেকে যায়। সেই আবহে অনেক বাংলাদেশি লোক মন্ট্রিয়ল থেকে টরন্টোতে চলে আসেন এবং এখানে স্থায়ী হন। বিশাল কুইবেক প্রভিন্স আলাদা হয়ে গেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডার গুরুত্ব ও বিশালত্ব কিছুটা কমে যেত বৈ কি!
কানাডা, বিশেষ করে টরন্টোতে বেগম পাড়া একটি বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ নাম। দেশে থাকতেই শুনে আসছি এর নাম। দেশের অর্থ আত্মসাৎকারী লুটেরাগণ টাকা পাচার করে টরন্টোর বেগম পাড়ায় আলিশান বাড়ির মালিক হয়েছেন এই ধারণা ছিল। এখানে এসে ধারণা বদলালেও মূল জিনিস ঠিক আছে। এখানে নির্দিষ্টভাবে অফিসিয়েলি বেগম পাড়া বলে কিছু নেই বা সেখানে সারি সারি সেরকম বাড়িঘরও নেই। কিন্তু টরন্টো বা ভিন্ন ভিন্ন শহরে সেই সব লোকের আলিশান বাড়ি আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। একটি বাড়িই একটি বেগম পাড়া। বেগম পাড়া আসলে একটি প্রতীকী শব্দ।
টরন্টোতে সাধারণের জন্য বর্তমান কালে বাড়ির মালিক হওয়া বেশ কঠিন। আগে ধারণা ছিল সহজে বাড়ির মালিক হওয়া যায়। কারণ, ব্যাংক লোন দেয় সহজেই। বিষয়টি আংশিক সত্য। জব্ বা ইনকামের সোর্স না থাকলে লোন পাওয়া কঠিন। আর লোন পেয়ে বাড়ি কেনার পর শুরু হয় আসল পীড়া বা কষ্ট। লোন বা মর্টগেজ পরিশোধ করতে করতে কোনোদিন যে বাড়ির মালিক হবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই! এরমধ্যে বাড়তি আয়ের জন্য একাধিক বাড়ি অনেকেই কিনে ফেলেন। সবশেষে এমন অবস্থা হয় যে, সব বাড়ি বিক্রি করতে হয়!
টরন্টো থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের মার্চ মাসে কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী আঘাত হানে। করোনাকালে ঘরবন্দি সময় কেটেছিল। নিয়মিত রুটিন ছিল টিভিতে করোনা খবর ও গ্রাফ দেখা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। কত প্রিয়জন চলে যাচ্ছেন অকালে। খুব বিষণ্ণ থাকতাম। মনে হতো সব মানুষ মারা যাবে। সবাই অধীর আগ্রহে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকেন। ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে স্বস্তি নেমে আসে জনমনে। ভ্যাকসিন গ্রহণ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়া ছিল বাহাদুরী কাজের মতো ! করোনাকালে একটা নীরব বিপ্লব সাধিত হয়ে যায় নীরবে। পৃথিবী ইন পারসন জগৎ থেকে পূর্ণ ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করেছিল সেই সময়ে। একটা অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় এভাবে- প্রতি একশ বছর পরপর আসা মহামারীর তাণ্ডব দেখে গেলাম চাক্ষুষ। ইতোমধ্যে এর ভয়াবহতা মানুষ কিন্তু ভুলতে শুরু করেছে!
এখানে লটো বা লটারি খেলা একটা নেশা। তবে এতে ফাঁকি আছে মনে হয়! প্রথমে বিশ ডলার পেয়ে যাবেন ঠিকই। তারপর আর খবর নেই! কিন্তু ইতোমধ্যে অনেকেই নেশাগ্রস্ত হয়ে যান ও টিকিট কিনে কিনে লস্ দিতে থাকেন।
মাল্টিকালচার খুব পরিচিত শব্দ কানাডার সর্বত্র। পৃথিবীর এমন কোনো দেশের মানুষ নেই যে- কানাডাতে বা টরন্টোতে পাবেন না। সবার সঙ্গে মেলামেশায় অনেক নতুন বিষয় জানা যায়। একদা ধারণা ছিল আফ্রিকার মানুষ কালো ও জংলি! কিন্তু তাদের সঙ্গে মিশে বিপরীত ধারণা পেয়েছি ও মনে মনে আগের ধারণা নিয়ে লজ্জিত হয়েছি। বিভিন্ন কালচারের মানুষের সঙ্গে মিশলে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। এখান আমাদের মেলামেশা মূলত বাঙালি ও বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেকেই দলাদলিতে বিভক্ত! অনেকে পার্টি নিয়ে মত্ত! তবে ইতিবাচক উদ্যোগও আছে।
যে প্রজন্ম এখানে জন্মেছে বা বেড়ে ওঠেছে তারা বাংলাভাষা ও বর্ণমালা জানে না। কিন্তু ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করে বাংলাতে গান কবিতা লিখে তা পরিবেশন করে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষা শিক্ষার একটা উদ্যোগ প্রয়োজন। টরন্টোতে পাবলিক লাইব্রেরি একটি চমৎকার জিনিস। ফ্রিতে জ্ঞানের ভাণ্ডার আপনার দুয়ারে উপস্থিত। অনেক শাখা আছে শহর জুড়ে। কিছু শাখাতে বাংলা বই পাওয়া যায়। লাইব্রেরিতে বসে ও বাসায় বই এনে পড়ার অবারিত সুযোগ। এছাড়া লিটিল ফ্রি লাইব্রেরি আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন একটি অভিজ্ঞতা। টেইক ওয়ান অ্যান্ড লিভ ওয়ান পদ্ধতি। বিভিন্ন পাড়ায় অনেক সহৃদয় বাড়ির মালিক লনে কাঠের খুঁটি পুঁতে মাথায় একটি কাঠের ডালা দেওয়া বাক্স লাগিয়ে দিয়ে সেখানে অনেক বই রেখে দেন। পথচারীরা সেখান থেকে পছন্দের বই নিয়ে পড়ে অন্য একটিতে ফেরত দিতে পারেন। খুবই চমৎকার একটি ব্যবস্থা।
এখানে ফুড ব্যাংক খুব ভালো একটি উদ্যোগ। অনেক পরিবার ও লোক এর উপরে নির্ভরশীল অনেকখানি। তবে মাঝে মাঝে মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার দেখা যায়। এতে মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালের সামারে ভ্যাঙ্কুভার বেড়াতে যাই। সেখানে আমার ছোটো মেয়ে ও জামাই থাকে। ভ্যাঙ্কুভার শহর যেন পাহাড় আর সমুদ্রে মাখামাখি। বিশাল পোর্টে বিশাল জাহাজ আর ক্রুজ শিপ দেখে মুগ্ধ হই। জাহাজে চড়ে এক দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে মনে হয়েছিল পটে আঁকা ছবি। ভ্যাঙ্কুভার পোর্টে সবসময় সি প্লেন ওড়াওড়ি করে পর্যটক নিয়ে। চক্কর দিয়ে আবার ঝুপ করে নেমে আসে সাগর জলে। ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মনোমুগ্ধকর। ফোয়ারার জল দেখে মন পবিত্র হয়ে যায়।
অভিজ্ঞতা মতে কানাডা প্রকৃত অর্থে একটি ওয়েল ফেয়ার কান্ট্রি। এখানে রেসিজম নাই। হিউম্যান রাইটস আছে পরিপূর্ণ। উন্নত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা বোধ খুবই স্বস্তিদায়ক। রাত-বেরাতে চলাফেরা নির্বিঘ্ন। এখানে পরিকল্পনা করে শহর গ্রাম রাস্তাঘাট বাড়িঘর তৈরি করা হয়। অগণিত পার্ক, খেলার মাঠ আর মুক্ত বাতাস। সর্বত্র সবুজ গাছপালা আর রঙিন ফুল। অনেক শ্বাসকষ্টের রোগী এখানে এসে আর শ্বাসের ব্যারাম হয়নি। টরন্টো শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট খুব উন্নত। গাড়ি না থাকলেও চলাফেরাতে অসুবিধা হয় না।
টরন্টোতে বসবাসের অনেকদিন পরে পরিচয় ঘটে একজন সুব্রত কুমার দাসের সঙ্গে। জনারণ্যে একজন। তিনি একজন লেখক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক। তিনি প্রায় ত্রিশটির ওপর বই ইতোমধ্যে রচনা করেছেন। অনেকগুলো বই ছাপার অপেক্ষায় আছে। কানাডিয়ান সাহিত্য বা ক্যানলিট নিয়ে উনার গবেষণাকর্ম খুবই মূল্যবান। দেশে বিদেশে পরিচিত প্রতিভাধর সুব্রত কুমার দাসের সংস্পর্শে এসে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি ও জ্ঞানের ভাণ্ডার অধিক সমৃদ্ধ হয়েছে।
টরন্টোতে আমাদের সমাজে বিয়ে অনুষ্ঠান অনেক ব্যয়বহুল। এই অর্থে বাংলাদেশে একাধিক বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা যাবে। তেমনি এখানে মরেও যেন শান্তি নেই! ফিউনারেল ও আনুষঙ্গিক খরচ অনেক বেশি। সেই তুলনায় বাংলাদেশে অনেক কম খরচে একাধিক ফিউনারেল শেষ করা যায়। দু-একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তারা বলেছেন যেভাবেই হোক, দেশে গিয়ে মরবেন। এখানে কে খরচ কুলাবে! কথাটি কঠিন শোনালেও এটিই বাস্তবতা। আমার শেষ কথা- শেষ বয়সে কানাডা এসে মনে হচ্ছে বিরাট এক জেলে যেন বন্দি জীবন-যাপন করছি! কবে যে মুক্তি পাব জানি না! শব্দসীমার কারণেও মেইলে লিখতে কম পারদর্শী হওয়াতে কিছু অভিজ্ঞতা বাকি রইল।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৪৯ সালে। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৭৪ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। ২০১৮ সালে তিনি কানাডা আসেন ও বতর্মানে টরন্টোতে বসবাস করছেন। সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দুটি স্থানীয় পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। লেখাতে ওর পছন্দের বিষয়বস্তু হলোÑ ভ্রমণকাহিনি, গল্প এবং কলাম। প্রকাশিত গ্রন্থ ৫টি।

