আমার দাদাবাড়ি – স্মরণীয় ও নস্টালজিক স্মৃতি (দ্বিতীয় পর্ব)
নাসরীন খান
ঈদের আগে তো যেন উৎসব লেগে যেত – চুড়িদার, বেল-বটম প্যান্ট, পাঞ্জাবি (বকরম লাগানো), ফ্রকের জন্য ক্যানক্যান – নিজেদের জন্য তো বটেই, বন্ধুদের জন্যও সেলাই করতাম। এই সবই শিখেছিলাম ভিকারুননিসা নূন স্কুলে – যেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আর্ট ছিল বাধ্যতামূলক বিষয়। সঙ্গে ছিল বেসবলও। আমাদের বেসবল শিক্ষিকা ছিলেন ফেরদৌস আরা – যিনি নাটকের শিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
দাদার কাছ থেকে শুনেছি, সে সময় হজ পালন করা কতটা কঠিন ছিল। জাহাজে করে যেতে হতো। যাত্রা ছিল দীর্ঘ ও অনিশ্চিত। অনেক হাজী বিদায় নেওয়ার সময় প্রিয়জনদের সঙ্গে শেষ বিদায় বলে নিতেন। আমার দাদা ছিলেন একজন হাজী।
আমার আব্বা-আম্মাও হজ করেছেন। পরিবারের আরও অনেকে করেছেন – আমার স্বামীও। আর আমি নিজে যেতে না পারলেও, আমাদের প্রিয় কেয়ারটেকার আবুল কাশেম ফুল মিয়ার মাধ্যমে সেই সৌভাগ্যের অংশীদার হতে পেরেছি। তিনি আমাদের শ্বশুরবাড়ির পরিবারের দীর্ঘদিনের সহকারী ও পরিবারেরই একজন সদস্যের মতো।
দাদা-দাদি ছিলেন জলিল নানার ও ছোট নানুর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁরা নিয়মিত একে অপরের বাড়ি যাতায়াত করতেন। ছোট নানু ছিলেন সবার প্রিয় মানুষ। দাদা যখন ক্যান্সারে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন, ছোট নানু প্রায় নিয়মিতই তাঁকে দেখতে আসতেন। একদিন দাদা যখন খুবই খারাপ অবস্থায় ছিলেন, ছোট নানু বুঝে ফেলেন – এটাই তাঁর বিদায়ের সময়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দোয়া ও সূরা পড়তে শুরু করেন। ফুপ্পিরা তখন তাঁর আচরণে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন।

দাদা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও দৃঢ় বিশ্বাসের মানুষ। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে তিনি নিজেই তাঁর ডেনচার খুলে ফেলেছিলেন – এমন দৃশ্য আজও মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বড় চাচা তখন একজন প্রতিষ্ঠিত শিশু বিশেষজ্ঞ। তাঁর ছেলে স্বপন দেখেছিল – তাঁদের ফ্ল্যাটের সামনে থেকে বাবার নামফলক খুলে নেওয়া হয়েছে। এই সতর্কতাই বড় চাচাকে রক্ষা করেছিল। কারণ যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে দেশের মেধাবী সন্তানদের—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, শিক্ষক – হত্যা করেছিল, যেন নতুন দেশটিকে পঙ্গু করে দেওয়া যায়। আমরা সবাই ‘বধ্যভূমি’র ইতিহাস জানি।
আব্বাকেও তখন বাধ্যতামূলকভাবে আবার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি সদর দপ্তরে যাওয়ার পথে একটি অটোরিকশায় বসে ছিলেন। হঠাৎ এক মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কোথায় যাচ্ছেন। আব্বা গন্তব্য বলতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে অটোরিকশায় উঠে পড়ে রিকশার দিক ঘুরিয়ে দেন আমাদের প্রিয় নানাবাড়ি – দোহার, নূরপুরের দিকে। তিনি আব্বাকে বলেছিলেন – আগে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে লুকিয়ে পড়তে। আজ মনে হয় – এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো এক ফেরেশতা ছিলেন। সেই কারণেই দুই ভাই-ই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।
আরও চারজন ফুপ্পির কথা উল্লেখ না করলেই নয় – আরজুদা (আমরা তাঁকে বড় ফুপ্পু বলি), সফু ফুপ্পু, রুকু ফুপ্পু। আর একজন ফুপ্পি ছিলেন – যিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। একদিন তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং আর ফিরে আসেননি। সে সময় আজকের মতো নিখোঁজ ব্যক্তিদের রিপোর্ট করার ব্যবস্থা ছিল না। এটি ছিল দাদার জীবনের এক গভীর বেদনাদায়ক অধ্যায়।

নামু বা লুটু ফুপ্পির প্রায় ডুবে যাওয়ার ঘটনাটিও মনে পড়ে। তাঁরা সরষে বাড়িতে চম্পা ফুপ্পির কাছে গিয়েছিলেন, তখন ফুপ্পা ছিলেন সার্কেল অফিসার। একজন পুকুরে ঘাটলা নিয়ে গোসল করতে গিয়ে পিছলে পড়ে যান। সাঁতার না জানার কারণে তিনি প্রায় ডুবে যাচ্ছিলেন। পথচারী একজন দেখে তাঁকে বাঁচান। পরে ফুপ্পি আমাদের বলেছিলেন – ডুবে যাওয়ার সময় তিনি পানির নিচে কত রকম মাছ দেখেছিলেন! তখন গল্পটা আমার কাছে রূপকথার মতোই লেগেছিল।
ঈদের সময় যদি আমরা দাদা বাড়িতে থাকতাম, তাহলে ঈদ হয়ে উঠত এক মহা উৎসব। আব্বাকে মনে আছে – পরিপাটি সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে ভাইয়ার সঙ্গে ঈদের নামাজ শেষে দাদা-দাদির পায়ে সালাম করতে যেতেন। আমরা দাদা ও নানাবাড়ি – ’জায়গা থেকেই ভালো অঙ্কের ঈদী পেতাম।
কৈশোর বা কলেজ-ইউনিভার্সিটি জীবনে আমরা বড় তিন ফুপ্পির বাড়িতে বেশি যেতাম। রুকু ফুপ্পুকে বিশেষভাবে মনে পড়ে – পরীবাগের ওয়াপদা কোয়ার্টারে আমাদের সকালে হাঁটার সময় তিনি আমাদের দেখতে আসতেন। সফু ফুপ্পুও সেখানে এসে কিছুদিন ছিলেন। আমরা পিলখানায় তাঁদের বাড়িতে যেতাম। পরীক্ষার পর কয়েকদিন থেকে আসতাম।
একবার এসএসসি পরীক্ষার পর আমি আর লিনা বড় চাচার বাসায় গিয়েছিলাম। রাতে স্বপনের ঘরে গল্প করতে করতে হঠাৎ জানালা দিয়ে এক চোর উঁকি দিচ্ছে দেখে আমরা ভীষণ ভয় পেয়ে যাই।
তারপর ঘর বদলে বড় চাচা-চাচির ঘরে অতিরিক্ত গদিতে ঘুমাতে যাই। কিন্তু তাঁরা নাক ডাকতেন (পুরো সম্মান রেখে বলছি – আমরাও এখন করি!) – ফলে সেদিন আর ঘুমই হয়নি! আমরা বছরে এক-দু’বার সোনারগাঁওয়ে সফু ফুপ্পির কাছেও যেতাম।

আমরা সবাইকে ভালোবাসি – আরজুদা, সফু, রুকু, চম্পা, শেফু, সালমা, নাজ্জু, অনু, নামু, লুটু, রোজি ও বাবু – এগুলো তাঁদের ডাকনাম।
যাঁরা আর আমাদের মাঝে নেই, আল্লাহ তাঁদের জান্নাত নসিব করুন। দাদিকে নিয়ে আমরা ভীষণ গর্বিত – যিনি আপনাদের সবাইকে এত সুন্দরভাবে মানুষ করেছেন, আপনাদের অসাধারণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
আমরা আমাদের চাচাদেরও ভীষণ ভালোবাসি। আজ আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছি। কিন্তু ফেসবুক আমাদের আবার কাছে এনেছে। প্রতিদিন একে অপরকে দেখি, কথা বলি। প্রযুক্তি আমাদের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে – ধন্যবাদ ডিজিটাল দুনিয়া!
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে নিরাপদে রাখেন – এই আমার অন্তরের দোয়া ও কামনা।