আমার দাদাবাড়ি – স্মরণীয় ও নস্টালজিক স্মৃতি

নাসরীন খান

আমাদের দাদাবাড়ি ছিল ঢাকার লালবাগের জগন্নাথ শাহা রোডে। দাদার বাড়ির নম্বর ছিল ৯।

আমার দাদার নাম ছিল নাসিরউদ্দিন আহমেদ। মজার ব্যাপার হলো – আমার জীবনসঙ্গীর নামের সঙ্গে খুব মিল ছিল দাদার নামের। আমার দাদির নাম ছিল রওশন আখতার।

এখনও চোখ বুজলেই দেখতে পাই – দুটি গলির সংযোগস্থলে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাড়িটিকে। এটি ছিল দোতলা বাড়ি। রঙ ছিল হালকা গোলাপি – সেই সময়ে যা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক

বাড়িটিতে দুটি গেট ছিল – একটি সামনে, আরেকটি পেছনে। কোনো আড়ম্বর ছিল না। সাধারণ কাঠের গেট, তাতে দু’টি গোলাকার ফাঁপা হাতল ঝুলত। তখন কলিং বেল-এর কোনো দরকারই ছিল না! সেকালে সব বাড়িতেই গেট থাকতো। কিন্তু দাদাবাড়ির গেটকে ঘিরে আমার মনে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে ছোট ‘বাঁশের ঘর’-এর পাশ দিয়ে পেছনের গেটটি, যেটা দিয়ে বের হয়ে আমরা ছোট ‘মুদির দোকান’-এ যেতাম। বেশির ভাগ সময়ই যেতাম বাবু ফুপ্পির (আমারই বয়সী) সঙ্গে – ছোটখাটো জিনিস বা মিষ্টি কিনতে। মিষ্টি মানে হলো মুরুলি আর রঙিন সাদা ডোরা-কাটা গোল ক্যান্ডি!

সেই সময়ে এই পুরোনো শহরগুলোতে এত বেশি গাড়ি বা মানুষের ভিড় ছিল না। মানুষ মূলত রিকশায় চলাচল করত। তারও আগে নাকি ঘোড়ায় টানা গাড়িতে মানুষ চলাফেরা করত – আমি শুনেছি। পরে বড় রাস্তাগুলোতে রিকশা ও বাস ঘোড়ার গাড়ির জায়গা দখল করে নেয়।

আমরা এগুলোতে উঠতে ভীষণ রোমাঞ্চিত হতাম। কারণ তখন পাকিস্তানের অন্য অংশে  অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানে এসব ছিল না। তখন অটোরিকশা ছিল কি না, ঠিক মনে পড়ে না!
ছাদে ওঠার জন্যও একটি সিঁড়ি ছিল! সেখান থেকে আমরা আমাদের নানাবাড়িও দেখতে পেতাম। দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ি – দুটোই ছিল একই রাস্তায়।

এক পাশে ছিল রান্নাঘর, আর অন্য পাশে ছিল টয়লেট। সেকালে আলাদা পুরুষ ও নারীদের আলাদা আলাদা টয়লেট থাকত। একটি বাথরুম ছিল যেখানে ছিল একটি বড় পানির ট্যাংক বা রিজার্ভার ছিল। রান্নাঘরের অপর পাশে ছিল বৈঠকখানা এবং একটি বড় স্টোররুমের মতো ঘর।

বাড়িতে চলমান পানির ব্যবস্থাও ছিল – অবশ্যই পানির ট্যাংক থেকেই। পেছনের দরজাটি খুললেই পাশের রাস্তায় যাওয়া যেত। এই ঘরটিই আবার আমাদের নিজেদের আয়োজিত নাটক ও নাচের মহড়ার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো –সবকিছুই পরিকল্পনা ও কোরিওগ্রাফ করতেন আমাদের ফুপ্পিরা! আমরা আদর করে ফুফুদের ‘ফুপ্পি’ বলে ডাকতাম।

আব্বা আম্মার সাথে লেখক

আমরা দাদা-দাদি, চাচা ও ফুপ্পিদের সঙ্গে বাংলা ও উর্দু – দুই ভাষাতেই কথা বলতাম। খুব ছোটবেলায় আমরা বাংলার চেয়ে উর্দুতেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলাম। আমার আব্বা মনে করতেন, ছোটবেলায় একসঙ্গে তিনটির বেশি ভাষা শেখা কঠিন – তাই তিনি ইংরেজি, আরবি (পরবর্তী জীবনে কোরআন পড়ার জন্য) এবং উর্দুর ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য আমরা বাংলা পড়া-লেখা সবই শিখেছি।

আমাদের দাদাবাড়ির সবাই ঘরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উর্দু ভাষায় কথা বলতেন। তাই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁদের কোনো অসুবিধা হতো না। আমার দাদা ছিলেন সোনারগাঁও, ঢাকা থেকে আগত, আর দাদি ছিলেন মূল ঢাকা শহরের।

ফুপ্পিদের একটি মজার ও খুব কার্যকরী কৌশল ছিল – তাঁরা নিজেদের তৈরি একটি ভাষা ব্যবহার করতেন, যাকে বলা যায় এক ধরনের ‘উল্টা’ ভাষা! যেমন ‘আমি’ হয়ে যেত ‘মিয়া’ – এভাবে আরও অনেক শব্দ। তাঁরা এই ভাষায় এতটাই সাবলীল ছিলেন যে অন্য কেউ বুঝতে না পারলেও তাঁরা অনায়াসে নিজেদের মধ্যে গোপন কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন! আমরা সব সময় তাঁদের সঙ্গে থাকতাম বলে কিছুটা শিখেও ফেলেছিলাম।

আমার আব্বার নাম এ. বি. এম. মহিউদ্দিন। তিনি ‘বাসুদা’ নামেও পরিচিত ছিলেন।  আম্মার নাম রাবেয়া খানুম টগর। সেই দিনগুলোতে আমরা প্রতিবছর আব্বা এবং আম্মার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বেড়াতে আসতাম।

পরে আমরা যখন একটু বড় হলাম, তখন খুলনা থেকে দাদা বাড়িতে আসতাম। মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা লালবাগেই দাদা ও নানাবাড়ির কাছাকাছি বসবাস শুরু করি।

আমার দাদি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও দক্ষ একজন নারী। সে সময়ে বয়স্ক নারীরা খুব কমই বাড়ির বাইরে কাজ করতেন। দাদি দক্ষ ছিলেন এই অর্থে যে তিনি তাঁর বিশাল পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে অসাধারণভাবে সামলাতেন। আমাদের ছিল ১২ জন ফুপ্পি ও ৩ জন চাচা। আমাদের প্রিয় ৬ জন ফুপ্পি এবং ২ জন চাচা পরলোকগমন করেছেন। আমার আব্বা ছিলেন সবার বড় ভাই। সব ফুপ্পিই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত – চাচারাও তাই।

আমার দাদা তাঁর সন্তানদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার খরচ দিতেন। এরপর ফুপ্পি বা চাচারা নিজেরাই পড়াশোনার খরচ চালাতেন, অথবা বড় ভাই-বোনেরা আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন – এটাই ছিল বাড়ির নিয়ম!

দুই ফুফুর সাথে লেখক

আমাদের পরিবারে ডাক্তার, পাইলট, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, স্টুয়ার্ড, পার্সার, বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা – এমন আরও অনেক পেশার মানুষ ছিলেন।

এইসব গল্প আমরা শুনতাম আব্বার কাছ থেকে, বিশেষ করে আরও দুই চাচা –সাঈদ চাচা (মাহবুব আলম) ও ফদু চাচা (ক্যাপ্টেন এ. এফ. বি. জামান) – যখন তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানের মৌরিপুরে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, তখন আব্বা পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।

আমাদের বড় চাচা ডা. বদরুল আলম – তাঁকে আমরা ভীষণভাবে মনে করি। শুধু একজন ডাক্তার হিসেবে নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা তাঁকে স্মরণ করি এক তরুণ, উদ্যমী ছাত্র-ডাক্তার হিসেবে, যিনি প্রথম শহীদ মিনারের নকশা পরিকল্পনা ও আঁকায় অংশ নিয়েছিলেন! আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই – অপরিষ্কার দাড়ি-গোঁফে, কাগজে শহীদ মিনারের কাঠামো আঁকছেন তিনি। আমরা তাঁর জন্য ভীষণ গর্বিত।

সালাম, বরকত ও আরও অনেকের – গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়ার পর পুরো পরিবেশ তখনও ছিল অত্যন্ত অস্থির। সেই সময় বড় চাচাসহ একদল ছাত্র শহীদদের স্মরণে একটি স্থান ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা করছিলেন।

আমাদের বড় চাচা ছিলেন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ। তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করে এই ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। চাচি (ডা. আফজালুন্নেসা) ছিলেন একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট।

আব্বা ও আম্মা আমাদের বলতেন – সেই সময়ে ডাক্তারি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আর্থিকভাবে কতটা কঠিন ছিল!! আমার আব্বা ছিলেন এমন একজন ভাই, যিনি এসব পরিস্থিতিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। অন্য চাচারাও তাঁদের বোনদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে অকুণ্ঠভাবে সহযোগিতা করতেন। কোনো কোনো ফুপ্পি নিজেই উপার্জন করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। আর এসব কিছুর পেছনে আমার দাদির অবদান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এত বড় পরিবারের প্রতিদিনের রান্না, খাওয়ানো ও দৈনন্দিন কাজ সামলানোর দায়িত্ব কতটা বিশাল ছিল। যদিও সে সময় সহায়ক লোকজন ছিল, তবুও মূল রান্নার কাজ দাদিই করতেন। আম্মা যখন সেখানে থাকতেন, তখন পরিবেশন করার দায়িত্ব সামলাতেন। আম্মা ও দাদির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও স্নেহপূর্ণ।

লেখিকার বাবা এ. বি. এম. মহিউদ্দিন

আমার মনে আছে – ফুপ্পিরা আজিমপুর গার্লস স্কুলে পড়তেন, আর একজন-দুজন পলাসী গার্লস স্কুলে। দূরত্ব কম হওয়ায় তাঁরা হেঁটেই স্কুলে যেতেন – সবসময় বন্ধু ও বোনদের দল বেঁধে। তখন স্কুলে হেঁটে যাওয়া ছিল একেবারেই নিরাপদ। আমার আব্বা ও বড় চাচা তো মাইলের পর মাইল হেঁটেই স্কুলে যেতেন!!

আমার আব্বার পড়াশোনা হয়েছিল অবিভক্ত ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তাঁর ইংরেজি এত ভালো ছিল যে কলেজ জীবনেও ইংরেজি সাহিত্য পড়তে গিয়ে আমি তাঁর সাহায্য নিয়েছি!

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ না করলেই নয় – আমাদের বেশিরভাগ ফুপ্পিই সেলাইয়ের কাজে অসম্ভব দক্ষ ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকেই আমি সেই গুণের কিছুটা উত্তরাধিকার পেয়েছিলাম। মনে আছে, তানিয়া আর রুবার জন্য (রুবার নাম রেখেছিলেন আব্বা – দিলরুবা) ছোট ছোট ফ্রক সেলাই করতাম। রঙিন সুতোয় ফুলের নকশা কাঁথা সেলাই করে, কাপড়ের গোলাপ বসিয়ে দিতাম – সে কী আনন্দের সময়! (পরবর্তী সংখ্যায় সমাপ্য)