আমার দেখা কানাডা

অমলেন্দু ধর

আমার জ্যেষ্ঠ কন্যা মিতার স্পন্সরে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি প্রথম আমেরিকাতে আসি এবং পিআর কার্ড পেয়ে যাই। সেখান থেকে দ্বিতীয় কন্যা শান্তাকে দেখার জন্য ৩রা নভেম্বর প্রথম কানাডার মন্ট্রিয়লে আসি। পিআর রক্ষার্থে ২০১০ সালে আবার আমেরিকায় ফিরি এবং আবারও মন্ট্রিয়লে শান্তাদেরকে দেখে যাই। আমার দু-বছর আগেই আমার স্ত্রী শিল্পী ধর আমেরিকার পিআর পেয়েছিলেন। ইতোমধ্যে শান্তা আমাদের স্পন্সর করে এবং ২০১১ সালে কানাডা আসি। একমাস অবস্থান শেষে বাংলাদেশে ফিরে যাই কনিষ্ঠ কন্যা মুন্নির B.Sc (Civil and Environmental Engineering) Honours পরীক্ষার জন্য। ২০১২ সালের জুলাই মাসে স্থায়িভাবে কানাডাতে আসি। এই সময় আমার কাছে আমেরিকা ও কানাডা দুদেশেরই পিআর ছিল। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অনেকের সাথে আনন্দ ভ্রমণে আমেরিকাতে যাওয়ার সময় বাফেলো সীমান্ত চেকপোস্টে হোমগার্ড সিকিউরিটির অফিসার জানান- দুটো পিআর রাখা যাবে না। এবং যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেন আমাদেরকে। কোনোকিছু ভাববার সুযোগ না পেয়ে বলে ফেলি কানাডার পিআর রাখবো। ওরা তৎক্ষণাৎ আমেরিকার পিআর বাতিল করে দেয়। সেই থেকে আমি আর শিল্পী দুজনই কানাডিয়ান। 

তেরো বছর হয় স্থায়িভাবে কানাডায় আছি। এই সময়ে কানাডা সম্পর্কে আমার যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তার পুরো বর্ণনা করতে হলে একটি বই লেখার প্রয়োজন। কিন্তু আমার লেখা দু-হাজার শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশনা থাকায় অতি সংক্ষেপে আমার অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করছি। কানাডায় আমার ভালো এবং মন্দ দুধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। ভালো এবং মন্দ পাশাপাশি দুটো নিয়েই আলোচনা করি।

কানাডার যোগাযোগব্যবস্থা এবং রাস্তাঘাটগুলো খুবই উন্নত, সুন্দর, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সুপরিকল্পিত। ধুলাবালি বা আবর্জনার কোনো চিহ্ন নেই। সাইডওয়াক দিয়ে হাঁটুন, পাশ দিয়ে যাচ্ছে গাড়ি আর গাড়ি, একটা দুটো নয়, শত শত, কিন্তু না আছে কোনো হর্নের শব্দ, না আছে ইঞ্জিনের শব্দ। রাস্তার দিকে না তাকালে বোঝাই যাবে না যে, পাশ দিয়ে শত শত গাড়ি দৌড়াচ্ছে দ্রুতগতিতে। রাস্তার পাশে লাগানো আছে সুন্দর ঘাস। ঘাসগুলো আবার সুন্দর পরিপাটি করে কেটে রাখা হয়েছে। মনে হয় সবুজ কার্পেটে ঢাকা রয়েছে চতুর্দিক। ধুলা না ওড়ার প্রধান কারণ এই ঘাস। রাস্তাগুলো প্রশস্ত এবং লেন মার্ক করা। প্রত্যেকে নিজের লেন দিয়ে যাচ্ছে। লেন পরিবর্তনের নিয়ম আছে। এই নিয়ম মেনে চললে দুর্ঘটনার আশঙ্কা খুবই কম। অতি সহজেই গাড়ি চালানো যায়। তাই প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় সকলেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। হাইওয়েতে এক রাস্তার সাথে অন্য রাস্তা সোজা এসে মিলছে না। বহু দূর থেকে একটি পৃথক লেনের মতো তৈরি করে ক্রমশ এসে এমনভাবে মিলে যায় যাতে গতি কমানোর প্রয়োজন পড়ে না, দুর্ঘটনার আশঙ্কা কম এবং চালককে এদিক সেদিক তাকাতে হয় না। অতি নিপুণ পরিকল্পনা। মহাসড়কগুলোর পাশে গাড়ি চলার লেনের অতিরিক্ত একটি লেন থাকে। কোনো প্রয়োজন হলে কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঐ অতিরিক্ত লেনে গাড়ি পার্ক করে ইমার্জেন্সি লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। প্রশ্ন ওঠতে পারে বাংলাদেশে এমনভাবে রাস্তা নির্মাণ করা হয় না কেন।

কানাডার মাটি বালি ও পাথরের মিশ্রণ, খুবই শক্ত। এখানে দূর থেকে মাটি এনে ভরাট করতে হয় না। বাংলাদেশের মাটি বেলে দোআঁশ। নিম্নভূমি, দূর থেকে মাটি এনে ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করতে হয়। দুর্নীতি না থাকলেও বাংলাদেশে এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে যে খরচ হয় তা দিয়ে কানাডায় তিন/চার কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ সম্ভব।

কানাডা দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানে দুধের আবার রকমফের আছে যেমন ১%, ২%, ৩.২৫%, lactose free, fat free, half and half ইত্যাদি আরও কত কী ! গরুর অঢেল দুধ আছে, কিন্তু রাস্তাঘাটে এমনকি একশ’ কিলোমিটার ড্রাইভ করে গেলেও কোনো গরুর দেখা মিলবে না। শুধু ফার্মেই গরু পালন করা হয়, যেখানে সেখানে গরু চরানো যাবে না। এখানে কেউ একটা-দুটো করে গরু পোষেও না। যারা পোষে হাজার হাজার পোষে, তবে আড়ালে বা ঘেরাও করা নির্দিষ্ট খামারে। এই ব্যবস্থাটি খুবই প্রশংসাযোগ্য। বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা সম্ভব নয়। মূল কারণ, প্রয়োজনীয় ভূমির স্বল্পতা।

কানাডার শহরগুলোতে যেমন জালের মতো বিস্তৃত রাস্তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাস্তার উভয় পাশে সাইডওয়াক। আমাদের শহরগুলোতে পা ফেলার জায়গা নাই। আর এখানকার সাইডওয়াকগুলোতে হাঁটার মানুষ নাই। তাই বুড়ো ও ডায়বেটিস রোগীদের পোয়াবারো। যত ইচ্ছে হাঁটো।

২০২০ সালে ফ্লোরিডার কেপ কেনেডীতে আমেরিকার জাতীয় মহাশূণ্য ও গবেষণা কেন্দ্র (NASA) পরিদর্শনকালে সস্ত্রীক লেখক ও মেয়ে বনানী।

এখানকার সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয়টি হলো- কল্যাণকর ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। কানাডার স্বাস্থ্য খাত প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। প্রত্যেককে দেওয়া হয় একটি স্বাস্থ্য কার্ড (Health Card)। আছে নিজ পছন্দের একজন ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান (Family Physician)। শারীরিক কোনো সমস্যা হলে প্রাথমিক পর্যায়ে যেতে হবে এই ফিজিশিয়ানের কাছে। তিনি প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে প্রেসক্রিপসন পাঠিয়ে দেবেন নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে। অপরাহ্ণে ঔষধ পৌঁছে যাবে বাড়িতে। সিনিয়র সিটিজেন এবং পঁচিশ বছরের নিম্ন বয়স্কদের জন্য চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। অন্যদের জন্য ডাক্তারের ফিজ ও যেকোনো টেস্ট ফ্রি, শুধু ঔষধের আসল মূল্যের ২০% পরিশোধ করতে হয়। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকলে সবকিছু সবার জন্য ফ্রি। এখানে heart transplant, kidney transplant, liver transplant ইত্যাদির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য একটি ডলারও ব্যয় করতে হয় না। কিডনি রোগীদের জন্য চলে বছরের পর বছর ধরে dialysis। হাসপাতালে যেতে অপারগ হলে নার্স ঘরে এসে ডায়ালাইসিস করবে, না হয় এম্বুলেন্স এসে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। প্রয়োজনে প্রতিদিন। উপযুক্ত কিডনি না পাওয়া পর্যন্ত এমনি চলতে থাকবে। আমাদের বাঙালিদের মধ্যেই অন্তত দশ বছর ধরে এমন সুবিধা ভোগ করছেন অনেকে, অনেকের কিডনি এভাবেই ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে এবং তারা সুস্থ আছেন। তাদের কিন্তু একটি ডলারও ব্যয় করতে হয়নি। ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান যদি মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভিমত বা চিকিৎসা প্রয়োজন, তবে রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট রেফার করবেন। অনেকে এই বিনা খরচে চিকিৎসা সুবিধার কথা বিবেচনা করে অন্য দেশের চেয়ে কানাডা বেশি পছন্দ করেন। ইদানীং অভিবাসী ও শরণার্থীদের আধিক্য হওয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পেতে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। তবে জরুরি প্রয়োজনে ইমার্জেন্সিতে চলে গেলে সব সেবাই সাথে সাথে পাওয়া যায়।

এখানে স্বল্প আয়ের লোকদের কোনো সন্তান জন্ম নিলে প্রত্যেক সন্তানের জন্য দেওয়া হয় Child Benefit নামে বিশেষ ভাতা। সন্তানের আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত এই ভাতা পেতেই থাকবেন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রদের মোটামুটি ফ্রি শিক্ষাব্যবস্থা। তবে বিত্তবানরা ইচ্ছা করলে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারেন। এগুলোতে আবার বেজায় খরচ। উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়তে হলে নিজ খরচে পড়তে হয়। এখানে অতি সহজশর্তে শিক্ষাঋণের ব্যবস্থা আছে। প্রায় ৯০% শিক্ষার্থীই ঋণ নিয়ে পড়াশুনা করে। পড়াশুনা শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়ে ছোটো ছোটো কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করলেও চলে। এক্ষেত্রে সুদের হারও খুবই কম। এখানে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়, বইয়ের বোঝা নাই, শিক্ষকরা খুবই আন্তরিক। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির র‌্যাংকিং আছে। প্রতি বছর এগুলোর মূল্যায়ন হয়। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গঠনমূলক প্রতিযোগিতা। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি। এগুলো নির্ভর করে বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীর ওপর। প্রতি বছর হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী এগুলোতে ভর্তি হয়। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি অন্তত তিনগুণ বেশি। তবে একবার ভর্তি হয়ে এখানে আসলে শিক্ষার্থীরা খণ্ডকালীন চাকরি করে কিছু খরচ পুষিয়ে নিতে পারে। কোনো কোর্সেরই ধরাবাঁধা মেয়াদ নাই। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ সুবিধানুযায়ী বছরে কয়টি বিষয় পড়বে ঠিক করে নেয়। একসাথে বেশি বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করলে ডিগ্রি অর্জনে সময় কম লাগবে, কম সাবজেক্ট নিয়ে পড়লে সময় বেশি লাগবে। নিয়মিত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে পিছিয়ে পড়াদের জন্যে বিভিন্ন ধরনের শট কোর্স। সব কোর্সই চাকরিভিত্তিক, যাতে সহজে কাজ পাওয়া যায় অথবা নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে জীবিকার ব্যবস্থা করা যায়। এক কথায় শিক্ষা মানে জীবিকা নির্বাহের উপায় করা, কেরানি তৈরির শিক্ষা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক শিক্ষক রয়েছেন বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, চৈনিক ইত্যাদি এশীয় দেশের। আমাদের ছাত্রেরা আমাদের দেশীয় শিক্ষকদের কাছে পড়ার জন্য বিদেশে আসে হাজারো ঝক্কিঝামেলা মোকাবেলা করে অঢেল অর্থের শ্রাদ্ধ করে। কিন্তু কেন? এই কেন’র উত্তর খুঁজে সমাধান বের করা জরুরি। তাহলে আমাদের ছাত্র ও শিক্ষকদের দেশে রাখা যাবে, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, মেধা পাচার কমবে। দেশের সকল মেধা যে বিদেশে চলে যাচ্ছে সে নিয়ে কারও ভাবনা আছে? আসল মেধাবীরা দেশ ছাড়ছে আর মেধাহীনরা মেধাবী সেজে দেশের বারোটা বাজাচ্ছে। সুশীলরা একটু ভাবুন।

২০১৯ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সস্ত্রীক লেখক ও নাতি মুখর।

এখানকার শিক্ষাব্যবস্থার এতসব ‘ভালো’র মধ্যেও কিছু ত্রুটি আমার কাছে ধরা পড়েছে। যেমন- শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকে, স্যার বা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ প্রয়োগের বিধান নেই। শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশের সময় বা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় ছাত্রেরা দাঁড়ায় না বরং শিক্ষকই দাঁড়িয়ে থাকেন আর ছাত্র বসে বসে কথা বলে। ছাত্রদের শেখানো হয় “Your life, your decision. Your body your decision.’’ এমন শিক্ষায় গুরুজনদের অবজ্ঞা করা হয় এবং বা তাদের কথার মূল্য দেওয়ার শিক্ষা তারা পায় না বলেই আমার মনে হয়। এতেই পরিবার ভাঙে, অশ্লীলতা বৃদ্ধি পায়, বয়স্করা অবহেলা তথা অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েন। আঠারো বছর বয়স হলেই অনেক সন্তান তাদের পিতামাতাকে বাই বাই বলে অন্যত্র চলে যায়। এদের বেশিরভাগই বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড ধরে আনন্দে মত্ত হয়। পড়াশোনা লাটে ওঠে। পরিণামে সর্বনিম্ন মজুরির কাজ। পিতামাতাও সন্তান চলে গেলে তেমন অসন্তুষ্ট হন না। মন বোঝানোর জন্য চালু করা হয়েছে বছরে একদিন ‘ফাদার্স ডে’ আর একদিন ‘মাদার্স ডে’। এই দিনগুলোতে বাবা-মায়ের জন্য বরাদ্দ থাকে স্বল্প মূল্যের একেকটি ফুলের তোড়া। কেন যে আমাদের বাঙালিরা এসব অপসংস্কৃতির পিছনে ছোটে, বুঝি না।  

এখানকার আবাসন ব্যবস্থা খুবই জটিল। আমাদের দেশের মতো যার যেমন ইচ্ছা বাড়ি নির্মাণ করার সুযোগ নাই। ১% লোকের পক্ষেও জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ সম্ভব নয়। বাড়ি ব্যবসা বলতে গেলে কর্পোরেট বিলিয়নেয়ারদের দখলে। তারা একসাথে বিশাল এলাকা ক্রয় করে, শত শত বাড়ি নির্মাণ করে যত ইচ্ছে দাম হাঁকে। অসহায় ক্রেতারা সেই দামেই বাড়ি কিনতে বাধ্য, তাও লাইসেন্সধারী দালালের মাধ্যমে। এখানে মোটামুটি সকলেরই বাড়ি আছে, কিন্তু কারও বাড়ি নেই। সবাই ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাড়ি কেনেন। আমি বলছি এটি আমার বাড়ি। আসলে এটি ব্যাংকের বাড়ি। ব্যাংকগুলোর মূল ব্যবসাই হলো বাড়িক্রেতাদের লোন দেওয়া ও সুদসহ কিস্তি আদায়। নিজেরা বাড়ি নির্মাণের বাধাগুলো হলো পরিমাণমতো জমি পাবেন না, জমি পেলে সরকারের ডজনখানেক অফিস থেকে শর্তাদি পূরণ করে অনুমতি গ্রহণ প্রায় দুঃসাধ্য। এসব যদি করতেও পারেন নির্মাণ শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। তাই অতিরিক্ত মূল্যে মনোপলিস্টদের কাছ থেকেই আপনাকে নতুন বাড়ি ক্রয় করতে হবে। তবে বেশিরভাগ ক্রেতাই পুরাতন বাড়ি ক্রয় করে থাকেন। সেগুলোর দাম কিন্তু নতুন বাড়ির চেয়ে কম নয়। বাড়িগুলোর মূল কাঠামো খুবই মজবুত, ভিতরে ফিটিংস মোটামুটি সুন্দর, কিন্তু খুবই দুর্বল। এখানে একটি ব্যাপার বেশ ভালো। যেমন এলাকার সকল বাড়ির বাইরের চেহারা একই রকম। বাইরে থেকে বাড়ি দেখে ধনী দরিদ্র নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বাড়ির বাইরের লুক ইচ্ছামতো বদলাতে পারবেন না। ভিতরের সাজসজ্জা নিজের মতো করে সাজানো যায়। তবে ছোটো-বড়ো সকলেরই সুবিধাদি প্রায় সমান। যেমন সকল ঘরেই এসি/হিটিং আছে, ওয়াশিং মেশিন, ড্রায়ার, ফ্রিজ ইত্যাদি আছে। বাড়ির দাম যেমন বেশি, বাড়িভাড়াও বেশি। টরন্টোয় বর্তমানে একটি দুই বেডরুমের বাসার ভাড়া গড়ে দুই হাজার ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি একলক্ষ আশি হাজার টাকা। কানাডা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ, লোকসংখ্যা মাত্র বেয়াল্লিশ মিলিয়ন (চার কোটি কুড়ি লক্ষ)। তাহলে জমি বা বাড়ির দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাড়িঘরের চেয়ে বেশি কেন? কারণ, বাড়ি ব্যবসা, নির্মাণ ব্যবসা (সড়ক মহাসড়ক, পাইপ লাইন, বৈদ্যুতিক লাইন ইত্যাদি), ঔষধ নির্মাণ ও ব্যবসা, বড়ো আকারের সাপ্লাই ইত্যাদি সবই কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণে। বেশিরভাগ মানুষই অভিবাসী ও রিফিউজি হওয়ায় এই বিষয়গুলো অনেকেরই চোখে পড়ে না। এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে, একের সাথে অন্যের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, চালচলন কিছুরই মিল নাই। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসৎ নাই। কোনো রকম থাকতে ও খেতে পারলেই হলো। এছাড়াও অনেক কারণ আছে সে নিয়ে স্থানসংকুলান হলে পরে বলবো।

শুরুতে বলেছি কানাডার শহর ও রাস্তাগুলো খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এই পরিচ্ছন্নতার পিছনে রয়েছে সুনিপূণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সিটি কর্পোরেশন প্রতিটি পরিবারে তিনটি বিশালাকারের কন্টেইনার সরবরাহ করে। পরিবারের শাকসবজি, মাছ মাংস ইত্যাদির উচ্ছিষ্ট ফেলতে হবে সবুজ কন্টেইনার; কাগজপত্র, প্লাস্টিক, কাচ ইত্যাদি রিসাইকেল সামগ্রী ফেলতে হবে আকাশী রঙের কন্টেইনারে, অন্যান্য বর্জ্য ফেলতে হবে কালো রঙের কন্টেইনারে। একইভাবে রাস্তার পাশে স্থানে স্থানে, বিভিন্ন মার্কেটে, শপিং মলে, পার্কে, যেখানেই মানুষের যাতায়াত আছে সেসব স্থানে বিভিন্ন আকৃতির কন্টেইনার দেওয়া আছে। এখানকার পরিবেশই সকল মানুষকে বাধ্য করে নির্দিষ্ট জায়গায় ও কন্টেইনারে বর্জ্য ফেলতে। কেউ ভুলেও এর অন্যথা করে না। কন্টেইনারের শক্ত হাতল ও ঢাকনা আছে। নির্দিষ্ট দিনে বর্জ্যবাহী ট্রাক আসে। ট্রাকগুলো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে কন্টেইনারের হাতল ধরে ভিতরের বর্জ্যগুলো ট্রাকের ভিতর ফেলে দেয়। সাথে সাথে ট্রাকের অভ্যন্তরের যন্ত্রাদি বর্জ্যগুলোকে মণ্ড বানিয়ে ফেলে। এতে ট্রাকগুলো বেশি পরিমাণের বর্জ্য একসাথে নিয়ে যেতে পারে। যে-রঙের কন্টেইনার, সেই রঙের ট্রাক নেবে ঐ কন্টেইনারের বর্জ্য। তারপর সবুজ কন্টেইনারের বর্জ্য নিয়ে ফেলবে জৈবসার প্রস্তুতের জায়গায়, রিসাইকেল কন্টেইনার নিয়ে যাবে কোনো নির্দিষ্ট কারকারখানায় এবং কালো কন্টেইনারের বর্জ্য নিয়ে ফেলবে নির্জন কোনো ডাম্পিং গ্রাউন্ডে। কানাডা বা উন্নত বিশ্বের পরিচ্ছন্নতার রহস্য এখানেই।

২০২১ সালে ব্রাম্পটনের একটি সানফ্লাওয়ার গার্ডেনে সস্ত্রীক লেখক।

নানা কারণে কানাডায় জন্ম হার কম। এখানকার মূল আদিবাসীরা ইউরোপীয় অভিবাসীদের আক্রমণে বা নির্যাতনে কোণঠাসা হয়ে উত্তরের বরফাচ্ছাদিত এলাকায় বা বনাঞ্চলে গিয়ে বসতি গড়েছে। ইদানীং কানাডা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠায় ও নাগরিকদের যথেষ্ট মানবতাবোধ জাগ্রত হওয়ায় আদিবাসীদের উন্নয়নে সরকারগুলো নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বা নিচ্ছে। কানাডার বর্তমান গভর্নর জেনারেল একজন আদিবাসী। আদিবাসীদের পরে প্রাচীন হিসেবে ইউরোপ থেকে কয়েকশ বছর আগে আসা অভিবাসীরাই ক্ষমতার কর্ণধার এবং তাদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু সীমাহীন অধিকার তাদের কিছু সংখ্যককে অনেকাংশে ভোগবাদী করে তুলেছে। ভোগবাদিতার কারণে তাদের মধ্যে রয়েছে সন্তান ধারণে অনাগ্রহ। এতে দেশে জনঘাটতি দেখা দেয়। জনঘাটতি পূরণের জন্যই তারা অভিবাসী গ্রহণ করে। এই অভিবাসী গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের একটি বিশেষ কৌশল। তারা কোনো এক দেশ থেকে বেশি অভিবাসী গ্রহণ করবে না। শতাধিক দেশ থেকে আনবে অভিবাসী, শরণার্থী ও শিক্ষার্থী। এরা একই এলাকায় থাকলেও কেউ কারও কথা বোঝে না, প্রত্যেকের আলাদা কালচার। তাই ওদের আধিপত্যে হস্তক্ষেপ করার জন্য অভিবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না। যদিও শিক্ষাদীক্ষায় ইউরোপীয় অভিবাসীরা কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে মূল ক্ষমতা কিন্তু তাদের হাতেই রয়ে গেছে বা যাচ্ছে। আমাদের মতো অভিবাসীদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের তরুণরা কিন্তু কানাডার মেইনস্ট্রিমে মিশে যাচ্ছে। তারা বাপ দাদার সংস্কৃতি ধরে রাখায় খুব একটা আগ্রহী নয়। এক সময় পিতৃ-মাতৃ পুরুষের ভূমি বা বংশধরদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে বলে মনে হয় না। দক্ষিণ এশিয়ায় যেমন ধর্ম একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, তেমনি কানাডা বা পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় অভিবাসীরা রাজনীতির হাতিয়ার। কানাডার লিবারেল পার্টি অধিক পরিমাণে অভিবাসী ও শরণার্থী গ্রহণের পক্ষপাতী। এই সুবাদে অভিবাসীদের ভোট প্রায় একচেটিয়া লিবারেলের দিকে যায়। কানাডায় গত নয় বছর ধরে লিবারেল সরকার। তারা নির্বিচারে শরণার্থী আমদানি করে কানাডার অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। অভিবাসীদের মধ্যে যারা ছাত্রাবস্থায় আসে তারা অনেক সহপাঠী পায়। আবার যারা তরুণ অবস্থায় আসে তারাও কর্মক্ষেত্রে অনেক সহকর্মী পায়। এতে তারা মোটামুটি স্বস্তিতে থাকতে পারে। কিন্তু যারা বুড়ো হয়ে ছেলেমেয়েদের স্পন্সরে আসেন তারা কোনো বন্ধু-বান্ধব যোগাড় করতে পারেন না। তাদের জীবন অনেকাংশে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর হয়ে যায়। তাই বৃদ্ধ বয়সে বিদেশ আসার আগে বিশেষভাবে চিন্তা করা আবশ্যক। তবে দেশে যাদের বিকল্প অবলম্বন নাই তারা তো সুযোগ থাকলে আসতেই পারেন।

কানাডা মানবাধিকারের দেশ, শান্তি ও সৌহার্দ্যরে দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ইদানীং হিংসা এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। টরন্টো থেকে প্রচারিত CP24 Tv Channel এর দৈনন্দিন সংবাদ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রায় প্রতিদিনই শুধু বৃহত্তর টরন্টোতেই ২/৩ টি শুটিং, স্ট্যাবিং ইত্যাদি ও খুন জখমের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। তুলনামূলক বিবেচনা করলে আঠারো কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশের তুলনায় এই একটি শহরেই শুটিং ও স্ট্যাবিং-এর ঘটনা বেশি ঘটে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে ঝগড়াঝাটি, হৈ হল্লা, গালাগালি, কিলাকিলি ইত্যাদি বেশি হলেও শুটিং বা স্ট্যাবিং-এর ঘটনা আমার বিবেচনায় অনেক কম। আমার মনে হয় অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি প্রদানের বিধান বা ব্যবস্থা না থাকাই শুটিং, স্ট্যাবিং ইত্যাদির মতো হিংস্রতার প্রধান কারণ। 

অনেকগুলো সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কানাডা বসবাসের জন্য একটি অতি উত্তম দেশ। আমাদের দেশে নির্বাচন আসলে প্রার্থীদের হাজার হাজার কর্মীর প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে মারামারি, মিছিল পাল্টা মিছিল, একে অন্যের পোস্টার ছেঁড়াছিঁড়ি ইত্যাদি লেগেই থাকে। নির্বাচনের দিন শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ, আধাসামরিক, সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করতে হয়। এরপরও ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান, ফলাফল জালিয়াতি ইত্যাদির অভিযোগ শোনা যায়। কিন্তু কানাডার নির্বাচনে এসবের কিছুই নাই। নির্বাচন পরিচালনায় বা নির্বাচন কেন্দ্রে একজন শান্তিরক্ষীও থাকে না। কোনো মিছিল নাই। কর্মীসভা করা হয় হলের ভিতর। আমাদের দেশে প্রার্থীদের খরচ করতে হয় কোটি কোটি টাকা। এখানে কর্মীরাই নির্বাচনের খরচ যোগায়। নির্বাচনের দিন এজেন্ট ছাড়া প্রার্থীদের কোনো কর্মী মোতায়েন করতে হয় না। ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে কেউ যায়ও না। প্রত্যেক ভোটারের কাছে কয়েকদিন আগেই নির্বাচন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে পরিচয়পত্র চলে আসে। এই পরিচয়পত্র নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে হয়। সেখানে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক থাকে যারা ভোটারদের সাহায্য করে। পরিচয়পত্র দেখালে নির্বাচনি কর্মকর্তা ব্যালোট পেপার দেন। পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে ক্রস চিহ্ন দিয়ে নির্দিষ্ট বাক্সে ফেলে দিলেই হয়। কোনো হৈ চৈ নাই। সন্ধ্যায় নির্বাচনের ফল জেনে যাবেন। একেই বলে সভ্যতা।

এখানে সিনিয়র সিটিজেনরা নানা সুবিধা ভোগ করে থাকেন। নিজ শহরে বাসভাড়া ফ্রি, কানাডায় কোনো কাজ করে থাকুন বা না, বয়স পয়ষট্টি হলেই জীবন ধারণ করার মতো পেনসন পাবেন, স্বল্প ভাড়ায় বাসস্থান পাবেন, চিকিৎসা সেবা পাবেন। প্রয়োজনে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে পারবেন। যে-কোনো লোক কর্মহীন বা রোজগারহীন হলে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে ভাতা পাবেন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার হলে চিকিৎসা ও দুর্ঘটনা ভাতা পাবেন। একেবারে নিম্ন পর্যায়ের কাজের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারিত আছে যা দিয়ে অনায়াসে সংসার চালানো যায়। চাকরি চলে গেলে এমপ্লয়মেন্ট ইন্সিয়রেন্স থেকে যথেষ্ট মাসিক ভাতা পাওয়া যায়। আমরা সমাজতন্ত্রের জন্য চিৎকার দিতাম। আসলে সমাজতান্ত্রিক কোনো দেশ কি পৃথিবীতে আছে? উপর্যুক্ত সুবিধা প্রদানকারী কানাডাই আমার মতে সমাজতান্ত্রিক দেশ। কানাডাই প্রকৃত অর্থেই কল্যাণকামী গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র বিদ্যমান। এখানে মুক্ত ও সুস্থ চিন্তার পরিবেশ বিদ্যমান। দেশে থাকতে নানা প্রতিবন্ধকতায় আমি বই লেখার সুযোগ পাইনি। এখানে এসে আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন চারশ’ বাইশ পৃষ্ঠার ‘উপলব্ধি’।

লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৪৪ সালে সিলেট জেলায়। কর্মজীবনের প্রথম চব্বিশ বছর শিক্ষকতা করেছেন। পরবর্তী সাতাশ বছর আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কর্মজীবনে সমসাময়িক বিষয়ে শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন যা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকার উপসম্পাদকীয় কলামে প্রকাশিত। ২০১২ সালে ৬৮ বছর বয়সে স্থায়িভাবে কানাডায় চলে আসেন। কানাডায় অবস্থানকালেও বাংলাদেশ, কানাডা ও আমেরিকার বিভিন্ন ম্যাগাজিনে অনেক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।  প্রথম বই ‘উপলব্ধি’ (২০২৪)।