ইংরেজির দেশে বাংলা লেখা

নিরঞ্জন রায়

আমরা ছোটোবেলায় একটা কথা শুনেছি, তা হচ্ছে দেশের ঠাকুর আর বিদেশের মজদুর। অর্থাৎ দেশে যে ব্যক্তির অবস্থান ঠাকুরের মতো, সে কিনা বিদেশে গেলে থাকতে হবে মজদুরের মতো। ঠাকুর হচ্ছে উচ্চ বর্ণের এবং মান ও খ্যাতিতে সমাজে উচ্চস্তরের মানুষ, যাকে সবাই বেশ সমীহ এবং সম্মান করে। পক্ষান্তরে মজদুর হচ্ছে সমাজের নিচুস্তরের খুবই সাধারণ মানুষ, যারা দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই শ্রেণির মানুষকে কেউ সম্মান করে না, উল্টো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। সমাজের ঠাকুর শ্রেণির মানুষও যখন বিদেশে যায়, তখন আর তাঁর সেই মর্যাদা থাকে না, উল্টো দিনমজুরের মতো জীবনযাপন করতে হয়। এখন অবশ্য সেই অবস্থা নেই। এখন একেবারেই উল্টো অবস্থা বিরাজ করছে। তাই এখন সেই প্রবাদ বাক্যও উল্টো হয়ে গেছে ‘দেশের মজদুর, আর বিদেশের ঠাকুর’।

এখন দেশে যারা দিনমজুরের মতো জীবনযাপন করে, তারাই বিদেশে এসে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় থাকতে পারে। বলে রাখা ভালো যে, আমি এখানে বিদেশ বলতে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার অনেক দেশকে বোঝাতে চাইনি। আমি বিদেশ বলতে মূলত আমাদের আশেপাশের কানাডা, আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছি। দেশে যে ব্যক্তি একটি গাড়ি কেনার কথা স্বপনেও ভাবেনি, সেই দেখা যায় বিদেশে এসে সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি চালাচ্ছে। দেশে যে ব্যক্তি একটি মানসম্পন্ন ভাড়া বাসায় থাকার কথা ভাবতে পারেনি, সেই বিদেশে এসে মিলিয়ন ডলার মুল্যের বাড়ির মালিক হয়েছে। দেশে যারা সাধারণভাবে জন্মদিন পর্যন্ত পালন করার কথা চিন্তা করেনি, তারাই বিদেশে এসে জমকালো আয়োজনে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, সুইট থার্টিন, সুইট সিক্সটিনের মতো দিবস পালন করছে। দেশে থাকতে যারা আত্মীয় বাড়ি বেড়ানোর চিন্তা করেনি, তারাই বিদেশে এসে বিভিন্ন দেশে অবকাশ যাপন করছে।

পক্ষান্তরে যারা দেশে ভালো অবস্থানে ছিল, তারাই বিদেশে এসে অনেক কষ্টে জীবন-যাপন করছে। যেমন, দেশে যে ডাক্তার ছিল, সে বিদেশে এসে ডাক্তারি তো দূরের কথা, সামান্য নার্সিং পেশাও বেছে নিতে পারছে না। দেশের প্রকৌশলী বিদেশে এসে একজন সাধারণ মেকানিকও হতে পারছে না। দেশে যে ব্যক্তি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ নির্বাহী ছিল, সে বিদেশে এসে একটি ক্যাশিয়ার বা টেলারের চাকরি যোগাড় করতে গলদঘর্ম হচ্ছে। দেশের এসব ঠাকুর বা পদস্থ এবং সচ্ছল ব্যক্তি বিদেশে এসে মিলিয়ন ডলারের বাড়িতে থাকা বা ব্র্যান্ডের গাড়ি চালানোর কথা কল্পনাও করতে পারে না। উল্টো হতাশায় জীবন কাটাতে হয় এবং চক্ষু লজ্জার ভয়ে সেই হতাশা আবার প্রকাশ করতেও পারে না। অবশ্য যারা বেগম পাড়ার বাসিন্দা, তাদের কথা ভিন্ন। তাদের মতো সৌভাগ্যবানরা সকল প্রকার ধরা-ছোঁয়া এবং আলোচনার ঊর্ধ্বে। সুতরাং পরিবর্তিত এই বাস্তবতার আলোকে বলা যেতেই পারে যে, এখন সময় পাল্টেছে, তাই আমাদের ছোটো সময়ে যা দেখেছি বা শিখেছি, এখন আর তা কার্যকর নেই।

এই পরিবর্তনের ছায়া যে শুধুমাত্র সচ্ছল জীবন-যাপন বা আরাম-আয়েশে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে, তেমন নয়। এই প্রবণতা শিল্প, সংস্কৃতি, ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বেশ ভালোভাবেই প্রসারিত হয়েছে। দেশে থাকতে যত না বাংলা ভাষার চর্চা, বিশেষ করে বাংলায় লেখালিখির সুযোগ পেয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ পেয়েছি এই ইংরেজির দেশে এসে বাংলা চর্চা করা এবং বাংলায় লেখালিখির। আমার ক্ষেত্রে অন্তত এমনটাই হয়েছে। সত্যি বলতে কি, লেখালিখি করা এবং লেখক হিসেবে নিজেকে দাবি করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। কেননা, লেখালিখি মোটেই সহজ কাজ নয়। এজন্য বিশেষ গুণাবলি থাকতে হয় এবং করতে হয় পর্যাপ্ত অনুশীলন। তেমনি লেখক হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। লেখক হতে হলে যেমন পর্যাপ্ত অধ্যবসায় প্রয়োজন, তেমনি থাকতে হবে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। যার কোনোটাই আমার মধ্যে নেই। লেখালিখি বলতে আমরা যে কাজটা করি, তা মূলত নিজের অভিজ্ঞতা পাঠকদের জানানো। দীর্ঘ চলার পথে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে আসতে হয়েছে। ফলে জীবনের প্রতি পদে পদে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে, যার মধ্য থেকে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো পাঠকদের জানানোর উদ্দেশ্যে কিছু লিখতে হয়। আমাদের মতো লেখকরা মূলত এই কাজটিই করে থাকে।

২.

আমি বাংলাদেশে থাকতেই ইংরেজি পত্রিকায় লিখতাম। আমার লেখার বিষয় মূলত ব্যাংক, ফাইন্যান্স, অর্থনীতি এবং সমসাময়িক কিছু বিষয়। এই বিষয়গুলো যেহেতু একটু টেকনিক্যাল, তাই ইংরেজিতে লিখতে বেশি সুবিধা। কারণ বিষয় সংক্রান্ত শব্দগুলো ইংরেজিতে লিখতে সুবিধা। কানাডা চলে আসার পর ইংরেজিতে লেখার কাজটা আরও সহজ হয়ে গেল। কেননা কানাডা ইংরেজির দেশ। এখানে ইংরেজিতে প্রচুর পড়ার সামগ্রী পাওয়া যায়। তাছাড়া ইংরেজি লিখতেও বেশ সুবিধা। নিজেই সরাসরি খসড়া লেখা টাইপ করে একবার রিডিং দিয়েই চূড়ান্ত করে লেখাটি সম্পন্ন করা সম্ভব এবং তা প্রকাশনার জন্য তাৎক্ষণিক পাঠিয়েও দেওয়া যায়। পক্ষান্তরে মাতৃভাষা হলেও বাংলায় লেখার কাজটা মোটেই সহজ নয়। কারণ, প্রথমে বাংলায় খসড়া লিখতে হয়, তারপর খসড়া একজন টাইপরাইটারকে দিতে হয় কম্পোজ করার জন্য। খসড়া কম্পোজ আবার পড়ে ভুলভ্রান্তি ঠিক করে দিলে, চূড়ান্ত খসড়া কম্পোজ সম্পন্ন হয়। এই ব্যবস্থা অবলম্বন করে বাংলাদেশে বাংলায় লেখা সম্ভব। কেন না, সেখানে বাংলায় ভালো কম্পোজার পাওয়া যায়, যারা নামমাত্র মূল্যে বাংলা লেখা কম্পোজ করে দিতে পারে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে তো আর কানাডায় বাংলা লেখা সম্ভব নয়। কারণ, কোনো জানা ব্যক্তিকে দিয়ে বাংলা খসড়া লেখা কম্পোজ করানোর সুযোগ নেই। যে দু-একজন এই কাজ করে, তারা অত্যধিক মূল্য নেয়। এরকম মূল্য দেখে শখের লেখালিখি তো দূরের কথা, জরুরি বিষয় কম্পোজ করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে যায়।

এসব কারণে ইংরেজির দেশ কানাডা এসে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলায় লেখালিখির সুযোগ করতে পারছিলাম না। এক প্রকার ব্যর্থ হয়ে ইংরেজিতে লেখালিখি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পরিচয় হলো বিদ্যুৎ দাদার সাথে। বিদ্যুৎ সরকার, যিনি টরন্টো থেকে প্রকাশিত ‘আজকাল’ পত্রিকার দায়িত্বে ছিলেন। একদিন বিদ্যুৎ দাদার সাথে দেখা হলো এবং লেখালিখির বিষয় নিয়ে এক দীর্ঘ প্রাণবন্ত আলোচনা হলো। আলোচনার এক পর্যায় তিনি আমাকে আজকাল পত্রিকায় লিখতে বললেন। আমি বললাম, “বিদ্যুৎ দা, লিখতে তো চাই কিন্তু এখানে তো কেউ আমাকে বাংলা টাইপ করে দেবে না। আর আমি তো নিজে বাংলা টাইপ করতে পারি না।” তখন তিনি আমাকে সাহায্য করলেন এবং একটা ভালো পথ বাতলে দিলেন, যা বাংলায় লেখার ক্ষেত্রে আমার ভালো উপকারে এসেছে। বিদ্যুৎ দা’র পরামর্শ মোতাবেক আমি ল্যাপটপে ‘অভ্র’ অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়ার ডাউনলোড করে নিলাম এবং সেই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে লিখতে শুরু করলাম। এটি আজ থেকে দশ-বারো বছর আগের কথা। এতদিনে এই ‘অভ্র’ সফটওয়ার যথেষ্ট উন্নত হয়েছে এবং বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছে। তাই এই বিষয়ে বেশিকিছু লেখার প্রয়োজন নেই।

বিদ্যুৎদার পরামর্শ পেয়ে সেই থেকে বাংলায় লেখালিখি শুরু করি, যা আজও অব্যাহত আছে এবং লেখার পরিধি ও ব্যাপ্তি, দুটোই বেড়েছে। প্রথমে ইংরেজিতে কলাম লেখা দিয়ে শুরু করলেও, এখন ইংরেজির চেয়ে অনেক বেশি কলাম বাংলায় লিখে থাকি। সপ্তাহে ইংরেজিতে যদি একটি কলাম লেখি, বাংলায় লিখতে হয় তিনটি কলাম। এটাই স্বাভাবিক, এটাই গর্বের, এটাই হওয়ার কথা এবং এটাই করছি। কেননা বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। প্রথম দিকে বেশ অসুবিধা হতো এবং বেশ সময় লেগেছে একেকটি বাংলা লেখা তৈরি করতে। প্রথমে কাগজে খসড়া লিখে সেই লেখা টাইপ করে এডিট করতে হয়েছে। এরপর লেখার ভুলগুলো চিহ্নিত করে লেখায় সংশোধন করে সেটি পুনরায় পড়ে লেখা চূড়ান্ত করতে হয়েছে। এত সময় নিয়ে লেখা তৈরি করা এবং এত কষ্ট দেখে আমার মেয়ে একদিন আমাকে সরাসরি ল্যাপটপে লিখতে বললো। আমি প্রথমে রাজি ছিলাম না। কিন্তু পরে যখন বাংলায় লেখার পরিমাণ বেড়ে গেল, তখন আর এভাবে পারছিলাম না। ফলে একদিন সাহস করে ল্যাপটপে সরাসরি লিখতে শুরু করলাম এবং পেরেও গেলাম। সেই থেকে কাগজে খসড়া লেখা বাদ হয়ে গেল এবং সরাসরি ল্যাপটপে লিখতে শুরু করলাম। প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হতো এবং সময়ও বেশি লাগতো। মানুষ অভ্যাসের দাস, তাই আমিও এই পদ্ধতিতে বাংলায় লিখতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম এবং বেশ স্বাচ্ছন্দ্যও বোধ করি। এমনকি এই পদ্ধতিতে একটি বইও লিখে ফেলেছি।

এভাবে কম্পিউটারে সরাসরি বাংলা লেখায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এখন আর সেভাবে কাগজে হাতেকলমে লিখতে পারি না। জানি লজ্জার, তারপরও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এখন মনে হয় কাগজে কলম দিয়ে লেখা ভুলেই গেছি। এখন যদি কেও তিন লাইনের ছোট্ট একটি বক্তব্য লিখে দিতে বলে, তাহলে আর কাগজে কলম দিয়ে সেভাবে লেখা সম্ভব হয় না। তখন ল্যাপটপ খুলে সেখানে মুহূর্তের মধ্যেই লিখে ফেলতে পারি। লিখছি ঠিকই কিন্তু মনে বড়ো কষ্ট আছে। জীবনের শুরুতে কত কষ্ট করে হাতের লেখা শিখেছি। সুন্দরভাবে লেখা রপ্ত করার জন্য মার হাতে কত না চড়-থাপ্পড় খেয়েছি! স্কুল শিক্ষকের কাছে কত গালমন্দ শুনেছি এবং মারও খেয়েছি। একটু উচ্চ শ্রেণিতে ওঠে যাওয়ার পর হাতের লেখা খারাপ হওয়ার কারণে আর সেভাবে শিক্ষকদের হাতে মার না খেলেও, পরীক্ষায় অনেক নম্বর গচ্ছা দিতে হয়েছে। কেননা সেই সময় সুন্দর হাতের লেখার জন্য নির্দিষ্ট একটা নম্বর বরাদ্দ ছিল, যা আমি কখনই পাইনি। এত কষ্ট এবং সাধনা করে শেখা হাতের লেখা নিজের জীবদ্দশাতেই এভাবে ভুলতে বসেছি, তা ভাবতেই খারাপ লাগে। যা-হোক খারাপ লাগলেও, কিছু করার নেই। প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার নামে আমরা আজ প্রযুক্তির দাসে পরিণত হয়েছি। তাই প্রযুক্তি আমাদের যেভাবে এবং যেদিকে নিয়ে যাবে, আমাদেরকেও সেভাবেই এবং সেদিকেই যেতে হবে।

একটি বিখ্যাত চাইনিজ প্রবাদ আছে যে, বিড়াল সাদা না কাল, সেটি বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা হচ্ছে বিড়াল ইঁদুর ধরে কি না। তেমনি কাগজে কলম দিয়ে লিখছি, না কম্পিউটারে সরাসরি টাইপ করে লিখছি, সেটি বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হচ্ছে লিখছি কি না। আসলেই লিখতে পারছি। যথেষ্ট সহজে এবং অধিক পরিমাণেই লিখতে পারছি। এই যে লিখতে পারছি, সেটাই বড়ো কথা এবং সেটাই বড়ো প্রাপ্তি। এক সময় বিদেশে আসার ক্ষেত্রে একটা আতঙ্ক এবং শঙ্কা কাজ করত যে আমরা হয়তো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ভাষা ভুলে যাবো। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এই ইংরেজির দেশেও এখন বাংলা চর্চা করতে কোনোরকম সমস্যা নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজের দেশের চেয়েও এই ইংরেজির দেশে বেশি বাংলায় লেখা যায়, পড়া যায় এবং কথা তো বলা যায়ই। এই চর্চাটা যদি নতুন প্রজন্মের মধ্যে সমহারে প্রসারিত করা যায়, তাহলেই ইংরেজির দেশে বাংলা চর্চার শতভাগ সফলতা অর্জন সম্ভব।

লেখক পরিচিতি
পেশায় ব্যাংকার এবং সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে অনার্স-মাস্টার্স, পরবর্তীকালে ব্যাংকিং ডিপ্লোমা এবং ল পাশ। কানাডা থেকে CPA, CMA এবং আমেরিকা থেকে CAMS ডেজিগনেশন। কানাডায় ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত। তিনি বাংলাদেশের একাধিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। ২০২২ সালে প্রকাশিত তাঁর দুটি গ্রন্থ হলো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং অনলাইন ব্যাংকিং’ এবং ‘Banking: Developed World’s Perspective’।