এক প্রবাসীর গল্প

তাহমিনা সুলতানা

সময়টা ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাস। আমার প্রথম বিদেশে আসা। তাও আবার জীবন-যাপনের জন্য। কখনও এমন নিজদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবি নাই। কিন্তু কপালের লেখায় প্রবাস জীবন এড়ানো সম্ভব হয়নি।

টরন্টো পিয়ারসন এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দেখি ক্যাপ পরা হাস্যোজ্বল এক যুবক দাঁড়িয়ে আমাদের নেয়ার জন্য। আপাতত ওর বাসায়ই আমাদের থাকার কথা। আমার স্বামী মাসুদের ক্যাডেট কলেজের রুমমেট- দোহা ভাই।

ডাউন টাউনে দুই বেডরুমের একটা এ্যাপার্টমেন্টে গায়ানিজ বউ ও ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে ওর সংসার। খুব সাধারণ গৃহসজ্জা। তবে অত্যন্ত পরিষ্কার। দুই বেডরুম, লিভিং স্পেসে একটা টেবিল, সেখানে কাচের ফুলদানিতে একটা লাল গোলাপ।

দোহা ভাই দারুণ মানুষ। এমন কেউ হতে পারে না যে ওকে পছন্দ করবে না। অনেক গল্প করেন। রাতে আমাদের গল্পের আসর জমতো। ওর মস্তিষ্কে দুনিয়ার কথা, ছোটবেলার ছড়া/কবিতা, আর দুষ্টমী জমা।

দোহা ভাইয়ের বউ কামি। আসল নাম কামিনি হতে পারে কি না জিজ্ঞেস করিনি। অনেক ভালো মেয়ে। আমেরিকায় ছোটকালেই চলে এসেছিল। ওর ইংরেজি ইন্ডিয়ানদের ইংরেজির মতো সহজ। তারপরও প্রথম প্রথম কথা বলতে আমার একটু অসুবিধা হতো। কোনো কথা বলার আগে সেটাকে ইংরেজি মনে মনে ট্রান্সলেশন করে নিতে হতো। দোহা ভাইয়ের বাসায় প্রবাস জীবনের শুরুটা আসলে আমার ভালো ছিল।

২.

দোহা ভাইয়ের বাসায় আমরা ১৫ দিন ছিলাম। এর মধ্যে আমরা বাসা ভাড়া করি- ডাউন টাউনেই। জায়গাটার নাম স্পেন্সার এ্যাভিনিউ। একটা চারতলা বিল্ডিং-এর এক তলায় এক বেডরুমের এ্যাপার্টমেন্ট। ডাইনিং-ড্রয়িং, এর সাথেই লাগানো কিচেন। তেমন ভালো বাসা না। দিনে আলো কম আসতো, তারপরও সেটাই আমার জীবনের প্রথম নিজের সংসার। অন্য রকম আনন্দ। সাথে আমার তিন বছরের ছেলে আর দুই বছরের মেয়ে। ওরা খোলা বাড়িতে ইচ্ছামত দৌড়াদৌড়ি করতে পারবে, এইসব ভেবে খুশী হলাম।

আমার এরিয়াটা পুরাতন। আশেপাশের বাড়িগুলোর অবস্থা ভালো না। কেমন ভাঙ্গাচোড়া। তবে হেঁটে হেঁটে অন্টারিও প্লেসে যাওয়া যায়। লেক অন্টারিওর সাথে সুন্দর বেড়ানোর জায়গা। বিল্ডিং থেকে হেঁটে হেঁটে অনেক জায়গা যাওয়া যেতো- লাইব্রেরি, পার্ক, গ্রোসারি স্টোর।

বাসা থেকে সামান্য দূরে ছিল, ‘মোর দ্যান চাইল্ড’স প্লে’। ওখানে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে সময় কাটাতে পারতো। বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল। মায়েরা বাচ্চাদের সাথেই থাকবে। আমি প্রায়ই ওখানে যেতাম। মানুষজন দেখতে ভালো লাগতো। ওখানে সিমার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। সিমা (ছিমা) ইন্ডিয়ান মেয়ে। ওর তিন বছরের একটা বাচ্চা ছিল।

সিমা কয়েক বছর আগে কানাডা এসেছিল। কিন্তু ওর প্রথম বন্ধুত্ব আমার সাথে হয়েছিল। সিমাই আমাকে এই কথাটা বলেছে। আমার বাসা থেকে সামান্য দূরে সিমার বাসা। আমাদের এক বছর চমৎকার বন্ধুত্ব ছিল। আমি সিমার বাসায় যেতাম। সিমাও আমার বাসায় আসতো। আমরা একসাথে অন্টারিও প্লেসে বেড়াতে গিয়েছি। রাইড চড়েছি। মেয়েটা মন-মানসিকতায় ঠিক আমার মতো ছিল। ওর সাথে ইংরেজিতে কথা বললেও আমার কখনো মনে হয় নাই আমি নিজের ভাষায় কথা বলছি না। শুধু একদিন ওর বাসায় গিয়ে ওকে মিনি স্কার্ট পরা দেখে মনে হয়েছিল আমরা আসলে একটু আলাদা।

৩.
ডাউন টাউনে আমরা এক বছর ছিলাম। এরপর স্কারবোরোয় টাক্সিডো কোর্টে এ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করি। বড় এরিয়া জুড়ে অনেকগুলা বড় বড় বিল্ডিং। আমার এ্যাপার্টমেন্টটা ২১ তলার নয়তলায়। আগের বাসার সাথে তুলনা করলে অনেক ভালো। খোলামেলা। আলো আসে। দখিনে চওড়া বারান্দায় কবুতরের আনাগোনা। এরা সারাক্ষণ বারান্দা ময়লা করে। একদিন দেখি এক কোণায় একটা কবুতর ডিম পেড়েছে। ওখান থেকে তিনটা বাচ্চা হয়েছিল।

এই কমপ্লেক্সে সবাই প্রায় দক্ষিণ এশিয়ার। পাকিস্তানি, তামিল, ইন্ডিয়ান। বেশ কিছু বাংলাদেশিও আছে। আমার বিল্ডিংএ আরও তিনটা বাংলাদেশি পরিবার ছিলো। ঈদে কেমন বাংলাদেশ বাংলাদেশ ভাব চলে আসতো। এখানের দোতলার ভাবির সাথে আমার খুব খাতির হলো। অতিরিক্ত ভালো মহিলা। কথা বলতে আমার কী যে ভালো লাগতো!

এই সময় আমার চার বছর বয়সী ছেলে জুনিয়র কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া শুরু করলো। আমার নতুন ডিউটি- স্কুলে আনা-নেয়ার কাজ শুরু হলো। এই সুবাদে বেশ কিছু বন্ধু জুটে গেলো আমার। আমি কিছুদিন ওর স্কুলে ভলেন্টিয়ার জব করেছিলাম। অল্প কিছুক্ষণ বাচ্চাদের পড়তে শেখাতাম। এই সময় ‘হোম-বেসড ডে কেয়ার’ বিষয়ে ছোট একটা কোর্সও করেছিলাম। ঘরে বেবি সিটিংও করেছি কিছুদিন। পরে আর ভালো লাগে নাই। চাই নাই কন্টিনিউ করতে।

এখানে আমরা দুই বছর ছিলাম। এই সময়ে মাসুদের ড্রাইভিং লাইসেন্স হয়। ও একটা পুরাতন গাড়ি কেনে। কিন্তু এইসব দেশে এটা একটা বিগ চেঞ্জ বলে আমার মনে হয়। গাড়ি থাকা মানে লটস অব ফ্রিডম। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা। জবে যাওয়া, আসার সময় কমে যাওয়া। ইত্যাদি, ইত্যাদি। দারুণ সব সুবিধা।

এখানে থাকতে আমি এদিক সেদিক একটু খোঁজ খবর নিতাম। এখানে সেখানে যেতাম। একদিন এমন কী জন্য যেন গেলাম একটা কমপ্লেক্সে। হঠাৎ কে যেন আমাকে ডাকলো- রেখা। তাকিয়ে চিনেছিলাম কি না সেটা মনে নেই। শিল্পী। আমার সাথে ইউনিভার্সিটি পড়তো। খুবই আন্তরিক মেয়ে। ভালোতো অবশ্যই। শিল্পীর মাধ্যমে ভূগোল বিভাগের পুরা একটা গ্রুপের সাথে আমি কানেকটেড হয়েছিলাম। আমার ডাইরেক্ট টিচার মিজান স্যারও ছিলেন এই গ্রুপে। গেট টুগেদারে গেলে কেমন আপন আপন লাগতো। অনেকটা সময় আমাদের সুন্দর কেটেছে।

লেখক পরিচিতি
তাহমিনা সুলতানার জন্ম ৩ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিভাগে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর তিনি। ২০০০ সাল থেকে তিনি কানাডার টরন্টোয় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ পর্যন্ত তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হলো ‘অর্থহীন কথামালা’ (২০২০), ‘দখিন হাওয়ায় একলা নদী’ (২০২১), ‘একলা প্রহর’ (২০২৩)।