কর্মজীবনে বিশেষ সান্ত্বনার জায়গাটুকু

মেজর (অব.) সুধীর সাহা

ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং সেখানে সৃষ্ট মুসলিমবিরোধী সেন্টিমেন্টের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়। ৭ ডিসেম্বর ঢাকেশ্বরী মন্দির এবং ভোলানাথ গিরি আশ্রম আক্রমণ ও লুট করা হয়। পুরানো ঢাকায় অবস্থিত কয়েকটি হিন্দু মালিকানাধীন স্বর্ণব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়। রায়েরবাজারে কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ওই একই দিনে ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের বাংলাদেশ-ভারত প্রতিযোগিতায় প্রায় পাঁচ হাজার মুসলিমকে লোহার রড, বাঁশের লাঠি নিয়ে আসতে দেখা যায়। পুলিশ এই মবকে ঠেকাতে ব্যর্থ হলে ৮ দশমিক ১ ওভার খেলাশেষে কর্তৃপক্ষ খেলাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে সারা দেশে হিন্দু ঘর-বাড়ি এবং মন্দির আক্রান্ত হতে থাকে। এই সংঘর্ষে ১০ জন হিন্দু নিহত হয় এবং ১১টি মন্দিরসহ অসংখ্য হিন্দু ঘর-বাড়ি ভাঙচুর হয়। আমি তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর হিসেবে চাকরিরত।

নিরাপত্তার স্বার্থে হিন্দু সেনা কর্মকর্তাদের ক্যান্টনমেন্টের বাইরে না যেতে পরামর্শ দেওয়া হয় সেনাসদর থেকে। তখন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র হিন্দু সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী সিনিয়ার অফিসার মেজর জেনারেল নাসিম আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ-ই ফোন পাই জেনারেল নাসিমের। গতানুগতিক আলাপ, আমার ও পরিবারের ভালো-মন্দের খোঁজ-খবর। সবশেষে বললেন, কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ফোন করবে। সেই সময়ের ওই পরিস্থিতিতে তার তেমন একটি টেলিফোন কলের উদ্দেশ্য বুঝতে আমার অসুবিধা হলো না। মেজর র‍্যাঙ্কের একজন আর্মি অফিসার, শুধুমাত্র মাইনরিটি সম্প্রদায় হওয়ার কারণে তার প্রিয় জেনারেল তাকে অভয় দিচ্ছেন- বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল। খুবই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলাম মানসিকভাবে। আমার যেখানে অন্য হাজার অসহায় মানুষকে অভয়ের বাণী শোনানোর কথা, শুধুমাত্র মাইনরিটি বলে তাকেই অভয় নিতে হচ্ছে অন্য এক জেনারেলের নিকট থেকে! শুধু অসহায়ত্ব নয়, ভীষণভাবে অপমানিত বোধ করলাম। চাকরির ভবিষ্যৎ, ব্যক্তি ও ব্যাপ্তির সোপান সব যেন হঠাৎ করেই গৌণ হয়ে গেল। নিরাপত্তার বিষয়টি হয়ে দাঁড়াল প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

২.

জন্ম নিয়েছি যে দেশে, সে দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে আর মন চাইল না। ভারতে যাওয়ার কথা কোনোদিনই ভাবতে পারিনি। উন্নত বিশ্বের নাগরিক হওয়ার সাধ জাগলো মনে। বেছে নিলাম আমেরিকা, কানাডা অথবা ইউরোপের কোনো দেশ। মনে মনে গুছিয়ে নিলাম নিজেকে। ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভিসাসহ আমেরিকা এবং কানাডার ভিসা সংগ্রহ হয়ে গেল। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে চলে এলাম আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে বন্ধু লে. কর্নেল (অব.) আনামের বাসায়। বন্ধু জানালেন, আমেরিকা ইজ আমেরিকাই; থেকে যান এখানে।

এক সপ্তাহ যেতেই মনটা কেন যেন বিদ্রোহ করলো! নিউ ইয়র্কের সামাজিক পরিবেশ মনে ধরলো না। অগত্যা কানাডার অজানা উদ্দেশে জাহাজ চালিয়ে দিলাম। মন্ট্রিয়লের অজানা পরিবেশে এক পরিচিত ব্যক্তির বাসায় উঠলাম। তিনদিনের মাথায় ভদ্রলোক উপদেশ দিলেন- কানাডা খুব সুন্দর দেশ; এদেশে এসেছেন, খুব বেশি বেশি খাবেন এবং আমেরিকান খেলা দেখবেন। একই ভদ্রলোক পরের রাতে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। কে একজন তার কাছে আমার কথা জানতে চেয়েছেন। জানতে চাওয়া ভদ্রলোক আমাকে মেজর সম্বোধন করেছেন। এখানেই তার রাগ। মেজর-টেজর বলবেন না, এখানে ওসব নেই- সবাই সমান। স্মিত হেসে তাকে সান্ত্বনা দিল- ঠিক আছে। ভদ্রলোককে এড়াতে খুব দ্রুত একটি বাসাভাড়া নিয়ে নিলাম। দুদিন পর ভারতীয় একটি গ্রোসারি দোকানে বাজার করতে গেলাম। মালপত্র ওঠানামা করা সাহায্যকারী লোকটাকে বাংলাদেশেরই মনে হলো। গালভরা হাসি দিতেই সে জানা- ভাই কি নতুন আসছেন? সোজা বাংলায়ই জিজ্ঞেস করল সে। ধরেই নিয়েছে, আমিও বাংলাদেশ থেকেই এসেছি। বেশ দরদ দেখিয়ে বললো- ভয় পাবেন না। কাজের দরকার হলে এখানে আসবেন, আমি সাহায্য করবো। এখানে অনেক কাজ, আমার একজন সাহায্যকারীও দরকার। এলেই ঢুকিয়ে দিতে পারবো।

৩.

দেখতে দেখতে ঠিক দশ মাস কেটে গেল। টরন্টোতে স্থানান্তরিত হলাম। কী করব, ভাবতে ভাবতেই চলে গিয়েছে এই দশ মাস। মন্ট্রিয়লের আইনজীবী দস্তালার খুব অনুরোধ জানালো তার সঙ্গে কাজ করার। কিছুতেই মন্ট্রিয়লে থাকবো না এবং ইংলিশ স্পিকিং প্রদেশে যাবো, একথা বুঝতে পেরে টরন্টোর একজন আইনজীবীর রেফারেন্স দিলেন তিনি। টরন্টো এসে সেই আইনজীবীকে সাহায্য করা শুরু করলাম। তিনি ইমিগ্রেশন সেক্টরে বেশ স্বনামধন্য আইনজীবী। পরামর্শ দিলেন, বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করার। পার্টনারশিপে শুরু হলো বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের ইমিগ্রেশন প্র্যাকটিস। তখনও বাংলাদেশ থেকে ইমিগ্রেশন নিয়ে কেউ আসা শুরু করেনি। সমুদ্রের মতো মনে হলো বিষয়টি। ততদিনে ঢাকায় আমার ল’ অফিস ছেড়ে দিয়েছিলাম। মূলত আমার এক বন্ধুকে ব্যবসা ও অফিস দিয়ে এসেছিলাম। এবার সেই অফিসেই শুরু করলাম ইমিগ্রেশন ব্যবসা। বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল তখনও ইমিগ্রেশন প্রত্যাশী আবেদনকারীদের। দু-একজন করে আসা শুরু করলো। প্রত্যেকের চোখে-মুখে শুধু প্রশ্ন- বিষয়টি সত্যি তো? এভাবে কয়েক মাস কেটে গেলে সেই সিনিয়র আইনজীবী একদিন আমাকে প্রস্তাব করলেন- এবার তোমার অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে, তুমি এখন নিজের একক প্র্যাক্টিস শুরু করতে পারো।

কোম্পানি গঠন করে শুরু করলাম কানাডাতে বাংলাদেশিদের ইমিগ্রেশন নিয়ে আসার রাস্তাটুকু। উৎসুক বাংলাদেশি ক্লায়েন্টদের চোখে তখন শুধু একটিই প্রশ্ন- বৈধ উপায়ে ইমিগ্রেশন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে সত্যি সত্যি কি কানাডা আসার উপায় আছে? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় শুরু হওয়া প্র্যাক্টিস ইতোমধ্যেই ৩১ বছর পার হয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার বাংলাদেশের মানুষ আমাদের আইনগত সাহায্য নিয়ে কানাডাতে এসেছে। এসব গতানুগতিক কার্যাবলির মধ্যে দুটি ঘটনা আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। প্রফেশনাল জীবনে অনেক বড়ো প্রশান্তি দিয়েছিল ওই দুটি ঘটনা। তা ছিল একদিকে অসম্ভবের বুকে সম্ভবের পদধ্বনি, আর অন্যদিকে আমার প্রফেশনাল জীবনপথে উজ্জ্বলতর পাথেয়- এখনো যা স্মরণ করে আমি আনন্দ-উত্তেজনায় শিউরে ওঠি, উদ্বেলিত হই, আহ্লাদিত হই। পাঠকের জন্য ওই ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরলেও সঙ্গত কারণে ব্যক্তিবিশেষের গোপনীয়তার স্বার্থে এবং আমার প্রফেশনাল গোপনীয়তার স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করছি না।

৪.

ছেলেটি একসময় ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডাতে এসেছিল। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এই যুবকের প্রেমিকা তখনও বাংলাদেশে। ঢাকার পুরানো শহরের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত একটি এলাকায় বসবাস করতে গিয়ে পাশের একটি মুসলিম পরিবারে প্রাইভেট পড়াতো খ্রিষ্টান যুবকটি। প্রাইভেট পড়াতে পড়াতে কখন যে সে মেয়েটির প্রেমে পড়ে যায়, তা নিজেও বুঝতে পারেনি। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েটি সাহস করে প্রেম করতে পারে, তা-ও আবার একজন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ছেলের সঙ্গে এমন ভাবনাও মনে আনার সাহস ছিল না মেয়েটির। কিন্তু দুজনেই যখন তাদের গোপন প্রেমের ছবি তাদের সামনে একদিন উপলব্ধি করে, একজন অন্যজনকে অবলম্বন করে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নের চিত্র দেখতে পায়- বিশেষ করে মেয়েটি তখন ভয় পেয়ে যায়। এ তো হবার নয়! এ তো সর্বনাশের ডাক দেবে! এ পথ তো দুজনের জন্যই সমস্যা ডেকে আনবে! অতএব, আর নয়। শুরুতেই শেষ হোক এই দুঃসাহসিক অভিযাত্রা। ছেলেটি অভয় দেয় মেয়েটিকে- একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মেয়েটি তারপরও শিউরে ওঠে।

বাবাহীন পরিবারে মামাদের কঠিন শাসনে এবং মায়ের সার্বক্ষণিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে বড়ো হয়ে ওঠা রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েটি কোনোভাবেই ভাবতে পারে না- তার পরিবার একজন খ্রিষ্টান ছেলেকে তাদের মেয়ের স্বামী হিসেবে মেনে নেবে। তাই, না-হয় হোক নিজের ক্ষতি, নিজের বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড় করানো, তবুও এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা যাক। কিন্তু পারে না তারপরও। ততদিনে মন চলে গিয়েছে তার অন্য একজনের মনের মধ্যে। মেয়েটি ততদিনে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করে ফেলে। তাই তাকে প্রাইভেট পড়ানোর কাজ শেষ হয় ছেলেটির। কিন্তু মন তো মানে না! রোজ দেখা না হলে হাহাকার করে মন। পাশের বাড়ির রাস্তায় কেটে যায় তার অধিকাংশ সময়। একবার যদি ব্যালকনিতে দেখা মেলে তার! ততদিনে দুই পরিবারেই একটু একটু জানাজানি হয়ে যায় ব্যাপারটি। মেয়েটি চাকরি পায় শাহবাগের ডায়াবেটিক হাসপাতালে। ছেলেটির চাকরির জায়গা মতিঝিল। এবার তাদের গোপনে দেখা করার জায়গা শাহবাগের ডায়াবেটিক হাসপাতাল। মেয়েকে বিশ্বাস করতে পারে না মা, মাঝে মাঝেই সঙ্গে চলে আসেন। কিন্তু তাদের গোপন প্রেমে বাধা দেওয়া সম্ভব হয় না।

৫.

একদিন ছেলেটির সেই সুযোগের দিনটি আসে। মাকে নিয়ে কানাডা যাওয়ার সুযোগ। বোন আগেই ছিল কানাডাতে। এবার তাকেও চলে যেতে হবে। প্রেমিকার হাত ধরে অঝোরে কান্না! দুজনের প্রতিজ্ঞা- একে অপরকে ছাড়া তারা বাঁচবে না। বাঁচতে হলে একসঙ্গে বাঁচবে, মরতে হলেও একসঙ্গে মরবে। এই কথা ধরেই একদিন ছেলেটির ফ্লাইট- সোজা টরন্টো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। দূরে, যত দূরেই থাক তারা- দুজনের মন সেই আগের মতোই; একের মন অন্যজনের মধ্যেই থেকে গেল।

পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে গেল, যখন মেয়েটির বড়ো মামা সবিস্তারে সব জেনে গেলেন। সমাজে তারা মুখ দেখাতে পারবে না- এমনটা মনে হওয়ায় এবার মেয়েটির ওপর কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো পরিবার। মামার পরামর্শে মেয়েটির মা, মেয়ের চাকরিতে যাওয়া বন্ধ করে দিতে চাইলেন। মেয়ে বেঁকে বসলো এবং জোর করে বলে দিলো- ওর কানাডা যাওয়ার পর আর কোনো যোগাযোগ নেই আমাদের। তারপরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিল পরিবারটি। বিশ্বাস করতে পারছে না মেয়েটিকে। মেয়ের তিন মামা, মা এবং অন্যান্য আত্মীয়রা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলো- মেয়ের চাকরি বাদ। চাকরি ছাড়ার নোটিশ দিতে বলা হলো মেয়েটিকে। দুঃসংবাদটি চলে এলো কানাডাতে। ছেলেটি অস্থির হয়ে ওঠলো। এই সময় ছেলেটি যোগাযোগ করলো আমার সঙ্গে। সরলভাবে স্বীকার করলো তার প্রেমের কথা, মেয়েটিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসার কথা। তাকে ছাড়া বাঁচবে না ছেলেটি! পরামর্শ দিলাম ঢাকা চলে যেতে। বিয়ে করে নিয়ে আসতে বললাম কানাডাতে। বিয়ে করার জন্য তার ঢাকা যাওয়া প্রয়োজন। বিয়ে হলে তখন স্পন্সর করে সে নিয়ে আসতে পারবে তার বউকে। ছেলেটির ঘটনা জেনে মন আমার গলে গেল। জানালাম, আমি সবরকম সাহায্য করবো। ছেলেটি টিকিট বুক করে ফেললো। চলে যাবে সে ঢাকাতে; বিয়ে করবে তার প্রেমিকাকে। সব যখন ঠিকঠাক, তখন ঘটলো আরও কঠিন ঘটনা। মেয়েকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হলো না। মা কর্মস্থলে গিয়ে জানিয়ে এলো- মেয়ে কাল থেকে আর অফিসে আসতে পারবে না। ঘরে বন্দি করে রাখা হলো মেয়েটিকে। যোগাযোগ করার সব মাধ্যম আটকে দেওয়া হলো।

এমনিতেই ছেলেটি তার বোন ও মায়ের বিরুদ্ধে মেয়েটিকে জীবনসঙ্গী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং সারাক্ষণ মেয়েটির দুর্ভাবনার কথা ভাবছিল; মেয়েটিকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে জেনে একেবারে ভেঙে পড়লো। হঠাৎ সে স্ট্রোক করে বসলো। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। হাসপাতালের বেডে শুয়েই ছেলেটি একজন নার্সের সাহায্যে আমাকে ফোন করলো। ততদিনে তার শরীরের একপাশ অবশ হয়ে গিয়েছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আমি হাসপাতালে তাকে দেখতে গেলাম। হাউমাউ করে ছেলেটি কেঁদে জানাল- আমি শুধু ওকে চাই। ভেবে পাচ্ছিলাম না, কীভাবে ওদের দুজনকে সাহায্য করবো! কানাডা ইমিগ্রেশনের অটোয়াস্থ কেন্দ্রীয় অফিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিস্তারিত জানিয়ে চিঠি দিলাম। মানবিক কারণে দুটি জীবনকে রক্ষা করার আবেদন জানালাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে পজিটিভ একটি উত্তর এলো। পরামর্শ এলো- আমি সাহায্য করতে উদ্যোগ নিলে তারা ঢাকাস্থ কানাডিয়ান হাইকমিশনকে সেভাবে নির্দেশিকা জানাবে। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে আবার হাসপাতালে ছুটে গেলাম। ছেলেটির স্বাক্ষর নিলাম, যেন আমি তাকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারি। সিদ্ধান্ত হলো, কানাডা সরকার মেয়েটিকে ভিজিট ভিসা প্রদান করবে। ভিজিট ভিসায় কানাডাতে আসার পর হাসপাতালেই তাদের বিয়ে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সেভাবেই অনুরোধ করবে সরকার। ছেলেটিকে দীর্ঘ সময়ই যেহেতু হাসপাতালে থাকতে হবে, তাই এমন সিদ্ধান্ত। এরপর আমি ঢাকা গেলাম এবং ছেলেটির পরামর্শ অনুযায়ী মেয়েটির দুজন বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বান্ধবী দুজন দেখা করার অজুহাতে মেয়েটির বন্দি শিবিরে যেতে পারে এবং আমার পরামর্শ অনুযায়ী তার স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পারে। বান্ধবী দুজন আমার পরামর্শ অনুযায়ী মেয়েটির মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেয়েটিকে সবিস্তারে সব ঘটনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বুঝিয়ে দিয়েছিল।

৬.

কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা মেয়েটির ভিজিট ভিসার অ্যাপ্রোভাল পেয়ে গেলাম। বান্ধবী দুজন মেয়েটির পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। কেননা, সে-সময় পাসপোর্টটি তার মায়ের কাছে ছিল। বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং বিশেষ বিবেচনায় কানাডিয়ান কনস্যুলেট অফিস সম্মত হলো- মেয়েটি যদি নিরাপদে বাড়ির বাইরে আসতে পারে, তবে তারা এয়ারপোর্টে তার ভিসা সিল দিয়ে দেবে। সেই অনুযায়ী মেয়েটির টিকিট বুকিং হলো। ভিসা অফিসের একজন অফিসার এয়ারপোর্টে এলেন। কিন্তু সমস্যা ছিল- বন্দি অবস্থা থেকে মেয়েটি বাড়ির বাইরে আসবে কীভাবে? রক্ষাকারী বান্ধবী দুজন আবার গেল তার মায়ের কাছে। তাদের একজন চাকরি করতো মেয়েটির সঙ্গে একই সংগঠনে। মাকে তারা বোঝাতে সমর্থ হলো- মেয়েটিকে অফিসে যেতে হবে তার পাওনা টাকা গ্রহণ করতে, অন্যথায় টাকাটা পাওয়া যাবে না। মা সম্মত হলেন। নির্দিষ্ট দিনে সকালে দুই বান্ধবী হাজির হলো মেয়েটির বাড়িতে। তাকে নিয়ে সোজা শাহবাগ, সেখান থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ব্যবস্থা অনুযায়ী মেয়েটির পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্পড হলো এবং মেয়েটি বিমানে ওঠে গেল। আমি তার আগেই টরন্টো পৌঁছে গিয়েছি। টরন্টোতে মেয়েটির পরিচিত কেউ নেই। ছেলেটির মা ও বোন তাদের বিয়ে কিংবা মেয়েটিকে মেনে নেবে না। এমন একটি পরিস্থিতিতে ছেলেটির বিশেষ অনুরোধে আমি টরন্টো বিমানবন্দরে গিয়ে মেয়েটিকে স্বাগতম জানাই। সেদিন মেয়েটি যে কৃতজ্ঞতায় আমার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছিল, তা আজও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তির অন্যতম একটি হয়ে আছে।

মেয়েটিকে কোথাও রাখার সুযোগ ছিল না। তাকে আমাদের বাসাতেই আশ্রয় দিলাম। পরের দিন সকালে টরন্টো ডাউন টাউনের হাসপাতালে মেয়েটিকে নিয়ে গেলাম। অনেক কান্নাকাটির পর শুরু হলো মূল আয়োজন। হাসপাতালের নার্স, সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং অন্যদের সাহায্যে আগে থেকে স্থির হওয়া ব্যবস্থায় অসুস্থ ছেলেটির সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে সম্পন্ন হলো। বিয়ের ছোট্ট আয়োজন এবং মিষ্টি কেনার দায়িত্ব আমি আর আমার স্ত্রী-ই গ্রহণ করলাম। হাসপাতালে বিয়ের পর নতুন বউকে আবার আমাদের বাসাতেই নিয়ে যেতে হলো। এরপর সে সারাদিন থাকতো ছেলেটির সঙ্গে এবং রাতে বাসায় গিয়ে ঘুমাতো। তাকে হাসপাতালে আনা-নেওয়ার কাজটি মহা-আনন্দ আর আগ্রহের সঙ্গেই করেছি। মেয়েটির সান্নিধ্য এবং পরিচর্যায় দ্রুত ছেলেটি হাসপাতাল ত্যাগ করার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেল। ইতোমধ্যে মেয়েটির টরন্টো আসার সংবাদ এবং ছেলেটির সঙ্গে বিয়ের সংবাদ জেনে ছেলেটিকে হাসপাতালে দেখতে আসা থেকে বিরত থাকলেন তার মা ও বোন। ছেলেটি একাই সাহস করে মেয়েটিকে নিয়ে নতুন ঘর বাঁধার স্বপ্নে এগিয়ে গেল। দুটি মানুষ শত বাধার মধ্যেও একজন অসুস্থ-পঙ্গু শরীর নিয়ে ঘর বাঁধলো, যে ঘর আজও অক্ষুণ্ণ আছে। ছেলেটি এখন হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে স্বাভাবিকভাবেই। তাদের ঘরে ফুটফুটে একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। খুব ভালো আছে তারা। আজও তাদের সেদিনের সেই বাঁধভাঙা প্রেম বজায় আছে। ভুলে গিয়েছে- কে ছিল মুসলমান, কে ছিল খ্রিষ্টান; তারা দুজন আজও মানুষ হয়ে আছে।

৭.

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। দুদিন পরই ঢাকা থেকে টরন্টোর উদ্দেশ্যে আমার ফ্লাইট। এরও দুদিন আগে, সকাল ১১টায় অফিসে ছিলাম। কেউ একজন বললো- স্যার, মেজর… দেখা করতে এসেছেন। ভিসা পেয়ে গিয়েছেন, এক সপ্তাহ পরে ওদের ফ্লাইট। আপনি ঢাকা আছেন শুনে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। বউসহ এলো মেজর সাহেব। ইতোমধ্যে কানাডা যাওয়ার প্রস্তুতি তাদের শেষ। অনেক শুভেচ্ছা জানালাম। বোঝালাম- তোমাদের অসুবিধা হবে না, দুজনেই কষ্ট করতে পারবে; এখনো তোমাদের বয়স কম। যখন কানাডা ইমিগ্রেশনের আবেদন করবে বলে শুরুতে আমার সঙ্গে তারা দেখা করতে এসেছিল, আমার প্রশ্ন ছিল– কেন এখন যাবে? তোমার তো চাকরির ভবিষ্যৎ সামনে, অনেক দূরই যেতে পারবে। কিন্তু না, পরিবারটি বদ্ধপরিকর- তারা কানাডাতে যাবেই। আবেদনের পর যথাসময়ে তাদের ইমিগ্রেশন হয়ে গেল। এখন প্রস্তুতি নিয়ে শেষ দেখা করতে এসেছে। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর তারা চলে গেল। তার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের কথা নতুন করে মনে পড়লো ঠিক ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে, যখন জানলাম বিডিআর-এ মিউটিনি হয়েছে। বিডিআর ঢাকার পিলখানায় বিদ্রোহ করেছে এবং বেশ ক’জন অফিসারকে বিডিআর জোয়ানরা হত্যা করেছে। আমার মনে পড়ে গেল সেই মেজরের কথা। তারা বলছিল, তার বউ এখন বাবার (অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার) বাড়িতে থাকছে এবং মেজর সাহেব ঢাকা পিলখানার বাসায় একা থাকছে। ভিতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠল। পুরোটা সময় থাকলাম টিভির এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে। জানতে চেষ্টা করলাম, কী হচ্ছে ওখানে! ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি চললো এই বিদ্রোহ। অনেক ঘটনা ঘটলো, রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা হলো। একসময় যখন সব শেষ, তখন দেখা গেল ৫৬ জন আর্মি অফিসার এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। তখনও জানতে পারলাম না, কী পরিণতি হয়েছে হাতে কানাডা ভিসা পাওয়া ওই মেজর সাহেবের।

যথাসময়ে আমি টরন্টো চলে এলাম। এসেই ওই অফিসারের শ্বশুরের ফোনে জানতে পারলাম, সেই মেজর সাহেবও মৃত অফিসারদের একজন। তার বাসায় তাকে একা পেয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে বিডিআর জোয়ানরা। বাবার বাড়িতে ছিল তার বউ। কানাডা আসার আগে মা-বাবার সঙ্গে কয়েকদিন থাকার ইচ্ছে ছিল তার। একমুহূর্তে তার জীবনের সব শেষ! স্বামী, কানাডার ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, ভবিষ্যৎ আশা-ভরসা- সবই ছিল তার; কিন্তু আজ কিছুই নেই।

এক সপ্তাহ পর আবার ফোন পেলাম তার শ্বশুরের কাছ থেকে। ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে কিছু করা যায় কি-না সেই অনুরোধ। ওই মেজর ছিল প্রধান আবেদনকারী। তার এন্ট্রি না হলে তার ডিপেন্ডেন্টগণ অর্থাৎ তার স্ত্রী-সন্তান কানাডাতে ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে প্রবেশ করতে পারবে না এবং কানাডার স্থায়ী অধিবাসী হতে পারবে না। এমন অবস্থায় কী করা যায়, তা ভাবালো আমাকে। প্রিন্সিপ্যাল অ্যাপ্লিক্যান্ট না থাকলে ডিপেন্ডেন্টরা কোনো সুবিধা পাবে না জেনেও চিঠি লিখলাম যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে। ততদিনে বাংলাদেশের বিডিআর বিদ্রোহ সারাবিশ্বে জানাজানি হয়ে গিয়েছে। সিঙ্গাপুরে অবস্থিত কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিসাররা বিষয়টি অবগত ছিলেন। সব ঘটনা জানিয়ে মৃত আবেদনকারীর ফেলে যাওয়া বউ এবং সন্তানের ভবিষ্যতের স্বার্থে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার জন্য আবেদন করলাম। মেজরের পরিবর্তে তার স্ত্রীকে প্রিন্সিপ্যাল অ্যাপ্লিক্যান্ট করার অনুরোধ জানালাম। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, তারা বিবেচনা করলো এবং বউ-বাচ্চাকে ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে কানাডা যাওয়ার সুযোগ দিলো। মেজর সাহেবের বউ এবং শিশুসন্তান একদিন টরন্টো এয়ারপোর্টে নামলো এবং অনেকের মতো এই দেশটিকে তাদের নিজেদের দেশ হিসেবে গ্রহণ করার যাবতীয় মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করলো।

উপরের ঘটনা দুটি আমার প্রফেশনাল জীবনের বিশেষ উল্লেখযোগ্য দুটি ঘটনা এবং এই দুটি ঘটনাকে আমি কখনও ভুলতে পারিনি। ঘটনা দুটি আমাকে প্রশান্তি দেয়, পরম কষ্টেও আনন্দ দেয়। জীবনে যত কাজই করেছি, যত জনকেই সাহায্য করেছি, সব ছাপিয়ে এই দুটি পরিবার এবং এই দুটি ঘটনা আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি আলো নিয়ে আমাকে সুবাতাস দেয়, প্রশান্তি ও সান্ত্বনা দেয়।

লেখক পরিচিতি
১৯৫৭ সালে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএল.বি (অনার্স) এবং এলএল.এম শেষ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্যরূপে ওকালতি পেশায় নাম লেখান। লেখক, গবেষক, ব্যবসায়ী, ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞ, সমাজ সেবক অনেকগুলো বিশেষণের অধিকারী তিনি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য দৈনিক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখক। বইয়ের সংখ্যা ২৩। ১৯৯৩ সালে তিনি সপরিবার চলে আসেন সুদূর কানাডায় স্থায়িভাবে বসবাস করতে।