কানাডায় অভিজ্ঞতা
সৈয়দা রোখসানা বেগম
সবে মাত্র মাস্টার্স দিয়েছি তখন। ফলাফলের অপেক্ষায় আছি। হঠাৎ করেই মনে হলো, চলো আমেরিকা বা কানাডাতে যাওয়ার জন্য ভিসার এপ্লাই করি! অনার্স প্রথম বছর শেষ হতেই বিয়ে। ফাইনালের সময় ছেলের জন্ম। শাশুড়ি মা মাঝে মাঝে বলেন- সবার ছেলে-মেয়ে বিদেশে যায়, আমার ছেলে-মেয়ে যায় না কেন! কর্তা বড়ো পজিশনে থাকায় ভিসাটি পেতে বেগ পেতে হয়নি! বাচ্চাটি কোলে, বয়সটা নিতান্তই কম! কর্তা একটি ট্রেইনিং-এর সুযোগ পেয়ে গেলেন, এলাম Pan Pacific Vancouver-এ। ছিলামও সেই ফাইভ স্টার। সে এক luxury life দিয়ে শুরুটা! Limo এলো হোটেল থেকে এয়ারপোর্ট-এ pickup করতে।
যাক সে-সব কথা, প্রথম যে শিক্ষাটা পেয়েছি সেটা হলো এয়ারপোর্টে। মধ্যবয়সী ইমিগ্রেশন অফিসার ওয়েলকাম জানালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ক’জন তোমার ফ্যামিলিতে? কর্তা উত্তর দিলেন বাবা-মা, ছোটো ভাই ও একটি বোন! অফিসার কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বললেন আমি তো তোমার বাবার ফ্যামিলির কথা জিজ্ঞেস করিনি! তোমার ফ্যামিলিতে ক’জন? সে-ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো!
অফিসার বললেন- তুমি, তোমার ওয়াইফ এবং একটি বাচ্চা?
আমি বললাম- বং. অফিসার বললেন, this is your extended family young man! যাই হোক গাড়িতে বসে একটু মন খারাপ হলো। ও কেন আমাদের কথা বললো না! একটা কালচারাল ধাক্কা বৈ কি! আমাদের দেশে এভাবেই গোনা হয়ে থাকে। যাই হোক, ট্রেইনিং শেষে এক পরিচিত বন্ধুর বাড়ি গেলাম ভাত খাওয়ার জন্য! উনি দুদিন অবশ্য লুকিয়ে বাঙালি খাবার দিয়ে গেছেন হোটেলে! ওখানে কয়েকটি ফ্যামিলির সঙ্গে পরিচয় হলো। সবাই একই কথা বললেন টরন্টো চলে যান, ওখানে জব মার্কেট ভালো। আমি আসতে চাচ্ছিলাম না, কারণ, ভ্যাঙ্কুভার আমার ভালো লেগেছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভ্যাঙ্কুভার-এর সাথে তুলনা নেই! কর্তার ইচ্ছায়, বন্ধুদের ইচ্ছায় এলাম টরন্টো। টরন্টো আসার পর সবাই বলাবলি করছেন, চাকরির রেসেশন চলছে বরং মন্ট্রিয়ল চলে যাও। ওখানে বাচ্চার জন্য ভালো টাকা দেয়। এদিকে যে টাকা নিয়ে এসেছি প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
চলে গেলাম মন্ট্রিয়ল। কোনো কিছু না ভেবেই! অপরিপক্ক, নির্বোধ- যে যেভাবে বলছে তাই শুনে যাচ্ছি। গিয়ে তো এমন অসুবিধায় পড়েছি যে, সব ফ্রেঞ্চ! বাসে কোথাও যেতে পারছি না, ঠিকানা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে দিলাম। সে একঘণ্টা কোথায় ঘুরিয়ে নিয়ে গেল এবং মিটারে বিলটি বাড়িয়ে দিলো। সে যাই হোক, বাসা একটি নেওয়া হলো, পুরানো বাসা, রাতে কিচেনে যেতে ভয় পাই। কর্তাকে সাথে যেতে হয়, না হলে সব ফেলে লিভিং রুম-এ বাচ্চা নিয়ে বসে থাকি। পরিচয় হলো অনেকের সাথে, ধীরে ধীরে। অনেকেই ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন। না না! এখানে এসে শিখলাম বলতে হবে, কাজ করেন। সবাই বললেন, এখানে এভাবেই চলতে হবে। ভুলে যেতে হবে দেশে কী ছিলাম, কী করতাম… এইসব।
বুকের মাঝে কী যেন নেই, কী যেন নেই শুরু হলো। মাঝে মাঝে মনে হতো ফিরে যাবো না কি! শেষে বলে ফেললাম, ফিরে আসতে চাই। শাশুড়ি বললেন- এত টাকা খরচ করে গেছো, মানুষ তো যেতেই পারে না। হতাশা দানা বাধা শুরু হলো। সবার কথামতো গেলাম এক গারমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে, আর একজনের অনুপস্থিতিতে। মানে, উনি দেশে যাবেন তাই। সেখানে গিয়েও বিপত্তি দেখা দিলো। মেয়েরা যে কাজ তিন ঘণ্টায় করে, আমি এক ঘণ্টায় করে দিচ্ছি। একটি রাশিয়ান মেয়ে এসে ফ্রেঞ্চ ভাষায় গালি দিয়ে কী যেন বলে গেল। লাঞ্চের সময় এক বাঙালি লোকের সাথে পরিচয় হলো। দ্বিতীয় দিনে সে এসে বললো যে, এত তাড়াতাড়ি কাজ যেন না করি। এক সপ্তাহ করে আর গেলাম না ! কারণ, নিজের সাথে এই প্রতারণাটি মেনে নিতে পারলাম না। আর একটি কোট ফ্যাক্টরিতে কাজ পেলাম। কোটের বোতাম লাগানো, তারপর ইস্তিরি করা, তা-ও আবার মেশিনে! তিন দিন পর হাতের তালু লাল হয়ে আর কিছুই করতে পারছিলাম না। হাতের দিকে তাকিয়ে কান্না করছি আর বাসায় রান্না করছি। এদিকে বাচ্চা রেখে যাই- ডে কেয়ারে। এসে কিছুই করতে পারছি না। কর্তা বললেন, চলো ইংলিশ প্রভিঞ্চে চলে যাই এখানে জব পাওয়া যাবে না কারণ তিনি এসব কাজ করবেন না। কিন্তু আমাকে দিয়ে করাতে তার একটুও বাধেনি!

উনি প্রথম অটোয়া গেলেন দেখতে, ভালো লাগেনি, কারণ, ১৯৯০ সালে অটোয়াতে কিছুই ছিল না। ফিরে এলাম টরন্টো। এক মাসের মধ্যে তার চাকরি হয়ে গেল। কষ্ট করে চলতে হচ্ছে। ফার্নিচার কেনার টাকা নেই, শ্বশুরের কাছে চাওয়াটাও লজ্জার। ওরা জিজ্ঞেস করলে বলি- ভালো আছি।’
আমি জব খুঁজছি, বিভিন্ন জায়গায় রেজুমি দিচ্ছি, Service Ontario Job Bank-এ গিয়ে চেক করি। একদিন একজন, ওখানকার social worker বললেন দেখো, ৮৫% job remains hidden, so you have to go door to door.. তখন অনেক ইংরেজি টার্ম বুঝতে পারি না। শুরু করলাম বাসে করে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে রেসুমি দেওয়া। কত অফিসে গিয়েছি হিসেব নেই। আমি তার যোগ্য কি না, তার হিসেবও কষতে বসিনি।
এদিকে বকা খাচ্ছি বাসায় জীবনেও জব পাবে না। বাংলাদেশে একটা জিনিস আছে, যারা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে আসে, তাদের ধারণা, তারা বাংলা মিডিয়াম থেকে একটু উঁচু স্তরের। তর্কে যাই না, কারণ, তারা আসলেই ইংলিশে ভালো কিন্তু বাকি বিষয়ে গোবর। বাসায় এসে একমাত্র তাকেই অর্থগুলো জিগ্যেস করি।
বাচ্চাকে বেবি সিটার-এর কাছে রেখে যাই দু’তিন ঘণ্টার জন্য চাকরি খুঁজতে। একদিন ভুল বাসে ওঠে, গেলাম হারিয়ে। এখন একটু পরপর বাস ড্রাইভারকে গিয়ে বলছি আমার গন্তব্য। সে মনে হয় বুঝতে পেরেছে, তাই বললো, বাস থেকে নেমো না, এটা ঘুরে আবার ওখানে যাবে, তখন নেমে যেও। যেতে যেতে একটি ল্যাবরেটরি চোখে পড়লো। বিশাল কোম্পানি। মনে রেখে পরের দিন এসে অ্যাপ্লাই করলাম। রিসেপশনে বললো, ওরা এখন লোক নেবে না। প্রায় জোর করে বললাম একটু রেখে দিতে, কারণ, ততদিনে জেনে গেছি ওরা তিন মাস রাখে ফাইলে। পথ হারিয়ে পথের ঠিকানা পেলাম।
এক সপ্তাহ পরেই কল পেলাম ওখান থেকে। প্রসেসিং লাইনে কষ্ট, তবু করে গেলাম। একমাস পর ডিপার্টমেন্ট হেড বললেন, তোমাকে অন্য ডিপার্টমেন্টে দেওয়া হচ্ছে, ডেভেলপমেন্টের এসোসিয়েট হিসেবে কাজ করবে। রিটেইল এবং ফাস্ট ফুড-এর জন্যে বিভিন্ন যাবতীয় বিষয়ে আস্তে আস্তে শিখতে লাগলাম। সেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল! ডিরেক্টর বললেন, কোম্পানি সব খরচ দেবে তুমি Food Science-এ পড়ো এবং একটু upgrade করো University of Gueph থেকে। তুমি নিজেও জান না, তুমি কতটা পারদর্শী। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম! তিনি বললেন, তোমার মাস্টার্স ডিগ্রি আছে কেমিস্ট্রিতে। what a waste! আমি এই অবিচার হতে দেব না! Irish Boss ছিলেন। আমার এখনও কান্না পায় সেই বসের কথা মনে হলে। ১৮ বছর কাজ করেছি সেই কোম্পানিতে। প্রথমে Associate থেকে আস্তে আস্তে senior food scientist হিসেবে, এখন অন্য একটি Flavour Industry-তে Senior Flavourist হিসেবে কাজ করছি।
নিজে পড়েছি, ছেলেকে পাশে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে একই সাথে পড়েছি। রান্না, বাজার করা, বাথরুম ধোয়া, লন্ড্রি করা… সব। যেটা বাংলাদেশে কখনও করা হয়নি। পিছনে ফিরে তাকালে মনে হয়– এক নিঃশ্বাসে জীবনের কতটা বছর ঝরিয়ে ফেলেছি! অনেক শিক্ষিত ছেলে মেয়ে দেশ থেকে এসে কত ধরনের জীবিকায় যুক্ত হচ্ছে। অনেক স্বামী তাদের স্ত্রীকে বাইরে কাজ করতে দিচ্ছেন না হীনম্মন্যতার কারণে। মাঝে মাঝে ভুপেন হাজারিকার গানের লাইনটি মনে মনে গাইতাম- “আমি দেখেছি অনেক গোলাপ বকুল ফুটে আছে থরে থরে, আবার দেখেছি না ফোটা ফুলের কলিরা ঝরে গেছে অনাদরে!” বুকের ভিতরটা হু হু করে কেঁদে উঠত, কারণ, তারা প্রতিবাদ করতে পারত না! অনেক ছেলেকে দেখেছি তারা নিজেরা তেমন লেখাপড়া জানেন না কিন্তু দেশে গিয়ে একটি সুন্দরী শিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করে এনেছেন যেন মেয়েটি এখানে কাজ করে আয় করতে পারে। আশ্চর্য যে, মেয়েগুলোর বাবা-মা রাজিও হতেন বিয়ে দিতে, যেন বিদেশে আসতে পারে। এখন অবশ্য কিছুটা সচেতন হয়েছেন।
ছেলে আমার পাস করে বের হলো ইউনিভার্সিটি থেকে, জব পেলো, কিছুদিন করার পর মাস্টার্স করতে গেলো ওয়াটারলুতে। কঠিন সময় আবার শুরু হলো। প্রত্যেক সপ্তাহ নিয়ে আসি আবার দিয়ে আসি। শরীর দ্রুত খারাপ হতে থাকলো কারণ, খুব একটা রেস্ট হচ্ছে না। একদিন যেয়ে সেখানেই প্রচ- রক্তপাত শুরু হলো। ফিরে আসতে রাত একটা বেজে গেল। ওদিকে ছেলেকেও বলতে পারছি না, বাঙালি চেতনায় আছি। একটি পুরু পেপার রোল সিটে বিছিয়ে রওয়ানা দিলাম। এদিকে কর্তা রেগে আগুন এত দেরি করে আসাতে। তিনি নিজে যাবেন না কারণ, দুটি দিন উনার রেস্ট দরকার সারা সপ্তাহ কাজের পর। কিন্তু মেয়েদের তো রেস্ট-এর দরকার নেই। মেয়েরা তো দেবী ! দশ হাতে কাজ করতে পারেন।

পরের দিন ডাক্তারের কাছে গেলাম, যাবতীয় সমস্ত টেস্ট করে রিপোর্ট পেলাম দশদিন পর। গাইনি ডাক্তার শীঘ্রই দেখা করতে বললেন। গেলাম। অনেকক্ষণ ধরে বাচ্চাদের মতো বোঝালেন, বললেন- আমি কিছু আঁচ করতে পারছি কি না! বললেন আমার ক্যান্সার হয়েছে, অপারেশন লাগবে। আমি কাঁপতে কাঁপতে রিপোর্টটি হাতে বেরিয়ে এলাম। অঝোরে চোখে জল। কিন্তু কথা বলছি না। সে জোর করে বন্ধুদের আড্ডায় নিয়ে গেলো। আমি বললাম আমাকে বাসায় দিয়ে এসো। সে থেকে গেল, আমি চলে এলাম। ভালোই হলো, আমি চিৎকার করে কাঁদতে পারলাম। অপারেশন হলো! Ovarian Cancer, Ovary remove করা হলো। এতে বিস্তর হরমনাল পরিবর্তন দেখা দিলো। প্রতিদিন শাওয়ার নেওয়ার সময় অঝোরে চোখের জলের সাথে মনও কেঁদে ওঠত- ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’!
জীবন কোথায় নিয়ে গেল আবার। Princess Margaret Hospital, Chemotherapy, Radiation সব নিতে হলো। আটটি মাস কীভাবে বেঁচে ছিলাম, জানি না। Radiation-এর কারণে কিছু মেমোরি হারালাম, আরও অনেক কিছুই হারাতে হয়েছে জীবনে। ঠিক মতো হাঁটতেই পেরেছি পাঁচ মাস পর। চিৎকার করে শুধু মা’কে ডেকেছি। কেমোর ব্যথা নিয়ে চিৎকার করেছি। মা’র সঙ্গে কথা বললে, বলতাম ভালো আছি, তোমার কাছে আসবো খুব তাড়াতাড়ি।
প্রথম পাঁচ বছর মনিটরিং-এর পর ক্যান্সার ফ্রি বলে ঘোষণা হলো। সেটাও একটি মজার ব্যাপার। তিন তলায় একটি বেল আছে, যেটা রোগী বাজাবে আর সবাই জানবে যে একজন রোগী ক্যান্সার ফ্রী হয়েছেন। সমস্ত হসপিটাল হাতে তালি দেবে আর মেইন লবিতে পিয়ানো আর গিটার বাজিয়ে গান হবে ২/৩ মিনিট।
এই কানাডার হসপিটাল থেকে আমি যা পেয়েছি, তা আমার চির জীবনের মূল্যবান অনেক কিছু! এখানে অবসরপ্রাপ্ত লোকেরা ভোর ৫ টায় ওঠে বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীদেরকে হসপিটালে নামিয়ে দেয়, আবার বাসায় নামিয়ে দেয় ডাক্তার দেখানোর পর। গাড়ি থেকে নামানো ওঠানোর কাজটাও তারাই করে। অনেকে হসপিটালের ভিতরে রোগীদেরকে জুস ও স্ন্যাক্স বিতরণ করেন। একদম যারা ৮০/৯০ বছরের, তারা লবিতে বসে অথবা বাসা থেকে মাথার টুপি বানিয়ে বিতরণ করেন বিনামূল্যে। ক্যান্সারের পর যাদের চুল পরে গেছে তাদের সামনে গিয়ে ট্রে ধরেন এবং নিতে বলেন যার যেমন পছন্দ। আজ কেমন আছো জিজ্ঞেস করে। এই ভলেন্তিয়ার কাজগুলো আমাদের দেশের কত হতাশাগ্রস্ত বাবা-মাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতো! কিন্তু আমাদের দেশের যাতায়াতের ব্যবস্থা ভালো নয়। তা ছাড়া, তাদেরকে মনের দিক থেকেই অকেজো করে দেওয়া হয়। বয়স নিয়ে কটাক্ষ করে কথা বলা হয়, সাজগোজ নিয়ে কথা বলে মনোবল বিনষ্ট করে দেওয়া হয়। অথচ ওয়েস্টার্ন পৃথিবীতে বয়সটা শুরুই হয় পঞ্চাশ থেকে। অপরদিকে চল্লিশ পর্যন্ত মনে করা হয় পরিপক্বতা আসেনি। পঞ্চাশ মানে পাহাড়ের চূড়ায়। নতুন করে প্রেমে পড়ে। অনেকে জীবনকে নতুন আঙ্গিকে সাজায়।
অনেক কিছুই শেখার আছে কানাডা থেকে। সততা, শৃঙ্খলা, পরিমিতি বোধ, শ্রদ্ধা নিয়ে মানুষের সাথে কথা বলা। চোখে চোখ রেখে কথা বলাটা একটি ভদ্রতা, যেটা চাকরির প্রথম শর্ত। এখানে কেউ অন্যকে ছোটো করে কথা বলে না। সবকিছুই শৃঙ্খলার মাঝে চলে তাই এখন ও কানাডা বসবাস এর জন্য পৃথিবীর মাঝে একটি অন্যতম দেশ। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ট্রাফিক চলাচল, হসপিটাল, ব্যাংক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মমাফিক চলে। মানুষগুলো অতিমাত্রায় সহনশীল (সব কালচার নয়)। ধনি গরিব বলে কথা নেই, সবার সাথেই সমান আচরণ করে। একজন ডিরেক্টর বা সিইও তারাও একজন ক্লিনার-এর সাথেও সমান আচরণ করে থাকেন। মানুষের মূল্যবোধের জায়গাটি প্রচ-ভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং এজন্যে শিষ্টাচার Politness-এর জন্য কানাডা বিশ্বে একটি আলাদা অবস্থানে রয়েছে । প্রি স্কুল বা ডে কেয়ার থেকেই শিশুদেরকে শেখানো হয় আদব কায়দাগুলো। জীবনের মূল্যবোধ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, প্রতিটি আইন শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। উচ্চ শিক্ষিত হোক বা না হোক, তারা নিয়ম-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ইউনিভার্সিটিতে না গেলেও তারা কারিগরি শিক্ষার দিকে পারদর্শী হয়। তারা তাদের কাজের মূল্যায়ন করেন শতভাগ। সপ্তাহের পাঁচটি দিন এখানে সবাই কাজ করেন এবং বাকি দু’দিন সবাই তাদের ফ্যামিলি নিয়ে উপভোগ করেন। আমাদের সাউথ ইস্ট এশিয়াতে যেমন বাবা-মায়েরা তাঁদের আয় থেকে বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখেন অথবা জমি জমা কিনে রাখেন, তেমনটা কিন্তু এখানে নয়। এখানে সন্তানদের জীবনের ভারসাম্য বোঝানোর জন্য তাদেরকে ১৪/১৫ বছর বয়স থেকেই যেকোনো ধরনের কাজের শিক্ষা দেওয়া হয়। তাতে খুব সহজেই তাদের ভিতরে শ্রমের মর্যাদা উজ্জীবিত হয়। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। তবে গত দশ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন ইমিগ্রেশন নিয়ে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে এই সংস্কৃতির প্রতি ততটা শ্রদ্ধাশীল দেখা যায় না।
বিবাহিত জীবনেও তারা একে অপরের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। যে আগে বাসায় পৌছায়, সে ডিনার রেডি করে অথবা একে অপরকে সাহায্য করে। তবে তারা ‘ইনকাম’-এর টাকাটি কখনই ১০০% দিয়ে দেবে না। ৫০/৫০ ভাগ করে নেয় বিয়ের আগে থেকেই। রাজি হলে বিয়ে করবে, না হলে নয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা দশ বারো বছর একসাথে থাকে স্বামী-স্ত্রী হয়ে কিন্তু বিয়ে অব্দি যায় না। এটা অবশ্য দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে। হয়তোবা অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে ভয় পায়। যতদিন একসাথে থাকে, ততদিন শ্রদ্ধা নিয়ে থাকে, না পারলে সোজাসাপটা বলে ক্লিয়ার হয়ে যাবে, ভোগাভুগিতে নেই।
সবচেয়ে ভয়ের সময়টি বয়স আশি এর পর। কানাডার মানুষ আমাদের থেকে অন্তত বিশ বছর বেশি বেঁচে থাকেন। তখন তারা একাকিত্বে ভোগেন। বাড়ি বিক্রি করে, ছেলে-মেয়েরা তাদেরকে হোম-এ পাঠিয়ে দেয়, যেখানে ডাক্তার নার্স আছে। খাবার দাবার দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক খরচ সেখানে। ছেলে-মেয়েরা বিরক্ত হয়।
অনেক কিছু পাওয়ার মাঝেও কী যেন নেই! কী যেন তাড়া করে বেড়ায় সবসময়। মাঝে মাঝে নিজ দেশে গিয়ে মনে হয়- ওখানে সব আপন, সব নিজের। পরিচিত গন্ধ, বাতাসে নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। চিরচেনা মাটির সোঁদা সোঁদা ঘ্রাণ!
লেখক পরিচিতি
জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরনো ঢাকার ওয়ারিতে। বাবা এডভোকেট সৈয়দ মুহাম্মদ সারওয়ার এবং মা তোহফা সারওয়ার রতগর্ভা খেতাবে ভূষিত। রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি করেছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে। তারপর থেকে কানাডা প্রবাসী। ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। প্রথম কবিতার বই ‘নীল প্রেম’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ সালে।

