কানাডায় আমার মা হবার গল্প
শুভ্রা শিউলী সাহা
আমি এখন ছোট্ট সৌদামিনির ঠাকুরমা। ভোলানাথের অশেষ কৃপায় ও সকলের আশীর্বাদে বড়ো ছেলে অনিক সদ্য বাবা হলো, ৯ জুন ২০২৫। ছেলে-বৌমার রাতদিন খাটাখাটুনি, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতায় বিনিদ্র রাত, বিশাল দায়িত্বশীলতা দেখে সত্যিই বিস্মিত হই। মাতৃত্ব মানে শুধু সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, যত্ন এবং সুরক্ষা প্রদান করাই নয়, কানাডার প্রেক্ষাপটে এটি এক নতুন অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনের চলমান পরীক্ষা। এটি কেবল শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নয় বরং মাধুর্যময় আধ্যাত্মিক যাত্রা, নিষ্কাম কর্মযোগ। তাই, সাধুবাদ জানাই সকল আনন্দময়ী ধ্রুব জ্যোতি মা এবং তাদের মাতৃত্বের প্রতি। আনন্দ-উৎকণ্ঠা তো আছেই, তবে বর্তমান সমাজে জেন্ডার রোলের বিশাল পরিবর্তন দেখে খুব ভালো লাগে। প্রার্থনা করি, ওরা একসাথে শুদ্ধচিত্তে সুখ-দুঃখের অনেক সুন্দর স্মৃতিপট তৈরি করুক। কোনো দীর্ঘশ্বাস যেন ওদের বাকি জীবনটুকুকে আর না ভাবায়। একে অপরের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসায়, হাসি কান্নায় একে অপরের সাথী হয়ে থাকুক। প্রাণে প্রাণে বন্ধন অব্যাহত থাক ওদের। বন্ধু হয়ে থাকাটা ঈশ্বরের অপার করুণা, আশীর্বাদ। বাবা-মা কী মায়ায়, কী পরম মমতায় সন্তানকে বুকে তুলে নেয় ! কেবল দেওয়ার ব্যথা বাজে বুকে। প্রতিটি মেয়ে বাবা মা’কে ছেড়ে এসে স্বামী সন্তানকে নিয়ে গড়ে তোলে তার আপন ভুবন। যখন মা হয়, তখন প্রায় সব মেয়েকেই মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে হয়। তারপর রক্ত-ঘামে, চোখের জলে, হাসি-আনন্দে ভালোবাসায় তাদেরকে বড়ো করা। তারপর কোনো মায়ের সন্তান হয় বিদ্যাসাগরের মতো মাতৃভক্ত, কেউ-বা তার বিপরীত। ৩৬৫ দিনই যে মাতৃদিবস। প্রতি মুহূর্তে বুকের গভীরে নিজের মাকেও অনুভব করি- ‘একবার বিরাজ গো মা হৃদি কমলাসনে’। পরম স্নেহ ভালোবাসায় ছেলে-বৌমার নবজাত কন্যার লালন-পালন ভালোবাসা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কানাডায় আমার সেই সংগ্রামী মাতৃত্বের সোনালি দিনগুলো। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে মা হওয়ার ব্যথা বেদনা, যা সন্তানকে বুকে নিলে ম্লান হয়ে যায়।
২.
চোখে এক সমুদ্র রঙিন ঝলমলে স্বপ্ন নিয়ে ২৯ জুন ২০০৫-এ টরন্টোতে রওনা হওয়ার সময় অভিক ছিল আমার গর্ভে। চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা আমি, পরিবারের সবাইকে ছেড়ে আসার কষ্ট তো ছিলই, তবে Emirate এয়ার হোস্টেসদের অতুলনীয় সেবা, আতিথেয়তায় শারীরিক কষ্টের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, তারপরও প্লেনে দু-চারবার বমি হয়েছিল। এয়ারপোর্ট থেকে গভীর আন্তরিকতায় নিলয়দা আমাদের নিয়ে এলেন। অপুর হাতের ইলিশের ঝোল আর গরম ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ওঠে মনে হলো এত বড়ো জার্নির পর ডাক্তারের একটু চেকআপ দরকার। কিন্তু তার জন্য নাকি হেলথ কার্ড লাগবে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাপড়ি আপা এখানে Woodgreen Community সেন্টারে কাজ করে, তাকে ফোন করলাম। সে খানিকটা Research করে বললো East End Community সেন্টারে যাও, সেখানে যাদের Health Card নেই তারাও ডাক্তার দেখাতে পারে। সেই মতো নিলয়দা নামিয়ে দিলেন। তার গাড়িতে বাজছে রবীন্দ্র সঙ্গীত- “সেই যে আমার নানা রংঙের দিন গুলি।” যেতে যেতে এই আলো আঁধারি জীবনের কত পুরোনো কথা, মা, বাবা, শাশুড়ি, আত্মীয় পরিজনের সবার কথাই মনে পড়ছিল। জীবনের সর্বাধিক আনন্দ হলো ভালোবাসা। যারা ভালোবাসতে জানে, তাদের জীবনে ভালোবাসার অভাব হয় না। প্রবাসে দেখলাম রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও সবাই কেমন আত্মীয় পরিজন কাছের মানুষ হয়ে ওঠে।
East End এর প্রাকটিশনার নার্স অনেক যত্নের সাথে সব রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালো- সব ঠিকঠাক আছে। গাইনি ডাক্তার Dr. Remond-কে রেফার করে দিলো। ডাক্তার মেয়েটিকে দেখলেই শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় শান্তিতে বুক ভরে যায়। মনে হয়, আমার কত আপন! কত রকমের সাহস যে দিত! দেশে থেকে মা, দিদি বা অন্যা কাউকে Caregiver করে Visa apply করার জন্য চিঠি লিখে দিয়েছিল। যদিও আমি তা কাজে লাগাতে পারিনি। সব সময় জানতে চাইতো তোমার কি কখনো কান্না পায়? একা লাগে? সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে আলাপ করার জন্য সোশাল ওয়ার্কারের সাথে যোগাযোগ করে দিলো। গর্ভবতী মায়েদের গ্রুপের সাথে আমাকে সংযুক্ত করে দিলো। সেখানে গেলে সবাইকে দেখে আমার খুব ভালো লাগতো। কত কী শেখাতো! পুষ্টিকর খাবার বানানো, গান গাইতো, আবার প্রতি সেশনে জনের জন্য ফ্রি গ্রোসারি কার্ড দিতো। আমি বিশ্বাস করি, মা হওয়া মানেই সবকিছু ফুলস্টপ নয়, নতুন দেশে সংসার গোছানো, লেখাপড়া, কাজ খোঁজা সবই তো করতে হবে, সেই মনের জোরেই এগিয়ে চললাম। নৃত্যগুরু প্রিয় বিপ্লব কর দাদার বাড়ির দোতলায় তখন আমরা ভাড়া থাকি। নিজের গর্ভের সন্তান অভিক বেড়ে ওঠছে। মাতৃত্ব একটি গভীর আবেগপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা নারী জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মা কিংবা শাশুড়ি মা, কেউ তো কাছে নেই তাই নিজের যত্ন নিজেকেই করতে হয়। মাঝে মধ্যে ক্লান্তিতে কষ্ট হতো। অন্য সকলের মতো আমিও কোনো কিছু কেনার আগে বাংলা টাকাতে তার দাম হিসেব করতাম। কোনো বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছে করলেও তার দামের কথা চিন্তা করে কিনতাম না।
East End Community Center থেকে চেক আপ করে ফেরার পথে ঢুকলাম Queen এবং Coxwell-এর McDonald এ ছেলেদের জুনিয়র চিকেন কিনে দেবার জন্য। স্টোরের ম্যানেজারকে বললাম- “আমি এখানে কাজ করতে চাই। “বললো- পরদিন সকাল ৮টায় সাদা শার্ট আর কালো ড্রেস প্যান্ট পরে আসতে। সেই মতো গেলাম। ১ ঘণ্টা job shadowing-এর পর বললো- কাল তোমার অরিয়েন্টেশন। Front Cash Counter-এ দাঁড়ালাম কিন্তু তখনও আমি টুনি, লুনি কিংবা সব খাবারের আইটেমগুলোর নাম-ধাম কিছুই তেমনভাবে জানি না। নতুন একটা দেশে আসার পর প্রতিদিনই নতুন নতুন জিনিস শেখা। এদের সংস্কৃতি, ভাষা, পোশাক চালচলন আরও কত কী ! McDonald-এ দু-তিন সপ্তাহ কাজের পর মনে হলো, এভাবে বরফ ভাঙা কিংবা মেশিনে কোক ঢাললে আমার বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। সেদিনই Mainstreet Subway থেকে নেমে Tim Hortons-এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, একজন লেডি দরজার কাচ পরিষ্কার করছে। নেইম প্লেট দেখলাম তার নাম Karen। বললাম- Karen তোমাদের এখানে কাজ করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। আমি খুব কাছেই থাকি। বললো চলো ভিতরে, দেখি তোমার সাইজের Uniform আছে কি-না। শুরু হলো বিকেলের শিফটে কাজ করা আর সকালে কলেজে একাউন্টিং কোর্স করা। সব কাজ সেরে রাত ১১টা থেকে ২টা এই ছিল আমার study plan. একদিন টিমহরটনে গার্বেজ ফেলতে গিয়ে চাবি হারিয়ে আটকা পড়ে ছিলাম গার্বেজ রুমে কয়েক ঘণ্টা।
৩.
এ জীবনের পাতায় পাতায় কিছু তো ভুল-ত্রুটি থাকবেই। তবে নিজের প্রতি আমার অনেক বিশ্বাস। মস্তিষ্ক আমাদের পরিচালনা করে, যদি ভাবতে পারি ‘yes I can’, তখন ঠেকায় কে? আমার স্বামী তার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রফেশনাল লাইসেন্সের জন্য এগোচ্ছে, তাই ছেলেদের কথা ভেবে নিজের প্রফেশনাল Agricultural Economics লাইনে পড়াটা স্থগিত করলাম। কলেজে একাউন্টিং পড়তে শুরু করলাম। কানাডা খুব সুন্দর দেশ। অনেক ধরনের সুযোগ, যে যার ইচ্ছে মতো কাজে লাগাতে পারে। তখন, দু-দশক আগে টরন্টোর বাঙালি কমিউনিটির তেমন কাউকেই চিনতাম না। আর তথ্য প্রযুক্তি এত সহজলভ্যও ছিল না বললেই চলে। ইন্টারনেট কিংবা সেলফোনের ব্যবহার এতটা ছিল না। অরিত্রর স্কুলে এদিন Parent Council মিটিং-এ দেখা হলো রোজিনা করিম কনকের সাথে। অনেক আলাপ হলো। জানলাম, তার সিটি ফান্ডেড হোম ডেকেয়ারের কথা। আমাকে শিখিয়ে দিলো কীভাবে আবেদন করতে হবে। ওর টিপসগুলো খুবই কাজে দিয়েছে। আমি সেই মতো আবেদন করলাম। পরিবারের আয় অনুযায়ীই ফি দিতে হয়।
অপু বেশ ঘটা করে আমাকে সপ্তামৃত দিলো। কলেজের আর টিমহর্টন-এর বন্ধুরা baby shower দিয়েছিল। কলেজে আমার একটি আরমেনিয়ান বন্ধু প্রায়ই আমার জন্যে এটা সেটা রান্না করে নিয়ে আসতো। আমি শুধু assignment এবং project-এ সাহায্য করতাম। Accounting software-গুলো শিখতে একটুও বেগ পেতে হয়নি। এদেশে এ-সব practical applied লেখাপড়া খুব সহজ মনে হয়েছে, দেশের মতো কঠিন কিছু নয়। সেই সাথে চলছে অজয় বণিক দাদার কাছে ড্রাইভিং শেখা, দাদার বকাগুলো এখনো মনে হয়। কাজের ব্যস্ততায় শরীরের তেমন কোনো কষ্ট অনুভব করার সুযোগ পাইনি, তবে নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপে ছিলাম।
ইতোমধ্যে ৫ মাস পেরিয়ে গেল। একদিন রাত ১১টায় কাজ থেকে ফিরে সব কাজ শেষে যখন বিছানায় গেলাম তখন ব্যথা অনুভব করতে শুরু করলাম। ডাক্তার তার Personal Confidential একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল সব সময় কাছে রাখতে। যখনই খারাপ লাগবে, এই নম্বরে ফোন করতে। এই ক’মাস ফোন করার প্রয়োজন পড়েনি কিন্তু আজ ফোন করতেই ডাক্তার নিজেই ফোনটা রিসিভ করলো। বললো, East Toronto General Hospital-এ চলে যেতে। আমাদের কোনো গাড়ি ছিল না তখন। আমার স্বামী খানিকটা নার্ভাস হয়ে নিলয়দা আর অপুকে কল করলো। ওরা যথারীতি ৯১১-তে কল করতে বললো। কিন্তু নতুন এদেশে এসে আমার স্বামী ভাবতো ৯১১ মানে পুলিশ আর পুলিশ মানেই সাংঘাতিক কিছু। দেশের সেই বদ্ধমূল ধারণাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতো। এদেশের মতো ৯১১ কিংবা এত নাগরিক সুবিধা কিংবা নিরাপত্তা নেই আমাদের দেশে। ওদেশে এখানকার মতো এত বেশি ট্যাক্স দিতে হতো না আমাদের। অবশেষে আমাদের বিপ্লবদা আর তার বন্ধু গাড়ি করে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে গেল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। সিজারের সময় আমার হাসব্যান্ড আমার সমানেই ছিল। রাত দুটোর সময় অভিকের কান্নার আওয়াজ পেলাম ও হা… ও হা… । Hospital-এ announcement শুনলাম Shownak has arrived. ছেলেটি যখন মায়াবী চোখ দু-খানি তুলে তাকালো আমার দিকে, নিমেষেই ভুলে গেলাম সমস্ত ব্যথা বেদনা। কোথা থেকে কেমন যেন শক্তি ফিরে পেলাম, ওকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর। চারদিক আলো করে অভিক এলো জীবনের পাতায় পাতায় রঙ ছড়াতে। ২০০৫-এর বরফ ঢাকা ডিসেম্বরের ১২ তারিখে আবির্ভূত হলো আমাদের হাসি-আনন্দ, আমাদের সব সময়ের সাথী, আশা-ভরসার প্রতীক।
শিশুরা যখন আনমনে খেলে তখন ভারি মিষ্টি লাগে। সংসারে কী যে মায়ার খেলা! ছোটো শিশুটির কোমল মুখখানাতে কী যে মায়া! কী যে সুখ! সকল কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। ভগবানের দেওয়া উপহার আমাদের প্রাণে এনে দিয়েছে অনাবিল আনন্দ, হৃদয় ছুঁয়ে গেছে ওর অমলিন হাসির রেখা। কানাডাতে আসার ৫ মাস পরেই অভিকের জন্ম ডিসেম্বরে। ঘুম ভেঙে দেখলাম সলভেশান আর্মির কয়েকজন বৃদ্ধা অভিকের জন্য ফুল এবং নানাবিধ উপহার নিয়ে এসে মেরি খ্রিস্টমাসের গান গেয়ে বেবিকে Welcome করছে। কী ভালো লাগছিল, শরীরের ব্যথা ভুলে গিয়ে মনে হয়েছিল ওদের সাথে আমিও নাচ গান করি। ওরা মনে করিয়ে দিলো- সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। এদের স্বাস্থ্যসেবা দেখে আমি অভিভূত, মনে হলো আমি স্বর্গে আছি! এত মানবিক আর ওদের কথা বলা, যত্ন সবকিছু দেখে মনে হলো, সত্যি- জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই সেবিছে ঈশ্বর।
বিকেল বেলা কাজ থেকে ফেরার পথে বরফ ঠেলে অভিকের বাবা এসে দেখে যেতো। কোনো অনুযোগ নেই, যতটুকু দিয়েছ, ততটুকুই শিরে ধারণ করে রাখবো, হে বিশ্বপিতা! আমার পতিদেবতাকেও ধন্যবাদ জানাই, সে আমার সঙ্গে থাকে সব কিছুতেই! উঁচু-নিচু পথগুলোতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে পার করে! সাথে নিয়ে পথ চলে, হাত ধরে সাহস জোগায়! হাসপাতালে ৫ দিন আমি একাই ছিলাম। জানতাম না যে, হসপিটাল থেকে বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার দিন কার সিট লাগবে। একজন নার্সের সহযোগিতায় একটা কার সিট জোগাড় হলো। কমলা রঙের বেবি ট্যাক্সি করে বরফ ঠেলে অভিকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছলাম। পরদিন থেকে বাড়িতে নার্স প্রেট্রিশিয়া আসতো। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো, বুকের দুধ সংরক্ষণ করার কৌশল ও অন্যান্য সবকিছু চেক করতে। কী যে ভালো, বলে বোঝানো মুশকিল! আমাদের ভালো থাকা নিয়ে কী যে তার প্রচেষ্টা! পরের সপ্তাহ থেকে হোম ভিজিটর ইন্দিরা আসতো। কী যে সাহস আর মনোবল পেতাম! ওর সাথে চমৎকার সময় কাটতো। টানা এক বছরে সে আমাদের পরিবারের একজন হয়ে ওঠেছিল। বৌমা বললো, কোভিডের পর এখন নাকি এসব হেলথ কেয়ার সুযোগ-সুবিধা আর নেই। হাসপাতালগুলোতেও বাজেট স্বল্পতা। ডাক্তার ও নার্সদের স্বল্পতা, কারণ, কোভিডের পর অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে। তবে কি কানাডার স্বাস্থ্য সেবার মান কমে গেছে? এটা মেনে নিতে পারছি না।এদেশটিকে সুন্দর ও সচল রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সকল সম্পদের যত্ন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পৃথিবীটা যেন অন্যের বাসযোগ্য হয়, সে দায় আমাদের সকলের। চারদিকে এখনো কোভিডের ঢেউ, কত নতুন নতুন রোগ-শোক!
৪.
পৃথিবীতে সব ভালো কাজই মা হওয়ার মতো কষ্টের, ব্যথার। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, অসম্ভব বলে কিছু নেই। কানাডাকে ভালোবাসলে, কানাডা আমাকে ভালোবাসবে। সব সৃষ্টিরই প্রসব বেদনা আছে। প্রকৃতি চলবে তার নিয়মে। বিশ্বাস করি ঈশ্বর আছে, অন্তরে আছে আমার রবীন্দ্রনাথ। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, জগতে তখন কিসের ভয়!
আমি আবার কলেজ শুরু করলাম। কাজটাই যে আমাদের নিত্যেদিনের পূজা। সব কাজই তো ভগবানের। শুনেছি অসম্ভব কথাটি কেবল মূর্খ ও অলসদের অভিধানে লেখা থাকে। অন্তহীন ব্যস্ত জীবন। বেশ স্ট্রাগল তো বটেই। নতুন একটা দেশে সবকিছু মিলে গুছিয়ে ওঠতে একটু সময় তো লাগবেই। শুনেছি যে সয়, সে রয়। আবার ওঠে দাঁড়িয়েছি। অভিকের ১১ দিন বয়স থেকে সকালের বরফ ঠেলে অভিককে ডে কেয়ারে দিয়ে যেতাম। সঙ্গে ৬টি বোতলে বুকের দুধ দিয়ে যেতাম। ওর ভাইয়েরা, অনিক আর অরিত্র বিকেলে স্কুল থেকে এসে নিয়ে আসতো। কনকই ওর দ্বিতীয় মা হয়ে ওঠলো। তবে আমার বড়ো দুই ছেলে এদেশে আসার পর থেকেই সব রকমের সীমাহীন সহযোগিতা করেছে। ওদের ছিল না কোনো আবদার বা চাহিদা। যা দিতাম তাই খেতো। নিজেদের মতো করে পড়াশোনা করতো। দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া, দ্বন্দ্ব, হিংসা কিছুই ছিল না। ছোটো ভাইটিকে পেয়ে ওরা খুব খুশি হয়েছিল। দেখতে দেখতে ছেলেটা বড়ো হয়ে গেল।
স্কুলে যাওয়ার সময় অভিকের জ্যাকেটের সাথে হাতের মিটেন আর টুপি সেলাই করে আটকে দিতাম, যাতে না হারায়। সেটা তার খুবই অপছন্দের ছিল। ক্লাসে গিয়ে টিচারের কাছ থেকে কাঁচি নিয়ে সেটা কেটে ফেলতো। বাইরে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বরফের দিনেও ওদেরকে ৩/৪ বার করে খেলতে বের করতো স্কুলের মাঠে। আর তখন কিসের জ্যাকেট, টুপি বা মিটেন। অবশেষে স্কুলের প্রিন্সিপালকে অনুরোধ করলাম ওকে যেন ঠান্ডায় বাইরে না নেওয়া হয়, ওর কোল্ড এলার্জি আছে। তাতেও কোনো কাজ হলো না। খেলা ফেলে রুমে বসে থাকার মতো ছেলে সে নয়। আর teen age-এ শীতের কাপড় কম পরাই যেন ফ্যাশন। তারপর মহাসমারোহ ঠান্ডা, জ্বর, কাশি, বমি এসব বাধিয়ে নিয়ে রাত জাগা, কান্নাকাটি, ডাক্তারের কাছে দৌড়ানো, কাজ থেকে ছুটি নেওয়া, তুলসীপাতা-আদা-মধু-লেবুর রস, হলুদজল এসব চলতো। আলুভাজি, লেবু দিয়ে সাদা ভাত অভিকের সবথেকে প্রিয় খাবার। অভিক লন্ড্রি করে, একটু আধটু রান্না, অনলাইন শপিং ইত্যাদি সব কাজেই ভালো তবে স্কুলের অনলাইন ক্লাসে মিনিট কুড়ি লেকচার শোনার পরই তার ঘুম পেয়ে যায়। বলে কি-না বোরিং। দেশে গুরুজনেরা বলতো, মাইরের উপর ওষুধ নাই, কিন্তু এখানে কানাডাতে তো এসব শাসন একেবারেই অচল। পুলিশের ভয় আছে। আসলে এই teen age handle করার মতো যথেষ্ট Parenting skill আমারও নেই। অভিক ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবে সেই খুশিতে আটখানা। তাই আমার গাড়িটার প্রতি সে বিশেষ যত্ন করে। পরিষ্কার করা, কখন সার্ভিসিং-এ যেতে হবে ইত্যাদি সব কিছু সে-ই খেয়াল রাখে। অতি মাত্রায় সোসাল বলে এ-পাড়ায় সবাই তাকে চেনে। ওরই বা কী দোষ, আমরা যা পেয়েছি আমাদের শৈশবে ওরা তা পাইনি। এই প্রবাসে কী ঝড়ের বেগে স্ট্রাগল-এর মধ্যদিয়ে চলে গেল ছেলেটার! সে-রকম যত্ন করার সুযোগই হয়নি আমার। তাছাড়া ঠাকুমা, দিদা, মামা, মামী, মাসি, পিশি, পিশে, কাকা, জেঠু, বড়ো মা, চিনি মা, সবার অফুরন্ত ভালোবাসার স্বাদ না পেয়েই ডে কেয়ারে বড়ো হতে হলো তাকে; তাই ডে কেয়ারের মা-ই ওর আসল মা। তবে আমি সব সময়ই ওর পাশেই আছি এবং ও যতো বড়োই হোক বা যতো দূরেই যাক না কেন, ওর পাশেই থাকবো সব সময়।
অভিকের সাথে কোথাও গেলে আগে থেকে সাবধান করে- তুমি উল্টো পাল্টা কিছু বলবে না, আমি যেন embarrassed না হই। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় তার McMaster University-তে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু। যতদিন দেহে আছে বল হয়তো ঘুড়ির নাটাই টেনে যাবো তারপর সুতো কেটে কোথায় কী পড়বে তা বড্ড অনিশ্চিত। একদিন আমিও বাবা-মাকে ছেড়ে এসেছিলাম। জীবনের বিভিন্ন ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি, বিদেশ। বাবা-মা একাকিত্বের সন্তাপ বরণ করে আমাকে এগিয়ে দিয়েছে ধাপে ধাপে, যা সব বাবা মা করে থাকে। অথচ যখন ছোটো ছিলাম বাবা মায়ের এই কষ্টটা তেমন করে অনুভব করতে পারিনি। “কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে?” তিল তিল করে গড়ে তোলা সব অর্জন, সৃষ্টিকে পিছনে ফলে রেখে চলে যেতে হয় বিশ্বপিতার কাছে। “তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে।”
৫.
মেয়েদের কেবল হারাতেই হয়। বাবা মা চলে গেল। বেঁচে থাকতে কখনোই ভাবতেই পারিনি একদিন ত্রিভুবনের কোথাও যে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেন অক্সিজেনের সমুদ্রে ডুবে আছি বলে বুঝতেই পারি না, প্রকৃতি যদি ১/২ মিনিট অক্সিজেনের সরবোরাহ বন্ধ রাখতো! তবে কি, বাবা-মায়ের আশীর্বাদ সন্তানের হৃদয়ে সর্বদাই বিরাজমান। মায়ের কাছ থেকে প্রত্যাশার চাপ তো থাকেই। বিরামহীন কাজ করে চলেছি ঈশ্বরের ব্রত হিসেবে। কখনো প্রত্যাশা নিয়ে কোনো কাজ করিনি। যখন যা করেছি খুব মন-প্রাণ ঢেলে দিয়ে দৃঢ়তার সাথে করেছি। কী পেয়েছি আর কী পাবো, তা কখনোই ভাবিনি। তেমন কোনো বর্ণাঢ্য জীবন আমার নয়। নিতান্ত সাধারণ বাঙালি মেয়ের মা হওয়ার গল্পের এই জীবনের ক্ষুদ্র কোলাজ যদি এদেশে নতুন আসা কোনো মেয়ের মনে সাহস ও শক্তি যোগায় তবে আমার ভালো লাগবে। কখনোই মরার আগেই মরতে চাই না। সংগ্রাম চলবে, দেহে আছে যতক্ষণ প্রাণ। গতিই জীবন। জীবনটা সাইকেল চালানোর মতো। নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিজেকে অবশ্যই চলতে থাকতে হয়। সেটিই আনন্দের প্রাণ সাগরে ভেসে থাকার মূলমন্ত্র। যেকোনো বয়সে নিজেকে ব্যস্ত রেখে আনন্দ বাঁচিয়ে রাখার মতো অনেক কাজ পৃথিবীতে আছে। ঈশ্বর-অনুরাগী মানুষ যখন স্বার্থহীন নিষ্কাম কাজে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে, তখন তার চেয়ে সুখী আর কে আছে? যথাযথ সম্মানটুকু যেন পায় বিশ্বের প্রতিটি নারী, প্রত্যেক মা। মায়েদের জীবনের দিনগুলো আনন্দে কাটুক আর ভালোবাসায় কাটুক। অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ, কাউকে দুঃখ না দেওয়া, নিজের যত্ন নেওয়া, অপরকে ভালো রাখা, মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর প্রতি দয়া, ক্ষমা, স্নেহ, প্রেম ও ভক্তি নিয়ে যেন আমরা পরম শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারি, ক্ষণিকের এই জীবনে এটুকুই হোক আমাদের কামনা।
লেখক পরিচিতি
পেশাগত জীবনে শুভ্রা শিউলী সাহা একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ, সংস্কৃতি কর্মী। টরন্টোর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে দীর্ঘ দিন ধরেই জড়িত। জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণায় সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন জাতিসংঘের কর্মকা-ে। তিনি প্রকৃতি প্রেমিক এবং কবিতা পড়তে ভালোবাসেন। প্রবন্ধ, গল্প লেখা তার শখ।

