কানাডায় আমি
ফুয়াদ চৌধুরী
প্রায় পাঁচ দশক জুড়ে কানাডা আমার জীবনে আলো ও ছায়া বিস্তার করে চলেছে। নানান অভিজ্ঞতা আর টানা-পোড়েনের ভিতর দিয়ে কেটেছে এই দীর্ঘ সময়। কখনো কানাডা সরকারের কাজে, কখনো ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য কানাডার বাইরেও থাকতে হয়েছে; তবে সেখানেও আমার কর্মে কানাডা সম্পৃক্ত ছিল। এখানে পা ফেলার পর আমি এই দেশটিকে পছন্দ করে ফেলি। দ্বৈত নাগরিকত্ব ধারণ করে আমি সাংবাদিকতায়, শিক্ষকতায় এবং ফিল্ম নির্মাণে কানাডাকে মনে-প্রাণে লালন করেছি এবং করে চলেছি আজও।
১৯৭৩ সালে আমি কানাডার ইমিগ্রেশন লাভ করি এবং ১৯৭৪ সালে টরন্টো এসে পৌঁছাই। যেহেতু আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে ব্যাচেলর ডিগ্রি করেছি, তাই প্রথমে ওই সেক্টরে কাজ খুঁজতে থাকি; শপার্স ড্রাগ মার্ট-এ কিছুদিন কাজও করার সুযোগ পাই। তখন আমার মনে হলো, এইভাবে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থেকে ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল গুণে গুণে আমার পক্ষে জীবন কাটানো কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ দেখে ফিল্মের প্রতি আমার আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। তাই এখানে ফিল্ম ও টেলিভিশন বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য যোগাযোগ করি টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু আমি ভর্তি হতে পারিনি। অ্যাডমিশন ডিপার্টমেন্ট জানালো যে, ঢাকার ব্যাচেলর অব ফার্মেসি ডিগ্রি তারা গ্রহণ করবে না, প্রথম থেকে পড়া শুরু করতে হবে। জীবিকার জন্যও তখন লড়াই করতে হয়েছে। ড্রাইভিং-এ আমার আগ্রহ ছিল, বরিশালে স্কুলজীবন থেকেই গাড়ি চালিয়েছি; সহজেই বাস ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেলাম। জীবিকা হিসেবে তখন ড্রাইভিংকে বেছে নিলাম। প্রবীণ নাগরিকদের একটি সংস্থায় কাজ করতাম অ্যাসাইনমেন্ট প্রোগ্রামে। গ্রে হাউন্ড কোম্পানির ভাড়া করা বাসে করে প্রবীণদের নিয়ে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করানো ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে নিয়ে যেতাম। সিনিয়রদের জরুরি প্রয়োজনে দেখাশোনার জন্য আমাকে এক মাসের একটি কোর্স করতে হয়েছিল। গাড়ি চালাচ্ছি বটে, কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছি না। মন পড়ে আছে ফিল্ম পড়ার দিকে। একদিন হঠাৎ মনে হলো, আমেরিকা গেলে কেমন হয়? ১৯৭৬ সালের কোনো একদিন সকালে গাড়ি চালিয়ে সোজা চলে গেলাম বোস্টনে আমার খালাতো ভাই ইশতেয়াকের (ববো) বাসায়।
তারপর বোস্টনে এমারসন কলেজে ভর্তি হলাম। মাস-কমিউনিকেশনে মাস্টার্স করে বোস্টনের এমারসন কলেজে ১৯৮০ সাল থেকে পরবর্তী চার বছর পড়িয়েছি। ওই সময় কানাডা ঘুরতে এসে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের সাথে দেখা করি। সেই সূত্রে ছয়মাস পর ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান আমার সাথে যোগাযোগ করেন ইন্ডিয়ার একটি প্রজেক্টে কাজ করার জন্য; তখন তাঁরা নর্থ-আমেরিকায় অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন সাউথ-এশিয়ান খুঁজছিলেন। ১৯৮৪ সালে কানাডা ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আমাকে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে ইন্ডিয়ার দিল্লিতে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটির মাস-কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে পড়ানোর জন্য নিয়োগ প্রদান করে। কানাডানিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি, ‘সিডা’ (CIDA) এবং ভারত সরকারের পার্টনারশিপে ছিল এই আন্তর্জাতিক মিডিয়া-প্রোগ্রামটি। ‘ইনস্টিটিউশনাল কো-অপারেশন প্রোগ্রাম’ নামে এটি পরিচালিত হয়েছিল। চূড়ান্তভাবে আমাকে মনোনয়ন দেওয়ার আগে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ভারতের ওই ইউনিভার্সিটির মাস-কমিউনিশেন বিভাগের চেয়ারম্যান আনোয়ার জামাল কিদওয়াই-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, আমাদের মনোনীত ভিজিটিং লেকচারার একজন বাংলাদেশি, এতে ভারতীয়দের কোনো অসুবিধা হবে কি-না। জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘পড়াতে পারলে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই।’ আমাকে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে এক বছরের জন্য পাঠানো হয়েছিল।পরবর্তীকালে ভারতীয় এবং কানাডিয়ানদের মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে প্রায় ছয় বছর আমি সেখানে কাজ করি। আমি কানাডার এই বিশ্ব-পরিসরের বিরাট ক্যানভাসে যুক্ত হতে পেরে খুবই গর্বিত।
বলে রাখা ভালো, ভারতের অভিজ্ঞতা আমার জন্য টেলিভিশনের দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমি টিভির যাবতীয় কর্মকা- তখন বুঝতে শিখেছি। ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ফিরে এসে কানাডার প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিটিভি’ (CTV)-তে ডেইলি নিউজ সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে অ্যাসোসিয়েট নিউজ প্রডিউসার হিসেবে জয়েন করি। সিটিভি কানাডার বৃহত্তর প্রাইভেট টিভি চ্যানেল। সারাদেশের নিউজের গুরুত্ব নির্ধারণ, এক্সচেঞ্জ এবং মার্কেটিং-এ কাজ করতাম আমি। বিভিন্ন প্রদেশের সংবাদ তৈরি এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে কোন নিউজ কোন অঞ্চলে প্রচার করা হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কো-অর্ডিনেশনের দায়িত্ব পালন করেছি। তারপর সিবিসি জাতীয় সংবাদ বিভাগে যোগ দিই। সিবিসিতে কাজ করার সময় বুঝেছি যে, একটি নিউজ কীভাবে প্রচার করা হবে, এগুলোর গাইডলাইন তৈরি করে দেয় আমেরিকা-কানাডা-ইংল্যান্ড। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া তাদের তৈরি করে দেওয়া নিউজ প্রচার করে। রাতে কানাডা-আমেরিকায় যে আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রচার হয়, তা দিনের বেলায় ইউকে-ইসরাইলসহ পশ্চিমাদের বন্ধুরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা নেওয়া হয়। মিডিয়ার এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়টি আমার জন্য ছিল বেশ পীড়াদায়ক।
কানাডায় টেলিভিশনে কাজ করার সময়ে আমি সাউথ এশিয়ান বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই। সেই সূত্রে কিছু ডকুমেন্টারিও নির্মাণ করি। তখনকার উল্লেখযোগ্য কাজের বিষয় ছিল কানাডায় প্রচলিত প্রচ্ছন্ন বর্ণবাদ (সিস্টেমিক রেসিজম; অলিখিত বর্ণবাদ); চাকরি, সামাজিক মর্যাদা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা তুলে ধরাই ছিল আমার লক্ষ্য। এছাড়া চিলড্রেন অব ইন্টাররেসিয়াল ম্যারেজেস বিষয়েও কিছু কাজ করেছি। যেমন- একটি ডকুমেন্টারির নাম বলা যেতে পারে ‘মিক্সড মেসেজেস’; এটি সিবিসিতে প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া ভিশন টিভি ও অমনি টিভির জন্য সাউথ এশিয়ানদের সামাজিক বিষয়ের ওপর ডকুমেন্টরি বানিয়েছে। কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও পাবলিক লাইব্রেরি এগুলো সংরক্ষণের জন্য আমার কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল। বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করতে গিয়ে চিন্তা ও কাজের বিচিত্রমুখী প্লাটফর্ম তৈরি করতে পেরেছিলাম। প্রফেশনালদের সহযোগিতাও পেয়েছি; যেমন- চাইনিজ, কোরিয়ান, আফ্রিকান এবং ইউরোপিয়ান নন-ইংলিশ স্পিকিং কমিউনিটির সোশ্যাল এক্টিভিস্টরা, যারা তাদের কমিউনিটির মানসিকভাবে পর্যুদস্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করছিলেন। ওই সময়ে টরন্টোতে ‘উইমেন অব কালার’ নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে; যার নেতৃত্বে ছিলেন বিভিন্ন দেশের নারী অভিবাসীরা। প্রবাসী নারীরা যখন মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যেতেন, তখন তাদের পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ বুঝতে মেইনস্ট্রিমের (শাদা) ডাক্তার-নার্সরা অসুবিধায় পড়তেন। এ বিষয়ে আমার ফিল্ম ‘হিয়ার, হোয়াট উই আর সেইং’-এর প্রধান বক্তব্য ছিল যে, যারা মেডিকেল সার্ভিসে কাজ করবেন, তাদের অবশ্যই এন্টিরেসিজম সম্বন্ধে ট্রেনিং থাকতে হবে। এভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কাজের মাধ্যমে আমি মাল্টিকালচারাল সোসাইটির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। অন্টারিওতে বিভিন্ন ভাষা ও জাতির কমিউনিটিতে ‘হিয়ার, হোয়াট উই আর সেইং’-এর প্রায় ২০০ বার স্ক্রিনিং হয়। ডকুমেন্টারিটির সামাজিক প্রভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি প্রাদেশিক সংসদে উত্থাপন করলে সরকার ২৩ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করে এন্টিরেসিজম ট্রেনিং-এর জন্য। এন্টিরেসিজম সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারে ড. অলোক মুখার্জি (পরে মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্ভিসের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন প্রায় ১০ বছর) আমাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।
৩.
অনেকেরই হয়তো জানা আছে যে, ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগের পর পাক-ভারতের প্রচুর মানুষ কানাডায় এসেছেন। যেহেতু কানাডিয়ান অ্যাম্বাসির অফিস ছিল পশ্চিম-পাকিস্তানের ইসলামাবাদে, তাই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের লোকদের জানানো হয়নি যে, কানাডায় অভিবাসন পাওয়া যায়। তবে, ষাটের দশকের প্রথমদিকে বাংলাদেশ থেকে আগত বেশকিছু ছাত্র ইমিগ্রেশন নিয়ে এখানে স্থায়িভাবে থেকে যান। ওই সময় কয়েকটি ইউনিভার্সিটি থেকে ছাত্রদেরকে এদেশে থেকে যাওয়ার জন্য অভিবাসী ফরম বিতরণ করা হয়েছিল। তখন কানাডায় রেসিজমের রূপ ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। বিশেষ করে উগান্ডা থেকে ১৯৭৪ সালে, যে বছর আমি কানাডায় আসি, ইদিআমিন আগাখানের অনুসারীদের জোর করে বের করে দিলে কানাডা তাদেরকে বিপুলসংখ্যায় আশ্রয় দেওয়ার পর বর্ণবাদের মারাত্মক রূপ ধারণ করে। পথে-ঘাটে, বাসে-ট্রেনে তখন হোয়াইটরা দক্ষিণ এশীয়দেরকে ‘পাকি’ বলে গালি-গালাজ করতো। এমনকি সাবওয়ে স্টেশনে ধাক্কা দিয়ে কয়েকজনকে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও মিডিয়ায় প্রচার হয়েছিল। আমেরিকার টুইন-টাওয়ারে হামলার পর কানাডায় মুসলিম কমিউনিটি বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন হয়। অনেকেই জানেন যে, নর্থ-আমেরিকায় তখন মুসলিমদের বিষয়ে গোয়েন্দা-অনুসন্ধান শুরু হয়। কানাডায় বেশকিছু লোককে সন্দেহজনকভাবে গ্রেফতারও করা হয়। ইমিগ্র্যান্ড মুসলমানরা এমনিতেই রেসিজমের শিকার ছিল, তার ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে যুক্ত হয় সরকারের ‘ইসলামি ফোবিয়া’। আমি তখন কানাডায় বসে ‘চেইঞ্জ ইওর নেম: ওসামা’ শিরোনামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করি। এই রিসার্চভিত্তিক প্রমাণ্যচিত্রে কানাডার তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গোয়েন্দা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য এবং মুসলিম নেতৃবৃন্দের বক্তব্য তুলে ধরেছিলাম। ছবিটি টরন্টোর মেইনস্ট্রিমের ‘অমনি টেলিভিশন’ বহুবার প্রচার করেছিল। এছাড়া এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালেও প্রদর্শিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে কানাডায় মুসলমানদের সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণা, বিভ্রান্তি এবং বাস্তবতা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশনে কাজ করার পাশাপাশি আমি কমিউনিটির সম্প্রীতি ও বন্ধন নিয়ে ভাবতে শুরু করি এবং অন্যান্য অগ্রসর নেতৃবৃন্দের সাথে নিজের ভাবনা শেয়ার করতে উদ্যোগী হই। আমি মনে করেছিলাম যে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির লালন ও বিকাশের জন্য কাজ করা উচিত। বিশেষ করে সাময়িক দায়বোধ আমাকে এই ধরনের কাজে সম্পৃক্ত হতে প্রেরণা যুগিয়েছিল। ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটিমাত্র বাংলাদেশি-কানাডিয়ানের সংগঠন ছিল সত্তর-আশি দশকের দিকে। আমি ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি দুই টার্ম। টরন্টোবাসী বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে তখন সম্প্রীতিভাব লক্ষ্য করেছি। ভারতীয় বাঙালিদের সংগঠন ‘প্রবাসী’ এবং ‘কালি-মন্দির’-এর সদস্যরা যৌথভাবে বাংলাদেশিদের সাথে অনুষ্ঠান করতো। শত শত বাঙালির অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকতো। স্কুলগুলোতে ছুটির দিনে হেরিটেজ স্কুল বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতো। দেখা যেতো ভারতের বাঙালি ছেলে-মেয়েরা বাংলা হেরিটেজ স্কুলে ভাষা-গান-আবৃত্তি শিখছে; পক্ষান্তরে বাংলাদেশিরা যেতো ধর্মীয় শিক্ষা নিতে ইসলামিক স্কুলে। ফলে ধীরে ধীরে কানাডায় ভারতীয় বাঙালি ও বাংলাদেশের বাঙালি শিশুরা ভিন্ন সংস্কৃতিতে গড়ে উঠতে থাকে। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতির প্রভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকরা বিভক্ত হয়ে পড়লে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’ দুই ভাগ হয়ে যায়। তখন থেকে আমি ওই সংগঠন থেকে দূরে সরে পড়ি।
টরন্টোতে নানান সময়ে বাঙালি প্রবীণ নাগরিকদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি এবং আমার কিছু প্রামাণ্যচিত্র তাদের উপস্থিতিতে প্রদর্শন করার সুযোগও পেয়েছি। এসব ফিল্ম নিয়ে তাঁদের সাথে আলাপ-আলোচনাও হয়েছে বেশ। একসময় বাঙালিদের ‘অ্যাট ক্রিসেন্ট টাউন সেন্টার’-এর নেতৃত্বে থাকা নাজনীন আমাকে প্রস্তাব করেন ‘হারমোনি হল ফর সিনিয়রস’ নামের একটি মাল্টিকালচারাল অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য; এটিতে শ্রীলংকান, চাইনিজ এবং মেইনস্ট্রিম কমিউনিটির লোকেরাও ছিলেন। সেখানে অন্তত একজন বাঙালি প্রতিনিধি থাকা দরকার বলে তারা মনে করেছিলেন। এই কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করতো প্রভিন্সিয়াল এবং ফেডারেল সরকার। আমি সেখানে দুই বছর ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতাকে যখন পেছন ফিরে দেখি, তখন একটি বিষয় বারবার ভাবনার সামনে চলে আসে- শ্রীলংকান এবং চাইনিজ প্রবীণরা যেভাবে নিজেদের কমিউনিটির জন্য অবদান রেখেছেন, বাঙালি প্রবীণরা সেটা করতে চাননি বা পারেননি। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা কয়েকজন মিলে কানাডায় ‘বেঙ্গল ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিলাম। ওই সংগঠনের ব্যানারে স্বাধীনতার ১৬ বছর পর টরন্টো ইউনিভার্সিটির একটি মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধের কানাডিয়ান অ্যাক্টিভিস্টদেরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তাঁরা অনেকেই বলেছিলেন, “১৬ বছর পর আমাদেরকে মনে পড়লো তোমাদের? আমরা তোমাদের দেশ সম্বন্ধে সত্যি আবেগাপ্লুত। সুযোগ পেলে বাংলাদেশ দেখতে যেতে চাই।”
আরেকটি কথা, ‘টরন্টো ফিল্ম ফোরাম’ নামে বাংলাদেশিদের একটি সংগঠন রয়েছে এখানে। এই সংগঠন সাপ্তাহিক প্রোগ্রামের আয়োজন করে; চলচ্চিত্র প্রদর্শন, প্রথিতযশা ব্যক্তিদের সাথে আড্ডা, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা প্রভৃতি অনুষ্ঠান করে থাকে। এছাড়া প্রতি বছর আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভেলের আয়োজন করে। আমি প্রথম থেকে এই সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে থাকতে পারায় অত্যন্ত গর্ববোধ করি। এছাড়া ‘সাউথ এশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভেল’-এ বাংলাদেশ, পশ্চিমবাংলা এবং সাউথ এশিয়ান ছবি দেখানো হয়। সেখানে বাংলা ছবিগুলো দেখতে বাঙালি দর্শকের ভালো সমাগম ঘটে। এভাবে শুধু ফিল্ম তৈরি নয়, টরন্টো বা কানাডাভিত্তিক ফিল্মের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রচার-প্রসারের সাথেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি। বাঙালি দ্বিতীয় প্রজন্মের কেউ কেউ এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে প্রফেশনাল কাজ করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে আমার দেখা হয়েছে। অনেককেই চিনি না। অবশ্য বাঙালি অভিবাসী চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের সাথে তাদের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। পেশা হিসেবে এরা ফিল্মে ভালো করছেন। আমি মনে করি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কানাডা-বাংলাদেশিদের জন্য তারা নতুন নতুন দিক-নিশানা নির্মাণ করতে সক্ষম হবেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কানাডিয়ান টেলিভিশনে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি একসময় বাংলাদেশে ফিরে যাই এবং ১৯৯৮ সালে একুশে টিভি প্রতিষ্ঠায় অন্য ৩-৪ জনের সাথে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করি। মানবাধিকার বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমকে সমন্বয় করে সিস্টেমেটিকভাবে দেখানোর সুযোগ পাই একুশে টিভিতে। এরই ধারাবাহিকতায় আমি বাংলাদেশ ও কানাডাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকারের বিভিন্ন বিষয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে আগ্রহ বোধ করি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার একবছর পরে কানাডা এবং আমেরিকার লেবার লিডাররা বাংলাদেশে আসেন। আমাকে সাথে নিয়ে আসেন প্রামাণ্যচিত্রের প্রযোজক-পরিচালক হিসেবে। সেই সময়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি, ভিক্টিমদের বাড়িতে যাই, ডাক্তারদের সাথে কথা বলি, শ্রমিক নেতাদের সাথে আলোচনা করি। তারপর এই ফিল্মটি (‘রানা প্লাজা: ভিক্টিমস অব ফ্যাশন’) তৈরি করি। এটি টরন্টোতে লেবার কংগ্রেসের ফিল্ম ফেস্টিভেলে বেস্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। তবে এই ছবিটি দেখে টরন্টোর কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামে যে, গার্মেন্টস খাতে বাংলাদেশ কানাডাতে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা করে, সে ক্ষেত্রে রানা প্লাজাকে হাইলাইট করে এ ধরনের ম্যুভি বানানো ঠিক হয়নি। টরন্টোর ইস্টইয়র্ক অ্যান্ড বিচেস এলাকার এমপি ম্যাথিউ কেলওয়ে যাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল শ্রমিক ইউনিয়ন রাজনীতি (এনডিপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন) রানা প্লাজার একবছর পূর্তি অনুষ্ঠানে কানাডার শ্রমিক লিডারদেরকে নিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন এবং সেখানে শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ে সরকার, মলিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেছেন। আমার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রে এই বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
বাংলাদেশ-পর্বে কিছু কাজ করে পুনরায় কানাডায় ফিরে আসি। এখানে এসে ‘মার্সিলেজ মেহেম: দ্য বাংলাদেশি জেনোসাইড থ্রো পাকিস্তানি আই’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করি। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং পাকিস্তানিদের ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ইচ্ছা ছিল একটি রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু পাকিস্তান চেয়েছিল সামরিকভাবে সমাধান করতে। পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অর্থনৈতিক ও বর্ণবাদী বৈষম্য চালিয়ে আসছিল প্রায় ২৩ বছর ধরে। আমি তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাঙালির ওপর দুর্বিষহ অত্যাচারের কথা পাকিস্তানিদের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছি। এই প্রামাণ্যচিত্রটি কানাডায় এবং আমেরিকায় বসে করা সম্ভব হয়েছে। কানাডায় এসে প্রথমবারের মতো আমি সম্পূর্ণভাবে ফ্রিডম ফিল করি। যেটা বাংলাদেশে কখনও পাইনি। র্যাংগস বাংলাদেশ-এর ডাইরেক্টর আমানউল্লাহ চৌধুরী আর্থিকভাবে সহায়তা করেছিলেন। উনি একজন ফার্মাসিস্ট। তাঁর সাথে ১৯৭১ সালে আমার পরিচয় হয়েছিল। আমি একান্ত নিজ উদ্যোগে উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত পাকিস্তানি সাংবাদিক, লেখক, ব্লগার, প্রাক্তন সৈনিক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করি। কথোপকথনে অংশ-নেওয়া ২৪ জনের সবাই অফ-ক্যামেরা অনেক কথা বললেও মাত্র চারজন অন-ক্যামেরা আলাপ করতে রাজি হয়েছিলেন। তাঁদের অনেকে বলেছেন যে, “যদি সত্যি কথা বলি, তাহলে পাকিস্তানে আমার বাড়ি-ঘর এবং পরিবারের ওপর অত্যাচার হতে পারে। তবে, যৌবনে যা করেছি, তা ভালো করিনি।” আমি এই তথ্যভিত্তিক ও তাৎপর্যপূর্ণ কাজটি করেছি সেই সময়ে পূর্ব-পাকিস্তানে দায়িত্বে থাকা পাক-অফিসারদের বক্তব্য নিয়ে। এছাড়া, পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক এবং রাজনীতি বিশ্লেষকরাও এ-বিষয়ে তাঁদের অভিব্যক্তি জানিয়েছেন। তাঁরা আমাকে বলেছেন, কী ভয়ঙ্কর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তখন। তাঁদের মতে এই অত্যাচার ১৯৭১-এ নয়, তা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই। তাঁদের এই স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল। দেশ এবং দেশের বাইরে বৃহত্তর দর্শক-শ্রোতাকে ধরার জন্য আমি বাণিজ্যিকভাবে নির্মাণ করি নারী পাচার বিষয়ক পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘মেঘনা কন্যা’। এই ছবির দুজন প্রযোজক আনোয়ার আজাদ ও সাইফুল ইসলাম কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশি। এটি ২০২৪ সালে ঈদ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের সিনেমা হলে মুক্তি পায়। পরে চলচ্চিত্রটি ‘সাউথ এশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভেল’ টরন্টো এবং ‘সিল্করোড ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভেল’ চায়নায় প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রটি নির্মাণে স্পন্সর করেছে ইউন্ডরকের মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড অ্যাম্বাসি; বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্রামীণ ফোন এবং এসএমসি। আমার পরিচালিত একমাত্র বাণিজ্যিক পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘মেঘনা কন্যা’ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০টি জেলায় প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। নারী পাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। ‘মেঘনা কন্যা’ আমার পরিচালিত প্রথম সিনেমা হলেও এটি ব্যবসাসফল হয়েছে; স্পন্সরের মাধ্যমে খরচের বেশিরভাগ টাকা ওঠে এসেছে।
৪.
কানাডায় আমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ডকুমেন্টরি বানানো। সাসকাচুয়ান এবং অন্টারিওতে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিরঞ্জীব তালুকদার এক্ষেত্রে আমার প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। কাপ্তাই ড্যাম তৈরির পর চিরঞ্জীবদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। তিনি তখন ৩০ জন চাকমাকে কানাডায় নিয়ে এসেছেন স্পন্সর করে। ডা. তালুকদার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে চলমান ঘটনা নিয়ে খুব বিচলিত ছিলেন। তাঁকে সাথে নিয়ে ওখানে স্যুটিং করেছি। বাকি অংশ সাসকাচুয়ানে স্যুটিং হয়েছে। এ-তথ্য অনেকেরই জানা যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাহাড়িরা নানান কারণে শান্তিবাহিনী গড়ে তোলে। তাদের অধিকারের প্রশ্নে বাঙালির সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। এই লড়াইয়ে তারা ভারতের সহযোগিতা পেয়েছিল। বাঙালি-পাহাড়ি এই যুদ্ধ ২১ বছর চলমান থাকার পর ১৯৯৬ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়িদের সামাজিক সংকট বাড়তে থাকে। এই সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস ইন দ্য হিলট্র্যাক্টস’ নির্মাণ করি আমি। তবে, রাজনৈতিক কারণে এটি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে পারিনি।
সহজ কথায় বলতে গেলে এক প্রবল ও অনিয়ন্ত্রিত আগ্রহকে আশ্রয় করে ফার্মেসির পেশা ছেড়ে আমি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত ও বাংলাদেশের বিচিত্র ও বিস্তৃত মিডিয়া জগতে পরিভ্রমণ করেছি। মিডিয়া বিষয় শেখানোর পাশাপাশি মানবাধিকারভিত্তিক অনুষ্ঠান তৈরি করেছি। এই পথ ধরেই খুঁজে পেয়েছি আমার জীবন-পথের সত্যিকারের আহ্বান। অনেকটা পথ পেরিয়ে আজ এই পুরো যাত্রার দিকে ফিরে তাকাই গভীর সুখ আর একরাশ তৃপ্তি নিয়ে।
লেখক পরিচিতি
পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মিডিয়া নির্বাহী হিসেবে বাংলাদেশ, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত জুড়ে আন্তঃসাংস্কৃতিক তথ্যচিত্র, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন। প্রাক্তন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), দীপ্ত টেলিভিশন (বাংলাদেশ); প্রাক্তন নিউজ প্রডিউসার, সিবিসি/ সিটিভি (কানাডা)।

