কানাডা এক ম্যাজিক্যাল কান্ট্রি
ড. জান্নাতুল ফেরদৌস
এক যুগের বেশি সময় ধরে বসবাসরত এই দেশটিতে রয়েছে বিচিত্র রকমের অভিজ্ঞতা। গরমের দেশ থেকে এসে পুরো বিপরীত আবহাওয়া শুধু নয়, মাইনাস পঞ্চাশ পর্যন্ত শরীরে মানিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতার পাশাপাশি রয়েছে হোমসিক ও কালচার শক। তবে এই সবকিছুকে ছাপিয়ে যা আমাকে পুলকিত করেছে এর ম্যাজিক্যাল আবহাওয়া। তাপমাত্রার নিম্নগামিতা নিয়ে ক্যানাডিয়ান বা ইমিগ্রেন্ট সবারই অভিযোগ থাকলেও আমার ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত। আমার এই ছোটো চোখে ধরা পড়ে প্রকৃতির এই বিশাল ভাণ্ডার। যখন এই দেশে ল্যান্ড করলাম আমি এই স্বর্গীয় অনুভূতির ছোঁয়া পেলাম যেন। এত সুন্দর সাজানো গোছানো এবং মানুষগুলো এত আন্তরিকতার সাথে কথা বলছে! কিছু জানতে চাইলেই জিজ্ঞেস করছে “হাউ মে আই হেল্প ইউ।”
ল্যান্ড করেছিলাম কানাডার ক্যালগেরি এয়ারপোর্টে। আমার বড়ো ভাইয়া অভ্যর্থনা করে নিতে এসেছেন আমাদের। আমি ও আমার বর ল্যাগেজের ফর্মালিটি শেষে ভাইয়ের গাড়িতে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই কিছুদূর পেরিয়ে চোখে পড়লো ক্যালগেরি টাওয়ার। ক্যালগেরির বুকে তখন কেবলই সন্ধ্যা নেমেছে। ক্যালগেরি টাওয়ারের আলো ঝিকমিক করছে দেখে আমি জানতে চাইলাম, ওটা কী? আমার ভাইয়ের ছোটো ছেলে ওর বয়স তখন ছয় কি সাত হবে। বলে ওঠলো, ফুপি, ওটা ক্যালগেরি টাওয়ার। ওই ওপরে রেস্টুরেন্টও আছে। খুবই অবাক হয়েছিলাম একটা চিকন টাওয়ারের ওপর রেস্তোরাঁ! পরে অভিজ্ঞতা হয়েছে টাওয়ারে ওঠার, তবে তা টরন্টোর সি এন টাওয়ারে। সত্যি, আমার মনে হচ্ছিল আমি নেভার দ্যা ল্যান্ডে ঢুকে গিয়েছি! নিজেকে কল্প লোকের বাসিন্দা মনে হচ্ছে, আবার কখনো মনে হচ্ছে টাইম ট্রাভেল করছি।
পুরো বিপরীত মেরুতে পুরো ভিন্ন ভাষাভাষি মানুষ; রাস্তা, বাড়ি। পাহাড়ি জায়গাগুলো বার বার দেশের বান্দরবানের কথা মনে করিয়ে দিলেও পরক্ষণেই ভুল ভেঙে যায় অপরিচিত বুনোফুল ফল দেখে। যেদিন প্রথম কানাডাতে পা রাখলাম, মনে আছে তা, জুন মাসের পাঁচ তারিখ। সামার চলছে কানাডায়। যদিও সামার তবে সদ্য গরমের দেশের একজনের কাছে তা ছিল বাংলাদেশের শীতের প্রথম প্রহর। বাসায় পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। আমার একমাত্র বড়ো বোন হাজারো রকমের খাবার রান্না করে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। সেই অনুভূতি বোঝানো সহজ নয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠে বাইরে গিয়েই আরো চমকিত হলাম। এত সুন্দর ঝকঝকে নীল আকাশ আর আকাশের বুকে সাদা কটনক্যান্ডির মতো ঘন মেঘ এখানে সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে। এ যেন স্বর্গের অপ্সরীরা প্রতিযোগিতায় নেমেছে কটনক্যান্ডি বানানোর। মেঘের বুকে মেলে দিচ্ছে তাদের সৃষ্টি, তাদের শিল্প আর বাতাস বন্ধু তা বহন করে নিয়ে যাচ্ছে অন্য মেঘের দেশে।
আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এই যে প্রকৃতির এই অদ্ভুত যোগসূত্র তা স্বর্গ ভিন্ন মর্ত্যে পাওয়া কি সম্ভব! আহা, বিধাতা কাউকে ঠকান নাই যেন! পৃথিবীর প্রতিটি জায়গায় তার প্রমাণ মেলে।
গতানুগতিক ধারার বাইরে আমার চোখ পড়ে। তা বুঝতে পারি গরমের দিনগুলোর শেষের দিক থেকেই। হঠাৎ যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা আমাকে এনে ফেলে আর এক ভুবনে। প্রকৃতিতে শীতল ভাব। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্রথম স্নো-ফল হলো, ট্রেনে, বাসে, অফিসে, আদালতে। সবাই বলে ওঠলো ‘মেরি ক্রিসমাস’ বড়োদিন আসতে প্রায় দুইমাস বাকি। বছরের প্রথম স্নো এখানে যিশুর আশীর্বাদপুষ্ট। ভাগ্যদেবীর সহায়তায় তা যে এত আগে আসবে, কে জানতো!
আমার জন্মমাস নভেম্বর। গরমের দেশের মানুষ আমি নভেম্বরটা এত সুন্দর একটা আবহাওয়া বাংলাদেশে! চিটমিটে গরম নাই। প্রকৃতির ভিতর ঠান্ডা এক পেলবতা, কিন্তু হায় ঈশ্বর! এ আমি কোথায় এলাম! এমন ভাবতেই মনে পুলক জাগলো অন্য ভাবনায়। স্নো হোয়াইট মনে হতে লাগলো নিজেকে। মনে হলো, আমি সেই ঘুমন্ত রাজকন্যা যাকে বিধাতা এনে ফেলেছে সেই কল্পলোকে যেখানে স্নো-হোয়াইট গার্লেরা নিয়োজিত থাকে রাজকন্যার সেবা করতে, আর অপেক্ষায় থাকে কখন ঘুম ভাঙবে। কিন্তু এই ঘুম তো অমূল্য, যা ভাঙবে শুধু তার রাজকুমারের সোনা রুপার কাঠির আলতো ছোঁয়ায়। জন্মদিনের প্রথম প্রহরে রাজকন্যা মন নিয়ে কিছুক্ষণ চলে স্নো-স্নান। তুষারের কাচকাটা হিরের টুকরোর মতো বরফ কুঁচি সন্ধ্যায় গাড়ির গড়িয়ে পড়া আলোতে এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্য হয়ে বিরাজ করে, যার অনুভূতি সর্বস্তরে আলোড়ন তোলে। সত্যি বলছি, আমার সেই যে তুষারময় প্রথম জন্মতিথি ছিল আমার জীবনের অপার আনন্দের। তাপমাত্রায় এত ওঠানামা তা এতটুকুও বিরক্তির কারণ না হয়ে দিনকে দিন আমার কৌতূহলকে বাড়িয়েই দিলো। যখন তুষারপাত হতো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি খোলা মুখে আকাশের পানে চেয়ে ভাবতাম কত সম্ভাবনার কথা! অপেক্ষায় থেকেছি আমার কল্পলোকের বসবাসের সাথে আমার রাজকুমারের কথা। যার বসবাস যেন আমারই মতো অন্য এক নেভার দ্যা ল্যান্ডে।
শীতের সময়ে মাইনাস ডিগ্রি, বিশেষ করে মাইনাস তিরিশ এর নিচে তাপমাত্রা নামলে তার যে কী ভয়ংকর সৌন্দর্য! সেই সৌন্দর্য অবলোকন করেছিলাম প্রথমবার রকি মাউন্টেনের পাদদেশে; কখনো-বা লেক মিনাওয়াংকা, লেকলুইস আবার ব্যাম্ফের ট্যানেল মাউন্টেনের চূড়ায় সকলের প্রথম সূর্য কিংবা সন্ধ্যার সূর্যের শেষ রশ্মিতে। আমার এই একযুগের বেশি সময়ের বসবাসরত অভিজ্ঞতায় যা সঞ্চয় তা খুলে বসলে, সেখানে সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে পাওয়া যাবে, প্রকৃতির সাথে কাটানো আমার অনিন্দ্য সুন্দর মুহূর্ত, হোক সে ছোটো গ্রীষ্মকাল বা লম্বা শীতকাল।

বলছিলাম হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো কে যেন আমাকে নিয়ে যায় কোন অজানায়। প্রায় প্রতিদিনের রুটিন করে সকালে ওঠে বাসা থেকে বের হয়ে যেতাম, উদ্দেশ্যবিহীন উদ্দেশ্যে। সেই সকালবেলা আমার সঙ্গী প্রকৃতিকে নিয়েই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের ভিতর সৌন্দর্য অবগহন হতো আমার। রাস্তাগুলো যেন কার্পেটমোড়া চকচকে ঝকঝকে, বাড়তি কোনো জঞ্জাল নেই। এই রাস্তার যেন কোনো শেষও নেই। রাস্তার ধারে রয়েছে নানা ফুল ও ফলের গাছ। কখনো চোখে পড়ে আপেল, তারও আবার রকমভেদ। লাল টুকটুকে রং, আবার কখনো সবুজ। ক্রাব আপেল আমার প্রিয় হয়ে উঠলো তার টক-মিষ্টি স্বাদের কারণে। সেই আপেল দিয়ে প্রথম কয়েক বছরে আচারও দিতাম। এরপর আরো কতরকম বেরি গাছ, মালবেরি, স্ট্রবেরি, রাসবেরি, ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরি। মনে হলো, এই সব ব্যবস্থা যেন এই আমারই জন্য। হঠাৎ চোখে পড়ে চেরি ফল। লাল হয়ে কিছুটা জামের মতো পেকে টসটসে কালো জামের রং ধারণ করেছে। সেই গাছে বসেছে নানান জাতের নানান রঙের পাখি, দেখে মনে হলো যেন চেরিগাছ নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছে তাদের। আমাকে দেখে এতটুকুও ভীত না হয়ে আপন মনে টসটসে চেরিফল খেয়ে নিচ্ছে আর মাঝে মাঝে তাদের দৃষ্টি পড়ছে আমার ওপরে, সেই দৃষ্টিতে কোনো ভয় ছিল না ছিল নির্ভরতা ও অভ্যর্থনা। ছোটোবেলা থেকেই আমি প্রকৃতি কন্যা। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে কত রকম ফুল, ফল আর লতাপাতা আমাকে পাগল করে দিতো। ছেলেবেলার বন্ধু রক্তিমের সাথে কখনো ভোরে কখনো সাঝের বেলা ফুলের নেশায় মৌমাছি ও প্রজাপ্রতির পিছু নিয়েছি। এখানে ছেলেবেলার বন্ধুটি সাথে নেই, তবে সেই স্মৃতি ও সেই সময়কে বহন করে আমি আজও কখনো প্রজাপ্রতি, কখনো ঘাসফড়িং-এর পিছু নিই। মন কেমন করা বিকেলগুলোতে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে ঘাসফুলগুলো। মাঠভর্তি ঘাসফুল আমাকে যেন বলে ওঠে, মন খারাপের সময় কোথায়, বন্ধু? এসো, আনন্দে উদ্যমে বাঁচি, যেটুকু সময় বাকি।
আমার এই প্রকৃতির মধ্যে প্রকৃতির খোঁজা চলে অবিরত। কতকিছু যে দেখার বাকি, সময় যে নেই! কানাডাতে আসার পর আমার একমাত্র আফসোস সময় নিয়ে। এখানে সময় যেন ছুটন্ত; দুরন্ত কোনো অশ্ব। তুমি তার পিঠে চড়ে চলবে তার সাথে, কিন্তু ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে রেহাই নাই, তাই প্রতিটি মুহূর্তে বাঁচতে হয় মানুষের। বিশেষ করে যেখানে চোখের নিমিষেই শীত, বসন্ত আর গ্রীষ্ম তাল মিলিয়ে যাদুকরের মতো যাদু দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে।
ম্যাজিক্যাল কান্ট্রি তার যাদুর এতটা দাপট। রাতে ঘুমোতে গেলে সকালে ডালপালাহীন গাছে দেখা যায় কচিপাতা। এদের দেখেই বোঝা যায় মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির কী অমোঘ নিয়তি! শীতকাল সময়টা এখানে দীর্ঘদিন থাকে। তাপমাত্রা যখন মাইনাস বিশ কিংবা মাইনাস তিরিশের নিচে নামে, তখন চারদিকে শুনশান একটা নীরবতা চোখে পড়ে। কঠিন বরফের সময় মানুষজন পারতপক্ষে ঘরে থাকার চেষ্টা করে, বিশেষ করে যদি হয় ছুটির দিন তাহলে তো কথাই নাই। নিজের মনের মতো সময় কাটানোর উপযুক্ত সময় এইটা। দিনের বেলা সাদা চাদরের মতো বরফ-ঢাকা কানাডার ক্যালগেরি যেন নিজস্ব রূপ ফিরে পায়। সকালের তাপহীন সূর্যের আলোকে থোড়াই কেয়ার করে মাইনাস তাপমাত্রা বহাল তবিয়তে বিরাজমান তার আপন ঐশ্বর্য নিয়ে। রৌদ্রময় দিনে নিম্ন তাপমাত্রার ভিতরে সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ছাদ বেয়ে পড়া বরফের স্টিকগুলো যেন নান্দনিকতার চরম পর্যায়ের প্রতিফলন। প্রকৃতির এই অপার রহস্য আমাকে বার বার বিমোহিত করে যাদুমন্ত্রের মতো।
আমি মন্ত্রমুগ্ধ এক প্রকৃতিকন্যা। শীতের পড়ন্তবেলায় মন কেমন করা বিকেলগুলোতেও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি, আমার কানে শীত ঋতু পরম আপন হয়ে যেন বলতে এসেছে- আমি শীত শীত, আমি আদিম ডাইনোসর, আমাকে গ্রহণ করো তোমার সমস্তটা দিয়ে, আমাকে বরণ করো তোমার অনুভূতির শীতলতায়। এসো, দেখো আমি ডাইনোসর রূপে এসেছি তবে তোমাকে ধরতে নয়, ধরা দিতে। তোমার আঙিনায় তোমার সময়ে এসেছি, তোমারই চিরচেনা অতিথি আমি, যত্ন করো আমাকে পরম ভালোবাসায় গ্রহণ করো প্রিয়, বিনাদ্বিধায়। সেই যে ফিসফিস করা বাতাসের শীষ ধ্বনির মধ্যে এই কথাগুলো বাজতে থাকে আমার কানের গভীরে আমি আর থাকতে পারি না। উদাস মনে আমাকে কোথায় যেন টেনে নিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় আমার সেই সোনার কাঠি আর রুপার কাঠি ছোঁয়ানো রাজকুমারের কথা। মেপেল গাছের নিচে আগুন লাগা ফাগুনের মতো গাছের পাতাগুলো জানিয়ে দেয় শীতের আগমনী বার্তা, হেমন্তের প্রথম লগ্নে। ঘুম ভেঙে দেখি, দরজায় কড়া নাড়ছে হেমন্ত।

আমার ঘরে থাকা দায়। আমার হেমন্ত তোমার দরজায় নিয়ে যাবে বসন্তের আগমন, তুমি কি শুনতে পাও সে নূপুরের রিনিঝিনি, যে বাজে নিত্য তোমারই ছন্দে? আমার ভিনদেশি রাজকুমার! তোমার পাতালপুরের রাজকন্যার প্রাণভমরা ছটফট করে। তাকে উদ্ধার করতে এক নিঃশ্বাসে ডুব যে তোমাকে দিতেই হবে। এ সত্যি ধ্রূবতারার মতো সত্যি। ভালোবাসা বাসা ভালো না ভালোবাসা, অবশিষ্ট অশ্রুফোঁটা তাও মিলিয়ে যায় কালক্ষেপণে। আচমকাই আন্দোলিত হয় কথাগুলো মনের ভিতর। সত্যি তো সময় যে নেই বেশি, আমার তীব্র শীত আমার প্রচণ্ড শীত, আমার মন কেমন করা শীত, এসো তুমি-আমি প্রস্তুত। আমি নৃত্য করি, তুষার-নৃত্য, আমি গান গাই, কবিতা পড়ি। নৃত্যের তালে, গানের সুরে আর কবিতার ছন্দে ছন্দে বরণ করি আমার রুদ্রমূর্তির প্রকৃতিকে। আর প্রাণ খুলে বলে উঠি এই আমার যে শিল্পীসত্তা, তার পুরোটুকু ঢেলে দিলাম তোমার চরণে, গ্রহণ করো তোমার অকৃত্রিম উদারতায়। আমি বরণ করি যেমন কানাডার প্রচণ্ড শীতকে তেমনি ক্ষণিকের গ্রীষ্ম, হেমন্ত ও বসন্তকে।
আমার এই অপার রহস্যের প্রকৃতির ভিতরে আমার বিচরণ চলে সর্বত্র। শুধু আমার একান্ত সময়ে তাকে দেখি না, প্রচণ্ড কাজের ফাঁকেও চলে তার সাথে আমার মিতালি। এই অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির পসরার ডালি দেখতে দেখতে কখন যে সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, রাত শেষে প্রভাত হয় পৃথিবীতে, তা বুঝে ওঠার আগেই ঘটে সব। আমার রুদ্র শীত, আমার পরম আদরের গ্রীষ্ম, আমার অভিমানী বসন্ত ঋতু, তোমাদের এই বিচিত্রতার নতুন স্বাদ আমি পেলাম আমার এই ম্যাজিক্যাল কান্ট্রিতে। যেখানে আমার জন্ম নয়, আমার নিশ্বাস মিশে যায় এই দেশের বাতাসের প্রতিটি মুহূর্তে।
জীবনের চলার পথে দেখার অভিজ্ঞতা ও চোখ নিঃসন্দেহে সবার ভিন্ন। কারো সাথে কারো অভিজ্ঞতা যেমন মিলবে না, তেমনি সংস্কৃতি, পরিবেশ, পরিস্থিতি, বেড়ে ওঠা- এসবেও থাকবে অমিল। তবে বেশির ভাগ সময়ই মানুষ ভীষণভাবে পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে পরিবেশের জটিল সমীকরণ পাশে রেখে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও রুচির সংমিশ্রণে শিকড়কে না ভুলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে হৃদয়ে গেঁথে চলার মধ্যে যে জীবন সে জীবন যে অমূল্য তা বলার অধিক। বিধাতার এই অপার বিস্ময়ের পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের রত্নভান্ডার, যা খুঁটিয়ে দেখার মতো চোখ থাকতে হবে। বিশ্বভ্রমণে এই দেখার চোখটা প্রসারিত হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভান্ডারে যদি কিছু ঐশ্বর্য থেকে থাকে, তা আমার দেখা, বিশ্বকে ঠিক হাতের তালুতে পুরে দেখতে চেয়েছিলাম আমি। আর তেমন একটি অনুসন্ধিৎসু মন বিধাতার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ভরে ওঠলো, পুষ্পবৃষ্টি বর্ষিত হলো যেন। অসম্ভব সম্ভব হলো। আমার মনের মধ্যে বাঁশি বাজলো। সে বাঁশির সুরে ভরা মন কানায় কানায় পূর্ণ। সবকিছুর মধ্যে যেন জীবনের জয়গান। সেই সত্য-সুন্দর ধীর, শান্ত-সৌম্য হৃদয়- পঙ্কিলতা যাকে ছুঁতে পেল না। ফলশ্রুতিতে কানাডার তাপমাত্রার এই রুদ্রমূর্তি আমার ভালোলাগার অন্য পর্যায়ে নিয়ে যায় যেখানে চরমভাবাপন্ন তাপমাত্রা হয়ে ওঠে আমার জীবনের আইকনিক লাভ। যেখানে প্রকৃতির কোলে আমি খুঁজে ফিরি নিজেকে যেমন, তেমনি নিজেকে মেলে ধরি এই প্রকৃতিরই বিশালতায়। তাই নতুন একটি দেশের কোনো নেতিবাচকতা আমাকে স্পর্শ করার আগে তা ইতিবাচকরূপে বিকাশমান হয় এই আমার হৃদয় মন্দিরে। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আমার এই মুগ্ধতা কাটে না, আজও খুঁজে চলি আমি প্রকৃতির অপার রহস্য। যে মুগ্ধতা আমাকে পাগল করে ফেরে, যে মুগ্ধতা আমাকে টেনে নিয়ে চলে আমার নেভার দ্যা ল্যান্ডে। যে মুগ্ধতায় রাজকন্যা মন মাইনাস তিরিশে আজও অপেক্ষায়, আজও অপেক্ষায় এই ম্যাজিক্যাল কান্ট্রির প্রতিটি ঋতুর পরিবর্তনে।
লেখক পরিচিতি
জন্ম রাজবাড়ী জেলায়। ইডেন কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর থেকে এমএড ডিগ্রি এবং বাংলা বিভাগ থেকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা নিয়ে কোর্স করেছেন। বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের কবিতায় গ্রামীণ ও লোকজ জীবনের রূপান্তর’ (১৯৪৭-২০০০)।

