“গায়ের রঙের রাজনীতি: উপনিবেশের রেখে যাওয়া আয়না”
— “আমি কালো কোনো কিছুই পছন্দ করি না—কুত্তা, বিলাই, কিছুই না।”
— “এগুলোর গায়ের রং যেমন কালো, অন্তরও তেমন কালো।”
— “সে বড় ভালো মানুষ—একেবারে সাদা মনের মানুষ।”
— “সাদা চামড়ার ওপর সব রংই ভালো লাগে। জামা কেনার আগে নিজের গায়ের রংটা তো দেখতে হবে! পাতিলের তলার মতো কালো, আবার যা ইচ্ছা তাই কিনতে চায়!”
— “আমাদের রাজপুত্রের মতো ছেলেকে কালো মেয়ের সঙ্গে কেন বিয়ে দেব?”
খয়েরি মানুষের সমাজে এসব খুবই পরিচিত কথা। আমরা প্রায়ই শুনি। তার থেকেও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজকের দিনে যখন বিশ্বায়নের কারণে ঘরে বসেই পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর আরেক প্রান্ত থেকে জেনে নেওয়া যায়, যখন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অকল্পনীয়ভাবে সহজ করে দিয়েছে, যখন হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—“কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবাই সমান রাঙা”—তখনও আমরা সেই মানুষ, যারা বছরের পর বছর ককেশীয় শ্বেতাঙ্গদের শাসন, শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছি, অথচ নিজেদের অজান্তেই তাদের রেখে যাওয়া মানসিকতার চর্চা করে যাচ্ছি।
এটা যে শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই ঘটেছে, তা নয়। পৃথিবীর যেখানেই ইউরোপীয় উপনিবেশ গড়ে উঠেছে, সেখানেই কমবেশি এই ব্যাধির বিস্তার ঘটেছে। আর আমরা এমনই এক জাতি, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ব্যাধিকে উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করে চলেছি, কখনও প্রশ্ন না করেই।
ভারতীয় উপমহাদেশ হাজার বছরের সমৃদ্ধ সভ্যতা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ এই ভূখণ্ডের মসলিন, মসলা, কৃষিপণ্য ও হস্তশিল্পের খ্যাতি ছিল সুদূরপ্রসারী। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী থেকে ইউরোপের বিভিন্ন শ্বেতাঙ্গ বণিকগোষ্ঠী—পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি ও ব্রিটিশরা—বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসতে শুরু করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যে রূপ নেয়।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ শাসন সমগ্র উপমহাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে নিজেদের স্বার্থে পুনর্গঠিত করে। এই দীর্ঘ শাসন কেবল সম্পদ ও ক্ষমতার ওপরই প্রভাব ফেলেনি; মানুষের চিন্তাভাবনা, আত্মপরিচয় এবং সৌন্দর্যবোধের ওপরও গভীর ছাপ ফেলেছে। শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এমন এক মানসিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যেখানে শ্বেতাঙ্গদের আধুনিকতা, ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।
যদিও ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালে, গবেষকদের মতে সেই যুগে গড়ে ওঠা বহু ধারণা ও মানসিকতার প্রতিধ্বনি আজও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। সামাজিক মূল্যবোধ, আত্মপরিচয়, সৌন্দর্যবোধ—সবকিছুর ভেতরেই সেই প্রভাব কমবেশি রয়ে গেছে।
বলতে পারেন, “এ তো খুবই মেয়েলি কিংবা তুচ্ছ একটা বিষয়!” কিন্তু না, এই ব্যাধি মোটেও তুচ্ছ নয়। এর কারণে বহু মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার যৌতুকের অভিশাপে জর্জরিত হয়েছে, বহু মানুষ শুধু গাত্রবর্ণের কারণে সুযোগ হারিয়েছে, বহু আত্মবিশ্বাস জন্ম নেওয়ার আগেই মারা গেছে।
কখনও কখনও আমার মনে হয়, শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদীরা আমাদের সম্পদ লুট করার পাশাপাশি আরও একটি কাজ করে গেছে—আমাদের নিজেদের নিয়েই আমাদের ব্যস্ত করে রেখেছে। কে ফর্সা, কে কালো, কার বিয়ে হবে, কার হবে না, কে সুন্দর, কে অসুন্দর—এসব তুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে আমরা এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে মানুষের প্রকৃত মূল্য, যোগ্যতা কিংবা চরিত্র নিয়ে ভাবার সময়ই পাই না।
আর এই মানসিকতার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে বিলিয়ন ডলারের স্কিন-হোয়াইটেনিং ইন্ডাস্ট্রি। কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্বাভাবিক গায়ের রঙকে শত্রু মনে করছে। কেউ ফর্সা হওয়ার ক্রিম কিনছে, কেউ ফর্সা হওয়ার ইনজেকশন, কেউ আবার ফর্সা হওয়ার স্বপ্ন। অথচ পৃথিবীতে জন্মানোর সময় কেউ নিজের গায়ের রঙ বেছে নেয়নি।
তবু আমরা এমনভাবে আচরণ করি, যেন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো একটু বেশি ফর্সা হয়ে জন্মানো। এবং এখানেই এই গল্পের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
এখনও আমাদের সিনেমার ভিলেনকে অনেক সময় গাঢ় বর্ণের মানুষ হিসেবে দেখানো হয়। এখনও আফ্রিকান মানুষদের আমরা প্রথমেই তাদের গায়ের রং দিয়ে বিচার করি। বিয়ের পাত্র বা পাত্রী হিসেবে একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের কথা আমরা অনায়াসে কল্পনা করতে পারি, কিন্তু একজন আফ্রিকান মানুষের কথা ভাবতে গেলেই আমাদের কল্পনাশক্তি হঠাৎ করেই ছুটি নিয়ে বসে। কারণ? তার গায়ের রং।
আমরা এখনও অনেকেই মনে করি আফ্রিকার মানুষ মানেই এমন এক জনগোষ্ঠী, যাদের কাছে সভ্যতার আলো ঠিকমতো পৌঁছায়নি। অথচ সভ্যতার সংজ্ঞাটা কার? কে নির্ধারণ করেছে? যে ইউরোপীয় সভ্যতাকে আমরা সভ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরে নিয়েছি, সেই সভ্যতারও তো ইতিহাসে দাসপ্রথা, উপনিবেশবাদ, গণহত্যা এবং লুণ্ঠনের অধ্যায় রয়েছে। সভ্যতা যদি মানুষের মানবিকতা, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার মাপকাঠি হয়, তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি জনগোষ্ঠীরই নিজস্ব সভ্যতা রয়েছে। কিন্তু সেই সহজ সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
ঔপনিবেশিক শাসনের সময় সরাসরি এবং পরবর্তীকালে গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের যে সৌন্দর্যবোধ, যে শ্রেষ্ঠত্ববোধ এবং যে জীবনদর্শন শেখানো হয়েছে, আমরা তার অনেক কিছুই প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করেছি। এতটাই গ্রহণ করেছি যে এখন সেগুলোকে নিজের চিন্তা বলেই মনে হয়।
আমি মাঝে মাঝে মজা করে ভাবি, ঔপনিবেশিক শাসনের পরে যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হতো, কিংবা মা কালীর আবির্ভাব ঘটত, তাহলে হয়তো আমাদের সমাজের একটি অংশ তাঁদেরও সৌন্দর্যের পরীক্ষায় বসাত। কেউ হয়তো বলত, “সবই ঠিক আছে, কিন্তু গায়ের রংটা যদি আরেকটু ফর্সা হতো!” ভাবতে হাস্যকর লাগলেও বাস্তবতা কখনও কখনও এর চেয়েও অদ্ভুত।
এখনও আমাদের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর কিছু কেবল গায়ের রঙের ভিত্তিতে নিয়ে ফেলেন। এখনও বহু যোগ্য মানুষ চাকরি, সম্পর্ক কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে অদৃশ্য বৈষম্যের শিকার হন। এখনও আমরা কোনো খারাপ মানুষকে বোঝাতে বলি “কালো মনের মানুষ”, কিন্তু ভালো মানুষকে বলি “সাদা মনের মানুষ”। ভাষা কখনও কখনও সমাজের সবচেয়ে সৎ আয়না। আমরা যা বিশ্বাস করি না বলে দাবি করি, ভাষা প্রায়ই তা ফাঁস করে দেয়।
মজার ব্যাপার হলো, যাদের কাছ থেকে আমরা এই মানসিকতার অনেকটা উত্তরাধিকার পেয়েছি, সেই পশ্চিমা সমাজের বহু মানুষ প্রয়োজনের সময় এই গণ্ডি ভেঙে বের হয়ে আসতে পারেন। সেখানে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, বিশ্বসেরা শিল্পী হতে পারেন, জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের নায়ক হতে পারেন, কিংবা একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের জীবনসঙ্গী হতে পারেন। কারণ বাস্তবতার মুখোমুখি হলে তারা অন্তত অনেক ক্ষেত্রেই গায়ের রঙের চেয়ে যোগ্যতা, দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে।
অন্যদিকে আমরা প্রায়ই এমন এক অদ্ভুত অবস্থায় আটকে থাকি, যেখানে শ্বেতাঙ্গ সৌন্দর্যের পূজা করি, কিন্তু সেই সমাজের অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধগুলো গ্রহণ করতে খুব একটা আগ্রহ দেখাই না। আমরা তাদের বাহ্যিক রূপ নিতে চাই, কিন্তু তাদের আত্মসমালোচনার অভ্যাসটি নিতে চাই না।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো, আমরা ইতিহাস পড়ি ঠিকই, কিন্তু ইতিহাস কেন প্রয়োজন এবং বর্তমান জীবনে তার ভূমিকা কী, তা নিয়ে খুব কমই ভাবি। ইতিহাস আমাদের কাছে প্রায়ই পরীক্ষার বিষয়, উপলব্ধির বিষয় নয়। ফলে আমরা ঘটনাগুলো মুখস্থ করি, কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে চেষ্টা করি না।
আজও আমরা প্রসাধনী ব্যবহার করি ফর্সা হওয়ার আশায়। আজও গায়ের রং নিয়ে ঠাট্টা করি। আজও অনেক পরিবারে শিশুর জন্মের পর প্রথম মন্তব্যগুলোর একটি হয়—“ফর্সা হয়েছে নাকি কালো হয়েছে?” যেন পৃথিবীতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই তার মানবিক গুণাবলির চেয়ে গাত্রবর্ণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আর সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এই মানসিকতাকে প্রায়ই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। কেউ প্রশ্ন তুললে বলি, “আরে, এগুলো তো মজা করে বলা কথা!” অথচ ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈষম্যগুলোর অনেকগুলোই শুরু হয়েছিল এমন ‘মজা’, ‘অভ্যাস’ কিংবা ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া ধারণা থেকে।
গায়ের রঙের এই রাজনীতি তাই শুধু সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়; এটি আত্মমর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। আর যতদিন আমরা নিজেদের চোখ দিয়ে নিজেদের দেখতে শিখব না, ততদিন হয়তো আয়নায় নিজেদের মুখই দেখব—কিন্তু সেই আয়নায় প্রতিফলিত হবে অন্য কারও রেখে যাওয়া মানসিকতা।
আমি দেশের বাইরে থাকি আজ প্রায় দুই দশক ধরে। সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপায় পৃথিবীর প্রায় ত্রিশটি দেশ ঘোরার সুযোগ হয়েছে। বহুসাংস্কৃতিক শহরে বসবাস করার কারণে বহু জাতি, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের খুব কাছ থেকে জীবনকে দেখার সুযোগও হয়েছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে অন্তত একটি বিষয় শিখিয়েছে—পৃথিবীকে দূর থেকে যেমন দেখা যায়, কাছ থেকে দেখলে তার চেহারা অনেকটাই ভিন্ন।
আমি যে দেশে বাস করি, সেই কানাডারও একটি দীর্ঘ, জটিল এবং কখনও কখনও বেদনাদায়ক ইতিহাস রয়েছে। এখানকার নাগরিকত্ব পরীক্ষার জন্য সেই ইতিহাস পড়তে হয়। নতুন নাগরিকদের শেখানো হয় কারা এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী, কীভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় কত মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও পরিচয় বদলে গেছে।
উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মানুষই অভিবাসী অথবা অভিবাসীদের বংশধর। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখন “আমেরিকান” কিংবা “কানাডিয়ান” শব্দ দুটি ব্যবহার করি, তখন আমাদের কল্পনায় প্রথম যে মানুষটির ছবি ভেসে ওঠে, তিনি সাধারণত একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ। যেন এই দুটি পরিচয়ের মালিকানা একমাত্র তাদেরই।
অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বহু চীনা, জাপানি, আফ্রিকান, ভারতীয়, আরব এবং লাতিন আমেরিকান পরিবার চার, পাঁচ কিংবা ছয় প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে। তাদের সন্তানরা এখানেই জন্মেছে, এখানেই বড় হয়েছে, এখানেই কর দেয়, ভোট দেয়, জীবন গড়ে তোলে। তারা যতখানি কানাডিয়ান বা আমেরিকান, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত কোনো পরিবারও ঠিক ততখানিই।
তারপরও একজন খয়েরি বা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে “আসল” কানাডিয়ান কিংবা আমেরিকান হিসেবে কল্পনা করতে আমাদের অনেকের ভেতর যেন কোথাও একটি অস্বস্তি কাজ করে। ইতিহাস জানার পরও আমরা ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই না। আমরা তথ্য মুখস্থ করি, কিন্তু তার অর্থ বুঝতে চাই না।
আর এর থেকেও বড় বিদ্রূপ হলো, যাদের আমরা বছরের পর বছর অবমাননাকর ভাষায় “রেড ইন্ডিয়ান” বলে ডেকেছি, তারাই আসলে এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। আজ আমরা তাদের ফার্স্ট নেশনস, ইনুইট এবং মেটিস নামে জানি। কিন্তু তাদের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ খুবই সীমিত। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, ইউরোপীয়দের আগমনের বহু আগে থেকেই এই ভূমিতে মানুষের বসবাস ছিল। তাদের নিজস্ব ভাষা ছিল, সংস্কৃতি ছিল, শাসনব্যবস্থা ছিল, বাণিজ্য ছিল, জ্ঞান ছিল। অর্থাৎ সভ্যতা ছিল।
কিন্তু যখন আমরা “আমেরিকান” বা “কানাডিয়ান” শব্দকে কেবল শ্বেতাঙ্গ মানুষের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করি, তখন অজান্তেই আমরা সেই দীর্ঘ ইতিহাসকে অস্বীকার করি। অস্বীকার করি উচ্ছেদের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ধ্বংসের ইতিহাস, দাসপ্রথার ইতিহাস, এবং সেইসব মানুষের কান্না, যাদের কণ্ঠস্বর খুব কমই ইতিহাসের মূলধারায় স্থান পায়।
আর এখানেই আমি আবার ফিরে আসি আমাদের নিজেদের দিকে। আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। আমরা এখনও নিজেদের সৌন্দর্যকে অন্যের চোখ দিয়ে মাপি। আমরা এখনও নিজেদের সংস্কৃতিকে অন্যের সংস্কৃতির তুলনায় ছোট করে দেখি। আমরা এখনও এমনভাবে কথা বলি, যেন শ্বেতাঙ্গ হওয়াটাই উন্নত হওয়ার আরেক নাম।
এই প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়।
এই বছরের প্রথম চার মাস একজন বাংলাদেশি সেলিব্রিটিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ব্যক্তিগত কারণে তাঁকে এই দেশে শরণার্থী হিসেবে আসতে হয়েছে। বহু বছর দেশের বাইরে থাকার কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা সম্পর্কে আমার খুব একটা ধারণা ছিল না। পরে জানতে পারি, তিনি একটি পুরো প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়, প্রভাবশালী এবং অনুসরণীয় একজন মানুষ। আরও জানা গেল, তিনি এবং তাঁর সমসাময়িক কয়েকজন মিলে একটি বড় প্রজন্মের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই আমি কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু তাঁকে কাছ থেকে দেখে একটি বিষয় আমাকে বারবার বিস্মিত করেছে। নারী সম্পর্কিত প্রায় যেকোনো আলোচনায় তাঁর কাছে আদর্শ সৌন্দর্যের প্রতীক ছিলেন ককেশীয় শ্বেতাঙ্গ নারীরা। বিষয়টি একবার-দুবার নয়—প্রায় প্রতিটি আলোচনাতেই ফিরে আসত। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতেন—
“আই লাভ ককেশিয়ান ওমেন। আমার চোখে সবচেয়ে সুন্দর নারী হলো শ্বেতাঙ্গ নারী।”
প্রথম কয়েকবার শুনে আমি ভেবেছিলাম, হয়তো ব্যক্তিগত পছন্দের কথা বলছেন। মানুষের পছন্দ তো ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার মনে হতে লাগল, এখানে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নেই; এর পেছনে আরও গভীর কিছু কাজ করছে।
আমার কখনও কখনও মনে হতো, তাঁর কাছে নারী মানেই যেন মূলত একটি বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয়। মানুষের মেধা, ব্যক্তিত্ব, মানবিকতা, চিন্তাশক্তি কিংবা জীবনদর্শনের চেয়ে গায়ের রং এবং শারীরিক সৌন্দর্য যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আর তখন আমার মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেত—
যদি একজন জনপ্রিয়, শিক্ষিত, সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবশালী মানুষ, যাঁর দিকে একটি প্রজন্ম তাকিয়ে থাকে, তিনি এখনও শ্বেতাঙ্গ সৌন্দর্যের এই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে একজন সাধারণ মানুষের কাছে আমরা আর কী প্রত্যাশা করি?
তবে তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে দোষ দিই না। কারণ তাঁর এই মানসিকতা একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের মতো সমাজে বড় হওয়া অসংখ্য মানুষের মতো তিনিও এমন এক মানসিক উত্তরাধিকার বহন করছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের শিখিয়েছে—শ্বেতাঙ্গ মানেই সুন্দর, শ্বেতাঙ্গ মানেই কাঙ্ক্ষিত, শ্বেতাঙ্গ মানেই উন্নত।
সমস্যা হলো, আমরা এই ধারণাগুলোকে এতদিন ধরে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি যে এখন আর প্রশ্নই করি না। আমরা ভাবি এগুলো আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ। অথচ অনেক সময় সেই পছন্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকে শত শত বছরের ক্ষমতার রাজনীতি, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘ ছায়া।
হয়তো অনেকেই বলবেন, একজন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে এত কথা বলার কী আছে? আমিও তাই মনে করতাম, যদি বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু সমস্যা হলো, যখন একটি সমাজে নারীর মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় তার গায়ের রং, শরীর কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য, তখন ধীরে ধীরে নারীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতাটাই ক্ষয় হতে শুরু করে। তাকে একজন চিন্তাশীল, স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি পণ্য, একটি অলংকার কিংবা ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। আর যে সমাজে নারীর মানবিক সত্তার চেয়ে তার বাহ্যিক রূপ বেশি গুরুত্ব পায়, সেই সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য, অপমান, নির্যাতন এবং সহিংসতার ঘটনাগুলোও অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না। বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণের ঘটনা যে এখনও উদ্বেগজনকভাবে উপস্থিত, তার পেছনে আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক কাঠামো ও ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি এই নারীকে বস্তু হিসেবে দেখার মানসিকতাও কমবেশি ভূমিকা রাখে। কারণ মানুষকে যখন মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার প্রতি অন্যায় করাও অনেক সহজ হয়ে যায়।
জানি না কোন কথা থেকে কোথায় চলে এলাম।
তবে মোদ্দা কথা হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। নিজেদেরও মূল্যায়ন করতে হবে। বুঝতে হবে, গায়ের রঙের সঙ্গে মানুষের যোগ্যতা, মেধা কিংবা মানবিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। যদি পশ্চিমা সমাজের কাছ থেকে কিছু নিতেই হয়, তাহলে তাদের গায়ের রং নয়; বরং নিজেদের ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা, আত্মসমালোচনার সাহস এবং প্রয়োজন হলে পুরোনো বিশ্বাস ভেঙে নতুন করে ভাবার শক্তিটুকু নেওয়া উচিত।
আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা নিই না। আমরা এখনও নিজেদের সৌন্দর্যকে অন্যের চোখ দিয়ে মাপি। এখনও নিজেদের সংস্কৃতিকে অন্যের সংস্কৃতির তুলনায় ছোট করে দেখি। এখনও শ্বেতাঙ্গ মানুষদেরই “আসল” আমেরিকান বা “আসল” কানাডিয়ান ভাবি। এখনও কালো মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা করি। এখনও “সাদা মনের মানুষ” বলে প্রশংসা করি, আর “কালো মনের মানুষ” বলে অপমান করি।
আর তারপর নিজেদের খুব আধুনিক, খুব শিক্ষিত এবং খুব প্রগতিশীল ভাবি। এই জায়গাটাতেই আমার সবচেয়ে বেশি হাসি পায়।
কারণ পৃথিবীর প্রায় ত্রিশটি দেশ ঘুরে, নানা জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিশে আমার অন্তত এটুকু উপলব্ধি হয়েছে—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার গায়ের রং নয়, তার মানবিকতা। কিন্তু আমরা এখনও সেই পুরোনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি; যে আয়নাটা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল ঔপনিবেশিকতা।
আর সেই আয়নায় নিজেদের দেখেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই কে সুন্দর, কে অসুন্দর; কে আধুনিক, কে পশ্চাৎপদ; কে গ্রহণযোগ্য, কে নয়। এই কারণেই যখন দেখি মানুষ এখনও গায়ের রং দিয়ে মানুষ বিচার করে, শুধু শ্বেতাঙ্গদেরই আমেরিকান বা কানাডিয়ান ভাবে, কিংবা শ্বেতাঙ্গ জীবনধারাকেই উন্নত জীবনের একমাত্র মাপকাঠি বলে ধরে নেয়—তখন তাদের বড়ই ক্ষ্যাত লাগে।
হ্যাঁ, ক্ষ্যাত।
এই শব্দটির চেয়ে উপযুক্ত আর কোনো বাংলা শব্দ আমার জানা নেই।
কারণ ইতিহাস না জেনে ভুল করা এক ব্যাপার, কিন্তু ইতিহাস জেনেও সেই একই মানসিকতার বন্দি হয়ে থাকা আরেক ব্যাপার।
মধ্যযুগের কবি বড়ু চণ্ডীদাস বহু শতাব্দী আগেই লিখে গেছেন—
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা এই কথাটি মুখস্থ করেছি, কিন্তু বিশ্বাস করিনি।
যেদিন বিশ্বাস করব, সেদিন হয়তো গায়ের রঙের রাজনীতি ভাঙবে।
আর সেদিন হয়তো আমরা একটু কম ক্ষ্যাত হব।