ছিলাম শিল্পী, চিত্রকর করেছে কানাডা
ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন!- ওয়াল্ট হুইটম্যানের এই বিখ্যাত কবিতা কানে ধাক্কা দেয় যখন সুব্রত কুমার দাস আমার কাছে লেখা চান। মনে হয় তিনি কানাডার এমন এক জাহাজের ক্যাপ্টেন, যিনি জাহাজে বাংলা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে উত্তাল সাগর পার করে কানাডার মূলস্রোতে নিয়ে যাবেন বলে বাংলাভাষি লেখকদেরকে ডাক দিচ্ছেন। আবার ফিরে আসছেন কানাডীয় সাহিত্যের মূল ভাণ্ডার নিয়ে কানাডার বাংলাভাষি লেখকদের কাছে। সাহিত্যের একজন প্রকৃত ক্যাপ্টেনের মতোই কাজ। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিতেই হবে, তবে লেখা হতে হবে কানাডায় যাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। কী নিয়ে লিখবো? প্রকৃতি, নারী, ভ্রমণ কিংবা এখানে বেঁচে থাকার পদ্ধতি কতোরকমের ধাক্কা খাওয়া! আবার ভাবি- ধুর, ওসব নিয়ে তো সবাই লিখবে, আমি বরং আমার আর্ট জার্নি নিয়ে আরামপ্রদ কিছু লিখি। আমাকে শিল্পী করেছে বাংলাদেশ তবে চিত্রকর করেছে কানাডা।
দেশের সেরা বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে সিনিয়ার আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে ২০ বছর কাজ করেছি। একজন ভীষণ রকমের ক্রিয়েটিভ শিল্পী ছাড়া যা করা সম্ভব ছিল না। হাজারো বইয়ের কভার, শত কিশোরদের বইয়ের অলংকরণ ও প্রচ্ছদ, আর মঞ্চ নাটকের পোস্টার ডিজাইন করতাম- তাই শিল্পী আমাকে বলাই যায়। তবে চিত্রকর ছিলাম না। পুরোনো ঢাকার জমিদার কন্যা শাহানাকে বিয়ে করার পর পড়লাম মুশকিলে। কারণ, আমি বড়ো ক্যানভাসে ছবি আঁকি না। আমার শিল্পী বন্ধুদের মতো গ্যালারিতে ছবির প্রদর্শনী হয় না। উদ্বোধনী পার্টিতে শাড়ি পরে মাথায় ফুল ঝুলিয়ে অতিথি দর্শক ঢুকলেই প্রদর্শনীর আর্ট ক্যাটালগ তুলে দিতে পারে না। ছবি বিক্রি হলে মহা-উৎসাহে ছবির নিচে লাল টিপ পরাতে পারে না বলে তার খুব দুঃখ! যতই ক্যানভাসে বড়ো ছবি আঁকতে ধাক্কাধাক্কি করুক আমি অনড়। বিটপীর দায়িত্ব, বইমেলায় শত বইয়ের প্রচ্ছদ, সাথে উপন্যাস-গল্প লেখালিখি- এসবের বাইরে সময় কই আমার!
এরই মধ্যে আমার স্ত্রীর খুব আগ্রহ জন্মালো বিশ্ব ব্যাংকে চাকরি, আমার মজার ক্যারিয়ার, গ্রিনহ্যারাল্ডে পড়ুয়া আমাদের একমাত্র সন্তান অগ্নিলাকে নিয়ে বাকি জীবন কানাডা থাকার। মন্ট্রিয়লে তার ছোটো ভাইবোন শিক্ষাদীক্ষা শেষ করে মিশে গেছে ফ্রেঞ্চ কুবেকুয়া মূল সমাজে। দুইজনই বিয়ে করেছে ফ্র্যাঞ্চ কানাডিয়ান। আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো; গাড়ি-বাড়ির ছড়াছড়ি। ঠিক জানি না, সম্ভবত এই বৈভব ভাবিয়েছে তাকে। তাঁর মনে হয়েছে- আমি ওদের পড়তে পাঠালাম অথচ আজ ওরা কোথায়!
২.
আমাদের ইমিগ্রেশন হয়ে যেতেই কানাডায় না চলে এসে উপায় ছিল না। মেয়ে ছাড়া, পারিবারিক জীবন ছাড়া, একা থাকার সাহসও ছিল না। যাওয়ার সবকিছু যখন ঠিকঠাক, তখন স্ত্রী বললেন- আমাদের তো কানাডার এয়ারপোর্ট থেকে ফিরতি প্লেনে পাঠিয়ে দেবে। তোমার ইমিগ্রেশান হয়েছে একজন চিত্রকর হিসেবে। তোমার তো কোনো ছবির প্রদর্শনী নেই, আর্ট ক্যাটালগ নেই। কন্যা নায়াগ্রা দেখবে, স্ত্রীর বোন-ভাইয়েরা ঘর সাজিয়ে অধীর অপেক্ষায় আছে, কী করি! ঘর ভাড়া নিয়ে স্টুডিও করে রাত দিন বেশ কিছু ছবিও এঁকে ফেললাম। শিল্পাঙ্গন, আঁলিয়াস ফ্র্যান্সিস, জার্মান কালচার, আরিয়াল গ্যালারি পেতে ঘুরলাম। না! কোথাও ঠাঁই হলো না। শেষমেষ স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর আমাকে আমার প্রথম ছবির প্রদর্শনীর জন্যে সেন্ট্রাল রোডে তার ‘যোজন’ নামের গ্যালারিটি দশ দিনের জন্যে দিলো। যাওয়ার টিকেট কাটা শেষ তাই হুড়মুড় করে আয়োজন করলাম সব। ১৯৯৪ সালে আমার প্রথম ছবির প্রদর্শনী হলো। স্ত্রীর কর্মক্ষেত্র বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি প্রধান ল্যান্ডেল মিল্স প্রাক্তন কাজ ডেনমার্ক দূতাবাস তাই রাষ্ট্রদূতও এলেন। শিল্পীবন্ধুরা তো ছিলই। বরেণ্য শিল্পীদের মধ্যে হাশেম খান, রফিকুন্নবীসহ অনেকে এলেন। তখনকার বিটিভির নাটকের অভিনেতা বন্ধুরা এলো। বিটিভিসহ প্রায় সকল দৈনিক পত্রিকার লোক এলেন। অনেক বিষয়ে ছবি এঁকে ছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু ব্যান্ড, তাই প্রতীকী হিসেবে ত্রিশ বাই ত্রিশ ইঞ্চি ক্যানভাসে ছয়টি ছবির সিরিজ আঁকলাম একটি কালো ধূমপানের পাইপের পতন, একটি কালো মোটা ফ্রেমের পতন। নাম দিলাম ‘মর্নিং অব ফিফটিন আগস্ট’ মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে কাড়াকাড়ি করে ছবিগুলো বিক্রি হয়ে গেলো। পরের দিন দৈনিকগুলোর পাতায় প্রদর্শনীর ছবি ও রিপোর্ট। বাঘ যেমন রক্তের স্বাদ পেয়ে পাগল হয়ে ওঠে, আমিও তেমনি ছোটো-বড়ো ক্যানভাসে এ্যাক্রেলিক রঙে ছবি আঁকতে পাগল হয়ে উঠলাম। এই পরিবর্তন কানাডার কারণেই। আমার এই প্রথম প্রদর্শনীতে উপস্থিত একজন দর্শক মন্ট্রিয়লে নিজেই এসে দেখা করে বলে ছিলেন- আমার নাম দেলওয়ার এলাহী।
৩.
মন্ট্রিয়ল শহর অর্ধেকটাই পাতালে। জমজমাট সব মেট্রো স্টেশন থেকে স্টেশনে ঘুরে পাতালেই পার করে দিতাম দিন। একদিন দাঁড়িয়ে আদিবাসী ব্যান্ড দলের গান শুনছি। হাতে সদ্য ফ্রেম করা দুই বাই দুই ফুট পেন্টিং। ‘টিয়ার্স অব নেচার’ সিরিজের। ভাঙা ইংরেজিতে একজন বললেন- তোমার হাতের পেইন্টিংটি সুন্দর, কালার বেশ জেন্টাল, ফর্ম ডিস্ট্রিবিউটও ভালো। বললাম- আমার আঁকা। গতকালই ফ্রেম করিয়েছি, একজন দেখতে চেয়েছেন যদি পছন্দ হয় তিনি কিনলে কানাডায় আমার প্রথম ছবি বিক্রি হবে। তিনি বললেন- এই ‘নামুর’ মেট্রো স্টেশন থেকে উপরে মাটিতে বেরুলেই মেট্রো স্টেশন লাগোয়া আমাদের ‘নামুর আর্ট গ্যালারি’। আমার মালিকের চোখ খুব ঝুনা, তাঁকে দেখাতে পারো। যদি পছন্দ হয় বিক্রয়ের জন্যে গ্যালারিতে রাখতে পারেন। অবাক কাণ্ড, গ্যালারির মালিকও ছবিটি পছন্দ করলেন! মাত্র তিনদিন পর গিয়ে শুনলাম ছবিটি বিক্রয় হয়েছে। আরো অন্তত দুটি ছবি দিয়ে যেতে বললেন। মগজে চিনচিন করা এক ধরনের সুখ অনুভব করলাম। সেটিই কানাডায় প্রথম আমার ছবি বিক্রি হওয়া।
শ্যালিকার বাড়ি শহর থেকে বেশ দূরে, মেট্রোর শেষ স্টেশন হেনরি বরুসায় নেমে আবার বাস ধরে যেতে হয়। তার স্বামী রিচার্ড খুবই ভালো আর কাজ পাগল মানুষ। তিন পুত্র নিয়ে দোতলা কাঠের বাড়িতে থাকেন। তাদের ডিনার হয় সন্ধ্যা সাতটায়। এরপরই তারা ঘুমোতে যান। আমি রাতের খাওয়া খাই এগারোটায়, ঘুমাতে যাই রাত দুইটা-আড়াইটায়! ওয়াশরুমে যেতে কাঠের ফ্লোরে কিছু কিছু জায়গায় পা পড়লে মচমচ শব্দ হতো। ভয় হতো, যদি তাদের ঘুম ভেঙে যায়!
বিনা টাকায় থাকা-খাওয়ার অফার পেলাম মামুন ভাইয়ের কাছ থেকে। মামুনুর রশীদ নিজে কবি ও গল্পকার। কানাডায় তিনিই প্রথম বাংলায় সাপ্তাহিক ‘বালাবার্তা’ পত্রিকা বের করেছিলেন। তার বাসা বাংলা এলাকা পার্ক মেট্রো স্টেশনের কাছে রু ডঁরেসোতে। আশেপাশেই থাকে আমার বন্ধু কবি সাংবাদিক কাজী রফিকের ছোটো বোন কাজী মীরা ও তার স্বামী সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল, কবি সাজী ও তার স্বামী মিঠু, শিল্পী রবি খান- যাকে সবাই তুহিন বলে ডাকতো। মামুন ভাইয়ের স্ত্রী তাকে ছেড়ে গেছেন বলে আমার থাকার রুমটি ছাড়াও আরেকটা রুমে বাংলাবার্তার কাজকর্মের অফিস করা হয়েছিল। একদিন শুনলাম মন্ট্রিয়ল শহরে ‘ফোবানা’ হবে। তখনো জানতাম না এটি আবার কী! পরে বুঝলাম এটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের এক হাউকাউ আর কামড়াকামড়িতে ভরা ফেস্টিভ্যাল। একই শহরে বনিবনা না হওয়াতে দুই বড়ো হোটেলে দুই ফোবানা হচ্ছে। আমাকে ডক্টর শের ভাইয়ের গ্রুপ লাভাল শেরাটনে বিশাল মঞ্চ সজ্জা টিমকে সহায়তা দিতে ডাকলেন। আমিও সানন্দে গেলাম। যথাসম্ভব সাহায্য করলাম। আমার এতে বড়ো লাভ হলো। ঘুরে দেখি গোটা হোটেলে আমেরিকার নানা শহর থেকে আসা বাংলাদেশিরা প্রায় তিনশ’ রুম ভাড়া নিয়ে গিজগিজ করছে। কী চমৎকার হোটেল আর্ট গ্যালারিতে অতিথিদের ছোটো-ছোটো বাচ্চা-কাচ্চাদের জন্যে বেবি রাখার রুম বরাদ্দ দিয়েছেন! ডক্টর শের রুচিশীল মানুষ, তাঁকে গ্যালারি স্পেসে আমার ছবির প্রদর্শনীর জন্যে দিতে অনুরোধ করায় খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেলেন। মামুন ভাইয়ের বাসা হয়ে গেলো আমার স্টুডিও। কিছু ছবি রোল করা ছিল, নতুন কিছু ছবি এঁকে রবি খান তুহীনের সহায়তায় ফ্রেম করিয়ে রেডি করে ফেললাম আমার দ্বিতীয় ছবির একক প্রদর্শনী ‘ঘুরে দাঁড়াও বাংলাদেশ’। ১৯৯৫ সাল তখন ফোবানা ফেস্টিভ্যালে নাচ গান অভিনয়ের বিখ্যাত সেলিব্র্যাটিদের শুধু নয়, দেশে স্বনামধন্য লেখক-কবি-সাহিত্যিকদেরকেও প্লেনে টিকেট দিয়ে উড়িয়ে আনা হতো। সেবার এসে ছিলেন কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, শিমুল ইউসুফ, হাসান ইমাম, লায়লা হাসান-সহ আরো কয়েকজন। আমার প্রয়াত দীর্ঘকালের কবিবন্ধু ইকবাল হাসান এসেছিল টরন্টো থেকে। সে আগেই আদেশজারি করেছিল, আমার ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠান কবি শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হক এবং স্থানীয় পার্টি ব্লক কুবেকুয়ার এমপিকে নিয়ে সে উপস্থাপন করবে। ইকবাল হাসান আমার এমন বন্ধু যার কথায় না করা যায় না। তিন দিন চললো ফেস্টিভ্যাল, আমার প্রদর্শনীও তাই। খালি হয়ে আসছিল আমার পকেট আবার ক্যাশ ডলারে উপচে ওঠলো। তখনকার দিনে দুই শত থেকে পাঁচ শত ডলারে কিনলেন আমার ছবি অনেকে, যা আমার কাছে ছিল বিপুল আনন্দের।
৪.
‘ঘুরে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ টার্ন এরাউন্ড বাংলাদেশ সেটি আমার দ্বিতীয় একক ছবির প্রদর্শনী মন্ট্রিয়লে। তৃতীয় একক ঢাকায় ‘ফ্রম ড্রাকনেস টু লাইট’ গ্যালারি টুয়ান্টি ওয়ান ১৯৯৮। চতুর্থ একক ছবির প্রদর্শনী ‘মাইন্ডস্কেপ’ আমার শিল্পী জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ২০০১ সালে, সবে শুরু হওয়া বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে। যেমন পেয়েছিলাম মিডিয়া সাপোর্ট তেমনি হয়েছিল ছবি বিক্রয়। পঞ্চম একক ছবির প্রদর্শনী ২৫টি দুই বাই দুই ফুট ছবি নিয়ে আবার মন্ট্রিয়লে। শিরোনাম ‘টিয়ার্স অব নেচার। সময় ২০০১ সাল শুভ উদ্বোধন করেছিলেন তখনকার মন্ট্রিয়লের মেয়র পিয়ার ব্রাক। এরপর চলে আসি টরন্টোতে। একের পর এক একক ছবির প্রদর্শনী হয়েছে বার্লিংটন, মিসিসাগা, ইউনিয়নভিল ইত্যাদি নানা গ্যালারিতে। টরন্টোতে তিনটি আর্ট ডিস্ট্রিক রয়েছে ইয়র্কভিল, কুইন স্ট্রিট ওয়েস্ট এবং ডিস্টেলারি ডিস্ট্রিক। তার মধ্যে ইয়র্কভিল গ্যালারিগুলো খুবই দামি পেইন্টিং ডিল করে, শত হাজার ডলারের মার্ক সেগাল, মাতিস, পিকাসোর ছবির হাত বদল হয় এখানে। এটি টরন্টোর নম্বর ওয়ান আর্ট ডিস্ট্রিক।
ইয়র্কভিলের ‘হাটিট গ্যালারিতে ২০০৯-এর শুরুতে হলো আমার ১১তম প্রদর্শনী ‘ক্লায়মেট অব চেঞ্জ’। সঙ্গে গ্যালারি শেয়ার করে ছিলেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য স্থপতি রফিক আজম তার জলরঙের কাজ ও আর্কিটেকচার ড্রইং নিয়ে। একই বছর ২০০৯ সালের মধ্যভাগে টরন্টোর স্কারব্রো গল্ফ ক্লাব রোডে চার একর এলাকায় অবস্থিত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সিডার রিজড গ্যালারিতে ১২তম একক ছবির প্রদর্শনী ‘নো পেইন নো গেইন’ আমার জন্যে টরন্টো শিল্প জগতে টার্নিং পয়েন্ট। যেমন ছবি বিক্রয় হলো তেমনি মিডিয়া সাপোর্ট। প্রধান দৈনিক ‘টরন্টো স্টার’ ফটোগ্রাফার ও রিপোর্টার পাঠালো গ্যালারিতে। পিছনে নিজের পেইন্টিংসহ ছবি ও রিপোর্ট ছাপা হলো। আফসান চৌধুরী প্রদর্শনী নিয়ে বড়ো আর্টিকাল লিখলেন ঢাকার ‘ডেইলি স্টারে’ কানাডার সিবিসি রেডিও থেকে অর্পিতা ভাণ্ডারি এলেন ইন্টারভিউ নিতে। ওপেনিং-এ বিশেষ অতিথি কানাডার জাতীয় এমপি ও মন্ত্রী রব ওলিফ্যান্ট, সঙ্গে ছিলেন আলী কাজমী ও সায়রাস সুন্দর সিং দুইজনই কানাডার নামী ডকুমেন্টারি জেমিনাই এওয়ার্ড প্রাপ্ত ফিল্ম মেকার। ছিলেন ব্যারিস্টার পল্টু সিকদার যিনি আমার সাতটি ছবি সংগ্রহ করেছিলেন। একই বছর ২০০৯-এর একেবারে শেষের দিকে আমার ১৩তম প্রদর্শনী ‘আর্ট পার্টি’ একটু বিচিত্র। রিয়েলটর রাফি চৌধুরী রবিন্সন রোডে এক বিশাল বাড়ি এক মাসের জন্যে চাবি দিয়ে বলেন- এক মাস সময়, রাতদিন ছবি আঁকেন। শেষে আর্টি পার্টির ডাক দেন। তারপর ভাঙচুর করে রেনোভ্যাট হবে। তাই হলো। নিউ জার্সি থেকে বাইরোডে এলেন খ্যাতিমান লেখক দম্পতি জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও পূরবী বসু। টরন্টোর সাউথ এশিয়ান আর্ট স্পেশালিস্ট বন্ধু আলী আদিল খান, ‘বাংলা মেইল’ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু, সায়কোলজিস্ট দম্পতি রজত ও অর্পিতা, অন্যমেলার সাদী আহমেদ, কবি নিয়াজ শাহিদী, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কাকলী, পাঠশালার শিউলী, লেখিকা রোকসানা লেইস, আশরাফ আলী তাঁর বিদেশি গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে এসেছিলেন ‘মেমোরি অব লাগুনা বিচ’ সিরিজের ছবিও কিনেছিলেন। রেড ওয়াইন গ্রিকফুড-সহ শেষরাত পর্যন্ত চলেছিল জমজমাট ‘আর্টি পার্টি’। ১৪তম একক প্রদর্শনী লেক শো’র মিসিসাগায় পাকিস্তানি কানাডিয়ান শিল্পী আসমা মাহমুদের গ্যালারিতে। উদ্বোধন করতে আড়াই ঘণ্টা ড্রাইভ করে লন্ডন অন্টারিও ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলার ড. অমিত চাকমা এসেছিলেন, আন্তরিকতার টানে। তারপর আবার ঢাকায় ‘বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে’ ২০১৩ সাল আমার ১৫তম বড়ো ছবির প্রদর্শনী ’কালার ফ্রম সোল’। অতিথি বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম সাথে ছিলেন তখনকার বাংলাদেশে কানাডার নারী রাষ্ট্রদূত হিদার ক্রুগেন। আবার ব্যাক টু কানাডা ১৬তম একক মিসিসাগায় আসমা মাহমুদের গ্যালারিতে ২০১৬ সালে। শিরোনাম ‘কালার অব বেঙ্গল’ প্রধান অতিথি স্বনামধন্য বুদ্ধিজন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। ওপেন করলেন অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারের ইমিগ্রেশান মন্ত্রী চার্লস সোসা। ২০১৭-তে আবার স্কারবরো গল্ফ ক্লাব রোডের ‘সিডা রিজড’ গ্যালারিতে ১৭তম একক ছবির প্রদর্শনী ‘আরবান ট্র্যাপ’। বিশেষ অতিথিরা ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, বরেণ্য শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর, ড. অমিত চাকমা ও এমপিপি ডলি বেগম।
২০১৯ সাল পর্যন্ত একক ছবির প্রদর্শনী ‘মাই ব্রোকেন মাইন্ড’ ১৮তমতে এসে থেমে আছে। হয়তো আগামীতে আবার হবে। টরন্টোর স্কারবরো গল্ফ রোডের ‘সিডা রিজড’ গ্যালারিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন সুব্রত কুমার দাস। বিশেষ অতিথিরা ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, শহিদুল ইসলাম মিন্টু, ডলি বেগম, আলী আদিলো খান, জিয়াউল করিম ।
৫.
নিজের ছবির প্রদর্শনী থেকে বেরিয়ে এবার একটু অন্যদের কথায় আসি। বলি, কানাডায় বাংলাদেশের জন্যে ও বাংলাদেশি শিল্পীদের জন্যে কতটুকু করতে পেরেছি? বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘আর্ট গ্যালারি অব মিসিসাগা’কে দিয়ে আয়োজন করিয়েছি তিন মাসব্যাপী যৌথ প্রদর্শনী ‘আর্ট অব এ ইয়ং নেশান: বাংলাদেশ’। মোট ৩৮ জন শিল্পীর কাজ ছিল এই প্রদর্শনীতে। যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো দূতাবাসকে দিয়ে ৫০ বছরে বাংলাদেশের বাইরে কোনো দেশে আয়োজন করতে পারেনি। বন্ধু আলী আদিলো খানকে কিউরেট করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল গ্যালারি। তিনি আমার আইডিয়া নিয়ে প্রোপোজাল দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ পূর্তিতে বাংলাদেশি ওল্ড মাস্টার থেকে কন্টেম্পরারি তিরিশের বেশি আর্টিস্টের প্রদর্শনী করতে। আর্ট গ্যালারি অব মিসিসাগা রাজি হয়ে যায় নিজেদের খরচে ভীষণ ব্যয়বহুল এই প্রদর্শনী করতে। ডিএইচএলে ছবি আনা ও ফেরত দিতে বিরাট একটা বাজেট খরচ হয়। ছবি ছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, আর এম সুলতান, রশীদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হক, কালীদাস কর্মকার, হামিদুজ্জামান খান, আব্দুস শাকুর, বীরেন সোম, শহিদ কবীর, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ফরিদা জামান, সৈয়দ ইকবাল, আলমগীর হক, মোহাম্মদ ইউনুস, তাজউদ্দিন আহমেদ, কামাল কবীর, কুহু প্লামন্ডন, রোকেয়া সুলতানা, ইফতেখারউদ্দিন আহমেদ, দিলারা বেগম জলি, ভীনেতা করীম, কনকচাঁপা চাকমা, মোহাম্মদ ইকবাল, মাহবুবুর রহমান, তৈয়বা বেগম লিপি, মাকসুদা ইকবাল নিপা, বিপাশা হায়াৎ, আনিসুজ্জামান আনিস, নাজিয়া আন্দালীব প্রীমা, এম, ডি টোকোন, মোহাম্মদ ফকরুজ্জামান ও বিশ্বজিৎ গোস্বামীর। সবার চেয়ে সাইজে বড়ো ১৮ বাই ৫ ফুট ‘টিয়ার্স অব নেচার-১২২’ ক্যানভাসে আঁকা পেইন্টিং ছিল আমার। যা প্রদর্শনীর মূল্যবান আর্ট ক্যাটালগের প্রচ্ছদেও ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের বাইরে এতবড়ো প্রদর্শনী এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ সরকারিভাবে কিংবা বেসরকারিভাবে এরকম একটি প্রদর্শনী আবার আয়োজিত হতে কতো যুগ যে লাগবে, কারো জানা নেই।
নিজে সারা জীবন এ্যাডভার্টাইজিং আর্টের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। বিটপীতে সিনিয়ার আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে জীবনে একটাই চাকরিতে ২০ বছর পার করেছি। বিশ্বসেরা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিদের ডিজাইন অ্যান্ড প্রিন্টিং, এবং বড়ো-বড়ো ক্রিয়েটিভ কেম্পেইন সার্ভ করেছি। বিটপীর সাথে এলায়েন্ট ছিল আমেরিকার গ্লোবাল এ্যাডভার্টাইজিং কোম্পানি ‘লিউ বার্নেট’। টরন্টো ডাউন টাউনে আকাশছোঁয়া টাওয়ার বিল্ডিং-এর তিন ফ্লোর জুড়ে তাদের অফিস। ভেবেছিলাম গেলে সেখানে হালকা-পাতলা কোনো কাজ তো পাবো। এপোয়েনমেন্ট করে দেখা করতে গেলে দুইজন আর্ট ডিরেক্টর সময় দিলো। তাদের এনুয়াল ডিরেক্টরিতে আমার করা আমেরিকান ‘মোবিল’ কোম্পানির বাংলাদেশে লাউঞ্চিং ক্যাম্পেন দেখালো আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে আমার ছবিসহ। কফি খাইয়ে বললো- তুমিতো ৫৫ বয়সের মানুষ। এ্যাডভার্টাইজিং-এর নানা বিষয়ে মাস্টার্স করা তেরজন চাকরিপ্রার্থী লাইনে আছে। আমি বুঝে নিলাম এখানে কিছু করতে গেলে ছোটো হোক, নিজেই করতে হবে। তবু নতুন রাস্তায় এগোতে হবে। ডেনফোর্থ বাংলা টাউনে কোনো ডিজাইন অ্যান্ড প্রিন্টিং ব্যবসা তখনো কেউ চালু করেনি। কমিউনিটিতে অনেক না হোক, কিছু তো কাজ আছে। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের সহায়তার জন্যে রনি ডি রোজারিওকে পার্টনার হিসেবে নিয়ে শুরু করলাম ‘ইনডিজাইন’ নামে ডিজাইনিং ও প্রিন্টিং ফার্ম। দুইজন মিলে সচ্ছলভাবে চলার মতো টাকা কামাই হতো না, তবে প্রতি বছর ভালো হচ্ছিলো অবস্থা। আমরা এই প্রথম টরন্টোর দুর্গাপূজার সংকলন ‘চিন্ময়ী’ প্রচ্ছদ-সহ গোটা ছাপার কাজ করে চমকে দিয়েছিলাম। রনির সিআইবিসি ব্যাংকে ভালো চাকরি হয়ে যেতেই থেমে যেতে হলো আমাদের। তবে আজ ভাবতে ভালো লাগে, বাংলাদেশি কমিউনিটি বড়ো হওয়াতে একটি নয়, অনেকেই ডিজাইন অ্যান্ড প্রিন্টিং দোকান কিংবা অফিস করে ভালোই পরিবারসহ জীবন অতিবাহিত করছেন। এই কানাডায় দেশি মানুষের বাঁচার ব্যবসার পথ খুলে দিতে পারলাম! এটিও তো আনন্দের।
লেখক পরিচিতি
একাধারে চিত্রশিল্পী, লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী। ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার লাভ করেন। গল্প, উপন্যাস ও কিশোর সাহিত্য- সব মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩৬। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে- ‘খাগড়াছড়ির কংজুরী’, কূশল আর মৃত্যুবুড়ো’, ‘ঘুমাচ্ছো লস এঞ্জালিস’, ভালোবাসার পাঁচ পা’, ‘বিন্দুময় টরন্টো’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। গত শতকের আশির দশকের শেষদিকে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে এবং ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে চারুকলায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৯ সালে কানাডায় সাউথ এশিয়ান ফেস্টিভ্যালে সেরা শিল্পীর ‘পিপলস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। কানাডা ও আমেরিকায় ১০টি প্রদর্শনী এবং ঢাকায় ৮টি প্রদর্শনী হয়েছে তাঁর। দেশে বিদেশে ৬৪টি গ্রুপ প্রদর্শনীতেও অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। বিশ্বময় নামী শহরগুলোতে ব্যক্তিগত ও গ্যালারিতে সংগৃহীত আছে তার পেইন্টিং।

