“জাপানে যাপিত জীবন”- সুশীল কুমার পোদ্দারের জাপান জীবনের আখ্যান
আমাদের বহুল আলোচিত কানাডিয়ান বাঙালি কমিউনিটির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব সুশীল কুমার পোদ্দার যখন বিনয়ে নুয়ে পড়ে তাঁর “জাপানে যাপিত জীবন” বইটি উপহার দিলেন, তখনও তাঁর সঙ্গে আমার কোনো কথাবার্তা হয়নি। যদিও আমি তাঁর নাম জানতাম, তবু হঠাৎ করেই এমন উপহার পেয়ে খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়ি। খুশি তো হয়েছিলামই- বই আমার সবচেয়ে প্রিয় উপহার। তবে তখনও বুঝতে পারিনি তিনি আমার হাতে এমন একটি বই তুলে দিলেন, যা আমাকে একটি সম্পূর্ণ নতুন দেশ এবং তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও চলমান মানবজীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। আমার মতো অপরিচিত একজন অভাজনের প্রতি এমন ভালোবাসা প্রকাশের জন্য লেখকের প্রতি প্রথমেই বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
“জাপানে যাপিত জীবন” বর্ণনা করে সুশীল কুমার পোদ্দারের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের শুরুর দিককার বর্ণিল অভিজ্ঞতা। নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে তাঁর জন্য বিদেশযাত্রা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং সাহসী এক পদক্ষেপ। অবশ্যই কর্মক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ দক্ষতাই তাঁকে জাপান বা নিপ্পনের মতো একটি দেশে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ করে দেয়। সূর্যোদয়ের দেশ জাপান- আমাদের আধুনিক সভ্যতার অন্যতম পথিকৃৎ, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্বের অগ্রগামী রাষ্ট্রগুলোর একটি। আমাদের দেশের মতো বহু দেশের ছাত্রছাত্রীদের স্বপ্নের দেশ জাপান, যেখানে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া মানেই যেন সোনার হরিণের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া।
বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে, যেখানে বিমানে চড়াটাই একসময় ছিল এক ধরনের বিলাসিতা, সেখানে জাপানের মতো দেশে গিয়ে থিতু হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সদ্য বিবাহিত, টগবগে তরুণ, বিনয়ী, নম্র এবং মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের রক্ষণশীল মানসিকতায় বেড়ে ওঠা ড. সুশীল কুমার পোদ্দার যখন জাপানে পদার্পণ করেন, তখন তিনি পুরোদস্তুর বাঙালি হলেও ছিলেন মুক্তমনা এবং মুক্তচিন্তার অধিকারী। আর তাই সমাজব্যবস্থা এবং মানুষের আচার-আচরণে অসীম পার্থক্য থাকলেও তিনি সেদিকে তাকিয়েছেন খোলা মন নিয়ে।
তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন নতুন দেশের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস ও প্রথা আয়ত্ত করতে, এবং সেই প্রচেষ্টা ছিল সত্যিই অসাধারণ। যেসব প্রথা তিনি নিজে অনুসরণ করতে পারেননি, সেগুলোর প্রতিও তিনি দৃষ্টিপাত করেছেন সহনশীলতার সঙ্গে। এমনকি যেসব বিষয় তাঁর নিজস্বতার একেবারেই বাইরে, সেগুলোর পক্ষেও তিনি খুঁজে বের করেছেন যৌক্তিক ব্যাখ্যা। তিনি শিখেছেন জটিল জাপানি ভাষা, খেয়েছেন কাঁচা মাছ। আর যখন কোনো কোনো প্রথা—যেমন জাপানিদের স্থূল হাস্যরস কিংবা আত্মহননের প্রবণতা—মেনে নিতে পারেননি, তখনও তার পেছনের সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন।
জাপানের অত্যন্ত কঠোর কর্মজীবন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে জাপানি জাতি যে পথ অতিক্রম করেছে, তার প্রভাব গভীরভাবে পড়েছে তাদের সমাজজীবনে। বহু মানুষ সেই যাত্রাপথে হারিয়েছে নিজেদের অস্তিত্ববোধ। এই বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা এবং নতুনকে সহজে গ্রহণ করার মানসিকতার কারণেই হয়তো বিদেশ বিভুঁইয়ের কঠিন দিনগুলো তিনি আনন্দের সঙ্গে পার করতে পেরেছেন। পথের নুড়ি কুড়াতে কুড়াতে গড়ে তুলেছেন এক অসাধারণ জীবনভবন। বহু কষ্টের মাঝেও তিনি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন, এবং পরবর্তীতে আমরা তাঁকে পেয়েছি আমাদের এই শীতল কানাডায়।
সুশীল কুমার পোদ্দার তাঁর বইয়ে লিখেছেন একজন প্রবাসী ছাত্র কীভাবে একটি নতুন দেশে খাপ খাইয়ে নেয়। প্রথম থেকেই প্রতিটি পয়সা গুনে গুনে চলতে হয় তাদের। বিশেষ করে যারা সরকারি কিংবা বেসরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন, তাদের জন্য বাইরে কাজ করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ভরসা বলতে থাকে বৃত্তির অর্থ এবং গুরু কিংবা সেন্সেইদের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা।
ড. সুশীলের কথা পড়ে মনে হয়েছে, জাপানে সেন্সেইরা তাঁদের শিষ্যদের প্রতি সন্তানসম আচরণ করে থাকেন। বইজুড়ে বারবার এসেছে সেন্সেইদের প্রসঙ্গ। তাঁর যেকোনো প্রয়োজনে কিংবা সুযোগ-সুবিধার জন্য তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁদের কাছে, আর তাঁরাও অকৃপণভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন সাহায্যের হাত। সেন্সেইদের কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন এবং পরবর্তীকালে কানাডায় অভিবাসনের পেছনেও তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। আর ড. সুশীলও কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁদের স্মরণ করেছেন।
বইটিতে আরও উঠে এসেছে জাপানি বিনয়, কথাবার্তার আদবকায়দা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা আচরণ। একে অপরের প্রতি অসামান্য সম্মান, অতিথিপরায়ণতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক। সেখানে গ্রাহকদের দেওয়া হয় যথাযথ মর্যাদা। দোকান কিংবা ব্যাংক—সব জায়গাতেই এই সম্মানবোধ চোখে পড়ার মতো। বিদেশি ছাত্রদের জন্যও রয়েছে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা। যদিও প্রতিটি বিদেশি ছাত্র তাদের নিজস্ব রীতিনীতি নিয়ে আসে, তবু জাপানিদের বিনয় ও সহানুভূতি তাদের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সহায়তা করে।
জাপানের খাবারের সঙ্গে আমাদের উপমহাদেশীয় খাদ্যসংস্কৃতির রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমরা যেমন মশলা কষিয়ে সুসিদ্ধ খাবারে অভ্যস্ত, তেমনি জাপান বিখ্যাত তার সতেজ এবং অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা খাবার পরিবেশনের জন্য। সমুদ্রবেষ্টিত দেশ হওয়ায় আমিষের জন্য তারা নির্ভর করে মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর। মাঝে মাঝে সেই প্রাণীকে জীবন্ত অবস্থাতেও খাওয়া হয়। যদিও লেখক এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি, তবু তিনি জাপানি এই খাদ্যসংস্কৃতির বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলেননি। তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জাপানি মোচি, সাকে, মিসো স্যুপ, সবুজ চা ও তার শৈল্পিক প্রস্তুতপ্রণালী, সুশি, সাশিমি, মুলো, বাঁধাকপি এবং নানাবিধ মাছের সঙ্গে। জাপানি মানুষ খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসে। নানা জায়গায় নিমন্ত্রণ পেয়ে লেখক গেছেন এবং উদরপূর্তি করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, খাবারে যেমন আয়েশ ও স্বাদ আছে, তেমনি রয়েছে প্রচুর অপচয়ও।
লেখকের সৌভাগ্য হয়েছে জাপানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও শহর ভ্রমণের। তিনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় জাপানের প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তাদের ইতিহাস ও সামাজিক ব্যবস্থার কথা। তাঁর সাবলীল ভাষা পাঠককেও যেন সূর্যোদয়ের দেশ জাপান ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। তিনি পরম মমতায় স্মরণ করেছেন তাঁর সহপাঠী, সহযাত্রী এবং পরিচিত মানুষদের। বাঙালি কমিউনিটির ছোট-বড় দোষগুণও উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল একাকী; পরে স্ত্রী ও সন্তান তাঁর সঙ্গে যোগ দেন এবং তিনিও ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের সংসার। একজন ছাত্র, স্বামী, বাবা এবং বন্ধু হিসেবে তিনি জাপানের জীবনকে উপভোগ করেছেন নানা মাত্রায়।
বইটিতে উঠে এসেছে জাপানি জীবনের কিছু মর্মান্তিক দিকও। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ জীবনের করুণ পরিণতি কিংবা প্রতিবন্ধী মানুষের টানাপোড়েন। তিনি লিখেছেন নিম্নআয়ের মানুষের কষ্টের কথা। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে জাপানি গেইশাদের করুণ জীবনের কাহিনি। তিনি বলেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা, যেখানে আলোকপাত করেছেন ম্যানহাটন প্রজেক্ট, পারমাণবিক বোমা এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর তার অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞের প্রসঙ্গে।
তিনি বলেছেন জাপানিদের কর্মাসক্তি, অস্বাভাবিক কর্মজীবন এবং তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার কথা। তিনি তুলে ধরেছেন পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ আত্মহত্যার পরিসংখ্যান, মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট এবং তাদের স্থূল হাস্যরসবোধের বিষয়টি। তিনি আরও আলোচনা করেছেন জাপানিদের কিছু কুসংস্কার—যেমন ভূতে বিশ্বাস কিংবা অশুভ সংখ্যার প্রতি ভীতি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আজকের দিনেও কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে লিঙ্গবৈষম্যের উপস্থিতি। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতারই কিছু নেতিবাচক দিক থাকে, এবং জাপানের সেই দিকগুলো লেখক তুলে ধরেছেন তথ্য হিসেবে। তিনি নিজেকে বিচারকের আসনে বসাননি; বরং নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকেও নির্দয় সততার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।
আমার মনে হয়েছে, জাপান লেখককে জীবনের প্রতি আরও বিনয়ী এবং নম্র হতে শিখিয়েছে। এমনকি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পরেও একটি রেস্টুরেন্টে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করতে তাঁর দ্বিধা হয়নি। তিনি আমাদের বাঙালি মধ্যবিত্তের সামাজিক সংকোচ ভেঙে কাজ করে গেছেন। আর সেই কাজ কেবল অর্থোপার্জনের জন্য নয়; বরং কাউন্টারের পেছনের মানুষের জীবনকে গভীরভাবে জানার জন্যও। নিম্নআয়ের রেস্টুরেন্ট কর্মীদের জীবনযাপন ও মানসিকতার এক নির্মম চিত্র উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। এখানেও তিনি পেয়েছেন আরও একজন সেন্সেই, যাকে তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন “ওস্তাদ” হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ড. সুশীল কুমার পোদ্দারের জন্য জাপান ছিল একটি সেতুবন্ধন। জন্মভূমি বাংলাদেশ এবং বর্তমান আবাস কানাডার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাপানে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ এবং তরুণ। কিন্তু পরিশ্রম, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তাঁর কাজ করে গেছেন এবং নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেছেন। শত বাধা সত্ত্বেও তিনি তাঁর আত্মপরিচয় হারাননি। জাপান তাঁকে পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করেছে; শিখিয়েছে ধৈর্য, সময়ানুবর্তিতা, একাগ্রতা এবং খোলা মন নিয়ে চলতে। সর্বোপরি, তাঁকে গড়ে তুলেছে একজন কৃতজ্ঞ মানুষ হিসেবে। আর এই ধরনের মানুষেরই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ড. সুশীল কুমার পোদ্দারের “জাপানে যাপিত জীবন” পড়ার পর আমার নিজের মধ্যেও জাপানকে নতুনভাবে জানার এবং দেখার এক প্রবল আগ্রহ জন্ম নিয়েছে। বইটি প্রথমবার পড়ে জাপান সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর দ্বিতীয়বার পড়ার পর মনে হয়েছে—এই দেশটি একদিন নিজ চোখে দেখতেই হবে। লেখকের সাবলীল বর্ণনায় কখনও মনে হয়েছে আমি যেন তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছি; দেখছি তিনি দীর্ঘদিন পর নিজের পছন্দের খাবারের স্বাদ ফিরে পেয়ে গোগ্রাসে কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন খাচ্ছেন, আবার একইসঙ্গে জাপানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠছেন। বইয়ের শেষদিকে তাঁর রেস্টুরেন্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা পড়ে ঠিক করেছি, ভবিষ্যতে দেখা হলে বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে তাঁকে বলব—তাঁর হাতে তৈরি কোনো জাপানি খাবার খেতে চাই। আর সেক্ষেত্রে “আর একবার বলিলেই খাইব” রীতিটি পালন করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।
স্মৃতিকথা হিসেবে “জাপানে যাপিত জীবন”-এর অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর সহজাত সততা। লেখক কোথাও নিজেকে অতিমানব হিসেবে উপস্থাপন করেননি কিংবা নিজের সাফল্যকে অযথা মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেননি। বরং একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি তরুণ হিসেবে বিদেশের মাটিতে তাঁর বিস্ময়, সংকোচ, ভুলভ্রান্তি, সীমাবদ্ধতা এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস অর্জনের গল্প অকপটে তুলে ধরেছেন। ফলে বইটি কেবল একজন সফল মানুষের আত্মকথা হয়ে ওঠেনি; বরং বিদেশে নতুন জীবন শুরু করতে যাওয়া অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করেছে। একজন পাঠক খুব সহজেই লেখকের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন এবং তাঁর সংগ্রাম ও সাফল্যের অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।
বইটির ভাষারীতি অত্যন্ত সাবলীল এবং পাঠকবান্ধব। কোথাও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কিংবা বিদ্যাচর্চার ভারে ভাষাকে ক্লান্ত করে তোলা হয়নি। লেখক একজন গবেষক এবং ডক্টরেট ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ভাষা সাধারণ পাঠকের নাগালের মধ্যেই রয়ে গেছে। অধ্যায়বিন্যাসও যথেষ্ট সুসংগঠিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জাপানের সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস এবং মানুষের জীবনযাপনের নানা দিক একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে। ফলে বইটি কখনও নিছক ভ্রমণকাহিনি, কখনও স্মৃতিকথা, আবার কখনও একটি দেশ ও জাতিকে জানার প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়েছে।
তবে বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন এর তথ্যবহুলতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটিই সামান্য সীমাবদ্ধতার কারণ হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে লেখক এত বেশি তথ্য ও অভিজ্ঞতা একত্রে উপস্থাপন করেছেন যে পাঠককে খানিকটা ধীরগতিতে এগোতে হয়। তবে সেই সীমাবদ্ধতাকে অনেকাংশে ছাপিয়ে গেছে তাঁর গল্প বলার ক্ষমতা এবং পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা। তিনি ছোট ছোট ঘটনা, মানুষ এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন মানবিকতা খুঁজে পেয়েছেন যে পাঠক পরবর্তী পাতায় কী আছে তা জানার আগ্রহ হারান না। ব্যক্তিগত স্মৃতি, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং ইতিহাসের সমন্বয়ে তিনি এমন এক বয়ান নির্মাণ করেছেন, যা বইটির শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঠককে সঙ্গে নিয়ে চলতে সক্ষম।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বইটি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে, এটি শুধু জাপানকে জানার বই নয়; এটি মূলত একজন মানুষের আত্মগঠনের গল্প। একজন তরুণ কীভাবে নিজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করে, কীভাবে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে, কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেকে আরও সমৃদ্ধ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে—সেই যাত্রারই এক আন্তরিক দলিল এই বই। তাই “জাপানে যাপিত জীবন” কেবল জাপানপ্রেমীদের জন্য নয়; বরং যেকোনো পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিক, যিনি মানুষ, সমাজ এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প পড়তে ভালোবাসেন।
সবশেষে বলা যায়, “জাপানে যাপিত জীবন” জাপান এবং একজন প্রবাসী বাঙালি ছাত্রের বিদেশজীবনের এক চমৎকার আখ্যান। বইটি তার তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তরিক ভাষা এবং জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার জন্য পাঠকমহলে সমাদৃত হবে বলেই আমার বিশ্বাস। এই বই পড়ে অনেকেই জাপান সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবেন, অনেকে হয়তো দেশটি ভ্রমণের স্বপ্নও দেখতে শুরু করবেন। আর সেটিই হবে একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
লেখক ড. সুশীল কুমার পোদ্দারকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করছি। তাঁর কলম থেকে ভবিষ্যতেও এমন আরও স্মৃতিকথা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক গ্রন্থ আমরা পাব—এই প্রত্যাশা রইল।