টরন্টোতে আমার অভিবাসনের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা
বায়াজিদ গালিব
২০০০ সালের নভেম্বর মাস। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের টরন্টো শহরে পা রাখলাম। দেশ ছেড়ে, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে, একেবারে নতুন এক পরিবেশে এসে দাঁড়ালাম। আশা, স্বপ্ন এবং অজানা ভবিষ্যতের মিশেলে যাত্রা শুরু করে মনে হলো, দিগন্তে লাল ডগমগ সূর্য, এবার আর সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষা না, দুর্গম দুস্তর পথে আমার আর আমার পরিবারের যাত্রা শুরু করতে হবে। এই শহর যেমন আমাকে কঠিন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ। আজ ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেসব চ্যালেঞ্জ আমাকে শুধু শক্তিশালীই করেনি, বরং কানাডাকে আমার নিজের একটা অংশ করে তুলেছে।
নভেম্বর মাসে শীতের তীব্রতা বাড়তে শুরু করে। এ দেশের প্রকৃতি যেন নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। আমার অভিবাসন যাত্রার প্রথম চ্যালেঞ্জ, এ দেশের হাড়-কাঁপানো শীতকে মোকাবেলা করা। সৌভাগ্যবশত, আমি আমার বড়ো বোনের বাসায় ওঠতে পেরেছিলাম। তখনও নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করিনি। তবুও, সবকিছু নতুন ছিল। নতুন দেশ, নতুন জীবন, আর একেবারে ভিন্ন আবহাওয়া। কানাডায় প্রথম শীতের মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য ছিল অবাক করা এক নতুন অভিজ্ঞতা। মনে আছে, বিমানবন্দর থেকে বের হতেই আমার শরীর কেঁপে ওঠেছিল সেই হিমেল বাতাসে। ঠান্ডা যেন গায়ে বিঁধে যাচ্ছিল। শীতের এমন তীব্রতা আমার কল্পনাকেও হার মানিয়েছিল। প্লেন থেকে নামার মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, আসল যুদ্ধটা এখন শুরু। ডিসেম্বর মাসে তীব্র তুষারপাতে রাস্তায় বরফ জমে থাকতো, হাঁটার সময় মনে হতো প্রতিটি পা যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র অতিক্রম করছে। হিমে জমে যাওয়া ফুটপাত পেরোনো ছিল বিপজ্জনক, প্রায়শই পা পিছলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। হাত-মুখ খোলা থাকলে ঠান্ডা বাতাসে ত্বক ব্যথা করে ওঠতো। আমার নিজ দেশের উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর তুলনায় এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক অভিজ্ঞতা।
তবে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে শীতকালে কানাডা এসেছিলাম, এই চরম বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য। কারণ আমি জানতাম, কানাডায় বসবাস করতে হলে এই শীতের সঙ্গে সহাবস্থান করতেই হবে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ছিল খুবই কঠিন। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, স্থানীয়রা কীভাবে এই আবহাওয়ায় চলাফেরা করছে, তাদের পোশাক, আচরণ এবং প্রস্তুতি। এরপর থেকেই শিখতে শুরু করলাম কীভাবে শীতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। আমি এক ভালো মানের উইন্টার জ্যাকেট কিনে নিই, যেটি ঠান্ডা বাতাস থেকে পুরো শরীরকে রক্ষা করে। পাশাপাশি স্নো বুটস, যা পা উষ্ণ রাখে এবং বরফে পিচ্ছিল না হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। থার্মাল বা ইনারও পরে নিতে শুরু করি, যা শরীরের উষ্ণতা ধরে রাখে। প্রতিদিন সকালে আবহাওয়ার আপডেট দেখে বের হতাম, তাপমাত্রা, তুষারপাতের সতর্কতা, রোড কন্ডিশন সবই বিবেচনায় নিতাম। খুব শিগগিরই বুঝে যাই, এখানে শীতের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং তাকে সম্মান করে প্রস্তুত থাকা জরুরি।
শীত মৌসুম ছিল আমার কাছে নতুন এক উপলব্ধি। এই শীত শুধু একটি মৌসুমিজাত বৈশিষ্ট্য নয়- এটি একটি জীবনধারা। শীতকাল এখানে কষ্টদায়ক হতে পারে, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে তা সহনীয়, এমনকি উপভোগ্যও হয়ে ওঠে। আমি নিজেকে এই কঠিন আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মধ্যে এক ধরনের বিজয়ের অনুভূতি পেয়েছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও দৃঢ় করেছে। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি- প্রতিটি নতুন যাত্রার শুরুতেই কিছু অনিশ্চয়তা থাকবে, কিন্তু ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ আর প্রস্তুতি থাকলে তা অতিক্রম করা সম্ভব। টরন্টোর সেই প্রথম শীত আজও মনে আছে- ঠান্ডা শুধু শরীর নয়, মনেও কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই কাঁপনই আজ আমাকে শক্ত করে তুলেছে। শীতকাল এখন আর ভয়ের বিষয় নয়, বরং আমার কানাডিয়ান জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২.
এরপর মাথায় চিন্তা এলো, নিজের থাকার জন্য একটি বাসা। সাশ্রয়ী একটি আবাসনের সংগ্রামে নেমে পড়লাম পথচলার এক কঠিন অধ্যায়ে। সংগ্রাম এজন্যে বলছি, এখানে নতুন অভিবাসিতদের বাসা খুঁজে পাওয়া- একটি চ্যালেঞ্জ। অভিবাসনের প্রাথমিক ধাপগুলো একেকজনের জন্য একেক রকম হতে পারে, তবে প্রায় সবার ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়, বাসস্থান খোঁজার। কানাডার মতো উন্নত দেশে পা রাখার পর, আমরা অনেকেই আশা করি একটি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ঘর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমি টরন্টোতে আসার পর কিছুদিন আমার বোনের বাসায় ছিলাম। তখনও স্থায়িভাবে কোথাও উঠবার প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। তবে কিছুদিন পরই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নিজের জন্য একটি বাসা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনার জন্য। আমি যখন বিভিন্ন জায়গায় বাসা খুঁজতে যাই, তখন বারবার শুনতে হয়েছে এক বাক্য- “আমাদের কাছে ক্রেডিট চেক ছাড়া বাসা ভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়।” আমি তখন কানাডায় নতুন, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার কোনো ক্রেডিট হিস্ট্রি ছিল না। অনেক জায়গা থেকেই, শুধু এই কারণে ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আমার পরিচয়, পেশা কিংবা সদিচ্ছারও যেন কোনো মূল্য ছিল না। তারা চাইতেন নির্দিষ্ট ধরনের রেফারেন্স এবং অর্থনৈতিক প্রমাণ, যা তখন আমার পক্ষে দেখানো সম্ভব ছিল না। অবশেষে, আমার দীর্ঘ চেষ্টার পর আমার সহপাঠী বন্ধু ড. মোজাম্মেল হক খোকনের সহায়তায় আমি একটি বাসা পেতে সক্ষম হই। এটি ছিল কিল ও শেফার্ড অ্যাভিনিউর সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি বিশাল লাল বিল্ডিং, যেখানে আমি দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিই। এই বাসাটি পাওয়া আমার জন্য শুধু একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই নয় বরং এটি ছিল নতুন জীবনের ভিত্তি। এখানে ওঠে আমি খানিকটা স্বস্তি পাই, কারণ অবশেষে একটি ‘নিজের’ জায়গা তৈরি হলো। কিন্তু এই বাসা পাওয়া পর্যন্ত যে সংগ্রাম আমাকে করতে হয়েছে, তা সহজ ছিল না। অভিবাসনের পর এটিই ছিল আমার প্রথম বড়ো সাফল্য।
বাসা মানে শুধু থাকার জায়গা নয়, একটি অর্থনৈতিক দায়। এই নতুন বাসার ভাড়াটা তখন আমার জন্য অনেক বেশি ছিল। তাই খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যাই, শুধু বাসা পেলেই হবে না, এই খরচ চালানোর জন্য নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। এটি ছিল আমার স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রথম ধাপ। যাদের সহায়ক কেউ নেই তাদের জন্য সহায়তা আছে। আমি ভাগ্যবান ছিলাম, কারণ পাশে ছিল আমার পরিবার ও বন্ধু। কিন্তু যাদের এমন কেউ নেই, তাদের জন্য এই বাসস্থান সংকট অনেক বেশি কঠিন হতে পারে। তবে এই পরিস্থিতিতে কানাডা সরকার এবং স্থানীয় সংস্থাগুলো অনেক সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে, COSTI, YMCA Settlement Services-এর মতো স্থানীয় অভিবাসী সহায়তা সংস্থাগুলো নতুনদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের তথ্য ও বিকল্প সরবরাহ করে। সরকারি হাউজিং ভর্তুকি বা Rent-Geared-to-Income (RGI) হাউজিংয়ের আবেদন করতে সহায়তা করে। ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকা অভিবাসীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ প্রদান করে। এছাড়া অনেক সংস্থা নতুনদের টেম্পোরারি হাউজিং, শেয়ার্ড বাসস্থান ও ইমারজেন্সি হাউজিং সম্পর্কেও সহায়তা করে। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি কানাডায় নতুনদের জন্য আবাসন একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ; তবে বন্ধু বা পরিচিত কেউ পাশে থাকলে অনেক সমস্যাই সহজ হয়। স্থানীয় সংস্থাগুলোর সহায়তা গ্রহণে দ্বিধা করা উচিত নয়, তারা খুবই হেল্পফুল। দ্রুত আয় নিশ্চিত করা না গেলে একা বাসস্থান ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে। টরন্টো শহরে নিজের প্রথম বাসা পেতে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা বহু অভিবাসীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এটি শুধু একটি ঘর পাওয়ার গল্প নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সংগ্রামের গল্প।
৩.
অতঃপর শুরু হলো চাকরি জীবনের প্রতিবন্ধকতাবিষয়ক যাত্রা। আমি কানাডায় আসার আগে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, বাংলাদেশে আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা আমাকে এখানে একটি ভালো চাকরি পেতে সাহায্য করবে। কিন্তু বাস্তবে এসে বুঝলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা আর কানাডার চাকরি ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে এক বিশাল পার্থক্য। এখানে চাকরি পেতে গেলে যেটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তা হলো, ‘কানাডিয়ান এক্সপেরিয়েন্স’। আমি বারবার শুনেছি- ‘আমরা দুঃখিত, আপনার অভিজ্ঞতা ভালো হলেও সেটা কানাডিয়ান নয়’। পরিচিত লোক বা নেটওয়ার্কের অভাব এবং বিদেশি অভিজ্ঞতার স্বীকৃতির ঘাটতি এসব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে একধরনের ধাক্কা খেতে হয়েছে। এ কারণে আমি নতুন করে যাত্রা শুরু করলাম চাকরি খোঁজার সংগ্রামের পথে।
আমি তখন স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির সহায়তায় রেজুমি প্রস্তুতির ওয়ার্কশপ, মক ইন্টারভিউ এবং জব সার্চ কৌশল শিখি। এখানে কাজ পাওয়ার আগে কাজ খোঁজার কৌশল জানা দরকার। কয়েক সপ্তাহ পর আমি একটি পার্টটাইম চাকরি পাই। যদিও এটি আমার স্বপ্নের কাজ ছিল না, কিন্তু এটাই ছিল আমার কানাডিয়ান কর্মজীবনের প্রথম ধাপ। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতার পর যখন তা পেলাম, তখন আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেলো। এখান থেকেই আমি আত্মবিশ্বাস অর্জন করি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে, কানাডায় নতুন করে শুরু করতে হলে নম্রতা, ধৈর্য ও শেখার মানসিকতা থাকতে হয়। সেই সাথে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া ডিগ্রিকে আপগ্রেড করা খুবই জরুরি। তাহলে ভালো বেতনে চাকরি পাওয়া যায়।
৪.
পরের ধাপে যা অনুধাবন করলাম তা হচ্ছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। আমরা বাঙালিরা প্রাণবন্ত। আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা, চায়ের কাপ ঘিরে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক আর নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনেই আমাদের জীবন বর্ণময় হয়ে ওঠে। কিন্তু টরন্টোতে পা রাখার পরই আমি এই পরিচিত সামাজিক আবহ থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। প্রথম কয়েক মাস ছিল নিঃসঙ্গতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার কঠিন সময়। কাজ শেষে বাসায় ফিরলে মনে হতো আমি যেন নিঃসঙ্গতার এক গভীর কুয়োয় পড়ে গেছি। চেনা মুখ নেই, পরিচিত গন্ধ নেই, এমনকি খাবারও ভিন্ন। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা আমাকে একেবারে একাকিত্বে ডুবিয়ে দিয়েছিল। নিজের মানুষের খোঁজে এই চাপ কাটাতে আমি খুঁজতে শুরু করি নিজের মতো মানুষদের। ধীরে ধীরে পৌঁছে যাই ড্যানফোর্থ এলাকার বাংলা কমিউনিটিতে। যেখানে ড্যানফোর্থের প্রথম বাঙালি ক্যাসেটের দোকান। আলম ভাইয়ের সেই দোকান সময়ের পরিবর্তনে ঘরোয়া রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত হয়ে বাঙালি আড্ডার এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে গিয়ে দেখা পেলাম আমার মতো আরও অনেকেই আছেন, যাঁরা একই অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে এসেছেন। ধীরে ধীরে পরিচিত মুখ, পরিচিত ভাষা এবং বাঙালিয়ানা ফিরে আসতে শুরু করলো। উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান, ছোটোখাটো মিলনমেলায় অংশগ্রহণ করে আমি যেন আবার এক নতুন পরিবার খুঁজে পেলাম বিদেশের মাটিতে। এই সামাজিক সংযোগ আমাকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখলো এবং আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনলো। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যে কতটা কঠিন, তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। কিন্তু একইসঙ্গে বুঝেছি, মানুষ খুঁজলে মানুষ পাওয়া যায়। তখন ড্যানফোর্থের বাংলা কমিউনিটি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই ছিল। পরবর্তীতে আমি যখন আলবার্টা প্রদেশের ক্যালগেরি শহরে বসবাসের জন্য এলাম, তখন আমি আমার এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছিলাম। বিদেশে নতুন জীবনের মানে শুধু চাকরি বা বাসা নয়- এটি একটি নতুন সমাজে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্পও বটে।
৫.
ভাষা নয়, আত্মবিশ্বাসের লড়াই। কানাডায় আমার ইংরেজি ভাষার অভিযোজন (Adaptation) শুরু হলো। আমরা বাংলাদেশে বড়ো হয়েছি ইংরেজি পড়ে, পরীক্ষায় পাস করে, কখনও কখনও ভালো নম্বরও পেয়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিলাম, কানাডায় এসে এই ভাষা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারে ভিন্ন। কানাডায় পা রাখার পরই বুঝতে পারি শুধু ইংরেজি জানলেই হয় না, বুঝতে জানতে হয় এখানকার প্রেক্ষাপট, উচ্চারণ, পেশাগত ব্যাকরণ আর আত্মপ্রকাশের সঠিক কৌশল। প্রতিদিনের জীবন, কাজের জায়গায় আলোচনায়, এমনকি দোকানে কিছু কিনতে গেলেও বুঝতে পারতাম না, ঠিক কী বলছে, কী জিজ্ঞেস করছে। অনেক সময় এমন হয়েছে, আমি কিছু বলতে চেয়েছি কিন্তু তা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারিনি। তখন মনে হতো আমি যেন নিজের ভাবনাটাই অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি না। এটি ছিল শুধু ভাষার সংকট নয়, আত্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও একটি বড়ো ধাক্কা। আমি বুঝতে পারলাম, এখানে টিকে থাকতে হলে শুধু ভাষা জানলেই চলবে না, সাহস করে ব্যবহার করতেও জানতে হবে। ভুলে গেলাম আমি ইংরেজি জানি। নতুন করে শেখার পথ খুঁজে নিলাম। এই অবস্থায় আমি যোগ দিই LINC (Language Instruction for Newcomers to Canada) প্রোগ্রামে। এটি ছিল অভিবাসীদের জন্য সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত একটি ফ্রি ইংরেজি শিক্ষা কার্যক্রম।
প্রথম দিনেই যে বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করেছিল, তা হলো শিক্ষকদের সহানুভূতি এবং ধৈর্য। তারা জানতেন, আমরা শুধু ভাষা শিখতে আসিনি, আমরা এসেছি একটা নতুন সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে। ধাপে ধাপে আমি শিখি, কানাডিয়ান উচ্চারণ ও ধ্বনি বোঝা, দৈনন্দিন কথোপকথন পরিচালনা, পেশাগত ই-মেইল লেখা ও মিটিংয়ে কথা বলা, সুনির্দিষ্ট শব্দচয়ন ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার। এই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আমি কেবল ভাষায় সাবলীল হলাম না, আবার নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। কানাডায় ভাষা শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপ্রকাশের, সমাজে মিশে যাওয়ার এবং পেশাগতভাবে বিকশিত হওয়ার হাতিয়ার। আজ যখন আমি সাবলীলভাবে কারো সঙ্গে কথা বলি, তখন মনে পড়ে- এই যাত্রার শুরুটা কতটা কঠিন ছিল, আর শেষটা কতটা আশাব্যঞ্জক।
৬.
নতুন দেশে, নতুন শিক্ষা, ক্যারিয়ার গড়ার জন্য আত্ম-উন্নয়নের প্রয়োজন। আমি বাংলাদেশে একটি ভালো শিক্ষাগত পটভূমি নিয়ে কানাডায় এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, আমার ডিগ্রি ও পেশাগত অভিজ্ঞতা হয়তো আমাকে এখানে দ্রুত একটি ভালো চাকরি পেতে সাহায্য করবে। কিন্তু খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কানাডায় যথেষ্ট নয়। এখানে চাকরি বাজারের চাহিদা, পেশাগত কাঠামো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার একেবারে ভিন্ন। তাই শুধু বিদেশি ডিগ্রির ওপর ভরসা না রেখে, নিজেকে কানাডার প্রেক্ষাপটে আপডেট করা অত্যন্ত জরুরি। ভালো চাকরি পেতে হলে দরকার কানাডিয়ান সার্টিফিকেশন বা স্বীকৃত প্রশিক্ষণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, তা হচ্ছে সন্তান লালন-পালন। কালচারাল ডাইভার্সিফিকেশন শিশুর মন বিভ্রান্ত হবেই। তারা স্কুলে একরকম পরিবেশ দেখে। যখন বাসায় ফিরে আসে তখন দেখে অন্যরকম পরিবেশ। যে কারণে সব পিতামাতার প্রথম কাজ, সন্তানদের সময় দিতে হবে এবং তাদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে দুই দেশের কালচারের পার্থক্য বোঝাতে পারলে অনেক ভালো ফল পাওয়া যাবে।
প্রথমবার কানাডায় আসা যে-কোনো নতুন অভিবাসীর জন্য কিছু অভিজ্ঞতা অভিন্ন ভাষার সংকট, শীতের প্রতিকূলতা, চাকরির সংগ্রাম, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার বাস্তবতা এবং সন্তান লালন-পালন। আমার ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম ছিল না। এই লেখায় আমি আমার প্রথম জীবনের সেই শুরুটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এরপরেও নানা ক্ষেত্রে অনেক প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করতে হয়েছে, অল্প কথায় সেই অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করা কঠিন, তবু কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেয়ার করলাম যেগুলো হয়তো অন্য কারো জন্য প্রস্তুতির সহায়ক হতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমেই আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি। আমার বাস্তব জীবনের গল্প যদি কারো পথ সহজ করে, তবে সেটিই আমার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি।
লেখক পরিচিতি
জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। জাপানের নাগোয়া থেকে সিরামিকস প্রযুক্তিতে উচ্চতর শিক্ষা লাভ। বেঙ্গল ফাইন সিরামিক্সে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে ক্যালগেরিতে আবাস। ৪টি রম্য, ১টি গল্প, ২টি উপন্যাস, ১টি কাব্য ও ১টি শিশুতোষ ছড়া গ্রন্থের প্রণেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাতত্ত্ব বিভাগ থেকে সৃজনশীল লেখক পুরস্কার লাভ করেন।

