তুষারে কাঁপি,গরমে ঘামি : কানাডা ও বাংলাদেশে দুই রকম জীবনের গল্প

মো. ইসহাক সিকদার

মানুষের জীবনে কখনও কখনও এমন কিছু ঘটে, যা সে নিজেও আশা করেনি। আমিও ভাবিনি কোনো দিন এমন একটি দেশে বাস করবো, যেখানে শীতকালে বাইরে বের হলে নাকের ডগা জমে যায়, আর বাড়িতে ঢুকলে কোটের নিচে থেকে ঘাম বেরোয়। কানাডা আমাকে এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটি দিয়েছে। আর বাংলাদেশ? সেখানে সমস্যা উল্টো – গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত, ঘামে শার্ট ভেজা, তবুও মনে একটা উষ্ণতা আছে, যেটা কোনো হিটার দিয়ে তৈরি করা যায় না। দুই দেশেই কাটিয়েছি বেশ কিছু দিন। ফলে দুই দেশের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা এখন শুধু বইয়ের পাতায় নয়, হাড়ে-মাংসে গেঁথে গেছে। আজ একটু হাসি, একটু আক্ষেপ, আর প্রচুর বিভ্রান্তি নিয়ে সেই গল্পটাই বলি।

সকাল শুরু: এক দেশে অ্যালার্ম, আরেক দেশে আযান

বাংলাদেশে সকাল শুরু হয় ভোরের আজানে। তারপর বাসার কেউ না কেউ ডাক দেয়, চা তৈরির গন্ধ ভেসে আসে রান্নাঘর থেকে, পাশের বাড়ির মোরগ ডাকে, যদিও সে ডিজিটাল যুগেও ডাকতে ভোলেনি। সকালটা জীবন্ত, শব্দময়, কোলাহলপূর্ণ। কানাডায় সকাল একদম নিঃশব্দ। অ্যালার্ম না বাজলে বোঝার উপায় নেই যে দিন হয়েছে। শীতকালে তো জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হয় পৃথিবী তুলোয় মুড়ে রেখেছে কেউ। প্রতিবেশী আছে, কিন্তু দেখা নেই। সবাই নিজের গাড়িতে, নিজের রাস্তায়। সকালের চা বানাতে গিয়ে প্রথম প্রথম মনে পড়ত – আহা, এখন যদি পাড়ার চায়ের দোকানে বসে কেউ একজন বলত, “ভাই, এক কাপ দেন তো!”

যানজট বনাম তুষার জট:

ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালানো একটি শিল্প। এটি আয়ত্ত করতে হলে সাহস, ধৈর্য এবং হর্ন বাজানোর বিশেষ প্রতিভা দরকার। যানজটে বসে থাকতে থাকতে পাশের রিকশাওয়ালার সাথে রাজনীতি থেকে শুরু করে বিরিয়ানির রেসিপি পর্যন্ত আলোচনা হয়ে যায়। বাংলাদেশে রাস্তা শুধু যাতায়াতের জায়গা নয়, এটা একটা সামাজিক মঞ্চ। কানাডায় তুষারঝড়ের পর রাস্তায় বের হওয়া আরেক রকম অ্যাডভেঞ্চার। গাড়ি বরফের নিচে কোথায় যে ঢাকা পড়ে গেছে, খুঁজে বের করতেই আধা ঘণ্টা। তারপর বরফ সরানো, ইঞ্জিন গরম করা – এর মধ্যে অফিসের সময় পেরিয়ে যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো, কানাডায় যানজট নেই বললেই চলে। হাইওয়েতে গাড়ি চলে শনশন করে, সবাই লেন মেনে চলে, কেউ হর্ন বাজায় না। প্রথম দিকে এই নীরবতা ভারী অদ্ভুত লাগত।

খাওয়াদাওয়া:  ভাতমাছ বনাম পাস্তাপিৎজা:

বাংলাদেশি মানুষের কাছে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো – “ভাত খাইছো?” ভাত না খেলে যেন খাওয়াই হয় না। তরকারি লাগবে, মাছ লাগবে, ডাল লাগবে, সাথে একটু ভর্তা হলে তো কথাই নেই। খাওয়ার টেবিলে পরিবারের সবাই একসাথে বসে, হাসি ঠাট্টায় মুখর দুপুর। কানাডায় এসে প্রথমে বুঝলাম – এখানে লাঞ্চ মানে দশ মিনিট। স্যান্ডউইচ বা সালাদ হাতে নিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসেই খাওয়া শেষ। রাতে হয়তো পাস্তা বা পিৎজা। ভাতের জন্য মন কাঁদত। তখন বাড়িতে নিজেই রান্না করতাম – ইলিশের গন্ধ পাঠিয়ে দিতাম সারা অ্যাপার্টমেন্টে। প্রতিবেশী একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “What is that amazing smell?” বলেছিলাম, “It’s called happiness!”

প্রতিবেশী সংস্কৃতি : দরজা খোলা বনাম দরজা বন্ধ:

বাংলাদেশে প্রতিবেশী মানে পরিবারের বাড়তি অংশ। বিপদে-আপদে, খুশিতে-দুঃখে – পাশের বাড়ির মানুষ সবসময় আছে। বিয়ের নিমন্ত্রণ, বাচ্চার জন্মদিন, এমনকি ঝগড়াতেও প্রতিবেশীরা অংশগ্রহণ করেন – চাই বা না চাই! তবে এই উপস্থিতিটাই জীবনকে জমজমাট রাখে। কানাডায় দুই বছর একই বিল্ডিঙে থেকে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটির নাম জানতাম না। লিফটে দেখা হলে ‘হাই’ বলতাম, সেও ‘হাই’ বলত – ব্যস, সম্পর্ক শেষ। গোপনীয়তার সংস্কৃতি এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী। কেউ কারো বিষয়ে নাক গলায় না। ভালো দিক হলো, শান্তিতে থাকা যায়। খারাপ দিক হলো, মাঝে মাঝে একাকীত্ব চাপা দেয় বুকের উপর।

সময়জ্ঞান:

‘আসতেছি’ বনাম ‘I’ll be there at 3:00 PM sharp’। বাংলাদেশে সময়ের একটি ইলাস্টিক ধারণা আছে। “একটু পরে আসব” মানে আধা ঘণ্টাও হতে পারে, দুই ঘণ্টাও হতে পারে। কেউ যদি বলে “বিকেলে আসব”, বুঝতে হবে সন্ধ্যার আগে যেকোনো সময়। আর কোনো অনুষ্ঠান যদি চারটায় ডাকা হয়, তাহলে প্রথম অতিথি আসবেন সাড়ে পাঁচটায়। কানাডায় এই অভ্যেস নিয়ে গিয়ে একবার বিপদে পড়েছিলাম। বসের সাথে মিটিং ছিল তিনটায়। ভেবেছিলাম সোয়া তিনটায় গেলেই হবে। বসের মুখের ভাবটা দেখে বুঝলাম – না, হয়নি। সেদিন থেকে কানাডিয়ান সময়জ্ঞান আয়ত্ত করেছি। এখন মিটিংয়ে পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছাই, কিন্তু বাংলাদেশে গেলে সেই পুরনো “আসতেছি” মোডে ফিরে যাই অনায়াসে।

উৎসব আনন্দ : রঙিন বাংলাদেশ, শান্ত কানাডা

বাংলাদেশে উৎসব মানে পুরো পাড়া একসাথে। ঈদে নতুন পোশাক, সেমাই, কোলাকুলি – রাস্তায় রাস্তায় আনন্দের ঢল। পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশ, বাউল গান। এই রঙ, এই শব্দ, এই মানুষের ভিড় – এটাই বাংলাদেশের প্রাণ। কানাডায় ক্রিসমাস বা থ্যাংকস গিভিং উৎসব হয় ঘরের ভেতরে, পরিবারের সাথে। বাইরে বরফ পড়ছে, ভেতরে ফায়ারপ্লেসের উষ্ণতা, পরিপাটি সাজানো ডাইনিং টেবিল – সবকিছু সুন্দর, কিন্তু নিখুঁতভাবে নিঃশব্দ। টরন্টোতে বাংলাদেশি কমিউনিটির ঈদ পার্টিতে গেলে বুকটা ভরে যায় – সেখানে খানিকটা হলেও  দেশ খুঁজে পাই।

উপসংহার: দুই দেশ, দুই ভালোবাসা

দুই দেশে বাস করে যা বুঝলাম – কোনো দেশই নিখুঁত নয়, আবার কোনো দেশই খারাপ নয়। কানাডা দিয়েছে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সুযোগ। বাংলাদেশ দিয়েছে উষ্ণতা, সম্পর্ক, শিকড়ের টান। একটিতে তুষারে কাঁপি, আরেকটিতে গরমে ঘামি – কিন্তু দুই জায়গাতেই বেঁচে থাকার আনন্দটাই আলাদা। মাঝে মাঝে ভাবি – আমি আসলে কোথাকার মানুষ? তারপর মনে হয়, দুই দেশেরই। কানাডায় থাকলে বাংলাদেশের গল্প করি, বাংলাদেশে গেলে কানাডার ভালোটুকু মনে পড়ে। এই টানাটানিই হয়তো আমার পরিচয় – এক মানুষ, দুই দেশ, অফুরন্ত বিভ্রান্তি, আর দুটি হৃদয়।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে অন্টারিওর হ্যামিল্টনে বাস করছেন।