নিজ ভুবনে ফিরে আসা

লতিফুল কবির

কানাডায় স্থায়ী নিবাস গড়ার স্বপ্ন দেখে না, এমন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বিশ্বে যত দেশ, যত জাতি- সর্বত্র কানাডার মনের গভীর থেকে “আয়! আয় রে আয়!” ডাক পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব কিছু না। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে যে যেভাবে পারছে, ছুটে আসছে। আমাদের বেলায় ডাকটি এসেছিল ২০০১ সালে।

ততদিনে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। বিদেশ থেকে কেনা যন্ত্র বা সিস্টেমের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে পশ্চিমা দেশগুলোতে যাতায়াতও শুরু হয়ে গেছে- শুরুটা ১৯৯৭ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সল্টলেক সিটি দিয়ে। তারপর একে একে প্যারিস, লিওন, শেফিল্ড, টোকিও, নাগোয়া। যাত্রার পথে ক্ষণিক বিরতি ব্যাংকক আর দুবাইয়ে। আর যেটি বার-বার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছে- ডিসিপ্লিনের মানে কী।

দেশে ডিসিপ্লিনের জন্য হাহাকার, ব্যতিক্রম কেবল সেনানিবাস বা বিদেশি অফিসগুলো। অন্যদিকে, ঢাকা বিমানবন্দরে বিদেশি এয়ারলাইন্সের চেক-ইন কাউন্টারগুলো যেন নিঃশব্দে বলছিল- “নিয়মই সংস্কৃতি।” আর আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ম ভঙ্গই যেন নিয়ম। বলতে দ্বিধা নেই, আমিও সেই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে ওঠছিলাম।

২.

২০০০ সাল। তার আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনেকগুলো বোর্ডিং ব্রিজ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে, তাতে করে যাত্রীদের জন্য প্লেনে ওঠা-নামাটা সহজ হয়ে গেছে। সে-বছর শুরু হলো দোতলার সংস্কার প্রকল্প। একসাথে বহু দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল এতে। সিটা (SITA) নামের একটি কোম্পানি অনলাইন চেক-ইন সিস্টেম আধুনিক করবে। আমাদের তরফে ১৬টি পুরানো কাউন্টারের বদলে বসানো হবে ৩২টি আধুনিক কাউন্টার, থাকবে ওজন মাপার জন্য উইং স্কেলসহ কনভেয়র বেল্ট, যেটি বোতামের এক চাপে ব্যাগেজ নিচে সর্টিং বেল্টে পাঠিয়ে দেবে।

ইমিগ্রেশনও আধুনিক হবে। তখনকার ওসি, ইমিগ্রেশন ছিলেন আমাদেরই বয়সি, তরুণ ও আগ্রহী। তাঁর মাধ্যমে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারকে আমাদের বদলে যাওয়ার কথা পৌঁছে দিলে তাঁর কাছ থেকে খবর এলো: আমাদেরও বদল আসছে। কিছুদিন পর আমার এক আত্মীয় এসে জানালেন, তিনি ইমিগ্রেশনের জন্য ডাটাবেইজ এবং সফটওয়্যার বানানোর অর্ডার পেয়েছেন- ভারত থেকে পাওয়া কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি আর ঢাকায় ওরাকলের প্রযুক্তি দিয়ে ছোটো-খাটো কিছু মাস্টার-ক্লায়েন্টবেইজ নেটওয়ার্ক করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

বিমানবন্দরের চেহারা পাল্টে যেতে শুরু করলো। ফ্রান্সের একটি কোম্পানি চেক-ইন এবং ইমিগ্রেশন কাউন্টার বসানোর দায়িত্বে, ব্রিটিশরা কনভেয়র বেল্টের। যথাসময়ে পাঁচজন ব্রিটিশ, একজন ফরাসি প্রকৌশলী হাজির। সিটা-র পক্ষ থেকেও হাজির করা হলো ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক বসানোর যন্ত্রপাতি।

এর মধ্যে গুজব- বিমানবন্দর অচল হয়ে যাবে। সিভিল অ্যাভিয়েশন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এসে পড়লেন। বড়ো বড়ো কর্তাব্যক্তিদের অতিক্রম করে নজর গেল কিনা আমার পরে, টানা কয়েক ঘণ্টা জবাবদিহি করতে হলো। মাইক্রোসফট প্রজেক্টে গ্যান্ট চার্ট তৈরি করে উপস্থাপন করলাম। প্রতিটি ফেইজ, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সময়রেখা স্পষ্টভাবে দেখালাম। থাই এয়ারওয়েজের জাবের করিম জানালেন, উৎকণ্ঠার কিছু নেই।

অবশেষে, সকলের আস্থা ধরে রেখে কাজ শেষ হলো নির্ধারিত সময়ের দুই সপ্তাহ আগে। সরকার এই সময়ে দুইবার বদলেছে- আওয়ামী লীগ, তত্ত্বাবধায়ক, তারপর বিএনপি-জামাত। ট্রানজিশন ছিল ঘটনাবহুল। এই গদ্যের জন্য তা অপ্রাসঙ্গিক বিধায় এড়িয়ে যাচ্ছি।

কাজ চলাকালীন সময় ব্রিটিশ-ফরাসি প্রকৌশলী, সিটার ভারতীয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বিমানের লোকজন- সকলের মিলিত আড্ডা জমতো আমার রুমে। একদিন লন্ডন থেকে আসা এক প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিসফিস করে বললেন: “তুমি এখানে কী করছো? বিদেশ যাও।”

সিভিল অ্যাভিয়েশনে সেই সময় কারো ডেস্কে কম্পিউটার ছিল না। আমি আমার বাসার পিসি এনে বসিয়েছিলাম ডেস্কে। প্রিন্টার তো বটেই, পিসিতে ইন্টারনেটও যুক্ত করেছিলাম। ডায়াল-আপ নেটওয়ার্ক। অফিসের অনেক কাজ তখন কম্পিউটারে করতাম। এসব হয়তো ওই ব্রিটিশের নজরে এসেছিল। আর প্রকল্পের সমন্বয় করার যে দক্ষতা, হয়তো-বা সেটাও।

তখনো বিদেশ যাওয়ার কথা মাথায় আসেনি। দেশের মাটি, বৃষ্টির নেশা, গেঞ্জি ভিজিয়ে দেওয়া গরম, লেপের নিচের শীত, বাবা-মায়ের সান্নিধ্য- এসব ছাড়ার কথা ভাবিনি। তবু, অ্যাপ্লাই করে ফেললাম। গন্তব্য: কানাডা।

প্রসেসের সুবিধার কথা ভেবে লন্ডন অফিসে দরখাস্ত পাঠালাম। কয়েক মাস পর মেডিক্যাল চিঠি, তারপর ভিসা। দুই মেয়েসহ আমাদের চারজনের ছোটো পরিবার। কন্যাদ্বয় মহাখুশি, বড়োটা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছিল, ছোটোটা ইস্কুলে না গেলেও বড়োটাকে অনুসরণ করে আধো-আধো ইংরেজি বলতে শুরু করেছে। ইংরেজি ভাষার দুয়ার তাদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে, এই আনন্দে তারা চরকির মতো ঘুরতে লাগলো। যথাসময়ে বাবা-মা চলে এলেন। তাদের মন ভারি হয়ে আছে। আম্মার এক কথা: কী দরকার বিদেশে যাওয়ার? দেশে এত সুন্দর চাকরি ছেড়ে কেউ বিদেশে যায়?

আমি আম্মাকে অথবা নিজেকেই বুঝ দিই, “আরে, বেশিদিন থাকবো না তো। মেয়ে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই চলে আসবো।” বিদায়ের দিন, আমি আমার জীবনে প্রথমবারের মতো আব্বার চোখে পানি দেখলাম। তার আগে আমার ধারণা ছিল, আমার আব্বা কাঁদে না, কাঁদতে জানেই না।

৩.

২০০৪ সালের ১৬ জুলাই, আমরা কানাডার টরন্টো বিমানবন্দরে নামলাম। শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। বাঙালি অধ্যুষিত ড্যানফোর্থ এলাকায় ৭ ক্রিসেন্ট প্লেসে এক বন্ধুর বাসায় ওঠলাম। ম্যাপ দেখে ট্যাক্সিচালক ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিলো। পরের তিনদিনে সার্ভিস কানাডা, ব্যাংক, ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় পাশ- সব শেষ। বন্ধুর চোখে বিস্ময়।

তবু, হতাশার কথা শুনতে হলো। আমার এক আত্মীয় বললেন, “ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চেষ্টা করে লাভ নাই।”

টরন্টোতে বসবাস করে আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ-ই সেই সময় ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ করতো না। তাদের এক কথা- ওসবের পিছনে ছোটাছুটি সময়ের অপচয়। আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র বড়ো ভাই, তিনি তখন পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। এক সন্ধ্যায় আলাপে-আলাপে পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যে কত কঠিন, সেই গল্প শোনালেন। আমি তাদের কথা এক কানে শুনি, আরেক কান দিয়ে বের করে দিই। আর সমানেই ইঞ্জিনিয়ারিং জবে দরখাস্ত করতে থাকি। কিন্তু, কোথাও থেকে ইন্টারভিউ কল আসে না। এক বন্ধু তো আমার রিজুমি দেখে রেগেই গেল: গাধা নাকি তুই! এসব বাদ দে, টেকনিশয়ানের জব দেখ।

তো রাতারাতি ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হয়ে গেলাম ১২ গ্রেড পাস করা টেকনিশিয়ান। হুইটবিতে জেনারেল মোটরসের একটা অ্যাসেম্বলি প্লান্টে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ পেয়ে গেলাম। পরে ASQ থেকে কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার সার্টিফিকেট। সেখান থেকে দূরের শহর বোল্টানে ভালো বেতনে কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি।

উত্তর আমেরিকায় কোম্পানি অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে কর্মী ছাঁটাই অবশ্যম্ভাবী। আমিও বাদ পড়লাম। বলা বাহুল্য, জাপানি কিংবা স্ক্যান্ডানেভিয়ান দেশগুলো চলে ভিন্ন পথে। অর্থনৈতিক সংকটের সময় তারা সকলের বেতন হ্রাস করে, আর কর্মীদের নতুন-নতুন টেকনোলজিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। তারপর যখন অর্থনীতি জীবন ফিরে পায়, তখন তারা নবউদ্যোমে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বহুবছর পরে, বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানের আমি প্রধান নির্বাহী, সেখানে এই পথটি আমি অনুসরণ করেছিলাম কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের সময়। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

তো যা বলছিলাম, অর্থনৈতিক মন্দায় বোল্টনের সেই কোম্পানি থেকে ছাঁটাই করা হলো।

৪.

কানাডায় আন এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিট বলে একটা নিয়ম চালু আছে। এটা সরকারি ইন্সুরেন্স, যার আওতায় বেতনের প্রতিটা চেক থেকে কিছু টাকা কেটে রাখা হয় এবং চাকরি চলে গেলে বেকারত্ব ভাতা হিসেবে মাসে একটা ভাতা প্রদান করা হয়। শর্ত একটাই: নিজ থেকে চাকরি ছাড়া যাবে না। তো, শর্ত মেনে চাকরি আমি ছাড়িনি, চাকরিই আমাকে ছেড়ে দিলো। আমিও বেকার ভাতা খেতে শুরু করলাম। বেকারভাতা যদিও চাকরিচ্যুত মানুষের আইনগত অধিকার, তবু সরকার তাতে নাক না গলিয়ে থাকতে পারে না। চাকরিতে ফিরে যাওয়ার জন্য কী কী করছি, দুই সপ্তাহ অন্তর রিপোর্ট করে সরকারকে জানাতে হতো। মাঝেমধ্যে তাদের তরফে নতুন স্কিল কিংবা ভিন্ন স্বাদের চাকরিতে আগ্রহী কি না, তা নিয়ে পরামর্শ দেয়।

তেমন এক পরামর্শের খপ্পরে পড়ে ক্ষুদ্র-ব্যবসা সংক্রান্ত সরকারি অনুদান নির্ভর একটা উদ্যোগের সাথে যুক্ত হলাম। ওয়েবসাইট ডিজাইন ছিল আমার শখের বিষয়, সেটাই হয়ে গেল বিজনেস মডেল। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে দলবেঁধে নেমে পড়লাম। ওই উদ্যোগের সাথে যুক্ত কয়েকজনকে পেয়ে গেলাম ওয়েবসাইট ডিজাইনের ক্লায়েন্ট। আর যায় কোথায়? গুগুলের সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনও শিখে ফেললাম, সেটার প্রয়োগ ঘটিয়ে কয়েক মাসে নিজেরটার পাশাপাশি অন্যদের ওয়েবসাইটেও অর্গানিক সার্চে প্রথম পাতায় আসা শুরু করলে ব্যবসার প্রসারও হতে শুরু করলো। প্রতিদিন কল আসতে লাগলো। দেখতে দেখতে ছয় মাসে ক্লায়েন্টের সংখ্যা পঁচিশ অতিক্রম করে গেল। ক্লায়েন্ট বাড়তে লাগলো। তবু শান্তি নেই- ইঞ্জিনিয়ারিং কি চিরতরে ছেড়ে দেবো?

বন্ধুরা খবর দিলো, অনেকে মাস্টার্স করছে, তাতে ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরিও মিলছে। আমি টরন্টোর রায়ারসন ইউনিভার্সিটিতে যোগাযোগ করলাম। ভর্তির আবেদন বাতিল হয়ে গেলে দেখা করলাম আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রামের পরিচালক ড. সাঈদ জুলফাগারির সাথে। আমার আত্মবিশ্বাসে আস্থা রেখে তিনি আন্ডারগ্রাজুয়েটের তিনটা কোর্সে ভর্তি করিয়ে নিলেন। শর্ত একটাই: তিনটির মধ্যে অন্তত দুটিতে ‘এ-’ পেতে হবে। ২০০৯ সালে শুরু হলো নতুন পথচলা। প্রথম সেমিস্টারে দুটো কোর্স, দুটোতেই পেয়ে গেলাম ‘এ+’। ভাবলাম, তৃতীয় কোর্স করতে হবে না। তা কি হয়? তো শেষ কোর্সটাতে ‘এ’ পেয়ে শেষ করার পরে মাস্টার্সে ভর্তি করিয়ে নিলো। আমার মাস্টার্স শুরু হয়েছিল মাস্টার্স অব ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে, যার আওতায় মোট দশটি কোর্স শেষ করলেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া যেতো। বাধ সাধলো প্রথম সেমিস্টারে শেষ করা তিনটি কোর্স, যার প্রতিটিতে হয় ‘এ’, না হয় ‘এ-’; তো অধ্যাপক জুলফাগারি থিসিস নিয়ে মাস্টার্স অব সায়েন্স করার পরামর্শ দিলেন। সেক্ষেত্রে পাঁচটা কোর্স আর একটা থিসিস।

থিসিস না করলে কানাডার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে একটা অপরিণত ধারণা নিয়েই বাকি জীবন পার করতে হতো, তাতে সন্দেহ নাই। কোনো সমস্যাকে যে কতটা গভীর থেকে এবং কতটা মৌলিকভাবে দেখা যায়, তার প্রাথমিক জ্ঞান মাস্টার্সের থিসিস। আমার থিসিস এক ধ্রুপদি অপটিমাইজেশন সমস্যাকে কেন্দ্র করে। গাণিতিক মডেল এত নিখুঁত ছিল যে অধ্যাপক জানালেন, চাইলে একে পিএইচ.ডি পর্যায়ে নেওয়া যায়।

চেষ্টা করলাম। টরন্টোর এক কোম্পানি ফান্ডিং দিলেও সরকার থেকে রিসার্চ বাবদ অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় সাপোর্ট দিলো না। পিএইচ.ডি থেমে গেল। ২০১১ সালে আবার ফিরে এলাম জব মার্কেটে।

টরন্টোয় ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরি পাওয়া দুরূহ। সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যালগারিতে যাবো। ফেব্রুয়ারিতে পাড়ি দিলাম, পরিবার রেখে গেলাম টরন্টোয়।

ক্যালগারিতে পা দিয়েই কোয়ালিটি কো-অর্ডিনেটর পদে ইন্টারভিউ- প্রথম সপ্তাহে দুটো অফার। শহরকেন্দ্রের চাকরিটা নিলাম। এরপর নিরন্তর প্রচেষ্টা। এখানে বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের একটা নেটওয়ার্ক অনেকদিন থেকেই সক্রিয়। রুয়েটের এক বড়ো ভাই আমার রিজুমি পুনর্লিখন করলেন, আর নিলেন মক ইন্টারভিউ। বুঝলাম- কানাডা স্কিল নির্ভর দেশ, এখানে জবের জন্য চাই নির্দিষ্ট দক্ষতার ঘোষণা এবং ইন্টারভিউয়ে তা আস্থার সাথে বুঝিয়ে দেওয়া।

চাকরি খোঁজার পাশাপাশি পিএমপি (PMP– Project Management Professional) সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য কোমর বেঁধে নামলাম। কয়েক মাসের প্রস্তুতিতে পরীক্ষা দিয়ে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে থাকলাম। পাস! জীবনে অনেক পরীক্ষা দিয়েছি; কিন্তু, পিএমপি’র পরীক্ষা আর সবার চেয়ে আলাদা। টরন্টোতে থাকার সময় চ.ঊহম লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিলাম, সেটাও পেয়ে গেলাম। সেই পথটাও সহজ ছিল না আসলে। তো সেটা পাওয়ার পর অনেক বড়ো করে শ্বাস নিয়েছিলাম, সেটা কোনোদিন ভুলব না। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক ইঞ্জিনিয়ারিং-প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রকাশন (ইপিসি) কোম্পানি থেকে পেলাম প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরির অফার। তেল ও গ্যাস সেক্টরের বড়ো কোম্পানি। আমার কাজ খনি কর্মীদের আবাসন নির্মাণের সাথে যুক্ত মেকানিক্যাল সিস্টেমের ডিজাইন সমন্বয় করা, তা সত্ত্বেও খুব একটা আনন্দ পাচ্ছিলাম না। কয়েক মাস পরে একটা কনসালটিং ফার্ম থেকে ডাক এলো- তারা বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের HVAC এবং Plumbing সিস্টেম ডিজাইনের জন্য ইঞ্জিনিয়ার খুঁজছে। দেশে বিমানবন্দরে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবার কাজে লাগাতে পারবো, সেই চিন্তা থেকে তাদের অফার লুফে নিলাম। সেটা ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস। আট বছর পরে সেখানে প্রধান নির্বাহী হিসেবে জেঁকে বসেছি।

৫.

আজ পিছনে তাকালে মনে হয়- কানাডায় আসার সিদ্ধান্ত শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না, ছিল জীবনের দর্শন পাল্টে যাওয়ার এক যাত্রা। যাত্রাটা সহজ ছিল না, তবু পরিণত ছিল। বাংলাদেশ থেকে কানাডায় হিজরত করার আট বছর পরে ফিরে আসতে পেরেছিলাম নিজ ভুবনে। এ ভুবনের নাম প্রকৌশল জগৎ, দেশটা যদিও কানাডা, কিন্তু আমার শিকড় আজও মিশে আছে বাঙালি পরিচয়ের গভীরে।

কখনো কখনো চারপাশের সব শব্দ নিঃশেষ হয়ে গেলে মানুষ নিজের ভিতরকার কথাগুলো শুনতে পায়। কানাডার তুষারপাতে ঢাকা এক সন্ধ্যায়, যখন জানালার বাইরে কেবল নীরব শাদা, আর ভিতরে ঘড়ির টিকটিক শব্দ, তখন আমি বুঝি- এই নির্জনতা শুধু প্রাকৃতিক না, এটি এক ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রবাস। বাইরে দেশ পাল্টেছে, ঠিক; কিন্তু ভিতরেও যেন এক ধরনের দেশান্তর ঘটে গেছে। আত্মীয় নেই, প্রিয় মুখ নেই, সাপ্তাহিক বিকেলের চা-আড্ডা নেই, এমনকি কথার সেই চিরচেনা স্বাদটাও নেই- যা মাতৃভাষায় একটুও ব্যাখ্যা না করেও বোঝা যেতো। কখনো-কখনো মেয়েদের হাসির শব্দ কানে বাজে, অথচ তারা তো এখন নিজ বাড়িতে, কিংবা অন্য কোনো শহরে। স্ত্রীর মুখে অভিমান টের পাই, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারি না- না তার, না নিজের। শুধু অনুভব করি, সময় যেন আমাদের একে অপরের মুখ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, অথচ স্পষ্ট করে বলা হয়নি কিছুই। এমনই এক দুপুরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলেছিলাম: “তুই ভালো আছিস?” উত্তর আসেনি। শুধু নৈঃশব্দের ভিতর নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটা বেড়ে ওঠেছিল- সেই নিঃশব্দে, আমি প্রথমবার নিজের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। অভিমান, ক্লান্তি, অথচ একটুও নাটকীয়তা ছাড়া। নিঃশব্দ, কিন্তু মিথ্যা নয়।

আমার একাকিত্ব যেমন সত্য, তেমনি এই জার্নির পাশে থাকা মানুষেরাও বাস্তব। প্রতিটি অভিমান, প্রতিটি নীরবতা- আসলে আমাদের সম্মিলিত সহনশীলতার পরীক্ষা ছিল। স্ত্রী কখনো কিছু বলেনি, কিন্তু তার চাহনিতে এক ধরনের প্রশ্ন থাকতো- “এই পথের শেষ কোথায়?” মেয়েরা বুঝে নিয়েছিল, বাবা আর আগের মতো সকালবেলা পেপার হাতে নিয়ে বসে থাকে না, কিন্তু তারা কোনো অভিযোগ করেনি। হয়তো তারাও বড়ো হচ্ছিল এই যাত্রার সাথেই।

আমি ভেবেছি, একা লড়ছি- ছোট্ট ঘরে, শূন্য ফ্রিজের সামনে, কিংবা জব ইন্টারভিউর উত্তেজনায়; কিন্তু পরে বুঝেছি, আমার সাথে সাথে ওরাও সাহস করেছিল, ওরাও ছাড় দিয়েছিল, চুপচাপ শক্তি জুগিয়েছে। এই ভ্রমণ কাগজে শুধু আমার নাম লেখা, কিন্তু তার ছায়া পড়ে আছে অনেক নামহীন ভালোবাসায়।

আমার ব্যাগ গোছানোর দিনগুলোতে মা চুপচাপ বেশি সময় কাটাতেন। মুখে বলতেন, “যাও, ভালো থেকো,” কিন্তু চোখে জমে থাকা জলের রেখা দেখে বুঝতাম, এই যাত্রা শুধু আমার একার নয়। বাবার দৃষ্টিও বদলে গিয়েছিল- তিনি চশমার কাচ মুছতেন একটু বেশিই, যেন চোখে কিছু না পড়ে। যেদিন উড়াল দিলাম, বিদায়লগ্নে বাবার চোখে যে অচেনা জলের কতা দেখলাম, তা আজও মনে পড়ে। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি কাঁদেন না। অথচ আমার প্রবাস যাত্রায় তাঁর চোখ ভিজে ওঠেছিল।

আমার চলে যাওয়া মানে শুধু বাড়ির একটা ঘর ফাঁকা হয়ে যাওয়া নয়, মা-বাবার সময়ের ছন্দে একটা অনতিক্রম্য ফাঁকও তৈরি হয়েছিল, যা তাঁরা আজীবন চেপে গেছেন। ফোনে যখন বলতাম, ‘ভালো আছি’- তাঁরা বিশ্বাস করতেন, কিন্তু শব্দের ফাঁকে যে নিঃসঙ্গতা লুকানো ছিল, তা হয়তো তাঁরাও বুঝতেন। আমার প্রতিটি নতুন পথের শুরুর পাশে ওদেরও ছিল একটা নীরব বিসর্জন।

লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৬৬ সালে, বাংলাদেশের নওগাঁয়। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে রুয়েট) থেকে স্নাতক। প্রবাসে পা রেখে ২০১১ সালে রায়ারসন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ক্যালগারিতে প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত উপন্যাস: ‘মেহেরুন’ (২০২৪), ‘একুশ নম্বর সাক্ষী’ (২০২০), ‘টনির আমেরিকা প্রত্যাবর্তন’ (২০১৭), গল্পগ্রন্থ: ‘শিমুল তলা ও অন্যান্য গল্প’ (২০১৭), প্রবন্ধগ্রন্থ: ‘হাজার বছরের বাংলাদেশ: ইতিহাসের পাঠ বৈচিত্র্য’ (২০২২), ‘রোগমুক্ত দীর্ঘজীবনের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা’ (২০২১)।