নোঙ্গর

সুশীল কুমার পোদ্দার

আমরা কি সত্যি নিয়তির হাতে বন্দি? সব কিছুই কি পূর্ব নির্ধারিত! জীবনের অনেক সংকটে বার বার ভেবেছি এসব কথা। যুক্তি তর্কের ঊর্ধ্বে ওঠে মাঝে মাঝে ভাবি- এই যে আমি, আপন মাটি থেকে আমাকে উপড়ে নিয়ে এই পরভূমে ঘর বেঁধেছি, তার পিছনে কি ছিল আমার কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা? সত্যি, আমার তো তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না, যেমন ছিল না উচ্চ শিক্ষার্থে জাপানে পড়তে যাওয়ার!

ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো। নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছিলাম। সময় আমায় স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আবার এক বৈরী সময় আমার স্বপ্নগুলোকে ভেঙেচুরে আমায় নিয়ে দাঁড় করালো সরকারি চাকরির জন্য বেঁধে দেওয়া বয়সের শেষ প্রান্তে। জীবন ও জীবিকার দুশ্চিন্তা তখন আমায় পেয়ে বসেছে। একদিন কোন খেয়ালে বিসিএস পরীক্ষায় নাম লিখিয়েছিলাম। সেই পরীক্ষার ফল আমায় অন্ধের যষ্টির মতো হাত ধরে নিয়ে যায় বাংলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল নেত্রকোনায়। ম্যাজিস্ট্রেট হবো কখনো ভেবে দেখিনি। না ভাবলেও আমি তখন ম্যাজিস্ট্রেট, স্কুল কলেজে পরীক্ষায় পাহারা দিই, কেউ অসদুপায় অবলম্বন করলে, আমার ক্ষমতার যথার্থ প্রয়োগ করি, ইলেকশনে ডিউটি করি, কোর্টে ছোটো ছোটো অপরাধীদের শাস্তির রায় দিই। দিন শেষে ফিরে আসি আমার জৌলুশবিহীন সরকারি বাসস্থানে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে পর্দাবিহীন জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখি। শুধু মনে হয়, আমি যেন ভুল বাস ধরে এই গন্তব্যে চলে এসেছি। আমার যে- হাত জোড় করে নতমস্তকে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে শাস্তি দিতে মন চায় না! আমার যে- জনবিচ্ছিন্ন হতে মনটা হাহাকার করে ওঠে! আমার যে রাস্তার ধারে টঙ্গে বসে চা সিঙ্গাড়া খেতে মন চায়!

দিন যায়, রাত যায়, ম্যাজিস্ট্রেটেসি ক্ষমতার অন্তঃসারশূন্যতা চোখে পড়ে, সততা আমার গলা চেপে ধরে। আমি পালাতে চাই। মন আমার মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে চায়, কেউ ভালোবেসে আমায় নিমন্ত্রণ করলে আমার সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে মন চায়। আমি আমার মনের কথা শুনে একদিন এক স্বল্প পরিচিত ব্যাংক কর্মকর্তার দরিদ্রালয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হাজির হই। ভাগ্য আমায় হাত ধরে নিয়ে যায় টেবিলের ওপরে বিছিয়ে রাখা একটা খবরের কাগজের কাছে। মুহূর্তে চোখ যায় মাংসের ঝোলে সিক্ত হলুদাভ এক বিজ্ঞপ্তির দিকে- জাপানে মনবুশো বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি। আমি বিজ্ঞপ্তিটি কেটে পকেটে রাখি। ঘরে ফিরে কে যেন আমায় তাড়া দেয়। আমি আবেদন করে বসি। জাপান আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে আমার ঝুলিতে ভরে দেয় দু-দুটো ভারি ডিগ্রি। পড়ালেখার পাঠ চুকতেই, দুর্ভাবনা এসে আবারো ভিড় করে। এতদিন পড়ালেখা পড়ালেখা করে মস্তিষ্ককে যে জ্ঞান দিয়ে ভারাক্রান্ত করেছিলাম, সময় আসে তার প্রায়োগিক দিক নিয়ে ভাবার। কেউ বলে আমেরিকা চলে যাও, কেউ বলে মালয়েশিয়া, আবার কেউ বলে চলে যাও স্বগরাজ্য কানাডাতে।

২.

একদিন আমার কানাডাতে পা রাখবার সমস্ত কাগজপত্র চলে আসে। আমার বন্ধুরা কেউ কেউ ভীষণ আনন্দিত হয়, আবার কেউ কেউ বলে আমেরিকায় প্রফেশনালদের উপার্জন কানাডার চেয়ে ঢের বেশি। কেউ বলে শুধু টাকার কথা ভাবলেই হলো! কানাডাতে আছে সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আছে আইনের শাসন, সুদৃঢ় নিরাপত্তাব্যবস্থা। রাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন সুদৃঢ় নিরাপত্তাব্যবস্থার আশ্বাস আমায় দারুণভাবে প্রলোভিত করে। সংখ্যালঘু হয়ে জন্ম নিয়ে আজন্ম মাথা নিচু করে বড়ো হয়ে ওঠা আমার জীবনে আবার আসে স্বপ্নের হাতছানি, স্বাধীনতার হাতছানি।

একদিন গভীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে পা রাখি এই বিশাল ভূখণ্ডের বুকে। সেদিন ছিল এক রৌদ্রোজ্জ্বল অপরাহ্ণ, আকাশ ছিল মেঘহীন, দিগন্তে ছিল অসীমের হাতছানি। আমি প্লেনের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম নতুন দেশের নতুন আকাশকে। টরন্টো শহরে আমার এক আপা থাকেন, যিনি ঢাকায় বড়ো বোনের মতো আমায় স্নেহ আঁচলে ঢেকে রেখেছিলেন, আর ছিল ছোটো ভাইয়ের মতো এক করিৎকর্মা যুবক, যে আমার জন্য নিজ পকেট থেকে অগ্রিম ডিপোজিট দিয়ে বাসা ভাড়া করে রেখেছিল, তারা সবাই উপস্থিত আমাদের নতুন দেশে বরণ করে নিতে। বাইরে বের হতেই বাতাসেরা এক হিমশীতল স্পর্শ দিয়ে আমায় অভিবাদন জানায়। আমায় যেন ফিসফিস করে বলে- এই রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ দেখে বিভ্রান্ত হতে নেই, এ-সবই মরীচিকা।

ডানফোর্থে এক সুউচ্চ অট্টালিকার আপার এপার্টমেন্টে আমাদের ক্ষণিক নিবাস। ঘুম ভেঙে যায় এক অজানা অনুভূতিতে। আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ছে শ্বেতশুভ্র তুষার কথা। চরাচর ঢেকে গেছে বরফের এক নরম চাদরে। স্বপ্নাতুর মন আমাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যায় ডেকে। আমি ওর হাত ধরে দাঁড়িয়ে যাই উন্মুক্ত আকাশের নিচে। কী এক অনির্বচনীয় আনন্দে স্নাত হয়ে আমাদের মনের মাঝে সুপ্ত শৈশব, কৈশোর মায়ের বকুনি অগ্রাহ্য করে ছোটাছুটি আর অহেতুক হাস্যরসে মেতে ওঠে।

সে-বছর ছিল তীব্র শৈত্য প্রবাহের বছর। রাস্তা-ঘাট রুদ্ধ করে প্রকৃতি যেন মেতে ওঠেছিল এক রুদ্ধশ্বাস প্রলয় আনন্দে। ঘুম ভেঙে একদিন চোখে পড়ে প্রকৃতির আরেক নিরাভরণ রূপ। বৃক্ষলতা ওদের শরীর ঢেকে রেখেছে স্বচ্ছ কাচের আবরণে। অসংখ্য বাড়ির কার্নিশে ঝুলে আছে খঞ্জর সদৃশ বরফের স্ফটিক। রাস্তাঘাট একাকার করে দিয়ে প্রকৃতি যেন আমাদের নিয়ে গেছে সেই আদিম সময়ে! গুহাবাসী আদিম মানুষেরা যেন শুধু রূপ বদলিয়ে গায়ে তুলে নিয়েছে সভ্যতার বেশ! চোখে পড়ে বৈরী প্রকৃতির মাঝে পিচ্ছিল রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে যন্ত্রশকট, খেটে খাওয়া মানুষের অপ্রতিরোধ্য ছোটাছুটি। এসব দেখে দেখে আমি আকাশ থেকে নেমে আসি বাস্তবতার নিরস মাটিতে।

টরন্টো শহরের ল্যান্সডাউনে পুরানো অট্টালিকার এক কামরায় আমাদের নতুন আস্তানা। অট্টালিকার নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাতাল ট্রেন অহরহ মৃদু কাঁপুনি দিয়ে জানিয়ে দেয় তার অস্তিত্ব। জানালা দিয়ে চোখে পড়ে অসংখ্য মানুষের ছোটাছুটি। শব্দ করে ছুটে যায় সিটি বাস। আস্তে আস্তে এই কোলাহল মুখর বাসস্থানটি আমাদের আত্মীয় হয়ে ওঠে।

৩.

কীভাবে শুরু করব ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় চলে যায়। তখন কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে C++ এর পাশাপাশি জাভার কদর অনেক বেশি। জাপানে মাস্টার্স আর পিএইচ.ডি করতে যেয়ে শিখেছিলেম ইউনিক্স আর C ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি বেশ বুঝতে পারি যে, আমার অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে এখানে আমার চাকরি হবে না। চাকরি বাজারে এই পিএইচ.ডি আমার পথকে প্রতিনিয়ত কণ্টকাকীর্ণ করে চলে। রেজ্যুমি লিখতে যেয়ে আমি হিমশিম খেয়ে যাই। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আর রিসার্চ ইন্সটিটিউট ছাড়া এই পিএইচ.ডি-র মূল্যমান এত কম (অনেক ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা) আমার জানা ছিল না। আমার জানা ছিল না, কানাডার মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে কতোটুকু কাঠখড় পোড়াতে হয়! ভাগ্য আমাকে নিয়ে আবারো নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে।

আমি রাতদিন খেটে নতুন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখি আর সঞ্চয়ের টাকা ভেঙে ভেঙে খাই। আমার প্রতিবেশীরা আমায় কানাডার সোশ্যালে আবেদন করতে বলে। কিন্তু সরকারি পারিতোষিকে জীবন ধারণ কতটা অপমানের, কতটা অসহায়ত্বের প্রকাশ, আমি তাদের আচার-আচরণ দেখে সেটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমি খুব কাছ থেকে দেখতে পাই- কীভাবে দীর্ঘ সময় সরকারি পারিতোষিকে চলতে চলতে ওদের মেরুদণ্ড, নৈতিক সাহস ভেঙে গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে অপরাধ প্রবণতা, সততার বদলে মিথ্যাচার আর ভীরুতা। তাই প্রতিনিয়ত মনে হয় দেখি না আর কয়েকটা দিন। এমনি করে আমি যখন দিশেহারা, তখন স্বদেশি এক বন্ধু আমায় পথ দেখায়। তারই পরামর্শে আমি আবেদন করে বসি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রাংশকে আসেম্বল করার এক বিরাট প্রতিষ্ঠান সেলেস্টিকায়, পজিশন- প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট, শিক্ষাগত যোগ্যতা- হাইস্কুল, বেতন- ১১.৭৫/ ঘণ্টা।

আমার বেকারত্বের অসহায় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে একদিন আমার ডাক আসে। আমার সেদিন আনন্দ আর ধরে না! কাজ তেমন কিছুই না, মূলত অণুবীক্ষণযন্ত্রের চোখে চোখ রেখে নির্মাণাধীন বিশাল বিশাল কার্ডগুলোর সংযোগ পরীক্ষা করে দেখা, রোবটগুলো যখন বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রাংশ যথাযথ স্থাপন করে সোলডার দিয়ে সংযোগ করে, তখন তাদের কর্মযজ্ঞকে পরখ করে দেখা, ভুল করলে মেরামত করা, রিপোর্ট করা ইত্যাদি ইত্যাদি। কর্মক্ষেত্রে দেখা মেলে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, পাইলট, এমনকি মিসাইল বিজ্ঞানীদের। সবাই সেখানে জড়ো হয়েছে জীবনের এক সংকটময় মুহূর্ত কোনোমতে পার করে দিয়ে পরবর্তী ট্রেন ধরতে। প্রতিদিন শুনতে পাই অমুকে তার কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেয়ে সঠিক গন্তব্যের ট্রেনে চেপে বসেছে। ঈর্ষা করতে আমি ঘৃণা করি। তবুও মনের কোনে ঈর্ষা এসে জমা হয়। একটা কাঙ্ক্ষিত জীবনের ডাক শুনতে বড়ো বেশি মন চায়।

কাজ করতে করতে রাতের আঁধার নেমে আসে। একসময় সমস্ত কোলাহল থেমে যায়। মাঝে মাঝে কানে আসে দূরাগত নিশাচর প্রাণীদের কোলাহল। আমি কর্মস্থানের বিশাল কাচের জানালা দিয়ে নিকষ কালো রাতের আঁধারের দিকে তাকিয়ে থাকি। নিশুতি রাতে অণুবীক্ষণের আইপিসে চোখ রেখে কতজন ঘুমে ভেঙে পড়ে, যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তন্দ্রালু হয়ে হাঁটু ভেঙে পড়ে যায় কতজন! এই নিয়ে কত হাসাহাসি হয়। রাত যতো গভীর হয়, যাপিত জীবনের ছোটো ছোটো কষ্টেরা অনেক বড়ো হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, আমায় নিয়ে ব্যাঙ্গ করে, যেন বলতে চায়- এত পড়ালেখা করে কী করলি জীবনে! ম্যানেজার নিদ্রাল- শ্রমিকদের জাগিয়ে রাখার জন্য উচ্চস্বরে বলে যায়- wake up! wake up! আমি ধড়ফড়িয়ে ওঠি। আমার কেন যেন মনে হয় ‘ক্ষুধিত পাষাণে’র সেই পাগলা মেহের আলীর কথা- তফাৎ যাও, সব ঝুট হায়, সব ঝুট হায়। এক মুহূর্তে জগৎ সংসারকে বড়ো অলীক বলে মনে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কোথায়, কে আমায় ফেলে গেছে এমন এক কানাগলিতে?

সূর্যোদয়ে আবারো নতুন আশা জাগে মনে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে বার ঘণ্টার পরিশ্রম আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিনিদ্রার এক কষ্টবোধকে সাথে নিয়ে আমি ফিরে আসি আমার ঘরে। আমার শিশু সন্তান আমায় জাপটে ধরে। কোলে ওঠে খেলা করতে চায়। ওর মা ওকে টেনে নেয় নিজের কাছে। ওর চোখে চোখ রেখে শাসন করে- তোমার বাবাকে যে ঘুমোতে হবে! পেটে কিছু দেওয়া মাত্র আমার চোখ ভেঙে ঘুম নামে। আমি বিছানায় যাই, আর আমার নির্বিঘ্ন ঘুমের ব্যবস্থা করতে মা ও ছেলে ঘরের বাইরে পা রাখে। দ্বিপ্রহর অবধি এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু আমার যে নিরবচ্ছিন্ন ঘুম হয় না। ধমধম করে বিল্ডিং কাঁপিয়ে চলে যায় ট্রেন, ঘড়ির কাঁটাগুলো আমায় জাগিয়ে রাখতে টিক টিক শব্দ করে, জানালার পাশে উন্মুক্ত স্থান পেয়ে কিছু পায়রা বেঁধেছে বাসা। ওরা সারাক্ষণ বক বক করে কী যেন বলাবলি করে। আমি ঘুমাতে চাই। পৃথিবীটা এত শব্দময় জানতাম না। আমি নিদ্রাহীনতার এক গভীর কষ্ট নিয়ে জেগে ওঠি। আমার যে নিস্তার নেই- আমায় যে পড়ালেখা করে এগিয়ে যেতে হবে!

৪.

নিদারুণ এক অনীহা নিয়ে আমার চাকরি জীবনের আঠারো মাসের এক কষ্টকর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ম্যানেজার আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চান। আমি তাকে করজোড়ে বলি- আমায় মুক্তি দাও, আমি ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছি। শুধু আমায় দয়া কর, আমি যেন EI-এর জন্য আবেদন করতে পারি। ম্যানেজার তার কথা রাখেন। আমি এবার নিজ ইচ্ছায় বেকার হয়ে যাই। চাকরি ছাড়ার কারণে অনেকে আমার বৈষয়িক বুদ্ধি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। সে সংশয় মাঝে মাঝে আমাকেও ভাবায়। অস্থির মন আমার বলে ওঠে- চাকরি না ছেড়েও তো অন্য চাকরির চেষ্টা করা যেতো !

আমি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাই। তখন আইটির যুগ। ভিন্ন ফিল্ড থেকে কতজন ঝাঁপিয়ে পড়েছে কম্পিউটার হার্ডওয়ার শিখতে, সফটওয়্যার শিখতে। টরন্টোর বাঙালি পাড়ায় পাঠশালা খুলেছেন বেশ কিছু প্রফেশনাল। আমি ইতোমধ্যে বেশ কিছু কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজে প্রফেসিয়ান্সি অর্জন করেছি, certified হয়েছি java programmar হিসেবে। আমার কাছে পড়তে আসা বেশ কিছু সুহৃদ আমায় অনুপ্রাণিত করে একটা স্কুল খুলতে। জায়গাও জুটে যায়- ড্যানফোর্থের বেঙ্গল ফাইন্যান্সিয়ালের এর ছোট্ট এক কামরায়।

আমার ছাত্রেরা অধিকাংশই বয়োবৃদ্ধ। দেশ বিদেশে বড়ো বড়ো চাকরি করে অধিক নিরাপত্তা আর একটা প্রাচুর্যময় জীবনের স্বপ্নে নোঙর করেছে এই বিরস মাটিতে। মোহ ভাঙতে তাদের সময় লাগেনি। তাই অনেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে সম্ভাব্য একটা চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে কম্পিউটার ফিল্ডে। আমি বেছে বেছে ওদের জন্য তিন মাসের একটি কোর্স ডিজাইন করেছি, যাতে ওরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে যেয়ে অথৈ জলে না পড়ে। শিক্ষাকে আনন্দময় করতে আমায় কতো কিছুই না করতে হয়, কিন্তু অনেকেই ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ে। হোম ওয়ার্কের কথা বলতেই অনেকে কাঁচুমাচু করে কতো কিছুর বাহানা দেয়! মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও টাকার কথা অনেকেই বলে না, আবার কেউ অর্ধ মাসের বেতন দিয়ে বাদবাকি ঝুলিয়ে রাখে। আমি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাই। আমি ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরি।

৫.

ইতোমধ্যে সার্ভিস কানাডা আমাকে চাকরি বাজারে সক্ষমতা বাড়াতে আপগ্রেড করার সুযোগ দিয়েছে। আমি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার আগ্রহ দেখিয়ে তাদের কোর্স ফি-সহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতে বের হয়ে পড়ি। এই প্রথম আমার রেজ্যুমিতে আমার পিএইচ.ডি স্থান পায়। ভাগ্য এবার আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আমায় নিয়ে যায় এক চাইনিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আমাকে দেওয়া হয় এক খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ। আমি তখন ভীষণ ব্যস্ত। আমি সেখানে দিনে পড়াই এবং পড়ি। সন্ধ্যায় আমার স্কুল। এমনি করে চলে যায় আমার ব্যস্ত জীবন। বৈষয়িক তেমন উন্নতি না হলেও আমার এই শিক্ষকতা আমার ভেঙে পড়া মনকে দাঁড়াতে সাহায্য করে। আমি তখন আমার পিএইচ.ডি-কে লুকিয়ে কানাডায় অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে এখানে সেখানে আবেদন করতে থাকি।

একদিন এক ইন্টার্ভিউয়ের ডাক আসে- আইবিএমে জুনিয়র জাভা ডেভেলপার। আমি suited booted হয়ে প্রবেশ করি সুউচ্চ অট্টালিকার এক সুদৃশ্য কামরায়। আমার সামনে এক ব্যস্তসমস্ত চৈনিক রিক্রুটার, তিনি আমায় ভড়কে দিয়ে কত কিছু অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে চলে! কেন আমি এতদিন চাকরি করিনি, আমার রেজ্যুমি অত্যন্ত দুর্বল, এমনি কত-শত হতাশা জাগানো কথামালা। আমি হতাশার সাগরে ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ করে জেগে ওঠি। আমার মনের মাঝে লুকিয়ে রাখা কষ্টবোধ প্রতিবাদের কণ্ঠ হয়ে গর্জে ওঠে। আমি চিৎকার করে বলে ওঠি- বিশ্বাস করুন, আমি চাকরি করেছি, শ্রমিকের চাকরি, জাপানে ভয়েজ রিকগনিশনে পিএইচ.ডি করে তা গোপন করতে বাধ্য হয়েছি। আমার গর্জে ওঠা শুনে ছুটে আসেন বেশ কিছু suited booted. একজন আমায় নিয়ে যান এক নিভৃত কামরায়, আমার দিকে এগিয়ে দেন জলের বোতল। বিনীত হয়ে বলেন– আমরা তো দীর্ঘদিন তোমার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ওয়াটারলুর এক কোম্পানি voice recognition-এ অভিজ্ঞতাসম্পূর্ণ একজন পিএইচ.ডি-ধারী ক্যান্ডিডেট খুঁজে বেড়াচ্ছে দীর্ঘদিন। তুমি কি ওয়াটারলুতে যেতে চাও? আজই তোমার রেজ্যুমি পাঠিয়ে দাও, আমরা তোমায় ইন্টার্ভিউয়ের ব্যবস্থা করে দেবো।

আমার মনের মাঝে বয়ে যাওয়া ঝড় তখন থেমে গেছে। আমি তখন শান্ত সমাহিত। আমার মন বলে ওঠে এবার বুঝি আমার গন্তব্য হতে ডাক এসেছে। আমি আমার কল্পনার চোখে দেখতে পাই ধূসর দিগন্ত হতে একটা ট্রেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার পানে ।

লেখক পরিচিতি
কানাডাবাসী একজন গদ্যশিল্পী। ব্যক্তিগত স্মৃতি, অভিবাসী-অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বকে এক অনন্য বয়ানে রূপ দিতে সক্ষম তিনি। তাঁর লেখায় আত্মচেতনা, সময়ের প্রবাহ, পরিবার-সমাজের ছায়া এবং মানুষের অন্তর্গত ভাঙন-গড়া সবই একত্রে ধরা পড়ে। জাপান ও কানাডায় বহু বছরের প্রবাসজীবন তাঁর রচনার ভাষাকে দিয়েছে অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা, আর বহুমাত্রিকতা। গ্রন্থ: ‘অবলাচরণ’ (২০২৪), ‘জাপানে যাপিত জীবন’ (২০২৫)।