পরিযায়ী জনম
মিত্রা চট্টোপাধ্যায়
আমরা, চারজনের পরিবার (দিলীপ, আমি, দুই কন্যা ঝুমরি আর ঝিলাম), কানাডায় এসেছি ২০০০ সালের ৪ঠা জুলাই। আজ ঠিক ছাব্বিশ বছর অতিক্রান্ত। শিক্ষা, কার্যসূত্র, রাজনৈতিক অ্যাসাইলাম ইত্যাদি কারণ ছাড়া যারা এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে অভিবাসন করে, জীবন কাটায়, তাদের ক্ষেত্রে প্রথমেই যে স্বাভাবিক প্রশ্নটি আসে, ‘কেন’? কারণগুলো প্রত্যেকের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র হলেও, দু-একটি প্রাথমিক উত্তর প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একই। কিছুর অভাব, চাপ, অপছন্দ অথবা উচ্চাশা- আরও বেশি কিছু করা এবং অনেক বেশি পাওয়ার অভিলাষ। আমার বর দিলীপের ইচ্ছে আর জোরাজুরির কারণটি ছিল, অন্য আরেক রকম- বিস্তৃত জীবন, নতুন নতুন দেখা, শেখা, অভিজ্ঞতা।
আমরা যখন আসি এ-দেশে, ভারতে রাষ্ট্রীয় সরকারের অধীনে একই দপ্তরে ভূ-বিজ্ঞানী হিসেবে আমরা স্বামী-স্ত্রী কাজ করতাম। দিলীপের চাকরির পেনশন নিরাপদ ছিল, আমরা ছাড়া ওর ছিল না আর কোনো পিছুটান, সাংসারিক দায়-দায়িত্ব। সে-দিক থেকে, অতি ভালো চাকরি, মা-ভাই-বোন, শিল্প-সংস্কৃতির কাজ নিয়ে এতই পরিবৃত, মগ্ন ছিলাম, দেশ ছাড়ার পরিস্থিতি কিংবা ইচ্ছে কখনো ছিল না আমার এবং মেয়েদের। তখন আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের বয়স চল্লিশোর্ব্ধ, ছয় বছরের ব্যবধান, কন্যাদের একজন বাইশ, অন্যজন বারো। যে মহৎ উদ্দেশ্যই থাকুক, আমরা এলাম দেশের মাটি, চাকরির ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আপন মানুষ, অন্তরঙ্গ বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে, অধিক বয়সে নিজেদের আর মেয়েদের স্ব-জীবনগুলো থেকে উৎপাটিত করে। অতএব, সেই সময় থেকে আমাদের সংসারের একত্রিত, সুখে পরিপূর্ণ অধ্যায় ধীরে ধীরে বহুল এবং বিবিধ চাপের সম্মুখীন হলো। আপন দেশে থাকলেও সন্তানেরা টিন-এজ, প্রাপ্ত বয়স্ক হলে অধিকাংশ পরিবারে এমনই ঘটে থাকে, কিন্তু আমাদের চারজনের অভ্যস্ত সহাবস্থান, কম্যুনিকেশনের সরল সমীকরণ বিপুল ধাক্কা খেলো। হয়তো, তার একটা কারণ, আমাদের দেশ ছাড়ার বাস্তব কোনো প্রয়োজন ছিল না, দ্বিতীয় কারণ, আমরা দুজনে বেশি বয়সে, বড়ো হয়ে যাওয়া দুটি মেয়েকে নিয়ে নতুন দেশে এসে শূন্য থেকে সব শুরু করেছিলাম। নিন্দুকেরা বলে মূর্খামী!
বড়ো মেয়ে ঝুমরি তবু পরিণত বয়সে, সরাসরি পিএইচ.ডি ও অধ্যাপনা করতে আসায়, প্রতিষ্ঠার দিক থেকে সফল হয়েছিল। ইংরেজি সাহিত্যে খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে ইউরোপের অন্য দেশে অধ্যাপনা, গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ থাকলেও, হাতে টিকিট আর ইমিগ্রেশন থাকায় ওর পক্ষে সহজ হয়েছিল এ-দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি কাজ শুরু করার। এডমন্টনে প্রথমে একা থাকত, ২০০৪ সালে বিয়ে-ঘরসংসার করে। কন্যা-জামাতা দুজনেরই পিএইচ.ডি ডিগ্রি প্রাপ্তি হয়েছিল। কিন্তু কানাডা অভিবাসনের পলিসি কখনোই ইমিগ্রেন্টদের কাজের অভিজ্ঞতা আর পারদর্শিতার যোগ্য স্থান দিতে ইচ্ছুক, সচেষ্ট নয়। জনসংখ্যা কম বলে মুড়ি মুড়কির মতো কাজের জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় ইমিগ্রেন্টদের প্রথম প্রজন্মকে। পরে, যুদ্ধ করে নিজেকে, বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্মকে প্রতিষ্ঠা করার ইতিহাস। কেউ পারে, কেউ স্বদেশে ফিরে যায়।
দিলীপ পরোয়াও করেনি যেকোনো জীবিকায় অর্থোপার্জন করার, ক্রমশ আমিও বাধ্য হয়েছিলাম নানা ধরনের কাজ করে এ-দেশের মাটিতে নিজেদের অস্তিত্ব দৃঢ় করার। কিন্তু কানাডার প্রথম ছ-টা বছর ঝিলাম আর আমার জন্য মানসিক ও কেরিয়ারের উন্নতির দিক থেকে খুবই প্রতিকূল, কষ্টের, এলোমেলো সময় ছিল। কানাডা আমাদের অনেক দিয়েছে, কিন্তু দেশে আমাদের প্রত্যেকের অবস্থানগত যে প্রাচুর্য, মর্যাদা আর আনন্দ ছিল, সবই অচিরে শূন্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল আমাদের কাছে। স্বদেশের মাটিতে শক্ত শিকড়, মাতৃভাষা মস্তিষ্কের অক্সিজেনের মতো, হৃদয় ধক-ধক করে ওই দেশে। তাই আসা-যাওয়া।
পরিবার অটুট রাখতে আমি অতি সুরক্ষিত চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম কুড়ি বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে, ২০০৩ সালের ৩১মে, পেনশনটুকু কোনোরকমে রক্ষা করে। ৮ থেকে ১২ গ্রেড পর্যন্ত পড়াশোনার পরে, স্কুলের কোর্স শেষ করে, ঝিলাম আর কানাডায় থাকতে চায়নি, ২০০৬ সালে কলকাতার লরেটো কলেজে ইংরেজি অনার্স নিয়ে বিএ কোর্সে ভর্তি হয়েছিল। আমি টরন্টোর সেন্টিনিয়াল কলেজে দু-বছর ধরে এনভয়রনমেন্ট টেকনোলজি ডিগ্রি কোর্স ২০০৪ সালে শেষ করেও ভাগ্যের ফেরে সেই জীবিকায় চাকরি করতে পারিনি। সেই সময়ে, ১ জুলাই, আমাদের মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কলকাতার এক নার্সিং হোমে, সেখানেই ছিলাম। তার দু-বছর পরে ১৮ বছর বয়সি মেয়ের জন্য আবার ফিরে যেতে হয়েছিল কলকাতায়। সেখানে আমার মা, বড়ো মেয়ে, দিলীপ, চাকরি, কিছুই নেই, অপরিকল্পিতভাবে আমার জবলেস ফ্র্যাগমেন্টেড সংসার। কুড়ি বছরের খুব ভালো জীবিকার আয় এবং সঞ্চয় দিয়ে কেনা নিজেদের একটি বাসস্থান ছিল শুধু।
২০০৬ থেকে ঝিলামের কলকাতা কলেজে তিন বছর কোর্সের সময় মাত্র কয়েক মাসের জন্য যা-হোক করে এ দেশে আসতাম, দিলীপ একা এখানে থাকত বলে। ২০১৯ পর্যন্ত শীত-গ্রীষ্মে প্রতিবছর এসেছি, অস্থায়ী জব করেছি। ২০১২ থেকে ঝিলাম মুম্বাই-এ স্কুলের শিক্ষকতা শুরু করার পর আমার এ-দেশে থাকার মেয়াদ একটু লম্বা হলো। ২০০৮ সালে জামাই মিশা (দয়াদীপ) পোস্ট ডক্টরেট গবেষণা এবং অধ্যাপনার জন্য কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে গেলে বড়ো মেয়েরা কিংস্টনে কয়েক বছর ছিল। দিলীপ আর আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি কিংস্টোনে। শেষ পর্যন্ত, মেয়ে জামাই দেশে ফিরে যায় একে একে, মুম্বাই-এ যে যার বিষয়ে অধ্যাপনা শুরু করে ২০১১ এবং ১২ সাল থেকে। ওখানে ২০১৭-য় ওদের ছেলে জাইন-এর জন্ম, আমি প্রথমবার দিদিমা হই। আমার জীবনে সে এক বড়ো আনন্দ। কলকাতা-মুম্বাই আমার আরেক যাত্রা, সাংসারিক যাপন।
চৌদ্দ বছর ধরে টরন্টোর দু-তিন জায়গায় ভাড়াবাড়িতে থেকে ২০১৪-তে কেনা হলো ব্রাম্পটনে কন্ডোমিনিয়ামের একটি বড়ো ইউনিট; এখনো সেখানেই থাকি। ২০১৫ থেকে একটানা শুরু হলো দুই দেশে অর্ধেক বছর করে বসবাস আমার। করোনা অতিমারীর বিধি নিষেধ জারি হওয়ার আগেই, ২০১৯ এর নভেম্বরে এ-দেশের কাজ থেকে অবসর নিয়ে দিলীপ দেশে ফিরে গেছে বাংলায় নিজের গ্রামে, পৈত্রিক ভিটে মাটিতে। নতুন উদ্যম পরিকল্পনা নিয়ে এক্যুয়াকালচার করছে। ভাইপোর পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে ওদের সঙ্গে থাকে, কখনো কলকাতায় আমাদের এপার্টমেন্টে এসে স্বল্প ক-দিন থেকে যায়।
ঝিলাম কলকাতায় ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করে কলকাতা এবং পরে মুম্বাই-এ মূলত ইংরেজির স্কুল-শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি করে, যদিও ওর প্যাশন, দক্ষতা ছিল নাটক নিয়ে। অনেক বছর প্যারালালি নাটক চালিয়েছে, অভিনয়, আলো, পরিচালনা। ১২ বছর ভারতে অতিবাহিত করে আবার ২০১৮-তে ফিরে আসে কানাডায়। এখানে বাস করতে গেলে উপার্জন একান্ত প্রয়োজনীয়, সুতরাং ফুল টাইম, পার্ট টাইম কাজ করতে করতে, অতিমারীর দুঃসময় পার করে ও। ২০২০ থেকে বেরি-অরিলিয়ায় আমার জামাতা ব্রেন্ডানের সঙ্গে অরগ্যানিক ফার্মিং কার্যসূত্রে ওর পরিচয় এবং স্থায়ী সম্পর্ক হয়। ঝিলামের বেরি-অরিলিয়ায় মুভিং, বিয়ে ইত্যাদির পর ওদের ছেলে অশিনের জন্ম হয় ২০২২ সালে। অশিনের জন্মের পর অন্টারিয়ো প্রভিন্সের প্রায় উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্ত, কত নতুন ও রিমোট জায়গায় ওদের সঙ্গে থাকার প্রথম অভিজ্ঞতা হলো আমার! কোল্ড ওয়াটার, লিমিংস্টোন, পিলি দ্বীপ, মিন্ডেন, অরিলিয়া। অপূর্ব সুন্দর প্রতিটি জায়গা।
২০১৯ পর্যন্ত দিলীপ আর আমি চষে ফেলেছিলাম কানাডার পূর্ব (আতলান্তিক কোস্ট) থেকে মধ্য এবং পশ্চিম (এডমন্টন, কেনমোর, ক্যালগেরি, জেস্পার, ব্যানফ, লেক লুইস) দিক আর আমেরিকার প্রায় প্রতিটি স্টেট। আমি একাও ঘুরেছি কানাডার ভ্যাঙ্কুভার (প্রশান্ত মহাসাগর), আমেরিকার নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক, ক্লিভল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান রমন। জিয়োলজিস্ট জীবিকা আর প্রতি বছর কানাডায় আসা যাওয়ায় ভ্রমণ পিপাসা বেড়েছে, আমার কাছে খুলে গিয়েছে একাকী ভ্রমণের এক সাহসিক, অবারিত পৃথিবী। কানাডা আসা অথবা ফেরার পথে ছয়-সাত দিনের জন্য হল্ট নিয়ে ঘুরেছি লন্ডন, প্যারিস, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, আমস্টারডাম, অস্ট্রেলিয়া। ভ্রমণ নিয়ে আমার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায়, কানাডা নিয়ে লেখা বই ‘মেপল মিতা’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে।
২০২০-তে করোনা অতিমারী ঘোষিত হওয়ার পরে একা এসে, অতিরিক্ত চার মাস অরিলিয়াতে আটকে পড়েছিলাম। ভারতের প্লেন কানাডায় আসা যাওয়া বন্ধ ছিল। দু-দিকে আসা, যাওয়া- দেশ ও কানাডায় ঢোকা বেরনো- অর্থাৎ চারবার কোভিড টেস্ট। পরের বছরেও। বহু টেনশন আর কষ্ট। প্রথমবার ব্রাম্পটনে নিজের ঘরে ঢুকে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন, অর্থাৎ নিজ বাসস্থানে নির্বাসন। আমি পৌঁছানোর আগেই সুদূর বেরি থেকে এসে মেয়ে জামাই আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিয়ে দোকান-বাজার সমেত বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল, থাকেনি। পাশের বিল্ডিং-এর একটি মেয়ে রান্না করা খাবার (হোম ডেলিভারি) দরজার বাইরে দিয়ে গেল দু-বার, খেয়ে বাঁচলাম। যাত্রার ধকল সামলে সাতদিন পর রান্না শুরু করলাম, আমাদের ফ্লোরের বাংলাদেশের এক দাদা সবজি বাজার করে দরজার বাইরে রেখে দিয়েছিলেন। সবকিছু বন্ধ, স্টে-হোম অর্ডার চলছে। মন ছটফট করে, অন্যভাবে মনোসংযোগ করি। এখানে তো কাজের মাসি, ড্রাইভার, চলনদার কেউ নেই, ঘরে-বাইরে সবই নিজেকে করতে হয়। পরিবারের অন্তত দু-তিনজন একসঙ্গে থাকলে সব দিক থেকেই অনেক সুবিধে, কাজ ভাগাভাগি হয় আর বিশেষ করে দুর্দিনে অন্তত কথা বলার কেউ কাছে থাকে।
মৃত্যুর কালো ছায়া সারা পৃথিবীতে ঢেউ এর মতো ছড়াচ্ছে, ওঠানামা করছে, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ঢেউ, যা কখনই কোথাও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। বাস্তব দুঃস্বপ্নের মতো। অতিমারীর প্রথম ওয়েভ সামলেছিলাম কলকাতায়। দ্বিতীয়, তৃতীয় ওয়েভের সময় একটানা প্রায় দশ মাস কানাডায়। তুলনামূলকভাবে এখানে অনেক নিরাপদে ছিলাম। সরকারি পদক্ষেপে অতিমারীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত। এখানে প্রতিবেশী, পরিচিত কারো মৃত্যু বা হাসপাতালস্থ হওয়ার কথা শুনিনি। জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে গ্রেটার টরন্টো এরিয়ার প্রশাসন শুরু থেকেই খুব কড়া, ভিড় করলে, বিধিনিষেধ ভাঙলে সাড়ে সাতশ ডলার ফাইন। আমি ধৈর্য ধরে দেশে ফেরার দিন গুনি। ২০২০, ২১, ২২- এই তিনটি বছর, কোভিড ও তার পরবর্তী টালমাটাল অব্যবস্থার সময় যখন অনেক দুর্ভোগের মধ্যে একেবারে একা থেকেছি, যাদের একদিন কাছের মানুষ বলে ভাবতাম, কলকাতা এবং কানাডায়, দু-একজন ছাড়া তাদের কেউ খোঁজ-খবর নেয়নি। দিলীপ দেশে ফেরার পর থেকে আমি একা বলে আমাকে সরিয়ে না দিয়ে, যেই আত্মীয় এবং বন্ধুরা (আলাদা করে নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই, তারা জানে) সামাজিক যত্ন, দুঃসময়ে সাহায্য আর আতিথেয়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, নিঃসন্দেহে আমার আপন লোক, সুজন বলে চিনেছি তাদের। এদের সাথেই সম্পর্কের দৃঢ়তা আর নিশ্চয়তা বজায় রাখি।
আজ, ইতোমধ্যে, আমাদের যথেষ্টই অভিজ্ঞতা হয়েছে থাকা, দেখা, সামাজিক একাডেমিক জীবিকা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক। দুটি দেশের- ভারত ও কানাডায় ওতপ্রোতভাবে। ২৬ বছরের মতো লম্বা সময় পার করে, দুই দেশেই যাপনক্রিয়া চালু রেখে এখন আর কী হারিয়েছি, কী পাইনি, বিচার করি না। কী পেয়েছি সেটাই বিবেচ্য। এখন আমরা প্রত্যেকেই যে-যার অবস্থান থেকে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে স্বাধীন এবং মুক্তভাবে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ স্থির এবং পরিবর্তন করি। আমাদের এই বিপুল সক্ষমতা, উপায় আর জোর স্পষ্টতই দিয়েছে এই দেশ, কানাডা। বেড়েছে আমাদের যুদ্ধ করে অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া শক্তি আর সহিষ্ণুতা, বেড়েছে আমাদের বৈপরীত্ম, ডাইভার্সিটি গ্রহণ করার সক্ষমতা; উদারতা, বেড়েছে বাধা-বিপদ অতিক্রম করার আত্মবিশ্বাস। হয়তো আজীবন দেশের কায়েমী সুবিধা, অভ্যস্ততা, স্থিতিশীলতায় এতটা হতো না। শুধু ভৌগোলিক দিক থেকেই নয়, আমাদের পৃথিবী প্রসারিত হয়েছে কানাডা-যাপনে, অন্য একটি দেশকে আপন করে। আমি বহন করে চলেছি নতুন আরেক জন্ম, সেই ২০০০ সালে দেশ ছেড়ে কানাডা আসার গতিজাড্য আমার ওপরেই বর্তিয়েছে।
কয়েক বছর হলো শীত পড়লে কানাডা থেকে কলকাতায় যাই পরিযায়ী পাখির মতো। সেখানে বইমেলাগুলো চলে, আমাদের ১২ বছরের ‘প্রভাস পত্রিকা’ আর ‘সহজিয়া প্রকাশনা’র সম্ভার নিয়ে আমরা থাকি বিভিন্ন বই মেলায়। সেগুলো মিটে গেলে, সাধারণত এপ্রিল মাসে খানিকটা ঠান্ডা থাকতেই কানাডায় আসি। এয়ারপোর্ট থেকে ব্রাম্পটনে আমাদের বিল্ডিং কাছেই বলা চলে। গাড়িতে কুড়ি, পঁচিশ মিনিট। যখন কলকাতা থেকে কানাডায় আসি, সাধারণত এপ্রিলের শুরুতে বা মাঝামাঝি, বাড়ির গেট দিয়ে ঢোকা অবধি চারিদিকেই কেমন শ্রীহীন, শুকনো গাছপালা দেখি, যেন কাঁটাগাছ। কয়েকদিন পরে গাছের ডালে ডালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া সবুজ রঙের ছোপ, তবুও রুক্ষ, অকিঞ্চিতকর। কখনো মেঘলা, ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া। এদিকে তো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, বাড়ির সেন্ট্রাল হিটিং বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির পর কুয়াশায় ঢাকা থাকে বাইরের পৃথিবী। এই মেঘলা, ভেজা ভেজা ঠান্ডায় শীত করে বেশ, বিকেলে রোদ ওঠলেও হাড় কাঁপানো ভয়ানক ঠান্ডা হাওয়ায় আপাদমস্তক মুড়ে হেঁটে আসি বাড়ির কাছে লাইব্রেরিতে, সাউথ ফ্লেচার ক্রিকের লম্বা ট্রেল ধরে। এখানকার মানুষ কত পরিশ্রম আর যত্ন নিয়ে বাড়ি, পাড়া, পরিবেশ সাজিয়ে রাখে, গাছ লাগায়, বাচ্চাদের খেলাঘর বানায়! মনে মনে তারিফ করি। নিজেদের আয়ত্তের বাইরে বলে ক্ষোভ-অভিলাষ নেই বিন্দুমাত্র। আলাদা বাড়ি কেনা অথবা রক্ষণাবেক্ষণ প্রবীণ বয়সে, ছয় মাস করে থেকে, আমার একার পক্ষে সাধ্যাতীত, আর্থিকভাবে প্রশ্নাতীত। কিন্তু এখানকার মানুষের পরিবেশ আর আপন বাসস্থানের প্রতি যত্ন, শ্রম, ভালোবাসা আর ঘরে-বাইরে কঠোর পরিশ্রমের যাপন দেখে আনন্দ পাই, বাঁচতে শিখি।
কানাডা ঠান্ডার দেশ, অক্টোবর থেকেই শুরু হয় ঠান্ডা হাওয়া, নভেম্বরে দু-একবার ঝিরিঝিরি বরফ পড়ে জানান দেয় তুষারের দিন আসছে। ডিসেম্বরে শূন্য থেকে নামতে থাকে তাপমাত্রা, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চে সাদা বরফের নিচে ঘুমিয়ে থাকা প্রকৃতি। হাইবারনেশন। ২০২১ সালে অতিমারীতে আটকে পড়ে আর ২০২২-এ নাতির জন্মের জন্য সম্পূর্ণ উইন্টার কানাডায় ছিলাম। ২৫ বছরের কানাডা যাপনে অন্তত দশ বছর হাড়ে হাড়ে চিনেছি কানাডার শীতের ভয়াবহতাকে, কয়েক বছর তার মধ্যেই নানা ধরনের জব করেছি, দু-বছর হায়ার স্টাডি। এখানে যাদের জীবন, শীত জীবনসঙ্গী, পরোয়া করে না তারা।
এখানে বসন্তে, গ্রীষ্মের শুরুতে আরাম আমাদের। প্রকৃতিতে খুশির ছোঁয়া ভেসে বেড়ায় হাওয়ায় হাওয়ায়- রঙে, গন্ধে, সৌন্দর্যে, বেড়ে ওঠায়। ঘরে বাইরে প্রত্যেকদিনের বেড়ে ওঠা, স্ফুরণ দেখি। বাড়ছে ঝিলামের খোকা অশীন, আমার নাতি। তিন বছর হয়ে গেল তার। দু-বছর ধরে উত্তর অন্টারিয়োর মিন্ডেন হিলে আছে ওরা। নিচু পাহাড়-ঘেরা, গাল নদী বুকে নিয়ে অপূর্ব সুন্দর যে উপত্যকা। মে মাস কলকাতায়, দেশের অধিকাংশ জায়গায় অসহ্য গরম। এখানে বসন্ত, হালকা রোদ বৃষ্টি, শীতল বাতাস। নতুন পাতা, পাখির কুজন, সাদা চেরি আর কত রঙিন ফুলের উচ্ছ্বাস, উপচে উথলে পড়া। পাখির ওড়াউড়ি আর কুজন, কাঠবিড়াল, চিপমংকের ফুর্তির খেলা, গাছে গাছে সবুজ পাতার আন্দোলন। তাপমাত্রা বাড়ছে ধীরে ধীরে। এখানে আমার দ্বিতীয় জন্ম, অনেক যুদ্ধের শেষে ক্লান্ত আমি। এখন প্রিভিলেজড, আমার কানাডা-যাপন পরিযায়ী পাখির মতো, আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা নিয়ে। রোদ, বরফ, ঝড়, বৃষ্টি, বসন্তের হাওয়া, গ্রীষ্মের দাবদাহ, চলতে ফিরতে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ উপত্যকা তৃণভূমি, নদী লেক, গাছপালা, ফুল, পাখি, ছোটো ছোটো প্রাণী, এরাই আমার ভীষণ ভালো বন্ধু, প্রাণের আরাম। বন্ধু, মানুষ খুঁজে বেড়াই না এখন আর, যাদের পছন্দ করি, যাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, তারাও আমার মতো হাত বাড়িয়ে রাখে। আর, প্রকৃতি এত দেয় যে নিজের জীবনের সমস্ত না-পাওয়া, খেদ, নালিশ থাকে না, মিলিয়ে যায়। অনেক হারিয়ে যে আনন্দ-শান্তি আমার অর্জিত, তাকে আর ছাড়ি না। তার স্বাদ, গন্ধ, তরঙ্গ দিয়ে নিজেকে ভরাই, সাজাই, বিকশিত করি।
লেখক পরিচিতি
জন্ম কলকাতায়। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রানী চট্টোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। ভারতে ভূবিজ্ঞানী হিসেবে কুড়ি বছরের জীবিকা থেকে ২০০৩ সালে স্বেচ্ছাবসর নেন সপরিবার কানাডা অভিবাসনের কারণে। ২০১৪ সাল থেকে বাৎসরিক ‘প্রভাস’ সম্পাদনা এবং ‘সহজিয়া প্রকাশন’-এর কাজে যুক্ত। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মেপল মিতা’ (২০১৪) এবং ‘দেশ বিদেশের গল্প কথা’ (১ম খণ্ড ২০১৫, ২য় খণ্ড ২০১৮)।

