প্রবাসী লেখক কথন
গত শতাব্দীর শেষবেলায় বাংলাদেশ থেকে টরন্টো শহরে এসে হঠাৎ করে বুঝতেই পারিনি যে আমি বাংলাদেশের বাইরে কোথাও এসেছি। রসোম রোডে বরের বন্ধুর বাড়িতে ওঠে দেখি চারদিকে বাঙালি আর বাংলা ভাষার ছড়াছড়ি। তাই টরন্টো থাকার সময় বাংলা বলার লোকের কোনো অভাব হয়নি।
বিপত্তি ঘটলো যখন নতুন মিলিনিয়ামের দোসরা জানুয়ারিতে অটোয়া এসে পৌঁছলাম। একেই তো অটোয়া শহর বরফে ঢাকা ছিল, তার ওপর অটোয়া শহরে বর ছাড়া বাংলা বলার আর একটা লোককেও চিনতাম না। মনেপ্রাণে বাঙালি আমি একেবারে হাঁপিয়ে ওঠেছিলাম। তাই দাদুর থেকে পাওয়া ডায়েরি লেখার অভ্যাসটা আবার ফিরে এলো। আমার বর তখন সকালে ইউনিভার্সিটিতে যেতো আর রাত দশটার পর বাড়ি ফিরতো। তখন আবার স্মার্টফোনের সময়ও ছিল না, তাই দেশে যখন তখন কথা বলাও সম্ভব ছিল না। তখন আমার যতো অনুভূতি, এদেশে দেখা যতো সৌন্দর্য বা জীবন-প্রবাহ, সবই আমি দীর্ঘ চিঠির মধ্যদিয়ে আমার মাকে বা আমাদের বন্ধুদের লিখে জানাতাম।
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপার অক্ষরে প্রথম ছোটো গল্প ‘বহ্নি শিখা’ বের হয়েছিল। তারপর শুধু নিয়মিত ডায়েরির পাতায় নানারকম কথা লিখে যেতাম। তবে সেভাবে দু-এক জায়গায় লেখা ছাপা হওয়া ছাড়া ডায়েরির বাইরে তেমন কোনো লেখা হতো না। দেশের বাইরে বিশেষভাবে অটোয়াতে আসার পর বাংলা বলার বা শোনার লোকের ভীষণভাবেই অভাব বোধ করতে থাকি। এদিকে যতো দূরেই আসি, আমি মনেপ্রাণে একেবারেই বাঙালি। মনের ভিতর ছোট্ট একটা বাংলা যেন তুলে এনেছি কিন্তু তার প্রয়োগ করতে না পেরে স্থলের মাছের মতো ছটফট করতে থাকি। তাই তখন থেকে আবার সেই আবৃত্তি করার অভ্যাসটা ফিরিয়ে আনলাম আর সব কিছু লিখে রাখতে শুরু করলাম।
এদেশে এসেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাওয়াতে যেন অকুল সাগরে পড়ে গেলাম। আশেপাশে পরিচিত কেউ ছিল না আমাদের এই অনভিজ্ঞ সময়ে একটু উপদেশ দেবে। কিন্তু এদেশে এসে বুঝলাম এদের বোধ হয় কারোরই এমন মা, মাসীমা, কাকীমারা সারাক্ষণ তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে আসন্ন মাতৃত্ব বা পিতৃত্বকে সহজ করে দেওয়ার জন্য পাশে থাকে না। তাই এদের এসব সামাজিক দায়বদ্ধতা তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করে থাকে। অনাগত সন্তানের আগমনকে সহজ করার জন্য এবং হবু মা-বাবাকে শেখানোর জন্য আমাদের প্যারেন্টাল ক্লাস শুরু হলো। এই প্যারেন্টাল ক্লাস প্রথমে আমাকে এদেশের সামাজিক কাঠামোর সাথে আমাদের দেশের তুলনামূলক লেখা লিখতে উদ্বুদ্ধ করলো। তখন আমি সেগুলো গল্পের মাঝ দিয়ে একে একে লিখে যেতে থাকি। ডায়েরি ছাড়া গল্প লেখা এভাবেই গুটি গুটি পায়ে শুরু হয়ে যায়।
আমার বর তখন সকাল থেকে প্রায় রাত ১০টা পর্যন্ত কার্লটন ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে কাটাতো, তার মানে এই আমি তখন বান্ধবহীন এই শহরে মুখ বন্ধ করে দিন পার করছিলাম। সারাদিন যেন কথা বলতেই ভুলেই গিয়েছিলাম, যেটা আমার মনের ওপর বিশাল এক বোঝা হয়ে বসেছিল। তখন দেশে এক মিনিট কথা বলতে $২.৭৫ খরচ হতো, তাই ছাত্র বরের টিএ আর আরএ-এর $১৮০০ দিয়ে সংসার চালানোর পর দেশেও সেভাবে ফোন করার অবস্থা ছিল না। মা যখন ফোন করতো, তখন বড়োজোর পাঁচ মিনিট কথা বলে, কথা বলার সখ কখনোই মিটতো না। এসব কথা শুনে আমার গায়েনোকোলোজিস্ট আমার জন্য একজন ডৌলা ঠিক করে দিলো।
এই ডৌলা তো আমার জন্য এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। একজন মনোবিজ্ঞানে পিএইচ.ডি করা মেয়ে আমার মতো এক আত্মীয়-বান্ধবহীন সন্তানসম্ভবাকে একাকিত্ব ঘোচাতে সপ্তাহে দুদিন ভলান্টিয়ার ওয়ার্কের অংশ হিসেবে পুরো পাঁচ মাস সময় দিয়েছে। সেই লিসা, মানে আমার ডৌলার কাছ থেকে আমি এদেশি জীবন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। আর লিসার কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটা মূল্যবান মূহূর্ত কারো কাছে বলার জন্য মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠতাম। আর সেই অস্থিরতাই আমাকে প্রতিনিয়ত লিখতে উৎসাহ দিয়েছিল। লিসার চোখ দিয়ে আমি এদেশে আসার পর এদের সমাজকে দেখতে শুরু করলাম। আর নতুন দাঁত ওঠতে শুরু করলে যেমন শিশু সব কিছুতে কামড় বসায়, আমিও তেমনি নতুন নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে খাতার পাতায় গল্প লিখতে শুরু করলাম। লিসার সাথে সপ্তাহে দুবার অটোয়া সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে যাওয়া শুরু করলাম। আর লিসা এদেশকে বইয়ের পাতার মধ্যদিয়ে দেখার জন্য উপযোগী বই খুঁজে আমাকে পড়তে দিতো। একদিকে প্যারেন্টাল ক্লাসের শিক্ষা, অন্যদিকে সাইকোলজির ছাত্রী লিসার পরামর্শ আমাকে অন্তঃসত্ত্বা সময়ের হিন্দু সমাজের পুরাকালের কাহিনির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করতে শেখালো। ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি যে অভিমন্যু, শুভদ্রার পেটের মধ্যে থেকে অর্জুনের মুখে বলা কথোপকথন থেকে চক্রব্যুহ ভেদ করা শিখেছে। তখন মনে হতো এগুলো রূপকথার গল্পের মতো, এর কোনো সত্যতা হয়তো নেই। কিন্তু লিসার কাছ থেকে বিভিন্ন অন্তঃসত্ত্বার শোনা গল্প থেকে বুঝতে শিখেছি যে ওটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। আসলে একটা শিশুর মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় থেকেই শিক্ষা শুরু হয়। সেজন্য প্রসূতিকালীন সময়ে হবু মায়েদের সব সময় শুভ চিন্তা করতে হয়, নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হয়, আনন্দে থাকতে হয়। এগুলো অনাগত শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তখন থেকে আমি সারাক্ষণ শিশুর বিকাশের জন্য প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তুলনামূলক জ্ঞান একদিকে যেমন আরোহণ করতে শুরু করলাম, তেমনি গল্পচ্ছলে সেগুলোকে খাতাবন্দি করতে শুরু করি। তখন তো সেল ফোন বা কম্পিউটারে বাংলা লেখার সুযোগ ছিল না। তাই সবকিছু খাতা কলমে লিখে রাখতাম। এদেশের একাকিত্ব আর বাংলা বলা লোকের অভাবই মূলত আমার বাংলায় লেখক হয়ে ওঠার চেষ্টাতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
তাছাড়া নিজের প্রথম মাতৃত্বের অনুভূতি এবং ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে, আমারই অনুভব ও অনুভূতি নিয়ে সৃষ্টি হতে থাকা সেই অমূল্য সৃষ্টির আগমনবার্তা আমি ভীষণভাবে অনুভব করতাম। আর সেই প্রতিটা মুহূর্ত দিয়ে আমার প্রবাসী খাতাকে ভরিয়ে তুলতাম। আমি দেশে থাকলে হয়তো এগুলো এভাবে গুছিয়ে লিখে রাখতাম না, কারণ দেশে তো অনুভূতি মুখের ভাষায় প্রকাশ করার জন্য অনেক অনেক প্রিয়জন পাশে থাকত। তাই সেগুলো শুধু হয়তো বলেই তৃপ্ত হয়ে যেতাম।
আমার মধ্যে ছোটোবেলা থেকে একটা লুকানো জেদ ছিল যে, কোনো বিধি-নিষেধের কারণ না জেনে আমি কোনো নিয়ম মানতে পারতাম না। আর একটা মানুষকে মাতৃত্বকালীন সময়ে বোধহয় সবচেয়ে বেশি বিধি-নিষেধ মানতে হয়। আমি, আমার মা এবং শাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে এমন অনেক বিধি-নিষেধ ফোন বা চিঠিতে নিয়মিত পেতাম। তখন আমি ভাবতাম এসব বিধি-নিষেধের পিছনে সন্তানের মঙ্গলের জন্য কি কোনো বিজ্ঞানসম্মত কারণ লুকিয়ে আছে? তাই তখন আমার কাজ ছিল সেই সব পিছনের কারণ খুঁজে খুঁজে বের করা আর সেগুলো লিপিবদ্ধ করা। এরকমভাবেই প্যারেন্টাল ক্লাসে অভিমন্যুর চক্রব্যুহ ভেদ করার মতো একটা একালের ঘটনা শুনলাম।
একজন মা তাঁর সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক মাস পরে পৃথিবী থেকে চলে যান। তাঁর ছেলে, বাবার কাছে বড়ো হতে থাকে। ওই ছেলেটির বার বছরের সময় ওদের ঘরে থাকা একটা পুরানো পিয়ানো পরিষ্কার করে একা একাই বাজাতে থাকে। আর পিয়ানোতে প্রথম হাত দিয়েই এমন একটা সুর বাজাতে শুরু করে, যা শুনে ওর বাবা অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে, এই সুর সে কোথা থেকে বাজাতে শিখেছে? ছেলেটি উত্তর দেয় কোথাও থেকে শেখেনি, পিয়ানোটা ধরার সাথে সাথে ওর মাথায় এই সুরটা বেজে ওঠেছে, আরও কোনটা কোন রিড না জেনেই আঙুল ছোঁয়াতে সেটা বেজে ওঠেছে। এ ঘটনা ওদের বাড়িতে এক আলোড়ন তোলে, কারণ এই সুরটা ওর মৃত মা বাজাতো। ওদের বাড়ির আর কেউ ওর মা মারা যাওয়ার পর এই সুর তো বাজায়ইনি, এমনকি পিয়ানোটা পর্যন্ত কেউ বাজায়নি! স্ত্রীর স্মৃতি হিসেবে ভদ্রলোক পিয়ানোটা বাড়িতে রেখেছিলেন ঠিকই কিন্তু কখনও খুলেও দেখেননি। সবাই তো তখন ভাবতে লাগলেন যে, ওর মৃত মায়ের আত্মা ওর ওপর ভর করেছে। তাতে তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জনের কাছে এর প্রতিকার জানতে চাইলেন। তখন এক মনোবিজ্ঞানী বললেন যে, এটা কোনো অসুখই না, ছেলেটি মায়ের পেটে থাকাকালীন ওর মা নিয়মিত পিয়ানোতে এই সুরটি বাজাতো আর ছেলেটি মায়ের পেটে থেকেই তা শিখেছে। আর এটাই স্বাভাবিক ঘটনা প্রতিটা শিশু মাতৃগর্ভে থেকেই তার শিক্ষা শুরু করে। আমি বরাবরই পড়তে খুব ভালোবাসি, আর এসব ব্যাখ্যা শোনার পর তো পড়াশোনা আরো বেশি বাড়িয়ে দিই, আর সাথে সাথে সেগুলো থেকে নিজের মতো করে গল্প বানিয়ে লিখতে থাকি।
তারপর যখন বড়ো ছেলে আনন্দ এলো, তখন সেই অবুঝ শিশুর সাথে সারাদিন গল্প করে যেতাম। যাতে ও বাংলাটা ভালো করে শিখতে ও বলতে পারে। জানি না, ওর সাথে জন্মের পর থেকে এত কথা বলেছি বলে কি না, আনন্দ কথা বলা খুব আগে শুরু করেছে, আর এগারো মাস থেকেই পুরো বাক্য বলতে পারতো। প্রতিদিনের মা-ছেলের সে-সব দিনলিপি, মাতৃত্বের নতুন নতুন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখে যেতে থাকলাম। সে-সব অদ্ভুত সব অনুভূতি দিয়ে মাঝে মাঝে গল্প লেখা শুরু করলাম। আমি এদেশে আসার পর থেকে আনন্দের আড়াই বছর পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা চাকরি করিনি। ওকে আড়াই বছরের বড়ো করে আমার ক্যারিয়ারে ফিরে এলাম।
আনন্দের সাড়ে পাঁচ বছর পর ভালোবাসা দিবসে আমার কোলের ছেলে আর্য এলো। আর্য আসার পর ওর সব কিছু আমি আনন্দের দিনলিপির সাথে মিলিয়ে দেখতাম। আর্যর সাড়ে চার মাস বয়সে আমি সরকারি চাকরি পেয়ে চাকরিতে যোগদান করি। তাই আর্যর সাথে আমার ভালোভাবে সময় কাটানো হয়নি বলে আমার সব সময় একটা অপরাধবোধ রয়ে গেছে। দ্বিতীয় সন্তান বলেই হয়তো আর্য খুবই সংবেদনশীল আর খুবই মায়াভরা একজন মানুষ হয়ে উঠেছে। প্রথম সন্তানকে মা-বাবা যতো বেশি সময় দিতে পারে দ্বিতীয় সন্তানকে তেমনভাবে সময় দিতে পারে না বলে, দ্বিতীয় সন্তান এমনিতেই বেশি দায়িত্বশীল হয় বোধহয়। তাই ওকে সারাদিন সময় দিতে পারিনি বলে অফিসের পর ওকে পুরো সময়টা দিতাম। সেজন্য ওই সময়টায় আমি তেমনভাবে কোনো লেখালিখি করার সময় করে ওঠতে পারিনি। তাই মাঝে কয়েক বছর আমি সেভাবে কিছুই লিখিনি।
তারপর যখন ফেসবুক এলো, সেই থেকে ডায়েরির বাইরে অন্তরজালে লেখা শুরু করি। অভ্র ফন্টের কল্যাণে অন্তর্জালে বাংলায় লিখতে শুরু করলাম। এদেশে প্রথম একটা বিয়েতে গিয়ে মনে হলো, আমি তো বিয়ের কোনো রীতিনীতি জানিই না। তাই তখন হিন্দু বিয়ের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন অন্তর্জালে পড়তে শুরু করি। পড়ে দেখলাম, সাত পাকে বাঁধা পড়ার সময় প্রত্যেক যুগল সাতটা শপথ নিতে তাদের একসাথে পথ চলা শুরু করে। অথচ আমি নিজের বিয়ের সময় পুরোহিতের মন্ত্রের মাঝে এগুলোর কোনোটাই বুঝিনি। তাই তখন আমি গল্পের ছলে হিন্দু বিয়ের নানা রকম আচার অনুষ্ঠানগুলো অন্তর্জালে লিখতে শুরু করি। একসময় এগুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে একটা লেখা শুরু করি। সেগুলোকে নিয়েই আমার প্রথম উপন্যাস ‘হিয়া’ গড়ে ওঠে। এই উপন্যাসে গল্প বলার মধ্য দিয়ে আমি বিয়ে, মাতৃত্ব, অন্নপ্রাশন এসবের পৌরাণিক রীতিনীতিগুলো আজকের এই আধুনিক সমাজে যে কতটা উপযোগী তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় গল্পের মাঝে বলার চেষ্টা করেছি। কারণ এই নিয়মগুলোর পিছনের কারণ না জেনে বেশিরভাগ সময়েই আমরা ভুলভাবে অনুশাসন পালন করি। যাতে উপকারের চেয়ে অপকারই হয়। আবার অনেকে কারণটা না বুঝেই ভাবি যে এগুলো ভুল, তাই ভালো’র জন্য করা নিষেধাজ্ঞা না মেনে নিজেদের ক্ষতি করি। যেমন বাচ্চা হওয়ার পর এক মাসের পরিচ্ছন্ন আঁতুড়ঘর মা আর শিশুর সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে কতটা প্রয়োজন, সেটা না বুঝে এক সময় হিন্দু বাড়িতে সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর একটা ঘরে, নোংরা পরিবেশে মা ও শিশুকে শাস্তি দেওয়ার মতো করে এক মাসের অশৌচ মানা হতো। আর পরবর্তীকালে আসল কারণটা না জেনে এটাকে অমান্য করতে গিয়ে প্রসূতি মা ও সদ্যজাত শিশুকে আড়াল না করে যে কেউ বাইরের কাপড়ে ধরা-ছোঁয়া করে ইনফেকশন সৃষ্টি করে দিতো। তাই আমি চেষ্টা করেছিলাম আমাদের প্রতিদিনের চলার জন্য যে, প্রাচীন নিয়মগুলো ঠিক মতো মানলে জীবনটা সুন্দরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেগুলোকে প্রবাসী কলমে লিপিবদ্ধ করে প্রথম উপন্যাস সবার হাতে তুলে দিতে। আর আমার এই প্রচেষ্টাগুলো আমি জানি শুধু আমি প্রবাসী হওয়ার জন্যই লিপিবদ্ধ করার তাগিদ পেয়েছিলাম।
তারপর একটা অন্যরকম ঘটনা আমাকে এদেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঙালি বা অধিবাসী মেয়েদের সংগ্রামের এক চিত্র তুলে ধরলো। আমাদের দেশের অনেক অভিভাবকই এখনও না জেনে, না যাচাই করে বিদেশে বসবাসকারী ছেলে দেখলেই তার সবচেয়ে যোগ্য মেয়েটিকেও বিয়ে দিতে একবারও ভেবে দেখেন না। এভাবে কত মেয়ে, বিশেষভাবে সুন্দরী মেয়েদের জীবন যে বাবা-মা নরকে ফেলে দিয়েছেন, সেটা আমি এদেশে এসে দেখেছি। বুয়েটের এক ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ছেলে দেখে এক সুন্দরী মেয়েকে মা-বাবা বিয়ে দিয়ে অটোয়া পাঠিয়ে দেয়। আর সেই মেয়েটার থেকে আমি প্রথম জানতে পারলাম যে, রিক্সাওয়ালা বা পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ ছাড়াও কোনো শিক্ষিত ছেলে নিজের বউকে শারীরিক নির্যাতন করতে পারে। আমি জানি মানসিক নির্যাতন যেকোনো শ্রেণির মানুষই করতে পারে, কিন্তু গায়ে হাত তোলা, সেটা যে শিক্ষিত কানাডায় বসবাসকারী কেউ করতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। তখন আমি ওই নির্যাতিত মেয়েটির কাছ থেকে ওর ওপর হওয়া নির্যাতন, তারপর সেখান থেকে পুলিশ, ফস্টার হোম এসব আরো অনেক কথা জানতে পারি। ওকে দেখতে আমি কোনো ফস্টার হাউসে প্রথম যাই এবং সেখানকার পরিবেশ, নিয়ম-কানুন এসব জানতে পারি। তখন আমি এ-ধরনের নির্যাতনের স্বীকার হওয়া একটা মেয়ে কীভাবে, কোথায়, কী ধরনের সাহায্য পেতে পারে, কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, এসব তথ্য সামনে রেখে আবারও সেই গল্প বলার ছলে পেন্সিলে ধারাবাহিকভাবে আমার ‘কুহু কথন’ উপন্যাসটি প্রকাশ করতে থাকি। এই ধারাবাহিক লেখাটি পেন্সিলে বিপুল পাঠক সমাদর পেয়েছে। অনেকে হয়তো এ-ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করতে হয়, সেই তথ্যগুলো তাদের জীবনে কাজে লাগাতে পেরেছেন। এই লেখাটি আমার সমাজ সচেতনতা জাগানোর জন্য একটা লেখা ছিল। আর এদেশে না এলে এ-ধরনের কোনো লেখা আমার কলম থেকে বের হতো না।
কবিতা তো মনের প্রতি ক্ষণের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। তবে আমার কবিতায় বেশিরভাগ জায়গাতেই হয়তো প্রবাসী বাঙালিদের কষ্টগুলো ফুটে ওঠেছে। তাছাড়া দু-দেশের প্রকৃতির নানা বৈপরীত্যের মাঝেও আমরা বাঙালিরা কীভাবে আমাদের বাংলা বর্ষবরণ, বাংলাদেশের বসন্তের প্রথম দিন, মানে পয়লা বৈশাখ বা পয়লা ফাল্গুন বরফে ঢাকা প্রকৃতিতে মনের ভিতর বা বাইরে দেশের আমেজে উদযাপন করি, সেসব বেশি করে আমার কবিতায় ধরা আছে। কবিতা তো আসলে শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ, এটা কোনো ভৌগোলিক সীমারেখার বাধা মানে না। আমি যেখানেই থাকি না কেন, আমার বাঙালি আবেগের ছবিগুলোই হলো আমার কবিতা।
যেহেতু দেশের বাইরে থাকি, তাই এখন অন্তর্জালেই বেশি লেখা হয়। অন্তর্জাল থেকেই বিভিন্ন কবির সাথে মিলে কবিতার বই, সনেটের সাময়িকী, এবং একটা চিঠির বই বের হয়। তাছাড়া বিভিন্ন সাময়িকীতে, খবরের কাগজে অন্তর্জালের পরিচয় থেকেই লেখা বের হতে থাকে। এভাবেই এই প্রবাসী বাঙালি আমি ধীরে ধীরে এদেশে এসে বাংলা ভাষার টানে লেখক হয়ে ওঠার জন্য সমুদ্রের কথা সংগ্রহ করছি।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জ শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স। তারপর কানাডাতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অটোয়াতে ঋরহধহপরধষ অহধষুংঃ হিসেবে সরকারি সংস্থায় চাকরিরত। প্রকাশিত উপন্যাস ‘হিয়া’, ‘কুহু কথন’, ছোটোগল্পগ্রন্থ ‘ডায়েরির ধূসর পাতা’, ‘পরিযায়ী প্রাণ’, কাব্যগ্রন্থ ‘বোধের ভাঙা গড়া’, ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’।

