প্রবাস জীবনের প্রথম করুণ-মধুর দিনগুলি
সেই কবে এসেছিলাম এদেশে, চোখে আশার আলো, আর অল্প বয়সের অজস্র স্বপ্ন বুকে নিয়ে! প্রথম পদক্ষেপ, মন্ট্রিয়লের বিমান বন্দর ডর্ভালে, ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল। শীত সে বছরের মতো বিদায় নিয়েছে। দাদার সাথে এলাম তাঁর এক কামরার এ্যাপার্টমেন্টে। বহুতল বাড়ি, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছে- হাঁটা পথ। যা দেখি, তাই মনে হয় চকচকে, ঝকঝকে। জব চার্ণকের আমলের শহর কলকাতার তুলনায় তো বটেই। আর কী পরিষ্কার- রাস্তা, বাড়িঘর! আকাশচুম্বী বাড়িগুলোতে একাধিক এলিভেটর। পরে দাদা পেন্ট-হাউসে নিয়ে গিয়ে নিজের ব্যাচিলর জীবনের এ্যাপার্টমেন্ট সগর্বে দেখালেন, মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত লম্বা কাচের জানালা দিয়ে পুরো ডাউন টাউন দেখা যায়। আরে, আমি তো ‘ডাউন টাউন’ কাকে বলে তাই জানতাম না তখন।
যাই হোক, দাদার সাথে পাড়ার ছোট্ট মুদি দোকানে গিয়ে দুধ, মাস্টার্ড, আরও কী কী সব কিনেছিলাম। দাদা আগেই স্যামন মাছ কিনে রেখেছিলেন। পরের দিন সেই মাস্টার্ড দিয়ে মাছ রান্না করলাম, ভাপা ইলিশের অনুকরণে। আমি তো তার আগে বিশেষ রান্নাবান্না করিনি, দেশে মা-দিদিদের আদরে ‘গোল্লায়’ গিয়েছিলাম। দাদা আর আমি খুব খুশি হয়ে সেই মাছ আর ভাত খেলাম, কিন্তু আমার ফরাসি বৌদির খুব একটা পছন্দ হয়নি। বেচারার আর দোষ কী, প্রথম বার বিদেশি খাবার খাওয়া। এদেশে এত অঢেল খাঁটি দুধ পাওয়া যায়, দেখে তো আমার চোখ ছানাবড়া! তা-ও আবার কাগজের প্যাকেজে। কিনে এনে পায়েস রান্না করতাম, আর দেশে আমার ছোটো ভাই-বোনেদের জন্য মন কেমন করতো। খাঁটি দুধ পাওয়া তখন খুব কঠিন ছিল কলকাতায়।
দাদা আমাকে ফোন আর ‘ইয়েলো পেজ’ (শহরের সব লোক আর কোম্পানির ফোন নাম্বার থাকত তাতে) দেখিয়ে দিয়ে বললেন “এবারে তুমি নিজের জীবন নিজে গড়ে নাও”। মনে হলো অগাধ জলে পড়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম কোনো মতে একটা ভালো ডিগ্রি করেই আবার দেশে ফিরে যাবো। দেশ থেকে বেশির ভাগ মেয়েরা এদেশে আসে তাদের বিয়ের পরে- স্বামীর আগ্রহ, আদরের এবং আকর্ষণের পাত্রী হয়ে। আমার সম্পূর্ণ অন্য রকম পরিস্থিতি ছিল। আমাকে মোটামুটি প্রথম থেকেই নিজে নিজে সব কিছু শিখতে হয়েছিল, বুঝতে হয়েছিল এবং বেশ বিরূপ অবস্থার সাথেও মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
দাদার সাথে প্রথম সুযোগেই গেলাম “প্লাস ভিল মারি” তে (Place Ville Marie), মন্ট্রিয়লের ডাউন টাউনের মাঝখানে সুন্দর ঝকঝকে বিল্ডিং-এ। সেখানে আমার নামে একটা ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট খোলা হলো। আর তার পরে গেলাম একটা রেকর্ডের দোকানে। তখন লং প্লেয়িং রেকর্ডের যুগ। দুজনে মহানন্দে দুটো রেকর্ড কিনলাম, একটা ‘পথের পাঁচালী’র বাজনা, আর অন্যটা রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামা’।
পরের দিন সকালে দাদা অফিসে যাওয়া-মাত্র আমার বৌদি শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। দু’সপ্তাহ পরে তার প্রথম শিশুর জন্ম হবে। তাই তার বিশ্রামের দরকার। আমি তো একেবারে হতভম্ব। মা-দিদিদের কাউকে কখনও দেখিনি শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতে। শত বিশ্রামের প্রয়োজনে বা অসুস্থতা সত্ত্বেও নয়। “প্রাইভেসি” শব্দটার নতুন অর্থ শেখা হলো। সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাত! এই এ্যাপার্টমেন্টে আমি ঘুমোতাম বাইরের ঘরের এক কোণে। মর্মাহত হয়ে সেই কোণে বসে আমি রেকর্ড চালিয়ে দিয়ে কাঁদতে লাগলাম। দেশে ফেলে আসা সবার জন্য আরও বেশি মন কেমন করতে লাগলো।
আমার ভাইপোর জন্মের পর পারিবারিক বন্ধু এবং প্রৌঢ় চিকিৎসক আমার বৌদি আর আমাকে একই সাথে শিশুর যত্ন সম্পর্কে সমস্ত কিছু শেখালেন। ফরমুলা তৈরি থেকে ডায়াপার বদল করা- সব কিছু। A to Z. বৌদি প্রথম দিন থেকেই তার ছেলেকে ফরমুলা খাওয়াত। এরপর থেকে প্রায় প্রতি শনি-রবিবারে দাদা ও বৌদি বেরোতেন বাজার করতে বা অন্য কাজে, অথবা ডিনারের নিমন্ত্রণে। সেই শিশু থাকতো আমার কাছে। আমার কান্না পেলে সে আমার মুখের দিকে তার নিষ্পাপ চোখ মেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো, আমি আর কাঁদতে পারতাম না। এমনি ভাবে সে আমার কাছে এলো এক দেবদূত হয়ে। সেই পবিত্র-মধুর সম্পর্ক আমাদের আজও আছে। আর একটা কথা মর্মে মর্মে বুঝলাম- এদেশের সামাজিক জীবন দম্পতি-কেন্দ্রিক। প্রাপ্তবয়স্ক বোন বা ননদ হিসেবে আমি সেখানে একান্তই বাড়তি, অবাঞ্ছিত। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমি নিমন্ত্রিত হতাম না। তবে এক ব্যতিক্রমী সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে। মন্ট্রিয়ল শহরের মাঝখানে মাউন্ট রয়্যালের মাঝামাঝি উচ্চতায় এক রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম দাদা-বৌদি আর ওদের আর এক বন্ধু দম্পতির সাথে। জাপানি রেস্টুরেন্টে খাওয়া আমার সেই প্রথম। খাবার টেবিল নিচু লেভেলে, মেঝের কাছাকাছি। কিন্তু বিস্মিত হলাম বসতে গিয়ে- তলায় অদৃশ্য গর্তে পা ঝুলিয়ে বসার ব্যবস্থা ছিল।
এরপর আস্তে আস্তে রাস্তাঘাট কিছুটা চেনা হলো। বাসরুটের ম্যাপ হাতে নিয়ে বাসে একা একা চলাফেরা করতে শিখলাম। আমার কাছে তো কোনো টাকা-পয়সা ছিল না, দাদা মাঝে মাঝে হাতে কিছু ডলার গুঁজে দিতেন। প্রথম প্রথম অবাক লাগতো যে গন্তব্য কাছেই হোক বা দূরেই হোক, বাস ভাড়া সমান। আর ট্রান্সফার বস্তুটা ভীষণ ভালো লেগেছিল। বাস বদল করতে হলে এক বাস থেকে নেমে সেখানেই অন্য বাসে ওঠতে পারি, একই টিকিটে। বোনের মতো বান্ধবী দুর্গার বাড়ি চলে যেতাম। ওর স্বামী তুলসী ইউনিভার্সিটি অব মন্ট্রিয়লে (Université de Montréal) ছাত্র ছিল, ওদের বাড়ি ছিল সেই ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি। ইউনিভার্সিটিতে শনিবার সন্ধ্যায় অনেক সময় হিন্দি মুভি দেখানো হতো, তাই দেখতে যেতাম তিনজনে, হেঁটে হেঁটে। গাড়ি ছিল না ওদের। রাতে থেকে যেতাম সেখানে।
সেই সময়ে পার্ট টাইম, সাময়িক চাকরির চেষ্টাও করতাম সমানে। যে-কোনো কাজ, যেমন লাইব্রেরিতে বই গোছানোর কাজ করতেও রাজি ছিলাম। কিন্তু সর্বত্র শুনতাম কলকাতা থেকে আমার এমএ ডিগ্রি ছিল বলে আমি ওভার-কোয়ালিফায়েড, আর টাইপ করতে জানতাম না বলে আন্ডার-কোয়ালিফায়েড। শেষ পর্যন্ত অবশ্য টাইপিং শিখেছিলাম দাদার প্রেরণায়। সারাজীবন কাজে লেগেছে সেই শিক্ষা।
একদিন আমি একাই ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে একজন প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে আমার কলকাতার ফিলসফিতে এমএ পরীক্ষার রেজাল্ট অর্থাৎ মার্কশিট দেখিয়ে রাজি করালাম আমাকে তাঁর সাথে পড়াশোনা করার অনুমতি দিতে। ঠিক হলো সেপ্টেম্বর মাসে আমি যথারীতি ম্যাকগিলে ভর্তি হবো। কিন্তু তা আর হলো কৈ? তখন জানতাম না যে বিধাতা আমার ভাগ্যে অন্য ধরনের জীবনযাত্রার পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।
আমার হার্ভার্ড ও এম-আই-টির স্নাতক, প্রতিভাসম্পন্ন আর্কিটেক্ট দাদা শিক্ষকতার জন্য সাদর আমন্ত্রণ পেলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবাতে, সুদূর শীতল উইনিপেগে। আমি কানাডাতে একেবারে নতুন, আর তখনও স্বাবলম্বী নই, তাই দাদা বললেন আমাকেও তাঁদের সাথে উইনিপেগে যেতে। এছাড়া আর উপায় কী ছিল? গেলাম সবাই উইনিপেগে। জীবনের আর এক অধ্যায়ের শুরু। পরে আর একবার কয়েক দিনের জন্য মন্ট্রিয়লে গিয়েছিলাম আমরা- বোধ হয় অক্টোবরে, এক্সপো ৬৭ দেখতে।
উইনিপেগে গিয়ে আমার প্রথম মোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা হলো। ঘরে সাদা-কালো টিভি ছিল, সেও প্রথম অভিজ্ঞতা। ‘ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই’ দেখেছিলাম তিন জনে। পরের দিন প্রথম সুযোগেই আমি ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবার সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে হাজির হলাম। আবার সেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম-এর মার্কশিট দেখিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে আমি ভালো ছাত্রী এবং পড়ার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র প্রফেসর ডক্টর জন এ্যাডেয়ার আমাকে বললেন শতকরা ৬০-৬৫ পেলে চলবে না, ৮০% বা ৯০% পেতে হবে। দেশের অভিজ্ঞতার ওপরে নির্ভর করে মনে মনে ভাবলাম “ভদ্রলোক কি পাগল? এম-এ বা পিএইচ.ডির ছাত্র-ছাত্রী কি অতো নম্বর পায়?” তবে অনুমতি পেলাম ভর্তি হওয়ার, সঙ্গে শিক্ষকদের রিসার্চে সহায়তা করার জন্য কাজ। তার উপার্জন থেকে আমার ভর্তির টাকা আর খাওয়া-পরা চলে যাবে। আমি তো উৎফুল্ল- যাক, এবারে এদেশে আসার সব মানসিক কষ্ট সার্থক হবে। পরে শতকরা ৮০ বা ৯০ বা আরও বেশি নম্বর পেয়ে ডক্টর এ্যাডেয়ারের প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পেরেছিলাম। নতুন সাবজেক্ট, তাই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সও অনেক নিতে হয়েছিল।

কিন্তু বাড়িতে একই করুণ অবস্থা চলতে থাকলো। আমার ফরাসি বৌদির ঈর্ষা হতো যে, আমি প্রায় এক বয়সি হয়েও সকালে ওঠে ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি, আর ও বাচ্চা মানুষ করার জন্য বাড়িতে থাকছে। ওর অভিজ্ঞতায় আঠারো বছর বয়সে ছেলে-মেয়েরা বাবা-মা’র স্নেহের নীড় ছেড়ে নিজের ব্যবস্থা নিজে করে। আর আমি, প্রাপ্তবয়স্ক বোন, দাদা-বৌদির বাড়িতে থাকছি! এমনটি তো হওয়া উচিত নয়। নানাভাবে ও আমাকে বোঝাতে চাইতো যে, আমি ওর সংসারে কতটা অবাঞ্ছিত। আর অন্য দিকে দাদা আমাকে ভারতীয় আদর্শ অনুযায়ী বলতেন ‘এটা তোমারও বাড়ি’। আমার অবস্থা যে একেবারে বুঝতেন না তা নয়, কিন্তু সাংসারিক শান্তি বজায় রাখাটাও দরকার ছিল, তাই পুরোটা স্বীকার করতেন না।
আমি কঠিন পরিশ্রম করতাম লেখাপড়ায় ভালো ফল করার জন্য। ভোর বেলায় ওঠে স্নান সেরে তৈরি হয়ে, নিজের জন্য একটা স্যান্ডুইচ বানিয়ে নিয়ে প্রচণ্ড ঠান্ডায় হেঁটে হেঁটে ইউনিভার্সিটিতে যেতাম। সকাল আটটায় ক্লাস শুরু হতো। পরে একজন বন্ধুর গাড়িতে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা করেছিলাম, সামান্য কিছু ডলারের বিনিময়ে। ভাগ্যিস! সেপ্টেম্বরের পরে ক্রমশ শীত বাড়তে শুরু করেছিল, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দুঃসহ ঠান্ডা। বাড়ি ফিরতাম সন্ধেবেলায়, নিজের খাবার নিজে রান্না করতাম- কারণ আমি মাংস খাই না জানা সত্ত্বেও বৌদি আমার জন্য অন্য কিছু রান্না করতো না। তারপর বাসন ধুয়ে রাখতাম, আমার ছোট্ট ভাইপোর সাথে একটু খেলা করতাম, ওকে একটু আদর করতাম, তারপর আবার নিজের ঘরে গিয়ে পড়তে বসতাম। পড়া শেষ হলে প্রতিদিন লম্বা লম্বা চিঠি লিখতাম দেশের সবাইকে- মা, দিদিদের আর ছোটো ভাই-বোনেদের। চোখের জলে এয়ারোগ্রামের নীল কাগজ ভিজে যেতো।
শেষ পর্যন্ত আমি এই পরিস্থিতি আর সহ্য করতে না পেরে দাদার অমতে অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে এক প্রৌঢ় দম্পতির বাড়ির তিনতলার একটি ছোটো ঘরে চলে গেলাম। সেখানে বাথরুম ছিল দোতলায়, আর রান্না-খাওয়া ও বাসন ধোয়ার জল ছিল একতলায়। তাই সই, শান্তি তো ছিল। আমার ক্লাসের বান্ধবী মেরিয়ন ঘর খোঁজা আর একমাত্র সম্বল স্যুটকেসটি নিয়ে আমাকে বাড়ি-বদল করতে সাহায্য করলো। দাদা ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরে এই খবর জানতে পারলেন। আমিই ফোন করলাম। দাদা আর আমি দুজনেই কাঁদতে লাগলাম, কিন্তু আমি দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে বৌদির সংসারে অসন্মানের জায়গায় আর ফিরে যাবো না। তার পরে কিন্তু প্রতি উইকেন্ডে দাদা এসে আমাকে নিয়ে যেতেন, আবার রবিবারে সন্ধেবেলা আমাকে নিজের ঘরে পৌছে দিয়ে যেতেন। এই সময়ে বৌদির ব্যবহারের অনেক উন্নতি হয়েছিল।
এবারে বলি ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিকের অভিজ্ঞতার কথা। দেশে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করলেও কখনও ইংরেজিতে কথা বলার প্রয়োজন হয়নি। পরীক্ষা দিয়েছি ইংরেজিতে, কিন্তু লিখে। কাজেই লজ্জা করতো, অনভ্যাসের জন্য কনফিডেন্সের অভাব হতো। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সূক্ষ্ম nuance গুলো বুঝতাম না। যেমন “Would you like to do this?” তার আসল অর্থ “আমি চাই এটা তুমি কর”- তা আমি তখন বুঝতাম না। বুঝতাম না যে ‘like’ কথাটা শুধু ভদ্রতার খাতিরে। ক্লাসে সবার সামনে কখনও প্রশ্ন করতাম না। নিজের ভারতীয় accent সম্পর্কে যেমন সচেতন ছিলাম, তেমনি কোনো কোনো প্রফেসরের জার্মান বা এ্যামেরিকান এ্যাকসেন্ট বুঝতে বেশ অসুবিধা হতো। কিছু বুঝতে কষ্ট হলে পরে সেই প্রফেসরের সাথে পরে দেখা করে বুঝে নিতাম।
ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে প্রথম দিনে আমি ঘুরে ঘুরে সব জায়গাগুলো চেনার চেষ্টা করছিলাম- কোথায় ব্যাঙ্ক, কোথায় ডাকঘর, কোথায় বুক-স্টোর, কোথায় ক্যান্টিন। ঘুরতে ঘুরতে এক সময়ে ‘ফরেন স্টুডেন্টস’ এ্যাডভাইজারের’ অফিসে পৌঁছে গেলাম। সেখানে একটি বাঙালি ছাত্রের সাথে পরিচয় হলো, কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করছে। শুনলাম ক্যাম্পাসে আমরা দুজনেই শুধু বাঙালি। তারপরে তার সাথে এখানে ওখানে দেখা হতো, বাংলায় কথা বলার আনন্দে দুজনের বন্ধুত্ব হতেও দেরি হলো না। বৌদির জন্য দাদা আর আমি বাড়িতে বাংলায় কথা বলতাম না।
পরে জেনেছিলাম সেই মানুষটি পাটনায় জন্মেছিল। ওখানে ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করে দু’এক বছর স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ানোর পরে বম্বেতে ভাবা পারমাণবিক ইনস্টিট্যুটে কাজ করতে করতে বিদেশে আসার পরিকল্পনা করেছিল। আসলে পারমাণবিক গবেষণাই ছিল তার কর্ম-জীবনের সবচেয়ে বড়ো উচ্চাশা। পরে কর্মজীবনে কানাডার “নিউক্লিয়ার সেফটি কমিশনে” (পুরনো নাম ছিল এ্যাটমিক এনার্জি কন্ট্রোল বোর্ড) বহু বছর সসন্মানে কাজ করেছিল। এই সূত্রে সে আনস্কিয়ার (UNSCEAR OR United Nations Scientific Committee on Atomic Radiation) এবং আই-এ-ই-এ (IAEA – International Atomic Energy Agency) এই দুই প্রতিষ্ঠানে আজীবন কানাডা সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
আমাদের বন্ধুত্ব পরে আমাদের নিয়ে যায় সুখী দাম্পত্য-জীবনে। আমার ভাবী স্বামীকে ছেড়ে একটা ডিগ্রি করেই দেশে ফিরে যাওয়ার পূর্ব-পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হলো। সে আমাকে বোঝালো যে, তার কর্মজীবনের উচ্চাশা কানাডাতে যেমন পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা, দেশে ফিরে গেলে তেমন সম্ভাবনা থাকবে না। অগত্যা দুজনেই রয়ে গেলাম কানাডাতে। বিয়ে হলো উইনিপেগে, দাদার বাড়িতে- একজন স্ট্যাটিস্টিক্সের প্রফেসরের কাছে হিন্দু বিয়ের মন্ত্র ছিল, তিনিই পৌরহিত্য করলেন।
কিছুদিন পরে আমাদের আদরের শিশুকন্যার জন্মের পরে আমি লেখাপড়া মাঝপথে স্থগিত রেখেছিলাম। কারণ, আমার মেয়েকে আমিই মানুষ করবো, বেবি-সিটার বা ডে-কেয়ারের কর্মীরা করবে না- এটাই সংকল্প ছিল। পরে যখন সে সারা দিন স্কুলে যাওয়ার মতো বড়ো হলো, তখন আবার লেখাপড়া শুরু করলাম। ততদিনে সব কোর্সের ক্রেডিট হারিয়েছি, তাই আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হলো। অনেক বাধা, অনেক বিঘ্ন ছিল সেই যাত্রা পথে। একমাত্র আমার স্বামীর সহায়তা আর উৎসাহে আমি পিএইচ.ডি শেষ করতে পেরেছিলাম। মন খারাপ হলে বলতো “তুমি তোমার নিজের জন্য পড়াশোনা করছ না, তোমার বাবা আর আমার বাবার জন্য করছ।” আসল দুর্বলতার জায়গায় জাদুকাঠি ছুঁইয়ে দিয়েছিল তার এই অনুপ্রেরণা।

আমাদের দুজনের বন্ধুত্ব দৃঢ় হয়ে বিয়ের সম্ভাবনার দিকে এগোবার অনেক আগে থেকে একটা কথা বুঝতে কষ্ট হয়নি যে, সেই সময়ে ক্যাম্পাসে অবিবাহিত, অল্পবয়সী, শাড়ি-পরা, লম্বা বিনুনী-দোলানো একমাত্র বাঙালি মেয়ে হিসেবে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। বাঙালি এবং কেনেডিয়ান কোনো কোনো যুবকের আমার সাথে আলাপ-পরিচয়ের প্রবল আগ্রহের আভাস তখন পেয়েছি। ‘ডেটিং’ সম্পর্কে আমার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। সেই আগ্রহী দু’একজনের সাথে দু’একবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়েছি। আরও বেশি ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে আমার উৎসাহের (এবং অভিজ্ঞতার) অভাব দেখে তারাও ঐ দু’একবারের পরে উৎসাহ হারাতো। এও আর এক ধরনের সাংস্কৃতিক সমঝোতা। আমার হবু-স্বামী ও আমার, দুজনের দুজনকে কথা দেবার পরেও এক সহপাঠী একদিন আমাকে তার বিশেষ আগ্রহের কথা বলেছিল। আমি তাকে বুঝিয়েছিলাম যে, আমি বাগদত্তা।
এমনিভাবে কাটলো নতুন দেশে নতুন অভিজ্ঞতার বোঝা বয়ে প্রথম কয়েকটা বছর। তার পর? অভ্যস্ত হয়ে গেলাম-শুকনো বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার নিতেই এখন ভালো লাগে। ইংরেজিতে আড্ডা দিতে অসুবিধা হয় না। কর্মসূত্রে দেশে-বিদেশে ইংরেজিতে অসংখ্য প্রেজেন্টেশন দেওয়ার পরে সেটা এখন জল-ভাত। ভালো লাগে এখানকার সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, সিভিক সেন্স, সোজা পথে সব কিছু করতে পারা। প্রায় ষাট বছর এদেশে কাটিয়ে এখন এদেশটাকেও ভালোবাসি। মাতৃভূমির মতো না হলেও এটাও অকৃত্রিম ভালোবাসা।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম বাংলার আরামবাগে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে। পরে ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা থেকে মনস্তত্বে স্নাতকোত্তর এবং অটোয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন। কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারে দীর্ঘদিন গবেষণা-কাজে নিযুক্ত ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ডজনখানেক বইয়ের লেখক। সর্বশেষ বই ‘একটি বাঙালি মেয়ের কানাডার জীবন কাহিনি’।

