বাংলা মিডিয়া, প্রবাসজীবন এবং কানাডার এথনিক সাংবাদিকতা
বাংলাদেশে দীর্ঘ সাংবাদিকতা ও নির্মাণশিল্পের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছিল সত্যকে অনুসরণ করতে হয় হৃদয় দিয়ে, আর তার বিশ্লেষণ করতে হয় যুক্তি দিয়ে। কিন্তু কানাডায় এসে প্রথমবার উপলব্ধি করলাম সাংবাদিকতার আরেকটি বড় পরিসর রয়েছে সেটি হলো অভিবাসীদের জীবন, স্মৃতি, সংগ্রাম ও দৈনন্দিন বাস্তবতাকে ধরে রাখা। কানাডায় প্রথম কয়েক বছর আমি দেখলাম বাংলা সংবাদমাধ্যম যেন দুটো জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। খবরের বেশিরভাগই বাংলাদেশকেন্দ্রিক, অথচ এখানে লাখো বাঙালির প্রতিদিনের যন্ত্রণা, উদ্বেগ, সংগ্রাম ও অর্জনগুলো কোথাও নথিবদ্ধ হচ্ছে না।
যোগাযোগবিজ্ঞানের খ্যাতিমান গবেষক এলিহু কাটজ তাঁর ‘ইউসেস অ্যান্ড গ্র্যাটিফিকেশনস থিউরি’তে বলেন, মানুষ সবসময় এমন গণমাধ্যম খোঁজে যা তার প্রয়োজন, আকাক্সক্ষা এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই তত্ত্ব দিয়ে প্রবাসী বাঙালির অবস্থা ব্যাখ্যা করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, মানুষ এমন সংবাদমাধ্যমের অভাব অনুভব করছিল যা তাদের নিজের অভিজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করবে, তাদের কথা বলবে এবং তাদের সংকটকে গুরুত্ব দেবে। এই শূন্যতা উপলব্ধি করেই ২০০৬ সালের ১ জুলাই অনাড়ম্বরভাবে শুরু করি অনলাইন বাংলা নিউজ পোর্টাল- বেঙ্গলি টাইমস। কয়েকজন তরুণ সহযোদ্ধা, খুব সীমিত অর্থ, মাত্র দু’টি ল্যাপটপ- একটি আমার দখলে অন্যটি ছিলো ওয়েব মাস্টারের কাছে। কিন্তু হৃদয়ে ছিল কানাডা-প্রবাসীদের নিয়ে কথা বলার এক গভীর দায়বোধ। এই প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠার পেছনে আরেকটি তাত্ত্বিক উপলব্ধি কাজ করেছিল। জার্মান দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইউর্গেন হাবেরমাস গণপরিসরকে ব্যাখ্যা করেছেন এমন একটি সামাজিক ক্ষেত্র হিসেবে, যেখানে মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করে, মতামত তৈরি করে এবং সামাজিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সম্পৃক্ত করে। সেই বিবেচনায় প্রবাসী বাঙালিদের এমন গণপরিসর ছিল না। বেঙ্গলি টাইমস সেই আলোচনার দরজা খুলে দেয় মাত্র।
প্রথম দিকের প্রতিবেদনে ছিল ভাড়া বাড়ির সংকট, নিম্ন আয় চাকরিতে বৈষম্য, ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকলে লিজ পাওয়া না পাওয়া, শীতের বিষণ্ণতা, অভিবাসন ব্যবস্থার জটিলতা, ভাষাগত দুর্বলতা থেকে উদ্ভূত লজ্জা, কানাডায় সন্তান পালনের নতুন চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো কমিউনিটি সংবাদগুলো। কমিউনিটি ইভেন্টের সংবাদ ও ছবি ফলাও করে প্রকাশ করা হতো। প্রকাশ করা হতো ফটো এ্যালবাম। আর কানাডায় বসবাসরত লেখকেরা লিখতেন নিয়মিত। এসব লেখা ছিল প্রবাসী মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার সত্যনিষ্ঠ বয়ান। মানুষ প্রথমবার নিজেদের জীবনের প্রতিফলন দেখতে পেল সংবাদে, আর আমরা প্রথমবার বুঝতে পারলাম আমাদের কলম আসলে মানুষের বুকের ভেতরের চাপা কান্নার সঙ্গী হয়ে ওঠতে পারে। হয়ে ওঠতে পারে তার আনন্দ-বেদনার সহযাত্রী।
এখানেই আমেরিকান যোগাযোগ গবেষক ম্যাক্সওয়েল ম্যাককম্বস এবং ডোনাল্ড শ এর এজেন্ডা সেটিং তত্ত্বটি বাস্তবে উপস্থিত হয়ে যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, গণমাধ্যম তখনই সফল হয় যখন কোনো বিষয়কে গুরুত্ব দিলে তা সমাজের আলোচ্য ইস্যু হয়ে ওঠে এবং হয়। বেঙ্গলি টাইমস দেখিয়ে দেয় যে প্রবাসীদের সমস্যাগুলো ব্যক্তিগত নয়, বরং সমষ্টিগত। যখন আমরা ধারাবাহিকভাবে লিখলাম ভাড়াবৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অভিবাসন প্রক্রিয়ার বিলম্ব, নতুন প্রজন্মের পরিচয় সংকট নিয়ে, তখন অনেকে নতুন চিন্তার খোরাক পেতে শুরু করেন, ল্যাপটপ-কিংবা ডেস্কটপ থেকে আলোচনা গড়িয়ে যায় বাংলাটাউন ড্যানফোর্থের চায়ের টেবিলে কিংবা উইকেন্ডের জমপেশ পার্টিতে। বাংলাদেশের খবরতো না চাইতেই ধরা দেয় সবখানে, চিন্তার জালে শক্তিশালী স্পাইডার হয়ে বসে যায় বেঙ্গলি টাইমস-এর মূলধারা ঘেষা সাংবাদিকতা।
খুব অল্প সময়ে কানাডার বাংলাদেশীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই অনলাইন জার্নালটি। টানা দুইবার অনলাইন সাংবাদিকতায় বেঙ্গলি টাইমস লাভ করে এথনিক প্রেস এন্ড মিডিয়া কাউন্সিল অব কানাডার এ্যাওয়ার্ড।
২০১২ সালে সাপ্তাহিক বাংলামেইল আমাকে প্রবাসী সাংবাদিকতার পুরোনো ধারা ও নতুন বাস্তবতার মাঝে সেতুবন্ধনের সুযোগ করে দেয়। সংবাদপত্র কেবল খবর নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক দলিল। ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক রেমন্ড উইলিয়ামস বলেন, অভিবাসীরা তাদের ভাষা, স্মৃতি এবং পরিচয় ধরে রাখার জন্য নিজস্ব মাধ্যম রচনা করে। বাংলামেইল সেই মাধ্যম হয়ে ওঠে। আমরা প্রবাসী জীবনের অসংখ্য স্তর নথিবদ্ধ করি। এখানেও বিষয় হয়ে ধরা দেয় পরিবারের পুনর্গঠন, শিশুপালনের নতুন বাস্তবতা, অর্থনৈতিক স্থিতি অর্জনের সংগ্রাম, ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন ফি সংকট, বাড়িভাড়ার চাপ, নতুন পেশা শেখার সংগ্রাম এবং সর্বোপরি অভিবাসী জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কালচারাল কনফ্লিক্ট। এসব গল্প ভবিষ্যতের জন্য একেকটি প্রামাণ্য ইতিহাস। কোনো এক সন্ধ্যায় বেজমেন্টে বসে থাকা একজন অভিবাসী বাবা যখন কাগজ হাতে নিয়ে নিজের মতো আরেকজন মানুষের গল্প পড়তে পড়তে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, আমরাই তো! তখন বুঝেছি আমাদের শ্রম বিফল হয়নি। পত্রিকা বিতরণে সামান্য দেরি হলে যখন ফোনের পর ফোন আসতে থাকে তখন মনে হয় প্রতি সপ্তাহে ৫৬ পৃষ্ঠার এই আয়োজন প্রবাসী জীবনের ভালোবাসার অন্যরকম প্রকাশ। এ এক অন্যরকম ভালোলাগা!
কানাডায় বাংলা মিডিয়ার এই যে বিকাশ সেটা বোঝার জন্য এথনিক মিডিয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতাকে মনে করা জরুরি। জাতীয় গ্রন্থাগার ও মিডিয়া গবেষকদের তথ্য অনুসারে, ১৮৯০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে কানাডায় প্রায় একশোর বেশি এথনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। প্রথম দিকের ইউক্রেনীয় কানাডিজস্কি ফার্মার, ইয়িদ্দিশ দর কেনেদার অ্যাডলার, ইতালীয় ইল বোলেত্তিনো এবং জার্মান বার্লিনার জার্নাল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ১৯১১ সালের আদমশুমারির তথ্য বলছে, তখন কানাডার প্রায় বাইশ শতাংশ মানুষই অ-ইংরেজিভাষি অভিবাসী ছিল। ফলে তাদের ভাষায় সংবাদমাধ্যম হওয়া ছিল যোগাযোগের মৌলিক প্রয়োজন এবং পরিচয় রক্ষার প্রধান অবলম্বন।

১৯৭১ সালে কানাডার মাল্টিকালচারাল নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এথনিক মিডিয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় ১৯৭১ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে এথনিক সংবাদপত্র ও রেডিও টিভি প্রতিষ্ঠার সংখ্যা অন্তত দ্বিগুণ হয়। ১৯৯০-এর দশকে এসে কানাডায় প্রায় পাঁচ শতাধিক এথনিক পত্রিকা ছিল সত্তরটিরও বেশি ভাষায়। এর মধ্যে দক্ষিণ এশীয় মিডিয়ার বৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে টরন্টো, মন্ট্রিয়ল এবং ভ্যাঙ্কুভারে পাঞ্জাবি, তামিল, হিন্দি এবং বাংলায় গড়ে ওঠে নতুন নতুন গণমাধ্যম। এই ইতিহাসের ধারায় বাংলা মিডিয়ার উত্থান কেবল সময়োপযোগী নয়, বরং এক ধরনের কাঠামোগত বিবর্তন। কারণ বাংলা মিডিয়া শুধু ভাষা সংরক্ষণ করেনি, অভিবাসী সংগ্রামী জীবনের একটি সময়কে সযতনে ধারণ করেছে। প্রবাসী বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং পরিচয় রক্ষার এক ধারাবাহিক দলিল।
উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপে অভিবাসনের অল্প কিছু ধারা থাকলেও মূলত সত্তর দশকের পর থেকেই প্রবাসী বাংলা সাংবাদিকতার প্রকৃত পথচলা শুরু হয়। ১৯৭০ দশকে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে ব্যাপক অভিবাসন এবং ১৯৮০ দশকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের স্থায়ী বসতি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় প্রবাসী বাংলা সাংবাদিকতার প্রথম যুগ। ১৯৭৮ সালে যুক্তরাজ্যে জনমত পত্রিকা, ১৯৮১ সালে নিউইয়র্কে থার্ড আই নামের ছোট ট্যাবলয়েড এবং ১৯৮৬ সালে সৌদিআরবে শ্রমিকদের তৈরি স্টেন্সিল করা বাংলা নিউজলেটার- এসবই ছিল প্রবাসে বাংলা সংবাদমাধ্যমের প্রথম দৃশ্যমান রূপ। সে সময় পাঠকসংখ্যা ছিল সীমিত। তবুও ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে ছোট ছোট নিউজ বুলেটিন প্রবাসী জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়।
নব্বই দশকে অভিবাসী সম্প্রদায়ের দ্রুত বৃদ্ধির ফলে বাংলা সংবাদপত্রের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি জনসংখ্যা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি বাংলা সংবাদপত্রের প্রসার ঘটায়। বিশেষ করে নিউইয়র্কে ২০০০ সালের আগে ও পরে দশটির বেশি নিয়মিত বাংলা পত্রিকা চালু হয়, যার মধ্যে কয়েকটি তখন সাপ্তাহিক ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার কপি পর্যন্ত মুদ্রণ করত। ইতালিতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা যখন পনেরো হাজার ছাড়ায়, তখন রোমে দুটি বাংলাদেশি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং দুবাইতে প্রায় বারো থেকে পনেরো লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক থাকায় প্রবাসে বাংলা সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি শক্তিশালী পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়। যদিও মুদ্রিত পত্রিকা সেখানে খুব স্থায়ী হয়নি, কিন্তু ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় অনলাইন সংবাদপত্র সেখানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ঠিক একই সময়ে প্রবাসী বাংলা সাংবাদিকতার একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে কানাডা। বর্তমানে শুধু টরন্টোতে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার, আর সারা কানাডায় এই সংখ্যাটি দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছে। এই বিশাল পাঠকশ্রেণিকে কেন্দ্র করে কানাডায় একাধিক পেশাদার বাংলা পত্রিকা, টেলিভিশন এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল গড়ে ওঠে। ২০১৬ সালে কানাডার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে ‘এনআরবি টিভি’ যুক্ত হয়, আর এর আগে দ্য বেঙ্গলি টাইমস এবং উইকলি বাংলামেইল প্রবাসী পত্রিকাগুলোর সর্বোচ্চ প্রচারসংখ্যার অবস্থানে পৌঁছে যায়। কানাডার বহুসংস্কৃতিবাদী নীতি সাংস্কৃতিক সংবাদমাধ্যমকে উৎসাহিত করায় প্রবাসী বাংলা সাংবাদিকতা এখানে আরও পেশাদার, স্থায়ী এবং নীতিনির্ভর রূপ লাভ করে।

এই সব অভিজ্ঞতা এবং প্রেক্ষাপট মিলিয়ে ২০১৬ সালে এনআরবি টিভি চালু করার সময় আমার উপলব্ধি স্পষ্ট ছিল যে প্রবাসী যোগাযোগ এখন আর শুধু স্থানীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক অভিবাসনের বাস্তবতায় বাংলা ভাষাভাষি মানুষের সংবাদ প্রবাহকে বহুজাতিক মাত্রা দিতে হবে। ভারতীয় নৃতত্ত্বববিদ অরবিন্দ আপাদুরাই তাঁর ট্রান্সন্যাশনাল মিডিয়া সার্কিট তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে যে, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মিডিয়া এক দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা একই ভাষাভাষি মানুষকে একই সাংস্কৃতিক প্রবাহে যুক্ত করে। এনআরবি টিভি সেই প্রবাহের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। কানাডায় তৈরি হওয়া একটি সাক্ষাৎকার বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ার বাঙালিদের কাছে একই মুহূর্তে পৌঁছে যায়। এই যোগাযোগ ভৌগোলিক দূরত্বকে ভেঙে দেয় এবং একটি বহুকেন্দ্রিক প্রবাসী পরিচয় নির্মাণ করে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি দেখেছি প্রবাস জীবন কখনো শুধুই সুখ বা সফলতার গল্প নয়। এখানে আছে অপেক্ষা, হতাশা, বৈষম্য, একাকিত্ব, সংগ্রাম এবং আবার নিজ শক্তিতে ওঠে দাঁড়ানোর ইতিহাস। দেশে ছিলেন ডাক্তার, এখানে এসে ট্যাক্সি চালান। দেশে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, এখানে এসে রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। একজন দেশে সাংবাদিকতায় কাজ করতেন, এখানে এসে ম্যানুয়াল শ্রমের কাজ নেন। আবার অনেকেই এই দেশেই নতুন পেশা খুঁজে পান, নতুন স্বপ্ন দেখেন, সন্তানের চোখে ভবিষ্যতের আলো দেখেন। এই অভিজ্ঞতার মাঝে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মানুষকে বলে দেয় যে তাদের অভিজ্ঞতা অর্থহীন নয়, সমাজের কাছে সবসময়ই দৃশ্যমান। পরিচয় পুনর্গঠন তত্ত্বে বলে, মানুষ নতুন দেশে এসে নিজের পরিচয়কে পুনর্গঠন করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ায়। গণমাধ্যম সেই পুনর্গঠনের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে, কারণ মানুষের গল্প যখন প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয়, তখনই তা সমাজের স্বীকৃতি পায়।
কানাডার বাংলা মিডিয়া তাই শুধুই সংবাদমাধ্যম নয়, প্রবাসী মানুষের সংকটের ভাষা, সাফল্যের দলিল, সামাজিক ন্যায্যতার দাবি, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রমাণ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সমষ্টিগত স্মৃতি। এখানে সংগ্রাম আছে, আবার আছে পুনর্জাগরণ। এখানে ব্যর্থতা আছে, আবার আছে নতুন করে ওঠে দাঁড়ানোর সাহস। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়, ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।’ প্রবাস জীবনের ভেতর তাকালে দেখা যায় এই অসীমের চিরবিস্ময় মানুষকে শক্তি দেয়, আর সেই শক্তির ইতিহাসই গণমাধ্যম ধরে রাখে। কানাডার একশ পঞ্চাশ বছরের এথনিক সাংবাদিকতার ধারায় বাংলা সাংবাদিকতা এখন সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল, গভীর এবং বহুজাতিক রূপে আবির্ভূত হয়েছে।
একাডেমিক আলোচনার ক্ষেত্র থেকেও প্রবাসী বাংলা মিডিয়াকে আলাদা করে দেখা যায় না। ডায়াসপোরা স্টাডিজের অনেক গবেষক মনে করেন যে, নিজস্ব ভাষার সংবাদমাধ্যম আসলে দুটি ভূখণ্ডের মধ্যে একটি সেতু সৃষ্টি করে। একদিকে থাকে মাতৃভূমি, অন্যদিকে বর্তমান আবাসভূমি। এই দুইয়ের টানাপোড়েন, আবেগ, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির জটিল সম্পর্ক প্রতিদিনের সংবাদ, ফিচার, সম্পাদকীয় এবং টক শোর মধ্যদিয়ে প্রকাশ পায়। ফলে বাংলা মিডিয়া কেবল তথ্যের বাহক নয়, এটি এক ধরনের সেতুবন্ধন। এখানে একদিকে থাকে গ্রামের নোনাজলমাখা মাটির গন্ধ, অন্যদিকে থাকে টরন্টোর তুষারঢাকা রাস্তা, সাবওয়ের কোলাহল আর অফিসফেরত ক্লান্ত মানুষের নিঃশ্বাস। এই দুই অভিজ্ঞতা যখন একই স্ক্রিনে, একই পাতায়, একই আলোচনায় উপস্থিত হয়, তখনই প্রবাসী পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন ধীরে ধীরে এথনিক এবং ডায়াসপোরা মিডিয়া নিয়ে গবেষণা বাড়ছে। অনেক গবেষক বাংলা মিডিয়াকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে ব্যবহার করছেন, কারণ এটি একই সঙ্গে কমিউনিটি জার্নালিজম, ট্রান্সন্যাশনাল কানেকশন এবং অভিবাসী রাজনীতির বাস্তব উদাহরণ। বিজ্ঞাপনদাতা, নীতিনির্ধারক এবং মূলধারার গণমাধ্যমও বুঝতে শুরু করেছে যে এথনিক কমিউনিটির সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ স্থাপন করতে হলে বাংলা মিডিয়ার মতো মাধ্যমকে সম্মান জানাতে হবে, অংশীদার করতে হবে। এই সম্মান কেবল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, এটি পুরো কমিউনিটির জন্য মর্যাদার বিষয়।
কানাডা-জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে সংবাদমাধ্যম আসলে মানুষের আস্থার জায়গা। যখন কেউ ভোরবেলা কাজের পথে বেরোনোর আগে দরজার ফাঁক দিয়ে রাখা পত্রিকা তুলে নিয়ে দেখতে চান নিজের কমিউনিটির খবর, তখন তিনি কেবল সংবাদ পড়েন না, নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি খোঁজেন। যখন সন্ধ্যায় ক্লান্ত মানুষ ইউটিউবে বা টেলিভিশনে নিজের ভাষায় তৈরি কোনো প্রতিবেদন দেখেন, তখন তিনি মনে মনে বলেন, কেউ আছে যে আমার কথা ভাবে! এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাংলা মিডিয়া সেই অনুভূতিকে প্রতিদিন নতুন ভাষা দেয়, নতুন বাক্য দেয়, নতুন সাহস দেয়। সামনে যে প্রজন্ম আসছে, তারা হয়তো আরও ডিজিটাল, আরও দ্রুত, আরও বিচ্ছিন্ন হবে। কিন্তু যদি তারা নিজের ভাষায় নিজের গল্প শোনার সুযোগ পায়, তবে তারা কখনোই শিকড় ভুলে যাবে না। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি এখনও লিখে যাই, নির্মাণ করে যাই এবং স্বপ্ন দেখি, প্রবাসী বাংলা মিডিয়া আগামী দিনে আরও শক্তিশালী, আরও মানবিক এবং আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠবে। মজার বিষয় হলো সাংবাদিকতার শক্তি এখানেই, এটি শুধু খবর দেয় না, মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করে, তাকে মর্যাদা দেয়।
আমার কাছে কানাডায় বাংলা মিডিয়ার যাত্রা তাই একটি মানবিক, তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক এবং একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাভাষি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের যাত্রা। এই যাত্রায় প্রতিটি পাঠক, প্রতিটি অভিবাসী, প্রতিটি ছোট সংবাদই হয়ে ওঠেছে একটি বিশাল ইতিহাসের সূক্ষ্ম সুতো। সেই সুতোগুলো একত্রে বুনে যে নকশা তৈরি হয়, তার নামই কানাডার বাংলা মিডিয়া।
লেখক পরিচিতি
একাধারে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় নিবেদিত। কানাডায় প্রবাসী প্রায় ২১ বছর। ‘এনআরবি টিভি’র সিইও এবং ‘সাপ্তাহিক বাংলা মেইল’ পত্রিকার সম্পাদক। বেটা ফরমেটের ফিল্ম ‘দেবদাস’ নির্মাণ করে আলোচনায় আসেন ২০০২ সালে। লিখেছেন অনেক গ্রন্থ। প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে- ‘হৃদয় ছুঁয়ে যায়’, ‘ভালোবাসায় প্রথম ছোঁয়া’, ‘ছায়ামানবী’, ‘ক্যাম্পাসের ভালোবাসা’, ‘বাজিমাত’, ‘ডেটলাইন একাত্তর’, ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পেয়েছেন কানাডার ন্যাশনাল প্রেস এন্ড মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড, কানাডা হেরিট্যাজ এ্যাওয়ার্ড-সহ অসংখ্য পুরস্কার।

