বাঙালের কানাডা আগমন
কৈশোরে দুটো কবিতা পড়েছিলাম উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর, ‘Yarrow Unvisited’ এবং ‘Yarrow Visited’. Yarrow নদীকে দেখার আগে কবি-কল্পনায় তার যে ছবি এঁকেছিলেন Yarrow Unvisited কবিতায় সেই নদীকে দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা (Yarrow Visited) আগের কল্পনার সঙ্গে মেলেনি। এরকম অভিজ্ঞতা আমারও আছে। কানাডায় আসার পরে দেখলাম যে আমার কল্পনার কানাডার সঙ্গে বাস্তবের কানাডা মেলেনি।
রাজস্থানে মেয়েদের কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে আমি এবং আমার স্ত্রী (ডক্টর শিপ্রা) ২০০৬ সালের ১০ মার্চ স্থায়িভাবে থাকার জন্য কানাডায় আসি। মেয়ে পারমিতা এবং জামাতা বিশ্বজিৎ আমাদের স্পন্সর করায় প্রথমে আমরা Greater Toronto Area-র ব্র্যাম্পটন শহরের গোল্ডেন গেট ড্রাইভের বাড়িতে আসি। শহরের এই অঞ্চলকে বলা হয় ‘G’ section। বড়ো বড়ো রাস্তা ছাড়া এখানকার সব রাস্তার নাম ‘জি’ দিয়ে শুরু হয় গ্রেনোবল বুলেভার্ড, গ্রিনব্রিয়ার রোড ইত্যাদি। এই গোল্ডেন গেট ড্রাইভ রাস্তাকে এক কথায় মিনি ওয়ার্ল্ড বলা যায়। এখানে ইন্ডিয়ান ছাড়া আফ্রিকান, ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, ফিলিপিনো, কানেডিয়ান আর্জেন্টিনান, মেক্সিকান এবং অন্যান্য দেশের মানুষের বাস। এলাকাটা আক্ষরিক অর্থে কসমোপলিটান। এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে বচসা, ঝগড়া, গন্ডগোল খুব একটা দেখিনি। আপাত-ব্যবহারে সবাই ভদ্র, দেখা হলে অপরিচিতরাও ‘হায়’, ‘হ্যালো’, ‘গুড মর্নিং’ বলে সম্বোধন করে। অবশ্য এসব আলাপ খুবই ফরমাল। এখানে অপরিচিত কারো বাড়িতে কেউ বিশেষ যায় না এবং অপরিচিত কাউকে বড়ো একটা বাড়িতে ডাকেও না। পরিচিতদের মধ্যে যাওয়া আসার ব্যাপার আছে। তবে সেটা আগের থেকে খবর দিয়ে, হঠাৎ করে না জানিয়ে কারুর বাড়ি যাওয়ার চল নেই।
তো, প্রথমেই যে প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ হলো, তিনি আমাদের পাশের বাড়ির মিস্টার ক্লাইক। ভদ্রলোক জামাইকান, খুব সজ্জন ও পরোপকারী এবং পক্ষীপ্রেমী। দোতলা বাড়িতে সস্ত্রীক থাকতেন। ওদের ছেলেমেয়ে সবাই প্রতিষ্ঠিত এবং এই শহরের বাসিন্দা, কিন্তু সবাই আলাদা আলাদা থাকে। তাঁর কাছে একটা ব্যাপার জেনে, আমার এই দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার এবং সরকারের মানবিক চেহারার একটা ছবি পরিষ্কার হয়ে যায়। ভদ্রলোকের আসন্নপ্রসবা পুত্রবধূর ডেলিভারিতে কমপ্লিকেশন হওয়ায় তাকে সরকারি খরচে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসার জন্য অন্য শহরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সুস্থ করে নবজাতক সমেত ফেরত আনা হয়। সবটাই সরকারি খরচে।
২.
বাড়ির কাছেই একটা পার্ক, মাঝে-মাঝে বিকেলে পার্কে গিয়ে বসতাম। বাচ্চারা খেলাধুলো করত। কিছু বয়স্ক লোক আসতেন। প্রথম প্রথম আলাপে শুধু ‘হায়’ ‘হ্যালো’, তারপর ধীরে ধীরে কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। প্রথমে আমার ওদের ইংরেজি বুঝতে এবং ওদের আমার ইংরেজি বুঝতে, একটু অসুবিধা হতো। এদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় মিস্টার সিংহ, পাকিস্তানি মোহাম্মদ ইলিয়াস, আফ্রিকান ডক্টর নিউই (আমি উচ্চারণ করতে পারতাম না)। এছাড়া আরো কয়েকজন ছিলেন, যাদের নাম এখন আর মনে করতে পারছি না। আলাপচারিতায় প্রায় সকলেই কানাডার প্রশংসা করতেন, বলতেন- Canadians have a large country and a large heart. They have embraced people from almost all over the world.
বিপরীত ছবিও দেখেছি। একদিন দেখলাম, একজন অল্প পরিচিত ভদ্রলোক পার্কের দূরে এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন। কাছে গিয়ে বুঝলাম, উনি কাঁদছেন। অবাক হলাম! কানাডার পর উনি প্রচণ্ড বিরক্ত। উনি একজন দালালের পাল্লায় পড়ে, অনেক টাকা খরচ করে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় চুকিয়ে কানাডাকে ‘ল্যান্ড অব অপরচুনিটি’ ভেবে এখানে চলে এসে দেখেছেন, যেখানে ল্যান্ড অনেক কিন্তু অপরচুনিটি কম। তার কয়েকজন সমব্যথী জুটে গেল। মিস্টার মেকং বললেন যে, এই দেশের লোকেরা হিপোক্রেট। কোনো একটা সাধারণ অফিসের হলে গেলে দেখা যাবে যে পৃথিবীর অনেক দেশের লোক সেখানে কাজ করছেন। দেখে মনে হবে, এরা চাকরি দেওয়ার ব্যাপারে ইমপার্শিয়াল, সেকুলার এবং মেধাকে দাম দেয়, জাত-ধর্ম-বর্ণকে না। কিন্তু একবার অফিসের ভিতরে ছোটো ছোটো ঘরে গিয়ে দেখুন, যেখানে সব উচ্চ পদাধিকারীরা বসে আছেন, সেখানে বেশিরভাগ অফিসারদের গায়ের চামড়া সাদা এবং তারা খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। উচ্চ পদে নিয়োগের ব্যাপারে এরা ইমপার্শিয়ালও না এবং সেকুলারও না। পাকিস্তানি মিস্টার নুরুদ্দিন ইসলাম আরো খাপ্পা; তিনি বললেন যে, এখানে একজন সাদা চামড়ার লোককে ট্রাফিক রুল অমান্য করলে যে শাস্তি দেওয়া হয়, নন-হোয়াইট-এর ক্ষেত্রে একই অপরাধে বেশি শাস্তি দেওয়া হয় বা জরিমানা করা হয়। আরো অনেকের নিকট থেকে যে অভিযোগ শুনলাম, সেটা হলো, এখানকার সরকার মনে করে যে, অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মান এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মানের চেয়ে নিচু। ফলে, এখানে প্রথমে এসে অনেক উচ্চশিক্ষিত ডাক্তারকেও ‘অড জব’ করতে হয়, যতদিন পর্যন্ত না সে এখানকার কোনো মেডিকেল ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়।
৩.
সাধারণত, দেশ বলতে আমাদের মনে এমন একটা ধারণার সৃষ্টি হয়, যেখানে একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে এক বিশাল অঞ্চল, যেখানে বহু মানুষের বাস এবং কর্মকাণ্ড। কিন্তু কানাডার ক্ষেত্রে বিষয়টি অর্ধসত্য। আয়তনের দিক দিয়ে কানাডা সত্যিই বিশাল, রাশিয়ার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। পূর্ব-পশ্চিমে দেশটা এতটাই বিস্তৃত যে, পূর্ব প্রান্তরের স্থানীয় সময় পশ্চিম প্রান্তরের স্থানীয় সময় থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা এগিয়ে। এখানে ছয়টা টাইম জোন। আয়তনে ভারতের আড়াই গুণ বড়ো হলেও জনসংখ্যা ভারতে ৩০ ভাগের একভাগ। অধিকাংশ মানুষ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। শতাধিক ভাষাভাষির দেশ হলেও অধিকাংশ মানুষ ইংরেজিভাষি, তারপরেই ফরাসিভাষি- এই দুটোই কানাডার রাষ্ট্রীয় ভাষা।
কথিত আছে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে রাশিয়ার পশ্চিম প্রান্তের এবং কানাডার পূর্ব প্রান্তের মধ্যে অবস্থিত বেরিং প্রণালি প্রায় জলশূন্য হওয়াতে বহু মানুষ পায়ে হেঁটে রাশিয়া থেকে কানাডায় চলে আসেন। কানাডার উত্তর অঞ্চলের প্রচণ্ড ঠান্ডায় অনেকেই মারা যান এবং অনেকে দক্ষিণের কম ঠান্ডা অঞ্চলে চলে আসেন। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ৬ মাস শীতের প্রতাপ বেশি থাকে না। তুষারপাতের কয়েক মাস চাষ-বাস প্রায় বন্ধ থাকে। এখানে প্রচুর জমি এবং প্রচুর জল (এত লেক পৃথিবীর কোনো দেশে নেই)। এবং মেকানাইজড ফার্মিং-এর জন্য উৎপন্ন ফসল গুণগত এবং পরিমাণগতভাবে ভালো। এখানে দশটা প্রদেশ এবং উত্তরে তিনটে অঞ্চল। দক্ষিণভাগ ঘনবসতিপূর্ণ, এখানকার অধিকাংশ লোকই বহিরাগত। বহিরাগতদের সংখ্যা অন্টারিও প্রদেশে সবচেয়ে বেশি। বাঙালির সংখ্যা (দুই বাংলা মিশিয়ে) এই প্রদেশে সর্বাধিক।
টরন্টো শহরে এবং তার আশপাশ মিলিয়ে বহু সর্বজনীন দুর্গাপূজা হয়। এখানে বাঙালিদের বহু ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে। বাঙালি প্রবাসী ক্লাব, টরন্টো কালীবাড়ি, বঙ্গীয় পরিষদ, টরন্টো বাংলা ড্রামা গ্রুপ, সাহিত্যচক্র, কৃত্তিবাস, ক্যালকাটা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কানাডা হিন্দু মন্দির, হিন্দু ধর্মাশ্রম, টরন্টো দুর্গাবাড়ি, বেদান্ত সোসাইটি, ভারত সেবাশ্রম সংঘ ইত্যাদি।
কানাডায় বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যে শিখ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা খুব বেশি। রাজনীতিতেও শিখ সম্প্রদায়ের উৎসাহ বেশি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কয়েকজন শিখ মন্ত্রী আছেন। যদিও দুই বাংলা মিলিয়ে এত বাঙালি থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রিসভায় একজনও বাঙালি নেই।
৪.
সব দেশেরই কিছু ভালো, কিছু মন্দ দিক থাকে। আমার কাছে যেগুলো ভালো লেগেছে- দেশটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বায়ু-দূষণ, জল-দূষণ, শব্দ-দূষণ কম। রাস্তায় চলাকালীন মোটর গাড়ি সাধারণত হর্ন বাজায় না। হর্ন তখনই বাজায়, যখন চালকের মনে হয় যে, অন্য গাড়ির চালক কিছু ভুল করেছে (অনেকটা আমাদের দেশে আওয়াজ দেওয়ার মতোন ব্যাপার)। এখানে মশা-মাছি সাপ-বিছের উৎপাত কম। আর ভারতবর্ষের তুলনায় এখানকার যা যা খারাপ মনে হয়েছে, সেগুলো হলো- পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আকর্ষণ কম, আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল, ছাত্রদের শিক্ষকদের প্রতি এবং ছোটোদের বড়োদের প্রতি শ্রদ্ধা কম, বয়সের বড়োদের গুরুজন না মানা এখানে কোনো গুরুতর অপরাধ না। অনেক ছাত্র শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকে, যেটা আমার কাছে খুবই অস্বস্তিকর লাগে।
আমরা শুনেছি, পুকুরের বড়ো মাছ ছোটো মাছকে খেয়ে নেয়। কানাডায় সেটা বেশ বোঝা যায়। এখানে প্রায় সবক্ষেত্রেই বড়ো বড়ো বিজনেস হাউসের মনোপলি। এখানে ছোটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। বাজারের ক্ষেত্রে ওয়ালমার্ট, কানাডিয়ান টায়ার, নো-ফ্রিলস, ফ্রেশকো এদের মনোপলি। ভোজন সংক্রান্ত ব্যাপারে ম্যাকডোনাল্ডস, টিম হর্টনস, স্টার বক্স এদের মনোপলি। টেলিফোনে বেল কানাডা, রজার্স, টেলাস এদের মনোপলি। ব্যাঙ্কিং-এ আরবিসি, টিডি, বিমো, সিআইবিসি-দের মনোপলি। বাড়িঘর নির্মাণে ম্যাটামি, গ্রিন পার্ক, ড্যানিয়েলস এবং অন্যদের মনোপলি। সেই রকম বিজলি উৎপাদন এবং বণ্টন, গ্যাস উৎপাদন এবং বণ্টনেও গুটিকয়েক কোম্পানির মনোপলি।
কানাডায় পেট্রোল তুলনামূলকভাবে সস্তা। এখানে পেট্রোলকে বলে গ্যাস (গ্যাসোলিনের সংক্ষিপ্ত রূপ)। মোটর গাড়িতে সিটবেল্ট বাধা কম্পালসারি, না বাঁধলে আর্থিক জরিমানা। ট্রাফিক রুল খুব কড়া। অমান্য করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। হাসপাতালে কোনো শিশুর জন্ম হলে, বাড়ি যাওয়ার আগে নবজাতকের নাম পাকাপাকিভাবে জানিয়ে দিতে হবে। শুনেছি, এক শর্মা দম্পতি হাসপাতাল ছাড়ার আগে শিশুপুত্রের নাম না ঠিক করতে পারলে হাসপাতালের বার্থ সার্টিফিকেট এই শিশুর নাম লেখা ছিল FNU শর্মা। FNU মানে ফাস্ট নেম আননোন।
এখানকার রাস্তাঘাট খুব পরিষ্কার। রাতে বরফ পড়লে খুব ভোরে রাস্তা পরিষ্কার করা হয়। রাস্তার পাশের ফুটপাতকে এখানে বলে সাইডওয়াক। তুষারপাত হলে বাড়ির সামনের সাইডওয়াক পরিষ্কার করার দায়িত্ব বাড়ির মালিকের। তা না করলে যদি কোনো পথচারী বরফে পা পিছলে আহত হয়, তবে বাড়ির মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এখানে লিফটকে বলে এলিভেটর। ট্রামকে বলে স্ট্রিট কার। পাতাল রেলকে বলে সাবওয়ে। বাথরুমকে বলে ওয়াশরুম। কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের বানান একটু আলাদা। এখানে আমেরিকান অ্যাকসেন্ট প্রচলিত, যা ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট থেকে একটু আলাদা। যেমন, সিডিউলকে এখানে বলে স্কেজুল।
নির্বাচনের ব্যাপারটা অনেক শান্তিপূর্ণ। দেয়াল লিখন কিংবা মাইকের উৎপাত নেই। ভোটের দিন ছুটি থাকে না। নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিনের প্রায় একমাস আগে থেকেই ভোটদাতা নিজের সুবিধা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ভোট দিতে পারেন। এখানকার বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা ভালো। স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। অভিভাবককে বিদ্যার্থীর স্কুলশিক্ষার জন্য প্রায় আলাদা করে কোনো খরচ করতে হয় না। সব খরচ প্রভিন্সিয়াল গভর্নমেন্ট এবং ফেডারাল গভর্নমেন্ট বহন করে। স্কুলের পরিবেশ, খেলাধুলো, বিনোদনের ব্যবস্থা ভালো। অবশ্য বিদ্যার্থীকে সেই অঞ্চলের পাবলিক স্কুলে পড়তে হবে, প্রাইভেট স্কুলে পড়তে হলে সেই খরচ তাকে বহন করতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রফেশনাল কোর্স- যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল, ল’ ইত্যাদিতে পড়ার খরচ বিদ্যার্থীকে বহন করতে হবে। বিদেশি ছাত্রদের তুলনায় দেশের ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার খরচ কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার জন্য বিদ্যার্থীকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, সেই অর্থ তাকে চাকরি পাওয়ার পর কয়েক কিস্তিতে শোধ করতে হয়। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী বিদ্যার্থীদের পড়াশোনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে সরকারি খরচে। যারা কোনো কারণে বাল্যকালে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি তাদের নৈশ বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
কানাডার চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই ভালো। বয়স্কদের চিকিৎসার প্রায় সব ব্যয়ভার- ডাক্তার দেখানো, ওষুধ, হাসপাতাল, অপারেশন ইত্যাদি রিহাবিট্যাশন সেন্টার সরকার বহন করে। কম বয়স্ক কর্মচারীদের চিকিৎসা ব্যয় ভার বেশিরভাগ বহন করে তাদের এমপ্লয়ার অথবা ইন্সুরেন্স কোম্পানি। এসব শুনে ভাববেন না যে কানাডা সরকার দাতাকর্তা। অধিবাসীরা বিনা খরচেই এইসব সুবিধা পান। সরকার এই সমস্ত খরচ করেন জনসাধারণের ওপর ট্যাক্স চাপিয়ে। কানাডা ট্যাক্সের পরিমাণ অনেক দেশের থেকে বেশি, এমনকি ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার থেকেও বেশি। কথায় বলে, কানাডায় দুটো জিনিস থেকে পরিত্রাণ নেই- ‘শীতের মার আর ট্যাক্সের ভার’।
৫.
কানাডার হাউসিংয়ের পুরো ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। যেহেতু এখানে প্রচণ্ড তুষারপাত হয়, তাই এখানকার বাড়ির ছাদ সমতল হয় না। কারণ, তাহলে সেখানে তুষারপাতের বরফ জমে গিয়ে খুব ভারী ওজন চাপাবে বাড়ির দেয়ালের ওপর। তাই এখানকার বাড়ির ছাদ সাধারণত ঢালু হয়। যাতে সেখানে বরফ জমতে না পারে। এখানে বাড়ি এয়ার টাইট হয়, যাতে শীতের ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকতে না পারে। বিশেষ ধরনের ইট ব্যবহার করা হয় এবং দেয়াল ভিতরে ফাঁপা থাকে, যাতে বাইরে ঠান্ডা বেশি ভিতরে যেতে না পারে। এখানে বাড়ি বানানো শুরু করার আগে পুরো এলাকার বাড়ি গরম করার জন্য গ্যাসের ব্যবস্থা করতে হয়। সেই কারণে এখানে কারুর পক্ষে আলাদা করে বাড়ি বানানো খুবই খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। বড়ো বড়ো হাউজ বিল্ডিং কোম্পানি একসাথে অনেকটা জমি কিনে সেটা ডেভেলাপ করে। হিটিং-এর, বিজলির, জলের ব্যবস্থা করে কয়েকটা বাড়ি একসাথে তৈরি করে। এখানে যারা বাড়ি কেনে, তারা সাধারণত প্রথমে একসাথে পুরো দাম দিয়ে বাড়ি কেনে না। সেটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই বাড়ি প্রথমে কোনো ব্যাংক কেনে পুরো টাকা দিয়ে। তারপর সেই ব্যাংক কোনো লোককে বাড়িতে পুরো অধিকার দিয়ে থাকার সুবিধা দেয়। মর্টগেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রেতা প্রতি মাসে সেই মর্টগেজ-এর কিস্তি এবং ব্যাংকের লোনের ইন্টারেস্ট জমা করে। সব টাকা শোধ হয়ে যাওয়ার পর সেই বাড়িতে বসবাসকারী ব্যক্তি মালিকানা পায়। বসবাসকারী কিস্তির টাকা শোধ না করলে ব্যাংক সেই বাড়ি দখল করে নেয়।
কানাডায় চার্চের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার, মসজিদের সংখ্যা প্রায় ৮০০, মন্দিরের সংখ্যা প্রায় ৬০। এখানে দুই বাংলা মিলে, বাংলা ভাষাভাষিদের সংখ্যা লক্ষাধিক এখানে ৮ লাখের ওপর হিন্দু ধর্মাবলম্বীর বাস।
আজ Greater Toronto Area-তে বাঙালিদের জন্য একটা সম্মানের আসন পাতা আছে। সেটা একদিনে হয়নি বা হাওয়ায় ভেসে আসেনি। তার পিছনে বহু বাঙালির অবদান আছে, যাদের মধ্যে অনেকেই আজ পরলোকগত। তাদের আদর্শ আমাদের প্রেরণা, তাদের আশীর্বাদ আমাদের পাথেয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি এদের অনেকের কাছে ঋণী। জনাব আসাদ চৌধুরী এবং জনাব ইকবাল হাসানের কবিতা আমাকে ঋদ্ধ করেছে। শান্তি চক্রবর্তী, কমলা মুখার্জির গান আমাকে অভিভূত করেছে। স্বামী পুষ্করানন্দ এবং সায়ীদ যাদীদ-এর অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। রমেন গাঙ্গুলী, প্রসাদ ব্যানার্জি, গঙ্গা ব্যানার্জি, অজিত রায়, অনিমা ভট্টাচার্য, সুধাংশু সাহার স্নেহ আমাকে আপ্লুত করেছে। মহাদেব চক্রবর্তীর পুস্তকপ্রেম আমাকে প্রাণিত করেছে। অরুণ চক্রবর্তী ও সুব্রত ঘোষের বন্ধুত্ব আমাকে ঋণী করেছে। বর্তমান ভারতীয় ভিন মহাদেশের অনেক মানুষ আপন মেধা এবং কর্তব্য নিষ্ঠা দিয়ে কানাডার সমাজকে সমৃদ্ধ এবং ভারতীয় মানুষকে ঋদ্ধ করেছেন। তাদের অনেককে আমি চিনি না, সেটা সম্ভবও না। আমরা জানি-
A man throughout his life,
Cannot know even his wife.
তবু তাঁদের মধ্যে যত জনকে আমি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে চিনি তার সংখ্যাও নিতান্ত কম না। সবার নাম উল্লেখ করলে এই নিবন্ধ আয়তনে বড়ো হবে, পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে এবং সম্পাদকের বিড়ম্বনা বাড়বে। তাই সেই প্রচেষ্টা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম, “পেয়েছি ছুটি বিদায় ভাই, সবারে আমি প্রণাম করে যাই।”
লেখক পরিচিতি
জন্ম ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৭, বাংলাদেশের মাদারীপুর শহরে। বাল্য ও কৈশোর কেটেছে গাইবান্ধায়। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে পুরো পরিবারের সাথে দিলীপও ভারত চলে যান। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে দুইবার এমএ ডিগ্রি লাভের পর পিএইচ.ডি ডিগ্রি করেছেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ভারতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ সালে অবসর গ্রহণ। ২০০৪ সাল থেকে কানাডার ব্রাম্পটন শহরের বাসিন্দা। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চার।

