বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি – স্মৃতির মিনার
রেশমা মজুমদার শম্পা
আজ বরফঢাকা প্রবাসের ফেব্রুয়ারির এক বিষন্ন সকালে ঘুম ভাংগতেই অসামান্য এক উপহারে মন আপ্লুত হলো এক অনুপম ভালোবাসায়। আমার তিন বছরের নাতনি অরিত্রি ফাতিমা রহমান যার জন্ম এবং বসবাস আমেরিকার মিশিগানে সে খুব সুন্দর করে আবেগ নিয়ে গান গাইছে –
আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
ওর মা নদী তা রেকর্ড করে আমাদের কাছে পাঠিয়েছে। আনন্দে আবেগে আমার চোখের পানি আর বাঁধ মানে না। হাজার বছর রইবে বহমান আমাদের বংশ পরম্পরায় একুশে ফেব্রুয়ারির ত্যাগ, আবেদন আর মায়ের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। চিরদিন ধারণ করবো ভাষা শহীদ ভাইদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান আমরা এবং আমাদের উত্তরসূরীরা যা আমরা শিখেছি আমাদের পূর্বসূরীর কাছ থেকে।
অরিত্রির গানের সুরে আমার হৃদয় নিমগ্ন হয় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি খুব কাছ থেকে দেখা এক তরুনীর স্মৃতি কথায়। জাহানারা নুটু – আমার আম্মা, অরিত্রির বড় আম্মা। আম্মার বাবাকে নিয়ে লেখা আম্মার বই ‘আবদুল মজিদ’ এবং তার লেখা ডায়েরি থেকে তার দেখা একুশে ফেব্রুয়ারি কিছু স্মৃতি নিয়ে এই রচনা।
১৯৫১ সালের শেষের দিকে জাহান আরা নুটু নামের এক তরুণী প্রথমবারের মত ঢাকায় এসেছিলেন বড় বোন রাজিয়া সুলতানা কলির সাথে। বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরের রাজবাড়ি থেকে ঢাকায় পড়াশোনা করার তীব্র ইচ্ছা বুকে ধারণ করে একটি বেতের স্যুটকেস, সামান্য কিছু কাপড়, নিজের বইখাতা আর দুই চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে জাহান আরা নুটু তার বড় বোন কলির বাড়িয়ে দেয়া আশ্বাসের হাতটি ধরে রাজধানী ঢাকায় প্রথমবারের মতো পা রেখেছিলেন। বড়বোন রাজিয়া সুলতানা কলি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
কিছুদিনের মধ্যেই জাহান আরা নুটু বক্সীবাজার হোস্টেলে উঠেছিলেন। বড়ো বোন কলি আপা চামেলি হাউসে যা বর্তমানে রোকেয়া হল থাকেন তখন। উনি হল থেকে প্রতিদিনই প্রায় এসে দেখাশোনা করে যেতেন ছোট বোনের।

সেইসময় ঢাকা ছিলো ভাষা আন্দোলন সংগ্রামে মুখরিত। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সেই থেকে বাঙালি ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ এই ঘোষণার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলো। বাংলা ছাড়া আর কোন ভাষাই হবে না এই দেশের রাষ্ট্রভাষা।
ঢাকার বক্সীবাজার হোস্টেলের অনেক ছাত্রীই তখন সরাসরি ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত। প্রায় রাতে বক্সীবাজার হোস্টেলে ইডেন কলেজের সিনিয়র কয়েকজন সংগ্রামী ছাত্রী (দুলু, মনি) আন্দোলনের দিক নিশানা নিয়ে মিটিং করতেন। জাহানারা নুটু প্রবল আবেগ নিয়ে সেইসব মিটিং এ থাকতেন। মিছিলে যাবার জন্য মন ছটফট করতো কেবল। নুটুর তরুণ হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠতো আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের জন্য ।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনের এক জনসভায় আবার সদম্ভে বলেছিল উর্দু এবং উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। সেই মুহূর্ত থেকে বাঙালি গর্জে উঠলো প্রতিবাদে। হাজার কণ্ঠে মুখরিত হলো এক দাবী – “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই।“ বাংলাই হবে আমাদের মুখের ভাষা, লেখার ভাষা। জীবন দিয়ে হলেও মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে দেয়া হবে না।
তারপর এলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ফাল্গুন মাসের ৮ তারিখ। দুপুরের খাবারের পর তখন প্রায় বিকেল। জাহান আরা নুটু বইপত্র নিয়ে বক্সীবাজার হোস্টেলের জানালায় বসে আছেন । পড়ায় মন নাই তেমন। বড় বোন কলি সকালে ব্যস্ত হয়ে এসে বার বার নিষেধ করে গেছেন আজ যেন কোন মতেই নুটু হোস্টেল থেকে বের না হয়। তিনি শুনে এসেছেন আজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল হবে “রাষ্ট্র ভাষা বাংলার চাই” – এই দাবীতে ।
হঠাৎ গুলির আওয়াজে চমকে উঠলেন নুটু। মনে হলো যেন খুব কাছে থেকে গুলির আওয়াজ আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যই খবর এলো গোলাগুলি শব্দ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ব্যারাকের পাশ থেকে আসছে। সেই খবরে মহিলা সুপারের কড়া নির্দেশে হোস্টেলের মেইন গেট তালা লাগিয়ে দেয়া হলো।

কিন্তু সংগ্রামী ছাত্রীরা বাঁধা মানবে কেন! কয়েকজন হোস্টেলের পেছনের বিরাট বড় গাছ বেয়ে উঠে প্রাচীর টপকে পার হয়ে গেলেন। নুটুকে থামাবে কে? তাঁকেও যে ডাকছে মিছিল। মায়ের ভাষার প্রতি যে তার অপার ভালোবাসা। জাহান আরা নুটুর গাছ বেয়ে উঠার অভ্যাস নতুন নয়। চিরদিনের ডানপিটে মেয়ে তিনি।
গাছ বেয়ে তর তর করে উঠে প্রাচীর টপকে পার হয়ে রাস্তায় মানুষের সাথে মিশে এগিয়ে চলে এলেন সেই জায়গায় – মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে – এখন যেখানে শহীদ মিনার – যেখানে এখনও বুকের তাজা রক্ত লাল হয়ে আছে। আহত এবং নিহতদের অতি দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়েছিলো। লম্বা লাইনে সকলের সাথে এগিয়ে যেতেই শুনলেন আহতদের জন্য রক্ত দেবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। অনেকেই অতি আগ্রহের সাথে রক্ত দেবার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। দুই চোখ ভরা জল নিয়ে নুটুও রক্ত দেবার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। বুকের মধ্যে প্রবল আবেগ। তিনিও যে এই সংগ্রামের সাথী হতে চান। আহতদের জন্য রক্ত দিয়ে সে আবেগের সামান্য কিছুটা যেন প্রশমিত হলো। অনেকক্ষণ মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ব্যারাকে আরও অনেকের সাথে বসে রইলেন। তারপর সন্ধ্যা নামার আগেই হোস্টেলে ফিরে আসতে হলো।
২১ ফেব্রুয়ারির গুলিতে আহতের জন্য বিনামূল্য রক্ত দান একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের তরুণ চিকিৎসক ও ছাত্রদের উদ্যোগে প্রথমবারের মত মেডিকেল কলেজে ব্লাডব্যাংক স্থাপন করা হয় এবং একাধিক পত্রিকায় রক্ত দানের জন্য আবেদন প্রকাশ করা হয়।
জাহান আরা নুটু সেদিন জানতেন না ভবিষ্যতে যার সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন তার প্রাণপ্রিয় স্বামী এস এ মজুমদার সেইসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র এবং তিনিও ভাষা সংগ্রামের প্রতিবাদ সভা ও মিছিলে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই উত্তাল মিছিলে তিনিও ছিলেন।
জাহানারা নুটু পরবতীকালে চিকিৎসক ও অধ্যাপক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আজীবন তিনি প্রাণ দিয়ে নিজের ভাষাকে ভালোবেসেছেন। পড়তে যেমন ভালোবাসতেন তেমনি হাজার ব্যস্ততার মাঝেও অবিরত লিখে গেছেন। প্রকাশ করেছেন তিনটি বই।
নাটক পাগল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরবতীকালে ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস এ মজুমদারের ছিল বাংলা ভাষার প্রতি অপার ভালোবাসা। ভাষা ও দেশের প্রতি তাদের আবেগ ভালোবাসা ও উচ্ছাস গ্রন্থিত করে গেছেন তাদের সন্তানদের মধ্য। সেই ভালোবাসা ফুল হয়ে ফুটেছে আমার সন্তানদের মধ্যে ও আমার নাতনির মধ্যেও।
ভালোবাসি আমার বাংলা ভাষাকে – ভালোবাসি আমার দেশকে। ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা রেখে যেতে চাই আমাদের উত্তরসূরীদের তরে। তাঁরাও যেন মায়ের ভাষাকে রাখে সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার সাথে।
বিনম্র শ্রদ্ধা রফিক, বরকত, সালাম, জব্বর, শফিউর, আউওয়াল-সহ সকল ভাষা শহীদ ও ভাষা যোদ্ধাদের। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের সকল ভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র –
ডা. জাহান আরা মজুমদারের বই “আবদুল মজিদ”
ডা. জাহান আরা মজুমদারের লেখা রোজনামচা